জয়নুলের অন্দরের শিল্পীরা

লেখক:

মোবাশ্বির আলম মজুমদারJoynuler-ondhorer-shilphira

শিল্পাচার্যের পরিবারের আরো এগারোজন শিল্পীর শিল্পকর্মের কথা আমরা ইতিপূর্বে এতটা জানতে পারিনি। বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসের শিল্পাচার্যের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে যুক্ত হলো শিল্পাচার্য ও তাঁর পরিবারের শিল্পীদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। জয়নুল বাংলাদেশের সব পরিবারের সদস্য হয়েই বেঁচে আছেন। শিল্পকলার মানুষদের মাঝে নয়, শিল্পাচার্যের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। চল্লিশের শেষার্ধে শিল্পাচার্য এদেশের মানুষের মধ্যে সুন্দর চিন্তার বীজ রোপণ করেছিলেন ঢাকায় একটি শিল্পকলা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়ে। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এদেশের মানুষের সৌন্দর্যবোধ চর্চা আমাদের জয়নুল আবেদিনকে বারবার মনে করিয়ে দেয়। বাংলার মানুষ, নিসর্গ আর সুখ-দুঃখকে তিনি ছবি আঁকার বিষয় করেছেন। শিল্পাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র শিল্পী মিজানুর রহিম স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘বড়চাচার সঙ্গে আমরা নদীতে নৌকা চড়তে যেতাম। উদ্দেশ্য থাকত নদীতে গিয়ে নদী ও নৌকার ছবি আঁকা। কোনো কোনো দিন কিছু না এঁকেই বাড়ি ফিরতাম। তখন আমরা জানতে চাইলে বলতেন, আগে মিয়া নদীতে নৌকায় দোল খাইতে শিখো, তারপর নদীর ছবি আঁকবা।’ স্বদেশ আর নদীর কলকল-ধ্বনিকে নিজে আত্মস্থ করেই জয়নুল ছবি আঁকায় নিসর্গ তুলে ধরতেন। জয়নুল আবেদিনের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ময়মনসিংহের গ্রামীণ রূপ ছবিতে তুলে আনেন কলকাতায় অধ্যয়নকালেই। ‘দুর্ভিক্ষ ’৪৩’ চিত্র এঁকে তিনি ভারতবর্ষে খ্যাতি অর্জন করেন। দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্রগুলো ভারতবর্ষের বাইরেও শিল্পকলার ইতিহাসে স্থান করে নেয়। শিল্পকর্মের উচ্চাসনে পৌঁছানোর কারণসমূহের মাঝে তাঁর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সচেতনতা গুরুত্ব পায়। জয়নুল আবেদিন ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষের মর্মস্পর্শী মানুষ ও কুকুরের একসঙ্গে খাবার গ্রহণের মুহূর্তকে রেখাচিত্রে প্রকাশ করে সৃষ্টিতে শক্তিমত্তা দেখিয়েছেন। এ-প্রদর্শনীতে দুর্ভিক্ষ সিরিজের কয়েকটি কাজ ছাড়াও মৌলিক ১৭টি কাজ দর্শক দেখতে পাবেন। মোট প্রদর্শিত কাজের সংখ্যা ৭০টি। এ-প্রদর্শনীর সর্বকনিষ্ঠ শিল্পীর কাজ নিয়ে প্রথমে আলোচনা শুরু করা যাক। মানিজে আবেদিন জয়নুল আবেদিনের মেজ ছেলে খায়রুল আবেদিনের মেয়ে। তিনি দাদার প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। পেশাদার চিত্রশিল্পী। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া থেকে বিএফএ সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এ-প্রদর্শনীর কাজগুলো মুখাবয়বভিত্তিক। মানুষের মুখের মাঝে অভিব্যক্তি প্রস্ফুটনকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এক্সপ্রেশনিস্ট ধারার চিত্ররচনার প্রতি ঝোঁক শিল্পাচার্যের জীবনের শেষদিকের অাঁকা ছবির সঙ্গে মিল তৈরি করে। মাসুদ মিজান (১৯৭৪) শিল্পাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র মিজানুর রহিমের ছোট ছেলে। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক হন ১৯৯৬ সালে। কাতার প্রবাসী এ-শিল্পী পাহাড় ও সমতলভূমির ছন্দ এঁকেছেন তেলরঙে। তিনি প্রথাগত বাস্তবরীতি অনুসরণ করে               এ-ছবিগুলো সম্পন্ন করেছেন। আরিফ আহমেদ তনু (১৯৬৬-৮৯) শিল্পাচার্য পরিবারের সদস্য আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে। তিনি জলরঙে অাঁকা নিসর্গদৃশ্যে তুলির ছোপ-ছোপ দাগ রেখে ছবি এঁকেছেন। আরিফ আহমেদের স্বল্প শিল্পীজীবনে অাঁকা ছবিতে স্বদেশপ্রেম ও নিসর্গপ্রিয়তা প্রকাশ পেয়েছে। সামিনা নাফিস শিল্পী মিজানুর রহিমের ছোট ভাই আফজালুর রহিমের সহধর্মিণী। তিনি চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন ১৯৮৬-তে। তাঁর অাঁকা চারটি চিত্রকর্মে স্বদেশপ্রেম স্পষ্ট। শখের হাঁড়ি, শোলার তৈরি পুতুল ও হাতি ক্যানভাসে এলোমেলোভাবে সাজিয়েছেন। লোকজ আকৃতি ও সবুজ-হলুদ রঙের জমিন আবহমান বাংলার কথা জানান দেয়। আফজালুর রহিমের ছবির জমিনে বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন গাঢ় ও উষ্ণ রঙের বিভাজনে। ‘পিস অব ন্যাচার’ ও ‘টোয়াইলাইট’ শিরোনামের ছবিতে করণপদ্ধতির ঐক্য দেখা যায়। মাটির ফলকচিত্রে খেলনা হাতি আর অলংকারসমৃদ্ধ আকৃতির সমাবেশ ঘটিয়েছেন। জয়নুল আবেদিনের ছোট ছেলে মইনুল আবেদিনের পেশা পানিসম্পদ প্রকৌশলী। তিনি শখের বশে ছবি আঁকেন। এ-প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে শৌখিনতার ছাপ স্পষ্ট। শিল্পাচার্যের অাঁকা শেষ ছবি ‘টু ফেসেস’ থেকে অনুকরণ করে তিনিও এঁকেছেন ‘টু ফেসেস’। জয়নুল-প্রতিভার প্রসারিত নিদর্শন মইনুল আবেদিনের কাজে দেখা যায়। শিল্পাচার্যের বড় ও মেজ ছেলে এ-প্রদর্শনীতে কোনো কাজ প্রদর্শন করেননি। শিল্পী মিজানুর রহিম জয়নুল আবেদিনের ভাইয়ের ছেলে। ষাটের দশকে ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র থাকাকালীন শিল্পকলায় বাস্তবরীতির পাঠ নেন। জয়নুল আবেদিনের সাহচর্যে এসে তিনি নিজের সৃষ্টিকর্মে দেশজ ভাবনা উপস্থাপন করেছেন। বেলজিয়ামে ছাপচিত্র মাধ্যমে উচ্চতর অধ্যয়নের সময় আধাবিমূর্ত রীতির শিল্পসৃষ্টির ধারায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। শিল্পাচার্যের মতো মিজানুর রহিম সাংগঠনিক নেতৃত্বে দৃষ্টান্ত রেখেছেন। এ-প্রদর্শনীতে শিল্পী মিজানুর রহিমের লিথো প্রিন্ট ও দুটি চারকোলে আঁকা ফিগারের রেখাচিত্র রেখেছেন। রেখাচিত্রে সহজ-সরল রূপ প্রদর্শন করে তিনি নিজস্ব ঢং উপস্থাপন করেছেন।

নজরুল ইসলাম শিল্পাচার্য পরিবারের আরেকজন সদস্য। শিল্প-সমালোচক। কয়েকটি কাজে রেখার ব্যবহার পেশাদার শিল্পীদের মতো। ষাটের দশক থেকে শিল্পাচার্যের সাহচর্যে এসে শিল্পের সারাৎসার বুঝে নিয়েছিলেন তিনি। শিল্প সৃষ্টির রহস্য ভেদ করে নজরুল ইসলাম তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় চলে যান। শিল্পবোধের উৎসের সন্ধানে তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তাঁর এ-প্রদর্শনীর রেখাচিত্র ‘মি অ্যান্ড মোনালিসা’ কালি ও কলমে আঁকা। চারটি মুখাবয়ব পর্যায়ক্রমে মোনালিসায় রূপ নিয়েছে। মোনালিসার সঙ্গে নিজেকে এভাবেই যুক্ত করে নেন শিল্পী। আবদুর রাজ্জাক (১৯৩২-২০০৫) বিবাহসূত্রে জয়নুল আবেদিন পরিবারের সদস্য। জয়নুলের ক্লাসের সেরা ছাত্র আবদুর রাজ্জাক যুক্তরাষ্ট্রের এমএফএ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ছাপচিত্র ও ভাস্কর্য মাধ্যমে একসঙ্গে তিনি কাজ করতে থাকেন। ঢাকার অদূরে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তায় ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের শুরু তাঁর হাতেই। এ-প্রদর্শনীতে তেলরং ও ছাপচিত্র দুটি মাধ্যমেই তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়। তিনি নিসর্গের সবুজ, লাল আর নীল রং ভেদ করে দর্শককে দেখান ইম্প্রেশনিস্ট ধারার প্রকৃতি।

জুনাবুল ইসলাম ১৯৪৮-পরবর্তীকালে ঢাকা চারুকলায় জয়নুলের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে অধ্যয়ন করেন। শিল্পাচার্যের আপন ছোট ভাই কারুশিল্পের মাধ্যম বাটিকের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। বাংলাদেশে বাটিক শিল্পের প্রসার ও চর্চার জন্যে তিনি ভূমিকা রাখেন। এ-প্রদর্শনীর একটি বাটিক শিল্প ও জলরং ছবি দেখে দক্ষতা নিরূপণ করতে পারবেন দর্শক। শিল্পী শফিকুল আমিন জয়নুল আবেদিনের সতীর্থ বন্ধু, একেবারে সমবয়সী। জয়নুলের সাহচর্যে এসে তিনি বাংলাদেশের প্রকৃতির বাস্তবধর্মী ছবি এঁকেছিলেন। বাস্তবানুগ রীতিতে অাঁকা তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত হয় শীতল রং। বিষয়বস্ত্তকে স্পষ্ট করার জন্যে শফিকুল আমিনের বহিঃরেখা ব্যবহার করার অভ্যাস কাজে স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। এ-প্রদর্শনীর কাজে জয়নুল পরিবারের সদস্যদের শিল্পসৃষ্টির সঙ্গে ব্যক্তিপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে দর্শকদের বুঝতে সুবিধা হয়, শিল্পাচার্যের সঙ্গে শিল্পীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র। শিল্পাচার্যের আঁকা শিল্পকর্মের মধ্যে অতিচেনা ছবিগুলোর সঙ্গে শিল্পীজীবনের সর্বশেষ আঁকা ছবিটিও প্রদর্শিত হচ্ছে। ছবির শিরোনাম ‘টু ফেসেস’ একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মুখ।

এ-ছবিটি আঁকার উদ্যোক্তা শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বলেন, ‘মৃত্যুর দুদিন আগে শিল্পাচার্যের কাছে টিভি ক্যামেরা ও কাগজ-তুলি নিয়ে গেলাম। শিল্পাচার্যকে আঁকতে বলতেই তিনি কিছু সময় থমকে থেকে কালো রঙে তুলি ডুবিয়ে মুহূর্তেই দুটি মুখ এঁকে দিলেন। তখন মনে হলো, এইসব তরুণ মুখই গড়ে তুলবে আগামীর বাংলাদেশ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মাটি আর মানুষের কথা ক্যানভাসে তুলে আনতেন, এ-প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ আমাদের সে-কথাই স্মরণ করায়। বাঙালির প্রতিটি পরিবারের একজন সদস্য হয়ে শিল্পাচার্য এভাবেই বেঁচে থাকবেন।’ গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ১১ জানুয়ারি ২০১৪। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply