জিন্দেগির বায়োস্কোপ

লেখক: আখতার জাহান

ফাল্গুন চৈতের এই উদাইসা দুপ্ফর আসিয়ার ভালা লাগে না। কলিজাটা খা খা করে। ঠান্ডা শেষ অহনের লগে লগে আতখা দিন বড় হয়া যায়। নাইড়া গাছে নয়া পাতা ফুচকি দেয়। তাবিবি দেইখা আসিয়ার শান্তি লাগে না। দুপ্ফরের ভাত খাওনের বাদে পান মুখে দিয়ে আসিয়া একজেসি (একটু) বিছানায় কাইত অহনের লগে লগেই চোখে ঝিপকি আয়া পড়ছে। ছোট নাতি-নাতকুর গো চিল্লাচিল্লিতে ঝিপকিটা ছুইটা গেছে। উইঠা বারেন্দায় আয়া দেখে আছিলা কাঁটাআলা মাখনা ঝিনাইয়ের খোল দিয়া ছিলনের কোশিস করতাছে মাইয়া রাবিয়ার ছোট পোলাটা। অর বইনে বাঁশের চটার চুটা দিয়া কাঁটাআলা মাখনা আটকায়া চাক্কু দিয়া মুখ আর বটু কাইটা ভাইয়েরে দিতাছে। ছোট নাতিটার ছিলবার যায়া মাখনার কাঁটা হাতে বিন্দা যাওনে ছ্যাড়া সব ফালায়া ফুলায়া ফাল দিয়া উঠবার যায়া বারেন্দায় রাখা বেলিফুলের গোলদান দিছে ভাইঙ্গা। রাবেয়া ঘরের থে আয়া দেখে গোলদান ভাঙ্গা, ওইটার উপরে পোলারে পইড়া থাকতে দেইখা চেইতা গেছে। তার বাদে পোলারে উঠায়া গুম্মুর গুম্মুর পিঠে দিছে কয়টা কিল। চেইতা কইলো,

– হপায় গাছে নয়া কল্লি আইছে, দুইদিন বাদে বেলিফুল ফুটবো, তুই আমার গোলদান ভাইঙ্গা ফালাইছচ।

পোলা কিল খাইয়া ভ্যা-ভ্যা কইরা কান্তাছে। আসিয়া আয়া নাতিরে আদর কইরা হাত থেকা কাঁটা বাইর কইরা কইলো,

– যাও ভাই গ্যাসের জল্লা চুলার কিনারে হাতটা দিয়া সেক দেওগা। মাখনার কাঁটা বিনলে যে বিষ করে। তুই পোলাটারে মারলি কেলা? আওলাদ আল্লার দান, অগো যতন করন লাগে, আমি তগো কুনু দিন মারছি?

আসিয়ার বড় নাতি বাবুল বিয়ালে নওবগঞ্জের পার্কে বল খেলবার গেছিল। সাম ওক্তে আয়া গোসলখানায় যায়া হাত পাও ধুইয়া নানির ঘরে যায়া পাঙ্খা ছাইড়া বিছনায় চিত হয়া বাতাস খাইতাছে। নানি ঘরে আয়া বাবুলরে কইলো,

 

– তুই পড়বার বইবি না?

– না কাইলকা কলেজ বন্দ। আইজকা তোমার লগে আড্ডা দিমু।

– তরা পার্কে বল খেলছ কেমনে গাছগাছালির মইধ্যে?

– গাছ নাই খালি ময়দান, এখন তো নামেই পার্ক। বড়রা কয়, আগে বোলে বহুত সোন্দর আছিল। কত ফুলগাছ আছিল, ফুল ফুইটা থাকতো, মানুষের লেগা জাগা জাগায় বহনের পাকা গেরদা আছিল। চাইরো দিকে দেওয়াল ঘেরা, দারোয়ান বি আছিল।

হাতে চায়ের কাপ লিয়া বাবুলের বাপ আরমান মিয়া ঘরে ঢুইকা পোলার কথার ডুড়ি টাইনা কইলো,

– এর আগে তো আমরা বরষাতে ওইখানে মাছ ধরতাম, বড় পুকুর আছিলো। পানি আইতো, পরে তো পার্ক বানাইছে।

– আম্মা চা খাইছেন?

– না বাবা খামু।

– আই রুবি, তোমার নানিরে চা দাও।

– আমি চা আনতাছি,  রুবি পড়বার বইছে।

এই কথা কয়া বাবুল চা আনবার রান্দনঘরে মা-র কাছে গেল। বাবুল চা আইনা ঘরে ঢুকনের বাদে আরমান পোলারে সোয়াল করলো।

– বাবা তুমি পড়বার বইবা না?

– আব্বা আমি আইজকা পড়বার বহুম না। কাইলকা কলেজ বন্দ। আইজকা নানির কাছ থেকা ঘোড়ার গাড়ির কথা হুনুম।

– হ বাবা, হুন। নিজেগো ঘরের কথা জাইনা রাখন ভালা। মাগার লেখাপড়া হইছে সব থেকা কিমতি। আগে নিজেরে কাবিল বানাও। বাপ-মার কথার মরতবা বুঝি নাই। পুরান ঢাকার মানুষ লেখাপড়ার মরতবা বুঝত না। মন দিয়া লেখাপড়া করি নাই, আমি তো কুনো রকমে গাউছিয়া মার্কেটে দোকান দিয়া টিকা গেছি। মাগার তোমার বড় চাচাগো হালত দেখো। ঘোড়াগাড়ি বন্দ অহনের বাদে নয়া কোনো ফিকির বাইর করবার পারে নাই।

এই কথা কয়া বাবুলের বাপে সেগ্রেট খাইবার লেগা ছাদের সিঁড়ি দিয়া উপরে উইঠা গেল।

– নানি এইবার কও।

– মায়া লাগে, বহুত মায়া লাগে। জেন্দেগি আমার বিতা গেছে। ওইদিনের কথা মনে করলে – জিন্দেগিতে কী দেখলাম, কী হাসেল করলাম আর কী খোয়াইলাম। কলিজাটা ফাইটা যায়।

– তর নানার আছিল ঘোড়ার গাড়ি। তর নানা নিজেই চালাইতো। যারা ঘোড়ার গাড়ি চালাইতো অগো কইতো কোচোয়ান।

– আচ্ছা নানি, ঘোড়াগাড়ি বন্দ হইছে কেলা? রেসকা আইছে বইলা?

– মর জ্বালা, আগে কইবার দে। না খালি টববর টববর উপর টপকা, যা কমু না।

কয়া আসিয়া মুখ ঘুরায়া বয়া রইছে।

– না নানি, কও। মাপ চাই, এই যে কান ধরলাম আর উপর টপকাগিরি করুম না।

– তে হুন, আমি তো কোচোয়ান গো মাইয়া। আমার বিয়া বি হইছে কোচোয়ান বাড়ি। আমার হউরের আছিল চাইরটা ঘোড়াগাড়ি। দুই পোলা দুইটা চালাইতো। নিজে একটা চালাইতো, একটা ভাড়া দিত। অভাব আছিলো না দুই বাড়িতেই, খাওন পিন্দন লিয়া কুনোদিন তকলিফ করি নাই। পেশাটার মধ্যে আজাদি আছিল। নিজের ঘোড়া নিজের গাড়ি। আমাগো ঘোড়া দুইটার নাম আছিল রাজা আর বাহাদুর। তর নানার জান আছিল। বহুত মহব্বত করতো। ঘোড়ারা-বি তর নানারে মহব্বত করতো। অরা সব বুঝত। দুইদিন তর নানার বোখার আছিল। এই দুইদিন গাড়ি লিয়া বাইরাইবার পারে নাই। বোখার কমনের বাদে আরগাড়ায় গেছে, তর নানারে দেইখা দুই ঘোড়ার চোখ থেকা পানি টপ টপায়া পড়তাছে। দানা পানিবি ঠিকেতথে খায় নাই। তর নানায় বকলে ঘোড়াগো চোখ ছলছল করতো। তর নানায় একদিন আমারে কয় কি, ‘দেখ আসিয়া, রাজা আর বাহাদুর আমার নিজের আওলাদ থেকা বাইড়া।’ শ্যাষম্যাশ ওই পরমানবি দিয়া গেল। তর নানায় শৌখিন আর দিলখোশ আদমি আছিলো। একদিন রাইতে গাড়ি আরগাড়ায় রাইখা বাড়িত আয়া বয়া রইছে তর নানায় গুমসুম হয়া। জিগাইলাম,

‘এত বিলা কেলা? কি হইছে?’ আমি মনে করছি পুলিশ বুজি আবার কুনু হুজ্জুত করছে।

‘আর কয়ো না আসিয়া, দিন কাল কিমুন কিমুন হোয়া গেতাছে। এই পাড়ের গ্যারাইমা বাঙ্গাল হালা, ওইপাড়ের মাউড়া আর ঘটিরা ঢাকা শহরে গিজগিজ করতাছে। আমরা চালাই ঠিকা। ক্রাহাঞ্চি গাড়ি। মামদার পোলারা কইবার পারে না। কয় করাচি গাড়ি, হুহ – যিমুন লাগে আমাগো গাড়ি করাচি থেকা আইছে।’

আমি কইলাম, ‘এত মানুষ হামাইবো কই।’

‘জাগো বড় বড় বাড়ি জঙ্গলে ভইরা আছিল। ব্যাবাক জঙ্গল সাফসুতরা কইরা মুলি বাঁশের ব্যাড়া দিয়া ঘর বানায়া ভাড়া দিতাছে।’

‘বালাইতো আপনেরা সওয়াবি পাইবেন। সবতের রুজি-রোজগার বা ড়বো। বাড়িঘরে ভাড়া চলবো।’

‘রুজি-রোজগার বাড়বো না, বাল বাড়বো! গাট্টি গাট্টি ট্যাকা লিয়া আইছে তো, না!? ফকিন্নির পোলারা দেখনা কয়দিন বাদে কি কামড়া-কামড়ি শুরু করে। হাইগা মুইতা সব গান্দা নাসবাস কইরা ফালাইবো। আমরাই টিকবার পারি কিনা খোদা মালুম। কি রানছো? রাইত বহুত হইছে। ভুখ লাগছে ভাত দেও। রাইত থাকতে উঠন লাগবো। রাজা আর বাহাদুররে দানাপানি দিয়া সবিরে সবিরে রাহাটের মোড় থেইকা সাহা গো ম্যানেজাররে ফুলবাড়িয়া ইস্টিসিনে দিয়া আহন লাগবো। আর আমার কি? আমি চকে আলাউদ্দিন হালুয়াই-এর দোকানে বয়া নাস্তা খায়া লিমু। এর বাদে চক আর নওবগঞ্জ টিপ মারুম। নাইলে বান্দা সোয়ারি ছুইটা যাইবো। গোস্তের কোরমাটা বহুত মজা হইছে। কিচমিচ আর বাদাম বাইটা দিছ? আসিয়া তুমি খাইবা না? তোমার ভাত বাড়ো, আমি জানি যত রাইত হউক তুমি আমারে ছাড়া ভাত খাও না।’

– আমি ভাত খায়া জুঠা পানি তসলায় ফালায়া, খিড়কির পাল্লা বালা মতন খুইলা, মুসুরি তোষকের চাইরোদিকে গুইঞ্জা আমার আর তর নানার বিছানা কইরা হুইছি।

– মা, ভাত খাইবার আহ। দেরি কইরা রাইতের ভাত খাইলে তোমার হজম হইবো না।

– জামাই খাইছে রাবেয়া?

– হ খাইছে।

– বাবুল তুই মার মুসুরিটা টানায়া আয়া ভাত খা।

– নানি, মাখনা খাইবা?

– আমার লগে বিটলামি করছ?

– আমি এগুনি অখন খাইবার পারি? আমার দাঁতে জোড় আছে? খাইছি জুয়ানিতে।

– কেঠা আইনা দিত? নানায়?

– হ, ওই তো আনত। মাখনার দিনে রোজ রাইতে বেল ফুলের মালা আর ছিলা মাখনা আনত। ওই তরা সব মাখনা খায়া ফালাইচ না। মুন্নার কাইলকা হাতে কাঁটা বিনছে দেইখা মাখনা খাইবার পারে নাই, অর লেগা রাখ।

বাদের দিন বিহানে নাস্তা করনের বাদে বাবুল নানিরে আয়া জিগায়,

– নানি, কি করতাছো?

– এই যে নাস্তা করনের বাদে দাঁতটা শিরশির করতাছে। পান মুখে দিয়া সরতা দিয়া সুপারি কাটতাছি।

– তুমি আর পান ছাড়বা না?

– এই একটা আদত ছাড়বার পারলাম না। নাইলে সব গেছে।

– নানি তুমি আগে হলে যায়া বায়োস্কোপ দেখছো?

– কুচিতে কাচিতে বায়োস্কোপের টিকিট আইনা কইত, ‘জলদি কাপড় বদলায়া চল, শো শুরু হয়া যাইবো।’

‘আম্মাজান রে কি কমু?’

‘কওন লাগবো না মায় কিছু কইবো না, পোলাপানরে লিয়া লেও। সাবিস্তানে যামু। আসিয়া কপালে একটা ফোটা দেও তোমারে সোন্দর লাগে।’

না, সবতে কয়, হিন্দুরা ফোটা দেয়। তুমি হিন্দু?’

‘আরে লালটা দিও না, কালাটা দেও।’

– আমি ঘোড়াগাড়িতে চইড়া কুচিতে শহর দেখবার বাইর হইতাম। আমি তামাম ঢাকা শহরের রাস্তা চিনতাম। তর নানায় গান গাইত আন সিনেমার,

দিলমে ছুপাকে পেয়ারকা

তুফান লে চালে

হাম আজ আপনে মাউত কা

সামান লে চালে।

পাড়া-পড়শি বউঝিরা আমারে ঠ্যাসরা মাইরা কইত, ‘আমরা বাপের বাড়ি থেকা খসমের বাড়ির রাস্তাই চিনি আর কিছু চিনি না। মাইনষে তামাম শহর ভুইনা খায়।’ যিমুন লাগতো অরা বহুত ভালা। আমরা খরাব। সব বউঝিগো তো বায়োস্কোপ দেখবার দিত না। খরাব হয়া যাইবো বইলা। খালি মরদগণ যাইতো। ইমুন ওক্তে একটা ঘটনা ঘটলো খাজে দেওয়ানে। কুন নামকরা বন্ধুকআলা আছিল। অর দুই মাইয়ার ঘরের নাতিন আর এক নাতিনের ননদ সোন্দর সোন্দর তিন জুয়ানি এক ছ্যাডারে লিয়া বোম্বাই যাইবার লেগা টেরেনে উঠছে। বায়োস্কোপের হিরুনি হইবো। অরা বলে বাড়িতেবি থাকতো হিরুনিগো মতন সাইজা। তে, ওই জুয়ানি ছেড়িরা তো হিরুনি হইবো, রানবো কেঠা? ওই যে চামচা ছ্যাড়াটা পিরু, ওই রানবো। মাইগার মতন ছ্যাড়া রাজি হয়া গেছে, ফায়েক লঙ্গরবাজ ছেড়িগো লগে যাইবো। ছেড়িরা তো হিরুনি হইবো অরা রান্দন বাড়ন কেলা করবো। অগো কতো নাম হইবো। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে টেরেনে তো উইঠা বইছে। অগোই কুন ভেদুয়াল গাদ্দারি কইরা সব ফায়েস কইরা দিছে, আর যাইবো কই। বাপ, ভাই, খসম সব তৌরান ইস্টিসিনে যায়া হাজির। টেরেন ছাড়তে দেরি হইবো। কলকাতার টেরেনে উইঠা দেখে তিন ছেড়ি কালা বোরখা পিন্দা বয়া রইছে পিরুর লগে। সবতেরে ধইরা লিয়া আইছে। ঘরের কথা ঘরেই রাইখা দিছে। মনে করছে কেউ জানবো না। অরাই তো মহল্লার মাথা সব ইজ্জতদার। সবতে জানলে মাইনষেরে মুখ দেখাইব কেমনে। মানুষ সবতে তাজ্জব বইনা গেছে ছেড়িগো এত বড় কলিজার পাটা দেইখা। ওইদিনে পেরেম মহব্বত করবার বি হিম্মত পাইত না। তিন ছেড়িগো যার যার খসমের কাছে হাওয়ালা কইরা দিছে। তোমাগো জরু যেমনে ইচ্ছামাফিক শাসনে রাখ, আমরা বাপ-ভাই কিছু কমু না। আর পিরুরে মরদানারা খালি লাথ্থাইছে আর জুতাইছে। আর কইছে ইমুন নাফরমানি কাম ফের করলে তরে খুন কইরা ফালামু। তিন জুয়ানিরে নজরবন্দি কইরা রাখল। কথা কি আর ছাপ্পা থাকে, তামাম পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে এই খবর সুরাট হয়া গেছে। সবতের বায়েস্কোপ দেখন বন্দ। ওই তিন ছেড়ির মথন পুরান ঢাকার আবিয়াতো-বিয়াতো সব ছেড়িরে নজরে নজরে রাখে যার যার আপনা বেগানা।

– বাই আমার হাত পাও এর চারি কাইটা দে, বড় হয়া গেছে। চোখে দেখি না, আঙ্গুলের গোস কাইটা খুন বাইর হয়া যায়। চারিটা কাইটা দিলে আমি নাহাইবার যামু।

– রুবি, নাখুন কাটনিটা কই, বাইর কইরা দে; নানির চারি কাটুম।

একদিন সাম ওক্তে রুবি মা’র কাছে আয়া কইলো,

– মা, নানি ছদে মোড়ায় বয়া চান্নি দেখতাছে, রস্নিতে চাইরো দিক ফটফটা সাপা। চলো, আমরাবি যাই, বাতাসবি খেলতাছে।

রাবিয়া রুবির কথায় ঘরের সব বাত্তি মুঞ্জায়া, মা-মাইয়া ছদে মাদুর বিছায়া মা-মাইয়া-নাতিন আড্ডা দিতাছে।

– চৈতা চান্নি রাইতে তোর নানায় আর আমি সারা রাইত জাইগা চান্নি দেখতাম। ব্যাল ফুল ভুরভুরায়া গেরান ছাড়তো। তগো ছদের ফুলের গেরানে কত বচ্ছর আগের কথা চোখে ভাইসা উঠতাছে। আমার কাছে এই চৈতি চান্নি সবতে বেশি সোন্দর লাগে। আসমানে আবর থাকে না, চাইরো দিক সব দেখা যায় চান্দের রস্নিতে।

ইমুন ওক্তে বাবুল বি ছদে আয়া হাজির। অর মা’রে কইলো,

– মা কাইলকাত্থে রুবিরে স্কুলে বোরখা পিন্দায়া পাঠাইবা।

– কেলা কি হইছে বাবুল? আতখা ছদে আয়া এই কথা? আমার এই ছোট মাইয়ারে কেলা বোরখা পিন্দামু? হপায় এইট কেলাসে পড়ে।

– লতিফ চাচাগো ভাড়াইটা ছেড়িরে দৌলাত গুন্ডা বিয়া করবার চায়। ভাড়াইটারা সব মালসামান ফালায়া জানটা লিয়া সবতে পলাইছে।

– চোরের ডরে বউ লেংটা! এই ডরে আমাগো মাইয়ারে বোরখা পিন্দামু কেলা! আমাগো মাইয়ারে কিছু কওনের হিম্মত অইবো! আমরা আগে বোরখা পিনতাম না, নয়া চোচলা শুরু হইছে!

আসিয়া কইল,

– আমরা কুনুখানে গেলে দুই দিকে কাপড় টাইনা ধরতো, আর আমরা ঘোড়াগাড়িতে উইঠা যাইতাম। পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান অহনের বাদে মাউরানিগো দেখতাম বোরখা পিনতে। আমাগো মুরুব্বিরা কইত, ঘোমটার নিচে খ্যামটা নাচে। হুনছি মাউরা ছেড়িরা বোলে বোরখার ভিতরে থাইকা ছ্যাড়াগো চোখ মারত। আমাগো পুরান ঢাকার কিছু কিছু বুড়ি বোরখা পিনতো। খান্দানি মানুষেরা কইত, বোরখাআলির নাতিনরে বিয়া করায়ো না। কিছু চুকবুক হইবো উন্নি চুন্নি ধইরা বোরখা পিন্দায়া কাইজা করবো। পোলাপান ছোট ওক্তে রাস্তায় বোরখাআলি দেখলে চেতাইতো। ‘বোরখাআলি ঢুম ঢুম, বোরখাআলি ঢুম ঢুম।’ না আমার আর জান চলতাছে না। আমি হুইবার যাই, পিটটা বিষ করতাছে।

– হ নানি হুয়া যাও। এইরকম একজেসি দেরি কইরা হুইবা, সাম ওক্তে হুয়া গেলে রাইত থাকতে উইঠা জাগনা হয়া প্যারপ্যার করবার লাগবা।

– আমি কি করুম একলা আজিরা ভালা লাগে না।

– আরে এইটা তো আগে কইবা? আমি আছি না? তোমার কাছ থেকা আমার যে বহুত কথা হুননের বাকি আছে।

– কি হুনবার চাছ?

– ঘোড়াগাড়ির কথা। কাইলকা বহুমনি সাম বাদে ছুটির দিন আছে।

পাকিস্তান অহনের আগে থেকাই কোচোয়ান গো দিন খরাব অহন শুরু হইছে। বিটিশ আমলের শ্যাষের দিকে গুর্খা, গারোয়ালি পুলিশ জ্বালাইত। তালিবালি ছুতানাতা বানায়া এর গাড়ি আটকায়, ট্যাকা দিয়া ছাড়াও, এরে ডাণ্ডা মারে অরে ডাণ্ডা মারে; তর নানা বহুত পেরেশান থাকতো। কইত, –  ‘আমার জাত কোচোয়ান, আমরা আজাদ থাকবার চাই। এই সিপাই হালাগো হুজ্জুত খালি একজেসি ছুতা পাইলেই কয়, পালিশ কারেঙ্গা থানামে চাল।’

মাঙ্গির পো’রা কোইত্থেকা না কোইত্থে আইছে, আমাগো দ্যাশে ফুটানি মাড়ায়। আমাগো বাপ-দাদা-পরদাদা চৌদ্দগুষ্টির লগে খালি বলে ভিনদেশিরা আয়া ফুটানি মারাইছে। ঢাকাইয়া হালারা পান পাদ্দু চোদুর জাত, খালি মাইর খায়। যুগে যুগে হালারা আইছে আর পোম মারছে। কইছে, ‘আপনেরা বহুত ভালা, দিল বড়।’ আর এক্কেরে হোগা ফুইরা যায় ঢাকাইয়া চুতমারানির পোলাগো। সিদা বোদাই হালাগো বাঙ্গাল হালারা ধর্মের বাপ-ভাই ডাইকা কত মাইনষের বাড়িঘর যে নিজেগো নামে পর্চা বানায়া দখল করছে।’

রুবি আমার পেসারের দাওয়াই দে, খায়া ফালাই। বাবুল তুই যা, রুবি হুইবো, বিহানে ওর স্কুল আছে।

– পাকিস্তান হওনের বাদে কি দিন ভালা হইছিল? একজেসি সুকুন পাইছিলা?

– না ভাই, জুলুম সিতিম বাইড়া গেছিল। সবতে কইত,

এক বউ ছাড়ছি চাইল চাবানের ডরে,

আরেক বউ দেখি আস্তা ধান গিলে।

– দ্যাখ বাবুইলা, তুই আমার মা’র লগে রাইত বিরাইত বাইলা প্যাঁচাল পারবি না। আমার মা না হুইলে পেসার বাইড়া যাইবো।

– ঠিক আছে নানি, কাইলকা বল খেলবার যামু না; ওই ওক্তে বহুমনি।

– আচ্ছা, খাতায় কী লেখচ?

– তুমি তো একটা জিতা ডাইরি, কালের সাক্ষী। তোমার কথা টুইকা রাখি।

– আমাগো ওক্তে দুয়ার ঝাড়ু দিবার গেলে কম্মর ট্যারা হয়া যাইত। রোজ ঝাড়ু দিয়া ব্যায়াম হয়া যাইতো। এহন চাইর কদম হাঁটলে আর হাঁটনের জাগা পাই না। বিমারি কি এম্নেই আহে? এক রকম বিমারি আইছে কুনু তালাফি বোলে নাই? খালি বোলে হাঁটন লাগে? পুরান ঢাকার সব বাড়িঘর তো মুরগির দরবা হয়া গেছে, এর ভিতরে আবার সারা দ্যাশের মানুষ আয়া জুটছে।

বিবির নাই ঠাঁই

বিবির লগে সাতশো দাই।

– নানি এইগুনি প্যাঁচাল ছাড়ো। ঘোড়ার গাড়ির কথা শুরু করো।

– কি জানি কয়া রাখছি? হ মনে পড়ছে, মিনিসিপ্যালটিতে যায়া বছর বছর গাড়ির লাইসেন রিনু করন লাগতো। ওইখানে বি পেরেশান, ঘুষ না দিলে তালবাহানা কইরা রিনু করতো না। খালি ঘুরাইতো। নাজিরাবাজারে সব মহল্লার কোচোয়ানগো ডাকছে, সভা বইবো। মতি সর্দার হইছে সভাপতি। সবতে মিলা বানাইলো আঞ্জুমান। ঘুষ ছাড়া লাইসেন রিনু অহে না। পুলিশের জুলুম-সিতিম বাইড়া গেছে, আর সওন যায় না। সবতের এককাট্টা হয়া যা করনের করন লাগবো। মাগার এমুন কইরা বি কুনু ফায়দা অহে নাই। এর বাদে পঞ্চাশের আকালে বহুত ঘোড়া মইরা গেছে। মানুষ নিজে না খায়া ঘরের হাইড়া-পাতিলা বেইচা বি ঘোড়া বাঁচায়া রাখনের কোশিস করছে। এর মধ্যে সবথে বড় জ্বালা তো বিটিশের শ্যাষের দিকেই আয়া পড়ছিল, টাউন বাস সার্ভিস রেসকা ব্যবসা আর বেবি টেস্কি। এত কিছুর বাদে কেউ কেউ বাপদাদার পেশাটা আঁকড়ায়া ধইরা বাঁচবার চাইছে। এত কিছুর বাদে আর বাঁচবো কোইত্থে। আস্তে – আস্তে – একটা দুইটা কইরা গাড়ি বন্দ হওন শুরু করলো। মোড়ে মোড়ে, যিমুন চকের মোড়ে, ইসলামপুরের মোড়ে, মিনিসিপালটি লোহার চৌবাচ্চা বানাইছিল ঘোড়াগো দানাপানি দিবার। ওইগুনি উঠায়া দেওন শুরু করলো। গাড়ি তো কম, পোষায় না। অহন যিমুন জাগা জাগায় পেট্রোল পাম্প ইমুন।

– একদিন আতখা বন্দ হয়া গেছে নানি?

– না, আতখা অয় নাই। আস্তে – আস্তে – বন্দ অইছে আর বাঁচবার দেয় নাই। এই ঘোড়াগাড়ির লগে সুখ-দুঃখ রিজিক জুইড়া আছিল হাজার হাজার মানুষের। এই ঘোড়াগাড়ি চালায়া তর নানায় কত কিসিমের মানুষের কত কিরতি যে আয়া কইছে। সওয়ারি গো সুখ-দুঃখ সবকিছুতে নিজেরে শামিল মনে করতো। এই শহরের ঈদ, পূজা, সব পরবে কোচোয়ানরা শামিল হইত। ঈদ পরবে ঘোড়াগো কানে বালি, পাখির পরের তাজ বানায়া সাজায়া গুজায়া রাস্তায় নামাইত। ঘোড়াগো লগে নিজেরাবি চটকদার কুর্তা, নয়া লুঙ্গি আর ব্যাল ফুলের মালা গলায় লটকায়া, সাইজা গুইজা নয়া-নওশার সাজে গাড়ি লিয়া বাইর হইত। দ্যাখতে যা সোন্দর লাগতো!

মানুষের ভালা-কিরতি, বুরা-কিরতি বহুত কিছুর সাক্ষী আছিল এই কোচোয়ানরা। এই ঘোড়াগাড়িতে চইড়া কত রহিস হিন্দু মোসলমানরা যে ইসলামপুরের বেশ্যাপাড়ায় যাইতো, কতজনের তো বান্দা মাগি আছিল। হালাগো পয়সা আছে ত এইটার লেগা নিজেগো নওয়াব-সাব সোচ করত। মাগিবাজি আর নিকা-হাঙ্গা করত। নওয়াবসাবগো বাতাস লাগছিল বদনে। অমুক মিয়া, তুমুক বাবু, সারা রাইত বেশ্যাপাড়ায় বিতায়া সরাব খায়া ফজরে বেহুঁশ। ব্যাটাগো যার যার বাইত দিয়া আয়া গাইল পারতো। আর কইতো, ‘মানুষের কত অভাব, ভাত পায় না। চাইরোদিকে আকাল। ঘরে জরু থাকতে হালারা মাগিগো কাছে যায়, তামাম রাইত মউজ করবার।’ বিয়ার বয়রাত লিয়া গেলে যিমুন দিল খুশ থাকতো, লাশ লিয়া গেলে তিমুন দিল খরাব কইরা থাকতো। কত অজাত কুজাত ছ্যাড়ারা গাড়িতে মাগি লিয়া উইঠা আকাম-কুকাম করতো। তর নানায় বি চেইতা অগো হুনায়া হুনায়া ঘোড়ারে গাইল পারতো, আর গাড়ি জোরে জোরে চালাইতো।

– মা, চা খাও। তোমার গলাটা হুকায়া গেছে।

– হ, দে। দুই ঢোক খাই, জিটা মাতলাইতাছে।

– মা, বাত্তিটা জ্বালায়া যাও।

– বাবুল সাবধান, খেয়াল রাখিছ। মা যিমুন বেচইন না হয়া যায়। পুরানা ইয়াদাগার তো।

– এখন হুন আসল হিস্টুরি, বায়োস্কোপরে হার মানাইব। হুইনা তব্দা খায়া যাবি।

– যা হুনছি! এইটা বি বোয়োস্কোপ থেকা কম কী!

– দিনে দিনে সোয়ারি কমন শুরু হইলো। আমদানি কইমা যাইতাছে। যা আমদানি অহে ঘোড়ার খোরাকের পয়সা আহে না, আমরা কি খামু? মিরপুরের যাওনের রাস্তা বানাইছিল ঘোড়ার গাড়ির দুই চাক্কা চলনের মাপে। ঘাস হয়া থাকতো, দুই দিকে ইটা বিছান থাকতো। একদিন মিরপুরের শাহ-আলী শাহর মাজারে সোয়ারি লিয়া গেল। সারাদিন ঘরে কুনু খাওন নাই, পোলাপান সবতে ভুকা। মুসা সারাদিন না খাওয়া, টো টো কইরা ঘুইরা সাম ওক্তে ঘরে আয়া ল্যাথ্রায়া পইড়া রইছে। আমি তর নানার লেগাই ইন্তেজার কারতাছি। সোয়ারিরা অগো ছাওয়ের মুখে সিন্নি দিবার গেছিল আপনা বেগানা লিয়া। রাইতে অগো বিরানির সিন্নি লিয়া আইছে, ওইটা খায়া পোলাপান হুইছে। খায়া না খায়া দিন গুজরান করি, ধার করজা করবার কার কাছে যামু? বাপ-ভাই সবতের এক হালত। তর মা’র তো বিয়া হয়া গেছে, আমার ছোট মাইয়া সোরাইয়া। তর নানায় শখ কইরা বায়েস্কোপের হিরুনির নামে নাম রাখছে। ওইদিনে সোরাইয়া বহুত মাসুর হিরুনি আছিল। একদিন সোরাইয়া আয়া কয়, ‘মা আমরা এতই গরিব হয়া গেছি। আগে আববা কত আম, কাঁটঠল, তরমুজ আনতো; অখন আনে না। বাচ্চু চাচার বাড়ির ভাড়াইটা বড় মাইনষের বাড়িত কাম করে, অরা বি ওই বাড়িত থেকা দিলে আইনা খায়। আমরা পাই না, আমার খাইবার দিল চায়।’

– ভাইরে, অর মুখের দিকে চায়া আমার কলিজাটা ফাইটা গেছে। মাইয়ারে বুজাইলাম, ‘মাগো মানুষের কুনো কিছু দেইখা তরসায়ও না। তরশ খাও, এইদিন থাকবো না, আল্লা মুখ উঠায়া তাকাইব।’ ঘরে খাওন থাকে না, মুসা সারাদিন স্কুলে না যায়া ডিপটির ছাড়া বাড়িত যায়া বিড়িং খেলে। তর নানার দেলদেমাগ ভালা থাকে না। একদিন মুসারে ইমুন মাইর দিলো বোনবেলার ডালি দিয়া। – ‘স্কুলে যাস না কেলা।’ মুসা কাস্তে কাস্তে কাইলো, ‘যামু না, কুনো দিন যামু না। স্কুলের পোলাপান আমারে কয় ঘোড়ার ল্যাদা, আর হাসে।’ একদিন রাইতে ঘরে খালি হাতে আইছে। ঘরে একটা দানাবি নাই, বিহানে যে ফুটায়া দিমু। সোয়ারি কম, যা আমদানি হইছে ওই ট্যাকা দিয়া ঘোড়ার চানা কিনছে। আমি কইলাম, ‘পোলাপান গো মুখ কি দিয়া ভরুম? এতো তকলিফ আর সইবার পারি না। আপনে রেসকা চালান।’ এই কথা কইলাম না কইলাম আমার উপরে জুলমত আইয়া পড়লো। যে-মানুষ আমারে কুনুদিন একটা ফুলের টোকা দেয় নাই, ওইদিন আমারে চুল ধইরা কি মাইরটা যে মারল। মাইরা পেরেশান হয়া গেছে, আমারে কয়, ‘তুই আমারে রেসকা চালাইবার কইলি কামাইবার পারি না বইলা? বইল থেকা খরাব বানায়া দিলি? এই কথা হুননের আগে আমার মইরা যাওন ভালা আছিল।’ আমি খামোশ খায়া রয়া গেছি আর কথা বাড়াই নাই। দুইদিন বাদে আমার দেওর আয়া কয়, ‘ভাবি, ভাইরে দেখলাম আরগাড়ায় ঘোড়ারে কিচমিচ খিলাইতাছে।’ আগে ভালা ওক্তে ঘোড়ার তাকত বাড়াইবার লেগা কিচমিচ খিলাইতো।

আমি ওইদিন কিছু কওনে দিলে চোট লাগছে, পোলাপানের মুখে ওক্তের খাওন ওক্তে দিবার পারি না আর ওই ঘোড়ারে কিচমিচ খিলায় ।

বাদের দিন বিহানে ফল ফলার মাছ গোস, চাইল, ডাইল, তেল উনকুট্টি সংসারে যা যা লাগে, চাঙ্গাড়ি ভইরা মিন্তির মাথায় কইরা বাজার লিয়া আইছে। সোয়ারি ঘাট থেকা জোড়া ইলসা মাছ। কয়টা জানি ইলসা মাছের নোনাও কাইটা আনছে। আয়া কয়, ‘আসিয়া, বালা কইরা মেথি দিয়া গরুর গোস্তের দোপেঁয়াজা করো। লেম্বু দিয়া রৌ মাছের সাদা কোরমা রান্দো। আইজকা তোমাগো লিয়া জি ভইরা খামু।’ নিজেই ফল ফলারি ছিলা-কাইটা পোলাপানরে লিয়া আমারে দিয়া খাইলো। দিলে আইছে, ট্যাকা পাইল কই? মাগার কি দিলে আইলো, কিছু সোয়াল করলাম না। বাজার থেকা আয়াই কইছিল, ‘চাইল ভিজাও, গুড় নাইরোল আনছি; বিয়ালে গুজাপিঠা খামু।’ জিগাইলাম, ‘গাড়ি লিয়া বাইরাইবেন না।’ কইলো, ‘না আরাম করুম।’

আমি চুলায় লাকড়ি ঠুইসা, আমার জালের চুলা থেকা হাতায় কইরা আগুন আইনা চুলায় দিয়া, চাইল ভিজাইলাম। নোনা কাটা মাছে নুন দিয়া, পাইলার মুখ বাইন্দা, ছিকায় লটকায়া রাখলাম। দেইখা কইলো, ‘রাবেয়া আইলে নোনা রাইন্দো।’ মুসা সোরাইয়ারে লিয়া লুডু খেইলা, মুসারে লিয়া গাংগে নাহাইবার গেল।

আমি রানলাম, বাড়লাম। মাদুর বিছায়া আমার হড়িরে খাইবার ডাকলাম, অর বাপে পোলা মাইয়ারে লিয়া খাইবার বইলো। বড় মাছের টুকরাটা অরে দিবার গেলাম,

‘আমারে না, আমার বাবারে দেও।’ মুসারে দেখাইয়া কইলো।

‘মায়রে মাছের লেঞ্জাটা দেও, রৌ মাছের লেঞ্জা মা বহুত শখ কইরা খায়।’

আমার হড়ি পোলারে কইলো, ‘বাবা তুই খা।’ ‘না মা তুমি খাও, তুমি যে লেঞ্জার শোষের দিকের কাঁটাগুনি চুইসা খাও আমি ছোট ওক্তের থেকা দেখি, আমার ভালা লাগে।’

সোরাইয়া রেওয়াজআলা গোস পসন করে। নিজেই ওর বাসুনে উঠায়া দিলো। খাও মা, ‘আমি গরুর সিনা আর রানের গোস মিলায়া রানের গোস মিলায়া আনছি, তোমার মায় যে  রুটঠা গোস খায়, আসিয়া ওই টুকরাটা লেও।

আনার গাছে ঝুমকায়া ফুল আইছে পুরা গাছ লাল হয়া রইছে। চকির পাটি পুইছা ভিজ ডুমাটা আনার গাছের সামনে ছড়ায়া দিছি। রৈদ ওইদিকে পড়ছে। ঘরে আয়া দেখি, চকিতে গৈড় দিয়া গতরে বাতাস করতাছে। আমারে দেইখা কয়, ‘আহো আমার লগে গৈড় দেও।’ ‘চাইল বাটুম, পিঠা বানামু।’

‘কেউর কাছে বাটবার পাঠাওনি?’

‘না, দুই সের বাইলই।’ তার বাদে অর সামনে কাইত হইলাম। আমার ভিজা চুল ধইরা নাকটা লাগায়া হুংতাছে। ‘তোমার ভিজা চুরের গেরানটা কী যে ভালা লাগে। আর তোমার মথন ইমুন লাম্বা আর সটক্কা চুল এই মহল্লার কার আছে?’

বিয়ালে আমি আর আমার হড়ি মিলা গুজা পিঠা বানাইলাম। ফকির চানের বউ নাইরোল কোড়ায়া দিলো। ফকির চানরে লিয়া পিঠা খাইলো। ভাইরে ছাইড়া ভালাবুরা খাইত না। পিঠা খাইতে খাইতে আতখা জিগায়া বইলো, ‘রাবেয়ারে পিঠা পাঠাইছো।’ আমি না করনে বেচইন হয়া গেছে। ‘জলদি পাঠাও। কতদিন ধইরা কিছু দেই না। হড়ির ঘর কথা হইবো। কাইলকা আমি রাবেয়ারে দেইখা আইছি। অর শখের দই আর অফেলাতুন লিয়া।’ কয়দিন ধইরা বেশি বেশি হাসতো, মাগার আমার কাছে লাগতো দিলে বহুত গম লিয়া হাসে।

রাইতে হুইবার যায়া আমারে কয়, ‘আসিয়া তুমি আমারে মাফ কইরা দিও। আমি যে ওইদিন তোমারে মারছিলাম। আমার জুলুম তুমি মনে রাইখো না। আমি রাজা আর বাহাদুর রে বেইচা ফালাইছি, গাড়ি ভাইঙ্গা কাঠ আর লোহা সের দরে বেইচা দিছি।’ কয়া, এই যে পোলাপানের মথন হাউমাউ কইরা তামাম রাইত কানলো। জিগাইলাম, ‘কাগো কাছে বেচছেন।’ ‘রেসআলাগো কাছে। তাগড়া তো, লিয়া লিছে; ভালাই থাকবো।’ দুইশো ট্যাকা হাতে দিয়া কইলো, ‘ট্যাকাটা তোমার কাছে রাখো।’

ফজরের দিকে দুইজনে একজেসি ঘুমাইছি। বাদে উইঠা ভাত রানছি। বিহানে গরম ভাতের লগে বাহি গোস্তের সালুন দিয়া ভাত খায়া, যে-ইটার উপরে চকির পায়া বহায়, ওই ইটার কিনার থেকা সেগ্রেট আর দেশলাই লিয়া, একটা সেগ্রেট ধরায়া দেশলাই আর সেগ্রেটের বাক্স কম্মরে গুঞ্জলো। বাইরে যাইবার লিছে, জিগাইলাম – ‘কই যান।’ ‘এই যে সামনে’, কয়া সাদা শাট আর চেক লুঙ্গি পিন্দা তর নানায় বাইরায়া গেল। আমি যে ওসারায় খাড়ায়া রইছি ফিরা দেখলো না।

– নানি এই ল্যাও পানি খাও।

– তর নানায় ‘এই যে সামনে’ কয়া বাইর হওনের বাদে আমি ঘর লেপবার গেছি, ওইদিন ফাটায়া রৈদ উঠছে দেইখা। ওইদিনে ঢাকা শহরে বেশি বাড়িতেই মাটির কোঠা ঘর আছিল। ঘর ওসারা লেইপা আমি নাহায়া ধুয়া একজেসি কাইত হইছি, কবে যে চোখ লাইগা গেছে। ঘুমেত্থে উইঠা দেখি আসরের আজান দিতাছে, বাইরে আয়া দেখি মুসা পেয়ারা গাছে উইঠা পেয়ারা পারতাছে। সোরাইয়া চুলে ত্যাল দিয়া কাঙ্গই দিয়া মাথার উকুন ফালাইতাছে।

‘তর আব্বায় আইছিল?’

সোরাইয়া কইলো, ‘না।’

‘তরা ভাত খাইছস? আমারে ডাছনাই কেলা?’

‘তুমি হুয়া রইছো, আমরা দুইজন খায়া লিছি।’

আমি আমার দেওরের ঘরে যায়া জিগাইছিলাম, ‘ছোট মিয়া আপনের ভাইয়েরে সড়কে দেখছন?’ ওই না করনে মনে করলাম দোস্ত মহিমের লগে কুনোখানে গেছে।

যাউক দিলটা খরাব, কুনুখানে ঘুইরা আইলে দিলটা ভায়লাইবো। আমি রাইতের ভাত রাইন্দা, সালুনপাতি গরম কইরা, গোস-মাছ যেগুনই ওসনায়া রাখছি সব গরম করলাম। আমার চুলে ত্যাল দিয়া কাঙ্গই দিয়া চুলগুলি একজেসি সাপটাইলাম। সাম ওক্তে পোলাপান হাত পাও ধুইয়া ঘরে আইছে। আমি হারিকেনের শলাতা কাইটা, ত্যাল ভইরা, পুইছা জ্বালায়া, ঘরে বাত্তি দিলাম। বাদে অরা রাইতের খাওন খায়া হুইয়া গেছে। আমি মনে করলাম, তর নানায় আইলে এক লগে খামু। আমি মাটিতে আমাগো বিছানা কইরা একজেসি সুজি আর ময়দা মিলায়া, চুটকি সেওই বানাইতাছি। আহারে তর নানায় আনারস দিয়া চুটকি সেওইয়ের জর্দা বহুত শখ করতো, মাগার আমার হাতের সেওই ছাড়া আর কেউর হাতেরটা খাইতো না, ঘিনাইতো।

অর আহনের আশায় রাইত একটা বাইজা গেছে চাইরোদিক সুনসান হয়া গেছে। রাস্তায় একটা কুত্তাবি ডাকতাছে না। আমার দিলটা ঘাবড়ায়া উঠছে। চুটকি সেওই ফালায়া ঘর বাইর হওন শুরু করলাম। বাড়িতে না কয়া কুনুদিন বাইরে রাইত কাটায় নাই, মানুষটা গেল কই? অহন বি আহে না। সারাটা রাইত ছটফট কইরা কাটায়া দিলাম। ফজরের আজান দিছে, আমার দেওর ফকির চানরে যায়া কইলাম, ‘আপনের ভাইয়ে কুন বিহানে বাইরে গেছে অহন বি তো আইলো না।’ কয়া আমি কাইন্দা দিছি। ফকির চান হুইনা কইলো, ‘আসমানটা সাপা হউক। আমি খবর লিতাছি, আপনে বেতাব হোয়েন না।’

সব জাগায় খবর লিলো। তর নানার দোস্ত মহিমগো কাছে গেল, কিছু জানে কিনা, কেউর লগে কুনুখানে গেছে কিনা; কুনুখানে যায় নাই। সবতে কইলো শোচ কইরো না, আয়া পরবো। আপনা বেগানা সবতের কাছে খবর গেল, না, কেউ কিছু কইবার পারলো না। আমার বাপ ভাইয়ে চাইরো দিকে বিছরান শুরু করলো। না, কুনু খবর নাই। তর মা-বাপে নওবগঞ্জ থেকা আমাগো বাড়িত আয়া পরলো। মহল্লার কেঠা বোলে দেখছে, লালবাগের চৌরাস্তায় বাসে উইঠা গাবতলিতে যাইবো, অরে বোলে কইছে।

এই কইরা দুইদিন কাইটা গেল, না রান্দন, না খাওন, না নাহান, না ঘুমান – সারারাইত দরজা খুইলা বয়া থাকি। অরে বাইরে রাইখা ঘরের দরজা আমি কেমনে লাগাই। দুই চোখের পাতা এক করবার পারি না। একজেসি ঝিপকি আইলে ফাল দিয়া উঠি, এই বুজি আইলো। এর মধ্যে গুনিন, ফকিরের কাছে লৌড় পারতাছে সবতে। একজন ফাল খুইলা কইলো, ‘আছে, বাইচা আছে।’ আয়না পড়া দিলো। আয়নায় ১২ বছরের পোলা দেখলো, পানির রাস্তা দিয়া গেতাছে। একজন বুইড়া আঙ্গুলের চাড়ির ভিতরে দেখল, একটা বাড়িতে বয়া রইছে। এই সব হুইনা দিলে তসলি­ আছে, আয়া পড়বো। কত জাগায় যায়া কত তরতিব করলাম। আমার হড়ি এক মোল্লার কাছে যায়া তাবিজ আইনা গাছে লটকায়া দিলো। তাবিজ বাতাসে লড়বো, বেচাইন হয়া আয়া পড়বো। আমার বাপে আমলিগোলার বদ্দু পাড়ার এক গুণিনের কাছ থেকা তাবিজ আনছে, গুণিন কয়া দিছে চকির নিচে তাবিজ পাটা চাইপা রাখবার। সবতের কারবার হইলো, আমার ট্যাকা গেল।

– তোমরা পেপারে দ্যাও নাই? রেডিওতে এলান করো নাই?

– কেউ তো কিছু কয় নাই মরদগণেরা।

– তোমরা যেসব বাটপারগো কাছে যায়া যত ট্যাকা খোয়াইছো এর থেকা বহুত কম খরচ হইতো, পেপার আর রেডিওতে এলান করলে। ফায়দা বি পাইতা। নানি তুমি চা, পান খাও, আমি বল খেলবার যাই। কাইলকা আবার বহুমনি।

– না, তুই আমার দিলে ঢেউ উঠায়া দিছচ। আমার দিলের গুববার বাইর কইরা হালকা হইবার দে।

এর বাদে নিজের মনে বিড়বিড় কইরা কইলো,

– আর হালকা! সারা জিন্দেগি কাটায়া দিলাম, এই সিতিমের চাট্টান সিনায় চাইপা। এর বাদে দুনিয়ার রং বদলায়া গেল। আমার খরাপ ওক্তে আমি মানুষ চিনলাম। কত মাইনষে যে কত কথা বানাইলো। মরল না বাঁচলো, ওই খবর নাই। কয় আসামে যায়া আসাইমা তক্তায় আটকায়া গেছে, মতলব আসাইমা মাইয়া বিয়া করছে। তর নানার চাচি, আমার পিঠের পিছে মাইনষেরে কওন শুরু করলো যে, আমার আদত খরাব, আমি ভালা না। কিছু চোখে পড়ছে, দিলে চোট পাইছে, এইটার লেগা এত দিনের সংসার ফালায়া বাইরায়া গেছে। নাইলে যে ছ্যাড়া বউরে চোখে হারাইতো, ‘জরুর ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।’ এইসব কথা হুইনা আমি কান্তাছি, মুসা আর সোরাইয়া আমার সামনে শুকরায়া বয়া রইছে। আমার হড়ি আমারে সাহারা দিয়া কইছে, ‘যার দিলে যা ফাল দিয়া উঠে তা। কইবার দে। মাগো, আমরা তো তরে জানি, হারিছ না, আমি এখনবি বাইচা আছি। কেউ তর কিছু টসকাইবার পারবো না।’

– নানি আইজকা এই পর্যন্ত থাউক, আবার বাদে।

বাবুল অর নানির বিতা যাওয়া ইয়াদগার আর বাড়াইবার দিলো না। এত লোড একবারে সামলাইবার পারবো না। নানি ওইদিন রাইতভর ছটফট করলো।

ঠিকেত্থে ঘুম আহে নাই। বাবুল বুঝবার পারলো, সব দুঃখের কথা না কইবার পারলে সুকুন পাইবো না। বাদের দিন নানিরে চা নাস্তা খিলায়া, দাওয়াই পানি দিয়া বারেন্দায় বইছে। দুইটা চড়ুই অগো ঘরের আওয়াজিতে বাসা বানাইবার লেগা নাড়া আর বি কী কী জানি আইনা আওরাজির ভিতরে আহন যাওন করতাছে। মোড়ায় বয়া নানি চড়ুইগো দেখতাছে। বাবুল জিগাইলো,

– নানি কি দেখো?

– দেখি এই চড়ুই যিমুন পরের ঘরে বাসা বানতাছে, আমি বি তকদিরের ফেরে পইড়া পরের বাড়িতে পইড়া আছি।

বাবুল দিলো নানীরে একটা ঝাড়ি। তার বাদে, মাথা সায়লায়া গালে আদর কইরা কইলো,

– নানি আমরা তোমার পর? তার বাদে, নানি কি হইছে? তুমি হিম্মত হারাও নাই?

– হিম্মত না হারাইলাম, মাগার সংসার তো চলে না। মুসার বোখার, পাঁচদিন বাদে বোখার নামছে। নালায়া ধোলায়া এক লোকমা ভাত যে ওর মুখে উঠায়া দিমু, একদানা চাইল ঘরে নাই। একটা ছ্যাঁদা পয়সা হাতে নাই। ওসারায় গালে হাত দিয়া সোচ করবার লাগছি। ঘরে আম্লি আছিল, সোরাইয়া কুন একফাঁকে আম্লির ভরতা বানায়া গলিতে যায়া পোলাপান গো কাছে চাইলের বদলি আম্লি ভরতা বেইচা চাইল আইনা দিলো আধা সের। দেইখা চোখের পানি আপনেত্থে তরতরায়া পড়ন শুরু করলো। আসমানের দিকে তাকায়া কইলাম, ‘আল্লা তুমি আমারে এইটা কুন দিন দেখাইলা।’ শোচ কইরা দেখলাম, আমার আপনা-বেগানা সবতেই কোচোয়ান আছিল, সবতের একই হালত, আমারে টানবো কেঠা? বুড়া হড়ি আর কত করবো? আল্লায় পাচ জাঙ্গর দিছে কামে লাগাই।

মহল্লার এক পড়শীর চকবাজারে বিয়ার সামান বেচনের দোকান আছিল। আমার হড়ির হুকুম লিয়া, তাগো বাড়িত যায়া জরি আর বাদলা দিয়া মালা আর সেহেরা গাইথা দিতাম আর সোপ পোড্ডা বানতাম। ওইখানে এক আবাদানি শুরু হইলো। ওই পড়শি আমার রিস্তায় চাচা হউর। যেখানে বোয়া কাম করতাম ওই বুইড়া ছুতানাতা লিয়া আয়া আজিরা কথা জিগাইতো। আমার দুঃখে যিমুন অর কলিজাটা ফাইটা যায়, অর বউ চোখ গরম কইরা সামনে আয়া খাড়াইলে চোরের মথন সুটসুটায়া গেত গা। আমার হড়িরে সব জানাইলাম, আমারে কইছে, ‘কামে আর যাওনের জরুরত নাই। সোরাইয়া চকোলেটের কারখানা থেকা টিনের কাতি ভইরা চকলেট পুইরা বানতো সারাদিন। আমি মাইনষের পিঠা বানানের চাইল বাটতাম, হাতে ঠোলা পইড়া যাইতো।

একদিন আসমান গাদলা, যিমুন লাগতাছে দুপ্ফরেই সাম হয়া গেছে। দেখি লেংটা মুসা লৌড় পাইরা ঘরে ঢুইকা গামছা কম্মরে বান্তাছে আর কান্তাছে। আমি রান্তাছিলাম, ঘরে যায়া জিগাইলাম, ‘বাবা তুমি কান্দো ক্যান? তোমার হাফপ্যান্ট কই?’ মুসা কাস্তে কাস্তে যা কইলো আমি হুইনা তব্দা খায়া গেলাম। এক জুয়ান ছ্যাড়া ডিপটির সুনসান বাড়ির গাছে পাখির ছাও দেখানের লালচ দিয়া, লিয়া যায়া টান দিয়া হাফ প্যান্ট খুইলা ফালাইছে। মুসা ছ্যাড়ারে ধাক্কা দিয়া ফালায়া লৌড় পাইরা আয়া পড়ছে। আমার হড়ি আমার আববারে ডাইকা মুসারে হাতে দিয়া কইলো, ‘আমার ফালনের এই একটা চেরাগ, অরে আমি আপনের হাওয়ালা কইরা দিলাম। আপনের কাছে রাইখা অরে একটা কাম কাজে লাগায়া দ্যান।’ আমার আববা মুসারে লিয়া লাজিজ কোম্পানির গ্যারেজে, ওই যে মমিন কোম্পানিতে কামে লাগায়া দিছে। চালু পোলা, এক জায়গায় লাইগা থাইকা কাম হিকছে।

আমার বড় ননাসের জামাই এইটা ওইটা ভালা-বুরা লিয়া আমাগো দেখবার আইতো। আয়া আর যায় না, বয়া থাকে। কইবার বি পারি না মোলাজায়, ‘এ্যালা যাও। আমার বি তো সংসারের কাম আছে।’ সোরাইয়ার কাছে পানি চায়, অর ফোবায় আইলে মাইয়া আমার ঘরে যাইবার চায় না। যাইবার কইলে উসপিস করে। মাইয়ারে জিগাইলাম, ‘মা, তুমি তোমার ফোবা আইলে ইমুন করো কে লা?’ – ‘মা, ফোবা আমার গতরে হাত দেয়।’ হুইনা, আমার চাইরোদিক আন্ধার হয়া গেছে। এই দাঁড়িআলা পাঁচ ওক্ত নামাজরোজা করা পরহেজগার। আমি কই যামু, কারে কমু, হরদিশা হয়া গেলাম। এই ব্যাটা তো এই বাড়ির জামাই, চাট্টানের মথন এই ঘরের বালা থেকা কেমনে রেহাই পামু? মাইয়ারে কইলাম, এই কথা কেউরে কয়ো না। ওম্মরে তোমার এত বড় কেউ একিন করবো না। মাগার সোরাইয়া অর দাদিরে সব কয়া দিছে। অর দাদি আমারে হুকুম দিলো, ফির আইলে তোমাগো ঘরে আইবার না কইরা দিবা।

আপায় যুদি কিছু কয়?

– কইবো না। খসমের খাইছলত খরাব থাকলে অর জরু সবতের আগে মালুম পায়। আর জরু খরাব হইলে খসম মালুম পায়।

দুই দিন বাদে বাদেই বুইড়া ব্যাটা কতটি খাওনের পোটলা লিয়া খাচ্চইরা হাসি হাসতে হাসতে আয়া হাজির। আমি ঘরে ঢুইকা কইলাম, আপনে আর আমাগো ঘরে আইবেন না। বেশরম ব্যাটা সিনা টাইনা আমারে কয়, আমি এই বাড়ির জামাই, আমারে এই বাড়িত আহন ঠেকায় কেঠা?! আমি কইলাম, আপনে আমার দশ বচ্ছরের দুধের বাচ্চার বদনে হাত দিছেন, আমি সবতের কাছে ফায়েশ কইরা দিমু। ব্যাটা মইরা গেছে আমি অহন বি ব্যাটার আগুনের গোলার মথন চোখ কইরা ঘর থেকা বাইর হওন ভুলবার পারি না। এর বাদে ব্যাটা আমাগো ঘরে আর আহে নাই। ফকির চানের ঘরে আয়া বয়া থাকতো। আমাগো দেখায়া চাঙ্গাড়ি ভইরা কতকিছু আনত। এরবাদে হুনি, আমার ননাস আর ফকির চানের বউরে আমার নামে তোম্মত দিছে, ওই ব্যাটার লগে আমি বলে ফষ্টিনষ্টি বেশি করি। মান-ইজ্জতের ডরে এইটার লেগা আমাগো ঘরে আহে না। আমার ননাস আমাগো ঘরে আইতো, পোলাপানগো খোঁজখবর লিতো।

খসম না থাকনের সিতিম আমার রওয়া রওয়া জানতো। এক বড় ধাক্কা খাইলাম দেওরের বউর দিক থেকা। একদিন একটা ছিট কাপড়ের নিমা পিনছি। আমারে কইলো, ভেনাম্মা আপনের এখন এত ইস্টাইল সাজে না। ভাইসাব বাড়িত নাই। সোচ কইরা দেখলাম কথা ঠিকই কইছে। এরবাদে উঠতে বইতে টোকারা মারে। নাহায়া ধুইয়া ঠান্ডার দিনে রৈদে চুল হুকাইতাছি দুয়ারে বয়া। আমারে আয়া কয়, ভেনাম্মা, আপনের হায়া শরম নাই? আপনের দেওর ঘরে আর আপনে দুয়ারে বয়া চুল হুকাইতাছেন? জুয়ান মাইয়ালোকগো বাড়িতে মরদগণ থাকলে একজেসি সামলায়া চলন লাগে। আমার হড়ি তফাতে খাড়ায়া তব্দা হয়া সব হুনলো, কিছু কইলো না। আমার কাছে লাগলো জমিন ফাঁক হয়া যাউক, আল্লায় আমারে জমিনের ভিতর গারদ কইরা লেউক। আমার ছোট ভাইয়ের মথন দেওর।

আসিয়া একটা লাম্বা টানা শ্বাস ছাড়লো, বাবুল উইঠা নানিরে অর সিনায় সাটায়া লইলো। এতো দিন বাদে আসিয়া কানলো, যেমনেই বাবুলের চোখের দুই ফোঁটা আশু অর নানির হাতে পড়ছে অম্নেই অর নানি লগে লগে ঠিক হয়া গেল।

– কাইন্দো না ভাই, চোখের আশু ফালান ভালা না, দিল কমজোড় হয়া যায়। দুই মাইয়ারে খবর দিয়া আনায়া আমার হড়ি ফকির চানরে কইলো বাড়ি হিস্যা করবো। ফকির চান লগে লগে রাজি হয়া গেছে। দুই বইন লিলো না, কইলো, দুই ভাইরে দিয়া দিলাম। আমার হড়ির হিস্যা আমাগো দিয়া যতদিন বাইচা আছিলো আমাগো আগলায়া লিয়া রইছে। আমারে কুনুদিন বাজারে যাইবার দ্যায় নাই। কইতো, তুমি বাজারে গেলে হাটুন্নি ঘাঁটুন্নি কইবো। সোরাইয়ারে ভালা বিয়া দিবার পারম্নম না। আমার ননাসের পোলাগো ডাইকা বাজার করাইতো। আমার বড় ননাসের খসম অর বউয়ের হিস্যা আমাগো দিবার চায় নাই, কইছে, ‘মা’ তো অগো সব দিয়া দিছে। তোমারটা ফকির চানরে একলা দিয়া দ্যাও। মায় ফকির চানের লগে না ইনসাফি করতাছে। আর তোমার ভাই তো নাই। খসমের কথা টেরেও নাই আমার ননাস। অর হিস্যা আমাগো দিয়া দিছে। বাড়ি হিস্যা হওনের বাদে, আমার আববা ট্যাকা দিছে আর আমার ভাইয়ের কিছু ট্যাকা দিয়া ব্যাড়ার ঘর বানায়া ভাড়া দিছি। তর নানায় আমারে জিন্দেগিতে একটা গলদ সওয়াল রাইখা গেছে যেটার জবাব গলদই রয়া গেছে। কুনুদিন আর শুধরাইলো না।

কয়া আসিয়া ঝিম মাইরা বয়া রইলো। চোখ বন্ কইরা এই যে বয়া রইছে, বাবুল বি কিছু কইলো না। চায়া চায়া দেখতাছে অর নানি ডাইন হাত দিয়া বাও হাতের নাখুন খুটতাছে। যিমুন এই দিন-দুনিয়ায় নাই। আতখা চোখ খুইলা সিদা হয়া বয়া আসিয়া কইলো, দ্যাখত কেঠা আইছে? তর নানায় বুঝি আইছে। আমারে চান্নি ঘাটের বাড়িত না

পায়া, মুসার মুখে হুইনা তগো বাড়িত আইছে।

কইয়াই আসিয়ার মুখে একটা হাসি ফুইটা উঠলো। ওই হাসির মইদ্দে সুখ-দুখ কিছুই আছিলো না। যিমুন আসিয়া ওহপায় বুঝবার পারছে, জমানা যে বহুত বিতা গেছে। বাবুইলা বি কিমুন জানি হয়া গেল। তারপর নানি নাতি চুপ কইরা বয়া রইল বহুত ক্ষণ।

– আচ্ছা নানি, কোচোয়ানগো এই একশ বছরের উপরের পেশা; যার লগে হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজি জুইড়া আছিলো। এইটার লেগা কেউ অন্য কুনো ধান্দা ফিকির, কুনো রাহা, সরকারের কাছে কুনো আর্জি করে নাই? আঞ্জুমান তো বানাইছিল, সবতে এককাট্ঠা হইছিল, আন্দোলনের একটা মাওকা বি আছিল। মতি সরদার এইটা লিয়া কুনো দিশা বাৎলায় নাই?

– ঢাকাইয়ারা প্যাঁচ জানতো না। কুনো হুজ্জুত পসন করতো না, ডাইল ভাতেই শুকুর সবুর করতো। আর সিদা আছিল, এই সব বুঝতো না। কোচোয়ানরা তো পড়ালেখা জানতো না, নাইলে ঢাকা শহরে নয়া গাড়ি আইলো কোচোয়ানগো এই পেশা বন্ হওনের বাদে কত সিতিম হইছে, কেউ তো আর লেখে নাই। সবতে খালি রাজারাজরা নওবসাবেগো কথা লেখছে। ঢাকা শহরের গরিব মানুষবি আছিল, অগো সুখ-দুঃখ এই শহরের মাটিতে কাংকড় পাত্থরে ছাইপা রইছে। ওইসব দেখা যায় নাই। আমি তো এক আসিয়া আর ফালানের কথা কইলাম, আর কত আসিয়া আর ফালানের দুঃখের কথা কেঠা খবর রাখছে। এই শহরের মানুষের উপরে দিয়া বহুত তুফান গেছে, বহুত জুলুম সিতিম হইছে। আগে থেকাই মাথা উঁচা কইরা খাড়াইবার দেয় নাই। এখনবি ওইটাই চলতাছে। কোচোয়ানরা যে শ্যাষ হয়া গেছে কেউর কিছু টসকায় নাই। এই ঢাকা শহরের যত তরুক্কি হইছে এই ঢাকাইয়া আম মানুষের টেস-খাজনায়। খায়া না খায়া টেস-খাজনা দিয়া গেছি।

– নানি তুমি এতো কিছু জানো কেমনে?

– জিন্দেগির খাতার পাতায় পাইছি, পাতা উলটাইলে সব দেখি। দ্যাখ আমি বিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ, এই তিন সরকারের আমল দেখলাম। দিনে দিনে খরাবি দেখলাম। ভালা আর দেখলাম না । যে যায় লংকায় ওই অহে হনুমান।

– আচ্ছা নানি, মামু আর খালারে মানুষ করলা কেমনে?

– মুসা তো ওই এক জাগায় দিল লাগায়া কাম হিকছে, আর সোরাইয়ারে ছোট বিয়া দিয়া দিছি বাপের বাড়ির হক ভাতিজা গো কাছে বেইচা। আগের দিনে মনে করতো মাইয়া বিয়া দেওন মানে সব মুস্কিল আসান। আমার সোরাইয়ার বহুত বদনসিব। বাপের ঘরে বি সুকুন পায় নাই, খসমের ঘরে বি ওই এক হালত। খসম রোজগার করবার পারে না। তর মায় অর সংসারে কম খুচি ভরে। বাপের বাড়ির যতটি জাগা বেইচা অরে বিয়া দিছি ওইটা থাকলে বি তো সোরাইয়া ভাড়া দিয়া বাইচা যাইতো। ঢাকাইয়া গো রীতি-রেওয়াজ কম না। বিয়াতে বহুত খরচা হইতো। হোগা গইলা যায় কামুড় ছাড়ে না আওকাত থাকুক আর না থাকুক।

হারিকেনের সলতাটা বাড়ায়া দাওয়াই এর বাক্সোটা খুইলা বইতে বইতে আসিয়া কইতাছে, কী যে গরম বারেবারে কারেন যায় আর ভালা লাগে না। নানির প্যারপ্যারানি কানে আহনে বাবুল নানির ঘরে ফুচকি দিয়া দেখে নানি দেখে নানি তাইকার নিচে কি জানি রাখতাছে।

– নানি কী করো?

– এই যে কয়টা ব্যাল ফুল তাইকার নিচে রাখলাম। ফুলের গেরানটা ঘুমের মধ্যে নাকে আইলে আমার কাছে লাগে তর নানায় আমার লগে হুইয়া রইছে। আগে আমি ফুলের মালা জুরায় গুইঞ্জা রাখতাম। চুল খুললে দুই-তিনদিন ভক্কর ভক্কর গেরান বাইরাইতো, তর নানায় এই গেরানটা বহুত পসন করতো। চলিস্নশ বছরের জুয়ান মরদ কই যে গোম হয়া গেল আর তো ফিরা আইলো না। রিজিকের মালিক আল্লা। ওই কেলা গেলো? খায়া না খায়া এক লগে থাকতাম। অর থেকা বাইড়া আমার কুনো সুকুন আছিলো? একবার বি সোচ করলো না পোলাপানের কথা, আমার কথা। ওই না থাকলে আমাগো কি হালত হইবো। আমার জিন্দেগি সবতের মতন হইলো না কেলা? সবতের সব হইছে। মুসা কাম হিকা নিজের কারখানা দিলো। অর তরুক্কি হইলো। বাড়িঘর বানাইলো। মাগার আমার অর সংসারে ঠাঁই হইলো না। মুসার তরুক্কি হইছে, এইটাই আমার দিলে তসুলি। আমি না থাকি অর লগে। জেন্দেগানির কিস্তিতে সোয়ার হয়া ভাসতে ভাসতে এই নওবগঞ্জে আয়া আমার কিস্তি আসল ঠিকানায় যাওনের আগে ভিড়া রইছে।

– নানি, নানা কবে গোম হইছে?

– এই লাল বাহাদুর শাস্ত্রী লাহোরে যায়া মরণের এক বছর বাদে। ওইদিন সোমবার আছিলো। আমি এখন বি আশা করি তর নানা একদিন ফিরা আইবো।

কথাটা কয়া আসিয়া থম মাইরা তাকায়া রইছে দেওয়ালের দিকে। তাকায়া রইছে, মাগার দেখতাছে না কিছু। চোখের তারার কুনো নড়ন-চড়ন নাই। আবার ইমুন বি হইবার পারে, আসিয়া দেখতাছে বহুত কিছু ওই দেওয়ালের দিকে তাকায়া। অর বিতা জিন্দেগির সুখ-দুঃখের দিনগুনি, ফিলিমের ছবির মতন একটার পর একটা আইতাছে আর যাইতাছে। ওক্ত ভুইলা যায়া অর বিতা দিন আর আইজকার দিন বি এক হয়া যাইবার পারে।

– আচ্ছা বাবুল, ঢাকা শহরে যে এত বিল্ডিং হইতাছে তর নানা বাড়িঘর চিনা আইবার পারবো তো?

শেয়ার করুন

Leave a Reply