চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর : অর্জন ও অতৃপ্তি

লেখক:

সাজেদুল আউয়াল

cholocitro

চলচ্চিত্রকে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে মান্য করে একে সম্যকভাবে বোঝা এবং বোঝানোর জন্যই মূলত চলচ্চিত্রচর্চার শুরু। এ-চর্চা করার প্রক্রিয়া থেকেই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্ম ও বিস্তার ঘটে, বিশ্বব্যাপী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, চলচ্চিত্র আস্বাদনের প্রয়োজন থেকেই ১৯২০ সালে ল্যুই দ্যেলুকের উদ্যোগে প্যারিসে প্রথম চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের এক ‘সঙ্ঘ’ স্থাপিত হয়। কিন্তু সেখানে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র-প্রদর্শনীর কোনো আয়োজন ছিল বলে জানা যায় না। বস্ত্তত ১৯২৫ সালেই লন্ডনে প্রথম চলচ্চিত্র ‘সংসদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নাম ছিল ‘দি ফিল্ম সোসাইটি’। এ-সোসাইটির নিজস্ব ‘কার্যক্রম’ ছিল – ছিল ‘ধারাবাহিকতা’।

আমাদের এই ভূখন্ডে গত শতকের ছয়ের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রকে একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে মান্য করে একে সম্যকভাবে বোঝার ও বোঝানোর তাগিদ থেকেই চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয় – ‘পৃথিবীর সব জায়গাতেই ফিল্ম সোসাইটি তৈরির মুখ্য উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে, ভালো ছবি দেখার চাহিদাকে জাগানো এবং ভালো ছবির  সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করা।’১ ১৯৬৩ সালে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করে উদ্যোক্তারা সৎ, শুদ্ধ ও নির্মল চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও সেসব চলচ্চিত্র আস্বাদন-অনুধাবন-অধ্যয়ন-উপলব্ধি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা, চলচ্চিত্র-বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ, সর্বোপরি রুচিবান দর্শক তৈরি করার সেই চেষ্টারই সূত্রপাত করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ স্থাপনের উদ্যোগ নেন আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, মুহম্মদ খসরু, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, আবদুস সবুর, সালাহ্উদ্দিন, মনিরুল আলম প্রমুখ। আনন্দের কথা, উদ্যোক্তাদের মধ্যে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি, মুহম্মদ খসরু এখনো সর্বতোভাবে সক্রিয়।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র-বিষয়ক সংগঠনের কথা জানা যায়; কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে এগুলোর বেশিরভাগই ঠিক চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্য গঠিত সংগঠনের পর্যায়ে পড়ে না।২ এগুলোর নাম, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, স্থায়িত্ব থেকেই বোঝা যায় যে, ঠিক চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্য এগুলোর জন্ম হয়নি। আন্দোলনের অংশ হতে গেলে একটি সংগঠনের নির্দিষ্ট কার্যক্রম, ধারাবাহিকতা ও উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর কার্যক্রমের প্রভাব ও পরিণতি থাকতে হয়, যা ওইসব সংগঠনের ছিল না। তাই বলে এসব উদ্যোগের গুরুত্ব ও মূল্যকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। বরং সেসব উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করা আমাদের কর্তব্য বলে মনে করি।

যাই হোক, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ‘ইতিহাস’ অন্বেষণ এই রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে গত পঞ্চাশ বছর যাবৎ (১৯৬৩-২০১৩) চলমান আন্দোলন থেকে যেসব অর্জন এসেছে এবং যেসব অতৃপ্তি রয়ে গেছে, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা। এই দেখা ও বোঝার সুবিধার্থে বিগত পঞ্চাশ বছরকে প্রধান দুটি পর্বে বিভক্ত করা যেতে পারে : পূর্ব পাকিস্তান পর্ব (১৯৬৩-১৯৭০) এবং বাংলাদেশ পর্ব (১৯৭১-২০১৩)। দ্বিতীয় পর্বকে আবার দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে : প্রথম পর্যায় (১৯৭১-১৯৮০) এবং দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৮১-২০১৩)।

 পূর্ব পাকিস্তান পর্ব (১৯৬৩-১৯৭০)

প্রতিটি ভূখন্ডে কোনো সাংস্কৃতিক আঙ্গিকের চর্চার সঙ্গে সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক- সামাজিক দিকগুলো জড়িয়ে থাকে। জড়িয়ে থাকে প্রয়োজনের দিকটি। চলচ্চিত্র যে একটি শিল্প-আঙ্গিক, এর যে একটি আন্তর্জাতিকতা আছে, এর মাধ্যমে যে এর স্রষ্টা নিজের শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেন, এর দ্রষ্টা (দর্শক) যে তাঁর শিল্পকর্ম আস্বাদনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারেন এবং দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাগণ যে ভিনদেশি চলচ্চিত্র দেখে উপকৃত হতে পারেন – এ রকম একটি উপলব্ধি থেকেই পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। এই পর্বে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ ছাড়া ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আর একটি মাত্র সংগঠন ‘ঢাকা সিনে ক্লাব’ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন চালিয়ে গেছে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন আলমগীর কবির ও লায়লা সামাদ। উল্লেখ্য, এই পর্বে সিনেমা হলেও বিশেষত ঢাকার ‘নাজ’ ও নারায়ণগঞ্জের ‘ডায়ামন্ডে’ ম্যাটিনি শোতে শিল্পধর্মী বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো। মাহবুব জামিলের মতে, এগুলো যাঁরা দেখতেন তাঁদের একাংশ উল্লিখিত সংসদ দুটিতে কর্মী বা সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন এবং এই পর্বেই আলমগীর কবির ‘চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা’ বলতে যা বোঝায় তার চর্চাও নব-উদ্যমে শুরু করেন।

সমাজ-ইতিহাসে আকস্মিকভাবে কিছু ঘটে না। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন যে শুরু করতে হবে, সেই সময়কার সমাজ- বাস্তবতায় তার আবশ্যিক শর্তগুলো তৈরি হয়েই ছিল। প্রথমত, চলচ্চিত্র যে একটি শিল্পকর্ম, নানা দেশে যে ইতোমধ্যে শিল্পগুণসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, সেইগুলো যে আস্বাদন করা প্রয়োজন এবং নিজেদের দেশেও যে ওই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবেশ তৈরি করা দরকার – এই সব বিবেচনা থেকেই পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন শুরু হয়। মুহম্মদ খসরু ১৯৬৮ সালে এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে লেখেন যে, ‘চলচ্চিত্র যে শিল্প একথা আজ সর্বজন বিদিত। …দুঃখজনক হলেও একথা খুবই সত্য যে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পীরা সিনেমা যে একটা আর্ট একথা নির্বিকারে ভুলে গিয়েছেন। …আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের বন্ধ্যা ভাব এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে একটি সুষ্ঠু আন্দোলনের মাধ্যমে উন্নতি করার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।’৩ মুহম্মদ খসরুর এই অনুধাবন থেকেই স্পষ্ট হয়, ওই সময়ে কেন এই আন্দোলনের কথা ভাবা হয়। দ্বিতীয়ত, সমাজ-রাজনৈতিক একটি অবস্থাও সংস্কৃতির একটি আঙ্গিক হিসেবে শিল্পগুণসম্পন্ন চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও নির্মাণের তাগাদা দিতে থাকে। গত শতাব্দীর পাঁচ-ছয়ের দশক পূর্ব পাকিস্তানে সাংস্কৃতিক নবজাগরণের জন্ম দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা তখন নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার  বাঙালিদের দাবিয়ে রেখে শোষণ করে চলেছে। বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ করেছে, রবীন্দ্র-শতবর্ষ পালনে বাধা দিয়েছে – বাঙালি সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। কবিতা-গল্প-উপন্যাস, গান, নাটক, পোস্টার, নৃত্য প্রভৃতি হয়েছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। ছয়ের দশকের শুরুতে আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, মুহম্মদ খসরু প্রমুখ চলচ্চিত্রকেও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের একটি আঙ্গিক হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করলেন এবং সেই সূত্রে চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবলেন। ওয়াহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছেন – ‘আমি কাজটিকে নিলাম ছায়ানটের আরব্ধ কর্মেরই প্রসারণ হিসেবে – গান দিয়ে ছায়ানট যা করতে চেষ্টা করছে, সংসদ তাই করবে চলচ্চিত্রচর্চার মধ্য দিয়ে। কাজটি হল পাকিস্তানি অচলায়তনের পাঁচিলে ধস ধরানো, সুস্থতা, উদারতা, সংস্কৃতি মনস্কতার পথ কাটা। …দেশ বিদেশের সার্থক মহৎ চলচ্চিত্রের প্রদর্শন, তার রস ও মর্মগ্রহণ আমাদের মধ্যযুগীয় মফস্বলীপনার খুব দক্ষ উৎসাদন হবে – এই ছিল হিসেব।’৪ মুহম্মদ খসরুও ওই একই সময়ে চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ে ভাবছিলেন এবং ওই উদ্যোগের সঙ্গে একাত্ম হন। তাঁর মতে, ‘আমিও যখন ফিল্ম সোসাইটি গঠনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াহিদুল হকের সমান্তরাল চিন্তার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটল। আমরা একমত হলাম। ওয়াহিদুল হক বললেন, চলো কাজে লেগে যাওয়া যাক।’৫ তারপর কয়েকটি সভার মধ্য দিয়েই ঢাকায় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদে’র প্রতিষ্ঠা।

কলকাতায়ও ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ গঠিত হয় শিল্পগুণসম্পন্ন চলচ্চিত্র আস্বাদন, সমাজ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের অবস্থা ও আকাঙ্ক্ষা থেকেই। এ-সোসাইটির উদ্ভবের পেছনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, প্রগতি লেখক সংঘ, গণনাট্য সংঘ প্রভৃতির প্রভাব রয়েছে বলে সুধী প্রধানের অভিমত। তিনিই ১৯৪৬ সালে চিদানন্দ দাসগুপ্তকে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত একটি সংগঠন গড়ার পরামর্শ দেন।৬ তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ এবং ‘পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি’ – দুটিই স্ব-স্ব সময় ও সমাজ-রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম নিয়েছে এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি আঙ্গিক হিসেবে নিজেদের জিইয়ে রেখেছে। দুটি সংগঠনেরই অনেক অর্জন থাকলেও অনেক কিছু করতে না পারার অতৃপ্তিও আছে। এবার, বর্তমান রচনাকর্মের মুখ্য উদ্দেশ্যের নিরিখে পূর্ব পাকিস্তান পর্বে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদে’র অর্জন ও অতৃপ্তির দিকগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করবো।

 অর্জন

পূর্ব পাকিস্তান পর্বে দুটি মাত্র চলচ্চিত্র সংসদ সক্রিয় ছিল – ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ (১৯৬৩) ও ‘ঢাকা সিনে ক্লাব’ (১৯৬৯)। দুটি সংগঠনেরই বছরব্যাপী কার্যক্রম ছিল – ছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় – চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা। যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার স্বরূপ সম্পর্কে জানা যায় ধ্রুপদীর প্রথম সংকলনের সম্পাদকীয় থেকে, তাতে বলা হয়েছিল :

অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের মতো পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের কতিপয় লক্ষ্যবস্ত্ত বর্তমান, যেমন নিয়মিত সৎ ও শিল্পছবি প্রদর্শন, চলচ্চিত্র আলোচনা অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র গ্রন্থাগার নির্বাহ, চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার স্থাপন, চলচ্চিত্র শিক্ষায়তন স্থাপন, চলচ্চিত্র পত্রিকা প্রকাশ, চলচ্চিত্র পুস্তক প্রকাশনালয় স্থাপন, চলচ্চিত্র উপলব্ধি সঞ্চারণ, সংসদ প্রেক্ষালয় স্থাপন, সৎ ও সৃজনধর্মী চলচ্চিত্রায়নে উৎসাহদান, চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিকতা (বিষয়ে) যোগাযোগ রক্ষা ইত্যাদি।৭

উপরিলিখিত ‘লক্ষ্যবস্ত্ত’র কতোটা অর্জিত হয়েছিল? এ-প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় মুহম্মদ খসরুর রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘আর্থিক অসচ্ছলতা এবং নানাবিধ বাস্তব অসুবিধার দরুন সোসাইটি অন্যান্য কাজে সক্রিয় হতে না পারলেও এ পর্যন্ত (আগস্ট ১৯৬৮) সদস্যদের ৪৩টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে পেরেছে। এছাড়া স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিও অনেকগুলো দেখানো হয়।… বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে এ কথা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ তার সদস্যদের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধ্রুপদী রীতির ছবি দেখাতে আপ্রাণ সচেষ্ট ছিল।’৮ ‘ঢাকা সিনে ক্লাব’ ও প্রদর্শনী চালিয়ে গেছে। ১৯৭০  সালে প্রকাশিত SEQUENCE-3-এর সম্পাদকীয়তে আলমগীর কবির লিখেছেন — ‘The only quotable filmic event of the last quarter is probably the screening of a censored version of Andrzej Wajda’s ‘Everything for Sale’ in Dacca under the joint auspices of the Polish Consulate and Dacca Cine Club on the occasion of the Polish President’s visit to West Pakistan.’৯

বস্ত্তত ‘নিয়মিত সৎ ও শিল্পছবি প্রদর্শনে’র ফলেই পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্রবোদ্ধা শ্রেণি যেমন তৈরি হয়, তেমনি চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির বিকাশও ত্বরান্বিত হতে থাকে। এ সূত্রে বলা যায় যে, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রধান ‘লক্ষ্যবস্ত্ত’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ফলেই চলচ্চিত্রে উৎসাহীজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময় প্রদর্শিত ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধ্রুপদী রীতির ছবি’সমূহই (পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র) এ-অঞ্চলে দর্শক ও চলচ্চিত্রে উৎসাহীজনদের সিনেম্যাটিক টেস্ট সংগঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা বড় অর্জন। ওই সময় প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর উৎস ছিল ফরাসি, আমেরিকান, চেকোস্লোভাকিয়ান, জার্মান প্রভৃতি দূতাবাস। তারা এগুলো নিজেদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রদর্শন করতো। পরবর্তীকালে সংসদগুলো ওগুলো প্রদর্শন করতো।

ধারণা করি, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন চলমান থাকার ফলেই পূর্ব পাকিস্তান পর্বে আলমগীর কবির ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৬৮ সালের মে মাসে তিনি ‘ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন বলে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়। এই ইনস্টিটিউট থেকে একটি সার্টিফিকেট কোর্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর নিজস্ব গ্রন্থাগারও ছিল।১০ ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদে’রও নিজস্ব  সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল। এ-পর্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হচ্ছে ১৯৬৯ সালে আলমগীর কবির-রচিত ও সন্ধানী পাবলিকেশন কর্তৃক প্রকাশিত চলচ্চিত্র-বিষয়ক গ্রন্থ The Cinema in Pakistan

শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ফিল্ম ইনস্টিটিউট স্থাপন বা চলচ্চিত্র-বিষয়ক স্পেশালাইজড গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা নয়, পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ কর্তৃক চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত SEQUENCE-এর তিনটি এবং ধ্রুপদীর দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এসব সংখ্যায় চলচ্চিত্রকলার নানা বিষয় স্থান পায়। দেশি-বিদেশি ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের সমালোচনা, শিল্প-চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর রচনা, চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র সংক্রান্ত  রচনা, ভিনদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে লেখা, দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা, চলচ্চিত্রকলার সঙ্গে অন্যান্য শিল্প-আঙ্গিকের সম্পর্ক নিয়ে রচিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ, চলচ্চিত্র-বিষয়ক পুস্তক-সমালোচনা, চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রকারদের নিয়ে রচিত ইংরেজি প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকারের অনুবাদ, সেন্সর প্রথা প্রভৃতি বিষয় উল্লিখিত সংখ্যাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র-সাহিত্যের যেমন চর্চা শুরু হয়েছিল, তেমনি দর্শক ও চলচ্চিত্রে উৎসাহীজনদের মধ্যে চলচ্চিত্রবোধেরও বিস্তার ঘটেছিল। ওই সময় ধ্রুপদীর প্রথম সংকলনের অন্যতম সম্পাদক, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও চলচ্চিত্র-বিষয়ক প্রবন্ধ রচয়িতা জামাল খান তাঁর এক লেখায় যা বলেছিলেন তা থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত চলচ্চিত্রবোধের বিস্তারের দিকটি স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন, ‘ঢাকায় চলচ্চিত্র সংসদ সক্রিয়। সংসদের চলচ্চিত্রান্দোলন ধীরে ধীরে, খুব সীমাবদ্ধ আকারে হলেও, একটি রূপ লাভ করেছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা, চলচ্চিত্র পত্রিকাগুণে সংসদভুক্ত ও বহির্ভূত বোদ্ধা ও আগ্রহীদের মধ্যে চলচ্চিত্রবোধের বিস্তার হয়।’১১

উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, ওই সময় চলচ্চিত্র-বিষয়ক ‘আলোচনা সভা’ও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনা সভা ও অন্যান্য কার্যক্রম পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে শুধু বেগবান করেনি, ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখাও রচনা করে দিয়েছিল। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত মুহম্মদ খসরুর লেখায় তার উল্লেখও পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব ও প্রকৌশলগত আলোচনা সভা এবং চলচ্চিত্র পাঠাগার স্থাপন ও প্রকাশনার মাধ্যমে সোসাইটির নিজস্ব ধ্যান-ধারণা বুদ্ধিপ্রভ পাঠক সাধারণ ও সচেতন দর্শকদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৎ চলচ্চিত্র চিন্তা ও চলচ্চিত্র উপলব্ধি আন্দোলন সৃষ্টির ব্যাপারে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে শিল্পছবির দর্শকদের আন্তরিক সহযোগিতা সংসদের আগামী দিনের পরিকল্পনাগুলো আরো পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধিত করবে, এ আশা করা বোধ হয় অন্যায় হবে না।’১২ তাঁর এই আশা বৃথা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি এবং অন্যরা মিলে যে-ভিত তৈরি করেছিলেন, সে-ভিতের ওপর ভিত্তি করেই বস্ত্তত বাংলাদেশ পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। এই ভিত রচনা করে দেওয়াটাই, সম্ভবত পূর্ব পাকিস্তান পর্বের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

অর্জন আরো আছে। ‘চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিকতা’কে আন্দোলনে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন দেশের বাইরের বিভিন্ন  চলচ্চিত্র-বিষয়ক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেরও উদ্যোগ নেয়। মুহম্মদ খসরু লিখেছেন, ‘১৯৬৪ সনে অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ অনেক লেখালেখির পর সোসাইটি বৃটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা সি.এফ.আই.-এর সদস্যভুক্ত হয়। বি.এফ.আই. সোসাইটির সদস্যদের জন্য চলচ্চিত্র প্রদান ব্যতিরেকে অন্যান্য সকল প্রকার সাহায্য দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা সমস্যার কারণে বি.এফ.আই.-প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধাকে সোসাইটি কাজে লাগাতে পারেনি। তদুপরি আন্তর্জাতিক মুদ্রায় শুল্ককর ইত্যাদি দিয়ে বিদেশ থেকে চলচ্চিত্র আনা এত ব্যয়বহুল যে তার খরচ বহন করার মত আর্থিক সচ্ছলতা সোসাইটির ছিল না। সুতরাং এ দীর্ঘ চার বছরে বিদেশ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ছবি আনিয়ে সদস্যদের প্রদর্শন করতে সোসাইটি সক্ষম হয়নি।’১৩ অন্যদিকে আলমগীর কবির তাঁর ‘ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ থেকে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট, প্যারিসে অবস্থিত IDHEC (Institut des hautes études cinématographiques) এবং American Film Institute of California-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে মূল্যবান সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।১৪

অতৃপ্তি

পূর্ব পাকিস্তান পর্বে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে নানাবিধ অর্জনের পাশাপাশি কিছু অতৃপ্তির প্রসঙ্গও আছে। প্রথমেই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে সরকারের নানারকম বাধা-নিষেধের কথা বলা যায়। যার জন্য সংসদ সদস্যরা পৃথিবীর বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্র দেখতে পারেননি। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ধ্রুপদীর দ্বিতীয় সংকলনের সম্পাদকীয়তে সরকারি বাধা প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘সংসদ আন্দোলনের সাত বৎসর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সংসদ সরকারের সহায়তা প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক… উপরন্তু সরকারের শাণিত অস্ত্র সেন্সর বোর্ডের আমলাসুলভ অযৌক্তিক দৌরাত্ম্যের শিকারে পরিণত হয়েছে সংসদ। সেন্সরের বাধার ফলে অনেক বিশ্ববিশ্রুত ছবি সংসদ তার সদস্যদের প্রদর্শনে অকৃতকার্য হয়েছে।’১৫ ‘ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ও সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সেন্সরসের বাধার কারণে শিক্ষার্থীদের শিল্পগুণসম্পন্ন ও সমাজবাস্তবতাধর্মী চলচ্চিত্র দেখাতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে আলমগীর কবির উষ্মা প্রকাশ করে লেখেন – ‘International films are not only rare but foreign office interference at the instigation of the Central Board of Film Censors is gradually drying up the only source — the diplomatic missions. Why the students and specialists of film art must subject them to the anachronistic censorship rules even when they want to study film in private, non-commercial viewings remains a big puzzle.’১৬

উল্লিখিত উদ্ধৃতি পাঠে বোঝা যায় যে, তৎকালীন স্বৈরসরকার চায়নি পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটুক। এ-বাধা অতিক্রম করার জন্য তখনই কিন্তু চলচ্চিত্র সংসদকর্মীরা একত্র হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। ধ্রুপদীর ওই সম্পাদকীয়তেই লেখা হয়, ‘এই অসুবিধাগুলো অবশ্য একক প্রচেষ্টায় দূরীভূত হবার নয়। এর জন্যে দরকার সম্মিলিত প্রয়াস ও দেশভিত্তিক আন্দোলন। আর এ সমবেত প্রচেষ্টার রূপায়ণ সম্ভব একমাত্র চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে। ফেডারেশনের কার্যাবলীর বিশাল ব্যাপ্তি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথ সুগম করতে সাহায্য করে। …আমরা চাই চলচ্চিত্রের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠুক।’১৭

বাস্তবে এই ‘তীব্র আন্দোলন’ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু দমে যাননি সংসদকর্মীরা। কর্মীদের মধ্যে নানা শ্রেণির মানুষ থাকায় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মধ্যেও নানা শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির সমাবেশ ঘটেছিল। ধারণা করি, মধ্য-উচ্চবিত্তদের মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছিল সংসদ কার্যক্রমে। রণেশ দাশগুপ্তের রচনায় এই আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্রটির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন :

ফিল্ম সোসাইটি হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। যখনি তা ড্রইংরুমে উঠে যায় তখনই সামগ্রিক চলচ্চিত্র বিজ্ঞানের সঙ্গে অবধারিতভাবে সে সম্পর্ক হারায়। এই সত্যের পটভূমিতে খতিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে, আমাদের দেশে আমরা কী করছি। চারদিকে কী দেখছি। আমাদের ফিল্ম সোসাইটির প্রবণতা আভিজাত্য ও আত্মসম্ভ্রমের দিকে। …এ সব প্রবণতার অবশ্যই একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। …পাক-ভারত উপমহাদেশের ধনকুবেররা স্বাধীনতার পর মুক্ত ভারত-পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদীদের কনিষ্ঠভ্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাদের এ ধরনের ভূমিকায় আমাদের অবস্থা আরো দুরারোগ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ফিল্ম সোসাইটিগুলো ওদের সাথে সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত এবং পরে ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়েছে। কিন্তু সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে এখনো তারা মুনাফাখোরদের সাথে দ্বন্দ্বে বেসামাল।১৮

দেখা যাচ্ছে যে তৎকালীন সরকারপক্ষ যেমন চায়নি সংসদ আন্দোলন বিকশিত হোক, তেমনি আন্দোলনকারীদের শ্রেণিচরিত্রও আন্দোলনের বিস্তৃতির পক্ষে ততোটা সোচ্চার ছিল না। রণেশ দাশগুপ্তের কথার অনুরণন পাওয়া যায় সংসদকর্মী জামাল খানের রচনাতেও। চলচ্চিত্র সংসদের তৎকালীন ভূমিকা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘চলচ্চিত্র প্রদর্শন, আলোচনা ও পত্রিকা প্রকাশের অভ্যন্তরে তার ক্রিয়াকান্ড বৃত্তায়িত, তাই বৃহত্তর প্রেক্ষিত অনর্জিত, সমাজ মানসে তার প্রতিবিম্ব দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ছে না, চলচ্চিত্র সমাজাবয়বে মর্যাদা জাগ্রত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করায় সংসদ যেটুকু পারঙ্গম বর্তমানে সংসদ তা করছে না অথবা তা সাধ্যের অতীত।’১৯ বস্ত্তত সেই সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটানো কঠিন একটি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে যাওয়া তো দূরের কথা। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য শহরে সংগঠনের শাখা খোলাও সম্ভব হয়নি এই আন্দোলন সম্পর্কে সকলকে অভিহিত ও প্রাণিত করতে না পারায়। তবে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদে’র একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় যে, ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল অঞ্চল থেকে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালের দিকে। বার্ষিক চাঁদা ধরা হয়েছিল ৩০ টাকা।২০ মুহম্মদ খসরুর বিবেচনায়, ‘১৯৬৩-৭১ সাল, বলা যায় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের কথা বোঝাতেই এই সময়টা ব্যয় হয়েছিল।’২১ অন্যত্র লিখেছেন, ‘সংসদের বর্তমান সদস্যদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ সমাজ হতে আগত। ক্রমশ তাদের মধ্যে শিল্পছবি-প্রীতি ও চলচ্চেতনার পক্ষে গভীরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সংসদ তথা চলচ্চিত্র আন্দোলনের পক্ষে এটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। সকল পঙ্কিলতার অবসান ঘটিয়ে অচিরে এ দেশের চলচ্চিত্রশিল্প নির্মল রূপ ধারণ করবে, একথা সংসদ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে।’২২ তাঁর কথার সত্যতা বাংলাদেশ পর্বে প্রমাণিত হয়েছে বইকি।

পূর্ব পাকিস্তান পর্বে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সোচ্চারভাবে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা গঠন, সমাজের নানা স্তরে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ‘চলচ্চিত্র পরিষদ’২৩ ও ‘চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন’ গঠন করে সরকারের ‘চলচ্চিত্রের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে’ তোলার কাজটি করা যায়নি মূলত এ কারণেই যে, তখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল এই অঞ্চলের সমাজবাস্তবতা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অঞ্চলটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। গণআন্দোলন, নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন তখনকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ঘটনাক্রম। এই ঘটনাক্রমের সর্বশেষ পরিণতি স্বাধীনতা অর্জন তথা বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এই অভ্যুদয়ই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে নতুন এক পর্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

 বাংলাদেশে পর্ব : প্রথম পর্যায় (১৯৭১-৮০)

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপর দেশের সংস্কৃতির নানা শাখায় নবজাগরণ লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনও নতুন মাত্রা পায়। পূর্ব পাকিস্তান পর্বে এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে ভিত রচনা করা হয়েছিল সেই ভিতই নব-নব চলচ্চিত্র সংসদ জন্মের পথ করে দেয়। মাহবুব জামিলের মতে, ‘ষাট দশকে যে ভিতটা তৈরি হয়েছিল, তারই ফলশ্রুতিতে …বাহাত্তর সালে এবং পরবর্তী সময়ে যে চলচ্চিত্র সংসদগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রত্যেকটা সংসদই মূলত পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি অথবা ঢাকা সিনে ক্লাবের যারা নিবেদিত কর্মী ছিলেন বা নিবেদিতপ্রাণ সদস্য ছিলেন তারাই বেরিয়ে এসে কিন্তু আরেকটি সংসদ প্রতিষ্ঠা করলেন।’২৪ উল্লিখিত দুটি সংগঠনের কর্মী বা সদস্য ছাড়াও অনেকেই নতুন নতুন চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৯৭২ থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার উদ্যোক্তাদের পরিচয় থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য যে, ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘ফিল্ম ক্লাবসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮০’ পাশ হওয়ার পর চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাংলাদেশ পর্বে এই আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৭১ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে যেমন নানামুখী অর্জন লক্ষ করা যায়, তেমনি কিছু অতৃপ্তি, কিছু অপ্রাপ্তিও দুর্নিরীক্ষ্য নয়।

 অর্জন

প্রথম পর্যায়ে (১৯৭১-১৯৮০) অর্জনের কথা ভাবলে শুরুতেই চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যার কথা আসবে। পূর্ব পাকিস্তান পর্বে যেখানে মাত্র দুটি চলচ্চিত্র সংসদ ছিল সেখানে বাংলাদেশ পর্বে ১৯৮০ পর্যন্ত প্রায় ১০০টির মতো চলচ্চিত্র সংসদ ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। এই পর্যায়ে বিএফডিসিতেও ১৯৭৪ সালে ‘সিনে আর্টিস্ট অ্যান্ড টেকনিশিয়ান্স সোসাইটি’ বলে একটি সিনে ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে সাধন রায় ও আলম কোরাইশী। এটি ফেডারেশনভুক্ত চলচ্চিত্র সংসদ হিসেবেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করতো। বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড ও অন্যান্য সূত্র থেকে তথ্য নিয়ে চলচ্চিত্রবিদ্যার ছাত্র ও চলচ্চিত্রবিষয়ক গবেষক অব্যয় রহমান লিখেছেন যে, ‘নতুন প্রেক্ষাপটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে …অবাধ মুক্ত পরিবেশে অনেক নতুন চলচ্চিত্র সংসদ গঠিত হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, খুলনা, পটুয়াখালী পর্যন্ত চলচ্চিত্র সংসদের শাখা বিস্তার লাভ করে এবং এ সংখ্যা সত্তর দশকের শেষে এসে আনুমানিক ১০০টিতে উন্নীত হয়।’২৫ ফলে ব্যাপকহারে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র প্রথম পর্যায়ে সংসদগুলো থেকে প্রদর্শিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান পর্বে যেখানে দু-তিনটি দূতাবাস চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে সাহায্য করতো এই পর্বে বাংলাদেশে অবস্থিত প্রায় সকল দূতাবাসই চলচ্চিত্র এনে সংসদগুলোকে প্রদর্শনের জন্য দিত। এতে করে শিল্প-চলচ্চিত্র দর্শনের সুযোগ তৈরি হয়। সেসব চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখিরও সুযোগ ঘটে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদ থেকে চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে।

এ-সময় চলচ্চিত্র সংসদগুলোর সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। শিল্পছবি দেখার ও আস্বাদনের সুযোগটি সদস্যরা কাজে লাগায়। তাছাড়া ওই সময়টাতে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র দেখতে দর্শকরা হলবিমুখ হয়ে পড়ে। এদের একটা অংশও সংসদের সদস্য হন। তারেক আহমেদের বিবেচনায় – ‘যাদের কাছ থেকে সিনেমা ঘরে গিয়ে ছবি দেখবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হলো – সেই মধ্যবিত্ত নিজেদের বিনোদন বা সুস্থ চিন্তায় সময় কাটাবার অংশ হিসেবেই তখন বেছে নিয়েছিলো চলচ্চিত্র সংসদের গন্ডী – দর্শক যেমন বেড়ে চললো, তেমনি বাড়তে লাগলো চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যাও।’২৬

চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আন্দোলনের নেতাকর্মীরা সংসদগুলোর কার্যক্রমকে সুসংবদ্ধ করা এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য একটি ফেডারেশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। আমরা জানি যে, ১৯৭০ সালেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পর্বেই এই ধরনের একটি ফেডারেটিভ বডি গঠনের কথা ভাবা হয়েছিল কিন্তু সম্ভবত দেশব্যাপী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে গণজাগরণ শুরু হওয়ার কারণে ফেডারেশন গঠনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কয়েক বছর পরেই ফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আহমেদ আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, ‘১৯৭৩ সালে গঠিত হয় ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আলমগীর কবির। কিন্তু পরবর্তী দুই বছরের মধ্যেই নেতৃত্বের প্রশ্নে কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও তীব্র মতবিরোধের ফলে ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে উক্ত ফেডারেশন ভেঙে যথাক্রমে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ নামে দুটি স্বতন্ত্র সংগঠনের জন্ম হয়।’২৭ অর্জনের দিক থেকে দেখলে ফেডারেশন গঠন একটি বড় অর্জন ছিল কিন্তু এর ভাঙনের ফলে বস্ত্তত এদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ পর্বের প্রথম পর্যায়ে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের ক্ষেত্রে নানাবিধ অর্জন ঘটেছে। মুহম্মদ খসরুর মতে, ‘১৯৭১-১৯৮০ সালকে বলা যেতে পারে বিকাশ ও বিস্তৃতির যুগ।’২৮ এই যুগেই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্মীরা চলচ্চিত্রবিদ্যায় শিক্ষাগ্রহণের জন্য দেশের বাইরের বিভিন্ন ফিল্ম ইনস্টিটিউটে যান। ফিরে এসে কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখেন, কেউ চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এ-যুগেই চলচ্চিত্রবিষয়ক সেমিনার, ওয়ার্কশপ, বিভিন্ন চলচ্চিত্রকারের রেট্রোস্পেকটিভ, ফিল্ম ফেস্টিভাল, অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স প্রভৃতি শুরু হয়। এসব কর্মকান্ডই সংসদগুলোর বিকাশ ও চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিস্তৃতিকে সম্ভব করে তুলেছে। এসব কর্মযজ্ঞের জন্য সংসদগুলো বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ স্থাপনে সমর্থ হয়েছিল। দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে শুধু চলচ্চিত্র নয়, চলচ্চিত্রবিশেষজ্ঞদের এনে নানা ধরনের চলচ্চিত্র সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণেও সফল হয়েছিল সংসদগুলো। একটি কার্যক্রমের সফলতা অন্য একটি কার্যক্রমকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’ ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় ও অধ্যাপক সতীশ বাহাদুরের পরিচালনায় তিন সপ্তাহব্যাপী যে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের আয়োজন করে, সেই কোর্সের সফল পরিসমাপ্তিই কিন্তু এদেশে ফিল্ম আর্কাইভ গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে। ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’ ১৯৭৬ সালেই তাদের ফিল্ম বুলেটিনে ‘এই মুহূর্তের দাবি : ফিল্ম আর্কাইভ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় লেখে। তাতে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পেশ করেছে। অতএব সংসদের দাবি – আর সময় ক্ষেপণ নয়, আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির পুনরুচ্চারণ নয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ বছরই জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা হোক।’২৯ চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের এ-দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’। সংসদকর্মীরা অবশ্য ওই মুহূর্তে আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট একত্রে স্থাপনের পক্ষে ছিলেন না। এবং সত্য এই যে, আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হলেও ইনস্টিটিউট এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্মর্তব্য যে, পূর্ব পাকিস্তান পর্বেই ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগারের কথা তুলেছিলেন, যা বাংলাদেশ পর্বে এসে ফিল্ম আর্কাইভ হিসেবে স্থাপিত হয়।

প্রথম পর্যায়ের বাকি অর্জনগুলোও চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এ প্রসঙ্গে সরকারের অনুদান ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রথা চালুর কথা বলা যায়, যা মূলত সংসদসমূহের দাবির মধ্যেই ছিল। এই পর্যায়েই চলচ্চিত্র নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সমালোচনা রচিত হয় যেগুলো সংসদসমূহ কর্তৃক প্রকাশিত পত্র-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। এর ফলে চলচ্চিত্র সাহিত্যের এক বিশাল ভান্ডার গড়ে উঠেছে। এটা ওই দশকের সংসদ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করি। এ-পর্যায়ে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের অনেকেই সেন্সর ও জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৮০ সালে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভালে’ সংসদকর্মী মাহবুব জামিল, হাসান ইমাম প্রমুখ উৎসব কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন। অনুতাপের বিষয়, তারপর এদেশে কোনো সরকারের আমলেই আর সরকারি উদ্যোগে চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়নি! অথচ একটি দেশ তার চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি দিয়েই আজকের বিশ্ব-বাস্তবতায় সবচেয়ে কম সময়ে পরিচিত হতে পারে।

 অতৃপ্তি

বাংলাদেশ পর্বের প্রথম পর্যায়ে (১৯৭১-১৯৮০) অর্জন যেমন আছে তেমনি  অপ্রাপ্তি-অতৃপ্তিও কম নেই। এই ফেডারেশন ভেঙে দুটুকরো হওয়াটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে হয়। ক্ষতির দিকটি আমলে এনে ১৯৭৫ সালেই মাহবুব আলম লেখেন, ‘এমনিতেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্রসংসদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা এ যাবৎ প্রায় অবিকল থেকে গেছে। এগুলো দূর করতে এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে তাদের সামগ্রিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দানের জন্যই একটি শক্তিশালী ফেডারেশনের প্রয়োজন ছিল এই মুহূর্তে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় উপরন্তু বর্তমানে একই আন্দোলনে বিশ্বাসী দুটো শিবিরে বিভক্ত দুটো ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত চলচ্চিত্র সংসদগুলো নতুন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হবে।’৩০ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ভাঙনের জের এখনো সংসদগুলো টেনে চলেছে।

ফেডারেশন দ্বিখন্ডিত হওয়ার ফলে সবাই মিলে একসঙ্গে সংসদ-আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ করার কাজটি করা যায়নি। যেমন ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ করার জন্য সরকার থেকে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ৩০ এপ্রিল চিত্রালীর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘যেহেতু চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের প্রতি সরকারী সুদৃষ্টি পড়েছে, সেই হেতু নীতিমালা প্রণীত হলে একদিকে যেমন আন্দোলনকারীদের দুঃখ-দুর্দশা, নানাবিধ অসুবিধা দূর হবে, অন্যদিকে সৎ ছবি নির্মাণের পরিবেশ ও রুচিবান দর্শক তৈরির পথও হবে সুগম।’৩১ অতৃপ্তির কথা এই যে, সেই নীতিমালা অদ্যাবধি প্রণীত হয়নি। সম্ভবত ফেডারেশন দ্বিখন্ডিত থাকায় ওই সময় সুযোগটি কাজে লাগানো যায়নি। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আন্দোলনের স্বার্থে দ্বিখন্ডিত ফেডারেশনকে একত্র করার উদ্যোগ নেয় ফেডারেশনের একটি অংশ। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।৩২ মূলত ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদে’র উদ্যোগেই এই প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। এই সংসদটিই ১৯৭৩ সালে ‘উদ্যোক্তা হয়ে’ ফেডারেশন গঠনে অগ্রণীর ভূমিকা পালন করেছিল বলে জানা যায়।৩৩

বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয়, সংসদকর্মীরা বিভক্ত থাকায় অনেক দাবি নিয়ে এগোনো যায়নি, আদায় তো দূরের কথা। ১৯৭৩ সালে ‘ফিল্ম ফিন্যান্স করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হয়েছিল, তা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা যায়নি। উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য দেশের বাইরে সংসদকর্মীদের পাঠানো নিয়মিত করা যায়নি। সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি হচ্ছে, চলচ্চিত্র সংসদগুলো একত্র হয়ে আন্দোলন করে প্রচলিত সেন্সর প্রথার মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারেনি – ‘১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের উপর নেমে আসে নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল। নিয়ন্ত্রণের প্রথম পর্যায়ে চলচ্চিত্র সংসদ প্রদর্শিত ছবিগুলোর ওপর সেন্সর প্রথা আরোপ করা হয়, যা নাকি পৃথিবীর কোথাও নেই। এমনকি চলচ্চিত্র সংসদগুলোর জন্য পৃথক সেন্সরমালা দাবি করেও ব্যর্থ হতে হয়।’৩৪ ফলে চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও সদস্যরা বহু শিল্পগুণসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র দেখা থেকে বঞ্চিত হন। সত্যজিৎ রায়ের জন অরণ্য ১৯৭৬ সালে কলকাতায় মুক্তি পায় এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে আসে। কিন্তু ‘স্বনিয়মশাসিত সেন্সর ছবিটিকে চলচ্চিত্র সংসদ প্রদর্শনীর জন্য অযোগ্য ঘোষণা করলেন। অযোগ্যতার কারণও অজ্ঞাত থেকে গেল। যেমন ছিল গদারের বেলায়। …সম্ভবত এই প্রথমবারের মত সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবি কোনো দেশে প্রদর্শনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো এবং আমরা সে দেশের সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হয়ে অক্ষম ক্রোধে নির্বাক হয়ে রইলাম।’৩৫ ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পোও দুবার এসে ফিরে গেছে, প্রদর্শনের অনুমতি না পেয়ে। এই অতৃপ্তিগুলো ভোলার নয়, সংসদকর্মীদের একা চলার নীতির কারণেই তৎকালীন সরকারপক্ষ এমন আচরণ করেছে বলে মনে হয়। সংসদকর্মীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, বিভক্তির সুযোগে এবং সাম্প্রদায়িক স্বৈরসরকারের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নমুনা হিসেবে ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘ফিল্ম ক্লাব রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৮০’ বিল পাশ হয়, পরিণামে বাংলাদেশ পর্বের দ্বিতীয় পর্যায়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের গতি যায় মন্থর হয়ে।

 বাংলাদেশ পর্ব : দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৮০-২০১৩)

জাতীয় সংসদে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগের ওয়াকআউটের সুযোগে উল্লিখিত যে বিলটি পাশ হয় সংসদকর্মীরা তাকে ‘কালাকানুন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সঙ্গত কারণেই এ-আইন জারির পর সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের ফলে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে অর্জনের মাত্রার চেয়ে অপ্রাপ্তি-অতৃপ্তির মাত্রার পরিমাণ বাড়তে থাকে। উল্লিখিত বিলটি জাতীয় সংসদে পেশকালে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত তথ্য ও বেতারমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী বলেছিলেন যে :

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় একশত ফিল্ম ক্লাব-সিনে সোসাইটি রহিয়াছে এবং এই ধরনের আরো বহু সংগঠন গঠিত হইতেছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা প্রণীত হয় নাই। ফলে এইসকল ফিল্ম ক্লাব-সিনে সোসাইটি অনেকটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে বা খেয়ালখুশিমতো গঠিত হইতেছে এবং নিজ নিজ বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হইতেছে। এইসকল ফিল্ম ক্লাব-সিনে সোসাইটি সাধারণত নিজ প্রয়োজন ও গোষ্ঠীস্বার্থে দেশি-বিদেশি সংস্থা হইতে ছায়াছবি সংগ্রহ ও প্রদর্শন করিয়া থাকে। অনেকক্ষেত্রে এইসকল ছায়াছবি সংগ্রহ ও প্রদর্শন অত্যন্ত গোপনে অনুষ্ঠিত হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগের কথাও শোনা যায়। এইসকল ছায়াছবির মাধ্যমে দেশে কিশোর এবং যুবকগোষ্ঠী অনেকক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত বিদেশি মতবাদে প্রভাবান্বিত হওয়ারও সুযোগ পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ফিল্ম ক্লাব সংক্রান্ত তৎপরতা জাতীয় স্বার্থে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে উপযুক্ত সবকারি কার্যক্রম অপরিহার্য বিধায় অবিলম্বে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা যাইতেছে।৩৬

এই ‘অবাঞ্ছিত বিদেশি মতবাদ’ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। এই মতবাদ যাতে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনমানসে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্যই প্রধানত এই কালাকানুন জারি করা হয়েছিল। স্মর্তব্য যে, সংসদগুলো  ওই সময় সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে নির্মিত অগ্রসরভাবনাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতো বেশি।

 অর্জন

সরকার কর্তৃক চলচ্চিত্র সংসদগুলোকে নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়ার কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন করে চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের মাত্রা কমে যায়। তা সত্ত্বেও অনেকগুলো চলচ্চিত্র সংসদ দেশে গঠিত হয়েছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্রবিষয়ক সেমিনার, কর্মশালা, অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স প্রভৃতি যজ্ঞের আয়োজন করেছে সংসদগুলো। অনিয়মিতভাবে হলেও চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। চলচ্চিত্রকলার নানা দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এ-অঞ্চলে চলচ্চিত্রশিল্পের শুরু ও বিকাশের ওপর জোর দিয়ে ইতিহাসধর্মী আলোচনা করা হয়েছে কোনো-কোনো গ্রন্থে। এই পথ ধরে চলচ্চিত্র-সমালোচক, গ্রন্থপ্রণেতা ও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে। কেউ কেউ চলচ্চিত্রবিদ্যার ওপর উচ্চতর গবেষণাও করেছেন দেশে-বিদেশে। কেউ আবার চলচ্চিত্র-সমালোচকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেটিভ বডি FIPRESCI-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে IFCAB তথা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ গঠন করেছেন ১৯৯৪ সালে। এঁদের বেশির ভাগই কোনো-না-কোনো চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড, সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটিতে (চিত্রনাট্য বাছাই কমিটি, অনুদান কমিটি প্রভৃতি) চলচ্চিত্রসংসদের-কর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন এবং এখনো করছেন। একেও একটি অর্জন বলে ধরে নেওয়া যায়। অর্জনের দিক থেকে দেখলে এঁদেরকে বাংলাদেশে চলমান চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফসল হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে।

বর্তমানে চলচ্চিত্রকলা যে প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পাঠযোগ্য বিষয় হিসেবে অধ্যয়ন করা হচ্ছে তার পেছনেও চলচ্চিত্রসংসদকর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ইতিহাস জড়িত। দেশে বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রকলা অধ্যয়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিভাগ চালু করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র বিভাগ’ খোলা হয়েছে। চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের একটি অর্জন হিসেবেই এ-উদ্যোগগুলোকে গণ্য করা যায়। দেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এখনো ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত না হলেও সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের সভায় ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলচ্চিত্র সংসদকর্মী তানভীর মোকাম্মেল দীর্ঘদিন ধরে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ নামে একটি ইনস্টিটিউট পরিচালনা করছেন। এটিও এক অর্থে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অর্জনের মধ্যেই পড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ভবন নির্মাণের কাজ তার নিজস্ব জায়গায় শুরু হয়েছে – নিজস্ব জায়গায় নিজস্ব ভবন নির্মাণের দাবি সংসদকর্মীরা বহুদিন ধরেই করে আসছিল – ভবন নির্মাণকেও অর্জনের একটি অংশ বলে ভাবা যায়। তাছাড়া, সংসদকর্মীদের লাগাতার দাবির মুখে সরকার বহুল নিন্দিত চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণমূলক কালাকানুন বাতিল করেছে ২০১১ সালে। এখন শুধু নিবন্ধনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজকের বিশ্ববাস্তবতায় এই নিবন্ধনেরও কোনো প্রয়োজন আছে কিনা তা-ও সংসদকর্মীদের ভেবে দেখা দরকার।

বাংলাদেশ পর্বের দ্বিতীয় পর্যায়ে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনকারীরাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছেন এবং এই ধারা কোনো কোনো চলচ্চিত্র সংসদ এখনো বজায় রেখেছেন। ‘রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি’ ১৯৯২-১৯৯৬ পর্যন্ত এক বছর অন্তর এবং ১৯৯৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি দুই বছর অন্তর ‘ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভাল’ শীর্ষক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে যাচ্ছে। আরো একটি বড় অর্জন হচ্ছে ১৯৮৬ সালে ‘বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম’ গঠিত হওয়া। এই ফোরাম থেকে নিয়মিতভাবেই স্বল্প ও মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফোরামের প্রায় সবকর্মীই কোনো-না-কোনো চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী। সম্প্রতি ‘চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি’ থেকে নিয়মিত শিশু চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের আরো একটি অর্জন হচ্ছে, সংসদ কর্তৃক চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্রমের (১৯৮২) কথা বলা যায়। এ-চলচ্চিত্র সংসদটি ১৯৮৪ সালে আগামী নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে। তবে ইতিহাসের খাতিরে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’ই প্রথম নিজ খরচে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। মানজারে হাসীনের ভাষ্যে তার উল্লেখ আছে এভাবে :

 সংসদ থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের সমবায়ের নামে সদস্যদের কাছ থেকে একটা বার্ষিক চাঁদা নেয়া হত এবং সেই অর্থের পরিমাণ যখন ১৯৮০-৮১ সালের দিকে প্রায় ৪০ হাজারে দাঁড়ালো তখন সবার আগ্রহ দেখা গেল একটা ছবি নির্মাণে। এ সময় তানভীর মোকাম্মেল তাঁর হুলিয়া ছবিটি করার আগ্রহ প্রকাশ করায় এবং তার জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহে সফল হওয়ায় ‘বাংলাদেশ ফিল্ম কো-অপারেটিভ’ থেকে সেটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। স্যুটিং অনেকটা এগিয়ে যাবার পর প্রযোজনা সংস্থা এবং নির্মাতার মধ্যে দুঃখজনক ভুল বোঝাবুঝির কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়। তানভীর মোকাম্মেল কো-অপারেটিভের লগ্নিকৃত টাকা ফেরত দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই ছবিটি প্রযোজনা করেন। সংসদের চলচ্চিত্র নির্মাণের এই উদ্যোগ সফল হলে আজ বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে এ-দেশে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদে’র পথিকৃতের ভূমিকা স্বীকৃত হতো।৩৭ 

 অতৃপ্তি

দ্বিতীয় পর্যায়ে অতৃপ্তির প্রধান কয়েকটি দিক হচ্ছে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা’ এখনো প্রণীত না-হওয়া; জাতীয় চলচ্চিত্র সদন/ ফিল্ম সেন্টার/ চলচ্চিত্র কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ সরকারের তরফ থেকে এখনো          না-নেওয়া। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্য ও নীতিমালা প্রণয়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যে ফেডারেটিভ বডি থেকে এ-উদ্যোগ নেওয়া যেত সেই ‘ফেডারেশন’ এখনো দ্বিধা/ত্রিধা বিভক্ত। কয়েকবারই বিভক্ত ফেডারেশন একত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, একত্রও হয়, আবার ভাঙে! ১৯৮৩ সালে দ্বিধাবিভক্ত ফেডারেশন একত্র হয় কিন্তু ২০০১ সালে আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়! ২০০৭ সালে হয় ত্রিধাবিভক্ত! এটাও অতৃপ্তির একটা বড় দিক। এছাড়া বাংলাদেশ পর্বের প্রথম পর্যায়ে যেভাবে  বৃত্তি নিয়ে বিদেশি চলচ্চিত্রশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্রপাঠের জন্য চলচ্চিত্রে উৎসাহীজনেরা যেতো তা-ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের অভাবে কমতে-কমতে এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। এ-বিষয়েও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে কোনো প্রতিবাদ নেই!

সরকারি পর্যায়ে ‘ডাইরেক্টরেট অব ফিল্ম ফেস্টিভাল’ গঠনের প্রয়োজনীয়তাও আছে বলে মনে করি। এ সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি – না সম্মিলিতভাবে সংসদকর্মীদের দ্বারা, না সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে। বর্তমানে সক্রিয় সংসদ আন্দোলনকর্মীদের এ-বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করা উচিত। বেসরকারি উদ্যোগে চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেও নিয়মিতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হওয়া দরকার। যে সংসদকর্মীরা একসময় নকল ও অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করা ও অন্যান্য দাবিতে রাজপথে মিছিল করেছে, সেন্সর বোর্ড ঘেরাও করেছে, সিনেমা হলের সামনে পিকেটিং করেছে, জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ করেছে, নানা দাবি আদায়ের জন্য সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে, সেরকম তেজি-ক্ষিপ্ত সংসদকর্মীর সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে – এটাও কম অতৃপ্তির কথা নয়। পাইরেসি বন্ধ করা এবং অন্যান্য দাবিতে চলচ্চিত্র-সংসদকর্মীদের সোচ্চার হওয়া দরকার, এখনই।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে অতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে, ১৯৮০ সালের কালাকানুনের ফলে যে ক্ষতি চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের ক্ষেত্রে হয়েছে, তা আর কিছুতেই পুষিয়ে নিতে না পারা। অনেকগুলো প্রজন্ম চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন যে কী তার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েই থাকলো! তবে সত্য এই যে, এই কালাকানুন প্রণীত হওয়ার পরও নতুন চলচ্চিত্র সংসদের জন্ম হয়েছে, কার্যক্রমও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে চলচ্চিত্র সংসদের নানাবিধ কার্যক্রম চালু না থাকায় চলচ্চিত্রে উৎসাহী নবপ্রাণের স্পন্দন অনেকটাই কমে গেছে। অনেকে বলেন, ভিসিআর, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, নকল ও অশ্লীল চলচ্চিত্র ইত্যাদি কারণে সংসদের দর্শক সংখ্যা কমেছে। ফলে কালাকানুন না হলেও সংসদ কার্যক্রমে ধীর গতি আসতো। কথাটা আংশিক সত্য, সম্পূর্ণ নয়।

চলচ্চিত্র দেখার উপায়-উপকরণের নব-নব আবিষ্কারের কারণে চলচ্চিত্র দর্শনের প্রক্রিয়া বহুমুখী হয়েছে সত্য, কিন্তু তাই বলে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা কখনো কমবে বলে মনে হয় না। চলচ্চিত্র সংসদ তো শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য নয় – প্রদর্শিত চলচ্চিত্র নিরীক্ষণ-সমীক্ষণ-বীক্ষণের জন্যও এবং এই বীক্ষণকর্ম প্রকাশের জন্যও। কাজে কাজেই চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশও এই আন্দোলনের একটি প্রয়োজনীয় কর্তব্য। চলচ্চিত্রবিষয়ক সেমিনার-বক্তৃতা-ওয়ার্কশপ-অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স-নির্মাণ কর্মশালা সবই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মধ্যে পড়ে। সবগুলো কাজই করতে হয় দলবেঁধে – একা ঘরে বসে চলচ্চিত্র দেখে-দেখে এইসব কর্ম সম্পাদন করা সম্ভব নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে – অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তির পাল্লা যত ভারীই হোক।

তথ্যনির্দেশ ও টীকা

১.     মৃগাঙ্কশেখর রায়, ‘ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন : একটি খতিয়ান’, চলচ্চিত্র সমীক্ষা, মৃগাঙ্কশেখর রায় (প্রধান সম্পাদক), ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব ইন্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৮৩, পৃ ১৬।

২.     প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, ১৯৫৮ সালে ঢাকায় গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শিশু চলচ্চিত্র সমিতি।’ (অনুপম হায়াৎ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ ১৬১)। এই ‘সমিতি’র কার্যক্রম সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি উদ্যোগ নেয় চলচ্চিত্রবিষয়ক একটি সংগঠন করার। দুবছর পর সংগঠনটি গঠিত হয়, ‘১৯৬২ সালের শেষ দিকে চলচ্চিত্র প্রযোজকদের চেষ্টায় ঢাকায় গঠিত হয় ‘ফিল্ম ক্লাব’ (পূর্বোক্ত, পৃ ১৬২)। এর কার্যক্রম সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। মাঝে, ১৯৬১ সালে ‘ঢাকা ফিল্ম সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয় বলে জানা যায়, ‘এর প্রাথমিক সদস্য ছিলেন ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, এস.এম. পারভেজ, কাইয়ুম চৌধুরী ও সৈয়দ শামসুল হক (আহবায়ক)। …ঢাকা ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ছিলেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী।’ (অব্যয় রহমান, বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন : উৎস থেকে মোহনায়, অপ্রকাশিত রচনা, পৃ ৪)। এটির কার্যক্রমেরও কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। এদিকে ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহবুব জামিল ও অন্যরা মিলে গঠন করেন ‘স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাব’। এর কিছু ‘কার্যক্রম’ থাকলেও ‘ধারাবাহিকতা’ ছিল না। মাহবুব জামিল জানান, ‘স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাবে পরপর বেশ কয়েকটি ছবি দেখানো হলো। কিন্তু দুঃখজনক যে স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাবের স্থায়িত্বকালটা ছিল খুব অল্প।’ এরপরই ১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর গঠিত হয় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ যা আজো অস্তিত্বশীল। যার রয়েছে নানাবিধ চলচ্চৈত্রিক কার্যক্রম ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা। যদিও সংগঠনটির সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় দুটি পর্যায়ই রয়েছে, এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই।

৩.     মুহম্মদ খসরু, ‘চলচ্চিত্র আন্দোলন ও চলচ্চিত্র সংসদের ভূমিকা,’ ধ্রুপদী, প্রথম সংকলন, জামাল খান, মুহম্মদ খসরু ও ইয়াসিন আমীন (সম্পাদক), পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ১৯৬৮, পৃ ২৯-৩০।

৪.     ওয়াহিদুল হক, ‘পুরানো সেই দিনের কথা,’ মন্তাজ, চতুর্থ সংখ্যা, তানভীর মোকাম্মেল ও অন্যান্য (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৯২, পৃ ৬৭।

৫.     মাহবুব আলম, ‘মুহম্মদ খসরুর সাথে মাহবুব আলমের কথাবার্তা’, ধ্রুপদী, ষষ্ঠ সংকলন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ২০০৬, পৃ ১০৫।

৬.     সুধী প্রধান লিখেছেন – ‘১৯৪৬ সালের কোন এক মাসে সত্যজিতের সঙ্গে যিনি কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি গড়েছিলেন সেই চিদানন্দ দাসগুপ্ত ডেকার্স লেনে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ অফিসে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। …ডেকার্স লেনের সাক্ষাৎকারে তিনি লোকসঙ্গীত সম্পর্কে গবেষণার জন্য আমার সাহায্য চান। তিনি যে ইতিমধ্যে চাকুরি পেয়েছেন তা আমি জানতাম। তাই তাকে বললাম, ‘আপনি কি গ্রামে গ্রামে ঘুরতে পারবেন?’ না বলাতে আমি তাঁকে চলচ্চিত্র সম্পর্কে বিশেষ করে বিদেশের প্রগতিশীল চলচ্চিত্র সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ ও আলোচনা করার জন্য কোনো সংগঠন করার কথা ভেবে দেখতে বললাম। ইতিমধ্যে ‘সৈনিক’ ছবিতে আমাকে অনেকবার স্যুটিং-এ যেতে হয়েছিল। তাছাড়া বেঙ্গল আর্টিস্ট এসোসিয়েশন এবং সিনে টেকনিসিয়ান্স এসোসিয়েশন অব বেঙ্গল (সিটিওবি)-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে বেতার, মঞ্চ, গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র শিল্পের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ইতিমধ্যে অত্যন্ত কাছে থেকে জানতে পেরেছি। এই সব কাজকর্ম থেকে আমার মনে হয়েছিল – চলচ্চিত্র সম্পর্কেও সংগঠনগতভাবে আমাদের কিছু করা উচিত। তাই ১৯৪৭ সালে চিদানন্দ বাবু সত্যজিতের সঙ্গে ফিল্ম সোসাইটি গঠন করলে – আমাকে তাঁরা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রতি সভায় ডাকতেন এবং আমি আবার চেষ্টা করে জ্যোতির্ময় রায় (‘উদরের পথে’ খ্যাত), অজয় কর প্রমুখকে নিয়ে যেতাম। …ঐ সময়ে ফিল্ম সোসাইটির কাজ ছিল একত্রে ছবি দেখা এবং আলোচনা করা। …রেনোয়ার ‘রিভার’ ছবি সম্পর্কে ছবির আলোচনা নিয়ে চিদানন্দ বাবুর সঙ্গে আমার তীব্র মতভেদ হয়। ছবিটির শিল্প-কুশলতার উচ্চ প্রশংসা করেও আমি ‘অগ্রণী’ পত্রিকায় লিখি যে, ছবিটির বিষয়বস্ত্ত একেবারে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সহানুভূতিমূলক। এই বিষয়ে কিন্তু সত্যজিৎ বাবু মুখে কিছু বলেননি – লেখা তো পরের কথা। এই সময় থেকে চিদানন্দ বাবুর সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ হয় এবং আমি যে তাঁদের ফিল্ম সোসাইটি গড়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছি তা তিনি কোথাও স্বীকার করেননি।

   – সুধী প্রধান, ‘প্রগতি আন্দোলন ও সত্যজিৎ রায়’, যুগপট : বাঙালির বায়োস্কোপ দর্শন, সুগত সিংহ (সম্পাদক), দীপঙ্কর সেন (প্রকাশক ও মুদ্রক), কলকাতা, ২০০৪, পৃ ২৫৯-২৬০।

৭.     সম্পাদকীয়। জামাল খান, মুহম্মদ খসরু ও ইয়াসিন আমীন (সম্পাদক), ধ্রুপদী, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ৩, পৃ ৩।

৮.     মুহম্মদ খসরু, ‘চলচ্চিত্র আন্দোলন ও চলচ্চিত্র সংসদের ভূমিকা’, পূর্বোক্ত, পৃ ৩৩।

৯.     Alamgir Kabir, ‘A Wider Horizon,’ SEQUENCE-3, December, Alamgir Kabir (editor), Vintage Publications, Dacca, 1970, P 4.

১০.   আলমগীর কবির লিখেছেন, ‘The Dacca Film Institute that was founded in May 1968 overcoming an incomprehensible opposition from a section of the intelligentsia has survived its first 17 months with modest gains. A Certificate Course in Film Study introduced last year has just been completed with 14 students out of a total of 29 enrolled qualifying to sit for a 500 mark examination on Theory of the Cinema, History of the Cinema, International Cinema, National Cinema and Film Criticism. The results are due to be published this month…. DFI also has a tiny but the only specialist library (on film and allied arts) probably in whole of Pakistan open not only to students but also to other film enthusiasts on nominal yearly subscription.’

      – ibid, P. 4

১১.    জামাল খান, ‘নীল নির্বাক নির্মম’, চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ, সাহানা, ঢাকা, ১৯৮২, পৃ ৫৯-৬০।

১২.   মুহম্মদ খসরু, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ৩, পৃ ৩৩।

১৩.   পূর্বোক্ত, পৃ ৩৩।

১৪.    Alamgir Kabir, op. cit., P 4.

১৫.   মসিহ্উদ্দিন শাকের ও ইকবাল আহসান চৌধুরী, ‘সম্পাদকীয়’, ধ্রুপদী, দ্বিতীয় সংকলন, পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ১৯৭০, পৃ ২-৩।

১৬.   Alamgir Kabir, op. cit., P 4.

১৭.   পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ১৫, পৃ ৩।

১৮.   রণেশ দাশগুপ্ত, ‘ফিল্ম সোসাইটির ভূমিকা’, অনুবাদ : মাসুদ আলী খান, ধ্রুপদী, ষষ্ঠ সংকলন, মুহম্মদ খসরু (সম্পাদক), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ২০০৬, পৃ ৫৮-৬০।

১৯.   জামাল খান, ‘চলচ্চিত্র ও সমাজমানস’, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ১১, পৃ ২৭।

২০.   ধ্রুপদ, প্রথম সংকলন, পাদটীকা নং ৩, পৃ ৫।

২১.   মুহম্মদ খসরু, ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’, ধ্রুপদী, পঞ্চম সংকলন, মুহম্মদ খসরু (সম্পাদক), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ ২৯৩।

২২.   মুহম্মদ খসরু, ‘চলচ্চিত্র সংসদ প্রসঙ্গ’, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ১৫, পৃ ১৮২।

২৩.   পূর্ব পাকিস্তান পর্বে ‘চলচ্চিত্র পরিষদ’ বলে একটি সংগঠনের কথা ভেবেছিলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকারীরা। এ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘চলচ্চিত্র পরিষদ চিত্রপ্রদর্শনে বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। শিল্পছবি প্রদর্শন হেতু … দেশের বিভাগীয় শহরের কতিপয় প্রেক্ষালয়ের সাথে পরিষদ চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। চলচ্চিত্র পরিষদ হবে যৌথ বেসরকারী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান – সরকারী সংস্থা নয়, নয় ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। পরিষদে প্রদর্শন, বিনিয়োগ (চলচ্চিত্র নির্মাণ) প্রকরণ, সংরক্ষণ, আমদানী-রপ্তানী-প্রকাশনা-গ্রন্থাগার বিভাগ অন্তর্ভুক্ত হলে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনা প্রোজ্জ্বল।’

        – জামাল খান, ‘সংকটে আকণ্ঠ শিল্প’, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ১১, পৃ ৪৫-৪৬।

২৪.   মাহবুব জামিল, ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রণী…’, মন্তাজ, চতুর্থ সংখ্যা, তানভীর মোকাম্মেল ও অন্যান্য (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৯২, পৃ ৮৭।

২৫.   অব্যয় রহমান, ‘বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন : উৎস থেকে মোহনায়’, অপ্রকাশিত রচনা, পৃ ৮।

২৬.   তারেক আহমেদ, ‘চলচ্চিত্রের দর্শক : চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও বর্তমান বেনিয়া চলচ্চিত্র’,   সেলুলয়েড, চতুর্দশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, এম. আমিন (সম্পাদক), রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ১৯৯১, পৃ ৩৪।

২৭.   আহমেদ আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : আর্থ-সামাজিক পটভূমি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০৮, পৃ ২৪৭।

২৮.   মুহম্মদ খসরু, পূর্বোক্ত, পাদটীকা নং ২১, পৃ ২৯৩।

২৯.   ‘এই মুহূর্তের দাবী : আর্কাইভ’, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফিল্ম বুলেটিন, সংখ্যা-১, কাইজার চৌধুরী ও মাহবুব আলম (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৭৬, পৃ ১।

৩০.   মাহবুব আলম, ‘প্রতিপক্ষ তৃতীয় পক্ষ’, চলচ্চিত্র ভাবনা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০০৯, পৃ ১৪।

৩১.   পুনর্মুদ্রণ, ‘আন্দোলনের জন্য নীতিমালা’, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফিল্ম বুলেটিন, সংখ্যা-৪, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, কাইজার চৌধুরী ও মাহবুব আলম (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৭৬, পৃ ৭।

৩২.   ‘ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ’ ১৯৭৭ সালের গোড়া থেকেই একত্রীকরণের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ফেডারেশনের কাছ থেকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ছাড়া কিছুই পায়নি। তথাপি আন্দোলনের স্বার্থে, সব কিছু ভুলে গিয়ে এফ.এফ.এস.বি.-র পক্ষ থেকে নতুন নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সম্প্রতি সর্বশেষ প্রচেষ্টাটিও নস্যাত হলো।

   – সম্পাদকীয়, ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে আরেকটি শুভ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো’, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফিল্ম বুলেটিন, পঞ্চম বর্ষ, নবম-দ্বাদশ সংখ্যা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, মাহবুব আলম ও কাইজার চৌধুরী (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৭৮, পৃ ১।

৩৩.  ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’ অনেক দিন থেকেই ‘চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশনে’র কথা ভাবছিল। একক প্রচেষ্টায় যা সম্ভব নয় সবকটি চলচ্চিত্র সংসদের সম্মিলিত চেষ্টায় তা হয়তো বাস্তবায়িত হতেও পারে – এই ভাবনায়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদই এ ব্যাপারে উদ্যোক্তা হয়ে অগ্রণীর ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৭৩-এর শেষাশেষি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন’। ফেডারেশনের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা অনেক এবং আমরা আশা করবো, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের যথার্থতায় ফেডারেশন তার পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে।

 – ইকবাল আহসান চৌধুরী, ‘চলচ্চিত্র সংসদ : যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ ও সাম্প্রতিক চলচ্চেতনা’, ধ্রুপদী, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, মুহম্মদ খসরু (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৭৪।

৩৪.   মুহম্মদ খসরু, ‘ক্রুশবিদ্ধ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, পড়ুয়া, ঢাকা, ২০০৪, পৃ ১০।

৩৫.   সম্পাদকীয়, ‘সেন্সরের নিষেধনামায় সত্যজিৎ রায়’, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফিল্ম বুলেটিন, চতুর্থ বর্ষ, দশম-দ্বাদশ সংখ্যা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, মাহবুব আলম ও কাইজার চৌধুরী (সম্পাদক), ঢাকা, ১৯৭৭, পৃ ১।

৩৬.  উদ্ধৃত : মির্জা তারেকুল কাদের, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প, প্রথম প্রকাশ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ ৬৩৮-৬৩৯।

৩৭.   মানজারে হাসীন, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের পতাকা হাতে সুস্থ ছবির আন্দোলন’, তিমির হননের নান্দীপাঠ, মুহম্মদ খসরু (সম্পাদক), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা, ২০০৩, পৃ ১৬।