গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প অতিকায় ডানাওয়ালা এক বুড়ো

লেখক:

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

বৃষ্টিপাতের তৃতীয় দিন পর্যন্ত বাড়ির ভেতর তাদের হাতে এত কাঁকড়া মারা পড়ল যে পেলাইয়োকে ভেজা উঠোন পেরিয়ে এসব কাঁকড়া সমুদ্রে ছুড়ে ফেলতে হলো। কারণ নবজাত শিশুটির সারারাত জ্বর ছিল আর সবাই মনে করল এই দুর্গন্ধই অসুখের কারণ। সেই মঙ্গলবার থেকে পৃথিবীটা বিষণ্ণ হয়ে আছে। আকাশ আর সমুদ্র দুটোই একই রকম ছাই-ধূসর রঙের আর মার্চের রাতে যে-সৈকতের বালি আলোর গুঁড়োর মতো ঝিকমিক করত এখন তা কাদার দলা আর পচাগলা সামুদ্রিক মাছের মতো হয়ে গেছে। মরা কাঁকড়া সমুদ্রে ছুড়ে পেলাইয়ো যখন ফিরে আসছে আলো এতটাই ক্ষীণ, উঠোনে যে একটা কিছু নড়ছে আর গোঙাচ্ছে তা বলতে গেলে দেখাই যাচ্ছে না। দেখার জন্য তাকে খুব কাছাকাছি যেতে হলো – একজন বুড়ো, অত্যন্ত বুড়ো কাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন; আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবার পরও অতিকায় দুটো ডানার কারণে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না।

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কিত পেলাইয়ো স্ত্রী এলিসেন্দার কাছে ছুটে গেল। স্ত্রী তখন অসুস্থ শিশুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল। পেলাইয়ো তাকে উঠোনের পেছন দিকে নিয়ে এলো। নির্বাক নিস্পন্দন দুজন মানুষ মাটিতে পড়ে থাকা দেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে কাপড়-কুড়ানিদের ছিন্নবেশ। টেকো মাথায় কিছু বিবর্ণ চুলের আভাস তখনো রয়ে গেছে, মুখে অল্প কটি দাঁত, একদা যদি তার প্রপিতামহের মাহাত্ম্য থেকেও থাকে তার দুর্দশাগ্রস্ত ভেজা শরীর তা একেবারেই ম্লান করে দিয়েছে। তার বিশাল বাজডানার অর্ধেক পালক ঝরে গেছে, কাদামাটিতে মাখামাখি, যেন চিরদিনের জন্য মাটিতে গেঁথে গেছে। পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা দীর্ঘ সময় ধরে বুড়োর দিকে তাকিয়ে থেকে তাদের ঘোর কাটালো; একসময় মনে হলো বুড়ো তাদের চেনা। তারা সাহস করে বুড়োর সঙ্গে কথা বলল। বুড়ো দুর্বোধ্য এক আঞ্চলিক ভাষায় নাবিকের জোরালো স্বরে জবাব দিলো। ডানার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এবার তারা বুদ্ধি খাটিয়ে বের করল বুড়ো আসলে ঝড়ে জাহাজডুবিতে বিচ্ছিন্ন বিদেশি নাবিক। তারপরও তারা প্রতিবেশী এক বৃদ্ধাকে ডেকে আনল। জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে বৃদ্ধা সবই জানে। একবার তার ওপর চোখ পড়লেই ডানাওয়ালা বুড়োকে নিয়ে তাদের যে-বিভ্রান্তি বৃদ্ধা তা কাটিয়ে দিতে পারবে। বৃদ্ধা বললেন, ‘তিনি একজন দেবদূত। নিশ্চয়ই তিনি শিশুটির জন্য এখানে আসছিলেন। কিন্তু বেচারা এতটাই বৃদ্ধ, বৃষ্টি তাকে আছড়ে ফেলে দিলো।’

পরদিন সবাই জানল রক্তমাংসের এক দেবদূত পেলাইয়োর বাড়িতে আটকা পড়েছেন। তাদের প্রতিবেশী সেই জ্ঞানী বৃদ্ধার এই রায়ের কারণে এই দেবদূত বেঁচে গেলেন – তখনকার আমলের ধারণা, এরা হচ্ছেন আধ্যাত্মিক ষড়যন্ত্রের বেঁচে যাওয়া পলাতক প্রাণী, যাদের মুগুরপেটা করে হত্যা করা হতো।

নিজ হাতে পেয়াদার মুগুর তুলে নিয়ে পেলাইয়ো সারা বিকেল রান্নাঘর থেকে তার ওপর চোখ রাখছিল। তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তাকে টেনেহিঁচড়ে কাদা থেকে তুলে আনে এবং মুরগির খোঁয়াড়ে মুরগির সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখে। মধ্যরাতে যখন বৃষ্টি থামে পেলাইয়ো ও এলিসেন্দা তখনো কাঁকড়া মেরে চলেছে। এর কিছুক্ষণ পরই শিশু উঠে বসে, তার গায়ের জ্বর ছেড়ে দেয় এবং সে খেতে চায়। তারা কৃতজ্ঞতার প্রশান্তি অনুভব করল, দেবদূতকে একটি মাচানের ওপর বসিয়ে তার জন্য পানি ও তিনদিন চলার মতো খাবারের জোগান দিলো; ঠিক করল তারপর তাকে নিয়তির কাছে ভরা সাগরে ফেলে আসবে। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই তারা যখন উঠোনে নামল, দেখল প্রতিবেশীরা মুরগির খোঁয়াড়ের সামনে দেবদূতকে নিয়ে মজা করছে – তার ওপর এতটুকু শ্রদ্ধা তাদের নেই, খোঁয়াড়ের তারের ফাঁক গলিয়ে ভেতরে খাবার ছুড়ে মারছে – যেন তিনি কোনো অতিপ্রাকৃতিক সৃষ্টি নন, কেবল সার্কাসের একটি জন্তু মাত্র।

অদ্ভুত এই খবরটি শুনে ফাদার গনজাগা সকাল ৭টার আগেই এসে হাজির হলেন। ততক্ষণে আরো যেসব দর্শনার্থীর আগমন ঘটল তারা কেউই ভোরের দর্শনার্থীদের মতো এমন চপলচিত্তের নয়। তারা এই বন্দির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা-কল্পনা শুরু করল। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সহজ-সরল তারা ভাবল, এই দেবদূতকে গোটা পৃথিবীর মেয়র ঘোষণা করা উচিত। আর যারা একটু কঠোরমনা তারা মনে করল, ভবিষ্যতের সব যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য তাকে ফাইভ স্টার জেনারেল পদে উন্নীত করা দরকার। যারা ভাবুক ধরনের তারা মনে করল, এই দেবদূতকে আটকে রেখে তাকে দিয়ে জ্ঞানী ও পাখাওয়ালা সন্তান উৎপাদনের কাজে লাগানো যেতে পারে – এই নতুন প্রজন্মের জ্ঞানী মানুষ গোটা বিশ্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। ফাদার গনজাগা পাদ্রি হওয়ার আগে বেশ দশাসই একজন কাঠুরে ছিলেন। খোঁয়াড়ের তারের বাইরে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তিনি দরজা খোলার নির্দেশ দিলেন। ভেতরে একদল বিমুগ্ধ মুরগির মাঝে তাকে হাড়-জিরজিরে অতিকায় একটি মুরগির মতোই মনে হচ্ছিল। তিনি এক কোণে শুয়ে রোদে সকালবেলার দর্শনার্থীদের ছুড়ে দেওয়া ফলের ছালবাকল ও অবশিষ্ট নাশতার মধ্যে তার ছড়ানো ডানা শুকাচ্ছিলেন।

