জলের দাগ

লেখক:

সা দি য়া মা হ্ জা বী ন ই মা ম

সেদিন মাঝরাতে আজইগাঁতির মানুষ দেখল, ভৈরবের দিকে পাগলের মতো অন্ধকারে একজন দৌড়াচ্ছে। খালি পায়ের ধুলো উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। হালকা কুয়াশা শুরু হয়েছে, এদিককার মানুষ ডাকে ‘হিম’। হিমের ভেতর মিশেমিশে যাচ্ছে ধুলো। মানুষটার হাতে বাদামি রঙের কাপড়ের মতো কিছু একটা। ওটাও সঙ্গে যাচ্ছে, যেন নৌকার পালের পেটে ভাটির বাতাস লেগেছে। সেদিন আশ্বিনের রাতে আজইগাঁতির অনেকেই জেগে। ভোর হলেই একদল ঢোল-ডাগর নিয়ে মাঠে বেরিয়ে যাবে। কাঁচা হলুদের সঙ্গে সুন্দি বেঁটে মাখবে আফলা ধানগাছের গায়ে। অনুর্বর জমির জরায়ু থেকে শস্য প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা। সন্ধ্যা থেকে গাস্বীর গান বাঁধছেন কৃষকরা। নারীরা আমগুরুজের পাতার সঙ্গে হলুদ আর পান বেঁটে শরীরে মেখে গোসল সেরেছেন। ওরই রেশে আজইগাঁতির আশ্বিনের রাত জমজমাট। দশ-বারো বছরের ছেলেরা লম্বা পাটকাঠির মুখে আগুন দিয়ে বিড়ি খাওয়ার মহড়া চালাচ্ছে। কাঠির মাথার একপাশ দিয়ে লম্বা দমে আগুনটা টান দিলে পকপক করে সাদা ধোঁয়া বের হয়। গ্রামের এক কোনায় বুড়ির ঘরের সামনে মাটি আলু পুড়িয়ে খেয়েছে এই দল। শীত শুরু হলে তখন আবার ছোলার ক্ষেতে শুরু হবে আনাগোনা। সবে দানার দেখা দিয়েছে কি দেয়নি, ওই শেকড়সহ মুঠি মুঠি তুলে তাতে আগুন দেবে। খানিকটা পুড়ে এলে মাটিতে বাড়ি দিয়ে দিয়ে আগুন নেভানো হবে। এই দল সবকিছুতে আছে, তারা আজ রাত জাগবে। সেই ছেলেদের কয়েকজন পাখি মারার গুলাইল বানাবে বলে নদীর পাশের পেয়ারাবাগানে ঢুকেছিল চুরি করে। পেয়ারার ডালে গুলাইল ভালো হয়। ওটা মহাজনের ক্ষেত। নদীর কাছাকাছি ছিল বলে ছেলের দলই শুধু চিনল মানুষটাকে দৌড়ে যাওয়ার সময়। তাদের পাশ দিয়ে ভোঁ-কাট্টা ঘুড়ির মতো চলে যেতেই দু-একজন চিৎকার করে উঠল, ও কাওছারভাই শুনো শুনো, কনে যাতিছো এত রাত্তিরে? কী হইয়েছে? মানুষটার কোনোদিকে খেয়াল নেই, সে দৌড়ে যাচ্ছে বড় গাঙের ঘাটের দিকে। যেখানে প্রতিদিন তার নৌকা বাঁধা থাকত।
কাওছার বাড়ি ফিরেছিল সন্ধ্যায়। মাঝরাতে আকস্মিক ঘটনার শুরু। প্রথমে চৌকিতেই শুয়ে ছিল শিউলি, তারপর তাকে মেঝের পাটিতে শুইয়ে দিলো। পেটিকোটের ফিতের গিঁটটা ঢিলে করে খানিকটা নামিয়ে দিলো। তলপেটে হাত রেখে কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল কাওছার… কিছু টের পাতিছো বউ? শ্যামলা রঙের একুশ বছরের নারী হাত খামচে ধরেছে, কাওছারের দুই বাহুর চামড়া নখের ধারে এখানে-সেখানে চিরে গেছে। কোনোমতে শিউলি উচ্চারণ করল, মইরে যাতিছি। আমার শইল্লের ভিতর মনি হতিছে গাঙ মুচরোচ্ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে থেকে থেকে এমন চলছে। মাঝে মাঝে শান্ত হয়ে এলে শিউলির মুখের দিকে আশা নিয়ে তাকায় কাওছার। পরমুহূর্তেই দ্বিগুণ বেগে কাতরে উঠে, পাটিতে শুয়ে থাকা নারী। এখন কিছুটা শান্ত হয়ে আসছে শিউলি। আস্তে আস্তে ছটফটানি কমে আসছে, ভরসা বাড়ছে কাওছারের। তবে রাগও হচ্ছে খুব। সে বাড়ি ফিরে আসার সময় দেখেছে, ছেলেপেলেরা দল বেঁধে হালট ধরে যাচ্ছে। তাকে দেখেই একদল গাস্বীর ছড়া কাটল – ‘নাউ কুচকুচ কদুর বিচি/ রানচে কিডা, বড়দি/ খাবে কিডা, বড়দা।’ এসব মুখের বুলি। এমন ছড় কাটলে তাকে আবার ছড়া দিয়েই জবাব দিতে হয়। কাওছারের ভারি আমোদ লাগল। সে শিউলিকে ডেকে বাইরে এনে এই উৎসব দেখাবে ভাবতে ভাবতে ওদের উত্তর দিলো – ‘তোর বড়দা কনে গেছে, চরণে/ ফুল তুলতি, বরণে/ ধামাও নেই, কুলোও নেই/ ফুল তুলতি মনেও নেই।’ মানে হলো, এখন আর লাউ কেনার বাহানা করে যে-টাকা চাওয়া হয়েছে সেটা দেওয়া হবে না। তবু ছেলের দল হেসে কুটিকুটি জবাব পেয়ে। কিছু পেলে হয়তো তারা দোকানে গেয়ে দুই-পাঁচ টাকার মিছরির দানা কিনত। কাওছার বলল, নে তোগের জবাব দিইয়েছি এইবার এট্টু দাঁড়া দেইন তোগের ভাবিরে ডাইকে আনতিছি। শিউলি ঘর থেকে খুব একটা বের হয় না ইদানীং। উৎসব দেখলে আমোদ পাবে ভেবে দ্রুত বাড়ির ভেতর এলো। অথচ দরজায় খিল তোলা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এমন সময় একা কোথায় যাবে! আবার উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে কাওছার। ছেলের দল টাকা না পেয়ে চলে গেছে। ঠিক তখনই ভিজে কাপড়ে ফিরল শিউলি। ততক্ষণে মাথায় রাগ উঠছে চিড়বিড়িয়ে। রাগ সামলাতে সামলাতে জিজ্ঞেস করল, এই ভরসন্ধ্যায় তুই কনে গেছিলি?
ঘাটে নাইতি। সবাই সঙ্গে ছিল অত ভয় পাতিছো কেন?
তুই ভরসন্ধ্যায় গাঙে ডুব দিলি!
ও মা, আইজকের দিনে বউ-ঝিরা সন্ধ্যায়ই তো যায়, নাকি? গাঙে এট্টা নতুন ছড়া শুনিছি, কব?
কী শুনিছিস?
এটটা তারা, দুডো তারা/ ওই তারাডার বউ মরা/ তারারা সাতে ভাই/ তারা গুইনে বাড়ি যাই – বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল নারী।
কাওছারের রাগ হচ্ছে। পাঁচ বছরের সংসারে ছেলেপুলে আসেনি বলে দু-একজন তাকে নতুন বউ ঘরে আনার কথা বলেছে বটে; কিন্তু সে তো সেসব কানে তুলেনি। তাই বলে এমন অলক্ষুনে ছড়া কে শেখাল? সে মেজাজ দেখিয়ে বলল, ওসব আজেবাজে ছড়া ঘাটের মাগিরাই কয়। তুই মরতে গেছিলি ঘাটে। আরেকবার শুনলি ঠ্যাঙ বাইরে ভাঙবো কতিছি।
শিউলি হেসে কুটিকুটি স্বামীর অকারণ মেজাজে। সে গামছা দিয়ে ভেজা চুলের পানি সামলাতে সামলাতে কাছে এসে বলে,
কী চাইয়েছি জানো গাঙের কাছে? কইয়েছি গোলা না ভরুক তুমি অন্তত কিছু ধান এবার ঘরে তুলতি দিও। গত বছর পুরো কিনা চাউল রান্ধিছি। এইবার ধান না হলি আমাগের খোকার ওই চাউলের ভাতই মুখে দিতি হবি। কাওছারের অহঙ্কারটা যেন এবার একটু শানিয়ে উঠল।
কেন কিনা চাল তোর খারাপ লাগিছে খাতি? খেতেরতে ওডা চিকনই ছেলো। ভাত তো খাইয়েছিস আগের চে বেশি।
তা হলিও আমার পরান জুরোয়নি। আগে তুমি অল্প হলিও খেতের চাইল তুলিছো কিন্তু গতবার কী যে অলো।
গতবার প্রথম কাওছার খেতি করেনি। নতুন কাজে সময়ই পায়নি। শ্রাবণ শেষ হওয়ার প্রায় শেষ দিকে যেয়ে কয়েক বিঘেতে চারা বসিয়েছিল কিন্তু তা আর অকালের ঢলে উঠানো যায়নি। তবে তাতে যে খুব না খুশ তা নয়। কেনা চাল এই গ্রামের সবাই খায় নাকি! আর খেতির কাজ তার শখেরই ছিলো। নতুন কাজটা ধরেছে বলেই না কেনার ক্ষমতা হয়েছে। নতুন কাজে তার আয় রোজগার বেড়েছে, খাটুনিও কম। আগে সে নৌকা নিয়ে ভৈরবে যেতো। মনমতো আরো দু-এক জেলে পেলে তাদের সঙ্গে পশুর পর্যন্ত। সেই বাপ-দাদা তারও আগের বংশের মানুষ সবাই মাছ ধরেই খেয়েছে। কত দূর দূর চলে গেছে সে মাছের খোঁজে। নদীর ঢেউ আর বাতাসের বেগ বুঝে ঝাঁকিজাল ফেলে টেনেছে কাওছার। একটা ‘মাইয়াজালে’র শখ ছিল, পয়সা গোছাতে পারেনি। উপরন্তু ঘাটের ডাক আসার পর থেকে মাছও গেলো মহাজনের জিম্মায়। ঘাট থেকেই মহাজনের লোক এসে দর করে নেয়। পানির দর, না দিলে খালুইয়ের পেটে পচে। বছর দুই আগে নৌকার পাটা, খোল একেবারে ভেঙে গেল ঝরে। সারাইয়ের চেয়ে নতুন কেনাই ভালো। পুঁজি কোথায়? খাল থেকে আর কতটুকুই এখন পাওয়া যায় এক ঝাঁকিজালে? ঠিক তখনই ডাকটা এলো, যেন তারও কপাল খুলল। জেলে থেকে কাওছার হয়ে গেল ইজারাদারের সহযোগী। বছরে তিন কোটি টাকার ডাক আসে ভৈরব ঘাটের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় গিয়ে টাকা নিয়ে আসে টোল আদায়কারীদের কাছ থেকে। ময়লা, পকেটে রাখা, লুঙ্গির গাঁটের, মহিলার পার্সে ভাঁজ করা নোট, চকচকে কাগজে চামড়া আর কালির গন্ধমাখা টাকার নোট। অথচ ছোটবেলাও দেখেছে দুপাশে বড় বড় পাকুড় গাছ, সেসব গাছে রঙিন পাখি। নারীর লালরঙা ভেজা শাড়ি ঘাসের ভেতর মুখ গুঁজে আছে। আচারের জন্য কেই লাল বড়ই শুকোতে দিয়ে গেছে। এখন দুপাশে বড় বাজার। সেখানে হলুদ লাল বাতি, কাচের বাক্সর ভেতর সাদা চিনি দিয়ে বানানো মিষ্টি। ছিট কাপড়ের দোকান, মৌমাছির মতো মানুষ গিজগিজ করে। এখন নৌকার ভাড়া আলাদা আবার ঘাটে প্রবেশের জন্য দুই টাকা। মহাজনের খেলাটা এইখানে। কেউ বাক্স-পেটরা নিয়ে উঠলে বকশিশ দিতে হয়, ন্যূনতম ৫ টাকা। তাও রাজি না হলে দু-একজনের বাক্স বা বাজারের থলে রেখে দেওয়ার দায়িত্ব কাওছারের। এই বাড়তি আয়টা ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তবু মাঝরাতে ঘুমের ভেতর কাওছার নদীর শোঁ-শোঁ শব্দ শোনে, নৌকার বাদামের পতপত আওয়াজ হয় মাথার ভেতর। বৈঠার শব্দ শুনে বলতে পারে, ঠিক কতটা পানি নদীর ওই জায়গায়। তবে এই আবেগ পাত্তা দেওয়ার সময় নেই। ঘরে নতুন মুখ আসবে, তার জন্য কিছু জমানো চাই। সে বড় হবে, ঘাট পাড়ি দিয়ে ওপারের উঁচু ক্লাসের স্কুলে যাবে। পথে বাপের কাছে প্লাস্টিকের পুতুলের আবদার ধরবে। তখন সেই বায়না না মেটানো গেলে এই জীবন রেখে লাভ কী!! কাওছার নিজে বেশ খুশি, মুশকিল শিউলিকে নিয়ে। মহিলা মানুষের বাস্তব বিবেচনা কম। সে ক্রমাগত কানের কাছে একই গান গেয়ে যাচ্ছে।
– এতদিন ধইরে যে-গাঙ আপনেরে ভাত জুটোইছে, তারে হটাত কইরে ছাইরে দিতিছেন? কী অভাব পড়িছে আমাগের!
– অভাবে পড়িনি কতিছিস? ওই মাছ ধইরে দিন আর চলে না বউ।
– তয় খেতি করেন কিডা নিষেধ করতিছে, তাই বইলে নদী পার হতি আলাদা কইরে টাকা দিতি হতিছে এ-নিয়ম কোনোকালে শুনিনি।
– ঘাটের ডাকে, তোর স্বামীর ক্ষমতা বাইরেছে দেহিসনি?
– ওসব ভালো লাগতিছে না। টাউট-বাটপার লোকের সাতি কাজ করতি গেলি আপনি না বদলায় যান।
এসব শুনে কাওছার হাসে। সে বউকে বাগে আনতে গা-ঘেঁষে বসে, বউর মন উঠে না। তবে বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকে অভিযোগ কমছে। সারা দিনরাত ওই ধ্যানে থাকে। স্বামী ফিরলে জিজ্ঞেস করে, কন তো কার মতো হবি?
– ম্যাইয়ে হলি তোর মতো।
উহু বাপের মতো মাইয়ে-কপাল নে আসে, হবি ছেলে।
– কিডা কইয়েছে?
মন কতিছে, দ্যাহেন না সবসোময় পেটের ভিতর কেমুন করতিছে। মনে হতিছে এহুনি বাড়ায় আসতি চায়।
কাওছার সোহাগ নিয়ে বউর তলপেটে ফুলে ওঠা জায়গায় হাত রাখতে রাখতে বলে, বউ, মাইয়ের নাম রাখপো আয়েশা। বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর তাদের আঁটকুড়ে নাম ঘুচেছে সেই আনন্দে শিউলি আর কোন প্রতিবাদ করে না সন্তানের নামকরণ নিয়ে। সে এখন খাবারের আয়োজন করে ঘরের ভেতর। পাটি পেতে কেনা চালের চিকন সরু ভাত তুলে দেয় স্বামীর পাতে। হারিকেনের বদলে চার্জার বাতি এসেছে ঘরে। খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই শরীর গুলিয়ে ওঠে। তবে এই কষ্টের সঙ্গে কী যেন এক আনন্দ আছে, তাকে আলাদা করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। পৃথিবীটা খুব রঙিন রঙিন লাগে শিউলির। আশ্বিনের শেষ রাতে হালকা হিমের ভেতর তার গায়ে একটা চাদর টেনে দেয় স্বামী। কপট রাগ দেখাতে দেখাতে বলে, আমার মাইয়ের ঠান্ডা লাগলি তুই বুঝবি। ভরসন্ধ্যায় তোর গাঙে নাওয়া আমি ছুটোয় দেবো।
– ইশ মাইয়ের বাপ হইয়েছে। এহনো তারে দ্যাহে নাই দরদ কতো।
– বউ কাল সকালের ভাত থুইয়েছিস?
– রাখিছি পানি দিইয়ে। আপনের ওসবি ইবার মনে হতিছে খুব বিশ্বাস হতিছে?
আজইগাঁতির মানুষ আশ্বিনের শেষ রাতে রান্না ভাত কার্তিকের প্রথম সকালে খেতে খেতে বলে, আশ্বিনে রান্ধে, কার্তিকে খায়/ যে বর মাগে সে বর পায়। বহুকালের এই নিয়মে নাকি পয়মন্ত হয়।
– কাওছার হাসে, কুটুম আসতিছে এহন সব বিশ্বাস হয় বউ। ছাওয়াল পুলাপান হলি মনডা কেমুন নরম কইরে তুলে বাপ-মায়ের।
সারাদিন ঘাটে টাকা তোলা মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় শিউলির। আহা রে, তারও নিশ্চই কষ্ট হয়। গাঙ যে স্বামীরে এখনো টানে শিউলি টের পায়। দু-একদিন ঘুমের ভেতর কথা বলে উঠে কাওছার। বেঘোরের সেইসব শব্দে থাকে গাঙ। হঠাৎ হঠাৎ বলে বউ কত বড় নাও, কত বড় ছই। ইডা হলো গয়না নৌকার। শিউলি আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশে শোয় স্বামীর গায়ে। এখন পেটটা বড় হয়ে উঠেছে সে কাত হয়ে শুতে পারে না। পেটের চামড়ায় দাগ পড়েছে বউয়ের। ওই দাগগুলোর দিকে তাকালে হঠাৎ হঠাৎ শীতকালে নদীর পারে বালির পরতের কথা মনে হয় কাওছারের। জোয়ারের সময় পানি এসে ফিরে যাওয়ার পর রোদে বালিয়াড়িতে দাগ ধরে। অনেকটা সেরকম দাগ এখন অতটুকু পেটের জমিনে। কাওছারই এখন রাতে বউকে ধরে রাখে। আশ্বিনের মাঝরাতে সেদিনও ওভাবেই শুয়েছিল। তন্দ্রামতো এসেছে, ঠিক তখনই শিউলি বলে উঠল। আমার যেন কিরম লাগতিছে, কোমড়ের নিচে এমন ভিজা ভিজা ঠেকতিছে কেন। কাওছার লাফিয়ে উঠে বাতি জ্বালাল। ঠিকই কাপড় ভিজে উঠেছে, দ্রুত শুকনো গামছা আনল। শিউলির ব্যথা তীব্র হচ্ছে, মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ আসছে।
– কেমন লাগতিছে বউ, খুব কষ্ট হতিছে? ডাকপো কাউরে?
– শিউলি তার বাহু আঁকড়ে ধরে। আমার ভয় করতিছে। ব্যথায় মনে হতিছে মইরে যাতিছি।
কাওছার এবার খানিকটা জড়িয়ে ধরল আর ঠিক তখনই একটা দমকা হাওয়ার মতো বেগ উঠে এলো শিউলির সারা শরীরে। শিউলির কোমরের নিচ থেকে খুব তরল কিছু বেরিয়ে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে খেজুরপাতার পাটিতে। কোনোমতে উচ্চারণ করল, এট্টু তুইলে ধরবেন শুকনো জায়গায়? এটুকু বলতে বলতেই কণ্ঠ অস্পষ্ট হয়ে এলো। কাওছার একঝটকায় তুলে চৌকিতে শুইয়ে দিলো। মেঝেতে পড়ে থাকা পাটিটায় ছোপ ছোপ দাগ। চার্জারের আলোতে তার চোখ ভুল দেখছে। সে পাটিটা হাতে নিয়ে দৌড়ে উঠোনে এসে সামনে টানা দড়িতে মেলল। পূর্ণিমা গেছে কাল তবু আলো উজ্জ্বল।
জোছনার আলো বিভ্রান্তি তৈরি করে। কাওছারের চোখের সামনে দড়ির পাটিটা বাতাসে দুলছে। হালকা বাদামি সেই জমিনের দিকে তাকিয়ে মনে হলো চোখের সামনে ভৈরব। আজইগাঁতির জমি কেটে বেরিয়ে যাওয়া ভৈরবের জল এখন ঘোলা। জোয়ারের শুরুতে যেমন ভৈরব দুলতে দুলতে আগায় সেভাবে বাতাসে দুলছে একটা অর্ধেক ভেজা পাটি। কাওছার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। এই আলোতে অস্পষ্ট সেই রং। উঠোনের একপাশের নারকেলগাছটার সঙ্গে ঘরের খুঁটির দড়ি টাঙানো। কয়েকটা শুকনো কাপড় রাখা আর খুঁটির কাছে স্তূপ করে গুটানো পুরনো ঝাঁকিজালটা। ব্যবহার অযোগ্য হাতে ধরা ওই জিনিস বছরখানেক আগে রাখা হয়েছিল। বাতাসে দুললে জালের নিচে লোহার চাকতির ভারগুলো থেকে টরটর শব্দ উঠছে। ঘরের ভেতর থেকে এখন আর কোনো কাতর স্বর আসছে না। কাওছার এবার পাটি টেনে মাটিতে ফেলে উপুড় হয়ে বসল। এরই মধ্যে সরসর করে আসছে স্রোতের শব্দ। আজইগাঁতির মাটির ভেতর দিয়ে ভৈরবের খালে পানি যাওয়ার জানান দেওয়ার শব্দ এটা। কাওছার জানে খালের পাড়ে এখন দক্ষিণ দিকে নুয়ে যাওয়া হিজলগাছের গোড়ায় যে-কচুরিপানা জমেছে ওইখান দিয়েই ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে পানি। ভাটার সময় সে নবগঙ্গা খাল আর বাসুখালীতেও কম যায়নি। সেখানে তখন ভাটার টানে পানি সরে আর জোয়ারে খলখল শব্দ হয় নৌকার পাটাতনের পাশে। মাঝরাতে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে-শব্দ শুনছে তা শুধু ভৈরবের খালে ঢুকে যাওয়ার সময়ই হয়। আবার ঝুঁকল সে। এই পাটিতে তার অনাগত সন্তান নিয়ে শুয়েছিল শিউলি। নাহ্, রক্তের দাগ নেই অথচ পাটি ভেজা, অনেক অনেক পানি। এক নৌকাসমান পানি মানুষ কেমন করে ধরে অতটুকু পেটে! জোছনার আলো আর পাটির দাগ মিলে মনে হচ্ছে মাথার ভেতরই এক আস্ত ভৈরব বইছে। আজইগাঁতি গ্রাম থেকে ঘাটের দিকে যেতে যেতে লোকটা বলছে এটটা তারা, দুডো তারা… ওই তারাডার বউ মরা… মহাজনের বাগান থেকে গুলাইল চুরি করে আসা ছেলেরা খবরটা দিয়েছিল কার্তিকের সকালে। তখন আজইগাঁতির গায়ে উৎসব-পরবর্তী ক্লান্তি। কয়েকজন ছুটে এলো। শিউলির শরীরের নিচে ততক্ষণে রক্ত জমাট বেঁধে দু-একটা মাছি উড়ছে। ভিড়ের ভেতর কেউ আফসোস করল, ছ্যাড়াডারে আগেই কইয়েছি, গাঙ থুইয়ে হাটের ডাকে যাতিছো, ভালো হতিছে না। যে গাঙ বাঁচায়, সে অতো সহজে ছাড়ে না মানুষ।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার