চাবি এবং ভালোবাসা

লেখক:

হরিশংকর জলদাস

দাদুর চার ছেলে, দুই মেয়ে। এটা জীবিতদের হিসেব। মৃতের সংখ্যা কম নয়। তিন। যে ছেলের নামে দাদু পরিচিত, সে ছেলে মারা গেছেন। লোকে দাদুকে হরকিশোরের বাপ বলে ডাকত। গাঁ-গেরামে এরকমই রেওয়াজ। সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত নাম ধরে ডাকাডাকি। সন্তান হলেই নাম বদলে যাওয়া। তখন চন্দ্রকান্ত, সুশীল, মিলন নয়, তখন – নেপালের বাবা, বিশাখার বাপ – এসব। সন্তানের নামের মধ্যে মা-বাপের নাম হারিয়ে যাওয়া।

সেই রীতিতে দাদুর নামও পাল্টে গিয়েছিল। তাঁর নাম যে কী, অনেকটা বয়স পর্যন্ত আমি জানতে পারিনি। তিনি আমাদের কাছে দাদু, গ্রামবাসীর কাছে হরকিশোরের বাপ।

কিশোর শব্দটির প্রতি দাদু সমীরকিশোরের টান ছিল ভীষণ। মেয়েদের বেলায় রানি। ছেলেদের নাম রেখেছিলেন – হরকিশোর, রূপকিশোর, সঞ্জীবকিশোর, রামকিশোর, সঞ্জয়কিশোর। এসব

নামের ক্ষেত্রে কিশোর খাটে কিনা সেদিকে নজর নেই দাদুর, যত দুর্বলতা কিশোরের প্রতি। রবীন্দ্রনাথদের যেমন নাথ, বঙ্কিমদের চন্দ্র, তেমনি দাদুদের কিশোর। বিয়ের পর তাঁর সন্তানদের কৈশোরত্ব থাকবে কিনা, সেদিকটা ভাবেননি দাদু। মেয়েদের নামের শেষে রানি যুক্ত করে বড় তৃপ্তি পেয়েছিলেন। মেয়েদের নাম রেখেছিলেন তুলসীরানি, বৃন্দারানি।

খুব ছোট একটা চাকরি করতেন দাদু তাঁর প্রথম জীবনে। কুবস্টিল নামে একটা কারখানা বসেছিল আমাদের গাঁ থেকে এক গ্রাম পরের গাঁয়ে। দাদু খুব বেশি পড়ালেখা জানতেন না। ওই কারখানায় জাপানি ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করত। সুন্দর সুন্দর বাংলো টাইপের ঘরে থাকত তারা। দাদু তাদের দেখভালের চাকরি করত। বাবাদের ওরকমই বলতেন দাদু। কিন্তু বহু বছর পরে জানা গেছে – দাদু ওখানে সুইপারের চাকরি করতেন।

তবে এজন্য দাদুর কোনো আফসোস ছিল না। তাঁর যত কষ্ট, সব ছেলে সমানভাবে মানুষ না হওয়ার জন্য। আমার বাবা ছিল দাদুর জীবিত ছেলেদের মধ্যে দ্বিতীয়। সঞ্জীবকিশোর অন্য ভাইদের তুলনায় বেশ বেশিই লেখাপড়া করেছিল।

আমার জেঠা রূপকিশোরের থলথলে শরীর। গৌরবর্ণ। ফর্সা রঙের জন্যই বোধহয় দাদু তাঁর এই ছেলেটির নাম রেখেছিলেন রূপকিশোর। পড়াশোনা খুব বেশিদূর করেননি জেঠা। মাধ্যমিক পাস করেই নাটকের দিকে ঝুঁকেছিলেন। গান-বাদ্য – এগুলোতেই জেঠার যত তৃপ্তি। কোনোদিন রাগ করতে দেখিনি জেঠাকে।

কী একটা ভাবের মধ্যে হাঁটাচলা করতেন তিনি। অন্যান্য ভাই আর ভ্রাতৃবধূরা যখন ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ঝগড়াঝাঁটিতে লিপ্ত, জেঠু তখন নির্বিকার। ভাইয়েরা তাঁকে মধ্যস্থতা মানলে তিনি বলতেন, ‘এসব আমাকে বুঝিয়ে তেমন লাভ নেই, নিজেদের সমস্যা নিজেরা মিটিয়ে নাও।’

রামকিশোর কাকা বলত, ‘তোমার স্বার্থও জড়িয়ে আছে এখানে।’

‘আমার স্বার্থ?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন জেঠু।

‘হ্যাঁ দাদা, এ ব্যাপারে তুমি কথা না বললে তোমারও সমূহ ক্ষতি হবে।’ রামকিশোর কাকা আবার বলত।

চোখ দুটোকে সামান্য খুলে জেঠু বলতেন, ‘কী রকম ক্ষতি বুঝতে পারছি না রামকিশোর।’

‘সঞ্জয় বেলিøকটা পুকুরপাড় দখল করে ঘর তুলছে। বলে নাকি মুরগির খামার দেবে।’ বলল রামকিশোর কাকা।

‘এ তো ভালো কথা। বাউন্ডুলে স্বভাবের সঞ্জয়। চিরদিন কিছুই করল না। ঘুরে বেড়িয়ে আর আড্ডা মেরে কাটাল। এখন যদি তার সুমতি হয়, তাতে তোমার ক্ষতি কী রামকিশোর, বুঝতে পারছি না।’ মৃদু গলায় রূপকিশোর জেঠু বললেন।

এবার রামকিশোর কাকা গলায় একটু ঝাঁঝ ঢেলে বলল, ‘তুমি চিরটাকাল এরকমই থেকে গেলে দাদা।’ তারপর নিজেকে সংযত করে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘দাদা, ওই পুকুরপাড়টা তো শুধু ওর না, আমাদের সবার। এই যে ঘরটা বাঁধার উদ্যোগ নিচ্ছে, বাধা না দিলে শেষ পর্যন্ত ওই জায়গাটা তো সঞ্জয়েরই দখলে চলে যাবে। শেষে কি ওই পুকুরপাড়টা ভাগবাটোয়ারায় আসবে?’

জেঠু বলেন, ‘তো আমাকে কী করতে হবে বল রামকিশোর?’

রামকিশোর কাকা বলে, ‘বাবা নেই আমাদের। থাকলে তার কাছেই বিচার চাইতাম। তুমি বড় ভাই। সঞ্জয়ের এই অন্যায়ের বিচার তোমার কাছে না চেয়ে কার কাছে চাইব, বলো দাদা?’

জেঠু বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকেন। তারপর করুণ চোখে রামকিশোর কাকার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দেখ রাম, আমার কোনো ছেলেপুলে নেই। বয়সও কম হলো না আমার। তোরা দয়া করে দোকানটা আমাকে দিয়েছিস। ওই দোকানেই আমাদের সংসার চলে যায়। ওসব জায়গাজমির প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। তোদের ছেলেমেয়ে আছে। সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলে এর একটা বিহিত কর। পারলে পাড়ার দু-একজনকে ডাক। আমাকে আর এতে জড়াস না ভাই।’

রামকিশোর কাকার হতাশ চোখে জেঠার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

দাদু চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের পর বড় রাস্তার ধারে একটা চাল-ডালের দোকান দিয়েছিলেন। একটা সুন্দর গদিও তৈরি করিয়েছিলেন। ওখানে আয়েস করে বসে চাল-ডাল বিক্রি করতেন দাদু। দোকানে ভবতোষ নামের এক কর্মচারী ছিল। ও-ই দোকানের সবকিছু দেখাশোনা করত।

গোড়ালি ঢাকা ধুতি পরতেন দাদু। গায়ে ফতুয়া। ধবধবে সাদা। পেছন দিকে চুল আঁচড়াতেন। প্রতি রাতে দিদিমা দাদুর মাথায় তেল ঘষে দিতেন। ফলে দাদুর মুখম-লে সর্বদা তেল-চকচকে একটা আভা থাকত। সুইপারের চাকরি করার বেদনাটা চাল-ডালের গদিতে বসে দাদু ভুলতে চেয়েছিলেন।

