চেসোয়াভ মিউশের কবিতা

লেখক:

কুমার চক্রবর্তীKumar chakrabarti

‘ডেডিকেশন’ কবিতায় চেসোয়াভ মিউশ বলেছেন, What is poetry which does not save/ Nations or people? এর থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, কবির একটি বিশেষ প্রবণতাকে যা প্রথাগত নন্দনতত্ত্বের ধারণার বাইরে অন্য এক নন্দনের বিশেষত্বকে ইশারা দেয়। মিউশের এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই  থিয়োডর আডোরনোর সেই বিখ্যাত কথাটিও আমাদের মনে পড়বে : To write lyric poetry after Auschwitz is barbaric, বা তাদেউশ রুজেভিচের কথা, They forget/ that contemporary poetry/ means struggle for breath। এইভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কবিতার মনস্তত্ত্ব  ও অনুভব বদলে যেতে শুরু করে কিছু কবিকে আশ্রয় করে। এখানে মনে রাখা উচিত, যুদ্ধোত্তর নন্দন ও আলোকদীপ্তির ভাবনায় তাৎপর্যগত পরিবর্তন এসে গেল, কবিতা প্রথাগত নন্দনবোধ আর শিল্পভাবনায় নিজেকে আটকে রাখল না, ধরতে চাইল ননদনতত্ত্বের ও আলোকায়নের দ্বন্দ্বগুলোকে, তাদের খোলনলচে পালটে। আডোরনো এবং হোর্কহাইমার তাঁদের বিখ্যাত কাজ ডায়ালেকটিক অব এনলাইটেনমেন্টে বলেছেন, তথ্যপ্রবাহ এবং ব্র্যান্ড-নিউ বিনোদন মানুষকে অধিকতর স্মার্ট করেছে ঠিকই; কিন্তু তার চেয়েও বেশি করেছে নির্বোধ। সৌন্দর্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা ক্যামেরা উৎপাদন করে। সংস্কৃতি এখন আপাতবিরোধী পণ্য আর বিজ্ঞাপন হলো জীবনের সর্বরোগহরকর বিশেষ একটা-কিছু। তাঁরা তাঁদের বিখ্যাত গ্রন্থে আরো বলেছেন, অষ্টাদশ শতকের আশাবাদ বা মানবতাবাদ এক চূড়ান্ত ভ্রান্ত ধারণা, কান্টের ‘আলোকদীপ্তি কী’ এক বাতিল বিষয় ছাড়া আর কিছু নয়। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে, পশ্চিমা সভ্যতার অন্তরালে অপেক্ষায় রয়েছে এক পশু, যে সুযোগ পেলেই ঘাড় মটকে ধরতে ভুল করে না। এই প্রতিভাবনা ও রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে বিংশ শতাব্দীর কবিতাভাবনার যে-সমস্ত ভাংচুর এবং পরিবর্তন, তার অন্যতম পুরোহিত হলেন চেসোয়াভ মিউশ। বিশাল জীবন (১৯১১-২০০৪), অনেক কবিতা, অন্য লেখালেখি আর খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, পুরস্কার নিয়ে মিউশ কী করলেন? কীভাবে দাঁড় করালেন তিনি নিজেকে? কিংবা কী সেই ভাংচুর যা তাঁকে চিহ্নিত করে স্বতন্ত্র হিসেবে এই নিরিখে? আমরা বলতে পারি, তা ছিল আসলে বের হয়ে আসার কাঙ্ক্ষা। তাঁর মন ও ইচ্ছাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। কবিতার যে প্রথাগত ধারণা এবং ফর্ম, এর ভেতর থেকে নিজেকে পৃথক করা। মিউশ বলেছেন, বিংশ শতাব্দীর ভয়ংকরতার মধ্যে তাঁর জন্ম, আধুনিক ইতিহাসের দুই বিশাল সর্বগ্রাসী অবস্থা, জাতীয় সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মধ্যে তিনি বসবাস করেছেন। পতিত ছিলেন দুই-দুটি বিশ্বযুদ্ধে। তা ছিল এক আত্মবাস্তবতা, সে-কারণে ফরাসি প্রতীকবাদী অনুসারীদের মতো তিনি বিশুদ্ধ কবিতার রাজ্যে পালাতে পারেননি। তিনি লিখেছেন অতীতকে নিয়ে, ট্র্যাজিক ও শ্লেষাত্মকভাবে। ‘আর্স পোয়েটিকা?’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘…that I’ve devised just one more means/ of praising Art with the help of irony।’ সাবজেক্টিভ আর্ট এবং অবজেক্টিভ আর্টের মধ্যে তিনি তাই শেষোক্তটির সমর্থক ছিলেন, এবং তিনি দাবিও করেছেন যে, তাঁর কাব্যের অনুশীলনই এর প্রমাণ দেবে। এসব কিছুও আপতিক নয়, আমাদের মাথায় রাখতে হবে, থিয়োডর আডোরনো, তাদেউশ রুজেভিচ বা জবিগনিয়েভ হেরবের্টসহ আরো অনেককে এবং প্রতিকবি ও কবিতাকে। তাই তিনি বলতে পারেন অনায়াসে : ‘শপথ করে বলছি, আমার কাছে কোনো শব্দের চাতুরী নেই/  মেঘ বা বৃক্ষ যে-ভাষায় কথা বলে, আমি তোমার সাথে সেই নৈঃশব্দ্যের ভাষায় কথা বলি।’ অর্থাৎ তিনি অনুসরক ছিলেন না আগেকার ধারার, বরং সময়ের ভাষা ও কবিতাকে লিখতে চেয়েছেন তিনি। শুদ্ধ কবিতার লালিতপালিত রূপ এবং সৌন্দর্যসৃষ্টি থেকে সরে এসে ভিন্ন-এক সম্প্রয়াসে চেষ্টাশীল ছিলেন তিনি, যা মানুষের অন্য-এক সংলগ্নতার কথা বলে। তিনি মনে করতেন, দৃশ্যমান বাস্তবতা কবিতার স্বাস্থ্যকে উন্নত করে। এজন্যই তিনি বলেছেন, কবিতা তাঁর কাছে সাম্প্রতিক মানবিক দোলায়িত সময়ের এক অংশগ্রহণ। তবে এ-কথাও তিনি বলেছেন যে, তিনি কবির নিষ্ক্রিয়তা বা প্রতিক্রিয়াহীনতাতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, যা কবিকে উপহার দেয় এক-একটি কবিতা যা বস্ত্তত উঠে আসে তাঁর গভীর চিন্তা বা ধ্যান থেকে। এসবই তাঁর কবিতায় স্থায়িত্ব নিয়েছে সফলভাবে। তাঁর কবিতার ভাষা ও স্বরসংগতি তাঁর নিজেরই মতো, যা অন্তর্গতের কণ্ঠকে চিনিয়ে দেয়। তিনি বলতেও চান আত্মকথন বা স্বীকারৌক্তিক ধরনে ও উচ্চারণে এবং এই প্রবণতা তাঁর সমগ্র জীবনের শর্তেই যেন প্রকাশিত।

 

দুই

মিউশ, যদিও পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেননি, তবু তিনি নিজেকে পোলিশ কবি বলেই মনে করতেন, কারণ তিনি নেটিভ মাতৃভাষা পোল ভাষাতেই  লিখতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বলেওছেন যে, ভাষাই তাঁর স্বদেশ। পোল্যান্ডে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি, থাকেনওনি বহু বছর। তিনি জন্মগ্রহণ করেন লিথুয়ানিয়ায়, ১৯১১ সালে, তাঁর কৃষক পিতামহের ছোটো তালুকে। মিউশ এই গরিব লিথুয়ানিয়াকে আখ্যায়িত করেছেন ‘কবিতা এবং পুরাণের দেশ’ বলে। নেটিভ রেল্ম গ্রন্থে তিনি আরো বলেছেন, যখন ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় রাজ্যের পতন আর উত্থান হচ্ছিল আকছার, সে-সময়ে লিথুয়ানিয়া ছিল কুমারী অরণ্যে ছাওয়া এক অঞ্চল যেখানে উপকূলে মাঝেমধ্যে ভাইকিংদের জাহাজ ভেড়া ছাড়া আর কিছুই ঘটত না। তিনি বলেছেন, ‘মানচিত্রের জ্ঞানসীমানার বাইরে এটা ছিল বাস্তব অপেক্ষা অধিক পৌরাণিক।’

মিউশের শৈশব ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে টালমাটাল। তাঁর পিতা, আলেকজান্ডার ছিলেন সড়ক প্রকৌশলী এবং যুদ্ধের সময় তাঁকে জারের বাহিনীতে কাজ করতে হয়েছিল। এ-সময় রাশিয়ার যুদ্ধ-এলাকায় সেতু নির্মাণের কাজে তাঁকে নিয়োজিত থাকতে হয়েছিল, আর মিউশ ও তাঁর মাও তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে ছিলেন। এই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে মিউশ বলেছেন, ‘আমাদের ঘর ছিল প্রায় সময়ই এক ঢাকা ওয়াগন।’ ১৯১৮ সালে তাঁদের পরিবার লিথুয়ানিয়ায় ফিরে আসে। এখানে তাঁর শৈশব ছিল প্রশান্তময় আর এখানেই অতঃপর রাজধানী ভিলনিয়াসে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি আট বছর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং তা ছিল অনেকটা ক্যাথেলিক গোছের শিক্ষা। এ-বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিনই শুরু হতো প্রার্থনা দিয়ে আর সেখানে গীত হতো সেই গান : ‘যখন ভোরের আলোরা জেগে ওঠে।’ ক্যাথেলিক মতবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ক্যাথেলিক বিশ্বাস বা মতবাদ খুবই শক্ত মতবাদ, কারণ তা যেন সত্যিই ধরে  রেখেছে কতিপয় ভূতাত্ত্বিক স্তরপরম্পরা। ১৯৩৩ সালে ২১ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আ পোয়েম অন ফ্রোজেন টাইম এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ থ্রি উইন্টার ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়। তিরিশের দশকে তিনি নিজেকে যুক্ত রাখেন ক্যাটাসট্রোফিস্ট স্কুলের কবিদের সঙ্গে। ক্যাটাসট্রোফিজমের মানে হলো, চূড়ান্ত মূল্যবোধের সমূলে ধ্বংসসাধন, বিশেষত সেই মূল্যবোধ যা একটি এগিয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয়। তবে তা কিছু নির্দিষ্ট মূল্যবোধকে, কিছু ঐতিহাসিক রূপায়ণকে দূর করতে চায় বলে দাবি করেছিল, মোটেই  মানবতাকে নয়। মিউশ এখানেই আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর পারিতে বৃত্তি নিয়ে এক বছর কাটান। সাহিত্য নিয়ে না পড়ে আইন নিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি তিনি কী হতে চান তা আগেই প্রকাশিত হয়ে যেত তাহলে নিজের কাছেই পরাজিত হয়ে যেতেন যেন। তবে বৃত্তিটা  ছিল আইন নয়, বরং সাহিত্যের ওপর রাষ্ট্রীয় বৃত্তি। সেখানে তিনি তাঁর দূরবর্তী সম্পর্কের ভাই অস্কার মিউশের দেখা পান, যিনি ছিলেন ফরাসি কবি, এবং মিউশ তাঁর দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন সে-সময়। সে-সময়ের তাঁর নিজ চিন্তা-বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সকল তরুণ কবির মতো আমিও বিশ্বাস করতাম যে, সমসাময়িক শিল্পে কিছু গোপন জায়গা আছে, আর আছে এক সুতো যা একজনকে গোলকধাঁধার ভেতরে নিয়ে যায়।’ অস্কার মিউশ তাঁর একটি কবিতা বিখ্যাত এক রিভিয়্যু পত্রিকায় প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে মিউশ স্বীকারও করেছেন, তাঁর ওপর অস্কার মিউশের প্রভাব ছিল তুমুল, বিশেষত শৈলীর দিক থেকে। প্যারিস রিভিয়্যুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ-প্রভাবের বিষয়ে তিনি জানিয়েছিলেন : ‘বস্ত্তত আইনস্টাইনেরও আগে, তিনি স্বতঃলব্ধভাবে, আপেক্ষিকতার এক মহাবিশ্বতত্ত্বকে অনুধাবন করতেন – এক মুহূর্ত যখন সেখানে কোনো স্থান নেই, পদার্থ নেই, কাল নেই; এই তিনটিই, তাঁর কল্পনাশক্তিতে, এক গতিময়তার সাথে সম্পর্কিত ছিল।’

ভিলনিয়াসে সোভিয়েত শাসনের সময় মিউশ তাঁর যৌবনের শহর থেকে পালিয়ে নাৎসি-অধিকৃত ওয়ারশতে চলে যান। সেখানে তিনি সমাজতান্ত্রিক প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেন। সে-সময়ে তাঁর নাৎসিবিরোধী কবিতা সংকলন অজেয় কবিতা আন্ডারগ্রাউন্ড প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি লেখেন ‘জগৎ’ এবং ‘ভয়েসেস অব পুয়োর পিপল’। ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হলে পোল্যান্ড নাৎসি জার্মানির ও রাশিয়ার অধিকারে চলে যায়, মিউশ প্রতিরোধ আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন। এ-সময়ে কবিতাবলি নামে এক সংকলন জে. সিরাক ছদ্মনামে প্রকাশ করেন তিনি। ওয়ারশর পতনের পর তিনি ক্রাকাওয়ের বাইরে কিছুদিনের জন্য অবস্থান করেন। ১৯৪৫ সালে স্টেট পাবলিশিং হাউস তাঁর কবিতা সংকলন রেসকিয়্যু প্রকাশ করে। ওয়ারশতে প্রতিরোধ কার্যক্রমের সময়টাতে  নিজের কবিতাতে তাঁর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, কবি হিসেবে তখন তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, কবিতা আগের মতো আর পৃথিবীকে  মেলে ধরতে পারে না, আর এর জন্য দরকার ভিন্ন পথের। অর্থাৎ কবিতা লিখলেও তাকে হতে হবে অন্যরকম। এখানে অবস্থানকালীন টি.এস. এলিয়টের কবিতারও অনুবাদ করেন তিনি। দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডকে তাঁর মনে হয়েছিল বিপর্যয়কর এবং গভীরভাবে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপাত্মক।

যুদ্ধের পর মিউশের জীবনে অন্য পরিবর্তন আসে।  মিউশ পোলিশ কমিউনিস্ট সরকারের কালচারাল অ্যাটাশে হিসেবে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে কাজ করেছিলেন এক বছরের মতো। যখন তাঁকে পোল্যান্ডে ফিরে আসার জন্য বলা হয়, তখন তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। ১৯৫১ সালে তিনি পোলিশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। এই ফিরে না-যাওয়া বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি জানতেন তাঁর দেশ এক সাম্রাজ্যের প্রদেশ হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আরো বলেন, নতুন সাম্যবাদী বিশ্বাসকে তিনি অস্বীকার করেছেন কারণ মিথ্যাই ছিল তার প্রধান অনুজ্ঞা, আর সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বস্ত্তত ছিল মিথ্যারই আরেক নাম। কমিউনিস্ট শাসনে তাঁর মুখোমুখিতা ও অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেন তাঁর দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ড বইয়ে। পাশ্চাত্যে এটিকে সর্বগ্রাসী মানসিকতার এক মৌলিক ও অসাধারণ গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সে-সময়ে পারি থেকে তাঁর কবিতা সংকলনও প্রকাশিত হয়। পারিতে তিনি অনুবাদক ও ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ করেন। ১০ বছরের ফ্রান্স-অবস্থান খুব সুখকর হয়নি বিশেষত সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিচারে। এই সময়ে তাঁর দুটি উপন্যাস – সিজার অব পাওয়ার, দ্য ইসা ভ্যালি আর বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ড প্রকাশিত হয়। দ্য সিজার অব পাওয়ার হলো তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ক্ষমতা যখন বদলায় তখন কীভাবে বাঁচতে হয়, এটিই এই উপন্যাসের ভাব। প্রকৃতপক্ষে দ্য সিজার অব পাওয়ার আর দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ডের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। দুটোতেই বর্ণনাতীত যন্ত্রণা এবং পোল্যান্ডের দুর্ভাগ্যের অবস্থাকে দেখানো হয়েছে। এই বইয়ে মিউশ আহবান করেছেন পশ্চিমকে পূর্ব ইয়োরোপকে ঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য। দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ডে তিনি দেখিয়েছেন, সর্বগ্রাসী শাসনামলে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের নৈতিক স্খলন। এ-গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, যখনই তিনি জীবনের সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকেন, ঠিক তখনই একটি ইমেজ তাঁর কাছে ফিরে ফিরে আসে : ‘চোখের সামনে দেখলাম, সর্বদা একই তরুণী ইহুদি বালিকা। সম্ভবত সে ছিল বিশ বছর বয়সী। তার শরীর ছিল পূর্ণ, চমকপ্রদ, উল্লাসময়। সে রাস্তায় দৌড়াচ্ছিল, তার হাত ওপরে তোলা, বুক সামনের দিকে। সে তীব্রভাবে চিৎকার করে উঠল, ‘না! না! না!’ মৃত্যুর অনিবার্যতা তার বোধের বাইরে – যে-অনিবার্যতা বাইরে থেকে এসেছে, যা তার অপ্রস্ত্তত শরীরের সাথে স্বাভাবিক নয়। চিৎকারের মধ্যেই এসএস গার্ডের স্বয়ংক্রিয় পিস্তলের গুলি তাকে বিদ্ধ করল।’ ১৯৪১-৪৩, এই সময়ে ওয়ারশ গেটোতে প্রায় চার লাখ ইহুদি ধ্বংস হয়। দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ডে মিউশ লিখেছেন যে, ওয়ারশ গেটোর ট্র্যাজেডি নিয়ে, যার একজন চাক্ষুস সাক্ষী ছিলেন তিনি, তাঁর পক্ষে লেখা ছিল এক কঠিন কাজ। ইহুদি নিধনযজ্ঞের এক বছর পর পোলরা ১৯৪৪ সালে ওয়ারশ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শহরকে মুক্ত করার এক সাহসী কিন্তু সর্বনেশে উদ্যোগ গ্রহণ করে। শহরের উপকণ্ঠে  মিউশ ধরা পড়েন। হিটলারের বাহিনী তাঁকে এক অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্পে আটক রাখে। সে-রাতেই এক সাহসী ও কর্তৃত্বপরায়ণ নানের মাধ্যমে তিনি উদ্ধার পান, যে-জার্মান কর্তৃপক্ষের ওপর জোর খাটিয়েছিলেন যে, তিনি মিউশের আন্টি হন। তিনি তাঁর নাম জানতে পারেননি। ৬৩ দিনে ১৮ হাজার সৈন্য ও দুই লাখ বেসামরিক মানুষ মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সুন্দর বারোক শহরের ৮৫ ভাগই ধ্বংস হয়ে গেল। যুদ্ধের সময় এবং  যুদ্ধ-পরবর্তী অনেক কবিতাতেই তিনি গভীর সমবেদনায় যুদ্ধে নিহতদের কথা বলেছেন। যেমন ১৯৪৫ সালে লিখিত ‘উৎসর্গ’ কবিতায় তিনি যা লিখেছেন :

তুমি – যে-তোমাকে আমি বাঁচাতে পারিনি

আমার কথা শোনো।

এই সরল কথাটা বোঝার চেষ্টা করো তুমি,

যেহেতু অন্য কোনোরকম কথাই আমাকে লজ্জা দেবে।

আমি শপথ করে বলছি, আমার মধ্যে কথা দিয়ে কোনো

হাতসাফাই

কোনো চালাকি নেই।

আমি তোমাকে বলছি স্তব্ধতার ভাষায়, যে-ভাষায় কথা বলে

কোনো মেঘ কিংবা গাছ।

 

যা আমাকে শক্তিমান ক’রে তুলেছিলো, কারণ তুমি ছিলে

মারাত্মক।

একটা যুগের বিদায় আর নতুন যুগের সূচনাকে তুমি মিশিয়ে

ফেলেছিলে,

তুমি মিশিয়ে ফেলেছিলে ঘৃণার অনুপ্রেরণার সঙ্গে গীতল সৌন্দর্য,

অন্ধ পশুশক্তির সঙ্গে সুসম্পাদিত আকার।…

 

কাকে বলে কবিতা, যদি তা না-বাঁচায়

দেশ কিংবা মানুষকে?…

 

ওরা কবরগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিতো খুদকুড়ো কিংবা আফিম ফুল

পাখির বেশ ধ’রে  যারা ফিরে আসবে সেইসব মৃতদের খাওয়াতে।

এখানেই আমার এই বই রাখি আমি, তোমার জন্য, যে-তুমি

একদিন বেঁচে ছিলে

যাতে তুমি আর আমাদের হানা না-দাও।

(অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

 

 

তিন

কিন্তু ১৯৬১ সালে, পঞ্চাশ বছর বয়সে, মিউশ আমেরিকায় পাড়ি জমান এবং বার্কলিস্থ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লাভিক ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে অত্যল্প একটি বিভাগের একজন শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও অচিরেই দস্তয়েভস্কি-বিষয়ক কোর্সগুলোর জন্য তাঁর প্রভূত নামধাম হয়ে যায় এবং সেখানে তিনি অনুবাদ, বিশেষত জবিগ্নিয়েভ হেরবের্টের কবিতার অনুবাদ করেন। আমেরিকায়  আত্মজৈবনিক লেখা ন্যাটিভ  রেল্ম : আ সার্চ ফর সেলফ ডেফিনেশন এবং ভিশনস ফ্রম সান ফ্রান্সিসকো বে প্রকাশিত হয়। এই বইগুলোতে মিউশ তাঁর দেশ পোল্যান্ডের সঙ্গে পশ্চিমকে তুলনা করে মতামত তুলে ধরেন। ১৯৭০ সালে তিনি আমেরিকান নাগরিকত্ব পান। ১৯৭৩ সালের আগ পর্যন্ত তাঁর নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। ১৯৭৮ সালে তাঁর সংকলন বেলস ইন উইন্টার প্রকাশিত হয়, আর ১৯৮০ সালে তিনি পেয়ে যান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। পোল সাহিত্যিকদের মধ্যে নোবেলপ্রাপ্তিতে তিনি হলেন পঞ্চম। ১৯৮১ সালে ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনি পোল্যান্ড ভ্রমণ করেন আর ১৯৯২ সালে বায়ান্ন বছর পর তাঁর নিজ দেশ লিথুয়ানিয়ায় পুনরায় যান। ৫২ বছরের মধ্যে আবার লিথুয়ানিয়ায় যাওয়া সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানান, তা ছিল এক ভ্রাম্যমাণ অভিজ্ঞতা। সেখানে তাঁকে দেশের ছেলের মতোই বরণ করে নেওয়া হয়, সাম্মানিক ডিগ্রিও দেওয়া হয়। যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সেখানেও তিনি যান কিন্তু সেখানে তখন আর কোনো ঘরবাড়ি অবশিষ্ট ছিল না, ছিল না সেই মানুষগুলোও। ৫২ বছর পর লিথুয়ানিয়ায় গমন উপলক্ষে তিনি লেখেন কবিতা ‘লিথুয়ানিয়া, বায়ান্ন বছর পর’; তিনি লেখেন : ‘আমরা ধন্যবাদ দিই নিজেদের আর পূর্বপুরুষদের নামগুলোকে/ ওক আর তাদের এবড়োখেবড়ো বাকলগুলোর জন্য/ পাইন, আর তাদের সূর্য-ঝলসিত গুঁড়িগুলোর জন্য/ বসন্তকালের বার্চের কুঞ্জবনের পরিষ্কার সবুজ মেঘগুলোর জন্য/ আর সেই পপলারের  হেমন্তের খাঁ খাঁ প্রান্তরের পিলসুজের জন্য।’ লিথুয়ানিয়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, তা ছিল এমন-একটা জায়গা যেখানে তখন ছিল না কোনো রেডিও, টেলিভিশন বা কোনো ছায়াছবি, এরকম একটা ইউরোপীয় প্রাদেশিক স্থানেই তাঁর শৈশবে বেড়ে-ওঠে। এত কিছুর ঘাটতির পরও তিনি বলেছেন, সেখানে ছিল বইয়ের প্রাচুর্য, বিশেষত তাঁর পিতামহের পাঠাগারটি তাঁকে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে ঠাসা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর সব বিখ্যাত বই। পরে যখন তিনি ভিলনিয়াসে বাস করতে লাগলেন, তখন তিনি সিনেমা দেখা শুরু করেন। ভিলনিয়াস হলো এমন এক শহর যা বারেবারে প্রত্যর্পিত হয়েছে তাঁর লেখায়। তিনি বারবার এই শহরের কথা বলেছেন সাহিত্যে। মিউশ যখন পশ্চিমে তখনো তিনি পশ্চিমা পাঠকদের কাছে এ দুই শহরকে পরিচিত করিয়ে দিতে চাইতেন।

যদিও ১৯৬১ সাল থেকে তিনি আমেরিকায় বসবাস করেছেন তবু সেখানে তাঁর কবিতা কমই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু পোল্যান্ডে তিনি ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যদিও কমিউনিস্ট শাসনের সময় একজন দেশত্যাগী হিসেবে তাঁর লেখা প্রচারিত হতো না রাষ্ট্রীয়ভাবে। এর কারণেই তিনি ভেতরে ভেতরে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন – তাঁর বইয়ের অনেক গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড সংস্করণ বের হতো, প্রচারিত হতো তা ততোধিক গোপনে। কিন্তু ১৯৮০ সালে নোবেল পাওয়ার পর কমিউনিস্ট সরকার অনেকটা বাধ্য হলো তাঁর বইয়ের প্রকাশনা করতে। তাঁর কবিতার এক সংকলন বের হলো, যা সরকারিভাবে বিক্রি হয়ে গেল দুই লাখ কপি। পোল্যান্ডে মিউশের জনপ্রিয়তার আরেক প্রমাণ হলো, কমিউনিস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত কমরেডদের স্মরণে যখন পোলিশ শ্রমজীবীরা এক মনুমেন্টের উদ্বোধন করল, সেখানে উৎকীর্ণ করা হলো বাইবেল আর মিউশের এক কবিতা থেকে।

নোবেল পাওয়ার পর তাঁর অনেক কবিতা ও গদ্যের বই প্রকাশিত হয়। স্মর্তব্য যে, কয়েকজন বন্ধুবান্ধব বাদ দিলে তিনিই তাঁর কবিতার প্রধান ইংরেজি-অনুবাদক। তাঁর গদ্য বইয়ের মধ্যে আছে : ভিশন্স ফ্রম সান ফ্রান্সিসকো বে, বিগেনিং উইথ মাই স্ট্রিটস, দ্য ল্যান্ড অব উলরো আর তাঁর চার্লস এলিয়ট নর্টন ভাষণ দ্য উইটনেস অব পোয়েট্রি। ১৯৮৮ সালে মিউশের কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়, যাতে তাঁর আনঅ্যাটেনেবল আর্থ কাব্যগ্রন্থটিও অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে প্রভিন্সেস কাব্যগ্রন্থটিও এতে স্থান পায়। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় বিগেনিং উইথ মাই স্ট্রিট্স : এসেইস অ্যান্ড রিকালেকশনস। ১৯৯৪ সালে বের হয় আ ইয়ার অব দ্য হান্টার আর কাব্যগ্রন্থ ফেসিং দ্য রিভার প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৯ সালে ৮৮ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় কাব্য রোডসাইড ডগ যাতে তাঁর ধ্যান এবং অন্তর্বীক্ষণ স্পষ্টতই প্রতিফলিত। ২০০১ সালে প্রকাশ পায় তাঁর জীবনদৃষ্টি ও অভিজ্ঞতাঋদ্ধ গ্রন্থ মিউশেস আ বি সি। একই বছর আরো প্রকাশিত হয় তাঁর অনুবাদকর্ম আ ট্রিটিস অন পোয়েট্রি যা তাঁর নিজ ভাষায় প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৫৭ সালে। ২০০১ সালে আরো প্রকাশিত হয় প্রবন্ধ সংকলন টু বিগেইন হোয়ার আই অ্যাম : নির্বাচিত প্রবন্ধ। বার্কলিতেই তিনি বেশিরভাগ সময় বসবাস করতেন, আর গ্রীষ্মাবকাশ কাটাতেন ক্রাকাওতে।

 

চার

কবিতা সম্পর্কে তিনি তাঁর বিখ্যাত একটি কবিতায় বলেছেন : The purpose of poetry is to remind us/ how difficult it is to remain just one person,/ for our house is open, there are no keys in the doors,/ and invisible guests come in and out at will।  কীভাবে তাঁর ভেতর লেখার প্রেরণা বা উদ্ভিন্নতা জন্মলাভ করেছিল সে-সম্পর্কে তিনি বলেছেন, স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। কিন্তু তিনি এও বলেছেন, তা মোটেই ছিল না নিজেকে প্রকাশ করার নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। বরং তিনি ষোড়শ শতকের ফরাসি প্লেইয়াদ গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন তখন। তিনি বলেছেন, ‘এটা বলা মোটেই যথার্থ হবে না যে, আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম আমার চারপাশের সাথে দ্বন্দ্বে মেতে উঠতে, চেয়েছিলাম একধরনের ঋণাত্মক মনোভাব গড়ে তুলতে, ফ্লবের যাকে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ঘৃণা হিসেবে উত্থাপন করেছিল। আমি চেয়েছিলাম এক ধরনের ভিন্ন স্টাইল রপ্ত করতে, জীবনের ভিন্নপথে চলতে।’ এ-কারণেই আমরা দেখি, তাঁর কবিতায় জীবন ও জগতের অন্বয়বদ্ধ সিমবিয়োসিস বা অন্যোন্যজীবিতা, যা ব্যাপক আয়তন এবং ভিন্নতর বাচন নিয়ে আবির্ভূত হয়। তাঁর কবিতাতে উপস্থিতি অনুপস্থিতির সঙ্গে অংশগ্রহণের কর্তৃত্ব করে, যা কবিতাকে খেয়ালের মতো শিথিল অথচ কূলপ্লাবী করে দেয়। বহুস্বরিক তাঁর কবিতা, বলার জন্য তা সবসময় উন্মুখ এবং তা বলেও যায় অবলীলাক্রমে। তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলা হয় : তিনি পাঠককে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেন যেখানে একজন, সময়সম্পর্কিত কবির নিজস্ব অন্বয়ের সূত্রে, দ্যাখে, সত্তার মাঝ দিয়ে উঠে আসা সত্তাকে। একটি কবিতায় তিনি বলেছেন এই বলার অভীপ্সা আর আকাঙ্ক্ষার কথা :

তুমি তো জানো কীভাবে আমি

শব্দ দিয়ে পৌঁছাতে চেষ্টা করি

কী যে অনিবার্য

আর কীভাবেই না আমি ব্যর্থ হই।

কবিতা লেখা এক অনিঃশেষ যাত্রা এবং প্রতিবারই কবি মনে করেন, নিজেকে তিনি নিঃশেষ করে দেবেন পরবর্তী লেখায়; কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত অনিঃশেষিতই থেকে যায়। একটি কবিতা, ‘স্পাইডারে’, তিনি রূপকের আবরণে এও বলেন যে, কবিতা হলো সময়ের                 সীমান্তরেখার ওপারে পাড়ি দেওয়ার জন্য অতি ক্ষুদ্র এক নৌকা নির্মাণ করা। পেরোনো বা পাড়ি দেওয়া, এটা হলো সেই গুপ্ত ও সুপ্ত সন্ধান যা চলে নিরন্তর কবির ভেতরে। অর্থাৎ অধরা কবিতার প্রতি অন্ধভাবে ছুটে চলা। নিজেকে তিনি হারমেটিক কবি বলেছেন। তিনি মনে করতেন, তিনি লেখেন সেই আদর্শ ব্যক্তির জন্য যার আছে এক অপর সত্তা। নিজেকে তিনি অধিক প্রবেশযোগ্য মনে করতেন না। তাঁর মাপকাঠি ছিল, কবিতা ঠিক যথার্থ ও প্রয়োজনীয় হয় কি না। গন্ডগোল ও নঞর্থকতার বিরুদ্ধে বাস্তবতাকে তিনি কতটুকু আঙ্গিকায়িত করতে পারলেন, তা-ই ছিল তাঁর ভাবনার জায়গা। তিনি বলেছেন, তাঁর কবিতা সবসময়ই সুপরিসর ফর্মের জন্য এক অন্বেষণ। মিউশ মনে করতেন, বস্ত্তপৃথিবীকে ব্যবচ্ছেদ না করে বরং অনুভব বা ধ্যান করা উত্তম। বস্ত্তর প্রতি এই নিরাসক্ত অভিপ্রায় ওলন্দাজ স্টিল লাইফে পাওয়া যায় এবং শোফেনহাউয়ার একেই বিবেচনা করেছেন শিল্পের সর্বোচ্চ ফর্ম। মিউশও বলেছেন, শিল্পের ভালো একটি সংজ্ঞার্থ হলো এই নিরাসক্ত ধ্যান। দ্য উইটনেস অব পোয়েট্রিতে কবিতাকে তিনি বলেছেন, ‘বাস্তবের সংরাগিত পশ্চাদ্ধাবন’ যা শেষাবধি দূরাবগাহই থেকে যায়। এর সঙ্গে মিলে যায় ভার্জিনিয়া উল্ফের কথা, শিল্প হলো বুনোহাঁসের পশ্চাদ্ধাবন। পুঁজিবাদী পশ্চিম আর সাম্যবাদী পুবের কবিতার ভিন্নতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, পশ্চিমের কবিতা বিবিক্ত, তা অন্তর্বীক্ষণের অন্তর্দাহে ঠাসা; অন্যদিকে পুবের কবিতা তা নয় মোটেই, কারণ কবিকে সেখানে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, তৃপ্ত করতে হয় একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতাধরকে। তিনি শিল্পের জন্য শিল্প – এই গোষ্ঠীর লেখকদের সমালোচনা করেছেন। তবে কবি হিসেবে তিনি শেষাবধি বোধহয় তৃপ্তই ছিলেন। ‘রিপোর্ট’ কবিতার প্রথমেই ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি জানান দেন, ‘হে মহান, তোমার ইচ্ছায় আমি কবি হয়ে জন্মেছি আর এখন আমার সময় রিপোর্ট দাখিল করার।’ দ্য হিস্টোরি অব পোলিশ লিটারেচারে তিনি বলেছেন, কবিতা লেখার কাজ হলো এক বিশ্বাসের কাজ। আমরা জানি তাঁর ক্যাথেলিক বাল্যকাল। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রাচ্য কি পাশ্চাত্য, সমসাময়িক সমাজের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো নৈতিক ভিত্তির অভাব। দ্য ল্যান্ড অব উলরোতে তিনি বলেছেন, আধুনিক মানুষের কেবল আছে মাথার ওপরে নক্ষত্রময় আকাশ আর ভেতরে নৈতিক আইনহীনতা। নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিয়্যুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, তিনি সেই উত্তর খোঁজ করছেন, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের অভ্যন্তরীণ ভাঙন থেকে উঠে আসে। সমালোচকেরাও বলেছেন, নৈতিকতায়, নান্দনিকতায়, মূল্যবোধে রোপিত সাহিত্যই তাঁর অন্বিষ্ট। এভাবেই নষ্ট পৃথিবীতে নষ্ট-হয়ে-যাওয়া আধ্যাত্মিকতাকে জাগাতে চাইলেন মিউশ। এর সঙ্গে সহজেই আমরা মিল খুঁজে পাই এলিয়টের। এলিয়টও রীতিমতো দীক্ষা নিয়েছিলেন ক্যাথেলিসিজমে, লিখেছিলেন দ্য আইডিয়া অব অ্যা ক্রিশ্চিয়ান সোসাইটির মতো বই। মানবতাবাদের পরিবর্তে তিনি ক্যাথেলিক ধর্মমতেই বিশ্বাস স্থাপন করে বসে থাকেন। প্রথম জীবনে ঈষৎ হেলে-থাকা নাস্তিক-মার্কসবাদী এবং শেষমেশ রোমান ক্যাথেলিকবাদে আত্মসমর্পণকারী ও আশ্রয়ী চেসোয়াভ মিউশ কি এই ‘বাস্তব’ বা ‘সত্য’ বলতে ঈশ্বরকেই বুঝিয়েছেন? প্রকৃতপক্ষে তা-ই : Religion used to be the opium of the people. To those suffering humiliation, pain, illness, and opium of the people is the belief in nothingness after death, the huge solace, the huge comfort of thinking that for our betrayals, our greed, our cowardice, our murders, we are not going to be judged serfdom, religion promised the reward of an afterlife. But now, we are witnessing a transformation, a true.

 

পাঁচ

অনেকে তাঁকে একাধারে সংশয়বাদী আর সাধু বলে অভিহিত করেছেন। ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট, ৯৩ বছর বয়সে কাকাওতে তিনি মারা যান। হাজার হাজার মানুষ তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শামিল হয়েছিল। পবিত্র ঘটনা হই-হুল্লোড়ে পরিণত হয়েছিল শেষাবধি। কয়েক দিন আগে, উগ্র-জাতীয়তাবাদী ক্যাথেলিকরা অনুষ্ঠানে বিক্ষোভ করে তাদের প্রতিবাদ জানাবে বলে ভয় দেখিয়েছিল। কারণ তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার জন্য এই নোবেল লরিয়েট না ছিলেন যথেষ্ট পোলিশ, না ছিলেন যথেষ্ট ক্যাথেলিক। শুনলে মিউশ নিঃসন্দেহে আনন্দ পেতেন কারণ একদা তিনিই বলেছিলেন যে, ‘একজন মানুষের অনিবার্য দ্বন্দ্বগুলোই তার শুদ্ধিস্থল।’ বলা সংগত যে, তাঁর মধ্যে এই দ্বৈততা ছিল প্রণিধানযোগ্য। তিনি ক্যাথেলিক, কমিউনিস্ট, নস্টিক, মানিকীয়পন্থী, সংশয়বাদী যিনি বলেছিলেন, ‘আমার সব বৌদ্ধিক তাড়নাই ধর্মীয়।’ সমালোচকেরা বলেছেন, মিউশ বাম বা ডান, কারো কাছেই বন্ধুত্বময় ছিলেন না। দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ড লেখার পরও যুক্তরাষ্ট্র প্রাক্তন কমিউনিস্ট সংযুক্তির কারণে তাঁকে সন্দেহ করত। ইউরোপীয় বামপন্থীরা তাঁকে বিশ্বাসঘাতক ভাবত। পাবলো নেরুদা এক লেখায় ‘পালিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে’ তাঁকে ভৎর্সনা করেছিলেন।

তবে যা-ই হোক, মিউশ বিংশ শতাব্দীর এক গুরুত্বপূর্ণ কবি, যেমনটা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন আরেক দেশত্যাগী কবি জোসেফ ব্রদস্কি : ‘আমাদের সময়ের অন্যতম এক মহৎ কবি, সম্ভবত মহত্তম।’

 

‘আমি মনে করি না যে, নোবেল পুরস্কার আমাকে বা আমার কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে’ : চেসোয়াভ মিউশের সাক্ষাৎকার‑

চেসোয়াভ মিউশের এ-সাক্ষাৎকার নেন রবার্ট ফাগেন। এটি দ্য প্যারিস রিভিয়্যুর আর্ট অ্যান্ড পোয়েট্রির ৭০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

সাক্ষাৎকারটি প্রাথমিকভাবে বার্কলিতে মিউশের বাড়িতে গ্রহণ করা হয়, যেখানে তিনি স্ত্রী ক্যারোল এবং টিনি নামে একটি বিড়ালসহ বাস করতেন। বাকি অংশগুলো নিউইয়র্কের ৯২ স্ট্রিট YMHA-র উন্টারবার্গ কবিতা কেন্দ্রে সরাসরি অনুষ্ঠানের আগে রেকর্ড করা হয়। বার্কলির প্রথম কথোপকথনটি বিরতিহীনভাবে চার ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত হয়, যতক্ষণ না কবি তাঁর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু দরদি স্বরে তাঁর নিঃশেষিত সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘এখন ছয়টা বাজে, একটু ভোদকা খাওয়া যায়?’

প্রশ্ন : সম্প্রতি, বায়ান্ন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো লিথুয়ানিয়ায় গেলেন। কেমন ছিল এই ভ্রমণ?

মিউশ : এটা ছিল এক ভ্রাম্যমাণ অভিজ্ঞতা। দেশের সন্তান হিসেবে সেখানে আমাকে আন্তরিকভাবে বরণ করা হয়েছিল। কাউনাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে সাম্মানিক ডিগ্রি প্রদান করা হয়। তারপর আমি আমার কাউন্টি এলাকা পরিদর্শন করি। সেখানে আমাকে কৃষকদের পোশাকে সীমান্ত প্রতিনিধিদল থেকে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়, যা ছিল ওই অঞ্চলের এক বিশাল ঘটনা। আমাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং যেখানে একদা আমার ব্যাপ্টাইজম হয়েছিল সেই কাঠের গির্জায় এক জনসমাবেশে আমি অংশগ্রহণ করি। কিন্তু অনেক গ্রাম হারিয়ে গেছে। মনে হয় এলাকার অসংখ্য অধিবাসী সাইবেরিয়ায় নিয়োজিত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সেখানে লাল ইটের ছোট ছোট পরিচ্ছন্ন শহর রয়েছে। যেখানে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম, সেখানেও আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আর কোনো ঘরবাড়ি অবশিষ্ট নেই এখন, শুধু বিগত দিনের সৌন্দর্যকে নিয়ে একটি পার্ক রয়েছে, আর নদীটি একেবারেই দূষিত।

প্রশ্ন : লিথুয়ানিয়ায় বেড়ে ওঠার সময় কী ধরনের সাহিত্য আপনার কল্পনাশক্তিকে রূপায়িত করেছিল?

মিউশ : কল্পনা করুন এমন এক জগৎ যেখানে ছিল না কোনো রেডিও, টেলিভিশন বা ফিল্ম। এটাই ছিল ইউরোপের একটি প্রাদেশিক অংশে আমার শৈশব। সে-সময়ে এখনকার তুলনায় বইয়ের প্রভাব ছিল অনেক বেশি, আর আমি আমার ঠাকুরদার পাঠাগার থেকে উপকৃতও হয়েছিলাম খুব, যা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর নানা বইয়ে ভর্তি।

অ্যাটলাসটি এমনই পুরনো ছিল যে, আফ্রিকার ঠিক মাঝখানটাতে এক বিশাল সাদা দাগ পড়ে গিয়েছিল। সময়ের রহস্য মার্সেল প্রুস্তের হাত ধরে নয়, বরং জেমস ফেনিমোর কুপারের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল আমার কাছে। সে-সময়ে ফেনিমোর কুপারের মতো লেখকেরা সংক্ষেপিত এবং কখনোবা ঈষৎ পরিবর্তিত শিশুতোষ সংস্করণের জন্য খুব জনপ্রিয় ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হরিণহত্যাকারী নামক মহাকাব্যের সব খন্ডই একটি খন্ডে কমিয়ে আনা হয়েছিল। এখনো এ-বই আমাকে আশ্চর্যজনকভাবে বিমোহিত করে, কারণ এটা সত্যি সত্যিই এক তরুণ হরিণ শিকারির কাহিনি, যে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিবর্তিত করে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠেছিল, আর তারপর আস্তে-ধীরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে গিয়ে বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। তার ট্র্যাজেডি ছিল যে, সে নির্বাসিত ছিল কিন্তু সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারেনি। আমি টমাস মেনক রাইডের মতো লেখকদের লেখাও পড়েছি, যাঁদের নাম আমেরিকায় শোনা যেত না। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ,  যিনি আমেরিকায় একজন শিকারি ও শিক্ষক হিসেবে কিছুকাল বাস করেছিলেন, আর তারপর লন্ডনে বাস করার সময় তিনি শিশুদের লেখক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বইগুলো সকল প্রকার লতাগুল্ম, প্রাণী আর পাখিদের বর্ণনায় ভর্তি, এবং প্রতিটিরই নিজ নিজ লাতিন নামে পরিচয় দেওয়া থাকত। সে-সময়টা ছিল আমার জন্য খুবই সংকটময়, কারণ আমি চেয়েছিলাম একজন পক্ষিবিশারদ হতে। আমি লাতিন নামসহ পাখিদের নাম জানতাম। আমি কার্ল মে-র লেখাও  পড়েছি, যিনি সারা ইউরোপে ছোটো বালকদের খুব প্রিয় ছিলেন, এবং ইউরোপের সব ভাষায় তিনি অনূদিত হয়েছিলেন, কিন্তু আমেরিকায় তিনি ছিলেন অজানা। তিনি ছিলেন একজন জার্মান, যিনি দেনাদারের কারাগারে বসে অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস লিখতেন।

পরবর্তীকালে ভিলনিয়াসে বাস করার সময় আমি চলচ্চিত্র  দেখেছি। এ বিষয়ে আমার শিক্ষা ছিল সমসাময়িক শিশুদের মতো। ম্যারি পিকফোর্ড, লিলিয়ান গিশ, বাসটার কিটন, চার্লি চ্যাপলিন এবং পরে গ্রেটা গার্বো, সবাই আমাকে মুগ্ধ করত। শৈশবের পাঠ আর অধিক পরিণতির পাঠ শুরু করার মধ্যে পার্থক্য করা আমার জন্য খুবই কঠিন। কিন্তু আমার গ্রামীণ এবং প্রাদেশিক শৈশবকালের জন্য এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর পাঠাগারের ওই ধরনের বইগুলোর জন্য, আমি সে-বইগুলোর মাধ্যমে প্রকৃতির জগতে ঢুকতে পেরেছিলাম, বিশেষত, অডুবোন, আলেকজান্ডার উইলসন প্রমুখের অঙ্কন এবং রঙিন উডকাটের জন্য। এই বইগুলোই প্রকৃতিবিষয়ক আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে দিয়েছিল।

প্রশ্ন : প্রকৃতি কীভাবে আপনাকে আকৃষ্ট করল?

মিউশ : আচ্ছা, আমার মহান নায়ক ছিলেন লিনেয়াস; তিনি প্রাণীর নামকরণের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন এবং এভাবে তিনি প্রকৃতিকে অধিকার করেছিলেন, এ-ধরনের চিন্তা আমার ভালো লেগেছিল। প্রকৃতির প্রতি আমার যে-বিস্ময় তা সৃষ্টি হয়েছিল বৃহদার্থে নাম ও নামকরণের প্রতি আমার আগ্রহের কারণে। কিন্তু আমি একজন শিকারিও ছিলাম। পাখি এবং প্রাণী হত্যার জন্য এক্ষণে আমি গভীরভাবে লজ্জিত। এখন আর  আমি এই কাজ কখনোই করব না, কিন্তু সে-সময়ে আমি তা উপভোগ করতাম। এমনকি আমি একজন ট্যাকসিডারমিস্টও ছিলাম। উচ্চ বিদ্যালয়ে, যখন আমার বয়স ধরতে গেলে তেরো কি চোদ্দো বছর, আমি প্রাকৃতিক নির্বাচন-সংক্রান্ত ডারউইনের তত্ত্বগুলো আবিষ্কার করলাম। আমাদের  প্রকৃতিবিদদের ক্লাবে ঢোকার আমার সুযোগ হলো এবং আমি সেখানে ডারউইনের ওপর বক্তৃতাও করলাম। কিন্তু সে-সময়ে, যদিও আমাদের ইশকুলটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় ইশকুল, তবু পাদ্রিরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সুতরাং একদিকে আমি ধর্ম, গির্জার ইতিহাস, হঠবাদ আর দোষস্বীকৃতি শিখছিলাম; আর অন্যদিকে বিজ্ঞানও শিখছিলাম যা মূলত ধর্মকে দুর্বল করত। ইত্যবসরে আমি ডারউইনবাদ থেকে সরে এলাম কারণ তা ছিল নিষ্ঠুর, যদিও প্রথমে তাকে আমি গ্রহণ করেছিলাম। আমার মতে, প্রকৃতি চিত্রকলায় অনেক-অনেক সুন্দর।

প্রশ্ন : প্রকৃতি বিষয়ে একজন প্রকৃতিবিদ আর কবির উপলব্ধির মধ্যে কোনো সংযোগ কি করা যায়?

মিউশ : ডেভিড ওয়াগোনার ‘আমেরিকান পক্ষীবিজ্ঞানের লেখক এক পাখির ছবি অাঁকেন যা এখন বিলুপ্ত’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন। এটি আমেরিকার একজন প্রধান পক্ষিতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার উইলসনকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা, যিনি একটি কাঠঠুকরাকে গুলি করে আহত করেন এবং তাকে রেখে দেন ছবি অাঁকার জন্য, কারণ এটা ছিল তাঁর কাছে এক নতুন নমুনা। পাখিটি তাঁর বাড়িতে ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছিল। উইলসন ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, তাঁকে পাখি মারতে হয় যেন তারা বইয়ের পৃষ্ঠায় বেঁচে থাকতে পারে। এটি একটি নাটকীয় কবিতা। সুতরাং বিজ্ঞান ও প্রকৃতির সম্পর্ক, এবং আমি মনেও করি শিল্প ও প্রকৃতির সম্পর্ক হলো বিজ্ঞানী এবং শিল্পী – দুইয়ের  একধরনের মনের সহমিলন এইভাবে যে, তাঁদের উভয়েরই জগৎকে অধিকার করার আবেগ-উদ্দীপনা থাকতে হবে। ধর্মীয় কল্পনাশক্তির ক্ষয় দেখে আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, কারণ বিজ্ঞানের অভিঘাত। এটা আমাদের সময়ের দরকারি এক সমস্যার গভীর শিকড়ে যায়, তাহলো, ধর্মীয় সম্পর্ক বিষয়ে সমসাময়িক মানুষের অসামর্থ্য। আমি টমাস মারটনের দ্বারা  প্রভাবিতও হয়েছি, যার সঙ্গে অনেক বছর ধরে আমার পত্র-যোগাযোগ হয়েছিল। আমরা প্রায়শই ধর্ম এবং প্রকৃতি নিয়ে আলাপ করতাম। প্রকৃতি-বিষয়ে আশাবাদী একজন হিসেবে এবং মোটাদাগে আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গির জন্য আমি তাঁকে ভৎর্সনা করতাম।

প্রশ্ন : সুতরাং ক্যাথেলিক বিশ্বাস, যাতে আপনি বড়ো হয়েছেন, তা বিজ্ঞানের অভিঘাতকে বাতিল করে?

মিউশ : ও হ্যাঁ। কিন্তু সমস্যা হলো, বিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় কবিতা লেখা খুবই কঠিন। আমরা বৃহত্তরভাবে এক উত্তর-ধার্মিকতার জগতে বসবাস করছি। বর্তমান পোপের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, তিনি আমার কিছু কাজের, বিশেষত, ‘পদ্যে ছয়টি ভাষণে’র ওপর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আপনি এক কদম সামনে যান তো আর এক কদম পেছনে। আমি বলেছিলাম, পবিত্র পিতা, বিংশ শতাব্দীতে একজন আলাদাভাবে কীভাবে ধর্মীয় কবিতা লিখতে পারে?

প্রশ্ন : আর তা শুনে পোপ কী করলেন?

মিউশ : তিনি হাসলেন।

প্রশ্ন : আপনার দ্য ল্যান্ড অব উলরোতে আপনি এ সমস্ত সমস্যা আর আপনার ওপর আপনার বড়ো কাকাতো ভাই অস্কার মিউশের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। আপনার কাজে তাঁর প্রভাব কতটুকু ছিল?

মিউশ : স্টাইলের বিবেচনায় আমি সাবধান ছিলাম যে তাঁর প্রভাব মারাত্মক। তাঁর শৈলী ছিল উত্তর-প্রতীকীবাদী, যার কিছু কিছু আমি মনে করতাম সে-সময় অনুকরণ করা অনুচিত। কিন্তু তাঁর মরমি লেখাগুলো – ‘দ্য এপিস্টল টু স্টোরজ’ এবং ‘দ্য আর্স মাগনা’, যেখানে তিনি বলেছেন, জগৎ অজড় এবং জড় আলোর রূপান্তরণে সৃষ্ট – আমার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আইনস্টাইনেরও আগে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধারণা করেছিলেন এক আপেক্ষিকতার বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্বে – এক মুহূর্ত যখন কোনো স্থান নেই, বস্ত্ত নেই, কাল নেই; তাঁর কল্পনায় এই তিনটি একই আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ।

প্রশ্ন : আপনি একসময় আইনস্টাইনকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখেছিলেন।

মিউশ : আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার জানাশোনা ছিল। প্রকৃতপক্ষে বলা যায়, আমি তাঁকে পূজা করতাম। আমার কাকাতো ভাই অস্কার মিউশ বিশ্বাস করতেন যে, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মানুষের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে – বিজ্ঞান, ধর্ম এবং শিল্পের মধ্যে ঐকতান, পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আইনস্টাইনের আবিষ্কারের সদর্থক ফলাফল ছিল নিউটনীয় স্থানকাল অসীম-সংক্রান্ত ধারণাকে বাতিলকরণ এবং স্থান ও কালের আপেক্ষিকতার অবতারণা, যা মহাবিশ্বতত্ত্ব এবং বিগ ব্যাং ধারণার ভিত্তিস্বরূপ। আমি আইনস্টাইনকে গভীর শ্রদ্ধা করতাম। আর এ-কারণেই তাঁকে নিয়ে একটি কবিতা লিখি। ওই সময়ে তিনিও একমত হয়েছিলেন যে, পারমাণবিক বোমার কারণে বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার পথেই অগ্রসর হচ্ছে, আর এর একমাত্র সমাধান হলো অস্ত্রশস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এক বিশ্ব সরকার গঠন করা। ১৯৪৮ সালে তিনি এই ব্যাপারে তাড়িত হয়ে একটি লেখা লেখেন এবং তা পোল্যান্ডের রোক্লাউয়ে  বুদ্ধিজীবীদের বিশ্ব কংগ্রেসে পাঠিয়ে দেন। কংগ্রেস ছিল স্টালিনের সামরিকীকরণের ঠিক একটা ফ্রন্ট, আর রাশিয়া তা পাঠ করতে আপত্তি জানাল। ঠিক এই সময়ের দিকে আমি আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পোল্যান্ডে ফিরে যাব, নাকি বিদেশে থেকে যাব। তিনি মনে করতেন, আমার দেশে ফিরে যাওয়া উচিত, আর এ-ব্যাপারে তিনি খুব অকপট ছিলেন।

প্রশ্ন : তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনাটা কেমন ছিল?

মিউশ : ওয়াশিংটনে পোলিশ দূতাবাসে অ্যাটাশে হিসেবে আমি তখন কাজ করছিলাম। পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব, নাকি ছিন্ন করব – এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য সে-সময়টা আমার জন্য ছিল এক কঠিন সময়। আইনস্টাইনও আমেরিকায় নির্বাসনে ছিলেন, আর একজন বিশারদ-ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর সঙ্গ আমি কামনা করেছিলাম। একদিন নিউইয়র্ক থেকে সরাসরি ওয়াশিংটন না গিয়ে আমি গাড়ি ঘুরিয়ে প্রিন্সটন চলে এলাম। অবশ্যই আমি জানতাম যে, আইনস্টাইন সেখানে বসবাস করছেন। আমার চরিত্রের ব্যঙ্গাত্মকময়তা সত্ত্বেও আমার প্রকৃতি কাউকে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভক্তি করতে চাইত। আইনস্টাইনের সাদা চুল, তাঁর ঝরনা             কলম-আটকানো ধূসর সুয়েট শার্ট, তাঁর নরম হাত এবং কণ্ঠস্বর – পিতৃসুলভ ও দিশারীময় এক ব্যক্তিত্বের প্রতি এই সবকিছু আমাকে আকর্ষণ করল। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন মুগ্ধকর ও উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ। তিনি আমার অভিবাসী হওয়ার ব্যাপারটিতে আপত্তি জানালেন। আবেগী পর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, তুমি তোমার দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করো না; একজন কবির তাঁর দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা উচিত। আমি জানি এটা কঠিন, তবু এগুলোকে বদলানো দরকার। এভাবে তারা বেশিদিন চলতে পারবে না। তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, এ-শাসনের অবসান হবে। একজন মানবতাবাদী হিসেবে তিনি মনে করতেন যে,  মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী, যদিও আমার প্রজন্মে দেখা গেছে, মানুষ আসুরিক খেলায়  অতিমত্ত। তারপর আমি তাঁর মার্সার স্ট্রিটের বাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা অসারভাবে গাড়ি চালিয়ে কোথাও চলে গেলাম। সর্বোত্তম প্রজ্ঞার জন্য আমরা আকুল ছিলাম যারপরনাই, কিন্তু অবশেষে আমরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখলাম।

প্রশ্ন : কখন প্রথম ভাবলেন যে লেখক হবেন?

মিউশ : আমি যখন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি তখন থেকে আমি লেখা শুরু করি, যদিও তাতে ছিল না নিজেকে প্রকাশ করার কোনো প্রচেষ্টা। তা ছিল ফর্মের অনুশীলন, আর আমার ধারণা এই যে, আমি ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসি লা প্লেইয়াদ ঘরানার কবিগোষ্ঠী যথা জোয়াশিম দু বেল্লা, রেমি বেলিউ, পিয়ারে দ রসাঁ প্রমুখের  দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম, যাঁদের কবিতা আমি পড়েছিলাম ফরাসি টেক্সট বইয়ে। বলা যথার্থ হবে না যে, আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। আমি আসলে আমার পরিপার্শেবর সঙ্গে দ্বন্দ্বে মেতে উঠতে চেয়েছিলাম। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, ফ্লবের যাকে বলেছেন বুর্জোয়াদের প্রতি ঘৃণা, আমি একটি স্বতন্ত্র শৈলী চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম ভিন্ন জীবনযাপনের পথ।

প্রশ্ন : ভিলনিয়াস ছিল আপনার যৌবনের শহর, যা বারংবার আপনার লেখায় ফিরে আসে।

মিউশ : এর ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল। একটি প্রাদেশিক শহরে বেড়ে ওঠার অনেক সুবিধা আমি দেখি। এটা একধরনের ভিন্ন, সম্ভবত ভালো পরিপ্রেক্ষিত দেয়। যখন আমি বাইরে থাকি, তখন  ভিলনিয়াস এবং লিথুয়ানিয়াকে পশ্চিমা পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়, যা কঠিন কাজ, কারণ শহরটি এই শতাব্দীতে তেরোবার হাতবদল হয়েছে। তার নানা জাতীয়তা, গোষ্ঠী, ভাষা নিয়ে তা সারজেভোর মতো। বসনিয়ায় যা ঘটছে তাতে আমি গভীরভাবে তাড়িত হচ্ছি, কারণ আমি এতসব জাতিগত সংঘর্ষ বুঝতে পারি।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লেখা কবিতায় ইতিহাস-বিষয়ে আপনার অতি কম আগ্রহ দেখা যায়।

মিউশ : হ্যাঁ, নিশ্চয়। পোল্যান্ডের ঐক্যের সময়টাতে, যখন সামরিক আইন ঘোষণা করা হলো, তখন আমি একটি প্রবন্ধ লিখি ‘নোবল মাইন্ডেডনেস, অ্যালাস’ নামে, যাতে আমি সাবধান করেছিলাম যে, মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ কিছু নিশ্চিত বাগাড়ম্বরের সৃষ্টি করেছে, শিল্প-সাহিত্যে আদর্শমনা নৈতিকতা মারাত্মক, কারণ এটা মানবিক সম্পর্কগুলোকে পাশে রেখে আন্দোলন ও সংগ্রামের দিকে ঘনীভূত হয়। সে-সময়ে বুদ্ধিজীবী এবং চার্চের মধ্যে একধরনের সমঝোতা ছিল, যা অনেক সাহিত্য ও শিল্পসংস্থাকে আশ্রয় দিয়েছিল। আমার প্রবন্ধটি ছিল অনেকটা ভবিষ্যদ্বাণী গোছের, কারণ গত কয়েক বছরে জাতীয় ঐক্য আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। তরুণ প্রজন্ম উচ্চ নৈতিক আদর্শের প্রতি কোনো অবস্থান জাগাতে পারল না। আদর্শবাদীদের প্রতি আমার সহানুভূতি ছিল, আর আমি ক্যাথেলিক হিসেবে আমার ধর্মীয় অবস্থান ব্যক্ত করলাম। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চার্চের প্রতি আমার ভালোবাসা কম ছিল।

প্রশ্ন : প্রথমদিকে, জাগারি নামের একটি সাহিত্যিক দলে আপনি ছিলেন, যার বিশ্ববীক্ষা ও কাব্যিক চর্চাকে বলা হতো  ‘বিপর্যয়বাদ’।

মিউশ : আমি ছিলাম এই গ্রুপের সহ-স্থপতি। আমরা নিজেদের বিপর্যয়বাদী হিসেবে ভাবতাম না। পরে সাহিত্যের সমালোচকেরা এই নামকরণ করে। ১৯৩১-৩৩ – এ-সময়টা ছিল হতাশার বছর। আমি এখন আশ্চর্য হই যে, নৈরাশ্যবাদের প্রতি কোনো ব্যক্তিগত ঝোঁকেরই  কি ফল ছিল ইতিহাসের এক অন্ধকার রূপকল্প, নাকি একজনের নৈরাশ্যবাদই ঐতিহাসিক সময়ের পরিমন্ডলকে প্রতিফলিত করেছিল। যাই হোক না কেন, এটা ইউরোপের জন্য এক ভয়াবহ সময়। হবাইমার জার্মানির সাহিত্য ছিল নাস্তিবাদী, বিদ্রূপাত্মক, ঘৃণায় পূর্ণ। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ চালুর আগের ১৯২০-এর দিকের সোভিয়েত সাহিত্যও ছিল পুরোপুরি নিষ্ঠুর আর নঞর্থক। তখন সেখানে সেইফুলিনা এবং ইলিয়া এহরেনবার্গের মতো লেখকেরা ছিলেন, যাঁরা সে-সময় পারীতে বসবাস করতেন। এহরেনবার্গের নাস্তিবাদী উপন্যাসগুলো তখন খুব তাড়াতাড়ি পোলিশ ভাষায় অনূদিত হয়ে যেত। সুতরাং সাহিত্যের বিভাবটি ছিল নৈরাশ্যবাদী ও অতি নঞর্থক। একই সময় রাজনৈতিক খবরগুলো ছিল ভীতিজনক – রাশিয়ায় স্টালিনবাদ চলছে আর জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতায় এসে গেছে। অবশ্যই এই সবকিছু আমাদের দলকে প্রভাবিত করেছিল। একইভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর মারিয়ান জিকহওস্কি, যিনি ছিলেন একজন বয়স্ক অধ্যাপক আর একজন পাঁড় নৈরাশ্যবাদী। তিনি ফেসিং দ্য এন্ড নামে একটি বই লিখলেন, যেখানে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ইউরোপ অচিরেই জাতীয়তাবাদ এবং সাম্যবাদ – এই দুই শক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাবে। সৌভাগ্যবশত ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে তিনি মারা গেলেন। সেখানে নৈরাশ্যবাদী পোলিশ লেখকেরাও ছিলেন,  বিশেষত ছিলেন স্তানিয়াভ ইগনাসি ভিৎকিভিজ, যিনি ছিলেন সম্ভাব্য একজন বিপর্যয়কারী। সুতরাং আমাদের কবিতা একধরনের অমঙ্গলের আশঙ্কাকে প্রকাশ করত, যা ছিল ভয়ের একধরনের পরাবাস্তব ভবিষ্যদ্বাণী। এটা ছিল অনেকটা কাসান্ড্রার স্বরের মতো। পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পরিবর্তে আমরা এক মহাজাগতিক বিপর্যয় অনুধাবন করেছিলাম। পরে, ওয়ারশতে নাৎসি দখলদারিত্বের সময়, সেখানে অতি তরুণ কবিদের একটি দল ছিল যাদের কাছে চরমাবস্থা, রহস্যোদ্ঘাটন ছিল নাৎসি দখলদারিত্ব। আমাদের কাছে তা ছিল না; এটা ছিল শুধু এক বিশাল আলেখ্যের অংশবিশেষ।

প্রশ্ন : আপনি ছিলেন ওয়ারশ প্রতিরোধের একজন। নাৎসিবিরোধী একটি গোপন কবিতা সংকলন তখন আপনি প্রকাশ করেন। যুদ্ধের বছরগুলো আপনার কবিতায় কী প্রভাব বিস্তার করেছিল?

মিউশ : কবি হিসেবে আমি তখন বিচলিত ছিলাম, কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, পৃথিবী যেমন ছিল কবিতা তাকে সেভাবে অঙ্কিত করতে পারেনি – আগের ধারণা ছিল ভুল। সুতরাং আমি ভিন্ন কিছুকে খোঁজ করছিলাম। কিন্তু একই সময়ে ছোটো ছোটো কবিতা দিয়ে আমি একটি দীর্ঘ কাজ করি, যার নাম দিই ‘জগৎ (একটি সরল কবিতা),’ এক সিরিজ কবিতা – যদিও সে-সময়ে আমি তা নিয়ে সচেতন ছিলাম না – ব্লেকের ‘সংস অব ইনোসেন্সে’র মতো। পৃথিবীকে আমি এমন ভয়ংকর ভাবতে লাগলাম যে, এই শিশুতোষ কবিতাগুলো ছিল – পৃথিবী যেরকম তা না হয়ে কেমন হওয়া উচিত তার উত্তর। যা ঘটছিল তাকে মাথায় রেখে লেখা ‘জগতে’র কবিতাগুলো ছিল গভীরভাবে শ্লেষাত্মক।

প্রশ্ন : এটাই কি ছিল ‘একটি সরল কবিতা’ উপ-শিরোনামের কারণ?

মিউশ : শিশুদের টেডি বিয়ার গল্পের মতোই কবিতাটি ছিল অতিকাল্পনিক গোছের একটি বই। কিন্তু আমার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে গেল যখন সমালোচকেরা এবং পাঠকেরা এগুলোকে প্রেম, বিশ্বাস, আশা-সংক্রান্ত তথাকথিত কবিতা হিসেবে গ্রহণ করে বসল, এবং পোল্যান্ডের ইস্কুলগামী শিশুদের তা পড়ার জন্য ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বসল। যারা ইস্কুলে এই কবিতাগুলো মনেপ্রাণে শিখেছে সেইসব শিশুর কাছ থেকে আমি চিঠি পাই,  যে-কবিতাগুলো মজা করে লেখা হয়েছিল।

প্রশ্ন : ‘জগৎ’ নামের সিরিজ কবিতার একটি কবিতায় আপনি লিখেছেন, ‘আমরা আর ফুলেরা পৃথিবীর ওপর ছুড়ে দিই ছায়া/ যার ছায়া নেই তার বেঁচে থাকার শক্তিও নেই।’

মিউশ : এ পঙ্ক্তিগুলোর পেছনে রয়েছেন টমাস অ্যাকুইনাস। বস্ত্তর নৈর্ব্যক্তিক অস্তিত্বে বিশ্বাসের ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। এটা একধরনের সরল কবিতা – একটি ফুলের, একটি নদীর, একটি বাগানের বাস্তবতার ওপর বিশ্বাস। ওই সময়ের আমার কবিতাগুলোয় দুধরনের অনুসন্ধান রয়েছে : অপাপবিদ্ধ মাধুর্যের অন্বেষণ – সরল কবিতাগুলো –  অন্যদিকে, ‘অকিঞ্চিৎকর মানুষের স্বরে’র চক্র, নাৎসি দখলদারির সাথে কীভাবে সরাসরি মোকাবিলা করা যায় তার উপায় অন্বেষণ। তখন আমি বিশুদ্ধ মেজাজের জন্য চীনা কবিতা পড়ছিলাম, এই কবিতায় তার প্রভাবও ছিল।

প্রশ্ন : চীনা কবিতা পাঠে তখন কী ঘটল?

উত্তর : ওয়ারশতে দ্য চায়নিজ ফ্লুট নামে আমি একটি কবিতার সংকলন কিনেছিলাম, যা আদতে চীনা থেকে নয়, বরং ফরাসি ভাষা থেকে করা অনুবাদ ছিল। এসব কবিতায় ছিল খোলামেলা চিত্রকল্প আর বিশেষত ছিল শক্তিশালী রং, যা আমি নাৎসি দখলদারিত্বের কালো, লাল এবং অন্ধকার জগতের মধ্যে  ঢোকাতে পারতাম। সে-থেকেই কালো ও লাল – এই দুই রঙের সমন্বয় আমার কাছে ভীতিজনক হয়ে রয়েছে।

প্রশ্ন : এশীয় কোন কোন কবি আপনাকে আকর্ষণ করেছে?

মিউশ : সে-সময়ে আলাদা আলাদা করে কবিদের আমি বেশি চিনতাম না। পরে আমেরিকান কবিতায় আমার আগ্রহের কারণে আমি তা জেনে নিই। আপনি জানেন যে, পুরনো চীনা ও জাপানি কবিতার অনুবাদ আমেরিকান কবিতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এক্ষেত্রে এজরা পাউন্ড একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইমেজিস্টরা এশীয় কবিতা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিল। সুতরাং, এটা ছিল এক ধীর প্রভাব, আর আমার কিছু কাজের দার্শনিক মুখবন্ধের কারণে তা বিকাশ লাভ করেছিল।

প্রশ্ন : যেমন?

মিউশ : নিছক অতি তত্ত্বসর্বস্বতা আমার পছন্দ নয়, কিন্তু পুরোপুরি আত্মমগ্নতার বিষয়ে আধুনিক কবিতার কিছু নিশ্চিত প্রবণতার প্রতি আমি আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছিলাম। এশীয় কবিতায় আত্ম ও পরের মাঝে একটা-কিছু নিশ্চিত বোঝাপড়া পরিলক্ষিত হয়, যা পশ্চিমে খুবই কম দেখা যায়। আমি এমন এক কাব্যিক ঐতিহ্য থেকে আসি যেখানে ইতিহাসের এক বড় ভূমিকা রয়েছে। আমার কবিতা ইতিহাসের ট্র্যাজেডি, নিশ্চিত কিছু প্রধান ঘটনার পরিবর্তনকে অতি মাত্রায় ধরে আছে। মধ্য ইউরোপের ঐতিহ্য হলো, ব্যক্তি এখানে দুর্বল, যা পশ্চিম থেকে আলাদা, যেখানে ব্যক্তির ক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। যখন আমি বিংশ শতাব্দীর বড়ো ট্র্যাজেডিগুলোকে নিয়ে লেখা থেকে সরে গেলাম, তখন আমি চেয়েছিলাম ভারসাম্য পেতে। বিশুদ্ধ ব্যক্তিগত বোধ থেকে আমি লিখতে চাইনি, যা অতিমাত্র আজকালকার কবিতার ধাঁচের – অতি ব্যক্তিগত পরিপ্রেক্ষিত থেকে অবলোকন করা, আর সে-কারণে প্রায়শই তা হয়ে ওঠে অর্থোদ্ধারে কঠিন। আমি বুঝলাম, ব্যক্তির দুর্বলতা কবিতার জন্য শুভ নয়, আর অতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কবিতার জন্য বিপদ হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন : অপ্রাপনীয়ের জগতে হুইটম্যানের অনেক কবিতার অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর মতো এক অহংবাদী কবির প্রতি আপনি মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। আপনি তাঁর অস্মিতার প্রকাশকে কীভাবে বিবেচনা করেন?

মিউশ : হুইটম্যান এক অদ্ভুত ব্যাপার, কারণ তিনি এক পার্সোনা বা ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। এই পার্সোনা কথা বলে, যদিও হুইটম্যান এবং এই জটিল পার্সোনার মধ্যে এক সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে, যাকে তিনি তাঁর কবিতায় মূর্ত করেন, যা একজন কবি, যিনি সরলভাবে বিশ্বাস করেন যে, সবকিছুই যা তিনি একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে অনুভব ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করেন তা পাঠককে আগ্রহী করে তোলে, তা থেকে আলাদা। অবশ্যই হুইটম্যান একজন অতি জটিল কবি, ভালো আর মন্দকে একসাথে মেশান, যাকে আমার কাকাতভাই অস্কার মিউশ বলতেন, মহৎ কবিতার এক প্রেসক্রিপশন।

প্রশ্ন : হুইটম্যানের একজন আধুনিক উত্তরাধিকারী অ্যালেন গিন্সবার্গের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা রয়েছে।

মিউশ : আমার ‘অ্যালেন গিন্সবার্গের প্রতি’ কবিতাটি অতি গোলমেলে। কবিতা পাঠের পর তিনি আমার কাছে এসে বললেন, আমার মনে হয় নিজেকে তুমি যেমন করে তুলে ধরো, তেমন সৎ তুমি নও। গিন্সবার্গ সম্পর্কে আমার ধারণা স্ববিরোধী। তাঁর ‘কাদিশ’ এক অর্থে এক ভয়ংকর লেখা, কিন্তু খুবই দুঃসাহসিক। মায়ের পাগলামোর কথা বলা, তার বিভিন্ন অবস্থাকে তুলে ধরা… তা এককথায় অবিশ্বাস্য। আমি সবসময়েই এই ধরনের ব্যক্তিগত হঠকারিতাকে ভৎর্সনা করি। সুতরাং গিন্সবার্গের এই দুঃসাহসে আমি খুবই মর্মাহত এবং কতকটা ঈর্ষাকাতরও বটে। আর তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতায় আমি তা-ই প্রকাশ করেছি।

প্রশ্ন : আমি বুঝতে পারছি, আপনি হুইটম্যানের ‘চাকার ফুলকি’ কবিতাটি আপনার অপ্রাপনীয়ের জগতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।                এ-কবিতায় হুইটম্যান অনাদৃত সত্তার অবস্থা কিন্তু একইসঙ্গে একজনের মনোযোগের বিচ্ছিন্ন অবস্থাকে বোঝানোর জন্য ‘আনমাইন্ডেড’ নামের একটি অপূর্ব শব্দ ব্যবহার করেছেন। এ-ধরনের এমন-কিছু-একটা আপনিও আপনার কবিতায় করে থাকেন।

মিউশ : হ্যাঁ। একধরনের ব্যাজোক্তি। আমরা একে বলতে পারি রোমান্টিক ব্যাজোক্তি। একই সময়ে একজন অংশগ্রহণ করে এবং পর্যবেক্ষণও করে : যেন  সিঁড়ি থেকে পড়ার সময় একজন এ-অবস্থাকে মজা হিসেবে দেখে। আমি মনে করি, যখন একটি কবিতা খুব সাধারণ মানের হয়, আর তা একপ্রকার আবেগী স্বীকারোক্তির দিকে যায়, তখন আমি কিছু বাড়তি ভাষ্য তাতে যোগ করি, তা কোনো প্রথাগত কায়দাকানুন নয়, বরং এক সততার অন্বেষণ। এ-ধরনের ব্যাজোক্তি আমার লেখায় এমনই প্রয়োজনীয় যে, আমি প্রক্রিয়া থেকে তাকে আলাদা করতে পারি না।

প্রশ্ন : আপনি আপনার কবিতা ‘কাব্যতত্ত্বে’ বলেছেন, কবিতার উদ্দেশ্যই হলো আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, শুধু একজন অখন্ড মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা কী যে কঠিন।

মিউশ : আমার কবিতাকে বলা হয় বহুস্বরিক। তার মানে হলো কথনস্বরে আমি পরিপূর্ণ থাকি; একভাবে আমি নিজেকে মাধ্যম বা সরঞ্জাম ভাবি। আমার বন্ধু জিন হার্শ, যে আমাকে কার্ল ইয়াসপার্সের অস্তিত্ববাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, বলে যে, ‘এমন ইনস্ট্রুমেন্টাল ব্যক্তি আমি আর দেখিনি,’ তার মানে হলো, স্বর আমার মধ্যে যাওয়া-আসা করে। এখানে পার্থিব-বহির্ভূত কোনোকিছু নেই, বরং আমার নিজের সাথে কিছু-একটা রয়েছে। এখানে কি আমি একা? আমি তা ভাবি না। নিটশে ও দস্তয়েভস্কিই প্রথম লেখক যাঁরা আধুনিক সভ্যতার সংকটকে চিহ্নিত করেছিলেন এই বলে যে, আমরা প্রত্যেকেই পরস্পরবিরোধী স্বর এবং               জড়-তাড়না দ্বারা তাড়িত হই। যখন এসব অতিথি যাওয়া-আসা করে আর তাদের যন্ত্র হিসেবে আমাদের নেয়, তখন একই ব্যক্তি হিসেবে যথাযথ থাকার সমস্যা নিয়ে আমি লিখেছি। কিন্তু খারাপ সত্তা নয়, ভালো সত্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার আশা আমাদের থাকতে হবে।

প্রশ্ন : আপনি নিজেকে বলেছেন এক মাধ্যম, কিন্তু সন্দেহপ্রবণ একজন। এর দ্বারা আপনি কী বুঝিয়েছেন? কী অর্থে আপনি এক মাধ্যম?

মিউশ : পেছনে ফিরে তাকালে আমার মনে হয়, সবকিছুই যেন আমাকে লিখতে হুকুম করছিল, আর আমি যেন ছিলাম এক সরঞ্জাম। কিসের সরঞ্জাম আমি জানি না। আমি বিশ্বাস করি, আমি ঈশ্বরের এক যন্ত্র, কিন্তু এটা দুঃসাহসিক একটা ব্যাপার। আর  আমি যা-ই হোক না কেন একেই বলতে চাই আমার daimonion। আমি একটি নতুন কবিতা লিখেছি যেখানে আমার এই সম্পর্কটিকে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন : আমরা আবার ফিরে যাই আপনার আগের বছরগুলোর কাছে। ওয়ারশ অভ্যুত্থান এবং নিধনযজ্ঞের আপনি ছিলেন একজন চাক্ষুষ সাক্ষী, কিন্তু এ নিয়ে আপনার লেখা অপেক্ষাকৃত কম।

মিউশ : বিভিন্ন সময়ে আমাকে অনুরোধ জানানো হয় ‘campo dei Fiofi’ কবিতাটি পাঠ করতে, যা লেখা হয়েছিল ওই সময়ের ভোগান্তি নিয়ে। সম্প্রতি ওই সময়ের ঘটনাকে নিয়ে লেখা আমার কবিতাগুলোর পুনর্মুদ্রণের এক অনুরোধ আমি নাকচ করে দিই। আমি চাই না, নিজেকে একজন পেশাগত শোককারী হিসেবে পরিচিত করতে।

প্রশ্ন : আপনি একজন অভিবাসী হিসেবে পারিতে থেকেছেন। ‘Bypassing Rue Descartes’ নামীয় কবিতায় আপনি পারিকে এমন শহর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে  দেখা মেলে অনেক নীতি, যাকে আপনি বলেছেন ‘সুন্দর চিন্তা’, যা একাধারে সরল ও নিষ্ঠুর।

মিউশ : পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা মানুষের জন্য পারি কোনো নিশ্চিত জায়গা ছিল না। দুই পর্যায়ে আমি পারিতে ছিলাম। ১৯৫০ সালে আমি পোলিশ দূতাবাসের একজন অ্যাটাশে ছিলাম আর সে-সময়ে পাবলো নেরুদা এবং পল এলুয়ারের সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। পরের বছর পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভেঙে গেলে আমি একজন রিফিউজি হিসেবে সেখানে আবার বাস করতে আসি। সে-সময়ে ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা আবার সাম্যবাদ এবং স্টালিনের  প্রেমে একবারে মশগুল থাকত। আমার মতো যে-কেউ অসন্তুষ্ট হয়ে পূর্ব ইউরোপ থেকে এখানে এলে তাকে ভাবা হতো পাগল বা আমেরিকার দালাল। ফরাসিরা ভাবত, তাদের তথাকথিত Idées générales সমগ্র বিশ্বের জন্যই বোধহয় প্রযোজ্য। এগুলো ছিল সুন্দর ধ্যানধারণা; কিন্তু একেবারেই অবাস্তব। একই সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল হতাশাজনক এবং অস্বস্তিকর; লাখ লাখ মানুষ তখন গুলাকে; তাদের কষ্ট ইউরোপের বাতাস এবং বাতাবরণকে দূষিত করে ফেলেছিল। আমি জানতাম কী ঘটতে যাচ্ছিল। পশ্চিমকে তখনো সলজেনেৎসিনের লেখা গুলাক দ্বীপমালা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি আপনাকে সমস্যায় ফেলেছিল?

মিউশ : এটা কোনো গোপন কিছু নয়। যখন আমি ওয়ারশতে ফিরলাম, সরকার তখন আমার পাসপোর্ট কেড়ে নিল। কূটনৈতিক চাকরি নিয়ে পারিতে ফিরে যাওয়া তারা চাইল না। শেষ পর্যন্ত তা আমাকে পুরনো অবস্থায় নিয়ে এলো। কিন্তু তখনই আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম এবং নির্বাসনে চলে এলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজনের অতি আগ্রহী সাম্যবাদী রুশ পত্নী আমাকে বলল, আমার মতে, একজন লেখকের দেশত্যাগ করা উচিত নয়, কিন্তু যেহেতু আপনি অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন তখন মনে রাখবেন যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আপনার দায়িত্ব রয়েছে। কার বিরুদ্ধে? স্টালিন, তিনি বললেন; রাশিয়ার জল্লাদ। এরকম বলা তখন ছিল এক বিপজ্জনক ব্যাপার। কিন্তু আমিও বলার এক বাধকতাকে অনুভব করলাম। আলব্যের কাম্যুর সঙ্গে তখন আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, সে-সময় জাঁ পল সার্ত্র ও তাঁর লোকজন তাঁকে তাড়াচ্ছিল, তাঁকে ধ্বংস করতে চাইছিল কারণ তিনি তাঁর রেবেল গ্রন্থে, অন্য অনেককিছুর সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ছিল বলে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ আমার মতে, যারা আমাকে অনুবাদ করতে পারত তারা তা করতে অস্বীকার করল। তারা বলল যে, যদি তারা তা করত তবে তারা একঘরে হয়ে পড়বে। সুতরাং সে-সময় আমি খুব কঠিন অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : কবিতা কি দর্শনের জন্য যথাযথ ক্ষেত্র?

মিউশ : এটা নির্ভর করে কী ধরনের দর্শন তার ওপর।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কবিতার জন্য আপনি কী ধরনের দর্শন পেয়েছেন?

মিউশ : আমার কবিতায় সে-ধরনের দর্শন রয়েছে যা আমাকে রাতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় আলোতে খরগোশের লাফ দিয়ে পড়ার মতো একটি অবস্থা মনে করিয়ে দেয়। খরগোশ জানে না, কীভাবে আলোকরশ্মি থেকে বের হয়ে যেতে হয়। তাই সে সোজাসুজি সামনের দিকে দৌড়ায়। আমি সে-ধরনের দর্শনে আগ্রহী যা সে-অবস্থায় খরগোশের উপকারে আসবে।

প্রশ্ন : খরগোশের জন্য কোনো আশাই আর নেই। আপনি যখন ছাত্র ছিলেন, সবসময় আপনি আপনার ঝোলায় গির্জার ইতিহাস রেখে দিতেন, আর আপনি মানিকিইজমের মতো বিরুদ্ধ মতেও সুনির্দিষ্টভাবে আগ্রহী ছিলেন।

মিউশ : সাধু, কিন্তু বলা দরকার মানিকিইজম কোনো বিরুদ্ধ মত ছিল না, দীর্ঘকাল ধরে তা একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্ম ছিল। মূলত তা অশুভের এক উল্লেখযোগ্য ক্ষমতাকে স্বীকার করে, আর অশুভ হলো শুভের অভাব – এই ধ্রুপদী ও ধর্মগত ব্যাখ্যাকে প্রতিরোধ করে। সে-সময়ে অশুভের ক্ষমতাকে মানবসমাজের যৌথ সৃষ্টি এবং মানবাত্মার স্বতন্ত্র উপাদান হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকার করা হতো। সমসাময়িক  নাস্তিকদের যে যুক্তি – যে এক কল্যাণময় ঈশ্বর এ জগৎ যেমনটি সেভাবে তা সৃষ্টি করতে পারেন না – তা প্রকৃতপক্ষে নব্য-মানিকীয়। যদিও তা একবারেই আমার মতো নয়, তবু আমি স্বীকার করি যে, এটি একটি জোরালো যুক্তি; আমার কবিতাতেও আমি অশুভের অস্তিত্বকে ভালোভাবে সম্পর্কায়িত করেছি। সাইমোন ওয়েল, যিনি একজন অতি পরিণামবাদী, তিনি অশুভের ক্ষমতাকেও স্বীকার করেছেন, যা তাঁর চিন্তার প্রতি আমার আকর্ষণের প্রধান কারণ ছিল। তিনি বলে বসতেন যে, মানুষের মধ্যে কেবল সরষের দানার পরিমাণ শোভনতা আছে।

প্রশ্ন : আপনার ‘গান’ কবিতায় নারীটি আকাঙ্ক্ষা করে ‘অক্ষত একটি বীজ’। আপনি এবং ওয়েল উভয়েই দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করছেন মার্কলিখিত সুসমাচারের সেই সরষের বীজকে।

মিউশ : হ্যাঁ, এই ছোট সরষের বীজ হলো ঈশ্বরের রাজ্য, শোভনতা আর শুভত্ব – পৃথিবীর অমঙ্গলের সাথে তুলনা করলে বলতেই হয় ছোট। এটাই ছিল সিমোন ওয়েলের বিশ্বাস। সে-সময়ে আরেকজন লেখক আমাকে আকর্ষণ করেছিলেন, তিনি হলেন লেফ শেস্তোফ, যিনি দেখেছিলেন যে, সমগ্র  জগৎ বিশ্ববিধির দ্বারা পরিচালিত। তিনি স্টোয়িকবাদের বিরোধিতা করেন। একজন স্টোয়িক, তিনি প্রাচীন কিংবা আধুনিক যা-ই হোন না কেন, বলবেন হাসিমুখে দুঃখ সয়ে যাও। কিন্তু কেন আমরা তা সইব? শেস্তোভের তত্ত্ব ছিল, আমাদের দ্রোহ করা উচিত, আর্তনাদ নয়! তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ এথেন্স অ্যান্ড জেরুজালেমে গ্রিক স্টোয়িকবাদের বিপরীতে আর্তনাদরত যবকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ঘূর্ণিঝড় থেকে যবকে দেওয়া ঈশ্বরের উত্তর যথেষ্ট ছিল?

মিউশ : না, তা যথেষ্ট ছিল না, যথেষ্ট ছিল না।

প্রশ্ন : যবের ঈশ্বর আর ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বরকে কি আপনি আলাদা ঈশ্বর বলে বিবেচনা করেন?

মিউশ : আমি জানি না। অনুমান করি, আমরা এমন এক রাজ্যে প্রবেশ করেছি যেখানে এসবের কোনো উত্তর নেই।

প্রশ্ন : আদি খ্রিষ্টানত্বের জটিলতা থেকে নস্টিকবাদের জন্ম হয়েছিল, যা বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে জ্ঞানের মাধ্যমে পরিত্রাণ পাওয়ার ওপর জোর দিয়েছিল। নস্টিকবাদে আপনার আগ্রহ আপনার কবিতার সঙ্গে কতটুকু সম্পর্কিত?

মিউশ : খ্রিষ্টানত্বের প্রথম শতাব্দীতে নতুন ধর্ম নানাভাবেই শিক্ষিত মানুষের জন্য অসম্পূর্ণ মর্মে প্রতিভাত হচ্ছিল, আর                 এ-সুযোগেই নস্টিকবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। নস্টিকবাদ তখন তা-ই করেছিল এখন কবিতা শিক্ষিত লোকের জন্য যা করে। কিন্তু কবিতাকে শুধু নন্দনতত্ত্বে নামিয়ে আনলে হবে না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই কবিতা হলো নিখিলবিশ্বে মানুষের অবস্থানের অন্বেষণ। মানুষের স্বর্গ থেকে পতনের পর থেকেই মঙ্গল আর অমঙ্গল মানুষের মধ্যে আরোপিত। প্রধান প্রশ্ন হলো : এই মুহূর্তটির আগে আদম এবং ইভ কী অবস্থায় বেঁচে ছিল? দর্শনের মস্ত এবং চরম দুঃসাধ্য এক সমস্যা হলো আদিপাপ। লেভ শেস্তোভ বলেছেন, আর আমিও একমত যে, এটা উল্লেখযোগ্য বস্ত্তত অনেকটাই অনুনমেয় যে, আদিম ধর্মযাজকেরা এমন এক রহস্যময় পুরাণে উপনীত হলো যে, যে-প্রজন্ম আজ পর্যন্ত এর জন্য মেহনত করেছে, তাদের কাছে বিষয়টা অবোধ্যই রয়ে গেল।

প্রশ্ন : কীভাবে এক মঙ্গলের ঈশ্বর পৃথিবীতে অমঙ্গল হতে দেন, এই প্রশ্নটা আপনার কবিতায় একবারেই জড়িয়ে আছে। আমরা কি ঈশ্বরকে যুক্তির ভেতর দিয়ে, কবিতার ভেতর দিয়ে সত্যি বলে প্রমাণ করতে পারি?

মিউশ : শেস্তোভ বলেছেন, পৃথিবীতে এমন প্রশ্ন আছে যেগুলো জিজ্ঞেস করা ঠিক না, কেননা এগুলোর কোনো উত্তর হয় না। সাইমোন ওয়েল এই অসংগতিকে সমর্থন করতে চেয়েছেন এই বলে যে, তা অনধিগম্যতার নৈতিক জোর। আমার সবকিছুই অসংগতিময়, আমি দ্বন্দ্বেই যেন গঠিত, আর এ-কারণেই  দর্শন অপেক্ষা কবিতা আমার কাছে লেখালেখির জন্য উৎকৃষ্ট ফর্ম।

প্রশ্ন : ওয়েল ধর্মের এই সাবলীল স্বস্তির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

মিউশ : তিনি ছিলেন মানবিক দুর্বলতায় সামান্য সহ্যশক্তিসম্পন্ন একজন আপসহীন ব্যক্তিত্ব, অন্তত নিজের সঙ্গে। এক অর্থে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত তপস্বী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অন্তিম দশায় উপনীত রোগী, যে ভাবে যে, সে ভালো হয়ে যাচ্ছে, এইরূপ কাল্পনিক মতিভ্রমতার আসুরিক কাজকে তিনি বাতিল করে দেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে উপশম ঘটবে, এ-ধরনের আশা থাকা অত্যন্ত মানবিক এক ব্যাপার বলা যায়। কেন তাদের বাতিল করা? মানবিক সবকিছুতেই আমাদের এ-ধরনের স্বস্তিকে অনুমোদন করা উচিত।

প্রশ্ন : আপনার বন্ধু উইটোল্ড গোমব্রোভিচ একবার তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘মিউশ দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণা, আর সংশয়কে অভিজ্ঞতায় এনেছেন যা আগের লেখকদের কাছে একেবারেই অজানা ছিল।’ আপনি কি এতে একমত?

মিউশ : হ্যাঁ, আমি একমত। তিনি বিশেষভাবে তা উল্লেখ করেছেন আমার দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ড বইটি মনে রেখে, আর            এ-শতাব্দীর শয়তানের সঙ্গে আমার সংগ্রামকে মনে রেখে – হেগেলীয় ঐতিহাসিক বিশ্ববিধিতে বিশ্বাস যে, ইতিহাস পূর্বনির্ধারিত রেখা ধরে এগিয়ে যায়। আমি দ্য ক্যাপটিভ মাইন্ড লিখেছিলাম নিজেকে মুক্ত করতে, এ-দর্শনের বিরুদ্ধে যুক্তি খুঁজে পেতে। এজন্যই সম্ভবত তিনি বলেছেন যে, আমার সংগ্রাম আগের লেখকদের কাছে অজানা ছিল।

প্রশ্ন : এই মুক্তিতে কে সহায়তা করেছিল বলে আপনি মনে করেন?

মিউশ : আমার উপন্যাস ইসা ভ্যালিতে রাজনৈতিক কিছুই নেই। ঘটনাটি ঘটে ১৯২২ সালের দিকে লিথুয়ানিয়ার গ্রামে।  এক যাজকের এক রক্ষিতা ছিল আর সে একদিন আত্মহত্যা করল, তারপর গির্জাপল্লিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।  সম্প্রতি পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো লিথুয়ানিয়ায় গিয়ে আমি সেই গির্জা-এলাকা পরিদর্শন করি। আমার যেখানে ব্যাপ্টাইজম হয়েছিল এবং আমার উপন্যাসের অনেক ঘটনা যেখানে ঘটেছিল যা আমি বর্ণনা করেছিলাম উপন্যাসে, সেই একই গির্জার কাছেই স্থানীয় গোরস্তানে ছিল মেয়েটির কবর। কিন্তু উপন্যাসটি শুধু শৈশবের স্মৃতিরোমন্থন নয়, বরং শয়তান এবং ঐতিহাসিক বিশ্ববিধি ও প্রকৃতির  নিষ্ঠুরতা  থেকে নিজেকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষাসংক্রান্ত এক দার্শনিক উপন্যাস।

প্রশ্ন : তখন থেকেই আপনি উপন্যাস লেখাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়লেন। দেখা গেল সাহিত্যের এই রীতির সঙ্গে আপনার ঝগড়া লেগে গেল। কেন?

মিউশ : এটি একটি অবিশুদ্ধ ফর্ম। বার্কলিতে আমি বিশ বছর দস্তয়েভস্কি পড়িয়েছি। তিনি একজন জাত ঔপন্যাসিক, সবকিছুই তিনি ত্যাগ করেছেন; সম্মানের কোনো ধার ধারতেন না। উপন্যাসে তিনি সবকিছুই ঠেসে দিতেন। জেনারেল ইভোলগিন নামে একটি চরিত্র তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইডিয়ট উপন্যাসে, যে একজন মিথ্যাবাদী আর গল্প বলে বেড়ায় – কীভাবে সে যুদ্ধে তার পা হারায়, কীভাবে সে তার সেই পাকে কবর দেয়, আর তারপর সে সমাধিফলকে কী লিপি উৎকীর্ণ করে। উৎকীর্ণলিপিটি নেওয়া হয়েছিল দস্তয়েভস্কির মায়ের সমাধি থেকে। এখানে আপনি পাবেন সত্যিকারের একজন ঔপন্যাসিককে। আমি তা করতে পারিনি।

প্রশ্ন : যদিও উপন্যাস নামের রীতিটি আপনার সঙ্গে খাপ খেল না, তবু টমাস মানের ভক্ত ছিলেন আপনি, এমনকি ‘ম্যাজিক মাউন্টেন’ নামে একটি কবিতাও লিখেছেন।

মিউশ : ছাত্রাবস্থায় দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সেখানে নাফটা নামে একটি চরিত্র আছে যে-একজন জেসুইট যাজক, আলোকপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী একজন একচ্ছত্রবাদী। আমি এই চরিত্রে আবিষ্ট ছিলাম। আমার নিজের ছিল বামপন্থী সর্বগ্রাসী প্রবণতা আর সেজন্যই আলোকপ্রাপ্তির বিষয়ে নাফটার সন্দেহের বিষয়টাতে আটকে গিয়েছিলাম আমি। এখন যদিও উপন্যাসে নাফটার প্রতিদ্বন্দ্বী আলোকপ্রাপ্তির চৈতন্যের প্রতিনিধিত্বকারী সেটেমব্রিনির দিকেই আমার পক্ষপাত। কিন্তু মানবতা বিষয়ে আমার অন্তর্দৃষ্টি সেটেমব্রিনির থেকেও অধিক অন্ধকারময়।

প্রশ্ন : অবরোধের সময় আপনি ইংরেজি থেকে পোলিশ ভাষায় এলিয়ট অনুবাদ করেছিলেন। এ-কাজে কেন আপনি আগ্রহী হলেন?

মিউশ : পোড়ো জমির পুরোটাই বিপর্যয়ের উপাদানে ভরা।  সে-সময়ে, অধিকৃত ওয়ারশতে, ধসেপড়া শহরের চিত্রকল্পে এর ছিল কিছু সুনিশ্চিত ক্ষমতা। পুড়ে যাওয়া গেটোর আগুনের বিচ্ছুরণ যখন দিকচক্রবালে ছড়িয়ে পড়ত, তখন তা অতিপ্রাকৃত পাঠের সৃষ্টি করত। এটা গভীরভাবে এক শ্লেষাত্মক কবিতা, বা এমনকি বিদ্রূপাত্মকও। এটি আমার চিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না। কিন্তু চৌতালে আমরা এমন বিরল ও ব্যতিক্রম একজনকে পাই, যিনি অনেক সংগ্রামের পর শিল্পের মাধ্যমে তাঁর নিজ বিশ্বাসে ফিরে আসতে সমর্থ হন। এলিয়টের সঙ্গে লন্ডনে আমার দেখা হয়, আর তিনি আমাকে উষ্ণ অভিবাদনও জানান। পরে তাঁকে আমি আমেরিকাতে দেখি এবং পোলিশ ভাষায় তাঁর আরো কবিতা অনুবাদ করি।

প্রশ্ন : এলিয়টের মতো আপনিও কি মনে করেন, কবিতা ব্যক্তিত্ব থেকে পলায়ন?

মিউশ : সর্বদাই এটা আমার জন্য এক সমস্যা। সাহিত্য এমন-এক আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয় যা সত্যনিষ্ঠ হতে চায় – কোনোকিছুকে লুকাতে চায় না, আর একজনকে অবিকল উপস্থাপন করতে চায় না। তবু যখন আপনি লেখেন তখন কিছু নির্দিষ্ট বাধকতা থাকে, যাকে আমি বলি ফর্মের নিয়মনীতি। আপনি সবকিছু বলতে পারেন না। অবশ্যই এটা ঠিক যে, মানুষ কোনোরকম সংযম ছাড়াই অনেককিছু বলে। কিন্তু কবিতা কিছু সংযম আরোপ করে। তথাপি এমনই মনে হয় যে, আপনি নিজেকে বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। বই লেখা হয়, তা প্রকাশিত হয় আর ভাবি, ঠিক আছে পরবর্তী সময়ে আমি নিজেকে উন্মুক্ত করব। আর যখন পরের বইটি বের হলো, একই অনুভূতি আমার হয়। আর তারপর জীবন শেষ হয়ে যায়, আর এ-ই ঘটে।

প্রশ্ন : আপনার অনেক কবিতায় স্বীকারোক্তি দৃষ্টিগোচর হয়। আপনি কি মনে করেন এই স্বীকারোক্তি কোনো কিছুকে নির্দেশ করে?

মিউশ : আমি জানি না। আমি কখনো মনোবিকলিত হইনি। মনোরোগচিকিৎসার ব্যাপারে আমি খুব সন্দেহপরায়ণ। আমার স্বপ্ন হলো, ভাষায় সবকিছু প্রকাশ করা আর সবকিছু বলা। কিন্তু সম্ভবত আমি পেরে উঠব না, আর উপরন্তু, কোনোকিছুই তা নির্দেশ করবে না।

প্রশ্ন : আপনার লেখার পদ্ধতিটি কেমন?

মিউশ : আমি প্রতিদিন সকালে লিখি। এক পঙ্ক্তি বা দু পঙ্ক্তি যা-ই হোক না কেন, কিন্তু তা সকালে। আমি নোটবুকে লিখি আর তারপর কম্পিউটারে খসড়া করি। লেখার সময় আমি কফি বা অন্য কোনো উত্তেজক কিছু কখনোই নিই না। আমি পরিমিতভাবে পান করি, কিন্তু তা কাজ শেষ হওয়ার পর। সম্ভবত এ-কারণেই নিউরোটিক আধুনিক লেখকদের ইমেজের সঙ্গে আমি খাপ খাই না, কিন্তু কে জানে?

প্রশ্ন : আপনি কি লেখা খুব বেশি মাত্রায় সংশোধন করেন?

মিউশ : এমন কোনো নিয়ম  নেই। কখনো পাঁচ মিনিটে একটি কবিতা লেখা হয়, কখনো বা একমাসও লেগে যায়। কোনো নিয়মনীতি নেই।

প্রশ্ন : আপনি কি প্রথমে পোলিশ ভাষাতেই লেখেন, তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করেন?

মিউশ : আমি কেবল পোলিশ ভাষাতেই লিখি। আমি সবসময় কেবল পোলিশ ভাষাতেই লিখেছি, কারণ আমি মনে করি, যখন আমি আমার শৈশবের ভাষাকে ব্যবহার করি, তখনই কেবল আমি আমার ভাষার সেরা কেরামতিটি দেখাতে পারি।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন আপনার কবিতা ভালোভাবে অনুবাদিত হতে পারে?

মিউশ : আমি নিজেই আমার কবিতা অনুবাদ করি, তারপর আমার বন্ধুরা, অধিকাংশ সময়েই রবার্ট হাস বা লেনার্ড নাথান, এগুলো সংশোধন করেন। কিন্তু মৌল ছন্দটা আমিই ঠিক করে দিই, কারণ তাঁরা পোলিশ ভাষাটা জানে না। আমি বিশ্বাস করতাম না যে, আমার কবিতা অনুবাদিত হতে পারে। আমি খুবই ভাগ্যবান যে, আমেরিকান পাঠকদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি। এসব পাঠকের অর্ধেকই প্রায় হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় উদ্গ্রীব কবি। তারা  কবি হিসেবে আমাকে খুবই তারিফ করে। যেমন পোলসের কাছে আমি যে-কোনো কিছুর চেয়ে বেশি এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

প্রশ্ন : আপনি নিজেকে একজন গুহ্য অপ্রচারযোগ্য কবি বলেছেন। আপনি কি পাঠককে চিন্তা করেন না?

মিউশ : আমি সে-ধরনের আদর্শ ব্যক্তিদের জন্যই লিখি যারা ঠিক আমার অন্তরঙ্গ ধরনের। অতিমাত্রায় সহজগম্য হওয়া নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি দেখি আমার কবিতা কতটুকু যথার্থ, কতটুকু অপরিহার্য। আমি ছন্দোস্পন্দ  আর ক্রমকে অনুসরণ করি। আর আমার সংগ্রাম হলো বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতার বিরুদ্ধে, যেন আমি যতটা সম্ভব বাস্তবতার নানা ধরনকে ফর্মে নিয়ে আসতে পারি।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক একটি কবিতা ‘মাকড়সা’য়, আপনি কবিতাকে রূপকার্থে বলেছেন, ‘ …সময়ের সীমান্তরেখার ওপারে দাঁড় টানার জন্য/ এক ছোট্ট নৌকা বানানো।’ এভাবেই কি আপনি নিজের কাজকে দেখেন?

মিউশ : আমি খোলস ছাড়ার রূপক ব্যবহার করতে পছন্দ করি, যার অর্থ পুরনো ফর্ম এবং ধারণা বাতিল করা। আমি মনে করি, এটাই লেখাকে উদ্দীপক করে তোলে। আমার কবিতা সবসময়ই ফর্মের এক অধিকতর পরিসরকে অন্বেষণ করে। যে-সমস্ত কবিতার তত্ত্ব নান্দনিক বস্ত্তকে ঘিরে আবর্তিত, তার সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। যদিও কোনো না কোনোভাবে আমি খুশিই যে, আমার কিছু পুরনো কবিতা লেখার ধরন আমার থেকে আলাদা হয়েও তাদের নিজের ধাঁচে ভালোভাবেই এখনো অস্তিত্বশীল।

প্রশ্ন : তাহলে যখন একজন কবি বা শিল্পী প্রশংসিত হন এবং উচ্চ ধারণায় অবস্থান করেন, তখন কেন আপনি প্রায়শই সে-বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন?

মিউশ : সমস্যা হলো, জনসাধারণ সাধারণত কোনোরকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতহীন এবং জীবন যা দেয় তার চেয়েও অধিকতর বিশাল এক সুন্দর-অঙ্কিত প্রতিকৃতি প্রত্যাশা করে। এই ধরনের প্রতিকৃতি আর বাস্তবতার মধ্যে বৈষম্য থাকে, যা হতে পারে হতাশাজনক। একজন কবি যদি খুব সীমাবদ্ধ বৃত্তে খ্যাতি পান, তাহলে এটারই সম্ভাবনা থাকে যে, তাঁর ভাবমূর্তি বিকৃত হবে না। বৃহত্তর ক্ষেত্রে বিকৃত হওয়ার বেশি ঝুঁকি থাকে।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কী ধরনের বিকৃতিকে ব্যাপক সমস্যা বলে মনে হয়?

মিউশ : আমার নীতিবাগীশ ভাবমূর্তি।  নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পোল্যান্ডে যখন আমার কবিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল, অনেকের কাছেই আমি হয়ে উঠলাম সেন্সরশিপ থেকে বেরিয়ে আসা এক মূর্ত স্বাধীনতার প্রতীক, আর এজন্যই হয়ে গেলাম এক নৈতিক ব্যক্তিত্ব। আমি জানি না আমি এই ভাবমূর্তিকে ধরে রেখেছি কি না, এটা সম্ভবত আগের তুলনায় একটু হলেও খেলো হয়ে গেছে। এই যে দেখুন (মিউশ তাঁর পকেটে কী-একটা হাতড়ালেন আর একটি পদক পেলেন), এটা পোল্যান্ডের মনুমেন্টের একটি  রেপ্লিকা। এর চারটি প্রতীক আছে : পোপ দ্বিতীয় জন পলের সম্মানচিহ্ন, পোলিশ আর্চবিশপের মুকুট, লেস ওয়ালেসার যন্ত্র আর একটি বই, যা আমার প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রশ্ন : আপনি তো ভালো সাহচর্যেই আছেন।

মিউশ : বিংশ শতাব্দীর একজন কবির জন্য নেহায়েত খারাপ নয়, বিশেষত মানবসমাজে কবিতার স্থান নিয়ে যেসব খেদ বিদ্যমান তার আলোকে। কিন্তু আমি তা নিয়ে একটু সন্দেহগ্রস্তই। পোলিশ ইতিহাসের বিশাল নৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমি চিন্তিত হতে চাই না। একটি নৈতিক জীবনযাপনের সমস্যা হিসেবে শিল্প পর্যাপ্তভাবে প্রতিস্থাপনীয়  নয়। আমি আমার চেয়েও বড় কোনো ঘড়ি পরতে ভয় পাই।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, অজানা ও অখ্যাতভাবে কাজ করাই একজন কবির জন্য ভালো?

মিউশ : বহু বছর আমি অজ্ঞাতভাবে কাজ করেছি। বার্কলিতে আমার বছর ও সময়গুলো এমন ছিল যে, এখানে প্রকৃতপক্ষে আমার কোনো পাঠক ছিল না, আর আমেরিকায় এমন মানুষ সত্যিই কম ছিল যাদের বিচারবোধের ওপর আমি ভরসা করতে পারতাম। পারি এবং পোল্যান্ডে আমার কয়েকজন বন্ধু ছিল, সুতরাং পত্র-যোগাযোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল : কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া চিঠিগুলোই ছিল আমার বাঁচার শক্তি। পোলিশ ভাষায় আমার কবিতার বইগুলো বের হচ্ছিল। সেগুলো পোল্যান্ডে  বেআইনিভাবে বিক্রি হচ্ছিল, সুতরাং  পোল্যান্ডের পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানারও সুযোগ ছিল না আমার তখন।

আমি জানতাম আমি কী, আর আমার মূল্য সম্বন্ধেও আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম, কিন্তু বার্কলিতে, অবশ্যই এক্ষেত্রে স্লাভিক ভাষার অধ্যাপকেরা ছাড়া, আমার প্রায় সকল সহকর্মীর কাছেই আমি ছিলাম অজ্ঞাত। এক অখ্যাত বিভাগের এক অখ্যাত অধ্যাপক ছিলাম আমি। যখন আমি দস্তয়েভস্কি পড়াতে শুরু করলাম, তখনই আমি ছাত্রদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলাম। এ-সময়টাকে বোঝার জন্য একটি গল্প রয়েছে। জার্সি কোজিনস্কির সঙ্গে স্ট্যানফোর্ডে এক সাহিত্যিক নৈশভোজে আমি ছিলাম, আর অবশ্যই তিনি তখন বিখ্যাত একজন। সেখানে কোজিনস্কির ভক্ত একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন যিনি টেবিলে আমার কাছেই বসেছিলেন। তিনি ভদ্রভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কী করি। আমি বললাম, আমি কবিতা লিখি। তিনি তখন কর্কশভাবে বলে উঠলেন, সবাই কবিতা লেখে। আমি বেশি কিছু মনে করলাম না, কিন্তু ঘটনাটি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। তখনকার বছরগুলোতে আমার অবস্থা, আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার দুঃখকষ্টের ব্যাপারটা এ-ঘটনায় ধরা পড়ে।

প্রশ্ন : তুলনামূলকভাবে আপনার অধিকসংখ্যক পাঠককে আপনি কীভাবে বিবেচনা করেন?

মিউশ : অনেক বছর আগে একসময় ছিল যখন মানুষকে আনন্দ দিত, এমন ধরনের লেখার জন্য আমি স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। কিন্তু সে-সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। যখন আপনি রাজনৈতিক কবিতা লিখবেন, যেমনটা আমি যুদ্ধের সময় লিখেছিলাম, তখন সবসময় আপনার কবিতার খদ্দের থাকবে। যে-স্বীকৃতি আমি পাই, তার জন্য আজকাল আমি আশ্চর্য হই এবং অস্বস্তিতেও ভুগি। কারণ আমি জানি যে, এই সাড়া খুব খাঁটি, আর এজন্য নয় যে, আমি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত। অপরদিকে, আমি মনে করি না যে, নোবেল পুরস্কার আমাকে বা আমার কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রশ্ন : ওয়ালেস স্টিভেনসের ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক কবিতা হলো ‘প্রয়োজনকে খোঁজার লক্ষ্যে মনের ক্রিয়ার কবিতা’, কীভাবে আপনি  একে দেখেন?

মিউশ : সাহিত্য ও কবিতা এখন বৈজ্ঞানিক চিন্তাপ্রণালি এবং অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তাপ্রণালির মারাত্মক চাপের সম্মুখীন। স্টিভেনসের মর্মভেদী এবং ব্যবচ্ছেদী যে-মন, আমি মনে করি তা কবিতায় প্রয়োগ করা ভুল। আমরা যদি স্টিভেনসের  ‘স্টাডি অফ টু পিয়ার্স’ কবিতাটিকে নিই তাহলে দেখব, অন্য, এক গ্রহ থেকে এক প্রাণী নাশপাতিকে  যেনবা মঙ্গল গ্রহের মতো মনে করে বর্ণনা করার চেষ্টা করছে। এই হলো ব্যবচ্ছেদ। আমি মনে করি, পৃথিবীর বস্ত্তরাশিকে ব্যবচ্ছেদ না করে বরং গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। বস্ত্তর প্রতি  এ-ধরনের নিস্পৃহ মনোভাব যে-কেউ ওলন্দাজ স্টিল লাইফ চিত্রকলায় খুঁজে পাবেন। শোফেনহাউয়ার একেই শিল্পের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ-ধরনের গভীর চিন্তা জাপানি হাইকু কবিতাতেও দেখা যায়। বাশো বলেছেন, পাইন গাছ নিয়ে লিখতে গেলে তোমাকে পাইন থেকেই শিখতে হবে। জগৎকে ব্যবচ্ছেদ করার চেয়ে তা এক সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আমি মনে করি, শোফেনহাউয়ার প্রকৃতপক্ষে কবিদের, শিল্পীদের দার্শনিক।

প্রশ্ন : কেন?

মিউশ : কারণ তিনি দূরতেবর প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন। জগতে কাজ করতে গিয়ে আমরা জঘন্য আবেগের চক্রে পতিত হই – আপ্রাণ চেষ্টা আর সংগ্রাম করি উদ্ধারের জন্য। ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা শোফেনহাউয়ার প্রভাবিত হয়েছিলেন; তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে হলো শাশ্বত জন্ম-মৃত্যুর চক্রের বাইরে দাঁড়ানো। শিল্পও হলো এই ঘুরন্ত চাকার বাইরে দাঁড়ানো যেন আবেগ ও অভিপ্সামুক্ত হয়ে আর নিশ্চিত নিরাসক্তি নিয়ে কোনো বস্ত্তর দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারি। নিস্পৃহ গভীর  চিন্তনের দ্বারাই জীবনের সংরাগকে দূর করা যায়, যা শিল্পের এক ভালো সংজ্ঞার্থ : ‘নিরাসক্ত গভীর চিন্তন’। এ কারণেই শিল্পসংক্রান্ত শোফেনহাউয়ারের নির্যাস হলো স্টিল লাইফ। ডাচ স্টিল লাইফ।

প্রশ্ন : দুটো কবিতায়, একটি হলো ‘রাজা রাওকে’, যা ছিল এক কথোপকথনের জবাব, আর একটি সাম্প্রতিক কবিতা যার নাম ‘ক্যাপরি’, আপনি প্রকৃত বর্তমানের জন্য, ইন্দ্রিয়ের দেবত্বরহস্যের জন্য অপেক্ষার উল্লেখ করেছেন। এটা কি এ-ধারণাই দেয় যে, কবিতা হলো এমন এক সংস্কারাত্মক কাজ যার মাধ্যমে আমরা এই বর্তমানকে আহবান করতে পারি?

মিউশ : হ্যাঁ, ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, যে-জগৎকে আমরা জানি তা এক গভীর বাস্তবতার বল্কল, আর এই বাস্তবতাই এখানে  বিরাজমান।  শুধু শব্দে একে সীমাবদ্ধ করা  যায় না, আর এ-জায়গাতেই এ-শতাব্দীর কিছু লেখকের সঙ্গে আমার অমিল। এটা এমন এক ধরনের পার্থক্যের মতো, যখন একজন ভাষাকে, অন্তর্গত জীবনকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে, আর অন্য একজন যে আমার মতো শিকারি, মনস্তাপিত হয় এ-কারণে যে, বাস্তবতাকে ঠিক পাকড়ানো যায় না।

প্রশ্ন : লারকিনের ‘প্রভাতসংগীত’ কবিতাটি আপনার কেমন লাগে যেখানে তিনি মতামত উপস্থাপন করেন যে, ধর্ম হলো এক ধরনের চাতুরী আর তাকে বলেছেন, ‘এটি বিশাল এক শুঁয়াপোকা খাওয়া সাংগীতিক কিংখাব/ এই ছলনায় সৃষ্ট যে আমরা কখনো মরব না?’

মিউশ : আমি লারকিনের ‘প্রভাতসংগীত’ কবিতাটি  পড়েছি, এটি আমার কাছে মনে হয়েছে একটি জঘন্য কবিতা। আমি লারকিনকে পছন্দ করি না। তিনি ছিলেন একজন দারুণ কারিগর বা ক্রাফ্টসম্যান, বস্ত্ততই এক্ষেত্রে অতি ভালো একজন। রচনাশৈলীর অধিকারী হিসেবে আমি তাঁকে অতিউচ্চাসন দিই, কারণ তিনি আমার এ-ধারণাকে যথাযথভাবে প্রত্যয়িত করেন – ঠিক শুধু ভাবগত সংবেদনকে বিবেচনা না করে পরিষ্কার অর্থময়তাসহ স্পষ্টভাবে কবিতা লিখতে; কিন্তু আমি তাঁর কবিতা পছন্দ করি না, তিনি পছন্দের জন্য অতি লক্ষণাত্মক।

প্রশ্ন : লক্ষণাত্মক কার প্রতি?

মিউশ : বর্তমান, মারাত্মক বিশ্বদর্শন, বা weltanschauung-এর লক্ষণযুক্ত। আমার মনে হয় তাঁর কবিতায় কোনো প্রকাশ নেই। এমনকি তাঁর চিঠিগুলোও তাঁর বন্ধুদের হতাশ করে কারণ এগুলো বিদ্বেষময়, বিশেষত কালো, ভারতীয়, পাকিস্তানি এবং অন্যদের প্রতি জাতিবিদ্বেষাত্মক। তিনি ছিলেন অতি হতাশ এবং অতি অসুখী বেপরোয়া একজন মানুষ।  শূন্যতার প্রতি একধরনের আকাঙ্ক্ষার অভিপ্রায় তাঁর ছিল যা ছিল জীবনবিরোধী, যা তাঁকে বেশি কিছু দেয়নি। আমি শঙ্কিত যে, শিল্পে নৈতিক মানদন্ড প্রয়োগের রেওয়াজকে আমরা একেবারেই হারিয়েছি। কারণ যখন কেউ আমাকে বলে যে লারকিন বড়ো কবি, আর তা যদি তখন মানবিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে ভালো কবিতা লেখার জন্য ঢের হয়ে যায়, তখন আমি সন্দেহবাদী হয়ে উঠি। বোধহয় এ-ই আমার শিক্ষা ও প্রবৃত্তির ভাষ্য। আমার মন্ত্র হলো ইসসার এই হাইকুটির মতো – ‘নরকের ছাদে আমরা হাঁটি/ পুষ্পের দিকে তাকিয়ে।’ শ্লেষে বা ব্যাজোক্তিতে পড়ার জন্য তা অতি খেলো। এই শূন্যতা ও হিংস্রতা, যা লারকিনের weltanschauung-এর ভিত্তি, তা গ্রহণীয় হবে তার ওপর ভিত্তি করে যদি আপনার কাজ কিছুমাত্রায় আলোমুখী হয়।

প্রশ্ন : আচ্ছা, ভাষা কতটা নিবিড়ভাবে জগৎকে অধিকার করতে পারে?

মিউশ : ভাষা সবকিছুকে অধিকার করতে পারে না, বা তা আবার বিশুদ্ধ খেয়ালমাফিকও নয়। কিছু নির্দিষ্ট শব্দের, শুদ্ধ প্রথাগত ব্যবহার অপেক্ষা, গভীর অর্থময়তা থাকে। সুতরাং তাকে লেখার জন্য, ভাষা খেয়ালমাফিক – এ-ধারণাকে আমি বাতিল করি। আমি ভাষার ভেতরে বা তার বিষয়ে লিখতে গিয়ে তাকে écriture-এ নামিয়ে আনতে পারব না।

প্রশ্ন : প্রভিন্সেস কাব্যগ্রন্থের একটি গদ্যকবিতা ‘আ ফিলোসোফারস হোমে’ আপনি ঈশ্বরের প্রতি আরোপ করেছেন ‘একজন ফোটো-সাংবাদিকের আবেগোদ্দীপ্ত উদ্দীপনা।’ এটা কি প্রমাণ হিসেবে ঈশ্বরের আদর্শকে বর্ণনা করে, আর এটা কি সে-আদর্শ যা একজন কবি করতে চায়?

মিউশ : হ্যাঁ। তথাপি আমার বলা উচিত যে, একজন কবি হলেন পনিরের মাঝে এক ইঁদুরের মতো, যে খাওয়ার জন্য              কতটুকু পনির আছে এই ভেবে উত্তেজিত। আমি বলেছি যে, হুইটম্যান এমন একজন কবি, আমার ওপর যার খুব শক্তিশালী প্রভাব ছিল। হুইটম্যান সবকিছুকেই কাজে লাগাতে চাইতেন, সবকিছুকেই তাঁর কবিতায় ধরতে চাইতেন, আর আমরা তাঁর অন্তহীন শব্দপ্রবাহকে ক্ষমা করতে পারি, কারণ তিনি যতটা সম্ভব ব্যাপক বাস্তবতাকে কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। অনুমান করি, এটা কোনো না কোনোভাবে আমার মৃত্যুর পর জীবনের প্রতিচ্ছায়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ব্লেকের ভাষায় – ‘অন্তহীন শিকার।’

প্রশ্ন : কবিতা আপনার কাছে ‘বাস্তবের সংরাগময় পশ্চাদ্ধাবন’? আপনি কখনো কি আপনার কাজের মাধ্যমে এ-‘বাস্তব’কে অর্জন করতে পেরেছেন?

মিউশ : বাস্তব যার দ্বারা আমি বুঝিয়েছি ঈশ্বর, তা সবসময় অতলস্পর্শী।

শেয়ার করুন

Leave a Reply