গোশত

লেখক:

পাপড়ি রহমান
গেলবার শাহ আলমের হালের একটা গরু ধপ করে মরে গেল। অথচ গরুটার রোগবালাই-টালাই কিচ্ছু ছিল না। তখন নিদারুণ চৈত্রমাস। মাথার তালু ফাটিয়ে দেওয়া রোদ্দুর ঢুকে পড়েছিল একেবারে মগজের ভেতর। শাহ আলমের হাতে লাঙলের ফলা, বীজ বোনার আগে চৈত্রমাসের শেষ লাঙল দিচ্ছিল সে-জমিতে। তখুনি কিনা হঠাৎ করে একটা গরু বেকদমে চলতে শুরু করলো। ঘাড়ে জোয়াল দেওয়ার পর বেকদমে চলা যে-কোনো গরুর জন্য কঠিন বটে। তবু গরুটা যখন এই মতিছাড়া ভাব ধরলো, তখন শাহ আলম নিজেই পড়লো বিপাকে।
বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তিন-চারবার পাছায় বাড়ি দেওয়া সত্ত্বেও
মতিছাড়া গরুর মতি ফিরলো না। ফলে বাধ্য হয়ে শাহ আলমকে লাঙল ফেলতে হলো।
গরুর হঠাৎ এমন উতুরি করার কারণ কী?
গরুর কাছে এসে শাহ আলম নিজেই তাজ্জব – মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বেরোচ্ছে। অথচ তাকে সাপে-টাপে কাটে নাই! শাহ আলম তবু হাতিয়ে-পাতিয়ে গরুর সারাশরীরে ক্ষতচিহ্ন খুঁজলো। না, কোথাও কিছু নাই, শাহ আলমের আরো তাজ্জব হওয়া বাকি ছিল – কারণ মুখ দিয়ে ফেনা বেরোতে বেরোতেই মারা গেল গরুটা। এবং এই মরা পর্যন্তই। শাহ আলম জানে গরু মরার পর তাকে আর কোনোকিছু নিয়ে ভাবতে হবে না। মৃত্যুঞ্জয় আপনা-আপনিই হাজির হবে। এই গ্রামের আদি মুচি মৃত্যুঞ্জয়। এসেই সে মরার শরীর থেকে চামড়া খুলে নিয়ে যাবে।
আর মৃত্যুঞ্জয়ের চামড়া ছাড়ানো হতে না হতেই জড়ো হতে থাকবে যত ওয়ারিশ-বেওয়ারিশ কুকুর।
চামড়া ছাড়িয়ে মৃত্যুঞ্জয় দুই কদম হাঁটতে-না-হাঁটতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে মরা গরুর ওপর। মুহূর্তে কামড়াতে শুরু করবে হাড়-মাংস। কুকুরের কামড়ের চোটে গরুর নাড়ি-ভুঁড়ি সব বেরিয়ে পড়বে। আর কাঁচা মাংসের গন্ধে উড়ে আসবে ঝাঁকে-ঝাঁকে শকুন। মৃত্যুঞ্জয় মুচিরও মাঝে-সাঝে ধন্দ জাগে, শকুনের নাকে কীভাবে পৌঁছায় গরু মরার গন্ধ? আর তারা পলকে উড়ে আসে। তাও একা কেউ আসে না। তারা আসে দলবেঁধে।
গরু মরা শাহ আলমের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও তার আরো একটা বলদ ও একটা গাভী মরেছিল। গাভীটি সদ্য একটা বকনা বিইয়েছিল আর দুই বেলায় দুই কেজি করে দুধ দিচ্ছিল। কোনো রকম রোগবালাইয়ের আছর তারও ছিল না। কিন্তু সে মরে গেল! ফলে দুদ্দাড় গরু-গাভী মরা শাহ আলমের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু এইবার যা নতুন হয়ে দেখা দিলো, তার জন্য শাহ আলম আগাম কোনো ইঙ্গিত পায় নাই। মৃত্যুঞ্জয় মরা গরুর চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়ার পর থেকেই তা শুরু হলো। ততক্ষণে কুকুরের পাল গোশত নিয়ে খাবলা-খাবলি শুরু করেছে। কুকুরদের তীক্ষè দাঁতের কামড়ে নাড়িভুঁড়ি থেকে কাঁচা গোবরের গন্ধও বেরোতে শুরু করেছে। অথচ শাহ আলমের নাকে এইসব বদগন্ধের আভাস মাত্র নাই। তার নাকে তখন অন্য গন্ধ। খুব ভালো করে গরম মসলা দিয়ে গোশত কষানোর গন্ধ!
চৈত্রমাসের তীব্র ভাপ তখন ঝিমুতে শুরু করেছে। মৃত্যুঞ্জয় চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে ম্যালাক্ষণ!
প্রায় বাদামি হয়ে যাওয়া সামান্য জংলা, তার নিচে গর্ভ হওয়া নারীর উদরের মতো ফাটন্ত মাটি। এবং এই বাদামি জংলা-ফাটন্ত মাটির ওপরে পড়ে থাকা শাহ আলমের মরা গরু।
ইতোমধ্যে যা নিয়ে কুকুরের পাল মচ্ছব বসিয়েছে। কিছু-কিছু গাছে শকুনের দলও চুপটি করে বসে পড়েছে। কুকুরদের উদরপূর্তি হলে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়বে গোশতের ওপর। কুকুরের দল ও শকুনের পালের চাইতে কিছু তফাতে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে – সে শাহ আলম।
কষানো গোশতের ভুরভুর গন্ধে ততক্ষণে তার জিবে পানি এসে গেছে। পেটের ভেতরের আঁতুড়ি-ভুঁতুড়ি দলা দলা কোঁচার মতো প্যাঁচাতে শুরু করেছে – শাহ আলম আজ প্রায় কিছুই খায়নি। সকাল-সকাল এক শানকি পান্তা গিলে পেট ভরিয়ে এসেছিল সে। তারপর তপ্ত সূর্য ঢললো মাথার ওপর, হাল বন্ধ করতে হলো। আর তাকিয়ে-তাকিয়ে গরুটার মরে যাওয়া দেখতে হলো!
এই এতক্ষণে কুকুরে পাল আলসেমির কাঁইকুঁই করে পেটটা প্রায় ঢোল বানিয়ে সামান্য দূরে সরেছে। আর মরার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে শকুনের দল। এদিকে সূর্য প্রায় ডুবোডুবো। আসমানের শরীরে লালচে রঙের ছড়াছড়ির নিচে শাহ আলম ম্যালাক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।
তার নাকে ভাসন্ত কষা গোশতের ঘ্রাণ। মৃত্যুঞ্জয়মুচি আজ চামড়ার টোপলাটা বেশ ভারি করেই বয়ে নিয়ে গেছে – কেজি পাঁচেক গোশত সেও নিয়ে গেছে বাড়ির পালা কুকুর দুটার জন্য। শাহ আলমের নাকে গোশতের খুশবু ঢুকে পড়ার পর তারও কি  দুই-একবার মনে হয় নাই যে, কেজি পাঁচেক গোশত সেও নিয়ে যেতে পারতো! কিন্তু ভজঘট ঘটাতো বউ সখিনা – গরু মরার সংবাদ পেয়ে ঘণ্টাখানেক পরই সে এসেছিল নিজ চক্ষে দেখতে। এবং সে দেখেও গেছে। মরা গরুর গোশত নিয়ে বাড়ি ফিরলে সে চুলায় আগুন দেওয়া দূরে থাক, হয়তো নিজের গায়েই আগুন দিয়ে বসতো।
এই রকম নানা ভাবনায় সময় বয়ে যাচ্ছে অনেকটাই। এবং এই সন্ধে নামার মুখে শাহ আলম তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আর শাহ আলমের চক্ষের সামনেই হালের বদলটাকে কুকুর আর শকুন খেয়ে নিঃশেষ করছে।
শাহ আলমের মাথায় তখন যুগপৎ ধর্ম ও গোশতের চিন্তা। তার ধর্মে মাছ ছাড়া যে-কোনো মরা প্রাণী খাওয়া হারাম। জবাই না হওয়া কোনো প্রাণীর গোশত সে খেতে পারবে না। অথচ মানুষ তো কত কিছুই খায়। শাহ আলম শুনেছিল কারা নাকি কুকুর শিকার করে। সেই মরা কুকুরের পেটে চাল ভরে সেলাই করে দেয়। আগুনের আঁচে ঝলসানো কুকুরের গোশত ও আধসেদ্ধ ভাত তারা উল্লাস করে খায়। তওবা, তওবা। এইসব আবোল-তাবোল কীসব ভাবছে সে! কিন্তু শাহ আলম কী করে? জিভের জল গড়িয়ে পড়ার মতো হলে দুইবার সে জল গিলে ফেলেছে। কিন্তু এখনো গোশতের ঘ্রাণে তার জিভ তৃতীয়বারের মতো জলে টইটম্বুর হয়ে আছে।
শাহ আলমকে এজন্য দোষ দেওয়া যায় না। সে গরুর গোশত সর্বশেষ খেয়েছিল প্রায় ১১ মাস আগে। ঈদুল আজহার রাতে। সখিনা কয়েক ঘর থেকে ওই গোশত চেয়ে এনেছিল। এবং আদা-রসুন-পেঁয়াজে হুল্লোড় বাঁধিয়ে সে গোশত রেঁধেছিল। অবশ্য গজগজও সে কম করে নাই – ‘সব আমারেই সারতে অইব। সব আমারেই দেখতে অইব।’
শাহ আলম তখন হুঁক্কায় জ্বলন্ত টিক্কা ভরে সবে দুই-তিন টান দিয়েছে। টানের চোটে তার কুণ্ডুলি পাকানো মাথার মগজের জট ছাড়তে শুরু করেছে। ফলে সে সখিনার কথা স্পষ্ট শুনছিল – ‘কী অয় – মাইনসে কাইট্যা-কুইট্যা ১০-২০ সের গোশত ঘরে আনে না – উনি হইসেন নওয়াবের নওয়াব। তার নাকি শরম করে। গোশত কাটতে যাইতে শরম করে।’
চুলার এক স্তূপ শুকনা পাতা ঠেলে দিয়ে সখিনা ফের গজগজ করেছিল – ‘বউ যুদি গোশত মাইগ্যা আনে খাইতে জব্বর সোয়াদ লাগে। লাগবই তো। বউ হৈল দাসী আর বান্দি। দাসী-বান্দিগো আর শরহম-ভরম থাকতে অয় নাকি?’
শাহ আলম সখিনার কথার উত্তর করেনি। গোশত কষানোর খুশবুতে তার খিদা ততক্ষণে জেগে ওঠে কুমিরের মতো বিরাট হাঁ করে ফেলেছিল।
দুই-চারটা শকুন ডানা ঝাপটে গাছের ডালে বসেছিল। শাহ আলম তাকিয়ে দেখছিল। দিনের আলো একেবারেই ফুরিয়ে গেছে। এক্ষুনি থইথই অন্ধকারে চারপাশ ভরে উঠবে। শকুনের দল ঝটপট সরে যাচ্ছিল। অর্থাৎ তাদের পেটও ভর্তি হয়ে গেছে!

দুই
এইবারের বকরি ঈদ যেন একেবারে ঘাড়াঘাড়ি এসে গেল। অন্যান্যবার শাহ আলম তেমন কিছু খেয়াল করে না, কিন্তু এইবার তার যেন শ্যেন নজর। ওই যে তার হালের বলদটা মরলো এবং তারও আগে সখিনার কটাক্ষ – এ সবই সে মনে রেখেছে। ফলে এইবার শাহ আলম গ্রাম ঘুরে দেখল কে কয়টা গরু কিনেছে। কয়টা খাসি। কে বলদ কে গাভী অথবা ছাগল – সব সে খুব ভালো করে খেয়াল রাখলো। কোরবানির জন্য কেনা গরু-ছাগল ডাক ছেড়ে গ্রামে এক্কেবারে হট্টগোল বাধিয়ে রাখলো। লেগে হেগে একেবারে যা-তা অবস্থা। মরা গরুর গোশত দেখার পর শাহ আলমের যে-বিষয়টা শুরু হয়েছিল তা ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ আরো তীব্র আকার ধারণ করেছিল। শাহ আলম কখনো গরুর লাদা-গোবর মাড়িয়ে গেলেও নিজেকে অসূচি ভাবতে পারতো না। উড়ে আসা কষানো গোশতের তীব্র গন্ধ উলটো তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতো।
বকরি ঈদের দিন ভোর-ভোরই গোসল  সারলো শাহ আলম। তারপর গেল ঈদগাহে নামাজ পড়তে। নামাজ পড়ে এসেই হাতে একটা দা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো। উদ্দেশ্য গরুর গোশত বানানো। এইবার সে সখিনাকে এত গোশত এনে দেবে, যাতে তার থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে যায়। দা হাতে করে গাওয়ালিতে পৌঁছে ভারি আনন্দ বোধ করলো শাহ আলম। গোটা চল্লিশেক খাসি-গরু-ছাগল-বকরি-ভেড়া রক্তের নদীতে শুয়ে আছে। আসলে সামান্য পূর্বেই তাদের আল্লাহু আকবর বলে জবাই করা হয়েছে।
সত্যি-সত্যিই প্রবল উৎসাহ নিয়ে শাহ আলম গোশত বানাতে বসলো। চৌধুরীদের একটা সাদা গরুর তক্ষুণি চামড়া ছিলে ফেলেছে কসাই। সেই গরুর হাড়-গোশত কাটতে-কাটতে শাহ আলম ফের কষানো গোশতের ঘ্রাণ পেল। বাতাসে থইথই করছে মসলা-কষানো গোশতের সুগন্ধ। মাথা ঝাঁকিয়ে গন্ধটা তাড়াতে চাইলো শাহ আলম।
এবং ফের গোশত কাটার কাজে নিমগ্ন হয়ে গেল। তিনটা গরু পাঁচজন মিলে বানানোর পর ছোট একটা স্তূপ জমলো গোশতের। তাই নিয়ে বাড়িতে ছুট লাগালো শাহ আলম। তেল-পর্দা যাই জুটেছে সখিনা মসলার নিচে ফেলে দিক। গরু কাটার ভাগের গোশত পেতে-পেতে সন্ধ্যা লেগে যাবে।
বাড়িতে ঢুকতেই সখিনার সাথে টক্কর খেল সে। সখিনা একটা লাল-হলুদ শাড়ি পরেছে। শাড়ি থেকে উঠে আসছে আদা-রসুন-পেঁয়াজ-তেলের সুঘ্রাণ। পালের রাতাটা তাহলে আজ কোরবানি করেছে সখিনা। সত্যি-সত্যি খেতে বসে তাজ্জব বনে গেল শাহ আলম। পালের রাতাটার!
কিন্তু মোরগের গোশতের সোয়াদ কি গরুর গোশতের মতো হয় কোনো দিন?
সখিনা মুরগির ডানা-পাখনা পাতে তুলতেই শাহ আলম একেবারে হা-হা করে উঠলো – ‘আরে করস কী? করস কী? রাখ, রাখ। গরুর গোশতটা তেল-মসল্লার তলে দে। আমি ভাগের গোশত নিয়ে এই আইতাছি বইল্যা।’
‘হুড়াতাড়া করতাছেন কেন? ভালো মতন খাইয়া যান দুইডা। গোশতের টোপলা লইয়া আইতে আইতে সাঁঝ নাইম্যা পড়বো। আমিও ভাবতাছি গোশত টুকাইতে যামু নাকি দুই-এক বাড়ি?’
সখিনার কথা শুনে শাহ আলমের মেজাজ হঠাৎ চাতড়ে ওঠে। কঠিন একটা কথা ঠোঁটের আগায় এসে গেলেও সে বলে না।
উলটা সে হাত ধুয়ে ছোটে যেখানে রক্তনদীতে গরু-ছাগলগুলো নিঃসাড় শুয়ে আছে।
সৈয়দবাড়ির লাল গরুটা এক কোপ মেরেই শাহ আলম অস্বস্তি টের পায়। বাঁবুকটা কেমন ফাঁপড় করে। আর বিনবিনে ঘামে পরনের গেঞ্জিটা ভিজে চপচপা হয়ে যায়। শাহ আলম ভাবে, দা-টা ফেলে সে এইবার উঠে পড়বে। কিন্তু সে এক অদৃশ্য নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। কাঁচা গোশত-হাড় কোপানোর নেশা! এক-একটা কোপ পড়া মাত্রই হাড়গোড় থেকে অজস্র ঝিনুকের টুকরো-টাকরা এদিক-সেদিক ছুটতে শুরু করে। শাহ আলম ভাবে, সে চক্ষে ভেলকি দেখছে।
‘গোশতের মইধ্যে ঝিনুক আইল কইথন?’
নানান বিভ্রমের ভেতরেও সে গোশত কাটার কাজ চালিয়ে যায়। ততক্ষণে সখিনা গরুর কাটছাঁটে জিরার গুঁড়া ফেলেছে। মুহূর্ত মাত্র সময়েই সখিনার রান্না গোশতের গন্ধে শাহ আলমের শরীরে অচেনা পাঁক ওঠে। তীব্র কম্পনের পর শাহ আলম ক্লান্তিতে চোখ বুজে ফেললেও ওই গন্ধ তাকে ছাড়ে না।
প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে কষানো গোশতের গন্ধ শাহ আলমের সামান্য হিম শরীরে ক্রমাগত আছড়ে পড়ে…

শেয়ার করুন

Leave a Reply