ফাদার গনজাগা যখন মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে ল্যাটিন ভাষায় তাকে সুপ্রভাত বললেন, পৃথিবীর প্রগল্ভতার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা এই দেবদূত কোনোরকমে তার প্রাচীন চোখদুটো তুলে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কিছু একটা বিড়বিড় করে তার জবাব দিলেন।

পাদ্রির আওতাধীন উপাসকরা যখন দেখল এই প্রাণী ঐশ্বরিক ভাষা বোঝেন না কিংবা পাদ্রিকে কীভাবে সম্ভাষণ জানাতে হয় তাও জানেন না, তাকে প্রতারক মনে করল। পাদ্রি আরো কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি তো মানুষের মতোই, তার শরীরে লেগে থাকা আবর্জনার অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, তার পাখার পেছন দিকটাতে প্যারাসাইট গজিয়েছে আর মহাজাগতিক ঝড়ের দাপটে ডানা দুটো কাহিল হয়ে পড়েছে; এসব আঘাতের কারণে কোনো মাপেই তাকে গর্বিত দেবদূতের মতো মনে হচ্ছে না। পাদ্রি মুরগির খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে এসে উৎসাহী দর্শকদের নসিহত করলেন এবং তাদের মূঢ়তার জন্য সতর্ক করে দিলেন। তিনি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন বিচিত্ররূপী শয়তান অসতর্ক মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করে থাকে। বাজপাখি এবং উড়োজাহাজের পার্থক্য বুঝতে শুধু ডানা দেখাই যথেষ্ট নয়। আর দেবদূত শনাক্ত করার জন্য ডানা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তারপরও তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন বিষয়টি নিয়ে তিনি তার অধিকর্তাকে চিঠি লিখবেন, আর তিনি লিখবেন সুপ্রিম পনটিফের কাছে, সর্বোচ্চ আদালত থেকে এই অতিকায় ডানাওয়ালা বুড়ো সম্পর্কে রায় জানা যাবে।

পাদ্রির জ্ঞানগর্ভ নসিহত কৌতূহলী মানুষের বন্ধ্যা হৃদয় স্পর্শ করতে পারল না। দেবদূত ধরা পড়ার খবরটি এত দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ির উঠোন বাজারে পরিণত হয়ে বাড়িঘর ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। আর তাদের সামাল দিতে বন্দুকের ডগায় বেয়নেট লাগানো সৈন্যদের ডাকতে হলো। বাজারে পরিণত হওয়া আঙিনার ময়লা সাফ করতে গিয়ে এলিসেন্দার শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ার অবস্থা। শেষ পর্যন্ত তার মাথায় বুদ্ধি এলো বরং উঠানের চারপাশে বেড়া দিয়ে আটকে দেবে, কেউ দেবদূতকে দেখতে চাইলে পাঁচ সেন্ট দিয়ে তবে ভেতরে যাবে।

বহুদূর থেকে মানুষ আসতে শুরু করল। ভ্রমণে বের হওয়া একটি কার্নিভাল এখানে এসে থামল। তাদের একজন উড়ন্ত বাজিকর কসরত দেখিয়ে দর্শক টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। কারণ বাজিকরের ডানা দুটো দেবদূতের ডানার মতো নয়, বরং আকাশচারী বাদুড়ের মতো। সবচেয়ে হতভাগ্য পঙ্গু লোকজন সুস্বাস্থ্যের আশায় এখানে জড়ো হলো। সেই শৈশব থেকে হৃদ্যন্ত্রের ধুকপুক গুনতে থাকা এক বৃদ্ধার গোনার মতো সংখ্যা ফুরিয়ে গেছে, সেও এসেছে। পর্তুগিজ লোকটিকে আকাশের তারারা হইচই শব্দ করে বিরক্ত করছে, তারও সমাধান চাই। ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়ানো একজন জেগে থাকা অবস্থায় সম্পন্ন করা তার সারাদিনের কাজ লন্ডভন্ড করে দেয়। যেনতেন রোগব্যাধি নিয়েও অনেকেই আসে। জাহাজডুবির পর বিশৃঙ্খল অবস্থা পৃথিবীতে কাঁপন তুলেছে; এত ক্লান্তির মধ্যেও পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা খুব খুশি –  কারণ এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তাদের ঘর টাকায় ভরে গেছে আর দেবতীর্থে ঢোকার জন্য অপেক্ষমাণ তীর্থযাত্রীর লাইন ততক্ষণে দিগন্তরেখায় গিয়ে ঠেকেছে।

এই কর্মযজ্ঞে একজনই কেবল নিজের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেননি। তিনি দেবদূত। তেলের বাতির নারকীয় উত্তাপ আর চারপাশে উৎসর্গের মোমের আলোতে বিভ্রান্ত দেবদূত অন্যের আশ্রয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে সইয়ে নিচ্ছিলেন। তারা তাকে প্রথমে কর্পূর খাওয়াতে চেষ্টা করল, জ্ঞানী সেই বুড়ি জানিয়েছে দেবদূতদের জন্য খাবার হিসেবে এটাই নির্ধারিত। কিন্তু তিনি এ-খাবার প্রত্যাখ্যান করলেন। ঠিক একইভাবে তিনি প্রায়শ্চিত্তকারীদের আনা গির্জার মধ্যহ্নভোজ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ অবশ্য জানতে পারেনি তিনি বার্ধক্যের কারণে, না দেবদূত হওয়ার কারণে এই খাবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বেগুনের ভর্তা ছাড়া আর কিছুই খেলেন না। এ পর্যন্ত একমাত্র ধৈর্য ছাড়া তার মধ্যে অন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক গুণের প্রকাশ ঘটেনি। বিশেষ করে প্রথম দিনগুলোতে যখন তাকে মুরগি ঠোকর, ডানায় ঢুকে পড়া নাক্ষত্রিক প্যারাসাইট খোঁজা, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ স্পর্শ করার জন্য টেনে পালক তুলে ফেলা, তাকে শোয়া অবস্থা থেকে দাঁড় করানোর জন্য এমনকি অত্যন্ত সদয় হয়ে নিক্ষেপ করা পাথর – সবকিছুতে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। কেবল একবারই তারা দেবদূতকে নাড়াতে সমর্থ হয় যখন তপ্ত লোহার শলাকা তার শরীরের একাংশে লাগিয়ে দেয় – তিনি এতটা স্থবির হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চুপ পড়ে ছিলেন যে সবাই ধরে নিয়েছে তিনি মারা গেছেন। তবে শরীরে ঝাঁকি দিয়ে তিনি জেগে ওঠেন, তার তপোবনের ভাষায় কথা বলেন এবং তার চোখে অশ্রুপাত শুরু হয়।

তিনি কয়েকবার তার ডানা ঝাপটান, আর তাতে মুরগির বিষ্ঠা, মহাকাশের ধুলো এবং আতঙ্কের যে ঘূর্ণিপাত হতে থাকে তা নিশ্চয়ই পার্থিব কিছু নয়। অনেকেই তখন মনে করেছে দেবদূতের এই প্রতিক্রিয়া ক্রোধের নয়, বরং যন্ত্রণার আর এরপর থেকে কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করতে চেষ্টা করেনি – তাদের অধিকাংশই বুঝতে পেরেছে এই নিষ্ক্রিয়তা সবকিছু মেনে নেওয়ার কারণে নয়, বরং তা ঝঞ্ঝার পর নীরবতার মতো।