শেষের দিকে দাদু রূপকিশোর জেঠুকে সঙ্গে করে দোকানে নিয়ে যেতেন। তাঁর আসনের পাশে ছোট্ট একটা গদি তৈরি করিয়ে জেঠুকে সেখানে বসতে দিয়েছিলেন। মাস তিনেক ছেলেকে বেশ কড়া চোখে পরখ করে নিয়েছিলেন দাদু।

একদিন ক্যাশবাক্সটা তাঁর দিকে ঠেলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে হিসেবপত্রটা তুই দেখবি রূপকিশোর। আমি এইখানে বসে-বসে তোকে দেখে যাব।’

অন্যান্য ছেলের তুলনায় জেঠুকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন দাদু।

তো দাদুর মৃত্যুর পর এই দোকানের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। সঞ্জয় কাকা চাইল – দোকানটা তার দখলে নিতে। বাবারও লোভ ছিল দোকানটার প্রতি। এক রাতে মায়ের সঙ্গে কথোপকথনে বুঝেছিলাম আমি।

মা বলেছিল, ‘তুমি এরকম চুপচাপ থাকলে কি চলবে? এত টাকার দোকান! সঞ্জয় নাকি দোকানটা আত্মসাৎ করতে চাইছে। তোমারও তো হক আছে ওই দোকানে। শ্বশুরের সম্পত্তির ওপর তো তোমাদের চার ভাইয়ের সমান দাবি।’

‘তা তো জানি। কিন্তু দোকানটা তো এতদিন দাদাই চালিয়েছে। আমাদের চেয়ে দাদাকেই বেশি পছন্দ করত বাবা। দোকানটার প্রতি আমারও যে লোভ নেই, এমন নয়। কিন্তু দাদাকে একথা বলি কী করে?’

‘কেন, সঞ্জয় যদি বলতে পারে, তুমি বলতে পারবে না কেন?’ মা গলা উঁচিয়ে বলেছিল সে রাতে।

‘দেখো, সঞ্জয় বেয়াড়া ধরনের। তার উদ্ধত আচরণ বাবাকে ক্ষুব্ধ করত। বাবা মুখে কিছু বলত না সত্যি, কিন্তু তার ওপর বাবা যে ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিল, তা বাবার চেহারা দেখে বোঝা যেত। আর যা-ই করি, সঞ্জয়ের মতো বেয়াদবি করতে পারব না।’

বাবার কথাবার্তা শুনে মা সে রাতে চুপ মেরে গিয়েছিল।

দাদু থাকতে-থাকতেই উঠানের চারদিকে চারটা ঘর উঠেছিল। চার ছেলেকে ওই চারটা ঘর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দাদু। ওখানেই জেঠা-কাকারা সপরিবারে থাকতেন। দাদুর খুব বেশি সহায়সম্পত্তি ছিল না। বড় একটা বাস্ত্তভিটে, বিশাল একটা পুকুর, পুকুরের চারপাশে বাঁশঝাড়, শিমুলগাছ, শিরীষগাছ – এসব। পুকুর বা পুকুরপাড় ছেলেদের মধ্যে ভাগটাগও করে দিয়ে যাননি দাদু। ভিটেটাতেও পরবর্তীকালে যে যার মতো করে ঘরদোর বানিয়ে নিয়েছে। আমার বাবা দক্ষিণ হালিশহর হাইস্কুলে হেডমাস্টারি করত। বিএ পাস করেই মাস্টারিতে ঢুকেছিল বাবা। পরে প্রয়োজনে বিএডটাও করেছিল। রামকিশোর কাকা আবু তাহের অ্যান্ড কোং-এ ক্যাশিয়ারের চাকরি করত। বাবার চাপে রামকিশোর কাকা আইএ পাস করেছিল। সঞ্জয় কাকা কিছু না করেই জীবনটা কাটিয়ে দিল প্রায়। কিছু না করে বললে অবশ্য ভুল হবে, কিছু তো একটা করতই সঞ্জয় কাকা। সে টাউটগিরি।

পাড়ায় কে পাকা ঘর বানাচ্ছে, প্রতিবেশীকে উস্কে দিল সঞ্জয় কাকা – কিরে সাধন, চুপচাপ বসে আছিস যে! যদু কাকার ছাদটা কোথায় এসে পড়বে, বুঝতে পারছিস না? তোর তিন ফুট জায়গা তো যদু কাকার দখলে চলে যাবে রে। কিছু একটা কর।

গরিব সাধন কাঁচুমাচু করে বলল, আমারও সেরকম মনে হচ্ছে দাদা। কিন্তু কী করতে পারি আমি?

কাকা বলল – কী করতে পারিস মানে! চল আমার সঙ্গে, থানায় চল। জিডি কর যদু কাকার নামে। তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল!

সাধন বলল – আমি অশিক্ষিত গরিব মানুষ, থানায় যেতে আমার ভয় করছে দাদা।

তোর ভয়ের কিছু নেই। ওসির সঙ্গে আমার ভালো জানাশোনা। কিছু টাকা খরচ করতে হবে, এই যা। ধমকের সুরে সঞ্জয় কাকা বলে।

এইভাবে টুপাইস কামায় সঞ্জয় কাকা। কাকিটাও সেরকম। বাঘের সঙ্গে যেমন বাঘিনী, শেয়ালের সঙ্গে শেয়ালিনী, তেমনি সঞ্জয় কাকার সঙ্গে অমিতা কাকি। দুজনে মিলে বাড়িটাকে সর্বদা উত্তপ্ত করে রাখে।

এই অমিতা কাকি আর সঞ্জয় কাকা দোকানের মালিকানা নিয়ে একদিন গ-গোলটা পাকিয়ে বসল। সকাল থেকে হইচই। জেঠা দোকানে, বাবা স্কুলে, রামকিশোর কাকা চাকরিতে। ফাঁকা মাঠ। রূপকিশোর জেঠার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করল দুজনে – বাপের সম্পত্তি একা লুটেপুটে খাচ্ছে দাদা। বউ বলল – আক্কেল থাকলে কি এরকম করে কেউ? ভাইয়ালি সম্পত্তি একা ভোগ করে? কাকা বলল – লেড়া নাই, লেড়কি নাই, তার এত দরকার কী দোকানের? ছেলেমেয়ে নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। দোকানটা ছেড়ে দিতে বলো আমাকে।

শেষের কথাটা যে বড় বউদিকে উদ্দেশ করে বলা, সেটা বড় বউদি বুঝতে পারেন। কিন্তু মুখে কিছুই বলেন না বড় বউদি। একেবারেই নির্ভেজাল নারী তিনি। কিছুটা স্বভাবগুণে, অনেকটা জেঠুর প্রভাবে সাদাসিধে একজন নরম-সরল নারীতে পরিণত হয়েছেন জেঠি।

দেবরের হাউকাউয়ের কোনো জবাব দিলেন না জেঠিমা। উপরন্তু সঞ্জয় কাকার বাড়ির দিকের জানালাটা বন্ধ করে দিলেন।

জেঠি জেঠাকে বড় ভালোবাসেন। সন্তানাদি না হওয়ার কারণে সে ভালোবাসা আরো গাঢ় হয়েছে। জেঠুর দিবানিদ্রার অভ্যাস আছে। একদিন কী কারণে জেঠুদের দরজাটা একটু ফাঁক করা ছিল। ওই ফাঁক দিয়ে এক দুপুরে দেখলাম – জেঠু চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন, জেঠির বাম হাতে হাতপাখা। আর ডান হাত দিয়ে জেঠুর চুলবিরল মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন।

সঞ্জয় কাকা আর কাকির হইহলস্না শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। না জানি জেঠু কী রকম কষ্ট পান! কোনো না কোনোভাবে তো ওদের হলস্নাবাজির কথা জেঠুর কানে যাবেই। আর কেউ বলুক না বলুক, জেঠিমা তো বলবেনই। মাকে দেখেছি – সংসারে টুকরাটাকরা কিছু একটা ঘটলেই বাবা স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই নামতাপড়া শুরু করে। নামতায় তো নির্দিষ্ট গ– আছে, দুই একে দুই, দুই দুগুণে চার, তিন দুগুণে ছয়। কিন্তু মায়ের নামতায় সেরকম গ– নেই। তিলকে তাল বানায় যেমন অনেকে, মায়ের নামতাতেও দুই দুগুণে ছয়, ছয় দুগুণে বত্রিশ। বলছিলাম – বানিয়ে বানিয়ে বলে মা তৎক্ষণাৎই বাবার মাথা গরম করে ছাড়ে। জেঠিমার কাছে তা-ই আশা করেছিলাম আমি। কিন্তু কী আশ্চর্য, জেঠিমা সেদিনের কথা কিছুই বলেননি জেঠুকে। নইলে কেন সাত দিনেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না জেঠু।

সাত দিন পর এক সন্ধ্যায় দোকান থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন জেঠু। সাধারণত দোকানের হিসেবপাতি চুকিয়ে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে তাঁর দশটা বেজে যায়। সেদিন তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভাইপো-ভাইঝিদের মধ্যে জেঠু আমাকে বেশি ভালোবাসেন। আমিও। তো আমি জেঠুকে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর ঘরে। ‘শরীর খারাপ জেঠু?’ আমার কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠেছিলেন জেঠু, ‘দূর পাগলা, অসুখ করবে কেন? ভালো আছি আমি। যা যা, তোর বাপকে একটু ডেকে দে। বলবি – আমি ডেকেছি। আর হ্যাঁ, তোর রামকাকু আর সঞ্জয়কাকুকেও একটু ডেকে দিস।’

আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। জেঠু হঠাৎ করে সবাইকে নিজ ঘরে ডেকে পাঠাচ্ছেন কেন? ভয়ংকর কিছু কি? দ্বিধান্বিত পায়ে ঘরের দিকে হেঁটে গিয়েছিলাম আমি।

হয়েছে কী, আমাদের প্রতিবেশী যতীন ম-ল দাদুর কাছে চালের বস্তা কিনতে গিয়েছিল সেদিন বিকেলে। কথায় কথায় সঞ্জয় কাকা আর তার বউয়ের চেঁচামেচির কথা জানিয়ে দিয়েছিল। যতীন ম-ল এটা বলতে ভুল করেনি যে, কাকা-কাকির হাউকাউটা মূলত চাল-ডালের দোকানটাকে ঘিরে।

সেই সন্ধ্যায় বাবা আর কাকারা জেঠুর ঘরে এলে দোকানের চাবিটা টেবিলের মাঝখানে রেখেছিলেন জেঠু। টেবিলের চারদিকে চার ভাই বসেছিলেন।

জেঠু বলেছিলেন, ‘আমি আর দোকানটা চালাতে পারছি নারে। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তোদের মধ্যে কেউ দোকানটার দায়িত্ব নে।’

জেঠুর কথা শুনে সঞ্জয় কাকার লোভী চোখ চকচক করে উঠেছিল। ডান হাতটা টেবিলের ওপর তুলেও ছিল। কী বুঝে আবার হাতটা টেবিলের নিচে গুটিয়ে নিয়েছিল সঞ্জয় কাকা।

বাবা আর রামকিশোর কাকা বউদের কল্যাণে সেদিন-সেদিনই সঞ্জয় কাকার দুর্ব্যবহারের কথা জেনে গিয়েছিল। দাদার প্রতিক্রিয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করে ছিল তারা।

আজকে দাদার কথা শুনে রামকিশোর কাকাই প্রথমে কথা বলে উঠল, ‘কী বলছ দাদা তুমি? আমরা চালাব দোকান! এ দোকান তো তোমার দাদা!’

বাবা নীরস গলায় বলেছিল, ‘রামকিশোর ঠিকই বলেছে দাদা, এ দোকান তোমার।’

জেঠা মৃদু গলায় বলেছিলেন, ‘দোকানটা বাবার সম্পত্তি। তোদের সবার অধিকার আছে ওই দোকানের ওপর।’

রামকিশোর কাকা বলেছিল, ‘দেখো দাদা, আমরা সবাই চাকরি করি। তুমি করো না। ওই দোকানের আয় দিয়ে তোমার সংসার চলে। তুমি কি বলো তোমাকে আমরা পথে বসাই!’

এই সময় সঞ্জয় কাকা বলে ওঠে, ‘আমি করি না। আমি কোনো চাকরি করি না।’

সদ্বুদ্ধি বাবার মাথায় উদয় হলো। বলল, ‘তুই চাকরি না করলে কী হবে, তোর ইনকাম আমাদের কারো চেয়ে কম না।’ মেজদার কথা শুনে সঞ্জয় কাকা চুপ মেরে গেল।

রামকিশোর কাকা বলল, ‘শোনো দাদা, এই দোকান তোমার। তোমার কিছু হলে বউদির। বউদি তখন দোকানটা নিয়ে যা ইচ্ছে তা-ই করবে। এই দোকানের ওপর আমাদের কোনো দাবি নেই।’

‘আমার আছে।’ কঠিন গলায় বলে উঠল সঞ্জয় কাকা।

রামকিশোর কাকা বলল, ‘ঠিক আছে, তোর দাবি মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। দাদা তোকে বিশ হাজার টাকা দেবে দোকানের মালিকানা হস্তান্তর বাবদ। কালকে আমি স্ট্যাম্প নিয়ে আসব। ওই স্ট্যাম্পে আমরা সবাই স্বাক্ষর করব। আমাদের কোনো টাকা দিতে হবে না দাদা। তুমি সঞ্জয়কে টাকাটা দিতে পারবে তো দাদা?’

রামকিশোর কাকার কথা শুনে জেঠু মস্নøvন একটু হেসেছিলেন।

পরদিন সন্ধ্যায় একইরকমভাবে ডাইনিং টেবিলটা ঘিরে সব ভাই বসেছিলেন। রামকিশোর কাকা উকিলকে দিয়ে দলিলটা একেবারে লিখিয়ে নিয়ে এসেছিল। সঞ্জয় কাকাকে বিশ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা-ও লেখা ছিল দলিলে। তিন ভাই দলিলে স্বাক্ষরও করেছিল।

সেই সন্ধ্যায় সঞ্জয় কাকাকে বিশ হাজার টাকা দেওয়া ছাড়া আরো একটা কাজ করেছিলেন জেঠু। ঘরের ভেতর থেকে জেঠু টাকার তিনটে বান্ডেল নিয়ে এসেছিলেন। একটা বান্ডেল সঞ্জয় কাকাকে দিয়ে আর দুটো বান্ডেল বাবা আর রামকিশোর কাকার দিকে এগিয়ে ধরেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি কারো ঋণ নিয়ে মরতে চাই না ভাইয়েরা। তোরাই ঠিক করেছিস – বিশ হাজার দিলে দোকানের মালিকানাস্বত্ব ছাড়বে সঞ্জয়। সঞ্জয় শর্তটা মেনেও নিয়েছে। নইলে টাকাটা সে নিত না। ভাবলাম – তোদের ঋণটাও রাখব কেন? ঋণ নিয়ে মরতে চাই না আমি।’ বলতে বলতে কেঁদে দিয়েছিলেন জেঠু।

সে রাতে প্রত্যেক ভাই বিশ হাজার টাকার বান্ডেল নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে গিয়েছিল।

ওই ঘটনার পর খুব বেশি বছর বাঁচেননি জেঠু। জেঠিমার মৃত্যুর পর একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। দূর সম্পর্কের এক পিসি জেঠুর রান্নাবান্নার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আধাপেট খেয়ে পাত থেকে উঠে যেতেন জেঠু। আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘জানিস প্রত্যুষ, তোর জেঠির হাতের রান্না ছাড়া আর কারো রান্না খেতে রুচি লাগে না আমার।’

তো আমার রূপকিশোর জেঠু একদিন মারা গেলেন। শ্রাদ্ধশামিত্মও চুকে গেল একদিন।

তারপর এক দুপুরে সমীরকিশোরের উঠানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হলো। তিন ভাইয়ের হাতের কাছে যা ছিল, তাই নিয়ে মারামারিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যান্য ভাইয়ের পক্ষে তাদের ছেলেমেয়েরা, স্ত্রীরা যোগ দিলো।

জেঠা গেছেন, জেঠি গেছেন। দোকান আছে। দোকানের চাবি আছে। এই চাবির মালিক কে হবে এখন – এই নিয়ে তিন ভাইয়ের মধ্যে লাঠালাঠি।

আমি উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখে যেতে লাগলাম, স্বর্গ থেকে রূপকিশোর জেঠুও হয়তো। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার