জলরঙে জানা অজানার গল্প

লেখক:

জাহিদ মুস্তফা

অনুকূল একটি সাংস্কৃতিক পরিম-লে বেড়ে ওঠেও শিল্পী সাঈদা কামাল নিভৃতচারী। গত শতকের সত্তরের দশকে শিল্পীজীবনের সূত্রপাত তাঁর। আমাদের শিল্প-ভুবনে তিনি স্বনামে সুপরিচিত। স্নেহশীলা জননী কবি সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতার গুণাবলি তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। জলরং ছবি আঁকায় তাঁর পারঙ্গমতা আমাদের চারুশিল্পাঙ্গনে স্বীকৃত।

ঢাকার ধানম–তে এডওয়ার্ড কেনেডি সেন্টারে শিল্পী সাঈদা কামাল টুলুর নবম একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়ে গেল গত ৬ থেকে ১৮ ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত। প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘কত অজানারে’। এতে শিল্পীর সাম্প্রতিককালে আঁকা চুয়ালিস্নশটি চিত্রকর্মের সমাবেশ ঘটেছে। এর সবই কাগজে জলরঙে আঁকা।

এর আগে ১৯৯৩ থেকে ২০১৫ সাল অবধি তাঁর নয়টি একক প্রদর্শনী হয়েছে দেশে-বিদেশে। একেবারে প্রথম একক আয়োজিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ওয়াল্টহামেন আর্টিস্ট স্টুডিওতে। তাঁর দ্বিতীয় একক আয়োজিত হয় ঢাকায় দৃক গ্যালারিতে ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৯ সালে তাঁর তৃতীয় একক অনুষ্ঠিত হয় জার্মানির হামবুর্গে বাংলাদেশ-জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। ঢাকার গ্যালারি চিত্রকে ২০০৪ সালে হয় চতুর্থ একক। পঞ্চম একক হয় ঢাকার ক্যাফে ম্যাংগোয়। ষষ্ঠ প্রদর্শনী আয়োজিত হয় ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের সাসেক্সের ওর্থিংয়ে সাধারণ গ্রন্থাগারে। তাঁর সপ্তম একক অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে, কবি সুফিয়া কামালের জন্মদিন উপলক্ষে, ২০১১ সালে। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের সাসেক্সের ওক্সমার্কেট শিল্পকেন্দ্রে তাঁর অষ্টম একক চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজিত হয়। প্রতিটি প্রদর্শনীতেই শিল্পীর আঁকার মাধ্যম জলরং।

জলরঙের প্রতি সাঈদার এই অনুরাগ যেন সাহিত্যের নানান শাখার মধ্যে কবিতার প্রতি ভালোবাসার মতো। কারণ, আমরা জানি শিল্পে জলরঙের মর্যাদা কবিতার অনুরূপ।

প্রসঙ্গক্রমে তাঁর নিজের কথাগুলো তুলে ধরা যাক। তিনি বলেছেন – নিজের কাছে ছবি আমার বড় ব্যক্তিগত, অন্তর্গত কবিতার মতো, গানের মতো। বড় আনন্দের, বড় বেদনার। জলরঙের স্বপ্নময়তা, রহস্যময়তা, গতিমাধুর্য আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে, আলোড়িত করে, ভাবায় – কাজ করার প্রেরণা জোগায়। নিসর্গ নানাভাবে

ধরা দেয় আমার চোখে – কখনো ভারাক্রান্ত, খুলে দেয়

রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শময় স্মৃতির দরোজা। এই অপরূপ পৃথিবী, এই দেশ, মাটি-মানুষ, গাছ, নদী-নৌকা, আমার চারপাশের চিত্র-রূপময় জগৎ সবই আমার ছবিতে আসে বারবার। এ ভালো লাগা কখনো ফুরায় না। জীবনের বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আনন্দ-বেদনার ভারে সম্পৃক্ত কিছু ছবি নিয়ে আমার এ-প্রদর্শনী।

বাংলাভাষা আন্দোলনের উত্তাল বছর ১৯৫২ সালে সাঈদা কামালের জন্ম। তাঁর শিক্ষাজীবনে তিনি দেখেছেন বাষট্টির

ছাত্র-আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। মার্চের সেই টগবগে সময়ে চারুশিল্পীদের স্বাধীনতা-মিছিলে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে ঢাকার তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে চিত্রকলায় সণাতক হন তিনি।

ঢাকায় আয়োজিত তাঁর সবকটি একক চিত্রপ্রদর্শনী দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাঁর চিত্রকর্ম অবলোকন করে পেয়েছি, বাস্তবানুগতার প্রতি অনুগত থেকে তাকে শিল্পিতভাবে রোমান্টিক ধাঁচে তুলে আনার প্রবণতা। তাঁর চিত্রকর্মে আমরা দেখতে পাই শিল্পীর চোখ দিয়ে দেখা নানা সৌন্দর্যের বিষয়-আশয়। তিনি কখনো নিজের চারপাশের সরল সৌন্দর্য দেখে আঁকেন, কখনো-কখনো তাকান প্রকৃতির অফুরান বৈচিত্র্যের দিকে। জলরঙের নমিত স্বভাবে ওই সৌন্দর্যের অনুবাদ করেন। কাজগুলো হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।

শিল্পীর চিত্রকলা সম্পর্কে বরেণ্য শিল্পী-ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান লিখেছেন – সাঈদা কামাল জলরঙে অত্যন্ত পারদর্শী। রং প্রয়োগের শুদ্ধতা, সাবলীল কম্পোজিশন ও মিশ্ররঙের সমন্বয়ে তাঁর আঁকা ছবি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ছবির সহজ-সরল প্রকাশরীতি আমাকে মুগ্ধ করে। দীর্ঘকাল ধরে জলরং-চর্চায় নিবেদিত শিল্পীদের মধ্যে সাঈদা কামাল অন্যতম। তাঁর ছবি একটি শান্ত ও মায়াবী রূপ প্রকাশ করে।

এবারের প্রদর্শনীর চুয়ালিস্নশটি চিত্রকর্ম যেন ভ্রমণপিয়াসী এক চিত্রকরের ডায়েরি। এজন্যই বোধকরি শিল্পী প্রদর্শনীর শিরোনাম রেখেছেন – ‘কত অজানারে’। আকারে তুলনামূলক ছোট অনেকটা সহজে বহনযোগ্য স্কেচবুকেই প্রধানত আঁকেন সাঈদা কামাল। দেশে-বিদেশে নানা জায়গায় বেড়িয়েছেন আর সেসব এলাকার দর্শনীয় বিষয়বস্ত্তর ছবি এঁকেছেন।

বান্দরবানের দূর পাহাড়-তরঙ্গের ছবি এঁকেছেন, সবুজ-নীল বর্ণের সেই নন্দিত ছবির শিরোনাম দিয়েছেন – নীরবতা। এঁকেছেন নাইক্ষ্যংছড়ির ঝরনা, পুরান ঢাকার গলি, সুন্দরবনের ছবি। শিল্পী ডানা মেলেছেন দূর দেশে-দেশে। যুক্তরাজ্যের সাসেক্সের ওর্থিং সৈকতের আকাশে উড়ন্ত বলাকা এঁকেছেন, লন্ডনের বাড়ি এঁকেছেন পত্রপলস্নবশোভিত, ভুটানের থিম্পুর পাহাড় কেটে তৈরি সিঁড়িসমেত প্রকৃতি নিয়েও এঁকেছেন। একধরনের মুগ্ধতার অনুভব মনে আসে এসব কাজ দেখে। শিল্পীর সঙ্গে তাঁর চোখ দিয়ে যেন দর্শকরাও দেখে নিতে পারেন নানান দেশের নানান নিসর্গ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply