ঘর খুঁজছে রুদ্র

মধুময় পাল

কার বাড়ি উঠেছেন? একটা প্রশ্ন ভেসে এলো।

আমাকে বলছেন? রুদ্র জিজ্ঞেস করে।

আর কেউ নেই তো এখানে। দোকানদার আছেন বটে। তাঁকে এ-প্রশ্ন করা যায় কি? ভদ্রলোক হাসলেন। আমি জহরলাল বাগ। পেশায়  অ্যাডভোকেট। এখানে চতুর্থ পুরুষ।

রুদ্র দোকানে ঢোকার সময় ভদ্রলোককে দেখেছিল।

অচেনা কাউকে কেউ হঠাৎ এরকম প্রশ্ন করতে পারে? বলতে চায় রুদ্র। বলে না। এলাকাটা কিছুদিন আগেও পুলিশের খাতায় উপদ্রম্নত বলে চিহ্নিত ছিল। এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। হয়তো নজরদারি আছে। ভদ্রলোক পুলিশের লোক হতে পারেন। এলাকার শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে থানায় খবরাখবর দেন। জানিয়ে রেখেছেন পেশায় অ্যাডভোকেট। অর্থাৎ পুলিশের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা রাখতে হয়। বহিরাগতদের ওপর নজর রাখার সেরা জায়গা পাড়ার দোকান। রুদ্র বেশ কিছু ঘটনা জানে। দোকানদারদের পুলিশের চর হিসেবে কাজ করতে হয়।

এখন বেশি মানুষ এখানে বেড়াতে আসে না। থাকা-খাওয়ার দুটো হোটেল ছিল মোটামুটি। বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মাসছয়েক হলো মাঝে মাঝে দু-চারজন আসছেন। তাঁরা কারো না কারো বাড়িতে ওঠেন। তাই জিজ্ঞেস করলাম। ভদ্রলোক রুদ্রর মুখ দেখে যেন প্রশ্নটা পড়ে ফেলেছে।

রুদ্র জানে পরিস্থিতি এখানে শান্তিপূর্ণ নয়। ধর্মতলায় চৌধুরীদের দোকানে বুকিংয়ের সময়ই জেনেছে। ওঁরা বলে দিয়েছেন, হেনস্থা হতে পারে। নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। তেমন কিছু হলে আমরা দায় নেব না। তিন বছর বুকিং বন্ধ রেখেছিলাম। এ-বছর তিনটে বুকিং হয়েছে। সববাইকে আমরা এ-কথা বলে দিই। পুলিশ হাত দিলে নালি ঘা। তার চেয়ে খালি পেটে থাকা অনেক শান্তি। রুদ্র একা আসছে বলেও সমস্যা হয়েছিল। নেহাত পুলিশ-বন্ধু ফোন লাগাল, তাই পাওয়া গেল।

অত ভাবার কী আছে? বলেই তো দিলাম, আমি অ্যাডভোকেট। আইনের পাহারাদার। ন্যায়ের পাহারাদার। মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দেবার চেষ্টা করি। ভদ্রলোক বলেন।

প্রথম সাক্ষাতেই এত কথা। ভদ্রলোক সাধারণ নন। এদিকের হতে পারেন, আবার ওদিকেরও হতে পারেন। রুদ্র কেনাকাটা সারে। তেমন কিছু নয়। চা লাগবে। চিনি লাগবে। বিস্কুট। আর কয়েকটা পেঁয়াজ। দোকানে অনেক কিছু আছে। মাটির ঘোড়া হাতি থেকে ডোকরার লকেটের হার থেকে মুখোশ ইত্যাদিও। টুরিস্ট টানতে এসব লাগে। গোলমাল মিটে গেলে, দু-চারটে বাড়তি ট্রেন হলে, হয়তো একদিন এই এলাকা বিজ্ঞাপনে আসবে : আহা, কী সবুজ কী সবুজ, জন্মজন্মান্তরেও ভুলবেন না, আহা, বাতাসে মাটির গান, পাতায় পাতায় আলোর নাচন, শিশিরে পাখিদের স্নান, দেখে যান, দেখে যান।

একজন আটা কিনতে আসেন। খালি গা। শিরা বেরোনো শরীর। বয়সের চেয়ে বয়স্ক। তবু পাথরের মতো শক্ত পেশি, যা তাকে বাঁচিয়ে রাখে।

ভদ্রলোক বলেন, মাদল, দু-টাকার চাল আসে নাই? কী বলে উয়ারা?

মাদল জবাব দেয়, আসে নাই। উয়ারা শুধু বলি দেয়, নাই নাই।

ভদ্রলোক বলেন, সরস্বতী কি জামিন লিবে? কী বলে?

কী জানি, উকিলবাবু। উয়ার ছেলিয়ারে জিগান। আমি জিগালে গাল দিবে। আমরা সরস্বতীরে সাথ দিই নাই।

ভদ্রলোক রুদ্রকে বলেন, সরস্বতী। লোধাগ্রামের মেয়ে। দেড় বছর জেলে। ধর্ষিত হয়েছিল। প্যারামিলিটারির এক জোয়ানের কুকর্ম। পুলিশ-পার্টির বুদ্ধিতে চলবে না সরস্বতী। জামিন নেবে না। ধর্ষণের বিচার চায়। তা কোথায় উঠলেন?

রুদ্র জবাব দেয়, রুক্মিণী ভিলা। এই রাস্তার বাঁদিকে…

ভদ্রলোক রুদ্রকে থামিয়ে বলে ওঠেন, আর বলতে হবে না। খগেন চৌধুরীদের বাড়ি। এখানে কেউ থাকে না। গেস্ট হাউস করেছে। একটা কেয়ারটেকার রেখেছে। শান্তি পাল। খগেনবাবুর বাবাকে ওই জমি দিয়েছিল আমার দাদু। ধর্মতলায় ওদের জামাকাপড়ের দোকান আছে। ওখান থেকে বুকিং হয়। ঠিক বললাম তো? আপনিও নিশ্চয় ওখানেই?

রুদ্র বলে, হ্যাঁ।

একা? নাকি সপরিবার? ভদ্রলোক মানে যিনি নিজেকে জহরলাল বাগ বলেছেন, জিজ্ঞেস করলেন। রুদ্র জানায়, একা।

চলে আসুন বিকেলে। নদীর ওপাড়ে ওই যে বাড়ি দেখছেন, ওটা আমার নিবাস। সবাই উকিলবাড়ি বলে। কোথাও যাবার প্রোগ্রাম নেই তো? চলে আসুন। আড্ডা দেওয়া যাবে। এই জঙ্গলে কীভাবে জনপদ গড়ে উঠল বলতে পারব। মজার কাহিনি আছে অনেক।

দোকানদার বলে ওঠেন, ক্রাইম স্টোরিও পাবেন। বাঘা উকিল। ইয়া ইয়া ডাকাতও পায়ে পড়ে।

রুদ্র জানিয়ে দেয়, যাব। কাল নদী পেরিয়ে ওই বাড়ির পাশ দিয়ে ধানক্ষেতে গিয়েছিলাম। যাব। বোল্ডারে পা রেখেই নদী পেরোনো যায়।

এ-ধরনের আমন্ত্রণ ভালোই লাগে রুদ্রর। স্থানীয় মানুষ। অনেক কিছু জানা যায়। একটা ব্যক্তিগত ছোঁয়া থাকে। বানানো ব্যাপার তো থাকেই। বোঝা যায়। কিন্তু সেসব শোনাও অভিজ্ঞতা। আরো একটা ইচ্ছে রুদ্রকে লোভী করে তোলে। যেটা সে প্রথম টের পেয়েছিল বোলপুরে, কোপাইয়ের ধারে। তারপর বানিয়াপাড়ায়, বানিয়া-বাসরা নদীর গায়ে, কালজানির কাছে। নদী দেখলেই কি তার সেই ইচ্ছেটা জেগে ওঠে? নাকি আরো অন্য কারণ?

 

বিকেল হতে না হতেই জহরবাবুর বাড়ি হাজির রুদ্র। নেমপেস্নট দেখল। দরজায় টোকা দিলো। কাঠের পুরনো দরজা। ফাঁক হয়ে আছে। দেখা গেল উঠোন। গলার স্বর ভেসে এলো, দরজা খোলা আছে। চলে আসুন। ঢুকেই ডানদিকে সিঁড়ি।

বসুন। এই উঠোনে একসময় সুবর্ণরেখার জল ঘুরপাক খেত একমাস-দুমাস। চারপাশে বড় বড় গাছ। দিনেও অন্ধকার। দুটো ঘর। থাকার আর রান্নার। আর ছিল জলঘর, বাড়ির ওই পেছনের দিকে। বিরাট বিরাট জালা-ভর্তি জল। তিন মাইল দূরের ইঁদারা থেকে আসত। জালার পেছনে ডাকাতদের লুকোনোর জায়গা ছিল। সব মানুষ তো উচ্ছেদ মেনে নেয় না। কেউ কেউ ডাকাত হয়ে যায়। আমার বড়দাদু তাদের আশ্রয় দিতেন। বড়দাদুকেও ঝামেলায় ফেলত পুলিশ। রক্তারক্তি হতো প্রায়ই। সরকারের লোক আর আদিবাসী মানুষ। লাশ নিখোঁজ হয়ে যেত। দাদু হীরালাল বাগ খুন হয়ে গেলেন। মানুষে মানুষে লড়িয়ে দিয়েছিল পুলিশ। জঙ্গল কাটা আটকাতে পারেনি আদিবাসী জনতা। তো নিজেরাই কাঠ চুরি ধরল। ওরা আগে চোর ছিল না। হলো। বাবা কিষণলাল বাড়ি বানালেন শহরে। কাজের সুবিধের জন্যে। তবে এ-বাড়ি ছাড়েননি। মাসে একবার-দুবার আসতেন। সুবর্ণরেখার জল তখন আর আসে না। বাঁধ হয়েছে। দূরে দূরে ঘরবাড়ি। রাস্তাও হলো। আমি কিন্তু এখানেই বেশি থেকেছি। নতুন ঘর করেছি। পাঁচিল দিয়েছি। এখানেই ভালো লাগত বেশি। শহর কাজের জায়গা। রোজগারের জায়গা। দেখেশুনে কেস নিই। লোকে ভরসা রাখে। যা আয় হয়, দিব্যি চলে যায়। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে।

কথার পর কথা। এ-ঘটনা সে-ঘটনা। সাল তারিখ। জহরবাবু একাই বলে যান। রুদ্র ক্বচিৎ কখনো একটা-আধটা। সন্ধে হয়ে আসে। এখনো এখানে ছড়ানো নির্জনতা। বাড়িটা যেন আরো নির্জন।

আমার ড্রাইভার শিউজি। অনেক দিনের ড্রাইভার। বিশ্বাসী। খোঁজ নেই চারদিন। যে-দোকানে আপনার সঙ্গে দেখা হলো, তার মালিকের বাড়ি থেকে খাবার আসছে। এভাবে কদ্দিন? হয়তো রান্নার মেয়ে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমার আর ভালো লাগছে না। গ্রামগুলো যেন কেমন হয়ে গেছে। মানুষগুলো জঙ্গল কাটলে নতুন জঙ্গল তৈরি হয়। সেই জঙ্গলটা মানুষের পক্ষে খারাপ। উন্নয়নের সঙ্গে অনেক অনেক অধঃপতন আসে। ভাবছি চলে যাব। চার পুরুষের গর্বটা অর্থহীন। হাস্যকর লাগে। শহরে গিয়ে ধান্দার লোকজনের সঙ্গেই কাটিয়ে দেব বাকি জীবন। বাড়ি বেচে দেব।

এই কথাটাই যেন আসছিল, অনুভব করে রুদ্র। পায়ে পায়ে এই কথাটাই।

যদি ভালো খদ্দের পাই। দাম নয়। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নয়। মান দিতে জানে, এমন খদ্দের। এ-বাড়ির ঐতিহ্য আছে। বড় জাতের গাছপালা আছে। এ-বাড়িকে ভালোবাসবে। ভালোবাসা ছাড়া কিছু বাঁচে না। আমার যে সেটা শুকিয়ে গিয়েছে। মাদলকে দেখলেন তো। কেমন কাটা কাটা জবাব দিলো। ওরা আমাকে সন্দেহ করে।  বাড়ি বেচেই দেবো।

রুদ্র অনুভব করে, সুবর্ণরেখার জল উঠোনে আসছে। নদীচলার শব্দ উঠে আসছে।

জহরলাল বাগ অন্য ঘরে গেলেন।

জহরবাবু, আমি নেব। আমি কিনব।

সুবর্ণরেখা বয়ে যায়।

 

দুই

মা বলেছিলেন, তোকে আমরা ঘর দিতে পারিনি। দেশ দিতে পারিনি। আদরও দিতে পারিনি। আমার পেটের ভেতর তুই, তখন দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। আমি আজো ঘর খুঁজি। তোর খোঁজার মধ্যে আমি আছি।

সেবার কোপাইয়ের কাছে মিতিলদের বাড়ি গিয়েছিল রুদ্র। সেখান থেকে ফিরে মাকে বলেছিল। জানো মা, ওখানে আমার সুন্দর একটা ঘর হতে পারে। ছায়া ছায়া, মায়া মায়া। বিকেল হলে গাছগুলো মানুষের খুব কাছে চলে আসে, পাশে বসে। যেমন তোমার পাশে বসি আমি। বা আমার পাশে তুমি। ঠিক সেইরকম। কথা বলে। জানো মা, মিতিল বলেছে, আমাকে একটা ঘর বানিয়ে দেবে। মিতিলের বউ দিয়া। সাঁওতালি মেয়ে। কী ভালো। ওদের বিয়ে নিয়ে একটু গোলমাল হয়েছিল। মিতিল সাঁওতাল পরিবারের একজন হয়ে গেছে। জানো মা, মিতিলদের ঘরগুলো ছোট ছোট, আসলে ভেতরে খুব বড়। খড়ের দোচালা নেমে আসে দাওয়ার কাছাকাছি। প্রণামের মতো। দাওয়ায় আমরা বসি। দিয়ার মা পানমণি গান করেন। সব কথা হয়তো বুঝি না। কিন্তু সুরের মধ্যে মেঠোপথ, ছায়াপুকুর, মেঘবৃষ্টি, ধানক্ষেতের গন্ধ পাই।

মা বলেছিলেন, খোকা, তুই কবি হয়ে গেলি যে?

মা, তুমি রাগ করলে? ভয় পেলে? ঘর খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাবার ভয়? কোনো ভয় নেই। বলেছ, আমার খোঁজা তোমারই খোঁজা। শোনো না, একদিন মিতিল আর দিয়ার সঙ্গে কোপাই গেলাম। কাছেই। গ্রীষ্মের বিকেল। মাটি জুড়োতে তখনো কিছু বাকি। দূর দূর চাষজমি ঘাসজমি বাসজমি থেকে হাওয়া আসে। আগুনের রেশ। মিতিলের কী একটা বোকামি নিয়ে দিয়া খুব হাসছিল। বলল, তোমার বন্ধুটা একদম বোকা, রৌদ্রদা! দিয়া আমাকে রৌদ্র বলে। রুদ্রের চেয়ে এত ভালো হতে পারে বুঝতে বুঝতেই একটা মেঘ উঠল। দিক-টিক অত চিনি না। গোয়ালপাড়া থেকে মেঘের ছায়া হইহই করে ছুটে আসে। মিতিল বলে, এ-মেঘে বৃষ্টি হয় না। কথা শেষ না হতেই দু-চার ফোঁটা গায়ে পড়ল। দিয়ার আবার হাসি। তোমার বন্ধু কিচ্ছু জানে না, রৌদ্রদা! আমি আর মিতিল গাছতলায় দাঁড়ালাম। দিয়া একছুটে নেমে গেল কোপাইয়ে। নদীর বুকজোড়া জলের দুঃখ অশ্রম্নজল হয়ে বয়ে চলেছে। হাওয়া দেয় জোর। ডালে ডালে ঘষাঘষির শব্দ। মিতিল চিৎকার করে বলে, ইটা হামার পাগল বউ। দিয়া গলা ছেড়ে সুরে সুরে বলে ওঠে, তোমার বন্ধু কিচ্ছু বোঝে না, রৌদ্রদা!

সেই মেঘে বৃষ্টি হয়নি। বাতাস ঠান্ডাও হয়নি।

বাড়ি ফিরে মিতিল বলল, এইখানে থাকবে? আমাদের সঙ্গে। একসঙ্গে হাতের জিনিস বানাব। চলে যাবে। থাকবে?

মা, বিশ্বাস করো, কানে এলো কোপাইয়ের জলের শব্দ। কোপাই আসছে। এভাবে কেউ কোনোদিন বলেনি আমাকে ঘর দেবে। আমারও ঘর হতে পারে! মাটির ঘর। মাথা নিচু করে ঢুকে যাব তোমার কোলে। মিতিল বলেছে, দরজায়, ভিতে আলপনা এঁকে দেবে। কোপাই উঠে আসে।

 

কোপাই থেকে ফিরে রুদ্র নিজেকে বলেছিল, মিতিল আর দিয়া হয়তো কিছুই বলেনি। আমি ভেবেছি।

 

তিন

বছরচারেক পর সুধাকান্ত এলো। রুদ্র বাড়ি ছিল। কত কথা নাকি জমে আছে সুধাকান্তর। আসবে আসবে করে আসা হয় না। নানারকমের ব্যস্ততা। তাছাড়া রুদ্র থাকে মফস্সলে। ট্রেনে এক ঘণ্টার পথ। ইচ্ছে করলেই আসা যায়?

কী করব বলো? সারাজীবন তো পেটখোরাকির চাকরি করলাম। ডাল-ভাত জোটাতেই বেতন বারো আনা হজম। বাকি চার আনায় অন্যান্য খরচা। টায়েটোয়ে বেঁচে থাকা। শহরে আর বাড়ি হয় কীভাবে? রুদ্র জবাব দেয়।

তোমাদের সংস্থায় কাজ করে কত জন দামি হাইরাইজে পেল্লায় ফ্ল্যাট কিনল। জমি কিনে বাড়ি করল। ছেলেমেয়েকে সাহেব-মেম বানাল। আর তুমি কিনা শুধু মাকে নিয়ে…। সুধাকান্ত বলে।

সুধা, আমি পারিনি। ব্যর্থ। পৃথিবীতে ব্যর্থ মানুষ তো থাকেই। হয়তো তারাই সংখ্যায় বেশি। তুমি লেখো এই ব্যর্থতা সফলতা নিয়ে। এককালে তো শ্রেণিভেদ বৈষম্য শোষণ বঞ্চনা এবং গরিব মানুষের জয় ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর লিখেছ।

প্রচুর নয়। কয়েকটা গল্প, দুটো উপন্যাস লিখেছিলাম। এখন আর ওসব লেখা লোকে পড়ে না। সুধাকান্ত বলে।

কী পড়ে লোকে?

জানি না। বুঝি না। যেমন যা গেলানো হয় তাই গেলে। তেমনই যা পড়ানো হয়, তাই পড়ে। পাঠ্য কি অপাঠ্য বিচার নেই। মিডিয়া। অল পাওয়ারফুল মিডিয়া। সুধাকান্তর গলায় বেদনা ক্ষোভের আঁচ পায় রুদ্র।

বলে, ছেঁদো কথা ছাড়ো। আমাকে নিয়ে লেখো।

কে পড়বে? পাঁচ পিস পাঠকও পাবো না। আসলে লেখালেখির জায়গাটা বড্ড নোংরা হয়ে গেছে।

তাই? সুধাকান্ত, তুমি কী করে ভাবলে যে, নগর পুড়বে আর দেবালয় বেঁচে যাবে? চুলকানির চিকিৎসা না হলে সারা শরীরে ছড়াবেই। রুদ্র আরো বলতে পারে, যা সে পছন্দ করে না।

ফোন বেজে উঠল। রুদ্র স্ক্রিনে নাম দেখল। চিনতে পারল না। বিক্রম। বিক্রমটা কে? কবে কোথায় দেখা হয়েছিল মনে করতে পারে না। ফোন ধরে সে বলে, হ্যালো। বিক্রম বলছেন। কোত্থেকে বলছেন। ওওওও। হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে সেই বানিয়া নদী। বাসরায় গিয়ে মিশছে। কাছেই কালজানি। শীতের বিকেলে দল বেঁধে গোরু হেঁটে হেঁটে নদী পার হয়ে গেল। মনে পড়ছে সব। মনে পড়ছে, মনে পড়ছে, সেই বিক্রম। নদীর বুকে পেটে ধুলো উড়িয়ে ছুটে গেলাম। তুমিও আমার সঙ্গে। হাঁটুজলের নদী পেরোতে চাইলাম। তুমি বললে, স্যার, আর নয়। গ্রাম আরো দূরে। নদীর হাঁ পেট ছাড়িয়ে, বাঁধ ছাড়িয়ে। ছবি তুললাম। বিকেলের জলের নদী। গোরুদের গৃহযাত্রা। ওদেরও ঘর আছে। ঘরে ফেরার সময় আছে। আচ্ছা, বিক্রম, তোমাদের বাড়ির গায়ে বানিয়ায় এখন জল আছে? আরে, স্যারটা ছাড়ো। দাদা বলো। কাকু, জেঠু, দাদু যা খুশি বলো। কী বললে? তোমার বউ আমার জন্য জমি দেখে রেখেছে? দাও দাও, ওকে দাও ফোনটা। কী যেন নাম? হ্যাঁ, মায়া। মায়া! তুমি আমার জন্য জমি দেখে রেখেছ। কী ভালো মেয়ে তুমি। কোথায়? তোমাদের বাড়ি থেকে কত দূরে? বানিয়ার গাঁয়ে? আমি যাচ্ছি শিগগিরই।

সুধাকান্ত বিরক্ত বোধ করে। অপমানিত বোধ করে। কোথাকার কোন বিক্রম। তার সঙ্গে বাড়ি জমি নিয়ে প্যাঁচাল! অসহ্য। সুধাকান্তর গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা নেই রুদ্রর। সে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আপনমনে জোরে জোরে বলে যায়, লেখালেখির জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। লিখতে পারাটা এখন বড় কথা নয়। বড় কথা, তুমি কোনো সিন্ডিকেটে আছো কিনা। বড় কথা, তোমার কোনো প্রোমোটার আছে কিনা।

মায়া, তুমি এখনো টোটোপাড়া যাও? তোমার বাপের বাড়ি? তোরসার পাড় ধরে? টিংকুর সাইকেলে চড়ে? আগে যখন লুকিয়ে প্রেম করতেও? যাও? নদীর পেটে নেমে যাও? তোমার বাবা কি এখনো ভুটানে যান কাজ করতে? মা কেমন আছেন?

রুদ্র, আমি তোমার বাড়ি এসেছি। আমি বসে আছি। রুদ্র, তোমার সঙ্গে কথা বলব বলে এসেছি। আমি তোমার বন্ধু। আমি লেখক।

মায়া, তুমি মনে রেখেছ। আমি জমি খুঁজেছি তোমাদের বাড়ির কাছাকাছি। ঘর করব। তুমি মনে রেখেছ। কী ভালো লাগছে যে। আমার কথা কেউ মনে রাখে? তোমাদের সুপারিগাছগুলো কত বড় হলো? আরো গাছ লাগিয়েছ?

রুদ্র, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলবে কি? আমি একজন লেখক। আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছ না কেন? আমি যদি মিডিয়ার লেখক হতাম, পারতে এই ব্যবহার করতে? হাত কচলাতে মাটিতে বসে! তোমরা, তোমরাই লেখালেখির জায়গাটা নষ্ট করেছ। লেখাপড়া একটা সম্মান। সেই বোধটা আর তোমাদের নেই।

মায়া, বিক্রমকে দাও। বিক্রম। এবার বন্যায় বানিয়ার জলে কি তোমাদের ক্ষতি হয়েছে। তোমাদের পাড়ায় ঢোকেনি। ও। উলটোদিকে নিচু জমি দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে? হ্যাঁ, হ্যাঁ। উলটোদিকটা তো অনেক নিচু। মনে পড়ছে। আমার জমি কি ওইখানে হবে? মায়া কি আমাকে জলে ফেলবে? হা হা। আমি বানিয়ার স্রোতের শব্দ পাচ্ছি। তুমি, আমি, মায়া আর তোমার মা দাঁড়িয়ে। বিক্রম, জলের আরো কাছে যাও। আমাকে স্রোতের শব্দ শুনতে দাও আরো।

 

চার

সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র।

মনটা ভারি হয়ে গেছে। লেখকের বাড়ির এই হাল! এত বড় লেখক। ইংরেজিতে অনুবাদ হলে, ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার সিলেকশন হলে, নোবেল পেতেন। বাংলার গর্ব, বাঙালির গর্ব তিনি। তাঁর বই বেচে প্রকাশক লাখ লাখ টাকা কামিয়েছে বছর বছর। তাঁর বাড়ির এই দশা! যে-গাছের নিচে বসে তিনি লিখতেন, সেটা আরো প্রাচীন হয়েছে, কিন্তু আছে। আরো গাছ আছে। বাড়িটা কিন্তু পরিত্যক্ত। তিনি যে এখানে থাকতেন, এখানে থেকে লিখেছেন অসামান্য কিছু লেখা, তার কোনো পরিচয় নেই। অল্প কয়েকটা বই আছে একটা আলমারিতে। জীর্ণ। বিবর্ণ মলাট। আলমারি কেউ বোধহয় খোলে না। একটা ঘরের এ-মাথা ও-মাথা দড়িতে ঝুলছে কিছু সাদা-কালো পোস্টার। তিনি কোন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, তিনি কোন সালে কোন উপন্যাস লেখেন ইত্যাদি ইনফরমেশন। যেন পোলিওর পোস্টার। পোলিওর ওষুধ কেন খাওয়া দরকার ইত্যাদি যেমন থাকে। ঘরটা ধূর মফস্সলের পুরসভার পোলিও খাওয়ানোর অফিস মনে হয়।

অমিতকে নিয়ে চলে আসে রুদ্র। মন খারাপটা গোপন রাখে। কিছুটা পথ বাইকে চেপে নদীর কাছে আসে। সাঁকোর ওপর দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে থাকে।

চোখজুড়ে আকাশ নীল গাছ মাঠ সবুজ রোদজল জলরোদ। ধানক্ষেতে উড়ে যায় সোনার গয়নার মতো আলো। বাঁশঝাড়ে সাদা মেঘের হাসি হিরের টুকরো হয়ে ঝরে পড়ে। বকের সারি পাড়ি দেয় বিল-বাঁওড়। কত পাখি ডাকে এখনো। সরু সরু লম্বা পায়ে হেঁটে বেড়ায় নির্জনতা।

অমিত মাঝে মাঝে এখানকার ছবি দেয় ফেসবুকে। মাইল মাইল সবুজ হারিয়ে যায় রোদের ওড়াউড়ির নীল দিগন্তে। দুপাশ থেকে মুখোমুখি ঝুঁকে-পড়া গাছেদের কথা বলাবলির নিচে একটা মেঠোপথ সুড়ঙ্গের মতো চলে যায় কোনো এক হৃদয়ের ভেতর। ওই পথ প্রহরে প্রহরে নতুন আলোয় ভরে যায়। ভোরের দিকে সাদাটে থেকে সন্ধের মুখে তামাটে। কুয়াশা থেকে বৃষ্টি থেকে ঝরাপাতার শীত থেকে গ্রীষ্মদুপুরে নানা রাগে বেজে ওঠে।

অমিতকে জিজ্ঞাসা করেছিল রুদ্র, ছবিগুলো সত্যি? ফটোশপের কারিকুরি নয়তো?

অমিত কথা বলার আগে হাসে। সে-হাসি এতটাই ভেতর থেকে উঠে আসা যে, টেলি-সম্পর্কের দূরত্বেও ছুঁয়ে ফেলে প্রকৃত আত্মীয়তা। বলে, দাদা, আসুন। আপনাকে নিয়ে যাব সেই দেশে। ডিঙি চেপে পাখিদের পাড়ায় ঘুরবেন।

সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে রুদ্র মেনে নেয় অমিত মিথ্যে বলেনি। যা সে বলেনি, সেটা বলা যায় না। মানুষের ভাষা কতটুকু বলতে পারে প্রকৃতির ভাষা! লেখকের বাড়ি দেখার বিষাদ ধীরে ধীরে মুছে যায়।

বাঁশির সুর শুনতে পেল রুদ্র। যেন ঠিক এখানেই এই সময়েই বেজে ওঠার কথা।

অমিত বলে, আজবদার বাঁশি। আজব বাঙাল। এখানকার অনেক পুরনো মানুষ। ওনার ডিঙিতে বসে আমরা গল্প শুনি। ওই যে গাছটা দেখছেন, সেখানে আছেন। সময় হয়েছে বেরোনোর।

একটা চিল ঘুরে ঘুরে এসে বসে সাঁকোর ডানদিকে বাঁশের উঁচুতে।

অমিত বলল, আজবদার বাঁশি শুনে এসেছে। ওরা চেনে।

জল হারিয়ে হারিয়ে রোগাসোগা নদী বয়ে চলেছে। বর্ষার জলে সামান্য মাংস লেগেছে গায়ে। দুপাড়ে কচুরিপানা আর কলমির জমাট। রুদ্রর চোখে ভেসে ওঠে একটা ডিঙি। ঝাঁপানো গাছের আড়াল থেকে স্পষ্ট হতে থাকে। চিত্রিত ডিঙি। ফুল লতা পাতা মাছ পাখি বাঁশি ঢোল একতারা। ডিঙি এগিয়ে এলে রুদ্র একটু একটু করে দেখতে পায়।

অমিত বলল, চলুন। ঘুরে আসা যাক।

তরতরিয়ে নেমে ডাকল, আজবদা! এদিকে আসেন। আপনাকে এক দাদার কথা বলেছিলাম, উনি আসছেন। আপনার ডিঙিতে একটু ঘুরবেন।

নমস্কার। আমি আজব বাঙাল। পার্টিশনের জিনিস। আদিবাড়ি সাতক্ষীরা। জন্ম সাতচলিস্নশে। বাবা মাধব বাঙাল। যাত্রার দল ছিল। সব বাজনা বাজাইতে পারতেন। বাঁশি বলেন বাঁশি। ঢোল বলেন ঢোল। দোতারা বলেন দোতারা। সবাই ওস্তাদ মানত। আমি একটা ভাদাইম্মা। ওই হইল গিয়া বেকুব। অমিতরা আসে। প্যাঁচাল পাড়ি। অরা মজা পায়। তা আপনেরা শহরের লোক। কত জানেন। কত ক্ষমতা আপনেগো। আমরা বর্ডারের লোক। বর্ডারের লোকের কাছে ভালোমানুষ আসে না।

আজব হো হো করে হেসে ওঠেন।

রুদ্র বলে, বাঁশি শুনব।

আজব বলেন, এ আর কী শোনবেন। বাঁশি এখন বাজে টিভিতে, খ্রিষ্টান মড়ার খাটের মতন বাক্সে। ইচ্ছা যখন প্রকাশ করছেন, বাজাই। অমিত, ওই খুঁটিটার সঙ্গে ডিঙিটা বান্ধো।

বাঁশির শব্দ শুনে সেই চিলটা উড়ে উড়ে খুঁটির মাথায় এসে বসল।

রুদ্রর মনে হলো, রোগাসোগা নদীর আনন্দ দুঃখ কান্না বাঁশির সুর হয়ে উঠছে।

অমিত গলুইয়ে বসে আছে। মাঝখানে আজব বাঙাল। ডিঙির আরেক প্রান্তে রুদ্র। বাঁশি বাজে। কী বলবে রুদ্র? বাহ্? আহা? কোনো ভাষা নেই তার, যা বলতে পারে এ-বাঁশিতে কী বাজে। আজব বাঙাল কী বাজান।

পাখিরা আসে গাছে।

বাঁশি রেখে বিড়ি বের করেন আজব। টিপেটুপে একটু নরম করে ফুঁ দেন বিড়ির মাথার দিকে। বলেন, এ-বাঁশি আপনেদের জন্য নয়। কিছু মনে কইরেন না। সব সুরের শাস্ত্র আছে। ব্যাখ্যা আছে। তত্ত্ব আছে। আমার সুরের সেগুলা নাই। বাজাই মনের আনন্দে। দুঃখেও বলতে পারেন। বাবার কথা মনে পড়ে। মায়ের কথা। দেশের কথা। চোখ বুইজ্যা বাঁশিতে ফুঁ দিই। কী বাজে জানি না। তবে আমার মন বাজে। আর শোনে কারা? পাখি, মাছ, গাছ, নদী, বাতাস। দেখেন ডিঙির নিচে মাছ আসছে। ওই যে পাখি বসছে।

আজব বিড়ি ধরান। ধোঁয়া ছাড়েন।

রুদ্র বলে, ওই গাছের নিচে আপনার বাড়ি?

নদী থেকে কয়েক পা হাঁটতে লাগে। সামনে সবজির বাগান। একখান ঘর।

রুদ্র বলে ফেলে, আপনার জমিতে একটা ঘর বানাতে দেবেন? আমি থাকব।

কী যে কন? আমার লগে মজা করেন ক্যান? আজব হাসেন। গরিব মানুষ আমি। আপনে থাকবেন ক্যামনে?

রুদ্র বলে, পারব।

আমার বউ এই কথা শুনলে কইব, আরেকটা ভাদাইম্মা। মনে মনে কইব। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply