চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউটে

লেখক:

রফিকুন নবী
রেসকোর্স ময়দানের উত্তর-পশ্চিম কোণে জিমখানা ক্লাবের দালানকোঠা। ওখানটা ঘোড়দৌড়-রেসের স্টার্টিং পয়েন্ট। তার পশ্চিম পাশে রাস্তাঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা খোলা জমি (এখানটায় এখন জাতীয় জাদুঘর)। জমির মধ্যিখানে একটি বড় পুকুর। ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নওয়াবদের বাগান। সেখানে বিশাল একটি অশথ বৃক্ষের কাছাকাছিতে ভগ্নপ্রায় জরাজীর্ণ একটি পুরনো দালান, ‘কাটরা’ সদৃশ গেট মতন। তাতে ছোট ছোট চায়ের দোকান (এখন সেখানে পাবলিক লাইব্রেরি)।
আশপাশের গাছগুলিতে দুটো-তিনটে করে ঘোড়া বাঁধা। সহিসদের পরিচর্যা দেখতে অসংখ্য মানুষের ভিড়। হই-হুল্লোড় নেই কিন্তু রিকশা আর ঘোড়ার গাড়ির গ্যাঞ্জাম এতোটাই যে, নিশ্চিন্তে কোথাও দাঁড়াবার উপায় নেই এমন পরিবেশ। এই ভিড়ের মানুষগুলোর উপস্থিতি আসলে শনি-রোবিবারের ঘোড়ার রেস-সংক্রান্ত হরেক কারণে।
দৃশ্যটি দেখেছিলাম ক্লাস এইটে পড়ার সময়ে। গুরুজনদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সাইকেলে চেপে হাজির হয়ে। পরিবার থেকে এই তল্লাটে আসা বারণ ছিল। দূরত্বও কম মনে হতো না। পুরনো ঢাকা থেকে এতদূর আসার কোনো কারণও ঘটতো না ছোটদের। রেসের জন্য বড়দেরই আনাগোনা ছিল বলা চলে।
যা-ই হোক, সেই রেসকোর্সের পশ্চিমে যে অন্ধকার করে থাকা বিশাল বাগান, সেদিকে ঢুকিনি সেদিন। ওখানে যে গাছাগাছালির আড়ালে একটি অপূর্ব সুন্দর দালান তৈরি হয়েছে কবে-কবে এবং সেটিই যে আর্ট কলেজ তা টের পাইনি। অথচ তখনই মনে মনে বড় হয়ে আর্ট কলেজে পড়ার ইচ্ছেটি পোষা। জানলাম ১৯৫৯ সালের জুলাইয়ে ভর্তি হতে গিয়ে।
ভর্তি পরীক্ষার খোঁজখবরের জন্যে কলেজটিকে খুঁজতে গিয়ে দেখি একসময় গিয়ে হাজির হয়েছি সেই আগের দেখা রেসকোর্সের নিষিদ্ধ পরিবেশটিতে। জটলা পাকানো ভিড়ের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতেই গাছপালার দিকে তর্জনী দেখিয়ে একজন বললো, ‘ওই যে – ওই খানে।’ বিশাল অশথ আর একগাদা আমগাছের চেহারা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে লোকটির দিকে আবার তাকাতেই বললো, ‘আরে ওই তো, ওইখানে গেট। গাছের আড়ালেই নতুন সুন্দর একটা দালান আছে, ওইটাই কলেজ।’

কিছুটা এগোতেই গেটটি চোখে পড়লো। আর গেট খুলে ঢুকতেই চোখের সামনে ঝলসে উঠলো এক অপূর্ব সুন্দর ইমারত। পুরনো ঢাকার পৌরাণিক ঢঙের দালান দেখে অভ্যস্ত চোখ আচমকা অমন অদ্ভুত আর অবাক করা দালান আবিষ্কারে থমকে গেলো। দোতলাটাই চোখে পড়লো আগে। মনে হলো, একটি কাচের ঘর ঝুলে আছে শূন্যে। নিচের পিলারগুলো চোখেই পড়েনি উত্তেজনায়। দশাসই দারোয়ান এসে যখন বললো, ‘ভর্তি? উপ্পার দোতল্লামে যাও। উধার সিঁড়ি হ্যায়। খবর মিলে গা।’
ভয়ে ভয়ে দ্বিধাজড়িত পায়ে এগোতেই বুঝলাম আসলে কয়েকটি পিলারের উপরে ভর করা দোতলার কাচঘর। বিস্ময়ের পর বিস্ময় একে একে ভর করছে তখন। সিঁড়ির সামনে আসতেই আবার তাই হলো। খোলামেলা জায়গায় ঝকঝকে তকতকে ঝুলন্ত একটি সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে বাঁক খেয়ে শুধু একটি পিলারকে সহায় করে।
সেদিনের দেখা ওইটুকুই। আজ পেছনে তাকিয়ে হিসাব করতে গিয়ে দেখি সেই দালান, সিঁড়ি, চত্বরকে ঘিরে পুরো শিক্ষানবিশ পর্যায় থেকে শুরু করে শিক্ষকতা বা বলা যায় জীবনের সিংহভাগটাই কেটে গেছে দেখতে দেখতে। শুধু তাই নয়, শিল্পীজীবনটাই তৈরি হয়ে গেছে যেন একনাগাড়ে বায়ান্ন বছর ধরে সেই সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে।
সত্যি বলতে কী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তির আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমার জানা ছিল না যে দালানকোঠা বানাবার জন্যে আলাদা এক ধরনের শিল্পীর প্রয়োজন হয়। জানতাম ইঞ্জিনিয়ার আর রাজমিস্ত্রি মিলে কাজটি সমাধা করেন। আসলে যে নকশাকার বলে কেউ একজন যিনি একাধারে শিল্পী, প্রকৌশলী পরিবেশবিদ, সমাজবিদ, দার্শনিক ইত্যাদি মতন নানান কিছুতে গুণান্বিত ব্যক্তি থাকেন, যাঁকে স্থপতি বলা হয়, সে-ব্যাপারটিই জানা ছিল না। সেটি জানলাম আর্ট কলেজে ভর্তির কদিন পরেই। ক্লাসটিচার খ্যাতিমান শিল্পী কাজী আবদুল বাসেত বলেছিলেন, ‘স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এই চত্বর এবং দালানের নকশাকার। শিল্পীদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষ এবং তিনিও শিল্পীদের সুহৃদ। ১৯৫৬ সালে দালানটি নির্মাণ এবং প্রাঙ্গণের সাজসজ্জা পুরোপুরি শেষ হলে ক্লাস এবং কলেজের অন্যান্য কর্মকাণ্ড শুরু হয়।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ, কামরুল হাসান – এই তিন জ্যেষ্ঠ শিল্পী যেমন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তেমনি ছিলেন তাঁদের কনিষ্ঠ শিল্পী রশিদ চৌধুরী এবং মোহাম্মদ কিবরিয়াও। আমি তাঁর শ্রেষ্ঠতম স্থাপত্য নিদর্শন আট কলেজটির ছাত্র হলেও তাঁকে দেখেছি প্রায় বছরখানেক পর। যতদূর মনে পড়ছে রবীন্দ্র শতবর্ষের নানাবিধ অনুষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে যুক্ততার কারণে। বলা বাহুল্য, তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। বাড়িতেও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা হতো। অনুষ্ঠানাদিও হতো। আমি কাছাকাছিতে যাবার সান্নিধ্য অর্জন করি শিল্পী রশিদ চৌধুরীর কারণে। রশিদ স্যারের প্রদর্শনীর কাজকর্মের সুবাদে তাঁর বাড়িতে যাতায়াতের সুযোগ ঘটে। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে তাঁর সাংস্কৃতিক কোনো একটি আয়োজনে যুক্ত হতে হয়েছিল। তখন তাঁকে আরো কাছে থেকে দেখি এবং আবিষ্কার করি ভাবনা-চিন্তায়, চলনে-বলনে।  অত্যন্ত আধুনিকমনস্ক মানুষটি একজন খাঁটি বাঙালি। আর সবাইকে তাঁর মতোই বাঙালিত্ব ধারণে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে একজন সংগঠকের ভূমিকাও নিতে দেখেছি। বাড়িতে দেশের প্রগতিশীল অংশের রুচিশীলদের জড়ো করে একাধারে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আসর বসাতেন। দেখেছি তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন ছিল যে, তাঁর কথার বাইরে, নির্দেশনার বাইরে কেউ কোনো দ্বিমত পোষণ করতে পারতো না। সেই গুণের কারণেই হয়তো বা একসময় সরাসরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন। সবকিছুর সমাহারে তিনি সমৃদ্ধ এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ঋজুদেহী অত্যন্ত সুপুরুষ তো ছিলেনই বটে।
তবে সবচাইতে বড় দিক হলো, তাঁর নিজ সৃজনশীল দিকটিই। সাতচল্লিশ-পরবর্তীকালে এই ভূখন্ডে আধুনিক স্থাপত্য চর্চাকে প্রোথিত করেছেন। স্থাপত্যকে শিক্ষাক্রমে আনার মূল দায়িত্বটি তিনিই পালন করেছেন।
এই দিকটিকে অবিলম্বে ধর্তব্য জ্ঞান করার চিন্তা-ভাবনাটি ছিল প্রথম থেকেই। যখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীবৃন্দ আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত, তখন তিনি স্থাপত্যকে উচ্চশিক্ষা অংশে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
এই প্রসঙ্গটি আর্ট কলেজে ভর্তির কিছুকাল পর শিল্পীদের কাছে শুনতাম। কথিত আছে, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যকলার একত্রিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিরই তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি তা আর হয়ে ওঠেনি। এই নিয়ে তাঁর ক্ষোভ ছিল তৎকালীন সরকারের ওপর এবং সেইসঙ্গে অভিমান ছিল জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের ওপরও।
এসব কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং শিল্পীদের কোনো সমস্যা নিয়ে তাঁর শরণাপন্ন হয়ে দেখেছি তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন সমাধানের। আশির দশকের মাঝামাঝিতে যখন দেশজুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন চারুশিল্পী সংসদকে করণীয় দিকগুলো নিয়ে সাংগঠনিক নানান সুপরামর্শ দিয়েছেন, যুক্তও হয়েছেন সভা-সমিতিতে এবং তা আর্ট কলেজে বসেই।
তাঁকে দেখা এবং তাঁর চিন্তা-চেতনাকে উপলব্ধি করতে গিয়ে আমি শিল্পাচার্য জয়নুল এবং পটুয়া কামরুলের সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। নিজেদের সৃষ্টিশীল কাজের পাশাপাশি দেশ এবং দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবার যে মহান দিক সেসব তাঁর স্বভাবেও প্রাধান্য পেয়েছে চিরকাল। সাংস্কৃতিক জগৎকে হাতিয়ার করে প্রতিবাদী হওয়া যায়। দাবি আদায়ের আন্দোলন করা যায় – এমনটায় তিনিও বিশ্বাস করতেন এবং সেই চর্চাটিকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করতেন তরুণ শিল্পী, স্থপতি, সংগীতসেবী, কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে। তরুণদের মধ্যে গ্রাহ্য করার মতো নতুনত্বের প্রচেষ্টা দেখলে তা তাঁর আশকারা পেতো। মনে আছে শিল্পী রশিদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কবিতায় ‘নিহিলিস্ট’ বা ‘না’ ধরনের একটি দিক উন্মোচনের চর্চা চলছিল ‘গ্রুপ’ সৃষ্টি করে। তাতে তখনকার তরুণ স্থপতি রবিউল হুসাইন, সামসুল ওয়ারেস, আবদুর রশিদ, তাজুল ইসলাম প্রমুখকে দেখেছি যুক্ত থাকতে। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম তাঁদেরকে প্রশ্রয় দিতেন। তাঁরা তাঁর স্থাপত্যিক প্রতিষ্ঠান বাস্তুকলাবিদের তরুণ স্থপতি ছিলেন এবং স্থাপত্যে তো বটেই, ভাবনা-চিন্তার দিকটিতে আলোকিত হয়েছিলেন।
বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের তাঁর ব্যস্ততম সময়টিতে ঢাকায় বিশ্বের দুজন বরেণ্য স্থপতি কাজ করছিলেন। লুই কান শেরেবাংলা নগরে জগৎসেরা সংসদ ভবন তৈরি করছিলেন আর গ্রিসের স্থপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, হোম ইকোনমিক্স কলেজ। শুনেছি স্থপতি মাজহারুল ইসলামের প্রস্তাবনা এবং অনুরোধে তাঁরা ওই কর্মযজ্ঞে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন। স্থপতি হিসেবে তিনি যে তাঁদের প্রিয়পাত্র ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। বলতে দ্বিধা নেই যে, আধুনিক স্থাপত্যের যে-জোয়ারটি এ-অঞ্চলে এসেছিল, তার মূলে ছিলেন তিনিই। আর্ট কলেজ (যা বর্তমানে চারুকলা অনুষদ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার (যা প্রথমে পাবলিক লাইব্রেরি ছিল), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
এই কীর্তিমান সৃজনশীল মহান ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে যে-শূন্যস্থানটি সৃষ্টি হলো তা পূরণ করার নয়। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার