জীবজন্তুর গল্পের আশ্চর্য জগৎ ও সুকুমার রায়

লেখক:

মননকুমার মন্ডল

সুকুমার রায়ের গল্প বাংলা শিশুসাহিত্যের সম্পদ। যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পর সুকুমারের রচনা বাংলা শিশুসাহিত্যকে সাবালক করে তুলেছিল। কিন্তু সুকুমারের গল্প শুধু শিশুদের নয়, বড়দের চেতনাকেও আচ্ছন্ন করে আসছে এতকাল। কথন-বাচনে, দৈনন্দিন জীবনচর্যায় সুকুমারের বিভিন্ন বাক্যবন্ধ ও শব্দাবলি সুভাষিতে রূপান্তরিত। আবোল-তাবোলের জগৎ কিংবা খাই-খাইয়ের জগৎ যেমন বাঙালি-মননে নিখাদ ফ্যান্টাসির রূপময়তাকে তুলে ধরে, তেমনি মধ্যবিত্তীয় গ্লানিময়তার মধ্যে তৈরি করে ছদ্ম-অন্তর্ঘাতের অভীপ্সা;  যে-জীবন পাওয়া হলো না, দেখা হলো না অথবা আর ফিরে আসবে না, তার কথা। মাত্র ছত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন ছিল এই অবিস্মরণীয় প্রতিভার; তার মধ্যে অতি সংক্ষিপ্ত সাহিত্যজীবন। সাকুল্যে গোটা আষ্টেক নাটক, গোটা দুই কাব্যগ্রন্থ ও বেশকিছু কবিতা, খানবিশেক প্রবন্ধ ও বিভিন্ন শিশু-কিশোরপাঠ্য গল্প ও রচনা – এই তাঁর রচনাভান্ডার। আর এর মধ্যে তাঁর ‘জীবজন্তুর গল্প’ সংখ্যা প্রায় সাঁইত্রিশ। সত্যজিৎ রায়-সম্পাদিত সুকুমার সাহিত্য সমগ্রতে এই রচনাগুলিকে সংকলন করা হয়েছে। আসলে ‘জীবজন্তু’র নাম দিয়ে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে সন্দেশে প্রকাশিত রচনাগুলিকে একত্রে প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে। আসলে রচনাগুলি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায় ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৩০ বঙ্গাব্দের মধ্যে।  এ-ধরনের রচনা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখনীতেও পাওয়া যায়। জীবজন্তুর রচনাগুলি সম্পূর্ণ গল্পের আকার ধারণ করে না, কিন্তু কাহিনি-কথনের এক আলগা ধরনের প্যাটার্ন রচনাগুলিকে অপূর্ব স্বাদুতায় শিশু-কিশোরপাঠ্য থেকে সর্বজনপাঠ্য করে তোলে। সন্দেশের পাতায় বাংলা শিশুসাহিত্যের যে অবিস্মরণীয় জগৎ ডানা মেলেছিল, সুকুমার রায়ের সাহিত্য ও অলঙ্করণ ছিল তার অন্যতম আশ্রয়।

এক

প্রেসিডেন্সির পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন অনার্স কোর্স অধ্যয়নের পর সুকুমার রায় বিলেত গিয়েছিলেন ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণের কাজ শিখতে। এ-সময় তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুপ্রসন্ন বৃত্তি পান (১৯১১)। ঠাকুর পরিবারের পর সম্ভবত এই একটি পরিবারই সে-সময়ে এমন কাজ করতে পারত। পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা মুদ্রণ ও অলংকরণে যুগান্তর এনেছিলেন এ-কথা আমরা সকলেই জানি। তিনি যুবক সুকুমারকেও সেদিকে আকর্ষণ করেছিলেন যা পরবর্তীকালে বাংলা শিশুসাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলে সন্দেশের পাতায় চিহ্নিত হয়ে আছে। সুকুমারের সাহিত্যে বিজ্ঞানদৃষ্টির সঙ্গে মিশেছিল তাঁর শিল্পিত জীবনবোধ। হাফটোন প্রিন্টিং, আধুনিক ফটোগ্রাফি ইত্যাদি নিয়ে বিলেতে থাকাকালীন পাতার পর পাতা নেওয়া নোট প্রমাণ করে তাঁর অক্লান্ত অধ্যবসায় এবং শিল্পিত মেধার কথা। এসব শিক্ষার প্রায়োগিক দিক ছিল সন্দেশের পাতা। উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায় সচিত্র মাসিকপত্র সন্দেশ প্রকাশ পায় ১৯১৩ সালে; রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির বছরে। বিলেত থেকে শিক্ষিত ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত সুকুমার সন্দেশের পাতা ভরিয়ে তুলবেন অলংকরণে, নতুন চিত্রাঙ্কন ও আধুনিক বিন্যাসের অপরূপতায় – এমনই ভাবনা ছিল উপেন্দ্রকিশোরের। বিলেত থেকে সুকুমারের প্রত্যাবর্তনের অল্পকাল পরেই ১৯১৫ সালে পিতা উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। এ-সময় থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত আমৃত্যু সুকুমার ছিলেন সন্দেশের লেখক ও সম্পাদক। জীবনীমূলক ও জীবজন্তুবিষয়ক রচনাগুলি এই সন্দেশের পাতাতেই ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুধরনের লেখা তাঁর জীবদ্দশায় গ্রন্থভুক্ত হয়নি; এমন কোনো ইচ্ছাও সুকুমার প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায় না। সে-কারণে এই জীবজন্তুবিষয়ক রচনাগুলিকে সাহিত্যিক সুকুমারের অনুসন্ধিৎসু শিল্পীমনের এক অপূর্ব প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সময়বিশেষে যেগুলির মধ্যে সমকালীন কলোনি মন ও মানসিকতা এবং তার থেকে উৎক্রান্ত হওয়ার ম্যাজিক্যাল অভীপ্সা পরিদৃশ্যমান।

সুকুমারের বিজ্ঞানদৃষ্টি তাঁর রচনায় এনেছিল এক নির্মোহ মানববোধ এবং বিচারবোধের সূক্ষ্মতা। শিশুমনের উপযোগী বিশ্বদৃষ্টি তাঁর এ-ধরনের রচনাগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশই নয়, বিভিন্ন মহাদেশের বিচিত্র জীবজন্তুর পরিচয় তিনি তুলে ধরেন গল্পগুলির নির্মোকে। সর্বোপরি সে-গল্প মুখে বলার ঢঙে ভরিয়ে তুলত সন্দেশের পাতা। পিতা উপেন্দ্রকিশোরের রচনার মধ্যেও এই জীবজন্তুর পরিচয়ভিত্তিক গল্প ছিল। কিছু ক্ষেত্রে পিতা-পুত্র একই বিষয় নিয়ে লিখেছেন। সেগুলির তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা পরে আসব। জীবজন্তুবিষয়ক রচনাগুলি উপস্থাপিত হয়েছে কাহিনিকথনের মৌখিক প্যাটার্নের মাধ্যমে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের জীবজন্তুদের সঙ্গে পরিচিতি ঘটানোর একটা আপাত উদ্দেশ্য আছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তার সুদীর্ঘ ইতিহাসের পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের সঙ্গে অবহিত করার দায় নিয়েও যেন কথক একই রকমভাবে যত্নশীল। জীবজন্তুগুলির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত সজীব ও ঐতিহাসিক। সেই সম্পর্কসূত্রেই কখনো আমেরিকা, কখনো আফ্রিকার বিভিন্ন প্রজাতির কথা উঠে আসে। আবার হিতোপদেশের গল্পের মতো প্রায়শই কোনো নীতিকথার চারিয়ে দেওয়া উসকানি সেখানে থাকে না। কথক নিজের দায় সম্পর্কে কখনো সন্দিহান নন, বরং নৈতিকতার জায়গায় রূপকের চমক জেগে ওঠে কখনো-সখনো। এ-গল্প যেমন বৈঠকখানায় বলা গল্পের মতো এলায়িত নয়, তেমনি শিক্ষিত যুবকের নতুন আহরিত জ্ঞানসন্দর্ভের বিকিরণের অতিকথন দোষেও দুষ্ট নয়। নীতিবাগীশ সর্বজ্ঞ কথকের পরিবর্তে তীক্ষ্ণ, আধুনিক অনুসন্ধিৎসু-মন নিয়ে কথক বুনে চলেন গল্পমালা।

বুদ্ধদেব বসু সুকুমারের সাহিত্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর রচনার ‘বিশেষভাবে সাবালকপাঠ্য’ গুণটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। শুধু হাস্যরসিকতার মধ্যেই যে তাঁর রচনার আবেদন সীমাবদ্ধ নয়, সে-সম্পর্কে বুদ্ধদেব নিঃসংশয় ছিলেন। সুকুমারের রচনা আলোচনা প্রসঙ্গে লুইস ক্যারলের অনুষঙ্গ এসে পড়ে প্রায়শই। ইউরোপের যন্ত্রযুগের উত্থানপর্বে একই ছাঁচে ঢালাই করা মানুষ নির্মাণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন আগ্রাসন-অনুশাসনের ঘেরাটোপ তৈরি করছিল, তারই প্রতিক্রিয়ায় এসেছিল ‘লুইস ক্যারলের যুক্তিচালিত বিস্ময়বোধ’, অন্যদিকে এডওয়ার্ড লিয়রের লিমেরিকগুচ্ছে ‘ব্যক্তিবাদের পরাকাষ্ঠা’। সুকুমারের সন্দেশ পত্রিকায় লিখিত এই রচনাগুলি সেই যুক্তিচালিত মন এবং ব্যক্তিক পরাকাষ্ঠার নিদর্শন। শিশুসুলভ সরলতার সঙ্গে সতেজ ও স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসু মনের প্রকাশ ঘটে গল্পগুলির মধ্যে। অপার বিস্ময়বোধের অপূর্ব উৎসারণ এগুলির প্রাণ। ‘প্লাটন’, ‘পেকারি’, ‘বিদ্যুৎ মৎস্য’, ‘সমুদ্রের ঘোড়া’, ‘বীভার’, ‘হর্নবিল’, অস্ট্রেলিয়ার ‘বোয়ার বার্ড’ ইত্যাদি বিচিত্র জীবজন্তুর কথা সন্দেশের পাতায় এসে হাজির হয়েছিল সে-সময়ে। সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা ছেড়ে বিশ্বের বৈচিত্র্যময় খেচর, স্থলচর ও জলচর প্রাণীসমুদয় তাঁর নির্বাচনে উঠে আসে। শুধু তাই নয়, এসব জীবজন্তুর কাহিনি বাঙালি ও ভারতীয় জীবনচর্যার সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে পরিবেশিত হয় আর তার সঙ্গে লেগে থাকে বহুদিনের সংস্কার, রিচুয়াল অথবা ইতিহাসের ক্রনিকল। সমকালীন বাংলার অশান্তি-অস্থিরতা পাশ কাটিয়ে এই রচনাগুলির মাধ্যমে চিরন্তন সুকুমার মানববৃত্তিগুলির চর্চা সামনে আসে। ‘সেকাল’ আর ‘একালে’র একধরনের দ্বান্দ্বিক বুননও এক্ষেত্রে কার্যকর থাকে। যেমন ‘সেকালের বাঘ’, ‘সেকালের বাদুড়’, ‘সেকালের লড়াই’ ইত্যাদি। অন্যদিকে ‘আলিপুরের বাগানে’, ‘মানুষমুখো’, ‘লড়াইবাজ জানোয়ার’, ‘নিশাচর’, ‘সিংহ শিকার’ ইত্যাদি। সময়ের এই দ্বান্দ্বিক জটে পরিস্ফুট হয় ইতিহাসের সঙ্গে সমকালের পরিবর্তনশীল সম্পর্ক।

দুই

আশ্চর্য জগৎ উন্মোচনের অনলস ও অকৃত্রিম আগ্রহ জীবজন্তুর জগৎকে সুকুমারের গল্পে ব্যতিক্রমী করে তুলেছিল। উদ্ভট রসের যে-উৎসারণ তাঁর লেখায় ঘটেছিল তার একটা  বড় দিক ছিল বিচিত্র জীবজন্তুর অদ্ভুত গুণ ও চারিত্র্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংমিশ্রণ। এখানেও তিনি এমন এমন জীবজন্তুর কাহিনি চয়ন করেন যার আশ্চর্য জগৎ শিশু কেন সাধারণ পাঠকেরও কৌতূহল উদ্রেক করে। ভাবখানা থাকে এমন যে, এ-জগৎ আছে তোমার সামনেই অথবা দূর-বহুদূর কোনো পৃথিবীর কোণে; চাবি খুলে চলো তোমাকে সেথায় নিয়ে যাই। এই আশ্চর্য ফ্যান্টাসির জগৎ কখনোই অ্যালিসের ওয়ান্ডারল্যান্ড নয়, বরং বাস্তব ভূগোলের দৃশ্যমান জগৎ; বর্ণনার ত্র্যহস্পর্শে তারা ভেসে ওঠে জলছবির মতো। ধরা যাক সেই বিদ্যুৎ মৎস্যের কথা, যার ইংরেজি নাম Electric Eel বাংলায় ‘বৈদ্যুতিক ঈল’। প্রকান্ড বান মাছের মতো মাছটি প্রায় পাঁচ-ছয় হাত লম্বা এবং ধারালো দন্ত্যবিশিষ্ট। জলজ এ-প্রাণীটির প্রধান ক্ষমতা তার শরীরের মধ্যে সঞ্চিত বিদ্যুৎ। আসলে তার শিরদাঁড়ার দুপাশে পিঠ থেকে লেজ পর্যন্ত ছোট ছোট এরকম কোষ থাকে যেগুলির মধ্যে এক ধরনের আঠালো রস থাকে। এটিই তার বৈদ্যুতিক অস্ত্র। আফ্রিকায় এরকম একধরনের মাছ আছে যার সমস্ত শরীরটাই বিদ্যুতের কোষে ঢাকা – তার নাম ‘রাদ্’ বা ‘বজ্র মাছ’। সুকুমার শোনাচ্ছেন সমুদ্রের ঘোড়ার কথা যা আসলে মাছবিশেষ। নল মাছের বংশধর এই বর্মধারী মাছটি সমুদ্রের তলায় রঙিন বাগানে অপূর্ব রং-বেরঙের ঝালর দুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এদের মজার অভ্যাস হলো, নিজেদের ছানার দলকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরা – অনেকটা ক্যাঙ্গারুর মতো। মাছের মতো কুমির-বংশের প্রাণীদের না-জানা অদ্ভুত জগতের কথাও পাওয়া যায় এখানে। মাদাগাস্কারের টিকটিকি, মেক্সিকোর বিষধর গিরগিটি, মালয়দেশ ও ফিলিপাইন দ্বীপের উড়ুক্কু গিরগিটি – এরা সকলেই সরীসৃপের বিচিত্র প্রকার মাত্র। তাঁর অদ্ভুত জগতের কথায় আসে সিন্ধু ঈগল, যার বাসা – ‘সমুদ্রের ধারে যেখানে ঢেউয়ের ভিতর থেকে পাহাড়গুলো দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে বেরোয় আর সারা বছর তার সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রের জল ফেনিয়ে ওঠে, তারি উপরে অনেক উঁচুতে পাহাড়ের চূড়ায় সিন্ধু ঈগলের বাসা… তারা স্বামী-স্ত্রীতে বাসা বেঁধে থাকে।’ অন্যদিকে পাঠক চমৎকৃত হয় যখন দেখে সারাবিশ্বের নানারকমের ‘পাখির বাসা’র বৈচিত্র্যময় সম্ভার তার সামনে হাজির। ‘মানুষ যেমন নানারকম জিনিস দিয়ে নানা কায়দায় নিজেদের বাড়ি বানায় – কেউ ইট, কেউ পাথর, কেউ বাঁশ-কাদা, কেউ মাটি, কেউ-চালা, কারো দো-চালা – পাখিরাও সেরকম নানা জিনিস দিয়ে নানান কায়দায় নিজেদের বাসা বানায়। কেউ বানায় কাদা দিয়ে, কেউ বানায় ডাল-পালা দিয়ে, কেউ বানায় পালক দিয়ে, কেউ বানায় ঘাস দিয়ে; তার গড়নই বা কতরকমের… এক একটা পাখির বাসা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়, তাতে বুদ্ধিই বা কত খরচ করেছে আর মেহনতই বা করেছে কত।’ শুরুতেই এরকম কথা বলে সুকুমার রায় মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া দূর-দূরান্তরের বিচিত্র ইহলৌকিক ঘটমানতার মধ্যে ফ্যান্টাসি খোঁজেন। তাঁর বিশ্বদৃষ্টি এতে সহায়ক হয়। পরিচিত ভূগোলের অপরিচিত জীবজন্তুর বিবিধ ক্রিয়াকলাপের অনুসন্ধান একদিকে যেমন সরল পবিত্র এক সৌন্দর্যময় রূপজগৎ পাঠকের সামনে উন্মোচিত করে তেমনি এক বৈশ্বিক দৃষ্টিক্ষেত্র আনে গল্পবর্ণনার ন্যারেটিভে। বিশেষভাবে নজরে পড়ে যে-কথা তা হলো, প্রায় কোনো জায়গাতেই জীবজন্তুর বর্ণনার মধ্যে দিয়ে দেব-দেবীর বা ধর্মীয় কল্পলোক সামনে আসে না। আধুনিক অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে শিল্পিত মনের মেলবন্ধন না ঘটলে এ কীভাবে সম্ভব। ভাষার ঝরঝরে ঋজুতা এবং স্বচ্ছতোয়া ধারার সঙ্গে ঈষৎ ব্যঙ্গের পরিমিত মিশেল এই মেলবন্ধনকে স্মরণীয় করে রাখে।

আশ্চর্য জগৎ নির্মাণের ক্ষমতা সুকুমারের সহজাত। কিন্তু এই ফ্যান্টাসিময়তার সঙ্গে মিশে আছে তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টি এবং পর্যবেক্ষণশক্তি। গল্পের মতো করে তিনি বলে যান পৃথিবীর নানা প্রান্তের অথবা সুদূর ইতিহাসের জীবজন্তুর কথা। শুরুতেই ‘তোমরা জান’ অথবা ‘তোমরা নিশ্চয়ই জান’ ইত্যাদি কথা সেই গল্প বলার বৈঠকি মেজাজটিকেই ফিরিয়ে আনে। জীবজন্তুকেন্দ্রিক গল্পগুলির মধ্যেও নানারকম ব্যঙ্গের ছল থাকে, যা তাঁর গভীর সমাজদৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ফল। যেমন ধরা যাক ‘গোখরা শিকার’ রচনাটি। এখানে এক সাহেবের আস্তাবলে গোখরা সাপ ধরাকে কেন্দ্র করে সমস্যা, যার সমাধান করছে তার দেশি অশিক্ষিত চাপরাশি। আবার ‘খাঁচার বাইরে খাঁচার জন্তু’ রচনায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পোষ-মানা খাঁচার মধ্যে থাকা হরিণ, টিয়াপাখি, সিংহরা কেমন বিপন্ন বোধ করে বাইরে এসে এবং কীভাবে দ্রুত সেই খাঁচার আশ্রয়ে ফিরে গিয়ে হাঁফ ছাড়ে। বশ্যতা ও পরাধীনতা কেমনভাবে মনের গভীরে চারিয়ে যায় তারই গল্প। ‘তিমির ব্যবসা’ লেখাটির মধ্যে দেখা মেলে কীভাবে যুদ্ধের সময়ে খাদ্য সমস্যা মেটানোর জন্য আমেরিকা তিমির মাংস লাগু করে। এমনকি বক্তৃতা, লেখালেখি, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমেও প্রচার চলতে থাকে। আবার সাহেব ‘জানোয়ারওয়ালা’ বোস্টক সাহেবের গল্প – যিনি একাধারে অদম্য সাহসী অন্যদিকে জানোয়ারদের সঙ্গে হার্দিক সম্পর্কের কারণে পাঠকের মনে জায়গা করে নেন। কনসাল নামের এক শিম্পাঞ্জিকে পোষ মানিয়ে প্রায় মানুষের মতো করে তুলেছিলেন বোস্টক সাহেব। বিলেতের বড় বড় থিয়েটারে তামাশা দেখিয়ে লোককে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কনসালকে বোস্টকের লোকেরা ঠিক মানুষের মতো খাতির করত। এইরকমভাবে কনসাল কি পাঠকের মনে পোষ মানানো কোনো ঔপনিবেশিক মানুষের প্রতীকী ব্যঞ্জনা তুলে ধরে? সুকুমার এই রচনাগুলি লিখেছিলেন মাসিক সন্দেশের পাতায় শিশু-কিশোর পাঠকের জন্য। সেখানে জীবজন্তুর পরিচয় করানোর সঙ্গে ইতিহাস, ভূগোল ও সমাজতত্ত্বের প্রাথমিক পাঠও কি অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে? সেটাই দেখার।

তিন

আশ্চর্য জগৎ নির্মাণের পাশাপাশি লেখাগুলির আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল শিশু-কিশোর পাঠকমনে  নৈতিকতা ও সামাজিক শিক্ষার ইশারা দেওয়ায়। সাধারণভাবে যে-উদ্ভটত্বের কথা সুকুমারের  কাব্যরচনার (আবোল-তাবোল, খাই-খাই ইত্যাদি) অন্যতম গুণ তা এসব রচনায় আশ্চর্যময়তার রূপক হিসেবে এসে পড়ে। নির্ভার গদ্যের প্রখর চলিষ্ণুতা জীবজন্তুবিষয়ক রচনা ও গল্পগুলির এই জগৎকে চিত্রময় ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ‘তিমির খেয়াল’, ‘সমুদ্রের ঘোড়া’, ‘অদ্ভুত কাঁকড়া’, ‘শামুক ঝিনুক’, ‘ধনঞ্জয়’, ‘ফড়িং’, ‘বর্মধারী জীব’, ‘নিশাচর’, ‘নাকের বাহার’, ‘জানোয়ারের ঘুম’ ইত্যাদি রচনায় এই আশ্চর্য জগতের বৈচিত্র্যময় সম্ভার ছড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে উল্লেখনীয়, সুকুমারের রচিত নানাবিধ মহাপুরুষের জীবনীর মধ্যে যে প্রখর ইতিহাসবোধ ও মূল্যবোধের পরিচয় পাই এগুলির মধ্যেও তার দেখা মেলে। সন্দেশের পাতায় ডেভিড লিভিংস্টোন, গ্যালিলিও, ডারউইন, আর্কিমিডিস প্রমুখ মনীষীর জীবনী যেভাবে শিশু-কিশোরদের সামনে উপস্থাপিত করেন তা বাংলা শিশুসাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ হয়ে থাকবে। দুক্ষেত্রেই বলা যেতে পারে, পাশ্চাত্য জগৎ বিশেষত আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকার না-জানা মানুষ ও জীবজন্তুকে নিয়ে সুকুমার উদ্দীপ্ত হয়েছেন ও গল্প লিখেছেন। তাঁর নাটক ও কবিতার পরিচিত চরিত্র ও চিত্রকল্পগুলিতে দেশজ ও লোকায়ত মানুষজন প্রশস্ত পরিসর পেয়েছে; কিন্তু এই সমস্ত রচনার মধ্যে তিনি যেন বহির্মুখী এবং আন্তর্জাতিক। বিপুল বিশ্বের ভৌগোলিকতা এবং তার বৈচিত্র্যময়তা সুকুমারের লেখনীতে এক অন্য পৃথিবীর স্বাদ এনে দিয়েছে পাঠককে। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির সতেজ সাবলীল প্রকাশ ব্যতিরেকে এমনটা সম্ভব নয়।

‘সেকালের বাদুড়’, ‘ঘোড়ার জন্ম’, ‘সেকালের বাঘ’, ‘সেকালের লড়াই’, ‘প্রাচীনকালের শিকার’ এই প্রতিটি রচনাতেই সুদূর অতীতের জীবজন্তু সম্পর্কে মানুষের গবেষণালব্ধ ধারণাকে তুলে ধরা হয়েছে। কাহিনিগুলি শুরু হয় এরকমভাবে :

তোমরা সকলেই জান যে এমন সময় ছিল যখন এই পৃথিবীতে মানুষ ছিল না। শুধু মানুষ কেন, জীবজন্তু গাছপালা কোথাও কিছু ছিল না। তখন এই পৃথিবী তপ্ত কড়ার মতো গরম ছিল – বৃষ্ট জল তাহার উপর পড়িবামাত্র টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিত। তারপর যখন পৃথিবী ক্রমে ঠান্ডা হইয়া আসিল, তখন তাহাতে অল্প অল্প গাছপালা জীবজন্তু দেখা দিতে লাগিল। (‘ঘোড়ার জন্ম’)

সেকালে এমন সব জন্তু ছিল যা আজকাল আর দেখা যায় না – এ কথা তোমরা নিশ্চয়ই জান। সেকালের চার দাঁতওয়ালা হাতি, ত্রিশ হাত লম্বা কুমির বা হাঁসুলি পরা তিন শিঙা গন্ডার, এর কোনটাই আজকাল পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে গুহা গহবরে পাহাড়ের গায়ে বা বরফের নিচে, তাদের কঙ্কালের কিছু কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় – তা থেকেই পন্ডিত লোকে বুঝতে পারেন যে, একসময় এই রকম জানোয়ার পৃথিবীতে ছিল। যাঁরা এই সকল জিনিসের চর্চা করেন, তাঁরা সামান্য এক টুকরা দাঁত দেখে বলতে পারেন – এটা কি রকম জন্তুর দাঁত, সে আমিষ খায় কি নিরামিষ খায়, ইত্যাদি। (‘সেকালের বাঘ’)

পাহাড়ের গায়ে যেসব পাথরের স্তর থাকে তাহারা চিরকালই পাথর ছিল না। অনেক পাথর একসময় মাটির মতন নরম ছিল। সেই নরম মাটিতে জানোয়ারের কঙ্কাল জমিয়া অনেক সময়ে একেবারে পাথর হইয়া থাকে – এইরকম পাথরকে এক কথায় জীবশিলা বলা যাইতে পারে। (‘সেকালের বাদুড়’)

উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলিতে স্পষ্ট শোনা যায় এক স্বচ্ছ বিজ্ঞান-দৃষ্টিসম্পন্ন কথকের কণ্ঠ, যিনি গল্পের ছলে আধুনিক পৃথিবীর বিজ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত করান কচি-কাঁচা পাঠকদের; তাদের মধ্যে উসকে দেন আরো জানার ইচ্ছে। ‘সেকাল’ মানেই সুদূর অতীত; আর সেই বহু পুরাতন যুগের গল্পে যে আদর্শ রোমান্সের উপাদান বিদ্যমান তাকে স্ব-কপোলকল্পিত কাহিনির পরিবর্তে বাস্তব বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার মাঝে দাঁড় করান তিনি। ফলে শিশু-পাঠকের মনে ক্রমশই খুলে যেতে থাকে ঐতিহাসিক যুগের অপূর্ব চিত্রময়-রূপময় জীবজন্তুর জগৎ। সুকুমার সাহিত্য সমগ্রের দ্বিতীয় খন্ডের ভূমিকায় সত্যজিৎ রায় বিষয়টি ধরে দিয়েছেন অন্যভাবে :

…তৎকালে এবং তার আগে যে-সমস্ত বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক আবিষ্কার হয়েছে, আধুনিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, মানুষের সভ্যতার উপকরণে যেসব প্রয়োজনীয় উপাদান সংগৃহীত হয়েছে – সেসব তথ্যবহুল সংবাদ সন্দেশ পত্রিকায় সুকুমার নিয়মিরূপে, অত্যন্ত সরসভাবে পরিবেশন করতেন।… বিভিন্ন ইউরোপীয় গ্রন্থ বা পত্র-পত্রিকা থেকে এসব তথ্য আহৃত হয়েছে।… তাছাড়া, উনিশ শতাব্দের মধ্যভাগে আর বিশ শতাব্দের প্রথমাংশে পাশ্চাত্য জগতে বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে যে বিস্ময় ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল – এ দেশে শিক্ষিতজনের মধ্যেও তার আলোড়ন লেগেছিল। এই লেখাগুলিতে অন্তর্নিহিত রয়েছে সেই একই আগ্রহ ও উদ্দীপনা; সুকুমার কিশোর মনে তাকে সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন।

সুকুমারের চিত্রাঙ্কনী-প্রতিভাও এই রূপময়তার উদ্ভাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল সে-কথা বলাই বাহুল্য। রূপকথার জগৎ আর এই প্রাগৈতিহাসিক যুগের অত্যাশ্চর্য কাহিনির তফাৎ এটুকুই যে, সেখানে কল্পনাশক্তির নিয়ন্ত্রণহীন পক্ষবিধূননে তৈরি হয় মনোলোভা কাহিনিকায়া আর এইসব ক্ষেত্রে সুকুমার সাধারণত জ্ঞানের আধুনিক বোঝাপড়ার ওপর নির্মাণ করেন কল্পনাবিলাসের অপূর্ব কাহিনিলেখ, যা আসলে বাস্তব ঘটনার আশ্চর্য বর্ণনামাত্র। উপস্থাপনের ও বিষয় চয়নের বিশিষ্টতাই এগুলির সম্পদ।

চার

জীবজন্তুবিষয়ক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কিছু রচনার সঙ্গে সুকুমারের রচনা পাশাপাশি রেখে পড়া যেতে পারে। ধরা যাক ‘গরিলা’ নামের রচনাটি। উপেন্দ্রকিশোর গরিলার গল্প বলেন দুশেলু সাহেব এবং তার ভৃত্য গ্যাম্বোর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যা তিনি পড়েছেন। আফ্রিকার অন্ধকার উপত্যকায় ভয়ংকর গরিলা মোকাবিলার গল্প। কীভাবে অন্যায় আক্রমণের সামনে পড়ে যায় জঙ্গলে স্বাধীনভাবে পরিভ্রমণরত গরিলা এবং প্রচন্ড আক্রোশে আক্রমণকারীর বন্দুকের নল দাঁতে চিবিয়ে চ্যাপ্টা করে দেয় সে। আবার স্ত্রী গরিলার অপত্যস্নেহের গল্প; যেখানে নিজের বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো অবস্থায় শিকারির গুলিতে প্রাণ দিতে হয় গরিলাটিকে। আর মৃত মায়ের কাছ থেকে দুধ না পেয়ে মারা যায় শিশু গরিলার অসহায় বাচ্চাটি। উপেন্দ্রকিশোর এই শিকার কাহিনিকে উপস্থাপিত করেন পশুদের প্রতি নির্মম নির্দয় ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে : ‘পাঠক-পাঠিকা শুনিয়া হয়তো তোমাদের মনে ঘৃণা জন্মিবারই কথা।’ অন্যদিকে সুকুমারের ‘গরিলা’ও থাকে আফ্রিকার জঙ্গলে ডালপালার ছায়ায়, দিনেদুপুরেও যেখানে অন্ধকার, যেখানে ভালো করে বাতাস চলে না, জীবজন্তুর সাড়া নেই। কিন্তু সেখানে সুকুমারের বর্ণনা অনেক বস্ত্তনিষ্ঠ। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার স্বাধীনতাবোধ ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্নটি। ‘পৃথিবীর প্রায় সবরকম জানোয়ারকেই মানুষে ধরে খাঁচায় পুরে চিড়িয়াখানায় আটকাতে পেরেছে – কিন্তু এ-পর্যন্ত কোনো বড় গরিলাকে মানুষে ধরতে পারেনি। মাঝেমধ্যে দুটো একটা গরিলার ছানা ধরা পড়েছে কিন্তু তার কোনোটাই বেশিদিন বাঁচেনি।’ জঙ্গলের গরিলা ‘কিন্তু মানুষ দেখলেই তেড়ে মারতে আসে না – বরং অনেক সময়ে মানুষকে এড়িয়েই চলতে চায়।’ মানুষ জঙ্গলে গিয়ে গায়ে পড়ে তার জীবনচর্যায় ব্যাঘাত ঘটালে কিংবা মারতে গেলে সে যদি ‘খুশি না হয়, তবেই কি তাকে হিংস্র বলতে হবে?’। সুকুমারের কাছে যা কাহিনিচূর্ণক উপেন্দ্রকিশোর তা দিয়েই গড়ে তুলেছিলেন প্রায় পূর্ণাঙ্গ গল্প। উভয়েই সাহেবের শিকার কাহিনি, সাহসিকতায় মুগ্ধ; কিন্তু উপেন্দ্রকিশোরের কাছে সাহেবের অভিজ্ঞতা আসে গ্রহীতার জ্ঞানসন্দর্ভ হিসেবে আর সুকুমার সেই সাহেবকেও একটা চরিত্র বানিয়ে ফেলেন। ‘গ্লাটন’ রচনাটির মধ্যেও এক শিকারির কাহিনি অনুবাদ করে দিয়েছেন উপেন্দ্রকিশোর; সেখানেও অত্যন্ত চতুর গ্লাটন নামক জন্তুটির বুদ্ধিমত্তার সপ্রশংস অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে এবং সাহেবের কথা উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ‘এই-সকল দেখিয়া আমি সিদ্ধান্ত করিলাম যে, এইরূপ জন্তুর বাঁচিয়া থাকাই উচিত।’ কিন্তু সুকুমারের ‘গ্লাটন’ অভিনব তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলির জন্য। বর্ণনায় সে অনেক বস্ত্তনিষ্ঠ; শিকারির বুদ্ধিকে ঠকিয়ে চালাক গ্লাটন কীভাবে তাকে চূড়ান্ত হেনস্থা করেছে তা সুকুমারও বলেছেন কিন্তু সেখানে সাহেবের অভিজ্ঞতার মধ্যস্থতা নেই। সুকুমারের বোস্টক সাহেব তো সাধারণ চরিত্রের মতোই হয়ে ওঠেন। আবার ‘লড়াইবাজ জানোয়ার’ রচনাটিতে এক সাহেব তো বেজির আক্রমণে যৎপরোনাস্তি নাকালও হয়েছিলেন। বিলেত-ফেরত শিক্ষিত যুবক সুকুমারের মনের ঔপনিবেশিকতা বোধ আর উপেন্দ্রকিশোরের উনিশ শতকীয় উপচিকীর্ষু বাঙালি মননের ওপর ঔপনিবেশিকতার অভিঘাত একরকম নয়। উপেন্দ্রকিশোরের আশ্রয় নীতিবোধের জায়মান সামাজিকতা যা বাঙালির নিজস্ব; অন্যদিকে সুকুমার কখনো টপকে যান বাস্তবের বেড়া, কখনো স্বাভাবিকতার মধ্যে সন্ধান করেন মনুষ্যেতর প্রাণীর জীবনবোধ – যা উন্নত মানবজাতির প্রকৃতি জগতের সঙ্গে সংঘাতের বিপর্যাস মাত্র। কত সুন্দর, কত অদ্ভুত, কত অপূর্ব জীবনবোধ লুকিয়ে আছে আমাদেরই চেনা-অচেনা পারিপার্শ্বিকতায়! আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় সেসব দেখে।

পাঁচ

সুকুমার রায় এই লেখাগুলিতে বারবার বেছে নেন বাংলার বাইরের বিচিত্র ভূগোলের আশ্চর্য সব জীবজন্তুর কথা। কখনো আমেরিকার বড় বড় নদীর ধারেকাছে থাকা বিদ্যুৎমৎস্য, কখনো নরওয়ে দেশের গ্লাটন কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলের পেকারি, অথবা আফ্রিকার জঙ্গলের গরিলা ও বেবুন – সবই আসে তাঁর লেখায়। এমনকি কাঁকড়া, বাদুড়, ধনঞ্জয়, কচ্ছপ, ফড়িংয়ের মতো পরিচিত প্রাণীদের কথা বলতে গিয়েও সুকুমার তাদের বহুদেশীয় প্রজাতির কথা প্রতিতুলনায় আমাদের জানিয়ে দেন। কোনো কোনো জায়গায় প্রাণীগুলি আসে তাদের সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি সামনে নিয়ে। যেমন : ‘বর্মধারী জীব’ (যেখানে বর্ম বা খোলওয়ালা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের নিয়ে লেখেন তিনি), ‘নিশাচর’ (যেখানে রাত জেগে চলাফেরা করা প্রাণীরা যেমন প্যাঁচা, লেমার, টার্সিয়ের ইত্যাদি তাঁর আগ্রহের বিষয়), ‘পাখির বাসা’ (যেখানে বিচিত্র ধরনের পাখিদের বাসার খবর দেন তিনি), ‘অদ্ভুত মৎস্য’-‘রাক্ষুসে মৎস্য’-‘বিদ্যুৎমৎস্য’ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও আমাদের পরিচিত প্রাণীদের আদলগুলির মধ্যে থেকেই বৈচিত্র্যময় জীবজগতের সন্ধান দেন তিনি। আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বিচিত্র জীবকুল থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর আটলান্টিকের গভীর তলদেশ, সর্বোপরি শীতপ্রধান দেশ ও জঙ্গলময় দুর্গম অঞ্চলের এক বিপুল বিশ্ব তাঁর এই রচনাগুলির বিষয়। সংকীর্ণমনা পাঠকের মনের জানালা খুলে দেওয়ার পক্ষে যা যথেষ্ট। লোকায়ত প্রাণিসম্পদের সঙ্গে বৈশ্বিক নির্বাচনের এক অসাধারণ মিশেলকে তিনি ব্যবহার করেন। এই আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিতেই তাঁর অনন্যতা।

সুকুমার জীবজন্তু নিয়ে এতগুলি কাহিনি শোনালেও সে-অর্থে রূপকথার জগৎ থেকে উপাদান সংগ্রহ করেননি। এমনকি প্রচলিত লোককথাও তাঁর এই জীবজন্তু বিষয়ক লেখাগুলির ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। হ্যান্স অ্যান্ডারসনের সুবিখ্যাত রূপকথাগুলির মধ্যে যেমন লোককথার মোটিফ সুপ্রচুর, যেমনটা উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যেও পাওয়া যায়, সুকুমার সেপথ ধরেননি। সুতরাং লোককাহিনির তাত্ত্বিক আলোচনা প্রসঙ্গে যে মোটিফ-ইনডেক্সের কথা আমরা জানি তা এক্ষেত্রে খুব সাহায্য করে না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সুকুমারের বাস্তব ভৌগোলিকতায় দেশ-দেশান্তরের কাহিনি মাঝেমধ্যেই সেই স্টিথ টমসন-কথিত (‘মোটিফ ইনডেক্স অব ফোক লিটারেচার’) মোটিফ-ইনডেক্সের ইঙ্গিত দেয়। যেমন ধরা যাক, ক) প্রাণীরা মানুষের মতো আচরণ করছে (বি ২০০)। সুকুমারের কাহিনি/ গল্পে পাই – ‘পাখির বাসা’, যেখানে মানুষের মতোই বিচিত্র বাহারের বাসা বানায় মনুষ্যেতর প্রাণী; ‘নাকের বাহার’ – যেখানে মানুষের নাকের বিশিষ্টতার ভাবনা নিয়েই বিচিত্র জন্তুর নাসিকার বর্ণনা দেওয়া হয়, ‘মানুষমুখো’ – যেখানে ওরাং-ওটাং কিংবা শিম্পাঞ্জির মুখের সঙ্গে মানুষের মুখের মিল খুঁজে পেয়ে আমেরিকার এক বিশেষ শ্রেণির বাঁদরকে মানুষের আচরণের সঙ্গে প্রতিতুলনায় দেখানো হয়। খ) অসাধারণ প্রাকৃতিক সংঘটন (এফ ৯৬৯। ১)। সুকুমারের লেখায় পাই : ‘সিন্ধু ঈগল’ – যেখানে পাহাড়-সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের অসাধারণ প্রাকৃতিক নির্জনতায় সিন্ধু ঈগল বাসা বাঁধে; ইত্যাদি। আরো দৃষ্টান্ত সন্ধান করা যেতে পারে। আসলে বাস্তবের জীবজন্তুর বিচিত্র বহুমাত্রিক আচরণ-চরিত্র-অদ্ভুতত্ব এসবই সুকুমার ব্যবহার করেন শিশু/ কিশোর মনের সামনে এক ম্যাজিক্যাল জগৎ নির্মাণের উপাদান হিসেবে। কল্পলোকের গল্পের চেয়ে বাস্তব ভৌগোলিকতার বস্ত্তনিষ্ঠ, ঋজু বর্ণনায় যে-উপাদানের প্রকাশ।

সুকুমারের রচনাগুলির মধ্যে কোথাও তেমনভাবে কল্পলোক তৈরির প্রচেষ্টা নেই, যা এই বস্ত্তনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষতা থেকে উঠে আসা ন্যারেটিভগুলিকে পূর্ণাঙ্গ গল্পের অবয়ব দিতে পারে। অনেকসময় জীবজন্তু বিষয়ক রচনায়, যা উপেন্দ্রকিশোরের কাছ থেকে আমরা পেয়েছিলাম। সুকুমারের অসাধারণ বিজ্ঞানদৃষ্টি তাঁর এই ধরনের রচনাগুলিকে উদ্ভট রসাশ্রিত রচনাগুলির সঙ্গে একটা আপাতবিপ্রতীপতা তৈরি করে। পাঠকের মনে হয়, কীভাবে ইনি আবোল-তাবোলের মতো আপাত অর্থহীনতার শিল্প আঁকেন? হ্যান্স অ্যান্ডারসনের যে আশ্চর্য রূপকথার জগৎ আমরা জানি, সেখানে ছিল করুণরসের মোহময়তা, নীতিবোধের প্রচ্ছায়া প্রগাঢ় ছাপ ফেলে যেত পাঠকের মনে। উপেন্দ্রকিশোরের জীবজন্তু বিষয়ক গল্পেও আমরা দেখেছি দেশজ গল্পবয়নের স্বকৃত রীতি যা চেনা যায় বাঙালির নিজস্ব বলে। আবোল-তাবোল, খাই-খাই যেমন বিষয় ও রীতিগতভাবেই অনন্য, তেমনই তাঁর অন্যান্য রচনার আবেগহীন অথচ কমনীয়, যত্নশীল এবং বস্ত্তনিষ্ঠ উচ্চারণ শিশুমনের জানালায় টোকা দেওয়া যথার্থ আধুনিক লেখকের অভিজ্ঞান। দেখার জন্য যে সারা পৃথিবী রয়েছে এ-কথা খোলামেলা ভঙ্গিতেই জানিয়ে দেন তিনি; সংগ্রহ করে দেন গল্পের চূর্ণক। এসব থেকেই ছোট্ট শিশু-কিশোরের বড় হওয়ার শুরু।

জীবজন্তু বিষয়ক সুকুমার রায়ের লেখাগুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলির বিভিন্নতা ও ক্ষণিকতা। এগুলি সন্দেহের পাতায় প্রকাশের সময় গ্রন্থভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রচিত হয়নি। সংখ্যাপ্রতি শিশু-কিশোর মনের স্বাস্থ্যকর রসদ জোগানোর মৌল তাড়নাই লেখাগুলি হয়ে ওঠার কারণ। সুকুমারের জীবজন্তুবিষয়ক রচনা তাই উপেন্দ্রকিশোরের থেকে অনেকটাই অগোছালো। বস্ত্তনিষ্ঠতার ছাপ যেমন এগুলির অনন্যতা, তেমনি গল্পের কাল্পনিকতা ও টেনশন এগুলিকে তেমন স্পর্শ করে না। সন্দেশের একটা লক্ষ্য ছিল শিশুমনের সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর বিকাশ; সে-লক্ষ্য নিয়ে বিদেশি সাহিত্যের গল্পও সেখানে অনূদিত হতো। কুলদারঞ্জনের রবিনহুড যেমন প্রবল আকর্ষণের বিষয় ছিল, তেমনি ছিল প্রমদারঞ্জনের বনের খবর। অসাধারণ অলংকরণের সঙ্গে সুন্দর ‘পাইকা’ টাইপে ছাপা সন্দেশের পাতায় জীবজন্তুর গল্পগুলি ছিল যেন সোনার খনি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করেছিলেন ৩২টি সংখ্যা; এরপর সুকুমার ও সুবিনয় রায়, পরে সত্যজিৎ রায়। রায় বাড়ির লেখালেখির সঙ্গে এই পত্রিকার সংযোগ গভীর। শিশুমনের মনস্তাত্ত্বিক অভিপ্রায়কে লক্ষ্য করে ক্রমাগত সুখপাঠ্য রসদ সৃষ্টি করা এবং তা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া বাংলা  শিশু-সাহিত্যের ইতিহাসের স্বর্ণালি ও উজ্জ্বল এক অধ্যায়। জীবজন্তুবিষয়ক রচনাগুলি সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের আখর।

সুকুমার রায়ের রচনার সমস্ত উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে সুকুমার সাহিত্য সমগ্র (তৃতীয় খন্ড, ষষ্ঠ মুদ্রণ ২০১২) থেকে। বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যের জন্য দেখা যেতে পারে সাহিত্যচর্চা গ্রন্থের ‘বাংলা শিশুসাহিত্য’ প্রবন্ধটি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার