জাত-বেজাত

লেখক:

রে জা উ র র হ মা ন

ফ্ল্যাটবাড়ি আর বাড়ি দুটোতে বরাবরই বিস্তর তফাৎ খুঁজে পায় আরবাব। বাড়ি বলতে তার চোখের সামনে যে-ছবি ভেসে ওঠে তা হলো, মাঝখানের উঠানকে ঘিরে তিন-চারটে ঘর। সেগুলো হতে পারে মাটির কোঠা, নয়তো টিন বা বাঁশ-কাঠের চৌচালা ঘর। এর কোনো এক ফাঁকা জায়গায় দোচালা পাকের ঘর। মাটির চুলা। এর বেড়া-দরজার তেমন কোনো নির্দিষ্ট আয়োজনের দরকার হয় না। কোনোরকমের আব্রুগোছের কিছু একটা হলেই হলো। আর উঠান চৌহদ্দির কোনা ধরা নিম-ডালিম-পেয়ারা গাছ তো থাকবেই। থাকতে পারে বিরল নিষ্ফলা পুরনো গোলাপ-জাম গাছও। আর পুরো বাড়ির পেছনের দিকে থাকবে সুপুরি বাগিচা ও লাইন ধরা নারিকেল গাছের সারি। বাড়ির চৌহদ্দি জুড়ে নারিকেল সুপুরির শুকনো ডালার বেড়া। এমন একটা ছবি আরবাবের স্মৃতিতে আছে। বাস্তবে নেই। সেসব আগের দিনের কথা। এখন সে ঢাকা শহরের প্রায় মাঝখানটায় চোদ্দো তলা ফ্ল্যাটবাড়ির একটির বাসিন্দা। সে কাউকে ঠিকানা বা ফ্ল্যাটবাড়িটার পরিচয় দিতে গেলে ওই কমপ্লেক্সের সর্বমোট পঁয়ত্রিশটির একটিতে সে থাকে বলে জানায়। তখন তার বুকের কোথায় জানি একটু টনটনিয়ে ওঠে। সে কাতর হয়। মনে পড়ে কবে-কোথায় হারিয়ে যাওয়া কোনো গ্রামের কথা। মনে পড়ে লালমাটির খালপাড়ের কথাও। আর সেখানে আরো আছে আম-কাঁঠালের বাগিচা।
আরবাবের দোতলার ফ্ল্যাটটার মেইন দরজা খুলে বের হলে পুবমুখী গ্রিলটানা বারান্দাটা চোখে পড়ে। চোখে পড়ে সেখানকার সুরুৎ করে ঢুকেপড়া সকালি রোদ। কিংবা অসময়ের অগোছালো বৃষ্টির ছাঁট।
আজ আরবাব দুয়ার টেনে ঘর থেকে বের হতেই দেখে, টাইলসের ফ্লোরে বৃষ্টির মিহি ছাঁট, পরক্ষণে সেখানে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। যেন ছোট ছোট পানিভরা বেলুন। ফ্লোরে পড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। অথচ এ-সময়ে বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। শীত তো একেবারে দুয়ারে দাঁড়িয়ে। রাতে হাতড়িয়ে গায়ে চাদর টানতে হয়। ঘুমের ঘোরেও।
আরবাব আবহাওয়ার এমনতর বেহায়া আচরণ নিয়ে সামান্য বিজ্ঞান-দর্শন নাকি অন্য কোনো ধ্যান-ধারণার আঙ্গিকে ভাবতে গিয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কিছুটা ভাবালু হতে শুরু করল। তার ‘উলটো ফ্ল্যাটের লোকটি’ (যার নাম আরবাবের জানার আগ্রহ হয়নি কোনোদিন) হেঁড়ে গলায় এগিয়ে আসে,
‘ভাই সাহেব আপনি কয়টা?’
খানিক অন্যমনস্ক মানসিক অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে সে ঠিক ঠাওরে উঠতে পারেনি তার ‘উলটো ফ্ল্যাটের বাসিন্দা’ – কয়টা সম্পর্কে কি জানতে চাইছে?
তখন তার মনে পড়ে, সে কিছুক্ষণ আগে পাশের মসজিদ থেকে বকরি ঈদের নামাজ আদায় করে এসেছে। হালকা কিছু মিষ্টিজাতীয় খাবার মুখে দিয়ে সে বেরিয়েছে মাত্র। গ্রাউন্ড ফ্লোরে রাখা, গত রাতে কেনা গরুটা কী অবস্থায় আছে দেখার জন্য। এ ছাড়া তার কোরবানির গরুর দুই ভাগিদারও আসার কথা। আর বাকি একজন আসবেন না। তিনি আরবাবের ফুফু। বয়স ৮০ ছাড়িয়েছে। তাঁর আসার আগ্রহ ছিল। কিন্তু হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পেলভিক বোনে চোট পেয়েছেন। তিনি বিছানায়। তাঁর চলাফেরা নিষেধ।
‘উলটো ফ্ল্যাটের লোকটি’র প্রশ্নটা আরবাব এতক্ষণে ধরতে পারে। কিন্তু তা সে কিছুটা অবজ্ঞা করে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে লোকটি কাছাকাছি হয়ে তার মুখ বরাবর এসে দাঁড়ায়।
‘আপনি কয়টা?’
আরবাব কিছুটা বিরক্ত হয়।
‘কি কয়টা?’
‘আরে কোরবানি… কোরবানি। গরু কয়টা কিনছেন?’ তার খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আরবাব জানায়, ‘একটা’।
তাও সে যে শরিকি দিচ্ছে এ-কথাটা বলতে গিয়েও বলেনি। কারণ, তাতেও হয়তো আরো প্রশ্ন জন্ম নেবে।
‘আমি এখানে দুইটা।’
‘মানে আরো কোথাও দিচ্ছেন নাকি?’
‘হ্যাঁ… আমার গ্রামে… পাড়াপড়শির হক আছে না? তাদের কথা ভুললে চলবে কেন? বছরে একটা উপলক্ষ। তাই আমার গ্রামের দশজনার কথা ভেবে গ্রামে দিচ্ছি আরো চারটা।’
দুজনায় একত্রে লিফট ধরে নামে আবাসনের গ্যারেজ-স্পেসে। ‘উলটো ফ্ল্যাটের বাসিন্দা’ তোতাপাখির মতো অনর্গল কথা বলে চলেছে।
‘আগে কিনে বোধকরি ভুলই করলাম। গত রাতে এ-ধরনের ষাঁড় গরুগুলোর দাম চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার কমে গিয়েছিল। তবে তাতে আমার আক্ষেপ নেই।… কিসমতের ব্যাপার আর আল্লার ইচ্ছা…।’
‘উলটো ফ্ল্যাটের লোকটি’ লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যায়। দুটো বিশাল আকৃতির গরুর দিকে। গা থেকে এদের উপচেপড়া মাংস-চর্বির বর্ধিত পি-গুলো শরীরের সামান্য নড়াচড়ায় হেলেদুলে উঠছে, এদের রাজকীয় দেহ-দোলার অঙ্গভঙ্গিতে। আরবাব ‘লোকটি’র সঙ্গে গিয়ে গরু দুটো দেখে বিস্মিত হয়। প্রাণী দুটোর তেলতেলে দেহসৌষ্ঠব, সার্বিক পরিপূর্ণতায় বিক্রেতার সাজানো-গোছানো দেখে সেও আকৃষ্ট হয়। তার মনে হয়, প্রাণী দুটো সত্যিই আকর্ষণীয়। দেখার মতোই।
‘ফ্ল্যাটের লোকটা’ যেন আরবাবের মনের অবস্থাটা আঁচ করতে পারল।
‘আল্লা-তায়ালার বয়ান হোল, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আদরের প্রাণীটি কোরবান করো… তাঁর সন্তুষ্টিলাভের জন্য। তাই এখানে পয়সা-কড়ির কথাটা বড় নয়।’
একটু কেশে আবার বলে যায় লোকটি। ‘ওই যে দেখছেন, কালচেটে রঙের, মাথার মাঝখানে সাদাটে গোল্লা, শিংদুটো মোটা এবং সামান্য ছোট আকারের গরুটা, পড়েছে পৌনে দুই লক্ষ। আর বাকি সাদা ধবধবে… গলায় লাল ফিতার পিতলের ঘণ্টিওয়ালা বড় শিংওয়ালাটা পড়েছে দুই। মাংসও বেশি হবে এইটার।’
‘উলটো ফ্ল্যাটের লোকটা’ গ্যারেজের দেয়ালে বার দুই নাক ঝেড়ে বলে যায়, ‘দেশের বাড়ির গরুগুলোও এই রেঞ্জের মধ্যেই। দেড়-দুই-আড়াই।’
আরবাব তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে কেটে পড়ে। সে দেখে তার তেতাল্লিশ হাজারে কেনা শরিকি গরুটা চোখ বন্ধ করে আপনমনে খড়কুটো চিবিয়ে চলেছে।
সকাল সকাল আরবাবের চেনা কসাই এতক্ষণে এসে পড়ার কথা। গ্যারেজ-স্পেস ছেড়ে রাস্তায় নেমে যেতে যেতে সে অনুমান করে, ‘উলটো ফ্ল্যাটের লোকটা’র কেনা কোরবানির গরুগুলোই এই আবাসনের সবার সেরা। যেমন দেখতে, তেমনি দামে।

দুই
সাততলার উকিল কাসেম সাহেব নামাজ থেকে ফিরে ঘরে যাননি। রাস্তায় পায়চারি করছেন একটা ছুটকো কসাই ধরার জন্য। দুটো মাঝারি সাইজের খাসির ব্যবস্থা করতে তেমন এক্সপার্ট কসাইয়ের দরকার হয় না।
উকিল সাহেব আরবাবকে দেখে এগিয়ে আসেন। কোলাকুলি করেন। ‘কী খবর আরবাব সাহেব।’
‘খবর আর… কি এই গতানুগতিক।’
‘তাই আমাদের খবরাখবর থাকার কথাও নয়।’
কিছুক্ষণ হাসে উকিল সাহেব।
‘খবর হলো গিয়ে আপনার ‘উলটোদিকের পড়শি’র।’
‘তাই তো দেখছি। তার গরু দুটো দেখলাম। কোরবানি বলতে যা বোঝায়… এ আবাসনে একমাত্র তিনি তাই করছেন। আমরা তো ফাও।’
উকিল সাহেব আরবারের কাছে এগিয়ে যান। ‘শুনুন আপনার পড়শি শুক্কুর মিয়ার কথা। সে ছিল আমার কনট্রাক্টর শ্বশুরের অ্যাসিস্ট্যান্ট।…তাঁর ফুটফরমায়েশ করত। একদিন শ্বশুরের একটু তাড়াহুড়া ছিল…শুক্কুরকে ব্যাংকে পাঠিয়েছিলেন টাকা জমা দিতে। বেশি টাকা নয়। হাজারদশেক হবে। আর শুক্কুর মিয়াকে পায় কে? একেবারে দেশ ছেড়ে… ইন্ডিয়ায়।’
আরবাব অবাক হয়।
‘কী বলেন?’
‘সেই শুক্কুর মিয়ার ওপরই ভাগ্যের শিকা ছিঁড়েছে। দেখেন গরু দুইটা।’
আরবাব বলে, ‘দেশে নাকি এমনি আরো চারটা কোরবানি হচ্ছে।’
‘বলেন কি… তাই বলে এত…।’
উকিল সাহেব পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে যান। শ্বশুরের মৃত্যু হলে শুক্কুর মিয়া দেশে ফিরে আসে।
সে আস্তানা গাড়ে জেনেভা ক্যাম্পের কাছে। ক্যাম্পের বাসিন্দারা তখন তেমন বের হতো না। ভালো কায়কারবারও ধরতে পারছিল না। আর এর মধ্যে বিহারি ছেলেদের ছুটকো টুকিটাকি কাজ আর মেয়েদের অগোচরে-আবডালে বেশ্যাবৃত্তি। দালালরা খদ্দের ধরে আনত। সেই খদ্দেরের দলে শুক্কুর মিয়া ছিল নিয়মিত গ্রাহক।
সে তখন ক্যাম্পের কাছেই দুজন নন-বেঙ্গলি কার মেকানিক জোগাড় করে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ খুলে বসে। মেকানিকরা ভালো কাজ জানত। শুক্কুর মিয়ার ব্যবসা জমে ওঠে। অর্থের জোরে তার এলাকায় প্রতিপত্তি ও অসামাজিক কার্যকলাপের পরিসর বাড়ে। এদিকে কোহিনূর বানু নামে এক বিহারি নারীর সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকলে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কোহিনূর বানুর আত্মীয়স্বজন তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। মেয়ের বাবার সাইকেল পার্টসের ছোটখাটো একটা দোকান ছিল। একপর্যায়ে মেয়ের পরিবার শ্যামলীতে তাদের পাঁচ-সাত কাঠার একচিলতে পারিবারিক সম্পত্তি শুক্কুর মিয়াকে লিখে দেওয়ার প্রস্তাব করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্পত্তিটা অবশ্য তাদের দখলে ছিল না।
সম্পত্তির লোভ সে সংবরণ করতে পারেনি। সে কোহিনূরকে বিয়ে করলেও ক্যাম্পে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্য নারীর প্রতি তার আকর্ষণ কমেনি।

সময়ের ঘূর্ণিচক্রে ঢাকা শহরের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য দ্রুত বদলে যেতে থাকে। জমি ব্যবসায়ী ও ডেভেলপারদের দৌরাত্ম্য এবং তৎপরতায় ঢাকা শহরের স্কাই-লাইন বদলে যায়। এই সুযোগে শুক্কুর মিয়াও আধাআধি শর্তে সালামিসহ বিল্ডার্সদের কাছ থেকে সতেরোটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে যায়। বাড়ি ভাড়া হাতিয়ে সে বনে যায় ধানম-ির অভিজাত এলাকার বাসিন্দা। খানদানি ব্যবসায়ী। গড়ে তোলে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের অত্যাধুনিক গ্যারেজ ও জাপানি-ইন্দোনেশিয়া-থাই মোটর পার্টসের বড় মজুদদার। বসায় নকল টায়ারের কারখানাও।
কোহিনূর বানু তখন এক ছেলে ও এক মেয়ের মা। বয়সেরও টান পড়েছে দেহে। কিন্তু শুক্কুর মিয়ার অন্য নারীর প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলে। স্বামীর কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে রাখার জন্য ফকির-কবিরাজ, বদ্যি-হেকিমি নানা ধরনের ওষুধ ও পরামর্শ চালিয়ে ভালো ফল হলো না। অপরদিকে নতুন খবরও আসতে থাকে। শুক্কুর মিয়া নাকি বিয়ে করে শ্যামলীর এক ফ্ল্যাটে তার নতুন সংসারের পত্তন দিয়েছে। মাঝে মাঝে আজকাল সে রাতে ফেরে না। তখন কোহিনূর অন্য পন্থার পরিকল্পনা করে। সে বিহারি ক্যাম্প থেকে অভাবী কমবয়সী মেয়েদের বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে আনতে শুরু করে। আর রাতের বেলায় স্বামীর লোভ-লালসা উসকে দিয়ে সে ধরে আনা মেয়েদের ঘরে তাকে ঢুকিয়ে দেয়। শুক্কুর মিয়ার এমন ধারার আক্রমণাত্মক কর্মকা-ে প্রস্তুত নয়, এমন অসহায় মেয়েগুলোর কান্নাকাটি, চেঁচামেচি করা ছাড়া উপায় থাকে না। এসব ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর বাসিন্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো, শুধু নিজের অবস্থান ঠিক রেখে বাকি সবার সুবিধা-অসুবিধার কথা বেমালুম ভুলে থাকা।
তখন আরবাবের মনে পড়ে, হ্যাঁ… তাই তো উলটোদিকে ফ্ল্যাট থেকে রাত-বিরাতে মেয়েকণ্ঠের কান্নাকাটি-চিৎকার সে শুনেছে অনেকবার। ব্যাপারটাকে সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। বোঝার চেষ্টাও করেনি।
আরবাবের সামনে দাঁড়িয়ে উকিল সাহেব এক ছুটকো কসাইয়ের সন্ধান পেলেন যেন। তিনি তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় হেসে ফেলেন। হাসে আরবাবও। ‘তা হলে, আজকে আমাদের আবাসনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কোরবানিদাতার এই হলো কেচ্ছা। বলতে পারেন কাহিনিও।’

তিন
সকালের কোরবানি পর্বে সময়মতো ও জুতসই কসাই পেয়ে যাওয়াও এক ভাগ্যের ব্যাপার। কসাই ঠিকঠাক করা থাকলেও দেখা যায়, তাদের আসার সময়ক্ষণের ঠিক থাকে না। দেখা যাবে, নির্দিষ্ট কসাই আসবে তবে দেড়-দুই ঘণ্টা পরে। এসে হাত জোড় করবে।
‘বাবু… কি করব রওনা দিছিলাম এদিকেই। পথে ধরা খেয়ে গেলাম এক সাহেবের কাছে। আমাদের না… না… কে শোনে… সোজা বাড়ির চত্বরে টেনে নিয়ে তার গরুর রশি ধরিয়ে দেয়।’
আর একটু আপত্তি করতে গেলে, তার ছেলে মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসে। ‘বাবা বললেন তো… ঠিক আছে যাবে, আমাদেরটা সেরে তবে…।’
‘আজকালকার ছেলেমেয়ে বুঝেনই-তো মেজাজ গরম…। অগত্যা তাদের কাজটা সেরে আসতে হলো।’
এমনি ধারার একটা আলোচনা চলতে থাকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে জমায়েত হওয়া কোরবানি দেওয়া লোকজনের মধ্যে। তবে এ-ব্যাপারে শুক্কুর মিয়া নির্বিকার, নিশ্চিন্ত। সে জানে, তার বিহারি ক্যাম্পের যে খানদানি কসাই গোলাম মিয়া সময়মতোই আসবে। সে উদ্বাস্তু হলেও জাত-বিহারি নয়। সে ইউ.পিওয়ালা। তার খানদান ভিন্ন। সে এক
কথার মানুষ। তার চলন-বলন, বাচনভঙ্গিতে সততা রয়েছে। সে ধীরস্থির হয়ে তার সময় ধরে আসবে। তার দলে আরো তিনজন রয়েছে। তাদের রয়েছে একটা ভ্যানগাড়ি। গোলামের কর্মীদলের সুরুজ্জা সে-ভ্যানটি চালায় আর সেটাতে রয়েছে জবাই ও মাংস বানানোর যাবতীয় ছোট-বড় ছুরি-চাপাতি-কুড়াল ও একাধিক কাঠের টুকরা। দড়ি-টুকরি, চাটাই তো আছেই। সুবিধামতো পেলে গোলাম কোরবানির চামড়াও কেনে। গোলামের পাশে দিয়ে গেলে পাওয়া যায় দোক্তা-সুগন্ধি জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার আকর্ষণীয় ঘ্রাণ।
গোলামকে আসতে দেখে শুক্কুর মিয়া উঠে দাঁড়ায়। ‘আমার লোক এসে গেছে।’ সে ধীরপায়ে এগোয়।
‘আমি ভাবছিলাম প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে… গোলামের দেখা নাই। কী ব্যাপার?’
গোলাম হাসে।
‘আমার কাছে দুই নম্বরি পাইবেন না। একবার কথা দিলে…’
তাড়া থাকা সত্ত্বেও কিছুটা সময় অনির্দিষ্টভাবে কাটায় শুক্কুর মিয়া।
গোলাম সেখানে না দাঁড়িয়ে হাঁটা দেয় পেছনের গ্যারেজ চত্বরের দিকে। তার গতিবিধি সম্পর্কে শুক্কুর মিয়ার মোটামুটি একটা ধারণা রয়েছে। সে জানে, গোলাম ঠিক জায়গায় গিয়েই দাঁড়াবে। হলোও তাই। তখন শুক্কুর মিয়া গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। তার দিকে।
‘আমি তোমাকে টেস্ট করছিলাম। তুমি আমার গরুদুটি সঠিক চিনতে পার কিনা? তুমি পরীক্ষায় পাশ করেছ।’
‘বাবু আমি জানি… এ হাউস কেন, এ-এলাকায় যদি কোরবানি দেনেওয়ালা থাকে সেটা আওর কোয়ি হো নাহি সাকতা। ও… আপ হ্যাঁয়।’
শুক্কুর মিয়া গোলামের কাঁধে আদরের চাপড় মারে একটা।
গোলাম বিগলিত হয়।
‘আপনার দুই গরুর সামনে অন্যদের কেনা গরুগুলোকে আমি গরু বলতে চাই না। আমরা কসাই আছে না…? আমাদের চোখে ওসব বাকরি-খাসি। কোরবানিকা গরু নাহি।’
শুক্কুর মিয়া হাসে। আত্মসন্তুষ্টির হাসি।
‘আমার জন্য দোয়া করো গোলাম। আমি বড় বিপদে আছি। আমি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি। আমি চাই, বাকি জীবনটা সাধারণ-গরিব-দুঃখী জনগণের সেবায় কাটাই। এটা আবার অনেকের সহ্য হচ্ছে না। দোয়া করো…।’
‘আল্লাহ মদদ দেনেওয়ালা…।’ গোলাম ওপরের দিকে তর্জনী ওঠায়।
এর পরক্ষণেই ধমকে ওঠে গোলাম।
‘কেয়া-রে সুরুজ্জা… দাঁড়াইয়া থাকলে চলব? ভ্যান সে মালসামান নামা… দড়ি-কাছি বের কর। গরু দুইডারে রাস্তার ড্রেনপাড় নিয়ে যা।’
গোলামের তিনজন সহযোগী কসাই শুক্কুর মিয়ার অনুমতি নিয়ে বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ষাঁড় দুটির পায়ে-পিঠে দড়ি পেঁচিয়ে বেকায়দায় ফেলে ধরাশায়ী করে। শুক্কুর, আরবাব, উকিল সাহেব ও উপস্থিত সবাই তাদের প্রশংসা করে। শুক্কুর মিয়া গর্বিত হয়ে কসাইদের গুণগান গায়।
‘এরা হলো গিয়া জাত-কসাই। এদের ষাঁড় পেঁচিয়ে ধরার কায়দা-কানুনও আলাদা। সব যেন মুখস্থ। এর কোনো নড়চড় হবে না।’
এবার নাঙ্গা রক্তাক্ত হাতে শিক্ষানবিশ জুনিয়র মাওলানা এগিয়ে এসে ‘জায়গামাফিক তরবারিটা বসিয়ে’ শুক্কুর মিয়াকে হুকুম দিতে বলে।
জবাই হয়ে গেলে গোলাম মিয়া কাটা গলা দিয়ে সরু-লম্বা ছুরি ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে রক্তক্ষরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
ষাঁড়ের দেহদুটি কিঞ্চিৎ খিঁচুনি থাকা অবস্থায়ই সুরুজ্জা ও অন্য দুজন চামড়া ছিলতে আরম্ভ করে। গোলাম পকেট থেকে খইনির কৌটা বের করে তা আঙুলে নিয়ে নিচের ঠোঁটের ভেতরের দিকে ঢেলে দিয়ে হোগলার চাটাইগুলো গ্যারেজের সুবিধামতো জায়গায় বিছিয়ে ফেলতে থাকে। শুক্কুর মিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গে থাকা এক অ্যাসিস্ট্যান্টও হাত বাড়ায়।
দ্রুত কাজ এগিয়ে চলে।
এদিকে অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কোরবানির গরু-ছাগলগুলোও একে একে জবাই হয়ে যায়। যার যার সুবিধামতো সেসব কেটে হাউসের ভেতরে নিয়ে আসতে থাকে। আর সেসব বঁটি-টুকরো করাও শুরু হয়ে যায়।
ঘণ্টা দেড়-দুয়েকের মধ্যে মাংস বানানো শেষ হয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে ফকির-গরিব মানুষের মাংস সংগ্রহ করার জমায়েতও ক্রমে বাড়তে থাকে।
দুই-দুই চারজন পাহারারত দারোয়ান সামলাতে না পেরে গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে জানায়, ‘তোমরা ঘণ্টাখানেক পরে আসো। আরো সময় লাগবে। মাংস পাবে।’
তা কি সবাই শোনে। বেশিরভাগ দাঁড়িয়েই থাকে। বলা তো যায় না, কখন হঠাৎ করে আবার মাংস বিতরণ শুরু হয়ে যায়।

চার
গত কয়েক দিন আগে এই আবাসনের মালিক সমিতির জরুরি বৈঠকে কয়েকটি আলোচনার মধ্যে আসন্ন কোরবানির পশু ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কয়েকটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে গ্যারেজের ফাঁকা জায়গায় গরুগুলো যার যার দায়িত্বে গুছিয়ে রাখতে হবে, এগুলোর খানাদানা-পানি সার্বিক পয়ঃপরিষ্কার করা, গেটের বাইরে বড় ড্রেন বরাবর কোরবানি দেওয়া, পরে ভেতরে নিয়ে আসা ও পরিশেষে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে মাংস বিতরণের প্রসঙ্গগুলো প্রাধান্য পেয়েছিল। এর মধ্যে শুক্কুর মিয়ার মাংস বিতরণের পদ্ধতিগত যে প্রস্তাব তা গৃহীত হয়। তা হলো : এখানকার যারা কোরবানি দেবেন, তার এক-তৃতীয়াংশ গরিবের হক। ফকির-মিসকিনকে দিতে হবে। সেই কাজটা সবার দেয় মাংস একত্রিত করে নিজেদের তত্ত্বাবধান মোতাবেক বিতরণ করতে হবে। তাতে আবাসনে একটা নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে। তা না হলে একটা বাজারে-বিশৃঙ্খল ব্যাপার হয়ে যেতে পারে। হুড়োহুড়ির মধ্যে দুর্বল-বৃদ্ধারা পদদলিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও হয়। এমন সংবাদ তো পত্রপত্রিকায় প্রতিবছর আমরা দেখি।
সুতরাং এখানে সেই শেষ সিদ্ধান্তটা যথাযথভাবে পালনের জন্য শুক্কুর মিয়া সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মধ্যে ঈদে এখানে থেকে যাওয়া মালিক ও ভাড়াটিয়ারা যার যার মতো মাংসের শেয়ার গ্যারেজ চত্বরের মাঝামাঝি এক জায়গায় বিছানো হোগলা চাটাইয়ে এনে জমা করতে থাকে। এ ব্যাপারে শুক্কুর মিয়া অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন ও তদারকিতে এগিয়ে থাকে। এতেও পুণ্য আছে।
এই পর্যায়ে দুই দারোয়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। ‘স্যার… স্যার মাংস নিতে আসা গরিব-মিসকিনদের মধ্যে যে কতগুলো রংচং-মাখা হিজড়াও চলে এসেছে। এ নিয়ে ফকির-মিসকিনদের মধ্যে প্রচ- বাগ্বিত-া চলছে এবং কিছু কিছু হাতাহাতিও শুরু হয়ে গেছে।’
গরিবের ভাগ মাংসের চারপাশে দাঁড়ানো অ্যাপার্টমেন্টের লোকজনও এতে নড়েচড়ে ওঠে।
উকিল সাহেব ও আরবাব এগিয়ে গিয়ে ব্যাপারটা যাচাই করে আসেন।
শুক্কুর মিয়া আগ্রহী হয়ে ছিল।
আরবাব জানায়, ব্যাপারটা তাই। ‘বেশ কয়েকজন…। তবে তারা মেয়ে না ছেলে বোঝার জো নাই।’ উকিল সাহেব মিটিমিটি হাসেন। ‘এসব বুঝতে যাইয়েন না। বুঝবেনও না।’
শুক্কুর মিয়াকে বিচলিত দেখায়।
‘হিজড়ারা পবিত্র কোরবানির মাংস কুড়াতে বের হয়, এমন দৃশ্য তো দেখি নাই আগে… শুনিও নাই।’
উকিল সাহেব বলেন, ‘হিজড়ারা আজকাল রাস্তাঘাটেও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যানজটের সুযোগে তাদের উৎপাত বেড়ে গেছে। আরো দেখা যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে বেদেরাও যোগ দিয়েছে।’
আরবাব প্রসঙ্গটা অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করে।
‘আগে পরব-উৎসবে হিজড়াদের নৃত্য ও গানের মাধ্যমে যে-ধরনের কিছু আয় হতো… তা আজকাল আর চলে না। এ ছাড়া বেদেদের সাপের খেলা ও টোটকা-ওষুধ বিক্রি, মন্ত্রতন্ত্র, শিঙ্গা ফুঁর যে সামান্য ব্যবসা ছিল তা এখন নাই। কাজেই…।’
শুক্কুর মিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ি থেকে আসা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কপাল কুঁচকাল।
‘তা-তো বুঝলাম… কিন্তু এটা যে পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান-আয়োজন – হিজড়া-বেদেরা যদি এখানে এসে থাকে, কী তাদের ধর্ম, কী তাদের বিষয়-আশয় না জেনেশুনে মাংস দেওয়াটা কি জায়েজ হবে?’
এই ইস্যুটা নিয়ে জমায়েতের অন্যদের মধ্যেও একটা আলোচনা চলতে থাকে। এরই মধ্যে ধারাম-ধুরুম করে কি একটা ভেঙে পড়ার বড় ধরনের শব্দ হয়।
দারোয়ানরা দৌড়ে ছুটে আসে। ‘ফকির-মিসকিনদের হুড়োহুড়ি-চিল্লাচিল্লি-ধাক্কাধাক্কির মধ্যে গেটটা ভেঙে পড়ে গেছে স্যার। আর দু-চারজন হয়তো চাপাও পড়েছে। আপনারা আসেন স্যার। তাড়াতাড়ি…। আমরা পারছি না।’
শুক্কুর মিয়ার বিরক্তি চরমে ওঠে। সে সবাইকে অনুরোধ করে, ‘আপনারা একটু দেখেন তো? এদিকে আমি মাংস সামলাই। যাকে-তাকে তো তা দেওয়া ঠিক হবে না।’
আরবাব-উকিল সাহেব ও আরো কয়েকজন গেটের দিকে ছুটে যান।
একটা মোটা মহিলা-কণ্ঠ প্রাণপণ চিৎকার করে কাঁদছে। ‘বাবারে…মারে… মরে গেলাম। এই রাজু… এই দেবিকা তরা কই… আমারে ধর… আমার পেট যে ফুটা অইয়া গেছে।’ গেটের ভিড়ের যেদিক থেকে চিৎকার আসছে সেদিকে দু-চারজন এগিয়ে যায়। বাকি মাংস কুড়ানোর দল হন্তদন্ত হয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। আহত কারো দিকে ভ্রƒক্ষেপের সময় নেই তাদের। দারোয়ান সবাইকে সামলাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। ‘স্যার এখানে একজনের অবস্থা খারাপ। গেটের একটা বাঁকানো রড তার পেট ফুঁড়ে ঢুকে গেছে। সে হিজড়া দলেরই কেউ হবে…।’ শুক্কুর মিয়া দারোয়ানদের চিৎকার করে ধমকে ওঠে। ‘তোমাদের সবার চাকরি যাবে। তোমরা কেউ কোনো কাজের না…এক্ষুনি আহত হিজড়াসহ সবাইকে লাইথাইয়া বাইর কইরা দে। যত তাড়াতাড়ি পারস…।’
আরবাব ছুটে যায় আহতজনকে দেখতে। সে ছুটে এসে জানায়, ‘একটা মেয়ের অবস্থা খারাপ। খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যদিও তাদের এক সঙ্গী বহু কষ্টে তার পেট থেকে ধারালো গেটের রডটা বের করেছে মাত্র। কিন্তু রক্ত থামানো যাচ্ছে না।’
সে হতভম্ব হয়ে খানিক পায়চারী করে। তারপর উকিল সাহেবকে জানায়, ‘আমি বরং একটা রিকশা ডেকে এনে তাদের হাতে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তাদের বিদায় করার ব্যবস্থা করি।’
আরবাব তার হোন্ডা স্টার্ট দেয়।
উকিল সাহেব তাকে বাধা দেন।
‘আহত হিজড়া মরে-না-বাঁচে তার কি ঠিক আছে? থানা-পুলিশ… অনেক ঝামেলা…। তার চেয়ে বরং দারোয়ান দিয়ে এদের এই চত্বর থেকে রাস্তায় নামিয়ে দেন। গেটটা উঠিয়ে লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেটাই ভালো হবে।’
এতক্ষণ গোলাম গরুর মাথা ছিলে, ভাঁজে ভাঁজে তা কেটে সাজিয়ে রাখছিল আলাদা বড় পাত্রে। এতক্ষণ সে সব শুনছিল।
একপর্যায়ে সে উঠে দাঁড়ায়।
‘কই-রে সুরুজ্জা ভ্যানগাড়িটা বের কর। মেয়েটা যে মরে যাবে। তাকে লইয়া যা কোনো হাসপাতালে। যত তাড়াতাড়ি…।’ সুরুজ্জা আহত মেয়েটা ও তার দুই শাড়িপরা সঙ্গীকে ভ্যানে চড়িয়ে রাস্তায় নেমে গেলে কসাই গোলাম বলতে থাকে,
‘উও ভি ইনসান হায় না! আল্লাহই সবাইকে বানায়।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply