জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের আলাপনে শহীদ কাদরী

লেখক:

পিয়াস মজিদ

লেখা না-লেখার গল্প’, ‘কবির মুখোমুখি’ এবং ‘শহীদ কাদরীর বাছাই কবিতা’ – এই তিন পর্বে বিন্যাসিত জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গ্রন্থ শহীদ কাদরী লেখা না-লেখার গল্প

(অন্যপ্রকাশ, ফেব্রম্নয়ারি ২০১৩)।

ছয় অনুচ্ছেদ-ব্যাপ্ত ‘লেখা না-লেখার গল্পে’র প্রারম্ভেই জ্যোতিপ্রকাশ বলেন –

শহীদ কাদরী, বন্ধুবরেষু – কত সহজেই না লিখতে পারি। যদি লিখতে হতে বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ শহীদ কাদরী, কী লিখতে হতো কিংবদমিত্মর কবি শহীদ কাদরী, তাহলে তার কথা তার কবিতার কথা লেখা আমার জন্য সহজ হতো না। কাব্যরসিক সমালোচক যেমন নির্মোহ দৃষ্টিতে কাব্যস্রষ্টা ও তার সৃষ্টির আলোচনা করতে পারেন, বন্ধু তেমন পারে না।

না, হ্রস্বায়তন বিশেস্নষণ আর দীর্ঘ আলাপনে প্রিয় কবি শহীদ কাদরীর কবিতাই শুধু নয়, বরং বাংলা কবিতা থেকে বিশ্বসাহিত্যের অন্ধিসন্ধিরও অনন্য উন্মোচন ঘটে। সুচিমিত্মত-কাঠামোগত-গবেষণালব্ধ কোনো সিদ্ধামেত্ম হয়তো এ-বই উপনীত হয় না কিন্তু প্রকৃত কবির প্রাণের উত্তাপ পাঠকমনে সঞ্চার করে অনায়াসে। এই পর্বে শহীদ কাদরীর সঙ্গে লেখকের প্রথম সাক্ষাৎ – লিটল ম্যাগাজিন সপ্তককালবেলা – পঞ্চাশ-ষাটের দশকের তরুণ কবিকুলের নতুনতার অন্বেষা – ১৯৬৭তে কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার প্রকাশ – বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তি – বেশুমার আড্ডাবাজি – তাঁর দেশত্যাগ – প্রবাসে কবিতার নতুন উদ্গম – ১৯৯৩-এ শহীদ কাদরীর কবিতা সংকলন প্রকাশ ইত্যাদি নানা ঘটনাপরম্পরার ঢেউ এসে নোঙর গেড়েছে সাম্প্রতিক সময়-বন্দরে এসে অর্থাৎ ২০০৯ সালে চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও প্রকাশ – নীরা কাদরী এবং নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে কবিতার আসরের প্রসঙ্গ পর্যমত্ম। একেবারে শেষাংশের বাক্যসমুচ্চয়ে প্রতিভাসিত কবির যুগপৎ লেখা ও না-লেখার নেপথ্য-রসায়ন –

যাপিত জীবনের কিছু ছায়া লেখকের রচনায় পড়ে, এ-কথা জানা। লেখকের আপন জীবনই তাঁর রচনার সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান এ-কথাও অনেকে বলেন। সময়, সমাজ, স্বদেশ, দূরদেশ, পরিপার্শ্ব এইসব নিয়েও কথা হয় – লেখকের রচনায় কী পরিমাণ প্রভাব ফেলে ওইসব। কিন্তু সময়, সমাজ, স্বদেশ, দূরদেশ, পরিপার্শ্ব, পরিবেশ ইত্যাকার বিষয় লেখককে রচনাবিমুখও করে।

কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের এমন মমত্মব্যও অনুধাবনযোগ্য –

তবে কখনো কোনো জীবনাকুল বাতাস শরীর স্পর্শ করলে লেখক আবারও উড়তে পারে সেই হাওয়ায়, ছড়িয়ে দিতে পারেন তাঁর সৃষ্টি।

শহীদ কাদরীর অনুভব আবারো কবিতার আধারে মুদ্রিত দেখেছি শেষ ক-বছরে। নানান সাক্ষাৎকারে কবি জানিয়েছেন যে, পঞ্চম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের প্রস্ত্ততি তাঁর আছে। আধুনিক বাংলা কবিতার পাঠক সেই অপেক্ষায় ছিল কিন্তু হায় নিষ্ঠুর আটাশ আগস্ট ২০১৬ আমাদের সে-আকাঙক্ষায় চিরদিনের মতো যতি টেনে দিলো!

 

দুই

‘প্রবাসে, তবু বাংলাদেশের হৃদয়ে’ শীর্ষনামী শহীদ কাদরীর সঙ্গে একামত্ম এই আলাপচারিতা আলোচ্য বইয়ের মূল্যবান পর্ব। ব্যক্তিক প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ ধারণ করেও এটি একই সঙ্গে রূপ নিয়েছে বাংলা কবিতার নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যে। এই আলাপভাষ্যের বিশেস্নষণের চেয়ে এর কিছু টুকরো অংশ চয়নে দেখা যাবে কতটা গভীর – অনুধ্যানী দৃষ্টি শহীদ কাদরীর। এই দৃষ্টি রোমান্টিসিজম থেকে তার নিজের সুখ্যাত কবিতা ‘বৃষ্টি ! বৃষ্টি!’-এর ব্যাখ্যা পর্যমত্ম বিসত্মৃত –

…আমার মনে হয় রোমান্টিক কবিদের মধ্যেই কিছুটা ফ্যাসিবাদী জার্ম আছে। কারণ ফ্যাসিবাদ যেটা বলে, ফ্যাসিবাদের যে একটা পিকটোরিয়াল প্রেজেন্টেশন হয়, অনেকগুলো কাঠি একসঙ্গে বাঁধা আর সঙ্গে একটা কুড়োল। একটা কুড়োল এক ঘায়ে সবগুলো কাঠি ভেঙ্গে ফেলতে পারে। ভার্চুয়াসরা রাজত্ব করবে ননভার্চুয়াস জনগণের ওপর – এই রোমান্টিক হিরোইজমের মধ্যে কিন্তু ফ্যাসিবাদের জার্ম রয়েই গেছে। ফ্যাসিবাদ যে ইউরোপের কিছু ইন্টেলেকচুয়ালের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল তার কারণ কিন্তু এটাই।

…একজন কবিকে যখন এগুতে হয় তখন নতুন কিছু করতে হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় গ্রাম-বাংলার বর্ণনায় আমরা যে উপমা পাই তা রবীন্দ্রনাথেও নেই। এতে বিস্মিত হতে হয়। যখন কবিরা এভাবে যা কিছু স্পর্শ করবে সেখানেই নতুনত্বের ছাপ থাকবে – এভাবে কয় হাজার বই লিখতে পারবে? চার-পাঁচটা বই তো যথেষ্ট।

…জীবনপদ্ধতির বিশৃঙ্খলার জন্য লেখায় বিশৃঙ্খলা আসতে পারে। …এটা বাংলাদেশের অনেক কবিদের মধ্যেও দেখা গেছে। কিন্তু আবার বদলেয়ার-এর কাব্যশৈলীতে তাঁর জীবনাচরণের কোনো ছাপই নেই। তিনি পাগলের মতো মাথা কামিয়ে সবুজ রঙ মেখে প্যারিসের রাসত্মায় ঘুরে বেড়াতেন। ছেলেপিলেরা ইট মারত। টাকার অভাব ছিল। তাঁর সৎবাবার কাছ থেকে তার প্রাপ্য টাকা সবসময় পেতেন না। কিন্তু তাঁর কবিতাগুলো ফরাসি ধ্রম্নপদী কাব্যশৈলীর নিখুঁত দৃষ্টামত্ম।

…‘বৃষ্টি! বৃষ্টি!’ সবাই মনে করে এটা নাগরিক বৃষ্টি। নাগরিক বৃষ্টি ওটা না। ওটায় দেখানো হয়েছে শহরটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এমন বৃষ্টি যে শহরটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাবার পর নগরে রাজত্ব হচ্ছে কাদের? যারা আজীবন ভিক্ষুক, যারা আজীবন নগ্ন, যারা আজীবন ক্ষুধার্ত। আর যারা রাজস্ব আদায় করে তারা সব পালিয়েছে। এই যে একটা প্রচ- শক্তি তা এই নগরকে, যে নগরকে আমরা ধ্যানজ্ঞান মনে করছি, সে নগরকে একটা বিরাট শক্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই শক্তিকে আমি আঙুল দিয়ে শনাক্ত করি নি। এটা রাজনৈতিক শক্তি হতে পারে, এটা গণজাগরণ হতে পারে, বৈপস্নবিক উত্থান হতে পারে।

দীর্ঘ উদ্ধৃতি আবশ্যক ছিল শিল্পসাহিত্য বিষয়ে শহীদ কাদরীর ভিন্নমাত্রিক ভাবনাচিমত্মনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য। দেখা যাচ্ছে রোমান্টিসিজমের সূত্রে ফ্যাসিবাদ ও বিপস্নবের কথা চলে আসছে সমতালে। ত্রিশের দশকের জীবনানন্দ দাশের আলোচনায় চলে আসে সর্বকালের কবিদের লেখনবৈশিষ্ট্যের বিষয়। বাংলাদেশের কবিদের জীবনপদ্ধতি নিয়ে বলতে গিয়ে কাদরী চলে যান বদলেয়ারের ভুবনে। তাঁর নিজের কবিতার নেপথ্যকাহিনি বর্ণনে এসে ধরা দেয় শোষকসভ্যতার অমত্মর্লীনে বহমান প্রলেতারিয়েত-উত্থানের সংকল্প।

এ তো অল্পকতেক উদাহরণ মাত্র; পুরো আলাপচারিতা জুড়েই এই বহুকৌণিক বিচ্ছুরণের বিভা। অকপট আত্মউন্মোচনের সমামত্মরালে আত্মতদমত্ম আত্মসমালোচনারও পরিসর খোলা রেখেছেন শহীদ কাদরী। তিনি মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন-নিয়মিত-সুশৃঙ্খল লেখকজীবন তৈরি করে নিতে পারলে হয়তো ভালো হতো, কিন্তু তাই বলে ‘বিরলপ্রজতা’র বিশেষণ নিজের ক্ষেত্রে মেনে নিতেও সংগত কারণেই তিনি সম্মত নন। ইলুমিনেশনস এবং সিজন ইন হেলে মতো ক্ষীণতনু কাব্যযুগলে যদি আর্তুর র্যাঁবো পৃথিবীর অমর কবিগণের সারিতে নাম লেখাতে পারেন, তবে গণ্ডায় গণ্ডায় শিল্পরহিত কাব্যের জন্মদানই সুপ্রজতার শর্ত নিশ্চয়ই নয়।

এই আলাপনে মহাযুদ্ধ-মন্বমত্মর-সাংবাদিকতা ও কবিতার দ্বন্দ্ব-মার্কসবাদ-বুর্জোয়া বিকাশ-মাইকেল মধুসূদন দত্ত-পাবলো নেরুদা-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বুদ্ধদেব বসু-জগদীশ গুপ্ত-সুকামত্ম ভট্টাচার্য-সুভাষ মুখোপাধ্যায়-শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ-সৈয়দ শামসুল হক-মঙ্গলকাব্য-গদ্যকবিতা-কবিতা পত্রিকা-রিভারভিউ ক্যাফে থেকে সাম্প্রতিকতম ঝুম্পা লাহিড়ী-অরুন্ধতী রায়েরও ছায়াপাত ঘটেছে। আলাপসঙ্গী কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত নিজেও একই সাহিত্য পরিপার্শ্ব ও অভিজ্ঞতার অংশী হওয়ায় তা প্রকৃতই প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছে।

 

তিন

বইয়ের শেষ পর্বে ‘শহীদ কাদরীর বাছাই কবিতা’ অংশে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের বাছাইকৃত শহীদ কাদরীর ৩৫টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’র মতো পাঠকপ্রিয় কবিতা থেকে শুরু করে ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’য়ের মতো অধুনাতম কবিতারও সমাবেশ ঘটেছে এখানে। এ-অংশ বইয়ে আরো প্রাণ সঞ্চার করেছে, কারণ আমরা মনে করি কবিতা বা কবিকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কবির মূল কবিতাই অবিকল্প উপায় হিসেবে কাজ করে।

এ-বইয়ে কবিকৃতির মূল্যায়ন-কবির সঙ্গে আলাপচারিতা আর কবির সুনির্বাচিত কবিতাপাঠের অমত্মরালে পাঠক যেন কবির তীব্র স্বদেশগত উচ্চারণই ধ্বনিত হতে শুনবেন চারদিকে –

আমার সংরক্ত চুম্বনের অমত্মর্লীন আগুনগুলোকে

পৌঁছে দাও শ্রাবণে আষাঢ়ে রোরুদ্যমান

বিব্রত বাংলায়,

বজ্রে বেজে, বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার।

শেয়ার করুন

Leave a Reply