ফাদার গনজাগা যখন বন্দির প্রকৃতির সম্পর্কে সর্বোচ্চ মহলের চূড়ান্ত রায়ের প্রতীক্ষা করছেন, জনতার এই খেয়ালিভরা চাপল্যকে কাজের বুয়ার কৌতূহল বলে মেনে নিলেন। পাদ্রির কাছে রোম থেকে যে পত্রটি এসেছে তাতে মনে হলো না বিষয়টি কত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ তা তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন। বন্দির নাভি আছে কি না, তার মুখের ভাষার সঙ্গে আরামায়িক ভাষার যোগাযোগ আছে কিনা, আলপিনের ডগার খোঁচা কবার সহ্য করতে পারেন, বন্দি আসলে ডানাওয়ালা নরওয়েজিয়ান কি না – এসব নিয়ে তারা সময় কাটিয়েছে। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিঠি চালাচালি চলতেই থাকত যদি না একটি দৈব ঘটনা পাদ্রিদের এসব কীর্তিকলাপের ইতি টানত।

সেই দিনগুলোতে শহরের মেলার একটি বড় আকর্ষণ ছিল মেলায় আসা এক নারী, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়ায় সে মাকড়সাতে পরিণত হয়। তাকে দেখার জন্য যে দর্শনী নির্ধারণ করা হয় তা দেবদূতের দর্শনীর চেয়ে কেবল কমই নয়, উৎসুক জনতা চাইলে তাকে নারীর এই অসম্ভব রূপান্তর সম্পর্কে যে-কোনো ধরনের প্রশ্ন করতে পারে, যাতে তার এই ভয়াবহ দশা দেখে মনে কোনো সন্দেহ না জাগে সেজন্য উলটেপালটে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ভেড়ার আকৃতির একটি মাকড়সা, মাথায় বসানো বিষণ্ণ এক নারীর মুখ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়টি এই নারীর আকৃতি নয়, বরং তার মুখে এই হতভাগ্য জীবনের বর্ণনা। যখন বলতে গেলে তার শৈশবও কাটেনি অনুমতি না নিয়ে চুপিচুপি বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নাচের আসরে যোগ দিলো। সারারাত নাচানাচির পর যখন বনের মধ্য দিয়ে বাড়ি ফিরে আসছে, আকাশফাটা বজ্রপাত ঘটল আর সেই ফাটা অংশ দিয়ে বিদ্যুৎ ঝলকের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গন্ধকের টুকরো গায়ে পড়ে সুন্দর সেই মেয়েটিকে মাকড়সাতে রূপান্তরিত করল। সদয় মানুষেরা তার মুখের দিকে যে মাংসের টুকরো ছিঁড়ে দেয়,  তা-ই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার কাহিনিতে যে করুণ মানবিক সত্য ও ভয়ংকর শিক্ষা তা উদ্ধত বন্দি দেবদূতকে পরাস্ত করতে বাধ্য, তিনি তো এমনকি দয়াবশত মর্তের মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকান না। তাছাড়া যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর কৃতিত্ব দেবদূতকে দেওয়া হয়েছিল তাতে কিছু মানসিক বিপর্যয়ও ঘটে। যেমন একজন অন্ধের বেলায় দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার বদলে তার তিনটি নতুন দাঁত গজায়; পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন হাঁটার শক্তি ফিরে পাওয়ার বদলে জিতে নেয় লটারি আর কুষ্ঠরোগীর ক্ষতস্থানে বেরিয়ে আসে সূর্যমুখী ফুল। এগুলো অলৌকিক ঘটনার সান্ত্বনার বদলে বরং মজাদার কৌতুক – যখন মাকড়সাতে রূপান্তরিত নারীর আগমন ঘটল দেবদূতের খ্যাতি ধূলিসাৎ হয়ে গেল, মাকড়সা-নারী তাকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করল। এভাবে ফাদার গনজাগা তার অনিদ্রারোগ থেকে একেবারে সেরে উঠলেন আর পেলাইয়োদের বাড়ির উঠান তিনদিনের টানা বৃষ্টি আর শোবার ঘরে কাঁকড়া হাঁটাহাঁটির সময় যেমন জনশূন্য ছিল, ঠিক সে-অবস্থায় ফিরে এলো।

বাড়ির মালিকদের হা-হুতাশ করার আর কোনো কারণ রইল না। যে-টাকা তারা জমিয়েছে তা দিয়ে ব্যালকনি ও বাগানসহ দোতলা প্রাসাদ বানিয়ে ফেলল, চারদিক নেট দিয়ে ঘিরে দিলো যেন শীতকালে বাড়িতে কাঁকড়া ঢুকতে না পারে। জানালায় বসানো হলো লোহার পাত, যেন তা ঠেলে দেবদূত ঢুকতে না পারে। শহরের কাছাকাছি একটি খরগোশের খামার স্থাপন করে পেয়াদার চাকরিটা চিরদিনের মতো ছেড়ে দিলো। আর এলিসেন্দা কিনল উঁচু হিল সাটিনের পাম্প শু, বিচিত্রবর্ণ সিল্কের বহু পোশাক – সেকালের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নারীরা রোববারে এসব পোশাকই পরত।

মুরগির খোঁয়াড়টার ওপর কারো নজর পড়েনি। তারা যে-ক্রেওলিন দিয়ে ভেতরটা ধুয়ে রাখত, চক্ষুজ্বলা ধূপ দিত, এর কোনোটাই দেবদূতের প্রতি সমীহের কারণে উপচার নয়, বরং গোবরস্তূপের দুর্গন্ধ সরাতে – যে-দুর্গন্ধ ভূতের মতো চারদিক লেপ্টে রেখেছে এবং নতুন বাড়িটাকে পুরনো বাড়িতে পরিণত করেছে। প্রথমে শিশুটি যখন হাঁটতে শিখল সবাই সতর্ক থাকল যেন সে মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে না যায়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের ভয় কাটতে লাগল, দুর্গন্ধ সহনশীল হয়ে উঠল, দু-নম্বর দাঁতটি উঠতেই শিশুটি খেলার জন্য খোঁয়াড়ে ঢুকতে শুরু করল। খোঁয়াড়ের তারগুলো খুলে খুলে পড়ছে। মর্তের অন্যদের বেলায় দেবদূত যেমন গুরুগম্ভীর ছিল, শিশুটির বেলাতেও এতটুকু ছাড় দেননি, তবে তিনি সব ধরনের যন্ত্রণা ও গঞ্জনা মোহমুক্ত কুকুরের মতো সহ্য করে চলেছেন। দুজনেরই একই সঙ্গে জলবসন্ত হলো। যে-ডাক্তার শিশুটির চিকিৎসা করলেন তিনি দেবদূতের হৃদ্স্পন্দন শোনার লোভ সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি তার হৃৎপিন্ডের শোঁ-শোঁ শব্দ শুনলেন, কিডনিতেও বিচিত্র শব্দ; তিনি ধরে নিলেন দেবদূতের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল দেবদূতের দেহে ডানা লাগানোর যুক্তি – অত্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই দেহসংলগ্ন; ডাক্তার বুঝতে পারেন না, তাহলে এরকম ডানা অন্য মানুষেরও নেই কেন।

শিশুটি ততদিনে স্কুলে যেতে শুরু করল; রোদে-বৃষ্টিতে মুরগির খোঁয়াড় ধসে গেল। পথেঘাটের মরণাপন্ন মানুষের মতো দেবদূত নিজের শরীর টেনে এখানে-ওখানে পড়ে রইলেন। ঝাঁটাপেটা করে তারা দেবদূতকে শোবার ঘর থেকে বের করতেই পরক্ষণে দেখা গেল তিনি রান্নাঘরে পড়ে আছেন। মনে হলো তিনি একই সঙ্গে কয়েক জায়গায় অবস্থান করছেন। তারা ভাবতে শুরু করল, তিনি নিজের মতো দেখতে হুবহু একজন দেবদূত সৃষ্টি করতে পারেন – এখন সারা বাড়িজুড়ে তার মতো একেকজন। ধৈর্যচ্যুত ও মুখে লাগামহীন এলিসেন্দা চেঁচিয়ে বলতে শুরু করল, দেবদূতে ভরা এই বাড়ি নরক হয়ে গেছে, এখানে বাস করা অসম্ভব।

দেবদূত খাবার মুখে তুলতে পারছেন না, তার প্রাচীন জোড়াচোখ এতই ঝাপসা হয়ে এসেছে যে তিনি খুঁটিতে খুঁটিতে ধাক্কা খাচ্ছেন। তার আর অবশিষ্ট রয়েছে ডানার কিছু পালক। পেলাইয়ো তার দিকে একটি কম্বল ছুড়ে দেয় এবং শেডের নিচে ঘুমোতে দেওয়ার মতো দয়ালু হয়ে ওঠে। তখনই তারা টের পায় দেবদূত জ্বরে আক্রান্ত। বৃদ্ধ নরওয়েজিয়ানে জিহবা জড়ানো শব্দে প্রলাপ বকছেন। আরো দু-একবারের মতো এবারো তারা আশঙ্কা করল, তিনি মারা যাচ্ছেন। এমনকি প্রতিবেশী জ্ঞানবৃদ্ধাও বলতে পারলেন না মৃত দেবদূতকে নিয়ে কী করতে হবে।

এদিকে দেবদূত কেবল সেই শীতে টিকেই রইলেন না, প্রথম কদিনের রৌদ্রালোকে তার শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতিও ঘটল। উঠানের সবচেয়ে দূরের এক কোণে তিনি কদিন অনড় পড়ে রইলেন, কেউ তাকে দেখতে আসেনি। ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে তার পাখায় কিছু শক্ত পালক গজাতে শুরু করল, কাকতাড়ুয়ার পাখার মতো। দেখে মনে হলো, জরাজীর্ণ আরেকটি মূর্তিমান দুর্ভাগ্য। কিন্তু এ পরিবর্তনের কারণ নিশ্চয়ই দেবদূতের জানা, কারণ তিনি খুব সতর্ক ছিলেন যেন এই পরিবর্তন অন্য কারো চোখে না পড়ে। তারাভরা আকাশের নিচে কখনো কখনো তিনি                   যে-সাগরসংগীত গেয়েছেন, তা যেন কেউ না শোনে। এক সকালে এলিসেন্দা দুপুরের খাবারের জন্য কয়েকগুচ্ছ পেঁয়াজ কাটছিল, তখন তার মনে হলো গভীর সমুদ্র থেকে একটি ঝোড়ো বাতাস এসে রান্নাঘরের ভেতর বইছে। তখন সে জানালার কাছে গিয়ে দেখল, দেবদূত ওড়ার প্রথম চেষ্টাটি করছেন। কিন্তু প্রচেষ্টাটি এতই অগোছালো যে, তার আঙুলের নখের খামচিতে সবজির বাগানে বলিরেখার দাগ পড়েছে, পাখার দুর্বল ঝাপটায় তার শেডটি ভেঙে পড়ার অবস্থা, তার ঝাপটা ফসকে যাচ্ছে, বাতাসে ভর করতে পারছেন না। তারপরও দেখা গেল দেবদূত বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেছেন। এলিসেন্দা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল – নিজের জন্য, স্বামীর জন্য; অসুস্থ শকুনের মতো ঝুঁকি নিয়ে কোনোভাবে ডানা ঝাপটে বাতাসে ভর দিয়ে যখন তিনি শেষ বাড়িঘরগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে গেলেন, এলিসেন্দা তাকিয়ে রইল। পেঁয়াজকাটার মাঝখানে এলিসেন্দা তাকে উড়ে যেতে দেখছে যতক্ষণ তাকে দেখা যায় – কারণ দেবদূত আর কখনো তার জীবনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে না, বরং দিগন্তবিস্তৃত সাগরের ওপর একটি কল্পবিন্দু হিসেবে রয়ে যাবে।

 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার