জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ

লেখক:

ভূমেন্দ্র গুহ

 

জীবনানন্দ দাশ তাঁর সারাটা সাহিত্য-জীবনে গোটা আশি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর সমগ্র প্রবন্ধ (প্রকাশিত ২০০৯ সালে,
প্রতিক্ষণ, কলকাতা) বইটা সে-রকম সাক্ষ্য দিচ্ছে। বইটার পাতাগুলো উলটে গেলেই মালুম
হয় যে, তারা কখনো কোনো একটা ‘থিমেটিক প্রজেক্ট’ সাপেক্ষে লেখা হয়নি; এই যেমন কোনো
বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তৃতামালা হিসেবে, অথবা স্বনির্বাচিত কোনো একটা বিষয়কে
নানাভাবে নানা দিক থেকে দেখতে চেয়ে। বইটিতে প্রবন্ধগুলো আলগাভাবে নানা রকম
প্রাসঙ্গিকতায় সাজানো হয়েছে বটে, কিন্তু সে-প্রক্রিয়াটা সম্পাদকের সগুণ অথবা অগুণ
হাতের কাজ, পাত্তা না দিলেও চলে।

স্বপ্রণোদনায় জীবনানন্দ প্রায় কখনই প্রবন্ধ
লেখেননি; লিখেছেন দায়ে ঠেকে। কখনো সতীর্থ কোনো কবি-বন্ধুর কোনো কাব্যগ্রন্থের
সমালোচনা লিখতে অনুরুদ্ধ হয়ে; কখনো যে-কলেজে চাকরি করতেন, সে-কলেজের পত্রিকায়
বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের বিশেষ কোনো ঘটনায় অথবা দুর্ঘটনায় তাঁর নিজের প্রতিক্রিয়া
জানাবার দাবিতে বাধ্যত সাড়া দিয়ে; কখনো ব্রাহ্ম-সামাজিক শ্রদ্ধেয় এবং/ অথবা আপন
ব্যক্তিদের, এমনকি নিজের পিতা-মাতার, মৃত্যু-উত্তর স্মরণসভায় প্রথাসম্মত
শ্রদ্ধা-নিবেদনের সৌজন্য পালন করবার জন্য লিখিত ভাষণ পাঠ করতে; কখনো পূর্বসূরি
প্রখ্যাত কোনো-না-কোনো কবির স্মরণে কোনো-কোনো সাহিত্য-পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার জন্য
লিখতে অনুরুদ্ধ হয়ে; প্রধান কবি-লেখকদের সমাজে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করে ফেলে,
বলতে গেলে কিঞ্চিৎ পুলকিত চিত্তেই, কেন লেখেন, সেই জবানবন্দিটা খেটেখুটে হাজির
করতে; শেষ-বয়সে নিজের একটা বড়ো-সড়ো কবিতার-বই যখন রোল-কলে তিন নম্বরে বেরোচ্ছেই,
তার জন্য একটা নিজ-বিবেচনা অনুসারে মোটামুটি বড়ো ভূমিকা লিখবার তাগিদে, বার-তিনেক
ঘষামাজা করার পরিশ্রম ব্যয় করে; সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কনটেম্পোরারি কাগজটায় অবশ্য লিখেছেন পারস্পরিক সখ্যের কারণে।
যে-কোনো প্রবন্ধ লিখতে জীবনানন্দকে ঢের সময় খরচ করতে হতো, এতো বেশি কাটাকুটি করতে
হতো যে, তাঁর প্রায় সব প্রবন্ধের অন্তিম খসড়াটা আর দ্বিতীয় কোনো মানুষের পক্ষে
উদ্ধারযোগ্য থাকত না; তাঁর জীবৎকালের শেষ ছবছরের দিনলিপির যে-পান্ডুলিপি-সংস্করণটা
বেরিয়েছে, তা উলটে-পালটে দেখলে পাঠকের তা মালুম হবে।

বস্ত্ততপক্ষে, জীবনানন্দ প্রবন্ধ লিখতেন প্রায়
দায় ঠেকে, কবিতা লিখে পয়সা জোটে না, প্রবন্ধ লিখে তবু যা হোক দুটো পয়সা হাতে ঠেকে।
পূর্বাশা পত্রিকার সম্পাদক সঞ্জয়
ভট্টাচার্যের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, ঋণ শোধ করেছেন প্রবন্ধ লিখে; তাঁর
অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ এইভাবে লেখা হয়েছে। স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড
ইত্যাদি দৈনিক পত্রিকায় প্রায় যেচে ইংরেজি প্রবন্ধ লিখেছেন, সেই দুটো বাড়তি পয়সার
লোভে। অনেক সময় এমন হয়েছে যে, আগে থেকে ইংরেজি প্রবন্ধ লিখে রেখেছেন তাঁর ডায়েরির
খাতায়, যদি তাক বুঝে কোথাও লাগিয়ে দেওয়া যায়।

কিন্তু, ফুলস্কেপ কাগজে প্রেস-কপির মতো করে লেখা
তাঁর যে-ইংরেজি প্রবন্ধটার নাম, ‘The
Novel and its Progress in Bengal’, বাংলা অনুবাদে ‘বাংলা উপন্যাস ও তার অগ্রগতি’,
তা লেখা হয়েছিল, মনে হয়, টাকার কথা ভেবে ততটা নয়, যতটা বিগত শতকের
চল্লিশের-পঞ্চাশের দশকের বাংলা সাহিত্যে              আন্তর্জাতিক স্তরের কোনো একটা
বাম-মার্গী রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র-নির্দেশিত সাহিত্যিক হুকুমনামার প্রতি অন্ধ
আনুগত্যবশত অতিমাত্রিক দাপাদাপির জন্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কারণে। কিন্তু রাগের
বশে লেখাটা তো লিখে ফেলেছেন, তারপরে হয়তো খেয়াল হয়েছে তাঁর যে, কোনো রকম সাহিত্যিক
বিতর্কে তিনি তো নিজেকে সাধারণত জড়িয়ে পড়তে দেননি কখনো, বরং তা করে নিজের মনের
সুস্থিতিটাকে ব্যাহত হওয়ার হাত থেকে কোনো রকমে রক্ষা করেছেন, বস্ত্তত সেই কারণেই
প্রবন্ধ লেখা জিনিসটাকেই প্রায় অসচরাচর করে তুলেছেন; এই লেখাটা প্রকাশিত হলে
কিন্তু বিতর্কের মধ্যিখানে তিনি গিয়ে পড়বেনই। সুতরাং প্রেস-কপি তৈরি করেও লেখাটা
আর তিনি ছাপাতে  দেননি, যদিও ছাপালে হয়তো
কিছু টাকা আসত, বিশেষত প্রবন্ধটার ভাষা যখন ইংরেজি।

আমরা যখন তাঁর প্রবন্ধ সমগ্র বইটি তৈরি করছিলুম, তখন প্রবন্ধটা আমাদের চোখ এড়িয়ে
গিয়েছে, বাতিলের-চেয়ে-বাতিল কাগজপত্রের ডাঁইয়ে কাগজ ক-খানা এতোটাই ভিতরে সেঁধিয়ে
ছিল। এখন যখন লেখাটির অবিলম্ব গ্রন্থভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেল, লেখাটা কালি ও কলমে প্রকাশিত হতে দেওয়া গেল,
অনুবাদে, কারণ কালি ও কলম ইংরেজি
হরফে কোনো লেখা ছাপে না, পাশাপাশিও নয়। (সৌজন্য : অমিতানন্দ দাশ এবং প্রিয়ব্রত
দেব)।

কিন্তু বিগত শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে ঘটনাটি
কি ঘটেছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে যে-ঠান্ডা যুদ্ধের পরিবেশটা এসে
পড়েছিল দুই বিশ্ব-মহাশক্তির ভেতরে, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক পলিসিটা হলো
গিয়ে শিল্পের ওপর অাঁটো সরকারি অনুশাসন জারি করে দেওয়া, যাতে চূড়ান্ত প্রতিপশ্চিমি
এবং দেশীয় সংস্কারে শিল্প-সাহিত্য উৎসাহিত এবং উৎপাদিত হতে পারে। হুকুমনামাটা
প্রথমত জারি হয়েছিল সাহিত্যের ক্ষেত্রে, পরে দৃশ্যশিল্পে এবং বিজ্ঞানেও জিনিসটা
চারিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে, সোভিয়েত ইউনিয়নের যে-কোনো মননচর্চার ক্ষেত্রে,
দর্শনে, মনস্তত্ত্বে, ভাষাতত্ত্বে, শারীরবিদ্যায়, উদ্ভিদবিদ্যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানে
– যে-কোনো বিদ্যায় ফতোয়াগুলো ব্যাপৃত হয়েছিল।

রাজনৈতিক-রাষ্ট্রিক ওইসব সাংস্কৃতিক তত্ত্ব
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একটা প্রস্তাব অনুসারে
(খ্রিষ্টাব্দ ১৯৪৬) সূচিত হয়েছিল, তৈরি করেছিলেন পার্টির সেক্রেটারি ও সাংস্কৃতিক
উপদেষ্টা আন্দ্রেই আলেক্সান্দ্রোভিচ ঝানভ। তিনি পৃথিবীটাকে দুটো শিবিরে ভাগ করে
দিয়েছিলেন : সাম্রাজ্যবাদী, নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গণতান্ত্রিক, নেতা
সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঝানভ-তত্ত্বের মোদ্দা কথাটা সারমর্মে এরকম ছিল : ‘সোভিয়েত সংস্কৃতিতে যে-একটাই-মাত্র
সংঘর্ষ ঘটতে পারে, তা হলো ভালো এবং উৎকৃষ্ট – এ-দুয়ের ভেতর সংঘর্ষ।’ মানেটা
দাঁড়িয়েছিল এই যে, সোভিয়েত শিল্পীদের, লেখকদের, সাধারণভাবে বুদ্ধিজীবী মানুষদের,
তাঁদের সৃজনশীল কাজকর্মের বিষয়ে পার্টি যা বলবে, তা মেনে চলতে হবে। শুরুতে
(খ্রিষ্টাব্দ ১৯৪৬) এইসব হুকুমমানার অভিমুখটা ছিল দুটো সাহিত্য-পত্রিকার দিকে –
ঝভেঝদা এবং লেনিনগ্রাদ – অভিযোগটা, তারা ব্যঙ্গাত্মক রচনাকার মিখেইল জোসচেঙ্কোর
এবং কবি আনা আখমাতোভার তথাকথিত অরাজনৈতিক, ‘বুর্জোয়া’ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যমূলক
সব লেখা ছাপেন। (তাঁদের সোভিয়েত সাহিত্যিক-সংঘ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল।) তার আগে
কোনো কোনো সমালোচককে এবং ঐতিহাসিককে ভৎর্সনা করা হয়েছে এসব কথা বলার জন্য যে, রুশ
ধ্রুপদী সাহিত্য জাঁ-জাক রুশোর, মলিয়েরের, লর্ড বায়রনের এবং চার্লস ডিকেন্সের
দ্বারা কথঞ্চিৎ প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। স্বজাতীয়তার আমেজটা যখন বেশ জম্পেশ হয়ে
উঠেছিল, তখন দাবি করা হতে লাগল যে, পশ্চিমি দেশগুলোতে যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার
হয়েছে বলে বলা হয়, তারাও আসলে সোভিয়েত দেশের আবিষ্কার – অনেক আগে করে ফেলা।
ঝানভ-তত্ত্ব অনুসারে, সরকার যা চায়, তা-ই মান্য; মান্য না করলে কপালে ঢের দুঃখ
আছে; জেল, মৃত্যু, নিদেন দেশান্তরণ।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে-ডিক্রিটা জারি হলো,
তাতে সংগীত-প্রণেতাদেরও জড়িয়ে নেওয়া হলো। প্রচার-অভিযানটার নাম ছিল
অ্যান্টি-ফর্মালিস্ট ক্যাম্পেইন, তথা আঙ্গিক-সর্বস্বতাবিরোধী অভিযান। শুরুতে
লক্ষ্যটা ছিল যদিও ভানো মুরাডেলির অপেরা
দ্য গ্রেট ফ্রেন্ডশিপ, শাস্তির এবং সমালোচনার শিকার হলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের
তাবড় তাবড় সংগীতশাস্ত্রবিদ, উদাহরণ দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ, সের্গেই প্রোকোফিয়েভ এবং
অরম খাচাতুরিয়ান – তাঁদের সংগীত নাকি আঙ্গিক-সর্বস্বতায় জর্জরিত ছিল।
সংগীতশিল্পীদের একটা কংগ্রেস ডেকে এইসব শিল্পীকে ঢের কড়া-মিঠে শাসিয়ে শেষ পর্যন্ত
সর্বসমক্ষে মুচলেকা দিইয়ে রেহাই দেওয়া হয়েছিল।

ঝানভ সাহেব মারা গিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে, কিন্তু
১৯৫৩ সালে স্তালিন সাহেবের মৃত্যুকাল অব্দি জাতীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত
বিশ্বনাগরিকতায় বিশ্বাসী শিল্পী-সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ একইভাবে চলেছে।
আক্রমণটা চলেছে প্রলেতারিয়েতদের পক্ষ থেকে, কিন্তু প্রলেতারিয়েতরা তাতে কতটা-কী
লাভবান হয়েছে,  সে-কথাটা কেউ কখনো হিসেব
করেনি, স্পষ্ট করে বলেওনি। মাঝখান থেকে আক্রমণটা ধীরে ধীরে ইহুদিবিদ্বেষী হয়ে
পড়েছে। সোভিয়েত সাহিত্যের এই পর্বটাকে (১৯৪৬-৫৩) সাধারণভাবে বলা হয় সবচাইতে খরার
সময়।

কিন্তু প্রদীপ জ্বালাবার আগে সলতে পাকাবার একটা
অধ্যায় থাকে।

১৯১৭ সালের ২৪ অক্টোবর দ্বিতীয় স্তরের রুশ
বিপ্লবটা ঘটে গেল ট্রটস্কির নেতৃত্বে, লেনিনের নির্দেশে, বলশেভিকদের হাতে
রাষ্ট্রক্ষমতা এলো। দ্য ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস (ইউএসএসআর) গঠিত
হলো ১৯২২ সালে এবং তার সংবিধান গৃহীত হলো ১৯২৩ সালে। সবই হলো লেনিনের নেতৃত্বে।
রাষ্ট্রশাসনের ক্ষেত্রে যে-নীতিটা নিয়েছিলেন লেনিন, তাকে চিহ্নিত করা হয়
মার্কসীয়-লেনিনীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ নামে; সাব্যস্ত হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় তাবৎ নীতি,
কর্মপদ্ধতি এবং কর্মপ্রকল্প নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির অথবা
সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বার্থে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের হোতা হিসেবে
সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধান ভূমিকাটা থাকবেই এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর আক্রমণ
থেকে তাকে রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব সর্বদেশের সর্বহারারও থাকবে, কিন্তু তা হলেও

…building up the
anti-imperialist revolutionary socialist movement in one’s own country and
rendering all possible help to such movements, and such movements alone, in
other countries …is the best form of international in deeds and the best form
of defense of the USSR that the working class in countries outside Soviet Union
can render to-day. It looks upon the Soviet Union ‘as a link’ –
the most important link undoubtedly – … in
the chain of international proletarian revolutions’ and ‘always subordinate the
specific national state-interests of the USSR at any particular time to
permanent interest of international proletarian revolution and not vice versa –
that is the central axis round which any problem of strategy and tactics of the
entire world working class movement including those of the USSR must revolve in
its view if we have to forge ahead to the overthrow of capitalism and the
establishment of Socialism and the rule of the working class all over the
world.

 

এবং

We are living, not merely in a
state but in a system of states and the existence of the Soviet Republic side
by side with imperialist states for a long time is unthinkable. One or the
other must triumph in the end. And before that end supervenes a series of
frightful collisions between the Soviet Republic and the bourgeois states would
be inevitable. … The victorious proletariet (in the Socialist State) having
expropriated the capitalist and organized its own Socialist production, would
stand up against the rest of the capitalist world, attracting to its cause the
oppressed classes of other countries, raising revolts in those countries,
against the capitalists in the event of necessity coming out even with armed
force against the exploiting classes and their states.

 

লেনিন
মারা গেলেন ১৯২৪ সালে। পরে-পরেই বলশেভিক পার্টির উঁচু দরের নেতাদের ভেতরে নেতৃত্ব
নিয়ে রেষারেষি এবং নীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে যায়, শেষ পর্যন্ত অন্তিম লড়াইটা
হয় স্টালিন ও ট্রটস্কির ভেতরে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে; ট্রটস্কি যেখানে বিশ্বাস
করতেন, লেনিনের ভাবনা অনুসরণ করে, আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে, স্টালিনের
আস্থা ছিল জাতীয়তায় – দ্রুত নিজের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক উন্নয়ন –
অনেকটা নিজে বাঁচলে বাপের নাম – গোছের জিনিস। ট্রটস্কি ১৯২৭ সালে দল থেকে বিতাড়িত
হলেন, শেষ পর্যন্ত খুন হয়েই গেলেন। স্টালিন ‘সোশিয়ালিজম ইন ওয়ান কান্ট্রি’ নীতি
গ্রহণ করলেন; এবং তাঁর আমলে প্রথম দুটো পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়, ১৯২৮-৩৯, ভীমবেগে
ভারী এবং মাঝারি ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুললেন, যৌথ কৃষি খামার সংগঠিত করলেন। দ্রুত
শিল্পায়নের ফলে দেশের চেহারাটাই পালটে গেল; গতরে-খাটা শ্রমিকদের সংখ্যা চতুর্গুণ
বেড়ে গেল, শহরবাসীর সংখ্যা বেড়ে গেল দুগুণ; কিন্তু এসব হতে গিয়ে সামাজিকভাবে
দেশটাকে কঠিন দাম দিতে হলো : ১৯৩২-৩৪ সালে ইউক্রেনে ও কাজাকিস্তানে লাখ লাখ লোক
মারা গেল দুর্ভিক্ষে এবং ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকগুলোতে রাজনৈতিক বহিষ্কার, বিচার ও
শাস্তিদান, শ্রমশিবিরে পাঠানো, দেশান্তরিত করা এবং খুন – ব্যাপক হারে শুরু হয়ে
গিয়েছিল। লিও কামেনেভ, নিকোলাই বুখারিন, গ্রিগরি ঝিনোভিয়েভ প্রমুখ প্রধান নেতাকেও
নকল বিচারের ও বহিষ্কারের শিকার হতে হয়েছিল। ফলে যা হলো, সোভিয়েত কমিউনিস্ট
পার্টির অন্তর্দলীয় গণতন্ত্রের কবর ঘটে গেল, এবং তার জায়গায় স্বৈরতন্ত্র জায়গা করে
নিল, স্টালিনের সর্বশক্তিমান ব্যক্তি-প্রতিমার প্রতিষ্ঠা হলো।

১৯৩৯ সালে স্টালিন নাৎসি জার্মানির হিটলারের
সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি করলেন (মলোটভ-রিবেন্ট্রফ চুক্তি), এবং পোল্যান্ড অধিকার করে
নিয়ে দেশটিকে নিজেদের ভেতরে ভাগাভাগি করে নিলেন। ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া
ফিনল্যান্ড আক্রমণ করল এবং ১৯৪০ সালে একটা স্বল্পকালীন শান্তিচুক্তিতে রাজি হলো।
‘স্বদেশপ্রেমের এই বৃহৎ যজ্ঞে’ আড়াই কোটির মতো রুশি খতম হয়ে গিয়েছিল।

 

লেনিন যে বলেছিলেন, There
is ‘the necessity of strictly adhering to the principle of maintaining entirely
non-aggressive and peaceful relations by the Soviet Union as a state, in its
code of conduct and international dealings with surrounding states, capitalist
or otherwise’, স্টালিনীয় কমিউনিজম তাহলে তাকে সূক্ষ্মভাবে বদলে
নিল ‘prolonged equilibrium between
Socialism and Capitalism’-এ এবং আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রেণি-সহযোগিতায়। অতএব,
পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সে-সময়ের সর্বব্যাপী সংকটের কালে, যাকে লেনিন মনে করতেন
‘prelude to international proletarian revolutions’ – সোভিয়েত
ইউনিয়নের বাইরে যেকোনো দেশে পুঁজিবাদকে উৎখাত করে সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব
সংগঠিত করতে উৎসাহিত করার প্রশ্নই উঠল না। দুটো মূল তাত্ত্বিক খুঁটির ওপরে দাঁড়াল
এসে, তারপর থেকে আন্তর্জাতিক স্টালিনীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন : স্টালিনের রাজনৈতিক
তত্ত্ব – ‘victory of Socialism and Communism in
a single Country’ এবং তার সমান্তরাল তত্ত্ব
‘possiblity of the peaceful co-existence of the two systems –
Socialism and Capitalism side by side for a long period to come in the present
historical epoch.’ সর্বহারার আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং
তাতে সোভিয়েত প্রশ্রয়, অতএব, আপাতত শিকেয় তোলা রইল।

তাহলে, দেশে দেশে কমিনটার্ন-কমিনফর্ম ইত্যাদির
প্রশ্রয়ে যেসব কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছে এবং যাদের সভ্যসংখ্যাও বড়ো কম নয়, তারা
এক্ষণে কী করবে। তাদের কাজ হবে শুধু সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির আজ্ঞা
মান্য করে চলা এবং সোভিয়েত দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করে যাওয়া। সূত্রটি
ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম
বিশ্ব-কংগ্রেসে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ডি জেড মানুইলিস্কি
কংগ্রেসে বলে দিয়েছিলেন,

all the key problems of this
movement (i.e., the world working class movement, in so far as it is led by the
Stalinist Communists),  all its tactical
problems revolve around the central axis – the
reinforcement of the U.S.S.R as the base of world proletarian revolution.

অতএব,
ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, আদর্শগত এবং রাজনৈতিক নির্দেশের জন্য কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত
ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ওপর একতরফাভাবে এবং অন্ধভাবে নির্ভর করে থাকার
অভ্যাসটা তৈরি হয়ে যাওয়ার দরুন প্রতিটি দেশের স্টালিনিস্ট কমিউনিস্টরা একমাত্র
সোভিয়েত দেশের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনকে এবং তার রাজনৈতিক স্বার্থকে সেই মৌলিক অক্ষ
বলে গণ্য করবে, যার সঙ্গে লগ্ন হয়ে আছে সারাটা পৃথিবীর সর্বহারাদের সমাজতান্ত্রিক
বিপ্লব। তাঁর বক্তৃতায় মানুইলিস্কি এ কটা কথাও বলেছিলেন,

in the background of the rise of
Fascism which wants to unleash a new imperialist war and entertains frankly
aggressive intentions against the Soviet Union, the proletariat in most
capitalist countries were not confronted with the alternative of bourgeois
democracy and proletarian democracy (socialism), and the ‘bourgeois democracy’
(even the so-called democracy of imperialist-capitalist countries like Britain,
USA and France) is a progressive step forward compared with Fascism.

 

সোভিয়েত
রাশিয়ার বাইরের ক্যাপিটালিস্টিক দেশগুলোর শ্রমিকদের – যারা নাকি  ‘the base of world proletarian revolution’ – কড়া নির্দেশ
দিয়েছিলেন মানুইলিস্কি, দিমিত্রভ, আদি বড়ো বড়ো কমিউনিস্ট নেতারা, নিজের নিজের দেশে
সেভাবে পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে যেও না, বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা যেভাবে বলে
সেভাবে লড়ো – ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছ, ভেবে নিয়ে। সপ্তম কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে
এই কূটনীতির ওপর নির্ভর করে সুতরাং নাৎসিবিরোধী-ফ্যাসিবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মিলে
‘পপুলার ফ্রন্ট’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইঙ্গ-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে
মিলে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পিপলস কোয়ালিশন’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম একুশ মাস সোভিয়েত রাশিয়া নাৎসি-জার্মানির সখা, তারপর
বাকি সময়টা অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট পপুলার ফ্রন্টের – নাৎসি-জার্মানির বিরুদ্ধে।
সোভিয়েত রাশিয়ার হয়ে কাজ করতে – ঘুরিয়ে দেখলে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে বাঁচাতে – এই
অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট পপুলার ফ্রন্টের নামে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে স্টালিনীয়
কমিউনিস্টরা ব্যস্ত থেকেছে। সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধটা শুরু হলো ১৯৪১ সালের জুনে,
অক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিন-সোভিয়েত কোয়ালিশনটা তৈরি হয়ে গেল রাতারাতি, আর
সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রগতভাবে কী করে যে ‘পিপলস ওয়ারে’ অথবা
‘জনযুদ্ধে’ রূপান্তরিত হয়ে গেল, তা অনেকেরই মনে আছে; ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের
বিরুদ্ধে তাবৎ লড়াই নির্দ্বিধায় মুলতবি করে দেওয়া হয়েছিল, ইঙ্গ-মার্কিন-সোভিয়েত
জোট তখন অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। এ-প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, মানুইলিস্কি
সাহেব যে বলেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরাপত্তার ও তাকে শক্তিশালী করে তোলার
স্বার্থে কাজে লাগাই একমাত্র বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণির আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য
হওয়া উচিত, তার ঢের আগে খোদ স্টালিন বেশ জোরালো গলায় বলে দিয়েছিলেন যে, সোভিয়েত
ইউনিয়নের সীমানার বাইরের কোনো দেশে পুঁজিবাদকে উৎখাত করার জন্য বিপ্লবী আন্দোলনে
প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ মদদ দেওয়ার কোনো দায় অথবা ইচ্ছা তাঁর নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া বিজয়ী হয়েছিল
বটে, কিন্তু দেশটির অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়েছিল। জাতীয় মূলধনের এক-চতুর্থাংশ
নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন যুদ্ধের আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই কমে
গিয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য জোটের দেশ থেকে অল্পস্বল্প ধার,
তাঁবে দেশগুলো থেকে জোর করে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আদায়, এসব করে অর্থনীতিটাকে
দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে করতে দেশের ভেতরেও শক্ত হাতে কৃচ্ছ্রসাধন চালু করতে
হয়েছিল। ভারী শিল্পের দিকে ঝোঁকটা বেশি পড়েছিল, ভোগ্যপণ্যের এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন
সমমাত্রায় কম; ফলে স্টালিন যখন মারা যান ১৯৫৩ সালে, দেশে ইস্পাত-উৎপাদন ১৯৪০ সালের
স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন নেমে গিয়েছিল ১৯২০ স্তরে। স্পষ্টত, প্রশাসনকে
খুবই দমনমূলক হতে হয়েছিল। যুদ্ধের সময় যারা দলে নাম লিখিয়েছিল তাদের অনেককেই
তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, চার্চকে এবং যৌথ খামারকে যেটুকু সামান্য স্বাধীনতা দেওয়া
হয়েছিল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যুদ্ধ শেষ হলে যারা দেশে ফিরে এসেছিল – সে সৈন্যরা হোক
অথবা দেশত্যাগীরা অথবা বাধ্যত-শ্রমিকেরা – তাদের জেলে ভরে দেওয়া হয়েছিল অথবা মেরে
ফেলা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে-না-যেতেই
সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলো জোট ভেঙে আলাদা হয়ে গেল, দুপক্ষই পরস্পরের
কাজকর্ম ও উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে ছিল। চারপাশের পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর
প্রভাব বাড়াতে সোভিয়েত রাশিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাতে লাগলে (শেষ
পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে সাতটা দেশে কমিউনিস্ট সরকার গড়ে ফেলা গিয়েছিল) পশ্চিমি দেশগুলো
এই সময়ের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে সোভিয়েত রাশিয়াকে ঠেকাতে চাইল;
আর এই ব্যাপারটিই ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ নামে খ্যাত হলো।

এই পটভূমিকায় ১৯৪৬ সালে স্টালিনের একজন ঘনিষ্ঠ
সহযোগী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা, আন্দ্রেই আলেক্সান্দ্রোভিচ
ঝানভ, ‘দুই পৃথিবীর’ তত্ত্বটা খাড়া করলেন – ধনতান্ত্রিক পৃথিবী, সমাজতান্ত্রিক
পৃথিবী – এরা অনিরাময়যোগ্যভাবে পরস্পরের শত্রু; সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীর সবকিছু
ধনতান্ত্রিক পৃথিবীর চাইতে অতুলনীয়ভাবে ভালো। লেনিন কী বলেছেন-না-বলেছেন, তা নিয়ে
তাঁর মাথাব্যথা ছিল না, কমিউনিস্টদের সামনে আজ কী ঐতিহাসিক কর্তব্য এসে হাজির
হয়েছে, তা বলতে গিয়ে যদিও  ‘resistance to the plans of imperialist
expansion and aggression of Anglo-American powers along every line’ বলেছেন, তা
করতে বলেছেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং জাতীয় গণতন্ত্রের স্তরে; খুব সন্তর্পণে তিনি
সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি প্রধানত পড়েছেন
শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে এবং সৃজন-প্রকল্পে তাদের কী করতেই হবে, তা নিয়ে। জিনিসটা
নতুন নয়; ১৯৩৪ সালে, সোভিয়েত লেখকদের কংগ্রেসে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির
সেন্ট্রাল কমিটির নামে এবং দ্য কাউন্সিল অফ পিপলস কমিসারস অফ দ্য ইউনিয়ন অফ
সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকসের নামে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ‘আওয়ার গ্রেট লিডার
অ্যান্ড টিচার কমরেড স্টালিনে’র নাম পুনঃপুন উচ্চারণ করতে করতে, নিবিড় শিল্পায়নের
ও যৌথ খামারের গুণগান করতে করতে, ধনতন্ত্রীদের যে দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া
হয়েছে, সে-গর্ব করতে করতে, স্বদেশীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির তুমুল প্রশংসা করতে করতে,
শেষ পর্যন্ত লেখকদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, পার্টি নেতৃত্বে এবং তার দিনকে দিন
অভিভাবকত্ব মেনে নিয়ে লিখতে হবে; হতাশার কথা চলবে না; জনগণকে সমাজতন্ত্রে শিক্ষিত
করে তুলতে হবে, সাহিত্য হবে লোকশিক্ষামূলক; সাহিত্যিকদের সোভিয়েত শক্তির ও পার্টির
চারদিকে গিয়ে শামিল হতে হবে; সাহিত্যের গঠন ও বক্তব্য হবে সমাজতান্ত্রিক;
সাহিত্যের চরিত্র চোর-গুন্ডা-বদমায়েশ-বেশ্যা-দুষ্কৃতী হতে পারবে না, হবে পার্টি
নেতা, কর্মী, চাষি, শ্রমিক, সৈন্য – এরা সবাই; আশাবাদ  – এবং আশাবাদই হচ্ছে সাহিত্যের নির্যাস, মনে রাখতে
হবে; কমরেড স্টালিন বলেছেন, সাহিত্যিকরা হচ্ছে মানুষের মনের কারিগর, সাহিত্যকদের
তা হতে হবে; রোমান্টিসিজম চলবে, কিন্তু তা হতে হবে সোশ্যালিস্ট রোমান্টিসিজম, এবং
সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম; ওসব আবেগ-টাবেগ চলবে না, আগাপাছতলা ব্যবসায়ী ধরনের ও বাস্তব
অনুভব চর্চা করতে হবে – উদ্দেশ্যটা একটা কমিউনিস্ট সমাজ তৈরি করে তোলা;

শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন জীবনযাপন হুবহু তুলে ধরুন; লোকে বলতে পারে লেখাগুলো
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা-ই সই, তা-ই সার্থকতা; ইত্যাদি ইত্যাদি, তারপরে স্লোগান :
উঁচু দরের সাহিত্য তৈরি করুন, উঁচু আদর্শের, উঁচু শিল্প-পদার্থের; জনগণের মানসিকতা
গড়ে-পিটে তুলতে সাহায্য করুন, তাদের সমাজতন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করুন; শ্রেণিহীন সমাজ
বানিয়ে তুলতে যারা লড়াই করছে, তাদের সামনের সারিতে এসে দাঁড়ান। ফলে যা দাঁড়াল,
সোভিয়েত দেশে গ্রহণযোগ্য সাহিত্যের শর্তটা হলো গিয়ে সংকীর্ণ চরিত্রের একধরনের দেশপ্রেম
এবং পার্টি-আনুগত্য। ১৯৬৪ সালে যুদ্ধোত্তর রাশিয়ায় কোনো কোনো লেখক অতএব আশ্রয়
নিলেন গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত তাঁদের সরাসরি অভিজ্ঞতার এবং তার ওপরে তাঁদের
উপন্যাসগুলো দাঁড় করালেন; অন্যরা সরকারি দাবি মেনে নিয়ে দেশের শান্তিপূর্ণ
পুনর্গঠনকে তাঁদের উপন্যাসের বিষয় করলেন এবং প্রাণে বাঁচলেন।

১৯৪৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির
সেন্ট্রাল কমিটির প্রস্তাবে ঝানভের নেতৃত্বে যে-বিধানাবলি রচিত হয়েছিল, অর্থাৎ
ঝানভশ্চিনা তথা ঝানভবাদ, তার কথা আগেই বলা হয়েছে। যুদ্ধের বছরগুলোতে লেখকদের
সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পড়তে হয়েছিল, তাদের কিছু স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছিল, তখন
সোভিয়েত দেশে কিছু ভালো সাহিত্যও লেখা হয়েছিল; সে-সময়ে লেখা কয়েকটি গল্পের একটা
সংকলনের প্রশংসা করে একটা সমালোচনা লিখেছিলেন জীবনানন্দ, তাঁর প্রবন্ধ সমগ্রে আছে। কিন্তু, তার পরেই
ঝানভ সাহেব এসে পড়েছেন। কিন্তু বেশিদিন তাঁকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি। ১৯৪৮ সালে তিনি
খুন হয়ে গেছেন। তিনি গেছেন, কিন্তু তাঁর প্রণীত গোঁড়া বিধিনিষেধগুলো সোভিয়েত
দেশের  লেখক-শিল্পী-মননজীবীদের জন্য থেকে
গিয়েছে।

কথাটা জানা যে, পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের,
বিশেষত ইউরোপীয় দেশগুলোর মতনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় রাজনৈতিক লাইন
সোভিয়ত দেশের বিদেশনীতির পূর্ববর্তী পরিবর্তনসাপেক্ষে সাব্যস্ত হয়। সোভিয়েত দেশীয়
পরিবর্তনটা এদেশে এসে লাগু হতে একটু সময় লাগে, কিন্তু হয়। প্রতিটি জাতীয় কমিউনিস্ট
পার্টির সমগ্র আন্দোলনের যে-আন্তর্জাতিক প্রকৌশল এবং প্রধান অন্তর্দেশীয় ব্যবহারিক
দিক, তা অন্যথা-ব্যতিরিক্তভাবে, সোভিয়েত দেশের নীতির দ্বারা শাসিত হয়। আন্তর্জাতিক
এসব মূলনীতিগত নির্দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না নিতে পারলে তাৎক্ষণিক দেশীয় অবস্থার
সঙ্গে সুসমঞ্জসভাবে কার্য-নির্বাহক কোনো নীতি প্রণয়ন করতে গেলে, সেই লাইনে যে-নতুনত্ব
ঘটতে পারে, তাকে বিচ্যুতি বলে ধরা হবে, ‘ডান’ অথবা ‘বাঁ’, অথবা অন্যকিছু,
অবস্থা-অনুসারে। যে-কোনো দেশের যে-কোনো স্টালিনিস্ট কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে
জাতীয়-রাজনৈতিক লাইনে আন্তর্জাতিক কৌশলগত লাইনের থেকে সরে যাওয়াটা ভাবাই যায় না।
সে সাহিত্য-শিল্পগত বিষয়ের মতন একটা নিরীহ লাইন হলেও না।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পায়। এই
সময়টার আগে-পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ অবস্থাটা বিশৃঙ্খল হয়ে
পড়েছিল; পার্টিকে ডান-বিচ্যুতি বাম-বিচ্যুতির ভেতরে টানাপড়েন করতে-করতে
মোটামুটিভাবে তথাকথিত বাম-বিচ্যুতিতে থেকে যেতে হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে ভারতের
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল বাংলা প্রদেশে;
সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনটা খুব জঙ্গি ছিল, কখনো-কখনো সশস্ত্রও।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের একটা অংশ ভাবতে শুরু করেছিল যে, দেশে বিপ্লবের পরিস্থিতিটা
তৈরি হয়ে গেছে, এই স্বাধীনতা মেকি (ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়), কেন্দ্রে এবং
প্রদেশে-প্রদেশে যে-কংগ্রেস সরকারগুলো বসেছে, তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দুয়ারের
পাপোশ-মাত্র, ইঙ্গ-মার্কিন স্থায়ী স্বার্থ দেখাই তাদের কাজ। ভারতবর্ষের জনতা এই
শাসকদের বিদায় করে দেওয়ার জন্য প্রস্ত্তত, মাত্রই একটা ঠেলা দেবার অপেক্ষা (এক
ধাক্কা আউর দো)। দেশের প্রান্তিক গ্রামে-গ্রামে ‘অনেক মুক্ত এলাকা’ প্রতিষ্ঠা হয়ে
গেছে, সর্বভারতীয় রেল-ধর্মঘটের পরে গণঅভ্যুত্থান হবে, এবং ঘটনাটা ঘটে যাবে।
পার্টিকে তথাকথিত ডান-বিচ্যুতি থেকে যাঁরা বাঁচিয়েছিলেন লিখে সমালোচনা করে তাঁদের
প্রধান ছিলেন বি.টি. রনদিভে (বিটিআর)। তিনি ১৯৪৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয়
পার্টি-কংগ্রেসে পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। পার্টি-চিঠিগুলোতে,
পার্টি-পত্রিকাগুলোতে সমূহ আসন্ন বিপ্লবের ইচ্ছাপূরণের গল্পটা বারবার প্রচারিত
হচ্ছিল।

১৯৪৯ সালের ৯ মার্চে রেল-ধর্মঘট সম্পূর্ণভাবে
ব্যর্থ হলো। পার্টির কর্মী-সমর্থকরা অত্যন্ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল, তৃণমূলের অনেক
নেতাকর্মী বসে গেল। তিক্ত অন্তর্দলীয় চাপান-উতোর শুরু হয়ে গেল। কংগ্রেস সরকার
কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করে দিলো, পঁচিশ হাজার সক্রিয় কর্মীকে আটক করা
হলো। বিটিআর আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেন, সেখান থেকেই পার্টির কাজকর্ম করতেন,
অজ্ঞাতবাসে ছিলেন ১৯৫০ সাল অব্দি। তাঁর সময়ে পার্টি উগ্র গোষ্ঠীতান্ত্রিকতায় ও চরম
বাম-বিচ্যুতিতে চলে গিয়েছিল, হঠকারিতার চরম পর্যায়ে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও তার
প্রভাব পড়েছিল, মাঝে-মাঝেই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে, কোনোটাতেই সাফল্য মেলেনি।
জেলবন্দিদের দিয়ে হঠকারী আন্দোলন করানো হয়েছে, তরুণ মূল্যবান সব কমরেডের প্রাণ
গেছে। বিভিন্ন সম্মাননীয় পার্টি নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা অথবা অন্যায্য অভিযোগে
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে – স্টালিনীয় সোভিয়েত পার্টি-অধ্যক্ষের ধরনে।
এতোটাই ভয়াবহভাবে যে, কমিনফর্মকে (কমিউনিস্ট ইনফরমেশন ব্যুরো) তাঁর ভুলগুলো
শোধরাতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। রনদিভেকে পার্টি-সম্পাদকের পদ থেকে শেষ পর্যন্ত
সরিয়ে দেওয়া হয়েছে; তাঁর কেন্দ্রীয়
কমিটি-সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে; তিনি তাঁর হঠকারী পার্টি-চালনা স্বীকার
করে নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে রেহাই পেয়েছেন।

এর আগে ১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার যখন
বিশ্বাসঘাতকতা করে অনাক্রমণ চুক্তি ভেঙে সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করেন, বিটিআর
রাজস্থানের দেউলি জেলে বন্দি ছিলেন। তিনি মনে করেছেন, যুদ্ধের চেহারা পালটে গেছে;
তিনি জেলে থেকেই সোভিয়েত রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য ও বিশ্বজুড়ে নাৎসি-বিভীষিকাকে
পরাজিত করতে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর থিসিস – দেওলি থিসিস – তিনি জেলের
বাইরে পাচার করে দিতে পারেন; কমিউনিস্ট পার্টি-নেতৃত্ব তাঁর থিসিস গ্রহণ করে।
সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ অবিলম্বে ‘জনযুদ্ধ’ সম্মানটা পেয়ে যায়। ১৯৪২ সালের জুলাই
মাসে ব্রিটিশ-ভারত সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ‘ভারত
ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেয়; সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের তাবড় নেতাদের জেলে পুরে দেয়
ব্রিটিশ সরকার এবং গান্ধী বন্দিত্বে যেতে যেতে বলে দেন ‘ডু অর ডাই’। কংগ্রেসের
ডাকা এই আন্দোলনটাকে কমিউনিস্ট পার্টি পছন্দ করেনি, তাদের কাছে তখন সবচাইতে জরুরি
বিষয় সোভিয়েত রাশিয়ার পাশে দাঁড়ানো এবং আন্তর্জাতিক স্তরে নাৎসি-আগ্রাসন রুখে
দেওয়া; দেশ থেকে ব্রিটিশদের হটানো নয়, তারা এখন সোভিয়েতের সঙ্গে জোটে আছে। জাপানি
ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে সব রাজবন্দিকে মুক্ত করে ঐকমত্যের
ভিত্তিতে একটা জাতীয় ফ্রন্ট গড়ার ডাক দিয়েছে তখন রনদিভে আদি নেতাদের প্রামুখ্যে
কমিউনিস্ট পার্টি; একই উদ্দেশ্য মাথায় রেখে কংগ্রেসের ও ভারতীয় মুসলিম লিগের
ঐক্যের ডাক দিয়েছে পার্টি, এবং তার মাধ্যমে একটা ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের। স্বভাবতই
এসব ক্রিয়াকান্ডের ফলে কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘ব্রিটিশদের দালাল’ ইত্যাদি সুনাম পেতে
হয়েছে, জনতার থেকে আলগা হয়ে পড়তে হয়েছে, সেসব প্রায় একা হাতে সামলেছেন রনদিভে।
বাংলা প্রদেশের তেতাল্লিশের মন্বন্তরের দরুন সংকটে এবং তেভাগা আন্দোলনের দরুন
সংগ্রামে, এবং মহারাষ্ট্রের ওরলি চাষি-বিদ্রোহে রনদিভে জরুরি ভূমিকায় সকর্মক
থেকেছেন।

বাংলা প্রদেশে ভবানী সেন এবং সোমনাথ লাহিড়ি কট্টর
রনদিভেপন্থী ছিলেন।

ভবানী সেন ১৯৪৩-৫১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির
প্রাদেশিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৪৬-৪৭ সালে কৃষকদের তেভাগা
আন্দোলনের অগ্রণী নেতা, ১৯৪৮ সালে পার্টি-পলিটব্যুরোর সদস্য; সুবক্তা সুসাহিত্যিক
দার্শনিক সংগঠক, নামে-ছদ্মনামে লিখতেন; দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে ভারতীয়
দর্শনচর্চায় তিনি টেনে এনেছেন; পার্টিতে ছিলেন প্রাধান্যে ও কর্তৃত্বে বিটিআরের
ঠিক পরেই। ১৯৪৮-৫১ সালে আত্মগোপন করে ছিলেন।

সোমনাথ
লাহিড়ি ১৯৩০ সালে ড. ভূপেন দত্তের সংস্পর্শে এসে মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। ট্রেড
ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে পার্টিতে এসে পড়েছিলেন। মার্কসবাদী সাহিত্য অনুবাদ
করেছেন; ছিলেন স্মরণীয় সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক, লিখেছেন প্রচুর, ছোটগল্প অব্দি;
পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন; সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে তিনি
হাতে ধরে সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন;
১৯৩৩-৫০ সালে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৪৮-৫০
সালে পলিটব্যুরোর সদস্য; তেভাগা আন্দোলনের সময় আত্মগোপন করে কাজ করেছেন, জেলে
গিয়েছেন।

সেন এবং লাহিড়ি আত্মগোপন করে থেকে পার্টি
চালিয়েছেন ‘জনযুদ্ধে’র বছরগুলোতে, পার্টির ‘রনদিভে-পর্বে’, রাজনীতির, সাহিত্য-সংস্কৃতির
সব এলাকায় হঠকারী কার্যকলাপ প্রণয়ন করেছেন, করিয়েছেন, সন্ত্রাসের আবহাওয়া তৈরি করে
তুলে চরিত্র হনন করেছেন, অবিবেচক সব প্রকল্পে লড়িয়ে দিয়ে বহু মানুষের, অনেক
তরুণের; অকালমৃত্যুর কারণ হয়েছেন। অনেক সময়েই তাঁদের গোঁয়ার্তুমিটা ছিল বিদ্বিষ্ট,
প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভবানী সেন আগাপাছতলা প্রতিক্রিয়াশীল
বলে দেগে দিয়েছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে রবীন্দ্র-হননের একটা উৎসবই প্রায় লেগে
গিয়েছিল সে-সময়। এবং এদেশের যে-সাহিত্য সোভিয়েত রাশিয়ার স্টালিনীয় তাত্ত্বিক
ঝানভের এবং ইউরোপের দেশগুলোর ঝানভ-ফতোয়াধারীদের নির্দেশ মেনে হয়নি অথবা হচ্ছে না,
তাদের স্রষ্টাদের তখন অকথ্য হেনস্থা করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। (অবশ্য, সামাজিক
অবস্থানে যেসব জীবিত কবি অথবা/ এবং সাহিত্যিক বলশালী সংস্থানে ছিলেন, তাঁদের
সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।)

১৯৫০ সালে রনদিভে-বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে, অবশ্য রনদিভে-পর্বের
অন্য নেতাদেরও বিদায় দেওয়া হয়েছিল : সেন, লাহিড়ি, নৃপেন চক্রবর্তী। তাঁদের
পিজরাপোলে পাঠিয়ে দিয়ে যাঁরা তাঁদের জায়গায় উঠে এসেছিলেন, তাঁরা প্রাদেশিক স্তরে
জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত। সেন-লাহিড়ি-চক্রবর্তীকে নিজের নিজের রাস্তা দেখে
নিতে বলা হয়েছিল, তাঁদের মাসিক ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শোনা যায়,
পার্টি-নেতাদের চূড়ামণি, মুজফ্ফর আহমেদ বলেছিলেন, ভবানী সেনকে ইসকুল-মাস্টারি করে
চালিয়ে নিতে, রাজনীতি ছেড়ে দিতে; সেন অবশ্য রাজি হননি।

তাঁরা কর্তৃত্ব থেকে সরে গেছেন, কিন্তু তাঁদের
চেলা-চামুন্ডাদের যে-অভ্যাসটা তাঁরা শিখিয়ে গেছেন, তা থেকে গেছে। ঝানভ খুন হয়ে
গেছেন ১৯৪৮ সালে, স্টালিন মারা গেছেন ১৯৫৩ সালে (কীভাবে যে কেউ জানে না), তবু
ঝানভবাদ বিগত শতকের ষাটের দশকেও সোভিয়েত দেশে থেকে গেছে এবং যেতে-যেতে নববইয়ের দশক
লেগে গেছে। দুটো উদাহরণ সহজেই দেওয়া যায়; বরিস
পাস্তারনাকের ডক্টর ঝিভাগো
উপন্যাসটাকে ১৯৫৬ সালে মস্কোর একটা বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেনি, লুকিয়ে
বিদেশে প্রকাশিত হতে আঠারোটা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ১৯৫৮ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন;
পাস্তারনাক ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত রাইটার্স থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন; ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর
২৭ বছর পরে পুনঃগৃহীত হয়েছেন। সোলঝিনিৎসিন ১৯৬৩ সালের পর সোভিয়েত দেশে আর বই
প্রকাশ করতে পারেননি, তাঁর এর পরের বইগুলো বেরিয়েছে বিদেশে লুকিয়ে; ১৯৭০ সালে
নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, প্রাইজ নিতে বিদেশে যেতে পারেননি; তাঁর দ্য গুলাগ আর্কিপেলাগো উপন্যাসটি প্যারিসে
প্রকাশিত হতে গ্রেফতার হয়েছেন, ১৯৭৪ সালে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন; ১৯৮০ থেকে
সোভিয়েত দেশে পুনঃগৃহীত হচ্ছেন, ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরেছেন। ঝানভবাদের জীবনকাহিনি
এরকমই।

বাংলা প্রদেশেও অন্যথা হয়নি। সাহিত্য-সংস্কৃতির
বিষয়ে যতটা দাদাগিরি হওয়ার তা তো হচ্ছেই, অধিকন্তু আছে কানাঘুষো। হাওয়ায়-হাওয়ায়।
রনদিভে-সেন-লাহিড়িরা গেছেন, কিন্তু পরিচয়
পত্রিকা ঘিরে তাঁদের শিষ্যরা দোর্দন্ড প্রতাপে আছেন, সমসময়ের সতীর্থরাও। তাঁরা যে
যার নিজের মতন করে লিখেছেন – গল্প, কবিতা, তাত্ত্বিক-সাংবাদিক-রাজনৈতিক প্রবন্ধ –
নতুন একটা সাহিত্য-যুগ প্রবর্তিত হয়ে গেল বলে। কিন্তু ‘কালো ভেড়া’দেরও স্বরূপ
দেখিয়ে দেওয়া তো দরকার। জীবনানন্দ হয়তো অাঁচ করছিলেন যে, যে-ভাগ্য তাঁর সেই শনিবারের চিঠির সময় থেকে, এবার তীরগুলো
তাঁর দিকেই আসবে, বিশেষত ঝানভ চলে গেলেও যখন ইউরোপের সাহিত্যের বাজারে তাঁর আবহটা
বেশ সাম্প্রতিক আছে, কলকাতায়ই-বা সাম্প্রতিক থাকবে না কেন। তাছাড়া তিনি চাঁদমারির
দিক থেকে সবচাইতে সহজ নিরীহ ও নিরাপদ লক্ষ্য।

১৯৫২ সালে এসে পড়তেই তীরগুলো ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুটে
আসতে লেগেছিল তাঁর দিকে। প্রথম তীরটি ছুড়েছিলেন অশোক মিত্র সাতটি তারার তিমির কবিতার-বইটির সমালোচনা লিখতে গিয়ে, তারপর আরো
চোখা সাংবাদিকতার কলমে ননী ভৌমিক, সুভাষ মখোপাধ্যায় (সোমনাথ লাহিড়ির নিজের হাতে
তৈরি), সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃগাঙ্ক রায় – এঁরা।

জীবনানন্দের প্রবন্ধটি লেখার তারিখটি জানা যায়
না, যখন তিনি বিগত শতকের চল্লিশের দশকের শেষের দিকে অথবা পঞ্চাশের দশকের শুরুর
দিকে দুটো বেশি পয়সা আয় করার জন্য ইংরেজি প্রবন্ধ লিখছেন, সে-সময়েই লেখা হয়ে থাকতে
পারে; যদি হয়, তাহলে তীরগুলো এসে গায়ে বিঁধবার আগে-পরে কোনো সময় লিখেছেন। লিখেছেন,
প্রেস-কপি করেছেন, কোনো কাগজে ছাপতে পাঠাননি : খুব ক্ষীণবল মানুষেরা যেমন হয়,
জীবনানন্দ ভীতু সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন।

 

ঋণ : মেরিয়ান-ওয়েবস্টার
এনসাইক্লোপিডিয়া অফ লিটারেচার : ত্রিদিব চৌধুরী; রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য; সংসদ বাঙালা চরিতাভিধান; এ. এ. ঝানভ; দ্য ব্রিটিশ এনসাইক্লোপিডিয়া; উইকিপিডিয়া; লেনিন : সিলেকটেড ওয়ার্কস, খন্ড ৮

শেয়ার করুন

১ thought on “জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ

Leave a Reply