জলের কাছে যাওয়া

লেখক:

মণীশ রায়

Jaler Kache jaoa

একটা কলকল-ছলছল করা টলোমলো নদী, নাম কি তা জানা নেই।

বুকজুড়ে অজস্র স্বচ্ছ কাচের টুকরোর মতো ঢেউ তিরতির করে কাঁপছে; অল্প হাওয়ায় নদীর উচ্ছল কিশোরীর বুক দুলছে; সেই মৃদু ছন্দ পাড়ে এসে বালিকার চুড়ি ভাঙা হাসির মতো ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে।

দূর থেকে একটা নিঃসঙ্গ বটগাছের গুঁড়ি দখল করে রইসউদ্দিন সে-দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে আছে শূন্যদৃষ্টি মেলে। উথালপাথাল নদীর জলে ডলফিন হওয়ার বাসনা অন্তরে। সামান্য রোদের উত্তাপ শরীরে জ্বালা ধরালেই টুক করে শীতল জলের গভীরে ডুব দেওয়ার আকুলতা। আহা! রইসউদ্দিন কেন পদ্মানদীর  শুশুক হতে পারে না?

ঘুমের ভেতর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে এলো রইসউদ্দিনের বুকের গহ্বর থেকে।

আর ঠিক তখনি ইন্টারকমটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। ক্রিং ক্রিং ক্রিং। এতটাই কর্কশ ও গগনবিদারী এ-শব্দ যে, ঘরের সব আসবাব আর দরজা-জানালা কেঁপে উঠল রিনরিন করে।

কদিন ফ্ল্যাট-মালিক সমিতির সভাপতির কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেছেন রইসউদ্দিন নিজে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, কিছু বললেই সভাপতি সাহেবের এক উত্তর, ‘একটু সহ্য করে নেন ব্যাংকার সাহেব। আস্তে আস্তে ঠিক অয়ে যাবে।’

কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোকিছু ঠিক হয়নি। মাঝে মাঝে বড় বেশি আফসোস হয়; শরীর রি-রি করে রাগে; বিশেষ করে যখন কেয়ারটেকারকে কিছু একটা বললে সে ছুতোনাতা দেখিয়ে এড়িয়ে চলে, যখন দারোয়ানটি আদাব-সালাম কিছু না দিয়ে সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে হেঁটে যায়, যখন আশপাশের সাধারণ ফ্ল্যাটমালিকরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ওর সঙ্গে কথা বলতে চায়, তখন।

একদা ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। সারাক্ষণ কোট-টাই পরে এসি রুমে বসে থাকতে হতো। তাঁর ভয়ে

পিয়ন-আরদালি এবং অধীনস্থ কর্মচারীরা তটস্থ হয়ে পড়ত।

একবার ক্যাশের হিসাবে সামান্য ভুল করায় একটি মেয়েকে তার কক্ষে কৈফিয়ত তলব করা হলো। রইসউদ্দিন ওর

সিংহাসন-মার্কা সেগুনকাঠের চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে পাথরকঠিন চোখে এমন তীব্রভাবে কমবয়সী সুন্দরী মেয়েটির দিকে তাকালেন যে,  সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এমনি তার ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ধার ছিল চাকরিজীবনে। নিজের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ও ধার সম্পর্কে বলতে গিয়ে আত্মীয়-পরিজন ও পরিচিতজনের কাছে তিনি প্রায়ই এ-গল্পটি শুনিয়ে থাকেন; এ-সময় তাঁর চোখ-মুখ বেয়ে আত্মপ্রসাদের একরকম দ্যুতি ঠিকরে বেরোতে শুরু করে।

বিয়ের বছরদুয়েক পর বরিশালের আগইলঝাড়ার মেয়ে স্ত্রী লাইজুর সঙ্গেও ব্যক্তিত্ব ফলাতে চেয়েছিলেন তিনি; কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যেদিন তিনি হম্বিতম্বি করে ঘর মাথায় তুলতেন, সেদিন লাইজু রান্নাবান্নাসহ ঘরকন্নার সমস্ত কাজ বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে থাকতেন বিছানায়। দুদিনেও বিছানা থেকে নামতে চাইতেন না লাইজু। রইসউদ্দিনের নাওয়া-খাওয়া সব এলোমেলো হয়ে পড়ত। গ্রাম  থেকে আত্মীয়-পরিজন কেউ এলে তাদের নিয়ে হতো মহামুশকিল। অগত্যা আর কী করা, স্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণের ভেতরই খুঁজে পেলেন দাম্পত্যের পরম সার্থকতা। এই বন্ধুর দাম্পত্য-রাস্তায় আজ্ঞাবহ পিয়নের মতো কোনোরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা আর কি।

অন্দরমহলের চিত্র এরকম হলেও বাইরে কিন্তু রইসউদ্দিন বরাবর সুন্দরবনের অমিতবিক্রম বাঘই ছিলেন। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেত না এরকম স্টাফ ব্যাংকে চাকরি করার সময় কমই খুঁজে পাওয়া যেত। সবাই জানত, তিনি ব্যাংকের জটিল সব বিধিবিধানের গ্যাঁড়াকলে আটকে থাকা  কঠিন-কঠোর এক প্রশাসক। সবার কাছে রেহাই পেলেও তাঁর কাছে কোনো কারণে ফাইল আটকে গেলে সব একেবারে দফারফা। এমনি ছিল তাঁর ক্ষুরধার বিচার-বিশ্লেষণ ও ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের ছটা। ব্যাংকের যেদিক দিয়ে হেঁটে যেতেন, কোনো কারণে অধস্তন কেউ সামনে পড়ে গেলে সে পারলে পাশের দেয়ালের সঙ্গে পোস্টারের মতো সেঁটে যেতে চাইত,  ভয়ে ও ত্রাসে। কারণ চোখের সামনে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি  প্রথমেই যে-প্রশ্নটি করবেন তা হলো সে কোথায় ও কেন যাচ্ছে।  প্রশ্নের সঠিক উত্তর না মিললে সঙ্গে সঙ্গে শোকজ। পোস্টার না হয়ে উপায় আছে?

ভাবলেই পুলক জাগে মনে। অন্যকে অধীনস্থ ও পরাস্ত রেখে ক্ষমতার দাপট দেখানোর মাঝে যে-আত্মপ্রসাদ পাওয়া যায় তা কি অন্য কিছুতে মেলে?  রইসউদ্দিন সেই মজাটাই চেটেপুটে খেয়েছেন চাকরিজীবনে। এখনো সুযোগ পেলে জেল্লাহীন সেই ঢোলটা গলায় লাগিয়ে বাজাতে আঁকুপাঁকু করে মন। শব্দ হয় না আগের মতো, এই যা।

ও-সময় কত রকমের মানুষজনের সঙ্গে ছিল রইসউদ্দিনের  পরিচয়; সামান্য লোনের জন্য কত কাকুতি-মিনতি; সব তাঁর মনে আছে।

দুটো-তিনটা সিম অদলবদল করেও ওসব যন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায় ছিল না। একবার এক পুলিশ কর্মকর্তাকে তো মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, ‘আপনি আপনার রাজ্যে রাজা, আমি এখানে। প্লিজ অত আবদার করবেন না। যা নিয়ম রয়েছে সেই মোতাবেক আমাকে কাজ করতে দেন। আপনার রিকমেনডেড লোক লোন পাওয়ার যোগ্য হলে অবশ্যই পাবে। যোগ্যতা না থাকলে আমার সরি বলা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। প্লিজ, আমাকে আমার কাজ করতে দিন।’

অথচ অবসরগ্রহণের পর এখানে ফ্ল্যাটমালিক হয়ে এসে সেই মানুষটিকেই নাকাল হতে হচ্ছে প্রতি পদে; কেউ আর পাত্তাই দিতে চাইছে না তাঁকে!

তাঁকে এখন এসব কেয়ারটেকার-গার্ডদের তোয়াজ করে চলতে হবে? বড় চাকরির সুবাদে সারাজীবন যে-লোকটা অন্যের তোয়াজ পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত, তাঁর এখন সত্তরটা ফ্ল্যাটের মালিক সমিতির সভাপতির দিকে বোকার মতো মুখ করে চেয়ে থাকতে হয়; তিনি খুশি হলে কাজটি হবে, নইলে নয়?

রইসউদ্দিন ঘুম থেকে উঠে চোখ বোজা অবস্থায় ইন্টারকমের রিসিভারটি কানে দিয়ে গম্ভীরভাবে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কেয়ারটেকার হামদু চেঁচিয়ে উঠল, ‘স্যার পানি শেষ। পানি নাই।’ বলেই লাইনটা কেটে দিলো।

ছ্যাঁৎ করে উঠল মাথার ভেতরটা। মনে হলো কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সেখানে। একটা সামান্য কেয়ারটেকার, সে কিনা কথা বলার আদবটুকু পর্যন্ত জানে না! কথা শেষ করার আগেই টেলিফোনের লাইন কেটে দেয়? অথচ চা-কফি দেওয়ার সময় পিরিচে এর কিছুটা পড়ে থাকায় একবার ব্যাংকের এক পিয়নকে সে বরখাস্ত করেছিল। একই কথা দুদিন বলার পরও যখন শোনেনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা। কত কান্নাকাটি আর পা ধরাধরি – কিছুতেই মন গলানো গেল না ডিজিএম সাহেবের।

অথচ নিজের ফ্ল্যাটের সামান্য কেয়ারটেকার কোনোরূপ আদাব-সালাম না দিয়েই রিসিভার রেখে দেওয়ার সাহস পায়?

রইসউদ্দিন ছুটে গেলেন বাথরুমে। সকালে চা পানের আগে ও পরে মিলিয়ে মোট দুবার টয়লেটে যাওয়ার একটা পুরনো অভ্যাস  রয়েছে। কমোড ও পুশ-শাওয়ার ঠিকঠাক না চললে পুরো দিনটাই তাহলে মাটি। সেই ভাবনা ও তাগিদ থেকেই তাঁর সেদিকে ছুটে যাওয়া।

বাথরুমে ঢুকে তিনি প্রথমেই পুশ-শাওয়ারটির বোতামে আঙুল দিয়ে চেপে ধরলেন। ফুসফুস করে হাওয়া বেরোচ্ছে সেখান থেকে, জল নয়। কমোডে ফ্ল্যাশ করলেন; কই, লো-ডাউনের নবটি ভাঙা ঘণ্টার মতো নড়তে শুরু করে দিলো। এক ফোঁটা জল নেই ভেতরে।

সঙ্গে সঙ্গে তলপেটে কামড়। তিনি ছুটে গেলেন স্ত্রী ও সন্তানের কক্ষে; তিন ছেলেমেয়ের ভেতর ছোট ছেলেটাই এখন ওদের সঙ্গে থাকে। এক ছেলে এক মেয়ে বিয়েশাদি করে পাকাপাকিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। সপ্তাহে একবার করে ইন্টারনেটের বদৌলতে ভিডিও কনফারেন্স করে। বিদেশে গিয়ে ওরা কত যে সুখে রয়েছে তা ওদের ছেলেমেয়েদের হাসি-ঠাট্টা-খুনসুটি দিয়ে বারবার বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাতেই রইসউদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। ছেলেমেয়ের ছবির মতো সংসার আর উপচেপড়া আনন্দ-উচ্ছ্বাস ক্ষণিকের জন্য হলেও মা-বাবাকে আপ্লুত করে।

এসব দেখেশুনে ছোট ছেলেটাও, যে কিনা একটা বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, এদেশে আর থাকতে চাইছে না, ক্রেডিট ট্রান্সফার করার সুযোগের জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে।

শুধু বুড়োবুড়ির আর কোথাও নড়াচড়ার ইচ্ছা হয় না। দু-চারবার বিদেশে গিয়েও থেকে দেখেছেন। কিন্তু খাওয়া, থাকা, কথা বলা – কোনোদিক দিয়েই শান্তি খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সন্তানদের হতাশ করে এদেশেই ফিরে এসেছে রইসউদ্দিন দম্পতি।

ওদের কাছে এ-ফ্ল্যাটটি হচ্ছে সুখের একমাত্র আস্তানা; মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাটাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বটে; কিন্তু নাগরিক টান আর মোহ সেপথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়; অসুস্থ হলে অ্যাপোলো বা স্কয়ার হসপিটাল কোথায় পাবেন তাঁরা? মাঝে মাঝে ফেলে আসা শৈশব ‘আয় আয় তই তই’ বলে ডেকে উঠে উতলা করে তুললেও এই ফ্লুরোসেন্ট-সোডিয়াম আলোয় ঝলমল করা ঢাকা শহর ওদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। যে-মানুষটির প্রতি পদে নাগরিক আলো, লিফ্ট, গাড়িসহ অজস্র প্রযুক্তি-পণ্যের দরকার হয়, সে কীভাবে গ্রামে গিয়ে মানিয়ে চলবে? যে-গ্রাম একদা ফেলে এসেছিল, সেই গ্রাম তো এখন গা-ছমছম করা অজানা এক জগৎ। এক-দুদিনের বেশি উপস্থিতি নিজেকে বিরক্ত ও রাগান্বিত করে তোলে। সে কীভাবে গ্রামে গিয়ে মাটির মানুষ হবে এখন?

রইসউদ্দিন স্ত্রীর রুমে ছুটে যান; ওকে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন, ‘লাইজু, বাথরুমে পানি আছে? আমারটায় নাই।’

লাইজুর প্রেসারের ওষুধ খেয়ে শোয়া আর বেলা করে জাগার অভ্যাস। এজন্য লাইজুর শোয়ার কক্ষ আলাদা, বহু আগেই এ-প্রথা চালু হয়েছে দুজনার মাঝে। মোটাসোটা ভারিক্কি শরীর-স্বাস্থ্য আর রোগব্যাধি অর্জনের পর থেকে ওদের কারোরই একসঙ্গে এক বিছানায় শোয়া হয়নি। দীর্ঘসময় ধরে একসঙ্গে একই ছাদের তলায় বসবাসের কারণে নিজেদের ভেতর একধরনের মায়া-মমতা মাখানো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বটে; তবে শারীরিক মোহ থেকে অনেক দূরে দাঁড়ানো বলে কেউ কারো প্রতি নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া এগিয়ে আসেন না। দুজনার জগৎ দুরকম রং দিয়ে তৈরি; কেউ কারো কাছে ঘেঁষেন না আবার এড়িয়েও যান না। দাম্পত্য ঝগড়াগুলোও বরাবরের মতো প্রয়োজন-ঘেঁষা; একজন যে যুক্তি দেন, অন্যজন সেটি খ-ন করতে পারলে একধরনের আরাম বোধ করেন। যেন বাজারে গিয়ে দোকানদারকে দরকষাকষির মাকড়সার জালে ফেলে দিয়ে নিজেকে জিতিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা; পারস্পরিক ঈর্ষা কিংবা ভালোবাসা কোনোটাই এখন আর ওদের ছুঁয়ে যায় না।

লাইজুর সকালবেলার ঘোরলাগা মোহময় ঘুমটা ভেঙে যেতেই ছ্যাঁৎ করে ওঠেন, প্রথম কথাটাই বড় বেশি কর্কশ, ‘নিজেরও ঘুম ভেঙে যায় সকাল না হতেই, আর অন্যকেও ঘুমাতে দেবে না। যত সব বদখত খাইসলত। কী হইছে, হইছেটা কী?’

‘হামদু জানাল, পানি নাকি শেষ। তোমার বাথরুমের কী অবস্থা?’ নরম করে বলে।

‘আমার বাথরুমটা কি আকাশে? বাথরুমে ঢুকলেই তো হয়, এজন্য আমাকে জাগাতে হবে? যত বয়স বাড়ছে তত গর্দভ হচ্ছ।’ একরাশ বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরল লাইজু।

রইসউদ্দিন পা টিপেটিপে স্ত্রীর বাথরুমে ঢুকে বেসিনের কলটা খুলে দিলেন। সেখান থেকে কেবল ফোঁসফাঁস শব্দ বেরোচ্ছে, কোনো জলধারা নেই।

তিনি হতাশ হয়ে ফিরে এলেন নিজের রুমে। একবার মনে হলো ছেলেকে জাগাবে এজন্য। কিন্তু ইরফানের যা মেজাজ-মর্জি, তাতে ওর দরজায় গিয়ে টোকা দেওয়ার সাহস হলো না।

এ-সময় রইসউদ্দিনের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল সভাপতি  মনোনীত কেয়ারটেকার  ইঁচড়েপাকা হামদুর ওপর।

তিনি লিফ্ট ধরে সোজা নিচের গ্যারেজে নেমে এলেন। রাগে শরীর রি-রি করছে। একই সঙ্গে তলপেটে কামড় শুরু হয়েছে। এ সময় জলের অভাব কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়। রইসউদ্দিনের সমস্ত দিনের আরাম আর স্বস্তির শুরুটা যখন থেকে ঘটে তখনই এই বিপত্তি। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, একদিন না খেয়ে থাকা যায়; কিন্তু নানা রোগে জরজর এ-বয়সে এসে যদি প্রাণখুলে সকালের প্রাত্যহিক কর্মটি সম্পাদন না করা যায় তো এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? একশ কোটি টাকার লোন পাওয়ার চেয়েও যে এর আনন্দ অনেকগুণ বেশি, তা ওদের মতো মূর্খদের কে বোঝাবে?

নিচে নেমে তিনি কিছুটা থমকে গেলেন। বেশ কজন সম্ভ্রান্ত ফ্ল্যাটমালিক বিল্ডিংটির সভাপতি হোটেল-মালিক আবুল হোসেনকে ঘিরে রেখেছে। জটলার পাশে কেয়ারটেকার হামদু দাঁড়ানো।

রইসউদ্দিনকে দেখে আবুল হোসেন দরাজ গলায় বলে উঠলেন  – ‘আচ্ছা বলেন তো আমরা এখানে কী করব ব্যাংকার সাহেব? এক  ফোঁটা পানি নাই মূল লাইনে। তো আমরা পানি পামু ক্যামনে? আমার কাছে চিল্লাচিল্লি করলে লাভ অইব? বলেন ব্যাংকার সাহেব লাভ আছে কুন?’

রইসউদ্দিন সামান্য দমে গেলেন। এরকম তমিজের সঙ্গে কথা বললে রাগ করা বা কোনোরূপ উষ্মা প্রদর্শন করা সত্যিই মুশকিল হয়ে পড়ে। ভদ্রতাবোধ জাবড়ে ধরে থামিয়ে দিতে চায়।

তিনি কিছুক্ষণ গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থেকে রোগী দেখার মতো করে কখনো রিজার্ভ ট্যাংকের ঢাকনি তুলে পরীক্ষা করলেন জলের

সঞ্চয়, কখনো টানা মোটর, পানি তোলার চেক-বল ও দৃশ্যমান পাইপ-ফাইপগুলো হাত দিয়ে ধরে পরখ করে গম্ভীর কণ্ঠে সভাপতি সাহেবকে বললেন, ‘বিষয়টা ভালো ঠেকতেছে না। কোনো সাবোটাজ কিনা বুঝতে পারতেছি না।’

আবুল হোসেন বিষয়টা বুঝতে পারলেন না। লেখাপড়া নেই বললেই চলে। লেখাপড়ার প্রয়োজন হলে তিনি চোখে চশমা পরে নেন; তবে তাঁর হয়ে লেখাপড়ার সেই কাজটা সারে কেয়ারটেকার হামদু। কারণ, হামদু নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর এগোতে পারেনি।

তবে যে-জমিটির ওপর এই তিন-তিনটি আলিশান অট্টালিকা ডেভেলপারদের কল্যাণে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আবুল হোসেন এরই একদা মালিক ছিলেন। একাত্তরের পর অতিঅল্প টাকায় কেনা জমি এখন সোনার চেয়েও দামি; একটা সামান্য ভাত-মাছ-বিক্রেতা হোটেলঅলা ঢাকাই জমির আকাশছোঁয়া ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে ফুলেফেঁপে বড়লোক হয়ে যাওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আবুল হোসেন।

তবে গাড়ি-বাড়িঅলা বড়লোক হলেও লেখাপড়ার জোর না থাকায় কিছুটা পেছনে পড়ে গেছেন তিনি। তাঁর আচার-আচরণ ও

কথাবার্তার বালখিল্য রইসউদ্দিনের মতো মানুষজনদের তাকে করুণা করার রাস্তাটা সুগম করে দিয়েছে। কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, ‘ব্যাটা হোটেলঅলা আর কী বুঝব? ভাগ্যগুণে জমির মালিক হইয়া চাইরটা ফ্ল্যাট পাইয়া ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। এখন সবার ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায়। শালা উজবুক কোথাকার!’

রইসউদ্দিন গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন গ্যারেজের মাঝখানে। চারপাশে উষ্মা-মেশানো নানাজনের ফিসফিসানি। একটুখানি সুযোগ পেলেই বমি করে দিচ্ছে এর-ওর কানে; যাদের চক্ষুলজ্জা নেই তারা রাগে-দুঃখে ফেটে পড়ছে অন্যের ওপর। মোদ্দাকথা, দিনের শুরুটাতেই জল না পেয়ে সবাই একেবারে তাতানো উনুন হয়ে রয়েছে এক-একটি; কথা বলার সামান্য খড়কুটো পেলেই রীতিমতো উত্তাপ বেরোচ্ছে ধোঁয়ার কু-লী হয়ে!

একজন ফ্ল্যাটমালিক, সম্ভবত রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ী,  ফিসফিস করে ওর কানে কানে বলে উঠলেন, ‘সব আবুল হোসেনের ষড়যন্ত্র, চেক বলটা ইচ্ছা কইরা নষ্ট করে রাখছে। বাড়ি বরিশাল না, বদের হাড্ডি।’

অন্যজন তেড়ে এলো হামদুর দিকে, ‘ওই ব্যাটা সকালে পানি নাই নাই কস ক্যা? রাতে কী করছিলি? গাঞ্জা খাইছিস?’

একজন মহিলা, স্বামী যার গার্মেন্টসে মোটা বেতনে কাজ করে,  এ-কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘ওপরের ট্যাংক খালি হয় ক্যামনে? আধঘণ্টায় যে ট্যাংক পূর্ণ হয়, সারা রাতে আধঘণ্টা সময় পায় নাই এই হামদু?

‘আপনারা বেশি ভদ্রলোক হইছেন। অত ভদ্রলোক দিয়া এই বিল্ডিং চালানো মুশকিল। একটু আঙুল বাঁকা করন লাগব।’ হসপিটালের এক ডাক্তারের মন্তব্য।

‘মার লাগান। ভদ্রকথায় কিছু হবে না।’ রইসউদ্দিন চেনে না, এরকম এক মালিকের মন্তব্য ওর কানে এলো।

তিনি এসবের ভেতর গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ কাটিয়ে সভাপতিকে বললেন, ‘চেষ্টা করুন। আমি ওপরে যাচ্ছি’ বলে তিনি ফ্ল্যাটে চলে এলেন।

কিন্তু এর ভেতর লাইজু ও ছেলে ইরফানের ঘুম ভেঙে গেছে। জল না পেয়ে ওদের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ওর ওপর। তিনি ঘরের ভেতর পা দিতেই লাইজু চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তুমি কি জিন্দেগিতে একটা ভালো কাজ করতে পারো না?’

‘কী করলাম আমি আবার?’ নরম গলায় উত্তর দেন রইসউদ্দিন।

‘পানি নাই কেন? এটা ফ্ল্যাট না বস্তি? ছেলেটা ভার্সিটিতে যাবে, পানি নেই। ফালতু। তুমি এ-ফ্ল্যাট বিক্রি করার ব্যবস্থা করবা। উফ।’ লাইজু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন সোফায়। জল ছাড়া সকালটা কীভাবে যাবে ভাবতেই মাথা ঘুরতে থাকে ওর।

‘আমি তো নিচে থেকেই এলাম। কী করব বলো। মেইন লাইনে পানি নেই। ওরা কী করবে?’ আরো নরম করে বলার চেষ্টা করলেন তিনি।

সঙ্গে সঙ্গে ইরফান বলে উঠল, ‘আব্বা তোমাকে আরো হার্ড হতে হবে। ওরা  তোমাকে পেয়ে বসছে। ওরা ইচ্ছা করে ওপরের পাইপ বন্ধ করে রাখে।’

‘বোঝা তোর বাপকে। ওরা বলে দিয়েছে লাইনে পানি নেই। তিনি ওমনি দরবেশের মতো ওপরে উঠে আসছেন। কীভাবে যে ব্যাংক চালাইছে, আল্লাহ মালুম।’ ঠোঁট উলটে লাইজু ওর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।

রইসউদ্দিন নিজের বেডরুমে চলে এলেন। কিন্তু সকাল যত গড়াচ্ছে তত পেটের ভেতরকার অস্বস্তিবোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। হাতের কাছে বুয়াও নেই যে, দুই বালতি জল নিয়ে এসে কাজ সারবে। নিজের ছেলেটা এসব নিয়ে কথা বলবে বটে; কিন্তু দুই বালতি জল তুলে আনবে না কোথাও থেকে। লাইজু তো আরো আরামপ্রিয়, এসির বাতাস কিঞ্চিৎ কম ঠান্ডা হলেও ফ্ল্যাট মাথায় তুলে ফেলবে। অবস্থা বেশি খারাপ দেখলে মা-ছেলে দুজনই হয়তো গাড়ি নিয়ে আত্মীয়-পরিজনের বাসায় পালিয়ে যাবেন, উপায়ান্তর না দেখলে সোজা হোটেলে গিয়ে উঠবেন। আর দূর থেকে ওর ওপর সমস্ত দোষ চাপিয়ে নিজেরা যুদ্ধে জেতার এক ধরনের বিকৃত আনন্দ উপভোগ করবেন।

সবই জানা রইসউদ্দিনের; তবু  কিছু করার নেই। তিনি অসহায়; মনে মনে নিষ্ফল গজরানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তিনি বাথরুমে ঢুকলেন। বাথটাব, বেসিন, শাওয়ার কল সবই জলশূন্য। তিনি বেসিনের সামনে গিয়ে নিজের মুখটা দেখতে লাগলেন। খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি গজিয়েছে সেখানে। আগে প্রতিদিন সকালে ক্লিন-শেভড ও  স্যুটেড-বুটেড হয়ে অফিসে ছুটতে হতো। এখন সেই তাড়া নেই। তবু দুদিনের বেশি হলেই কেমন যেন অস্বস্তিবোধ হতে শুরু করে। আজ ভেবেছিল দাড়িটাড়ি কামিয়ে পুরনো অফিস থেকে ঘুরে আসবে একবার। কোথায় কী?

হতাশা থেকে রাগের জন্ম; সেই অভিব্যক্তিহীন রাগ ধীরে ধীরে অবদমিত যন্ত্রণা ও শঙ্কাবোধে পরিণত হয়।

ক্ষতবিক্ষত রইসউদ্দিন এ-সময় কিছু একটা খুঁজতে থাকেন। এত বড় ব্যাংক কর্মকর্তা – একটা মুশকিল আসান কি মিলবে না? এ সময় একজনের কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনটা এক অজানা আনন্দে ভরে উঠল। নিজেকে ফের ব্যাংকের ব্যক্তিত্বশালী এক কর্মকর্তা বলে মনে হতে লাগল। অতিপরিচিত আত্মপ্রসাদের  অনুভব ও  আমেজে সতেজ হয়ে ওঠে রইসউদ্দিনের সত্তা।

তিনি পাগলের মতো তাঁর মোবাইলের নাম-তালিকায় একটি বিশেষ নাম খুঁজতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করার পর চোখদুটো ওর উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আহ্! কী যে প্রশান্তি; মনে হচ্ছে,  এই বুঝি রইসউদ্দিনের অন্তিম ও একমাত্র  ইচ্ছাটা পূরণ হতে চলল। শীতের সকালে ঘনকুয়াশা ফুঁড়ে যে রোদ উজ্জীবিত করে তোলে সবাইকে, সেরকম এক অনুভব। সঙ্গে সামান্য উচাটন, কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না।

বুকভরা আশা নিয়ে একটু বাদে রিং দিলেন রইসউদ্দিন, ‘হ্যালো, হারুন?’

‘জি। ওয়াসার অ্যাকাউন্টস অফিসার বলছি। কে?’

‘আমি ডিজিএম রইসউদ্দিন। চিনতে পারছ?’ ফুল্ল হয়ে ওঠে চেহারার আনাচ-কানাচ।

‘জি চিনতে পারছি স্যার।’ ওপাশ থেকে উত্তর আসে।

‘আমাদের এরিয়ায় তো পানি নেই হারুন। কিছু একটা ব্যবস্থা করো। মরে যাচ্ছি তো। পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে বলো?’

‘স্যার, আমি তো ছুটিতে রয়েছি। অসুবিধা নেই, আমি  একটা নম্বর দিচ্ছি। আমার কথা বলে রিং দেন স্যার। হয়ে যাবে কাজ’ বলে হারুন ফোনটা ছেড়ে দিলো। অবসরগ্রহণের কয় বছর আগে এই ছেলেটি ওর ব্যাংকে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে ঢুকেছিল। কদিন চাকরি করে সরকারি সুযোগ মেলায় দেরি করেনি, লেজ গুটিয়ে চম্পট দিয়েছিল। ছেলেটিকে ওই সময়টায় নানারূপ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন রইসউদ্দিন। সেই সূত্র থেকেই ফোন করা।

তিনি হারুনের দেওয়া টেলিফোন নম্বরটায় রিং দিলেন। এক-একটি রিং যেন গোটা বছরের মতো দীর্ঘ, শেষ হতেই চায় না। বাজছে তো বাজছেই; কোনো সাড়াশব্দ নেই। রইসউদ্দিনের কানে লাগানো মোবাইলটি, চোখমুখ অন্ধকার। মনে মনে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিনকে স্মরণ করছেন, ‘হে খোদা, তুমি রহমতের ভা-ার। এ-সমস্যাটার একটা সমাধান করে দাও।’

যত বিড়বিড় করছেন তত রইসউদ্দিনের চোখমুখ কুঁচকে যাচ্ছে। অজানা এক আশঙ্কায় ওর রিং ও পেসমেকার লাগানো অসুস্থ বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে।

অনেকক্ষণ পর ঘুমকাতুরে একটি গলা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে?’

‘আপনাদের অ্যাকাউন্টস অফিসার হারুন সাহেব এই নম্বরটা দিলেন। আমাদের এদিকে পানি নেই তো। মরে যাচ্ছি রে ভাই আমরা। পানি ছাড়া কেউ বাঁচে বলেন? গ্রামে হলে তো একটা টিউবওয়েল, পুকুর বা নদীর পানি ব্যবহার করতে পারতাম, এখানে তো কিস্যু নেই। এভাবে চলে বলেন?’ বুজে আসে রইসউদ্দিনের কণ্ঠস্বর।

‘এত কথার তো দরকার নাই। কোন এলাকা?’ কর্কশ শোনাল কণ্ঠস্বর।

এলাকার বৃত্তান্ত জানাতেই লোকটি আরো একটি নম্বর দিয়ে বলে উঠল, ‘আপনাগো এলাকার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। ওনারে রিং করেন। কী হইছে জানাতে পারবেন।’

প্রচ- রাগ আর উষ্মা নিয়ে প্রদত্ত নম্বরটি ঘোরাতে শুরু করলেন রইসউদ্দিন। একটু পর তাড়াহুড়ো করে এক লোক ওপাশ থেকে বলে উঠল, ‘কে? কে?’

‘আমি ডিজিএম।’

‘তাড়াতাড়ি বলেন।’ কথায় পাত্তা না দেওয়ার বেয়াদবি।

রাগটা উসকে উঠতে চাইল; কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে দমন করে বলে উঠলেন, ‘আমি বাসাবোর বাসিন্দা। পানি নেই কাল থেকে। কিছু একটা করেন রে ভাই। মরে যাব তো?’ যতটুকু পারা যায় মার্জিত করে বললেন তিনি।

‘আমি কী করব? সায়েদাবাদ প্ল্যান্টে গিয়া খোঁজ নেন। তাদের পাম্পে হাওয়া ঢুকলে আমি কী করব?’

‘আপনি কী করবেন মানে?’ চেঁচিয়ে উঠলেন রইসউদ্দিন। ওর চেঁচানোর শব্দে স্ত্রী আর ছেলে ছুটে আসে ওর কাছে।

‘খেপলে তো পানি পাবেন না। সায়েদাবাদ প্ল্যান্টের যে-অবস্থা তাতে দুদিনেও পানি আসবে বলে মনে হয় না। বরং বলেন, দুই গাড়ি পানি পাঠাইয়া দিই।’

‘এক ফোঁটা পানিও লাগবে না। উজবুক কোথাকার।’ বলে মোবাইলটা বন্ধ করে দিলেন। রাগে বুকটা বাঙ্গির মতো চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তবু কিস্যু করার নেই। নিজের কাছে এতটা অপারগ-অসমর্থ আর কখনো মনে হয়নি রইসউদ্দিনের।

লাইজু চোখেমুখে প্রশ্ন ভাসিয়ে তুলে তাকিয়ে রয়েছেন ওর দিকে। কথা থামতেই বলে উঠেলেন, ‘তুমি পানিটা নিলে না কেন? রাগ করলে কেন? তুমি কি এদেশের প্রেসিডেন্ট?’

‘শাট  আপ’ বলে তিনি ছুটে বেরিয়ে গেলেন। কথা বলতে ইচ্ছা হলো না মহিলার সঙ্গে। সারাজীবনই কোনোকিছু না বুঝে না শুনে একতরফা ঝগড়া করে গেছে; আজো তা-ই করতে চাইছে পায়ের ওপর পা দিয়ে। ফালতু।

লিফটে উঠে মনে হলো চারপাশে সব অন্ধকার। বুকটা ধপধপ করছে। প্রেসার বাড়ছে ধাই ধাই করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে; জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া থেকে তিনি সেটি অনুমান করতে পারছেন।

দুদিন ধরে যদি জলধারা বন্ধ থাকে তো কী করবেন তিনি? শত শত গ্যালন খরচ হয় সকাল থেকে রাত অবধি। সেই জলধারা যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায় তো রইসউদ্দিনের পক্ষে কী এমন করার থাকবে? কে শুনবে কার কথা? মন্ত্রী-এমপি-রাষ্ট্রপতি কাকে জানাবে এ-দুঃখগাথা? কেউ তো আর জলধারা ঠিক করতে পারবে না?

যাকে জানাবে সে-ই বলবে, ‘পানির লেভেল তো নিচে নেমে গেছে। বৃষ্টি হচ্ছে না, বুঝতে পারছেন না?’

কেউ বলবে, ‘এ-সময় পানির সংকট হয়, তা তো নতুন কোনো কথা নয়। জমিয়ে রাখা উচিত ছিল সাহেব। এত বড় ব্যাংকের ডিজিএম ছিলেন, এটুকু বোঝেন না?’

কেউ বলে উঠবে, ‘এত পানি আমরা খরচ করি, হায় খোদা, পৃথিবীর আর কোথাও এরকম উদাহরণ নেই। ফ্ল্যাশ করতে গিয়ে যে অপচয় করি পানি, হা হা হা। আমরা মূর্খ, অকাট মূর্খ। যে-পানি নিয়া বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রম, সেই পানির অত অপচয় কীভাবে সম্ভব? ঠিক আছে, দু-চারদিন পানি ছাড়া থাকলে যদি বাঙালি পানির কদর করতে জানে। ঠিক আছে। একদম ঠিক আছে।’ লোকটির চোখমুখ এক অজানা প্রতিহিংসায় কাঁপতে থাকে।

রইসউদ্দিন নেমে এলেন নিচতলায়। সকালের জটলাটা যত সময় গড়াচ্ছে তত বড় হচ্ছে। কোনো সমাধান নেই, সভাপতির সঙ্গে কেবল খোশগল্প চলছে।

রইসউদ্দিনের পরনে ফুলের নকশাকাটা নীলরঙের ফতুয়া আর পাজামা। চোখে পাওয়ারের চশমা। মাথাজুড়ে বড় টাক। আর সেই টাককে ঘিরে রয়েছে পুরনো দিনের দুর্গকে ঘিরে রাখার মতো চুলের তৈরি পরিখা। সেই কয়েক গোছ চুলও এখন এলোমেলো। যতœ করার সুযোগ কই?

পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির মানুষটি মুখ কালো করে সভাপতি আবুল হোসেনকে প্রশ্ন করেন, ‘কোনো সমাধান হলো?’

‘সমাধান কীভাবে হবে ব্যাংকার সাহেব? পানি তো থাকতে হবে লাইনে। বাসায় মোটে চাল নাই, মেহমানদারি করবেন ক্যামতে বলেন?’ আবুল হোসেনের মুখে বেঢপ হাসির ছটা, যা মোটেই পছন্দ হচ্ছে না রইসউদ্দিনের।

‘এরকম যদি আরো দুদিন থাকে তো কী করবেন?’ রইসউদ্দিন তীক্ষè কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন।

‘সে-কথাই তো বলতেছি। আমার লগে ওয়াসার লাইনম্যানের কথা হইছে। হে একটা বুদ্ধি দিলো। বুদ্ধিটা খুবই উপযোগী। লাইনম্যান তো, ট্যাটনা বুদ্ধির অভাব নাই। হারামজাদা একটা পিসই বটে।’ দাঁত বের করে হাসতে লাগল আবুল হোসেন।

‘কী বুদ্ধি?’ অধীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন রইসউদ্দিন। অন্য ফ্ল্যাটমালিকরাও তাকিয়ে রয়েছেন সভাপতির দিকে।

‘একটা মিছিল লাগব ব্যাংকার সাব। আমরা ওয়াসার অফিস ঘেরাও করব। সবার হাতে হাতে শূন্য কলসি থাকবে। শূন্য বালতি থাকবে। সেগুলো নিয়ে আমরা পানিঅলাদের ঘিরে রাখব। তাতেই কাম হয়ে যাবে। শালারা পানি দিতে একেবারে বাধ্য।’ সভাপতি গদগদ গলায় জানাল।

‘কী বলছেন আপনি? মাথা-টাতা ঠিক আছে তো আপনার? কোটি টাকার ফ্ল্যাটের মালিকদের দিয়ে আপনি কলসি-মিছিল করাতে চাইছেন?’ বিস্ময়ে চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে কোটর থেকে রইসউদ্দিনের।

পাশে একজন ডাক্তার ছিলেন, তিনিও রইসউদ্দিনের কথায় সায় জানালেন। ধীরে ধীরে উপস্থিত সবাই নাকচ করে দিলেন এ-ধরনের উদ্ভট প্রস্তাব।

‘আমার প্রস্তাবটি নাকচ করে দিলেন সব ভদ্রলোকেরা? পানির অপর নাম জীবন, সেই জীবনই যদি শূন্য হয়ে যায় তো কোটি ট্যাকার ফ্ল্যাট আর মিছা ভদ্রতা দিয়া কী করবেন? ভাইবা দেখছেন?’

রইসউদ্দিনের গা জ্বলে যাচ্ছে লোকটির আচরণে। দাঁত কড়কড় করে তিনি বলে উঠলেন, ‘আপনি ওয়াসা থেকে পানির গাড়ি  কিনে নেন। ঠেলাগাড়িতে করে ক্যান ভরতি পানি বিক্রি হয়। সেগুলো সংগ্রহ করেন। আমরা সবাই সেগুলো  কিনে নেব। এসব আজেবাজে প্রস্তাব দেবেন না মেহেরবানি করে। বস্তিবাসী আর আমাদের এক চোখে দেখবেন না। এসব অডাসিটি। প্লিজ।’ বলতে বলতে রইসউদ্দিনের চেহারা লাল হয়ে ওঠে। মনে হচ্ছে, লোকটির গাল বরাবর একটা চড় কষাতে পারলে ও কিছুটা শান্তি পেত এ-সময়।

কিন্তু সবার ওপর তিনি একজন ভদ্রলোক তো, এসব কি তাঁকে মানায়?

ফ্ল্যাটমালিকরা যে-যার মতো নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় সবাই একবাক্যে সভাপতিকে বললেন, ‘যে করেই হউক পানি কিনে সাপ্লাই দেন আমাদের। আমরাও চেষ্টা করব ওয়াসায় পানির গাড়ির রিকুইজিশন দিতে। আজেবাজে কথা মাথা থেকে বাদ দিয়ে কাজের কাজ করুন।’

লিফ্টে উঠে সবাই এক শ্রেণিভুক্ত হয়ে গেলেন, একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন, ‘ব্যাটা একটা অশিক্ষিত উজবুক। আমাদের বলে কিনা পানির কলসি নিয়ে মিছিল করতে? অসভ্য কোথাকার?’

ওরা চলে যাওয়ার পর আবুল হোসেন থ হয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। নিজের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে মিছিল করার কথা বলায় ফ্ল্যাটমালিকরা কেন ক্ষেপে উঠলেন তা ওর বোধগম্য নয়। আজ দুবছর হলো এ সকল স্যুট-টাই পরিহিত চাকরিজীবী ভদ্রলোকদের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি; এরা এগিয়ে এসে কোনোকিছু করতেও চায় না; আবার ওদের হয়ে কিছু করতে চাইলে যখন তখন মাইন্ড করেন কিংবা একশ আটটা ভুল ধরে বসে ভারিক্কিয়ানা ফলান। এদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সত্যি কঠিন এক কাজ।

কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে গ্যারেজের ভেতর একা দাঁড়িয়ে থেকে আবুল হোসেন সহসা কেয়ারটেকার হামদুকে কড়া ভাষায় নির্দেশ দিলেন, ‘যেখান থেকে পারস পানির গ্যালন কিনে আন। এখানে সব বড়লোকরা থাকে, বুঝিস না হারামজাদা। দৌড় দে।’ বলতে বলতে আবুল হোসেন চকচকে লিফটে চড়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। কেন যেন জমিদার ফ্ল্যাটমালিক না হয়ে ওদের মতো নাক উঁচু ভদ্রলোক মালিক হতে ইচ্ছা করছে আজ। ওর তো সবই আছে, কমতিটা কোথায় তাহলে?

রইসউদ্দিন নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। গম্ভীর মুখ। সমস্ত চেহারায় ঘামের চ্যাটচ্যাটে কাদা। দেখলেই বোঝা যায় কতটা পেরেশানির ভেতর রইসউদ্দিনের সময় কাটছে।

ওর চোখের সামনে ড্রয়িংরুমের সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে স্ত্রী-সন্তান গাড়ি নিয়ে কোথায় পালিয়ে রেহাই পাওয়া যায় তা  নিয়ে ঘুমচোখে জল্পনা-কল্পনা করে চলেছেন। হয়তো একটু পর ড্রাইভারকে ডেকে নেবেন এবং কেটে পড়বেন জলহীন জঘন্য এই অট্টালিকা ছেড়ে। সমস্ত দোষ রইসউদ্দিনের কাঁধে চাপিয়ে ওরা ওকে ফেলেই হয়তো রওনা দেবেন কোনো আত্মীয়ের বাসায়!

রইসউদ্দিনের তলপেটে রোজকার মতো সকালবেলাকার টয়লেট না করতে পারার অস্বস্তিকর অনুভূতি। কিছুতেই ওকে শান্তি দিচ্ছে না। ভালোলাগার সমস্ত অনুভব বিস্বাদ ও তেতো হয়ে যাচ্ছে। পঙ্গু করে দিচ্ছে সুখের নির্যাস বহনকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো।

তিনি একটিও কথা না বলে নিজের কক্ষে ঢুকে এসির হাওয়া ষোলোয় নামিয়ে দেন। তারপর মুখ অবধি একটা কম্বল টেনে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু যে বয়োবৃদ্ধ মানুষটি সারারাত ঘুমিয়ে উঠেছেন তাঁকে কেন এই অসময়ে নিদ্রাদেবী দয়া করবেন?

চোখের পাতা তিরতির করে কাঁপছে। মাথার ওপর এসির হাওয়া শোঁ শোঁ করে শীতল করে তুলছে পুরো কক্ষ।

এরই ভেতর অনুভব করেন, তিনি বিশাল একটা নদীর কিনারে বসে রয়েছেন; চারপাশে থইথই করছে পারদস্বচ্ছ জলরাশি। রোদ পড়ে সেই জল চকমক করছে। জলেরও যে অনির্বচনীয় এক দ্যুতি রয়েছে, যা রুপালি কোনো মাছের আঁশের মতো দেখতে, তা মৃদুমন্দ বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই জলহাওয়া গায়ে লাগার সঙ্গে সঙ্গে নদীপাড়ের মানুষগুলো শান্ত, সমাহিত ও সহনশীল হয়ে যাচ্ছে। মুখে মুখে ফিরছে এক অনবদ্য কবিতা, ‘পৃথিবীর সবাই সুখী হউক, সবাই শান্তিতে থাকুক।’

রইসউদ্দিন সামান্য নেমে জলের ভেতর দুটো পা ডুবিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ঢেউ-খেলানো জলরাশির শীতল স্পর্শ ওর সমস্ত অনুভূতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বেমালুম ভুলে যান বিল্ডিংয়ের রিজার্ভ ট্যাংকটা আপাতত জলশূন্য; একটা ছোট বালতিও সেখানে আর ডুবতে চাইছে না!