চর্চিত গল্পমালা

মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন

চন্দন আনোয়ার রাজশাহীর ছেলে, আমিও। তবে আমি রাজশাহীছাড়া বহু বছর। এখন অবসর কাটছে গাজীপুরে। ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে বহুবার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। ভরাট গলা, শুদ্ধ উচ্চারণ। গল্পকথার জন্য বেশকটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। একবার তাঁর আগ্রহেই দেখা হলো একুশের বইমেলায়। বয়স চলিস্নশ ছুঁইছুঁই করলেও দারুণ তরুণ। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক। ইতোমধ্যে গবেষণা ও সৃজনশীল শাখায় অনেকগুলো প্রশংসাযোগ্য কাজ করেছেন। দুই বাংলার সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছেন। এসবই চন্দন আনোয়ারের মেধা, শ্রম ও সাধনার ফল।

এ-বছর কলকাতা বইমেলায় ‘একুশ শতক’ প্রকাশনী বের করেছে চন্দন আনোয়ারের গল্প সংকলন নির্বাচিত ৩০। গ্রন্থের প্রথম ফ্লাপে সৌমিত্র লাহিড়ী বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তমতি বুদ্ধিজীবী আবদুশ শাকুর তরুণ লেখক চন্দন আনোয়ারের নিষ্ঠা ও শ্রমসাধ্য উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ও বড়ো লেখক হতে পারবে। ওর মধ্যে সম্ভাবনা আছে।’ এছাড়া চন্দনের গল্প পড়ে বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক সাধন চট্টোপাধ্যায় পাঠক্রিয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন এভাবে, ‘উভয় বঙ্গের সাম্প্রতিক লেখালেখিতে এমন গল্পের তুলনা খুবই বিরল।’

আমিও, হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যকর্ম-সম্পর্কিত অভিসন্দর্ভ ও সম্পাদনা গ্রন্থপাঠে যতটা মুগ্ধ হয়েছি, তার চেয়েও অধিক আনন্দ-বিস্ময় আর মুগ্ধতায় পাঠ করি তাঁর গল্পের বিষয় ও নির্মাণশৈলী। চন্দনের গল্পের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কালি ও কলমে। ওঁর গল্পের বুনন-প্রণালি বারবার মনে করিয়ে দেয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র গল্পের গঠন ও কথনরীতির কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চন্দনের গল্প, চন্দনের মতো হয়েই গড়ে ওঠে। তাঁর গল্পের বিষয় প্রধানত নগরজীবন, রাজনীতি আর মুক্তিযুদ্ধ। তবে এসব সঙ্গ-প্রসঙ্গ গল্পের শরীরকে স্ফীত করে না, খুব প্রচ্ছন্নভাবে তার প্রয়োগ থাকে। বাস্তব খানিকটা জাদুবাস্তব বা পরাবাস্তব ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়।

চন্দন আনোয়ার গল্পের ঘটনা চিত্র কিংবা চরিত্রচিত্রণে অবিরল উপমা প্রয়োগ করেন। আঞ্চলিক ভাষা, বিশেষ করে রাজশাহী এলাকার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে তিনি সিদ্ধহস্ত। সে-সঙ্গে তিনি অবলীলায় চরিত্রের মুখে তুলে দেন অকথ্য গালি। ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ সংযুক্তকরণও অপ্রতুল নয়। উপমা, গালি ও ভিনদেশি শব্দ – সবই আসে সাবলীলভাবে, অতিপরিচিত পরিম-ল থেকে।

চন্দন আনোয়ার গল্পের সূত্র মেনেই গল্প শুরু করেন, কিন্তু শেষটা হয় যেন প্রত্যাশার চেয়ে অধিক প্রচ্ছন্ন। তাঁর গল্প প্রচলিত ধারা স্পর্শ করেও খানিকটা আলাদা, কিছুটা চমকপ্রদ, বাহুল্যবর্জিত, গল্পবাজারে টিকে থাকার মতো।

চন্দন আনোয়ারের জন্ম ১৯৭৮-এ। মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। প্রচুর নির্ভুল পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী কালকে সঠিকভাবে অনুধাবন করেছেন। তাঁর চেতনায় সঞ্চিত হয়েছে রাজনীতির চালবাজি, হরতালের তা-বলীলা, পুলিশের দৌরাত্ম্য আর শাসক-শোষকের চাপে পিষ্ট নিরীহ মানবজীবন। তাই তাঁর গল্প কেবল কল্পনার ফানুস নয়, বাস্তবতার মাটি-রসে পুষ্ট নবতর সৃজনকর্ম।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘কবি ও কাপালিকে’ গল্পকারের স্বদেশপ্রীতি আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের পরিচয় সুস্পষ্ট হয়। বাংলা ভাষা, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা
অর্জন-সংরক্ষণে বাঙালিকে কম সাধনা- সংগ্রাম করতে হয়নি। বিরোধীপক্ষ সর্বদা খড়্গহস্ত উঁচিয়ে রেখেছে। তারা বলেছে, রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা নয়, উর্দু। রবীন্দ্রচর্চা বন্ধ করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কাছে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ মনঃপূত হয়নি। তাই কবিকে প্রলোভন দেখানো হয়, ‘আমার সোনার বাংলা’ পালটে নতুন জাতীয় সংগীত লিখতে। ‘সামান্য এই কাজটি করে আপনি নিজে বাঁচবেন, সন্তান দুটো এতিম হবে না। একজন নারী বিধবা হবে না। দেশের মানুষও মালাউনের হাত থেকে বাঁচে! আমার সংগঠনও বেগবান হবে।

কবি সাপটে দাঁড়িয়ে গেলেন। দুই হাত টানা সোজা করে এবং সিনা উঁচু করে স্কুল-বালকের মতো সুর করে গাইতে লাগলেন – ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তো…’ (পৃ ২৩)।

এভাবেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক কবিরা নিজেকে অপশক্তির কাছে বিক্রি না করে, জীবন বাজি রেখে সত্য-উচ্চারণ করেন – যা লেখকমানসেরই শিল্পিত রূপায়ণ।

পরবর্তী গল্প ‘অসংখ্য চিৎকার’ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। এ-যুদ্ধে পাকবাহিনী কর্তৃক বাঙালি অসংখ্য নারীকে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করে ডোবা-নালায় পুঁতে রাখা হয়। যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হলেও একপর্যায়ে ক্ষমতার লাগাম চলে যায় বিরুদ্ধশক্তির হাতে। কিন্তু শুদ্ধচেতনার বীজ জেগেই থাকে। গল্পে দেখা যায়, শহর থেকে গ্রামে আগত এক তরুণ আবিষ্কার করে একটি বদ্ধভূমি, যা বটবৃক্ষের ছায়ায় শহীদদের আচ্ছাদিত করে রেখেছে। ওই এলাকার স্কুলমাস্টারের মেয়ে নাসরিনসহ কতিপয় তরুণ ডোবাটি লাল নিশান দিয়ে ঘিরে ফেলে। পতাকাগুলো উত্তাল বাতাসে সদর্পে উড়তে দেখে শত্রম্নপক্ষ জমির খাঁ হয় আতঙ্কিত। জীবনবাদী গল্পকার খানিকটা অতিলৌকিক এবং সদর্থক ভঙ্গিতে গল্পের সমাপ্তি টানেন, ‘অসংখ্য লাশ ডোবার ভিতর থেকে যেন উঠে আসছে। যুবতীদের লাশ। তাড়া করছে কাউকে। ভয় পেল জমির খাঁ। প্রাণভয়ে দৌড় দিল।… ওদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে লাল নিশান।… পুব আকাশে নতুন একটি লাল সূর্য উঠেছে’ (পৃ ৩০)। ‘পালিয়ে বেড়ায় বিজয়’ গল্পের মুক্তিযোদ্ধা রহম আলীও বিরুদ্ধশক্তির শত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়নি।

‘মা ও ককটেল বালকেরা’ এবং ‘করোটির ছাদে গুলি’ গল্পদুটির বক্তব্য মূলত একই – রাজনীতি, হরতাল আর তার ফলাফল। রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের অন্যতম শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-কর্মসূচি হরতাল। আমাদের দেশে হয় তার উলটো। ভাড়াটে কর্মী দিয়ে ককটেল নিক্ষেপ, মাস্তান দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও, ধরো-মারো, ভাঙো-কাটোই হচ্ছে হরতালের চারিত্র্য লক্ষণ। ফলে বিরোধী দল হরতাল ডাকলেই শান্তিপূর্ণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়। বিশেষ করে, মা তার সন্তান হারাতে চান না বলেই হরতালে অংশ নিতে নিষেধ করে, বাধা দেয়। কিন্তু ছেলেদের রুখতে পারে না। নেতার কাছ থেকে টাকা খেয়ে, অস্ত্র নিয়ে তারা অপকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গল্পকার চন্দন আনোয়ার সুকৌশলে রাজনীতির কদর্য চিত্র, নেতাদের মুখোশ উন্মোচন এবং মায়েদের চিরন্তন সন্তানপ্রীতির পরিচয় তুলে ধরেন।

চন্দন আনোয়ার তাঁর গল্পে তরুণ সমাজের সদর্থক অবদানকে শিল্পরূপ দিলেও তাদের নৈতিক অবক্ষয়কে উপেক্ষা করেননি। যেমন, অধ্যাপক জামিল, তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান বিজয়কে নিয়ে ‘মৃত্যু অথবা ঘুম’ গল্পের আখ্যান। বাবা-মায়ের স্বপ্ন কলেজপড়ুয়া বিজয় ডাক্তার হবে। কিন্তু বিজয় বখে যায়। সে ডাকাতি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে মারা যায়। লাশ আছে মর্গে। মা ছেলের শোকে জ্ঞানহীন পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে। হার্টের রোগী জামিলও স্বপ্নহারা, বুকভাঙা বিপর্যস্ত – মৃতপ্রায় অথবা চিরনিদ্রায় বিলীন। চন্দনের মৃত্যুবিষয়ক আরো দুটি সফল গল্প ‘ইচ্ছা মৃত্যু’ ও ‘মৃত্যুবিষয়ক কবিতাপ্রেমী’। উঠতি বয়সের নবীন নেতাদের নারীলিপ্সার গোপন ভয়াবহ চিত্র ‘গিরগিটি ও একজন মেয়ে’ গল্পে বিধৃত। গিরগিটি দেখলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়। সুন্দরী তরুণী যখন লম্পট নেতাদের ভোগের শিকার হয়, তখন সে সভ্য মানবিক পুরুষকে দেখলেও ভয়ে কুঁকড়ে যায়। হাজিবাড়ির একমাত্র ছেলে জামালকে নিয়ে বাবা-মায়ের বড় শখ ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজরানি বউ ঘরে আনবে। কিন্তু সে সুখ-স্বপ্ন বিফলে যায়। জামাল এক মেয়েকে নিয়ে ঘরে ওঠে। সে-মেয়েই সম্ভ্রম হারিয়ে আতঙ্কিত। পুরুষ দেখলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। জামাল বলে, ‘বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে হাত-পা ছুড়ে ভয়ানক শব্দ করে চিৎকার করে – আমাকে বিশ্বাস করো! আমি ওদের মতো হিংস্র নই! আমি ওদের মতো শকুন নই! আমি ওদের মতো কুকুর নই! আমি মানুষ! আমি মানুষ!!’ (পৃ ৬৩) মেয়েটি করুণ চোখে জামালের দিকে চেয়ে, ‘ওড়নাটাকে একগোছা দড়ির মতো প্যাঁচিয়ে হাতে নিল।’ গাল্পিক চন্দন জানান দেন, এই সমাজ মেয়েটিকে বাঁচতে দিলো না।

‘বাড়ন্ত বালিকার ঘরসংসার’ গল্পে শাহিদার পরিণতিও করুণ। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের নানারকম শারীরিক পরিবর্তন পরিলক্ষেত হয়। কখনো মনের গভীরে অজানা ভয়ও বাসা বাঁধে। শাহিদা তার শরীরে পরিবর্তন দেখে কৌতূহল আর আনন্দে নাচতে থাকে। বাইরে ছুটে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়। এটি তার বাবা-মা পছন্দ করে না। বিশেষ করে বাবা মনে করে মেয়ে সেয়ানা হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে। মা-মেয়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক কালো বীভৎস মহিষের মতো মানুষের সঙ্গে শাহিদার বিয়ে হয়। বিয়ের রাতে শাহিদা ভয়ে-আতঙ্কে চিৎকার করে – মা উদ্বিগ্ন, বাবা নীরব, বিমূঢ়। মহিষতুল্য পাষ- লোকটি যৌনতা-বে মত্ত। গল্পকারের বর্ণনায়, ‘রমিজা খাতুনের কলিজা ফাটিয়ে শাহিদা চেঁচিয়ে উঠল, মাগে! হামাক বাঁচা! মাগে হামাকে বাঁচা! ভুইষ! ভুইষ! ভুইষ!

ছালামত এগিয়ে আসে। মারে হাঁকে মাপ কইরা দে! হামি তোকে মাইরা ফেলেছি!

মাগে হামার প্যাট ফাইটা গেছে! মাগে হামার প্যাট কাট্যা ফেলছে। মাগে হামার প্যাটে ছুরি ঢুকাইছে! ও মাগে! ও মাগে! শাহিদা চরম নীরব হয়ে মাথা ফেলে দিল।’

(পৃ ৭৮)

স্ত্রীর মৃত্যুর বছর না পেরোতেই বৃদ্ধ আজহারউদ্দিনের দ্বিতীয় বিয়ে ও তার পরিণতি নিয়ে রচিত গল্প ‘বীজীপুরুষ’। বৃদ্ধের ছেলেমেয়েরা কেউ বাবার বিয়ের পক্ষে, কেউবা বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধের বিয়ে হয় এক সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে। বৃদ্ধের শরীর কুলোয় না। ব্যর্থ চেষ্টায় হাঁসফাঁস করে। নতুন বউ খলখল করে হাসে। পাশের ঘরে কলেজপড়ুয়া নাতি অনন্ত সব শোনে, অনুভব করে। দাদি-নাতির মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। বৃদ্ধ মারা গেলে ছেলেরা জমিজমা-সম্পদের ভাগবাটোয়ারার হিসাব কষতে বসে। এ সময় ‘হঠাৎ শুনতে পেল উঠোনের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে ওয়াক ওয়াক শব্দের ঝড় তুলছে সদ্য বিধবা। প্রথমে শরফুদ্দিন ঘর থেকে বের হয়। তারপর আজহারউদ্দিনের দুই ছেলে, মেয়েরা, ছেলের বউরা একে একে সবাই এসে গোল হয়ে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেল সদ্য বিধবাকে ঘিরে। শরফুদ্দিনকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে জায়গা করে নিয়ে বৃত্তের ভেতরে প্রবেশ করল অনন্ত।’ (পৃ ৮৬) নাতি অনন্তবিষয়ক শেষ বাক্যটি সংযুক্ত করে গল্পকার সদ্য বিধবা দাদি-নাতির সম্পর্ককে গভীর ব্যঞ্জনায় রঞ্জিত করেন। তাতে গল্পের গভীরতা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ।

‘পিতৃত্ব ও তিনটি চিৎকার’ গল্পটি প্রথম পুরুষে লেখা। পিতৃত্বের স্বাদ পেতে চায় না এমন পুরুষ বিরল। এক কলেজশিক্ষক; বিবাহিত অথচ নিঃসন্তান। বহুরকম চিকিৎসাশেষে এসেছে অবিবাহিতা আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের কাছে। বাড়িতে চাপ থাকলেও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে আগ্রহী নন ডাক্তার। কলেজশিক্ষক একদিন ডাক্তারের বাসায় যায় এবং ডাক্তারকে ধর্ষণ করে। কদিন পর পারিবারিক ইচ্ছায় এক ব্যাংকারের সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং যথাসময়ে সন্তান জন্ম দেয়। সন্তানলাভে বাড়ির সবাই আনন্দিত। দাদি তাকে নিয়ে মেতে থাকে। বাবা ব্যাংকের হিসাব ফেলে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও ‘বেবি’কে দেখতে ছুটে আসে। ডাক্তার মা-দাদি মেলাতে থাকে ছেলে কার মতো হয়েছে। সন্তান-বাবা ঘুমালে ডাক্তার মিলিয়ে দেখে সন্তান হয়েছে কলেজশিক্ষকের মতো। তার ভয় হয় কবে, কখন, কার কাছে ধরা পড়ে। একদিন ছুটির দিন ব্যাংকার ছেলেকে নিয়ে বসে। আদর-যত্ন করে। ‘হঠাৎ বাবু মুখ ফুটে ডেকে ওঠে – আববু! মানুষটা শান্ত সকাল কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার করে ওঠে – আমার বাবু আববু ডাকছে! আববু!

সঙ্গে সঙ্গে আর একটি বিকট চিৎকার বেরিয়ে আসে আমার বুকের জমিন ফেটে – ‘হায় আল্লা রে!’ (পৃ ৯৫) স্পষ্ট হয়, চন্দন আনোয়ার গল্পের সমাপ্তি টানতে খুবই সংযমী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং মার্জিত।

অপ্রত্যাশিত যৌনকর্ম নিয়ে চন্দনের আরেকটি গল্প ‘নিজের দিকে দেখি’। মেধাবী মাস্টার্স পরীক্ষার্থী সেঁজুতির সঙ্গে ব্যাংকার চয়নের কেবল বিয়ে হয়। সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা হবে পরীক্ষার পর। দুজন দুজায়গায় থাকে। বিশেষ আবেগের বশবর্তী হয়ে তাদের একবার মাত্র শারীরিক মিলনেই সেঁজুতি সন্তানসম্ভবা হয়। ফলে সেঁজুতির সব সুখ-স্বপ্ন ভেঙে পড়ার উপক্রম। সে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হবে, বড় ডিগ্রি নেবে, যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বামীর ঘরে উঠবে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সে সিদ্ধান্ত নেয় অ্যাবরশন করবে। স্বামী চয়ন ও মা রাজি নয়। বহু হিসাব-নিকাশ শেষে সেঁজুতি সিদ্ধান্ত নেয়, ‘সে মা হবে এবং চয়নকে ডিভোর্স দেবে।’ (পৃ ১৯৬) প্রতীয়মান হয়, আমাদের নারীসমাজের ইচ্ছাপূরণ ও ব্যক্তিত্বের বিকাশে চন্দন আনোয়ার বেশ যত্নবান।

ইতোমধ্যে আলোচিত গল্পগুলো ছাড়াও চন্দন আনোয়ারের ‘কাফন চোর’, ‘আদিম কাব্যকার’, ‘কতিপয় অনাথ শিশু’, ‘অন্তর্গত শূন্যতা’, ‘বারবনিতা এসোসিয়েশন’, ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’, ‘অনিরুদ্ধ টান’ প্রভৃতি গল্প সবিশেষ উলেস্নখযোগ্য। মানুষের অভাব, বদ-অভ্যাস, দেশভাগ, বাস্তব থেকে পরাবাস্তব ভাবনা এসব গল্পের অন্তর জুড়ে বসবাস। চন্দন আনোয়ার কেবল গল্পের সাদামাটা ঘটনা বিস্তারে আগ্রহী নন। গদ্যের কৌশলী প্রয়োগে, শিল্পের বিশেষ মাধুর্যে, তাঁর গল্প হয়ে ওঠে সফল সৃজনকর্ম। চন্দন আনোয়ারের গল্পের চলমান ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয় উপমা-তুলনা। যেমন, ‘খড়ের মতো অগোছালো চুল’, ‘দূর্বা ঘাসের মতো ছাঁট করা ঘন দাড়ি’, ‘পানবুড়ির দাঁতের মতো ইট আধা-ন্যাংটা’, ‘সুনামির মতো অন্ধকার ছুটে আসে চারদিক থেকে’, ‘পটকা মাছের পেটের মতো ফর্সা গাল।’ এরূপ অসংখ্য উপমার মতো তিনি গল্পের চরিত্রের মুখে তুলে দেন অকথ্য গালি এবং ভিনদেশি শব্দ। দু-চারটি গালির উদাহরণ-‘শালা চুদনার বেটা’, ‘লাথ্থি মারি তোর মুখে’, ‘পেচ্ছাব করি তোর সংসারের মুখে’, ‘মাদার চোদ, কাকে বলিস ভাড়াটে দালাল’, ‘হারামি মাগি কুণ্ঠেকার’। আর ভিনদেশি, বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ প্রয়োগ-ফ্লোর, ইমোশনালি বস্ন্যাকমেইল, গোল্ডেন চান্স, বাউন্ডারি, ইনকামের শর্টকাট, অপজিশন, সিকিউরিটি, পলিটিক্সের লাইফ, ননস্পট ইত্যাদি। এসব উপমা, গালি ও বিদেশি শব্দ গল্পের ঘটনাধারা কিংবা চরিত্রের ওপর আরোপিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত এবং সার্থক সংযোজন। তবে এসব শব্দ বাদ দিলেও গল্পের কোনো ক্ষতি হতো না। প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষা নির্মাণেও চন্দন আনোয়ার বেশ পরিশীলিত-

১. বোশেখের প্রথম সকালে লালচে রোদ উঠেছে। দুপুর হতেই মগজধোয়া আগুনরোদ কাউকেই ঘর হতে বেরোতে দেয়নি। সূর্য পশ্চিম আকাশে গা হেলিয়ে যে-ই না আয়েশ করতে গেল, তখনি লাটিমের তো ঘুরে ঘুরে বাতাস কু-লী পাকাতে শুরু করেছে ঝাউতলি বিলের মধ্যিখানে। মুহূর্তে সাঁই সাঁই শব্দ তুলে কালোঝড় উঠে আসছে লোকালয়ে। অন্ধকার দ্রৌপদীর শাড়ির মতো পেঁচিয়ে ধরছে আকাশের দিগম্বর শরীর।    (পৃ ৭২)

২. শাকুর মাথায় চাটি মেরে আইনা বলে – মানুষ পিডানোর মজারে বোকাচোদা! দুনিয়ার সেরা মজাডাই তো মানুষ পিডানির মজা! দেহিস না শালারা খুন দেওয়ানা অইয়া মানুষ পিডায়! মানুষের চিক্কুর হুনলে নাকি রক্তে নেশা বাড়ে! দেহিস না, মানুষ যতো চিক্কুর পারে ততো বেশি পিডায়।

মা-বইন মানে না। গরু-ছাগলের মতো পিডায়া লাশ বানায়া লা!        (পৃ ৩১)

চন্দন আনোয়ারের গল্প একবার পড়লে, পুনরায় পড়ার আকাঙক্ষা শেষ হয়ে যায় না। বারবার পড়ার যোগ্য তাঁর গল্প। তবে নির্বাচিত ৩০-এর সব গল্পই যে সমমানসম্মত তা নয়। তথাপি বলতেই হয়, তাঁর সাফল্যের শুরু যেন বিফলে না যায়। পাঠক হিসেবে প্রত্যাশা রাখি, চন্দনের হাতে যেন অধিক গুণমানসমৃদ্ধ গল্প পাই – যা বাংলা গল্পসাহিত্যের দিক-দিগন্তকে করবে প্রসারিত। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply