টানটান

লেখক:

আনোয়ারা সৈয়দ হক

ভালো করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না আর। সবকিছু কেমন একটা রহস্যময় নিস্তব্ধতার ভেতরে ডুবে আছে। এই নিস্তব্ধতার ভেতরেও ভয়াবহ একটা কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। লম্বা, টানা, এলোপাতাড়ি, বিদঘুটে একটা কিছু। আকাশের রঙের ভেতরেও এখন এমন কিছু অচেনা রং মিশেছে যে, আকাশটাকেও যেন আর ঠিকমতো চিনে ওঠা যায় না। এই কি আমাদের চিরপরিচিত আকাশ? এরকম প্রশ্ন জাগে মনে। আর চাঁদ? সেটারও অবয়ব একেকদিন একেকরকম। কোনোদিন সে একটা ঝুলে থাকা পানির ফোঁটার মতো, আবার কোনোদিন চায়ের একটা ট্রের মতো চৌকো। আবার কখনো বা সে অপূর্ব কিছু! তখন সেদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ভয় করে। মনে হয়, এতো ভালো তো কখনো ভালো নয়!

আজ আবার চারদিকে ঘন কালো অন্ধকার। এমন এক অন্ধকার যে মনে হয়, এই আকাশে কোনোদিন কি চাঁদ উঠেছিল? কোনোদিন কি ঝুলে ছিল তারা?

এসব কীভাবে হয়?

জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে নানা কথা ভাবে মাহমুদা।

এরকম সব ভাবনা কি শুধু মাহমুদার মনের ভেতরে ওঠে, শুধু তার আয়ত চোখেই কি এসব ভাবনা  বিহবলতার ছায়া ফেলে? নাকি দেশের প্রতিটি মানুষের চোখই এখন মাহমুদার চোখের মতো? মানুষের যে চোখে একদিন স্বপ্ন ছিল সে-চোখে এখন কেবলই এক ধরনের বিহবলতা। সেই বিহবলতা কখনো একটা আশার রূপরেখা নিয়ে  উঁকি দেয়, আবার কখনো বা একেবারে ঘোর অমানিশার ভেতরে ডুবে যায়, আবার সেই

একই চোখে কখনোবা পৃথিবী তার যাবতীয় কর্মকান্ডসমেত এবং সেইসঙ্গে নভোমন্ডলের সবকিছু একটা দূর, অজানা, অবাস্তব বস্ত্তপুঞ্জের মতো বড়  দ্রুতবেগে সমুদ্রের গর্ভের দিকে হয় তাড়িত।

তারপর এক বিক্ষুব্ধতার ভেতরে সবকিছুর যেন সমাপ্তি।

এ যেন এক ক্রমাগত বিক্ষুব্ধ রক্তক্ষরণ। ক্রমাগত ভেঙে ভেঙে গড়িয়ে পড়া। ক্রমাগত বাস্তব এবং অবাস্তবতার ভেতরে আছাড়ি-পিছাড়ি।  এ  যেন এক নিজের ভেতরে  নিজেকে লুকিয়ে রাখার সাধনা।

এখন চারদিকে, প্রকৃতির প্রতিটি অবয়বের ভেতরে এক ধরনের আর্তি ফুটে উঠেছে। সেই আর্তি ক্রমাগত যেন বলে চলেছে,  পালাও, পালাও,  পালাও, সব পালিয়ে যাও।  স্মৃতি থেকে পালাও, সংসার থেকে পালাও,  দেশ থেকে পালাও, না পালালে তোমার অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে।

কিন্তু  কোথায় পালাবে মানুষ, কীভাবে?  আর কতদূর? আর এই রকম অবস্থায়?

এখন দিন কি রাত কি, সব সময়ই একসময়। একই তাদের চেহারা। একই তাদের ধরন। একই তাদের বিলাপ। এবং বিলাপবাক্য।

কিন্তু এই বিলাপ নিঃশব্দ। এ বিলাপে গাছের পাতাও নড়ে না। পানিতে ওঠে না ঢেউ। স্তব্ধ হয় না বাতাস। চোখের পানিও পড়ে না। কারণ এখন পানি ফেলতে গেলেও আবেগের দরকার হয়। মানুষের হৃদয় এখন আবেগহীন এক অস্তিত্বের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এটা হচ্ছে বেঁচে থাকার প্রশ্ন। এখন যে যত বেশি চতুর, যত বেশি বুদ্ধিমান, যত বেশি করিতকর্মা, যত বেশি আপসকামী সে-ই বেঁচে থাকবে।

মাহমুদা নীরবে তাকিয়ে থাকে। ওই যেদিক থেকে নিঃশব্দতার ঘেরাটোপে পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখা।  নিকষ কালো আকাশের গায়ে আগুনের লেলিহান। ওই ধোঁয়া ও শিখা নীরবে বলে দিচ্ছে মানুষের বর্তমান ইতিহাস। মানুষের অস্তিত্ব নিধনের ইতিহাস।

এতসব অত্যাচারের ভেতরেও এ-পাড়ার মানুষের মুখে কোনো শব্দ নেই। এ-পাড়ার মানুষেরা জানে, শব্দ করা মানেই মৃত্যু। শব্দ মানেই বেয়নেট, মানে গুলি, মানে জবাই, মানেই ধর্ষণ। শব্দ করা চলবে না।  কক্ষনো নয়। সব চেপে রাখতে হবে বুকের ভেতরে। আর যদি চাপতে না পারে, তাহলে হাত ধরে চলে যেতে হবে তাদের। কখনো আর্মির কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, কখনো মাটির গর্তে, কখনো চক্ষুহীন অবস্থায় রায়েরবাজারে।

আজ মাহমুদার মা বারবার এ-ঘর ও-ঘর করছেন। তার ভেতরটা অস্থিরতায় ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছেন না। বারবার করে তিনি মাহমুদার ঘরে এসে ঢুকছেন। মেয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকছেন, তারপর আবার নীরবেই বেরিয়ে যাচ্ছেন ঘর ছেড়ে।

আজ সেই সকাল ১১টার দিকে মাহমুদার বাবা মনসুর আলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মাহমুদার জন্যে সিট ভাড়া করতে গেছেন।  কিন্তু এখন পর্যন্ত বাড়ি ফিরে আসেননি। এখন রাত প্রায় ১০টা বাজতে চলেছে। মায়ের মুখের দিকে ইচ্ছে করে তাকাচ্ছে না এখন মাহমুদা। কী বলবে সে মাকে? কী বলে সান্ত্বনা দেবে?

পরশুদিন এ-পাড়ায় একটা তান্ডব ঘটে গেছে। রাত ১২টার পরপরই বাইশ নম্বর বাড়িতে হামলা। বুটের লাথি, মুখখিস্তি, গর্জন, পৈশাচিক হাসি।

তারপর টেনেহিঁচড়ে বাড়ির মেয়েদের জিপে তোলা। আর তাদের বুকফাটা আর্তনাদ।  তাদের সে-আর্তনাদে কি পৃথিবী দুভাগ হয়েছিল?  মাটির বুক ফুঁড়ে উঠেছিল কি অশ্রুর উষ্ণ প্রস্রবণ? না। কোনো বাড়ির বন্ধ দরজা কি খুলে গিয়েছিল?  বেরিয়ে  এসেছিল কি কেউ প্রতিবাদ জানাতে? না। বরং আরো নিগূঢ়ভাবে বন্ধ হয়েছিল দরজা। আরো নিস্তব্ধ হয়েছিল সবকিছু।

অথবা কেউ কি হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে লাফিয়ে পড়েছিল রাস্তায়? না।

মৃত্যুর মুখে কে কার? আমরা সকলেই একা।

তারও এক সপ্তাহ আগে এ-পাড়ার জোয়ান ছেলেগুলোকে ধরে নিয়েছিল। তাদের ভেতরে কেউ ছিল হিন্দু, আর বেশিরভাগ মুসলমান।

সেদিন পাড়ায় মাতম উঠেছিল একটা। তারপর সব চুপ। এমন চুপ যে, মনে হলো পৃথিবী যেন সবেমাত্র জন্ম নিয়ে আকাশে ঝুলেছে!

মাহমুদার বাবা নীরবে কাঁদতে-কাঁদতে বলেছিলেন, বুঝলি রে মা, আর কিছুদিন এরকম গেলে এদেশে আর একটাও যুবক ছেলের নিশানা থাকবে না। আমাদের বাঙালির ঝাড়বংশ এরা নির্মূল করে ছাড়বে। নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর এরকম অত্যাচার? খোদা বলে কি কোথাও কেউ আছে?

আর পরশু দিন যখন পাড়ার মেয়েদের টেনেহিঁচড়ে জিপে তুলে নিয়ে গেল, মাহমুদার মা তখন তড়িঘড়ি করে মাহমুদার ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে মাহমুদার দিকে অদ্ভুত চোখ করে তাকিয়ে ছিলেন।

মায়ের তাকানো দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল সেদিন মাহমুদা।

শুকনো চোখে বলেছিল, আমাকে রেখেই তোমরা চলে যাও।

এ কি বলছিস, রুমি? মা আঁতকে উঠে বলেছিলেন।

ঠিক বলছি। আমি একা থাকতে পারবো। আমার ভয় করবে না।

এ অসম্ভব।  মাহমুদাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিলেন মা।

মাহমুদা বলে চলল, আমি জানি, তোমরা আমার জন্যে এখান থেকে সরে যেতে পারছ না। কিন্তু আমার মনে এখনো সাহস আছে। তোমরা তো জানো, ছেলেবেলা থেকে আমি ডানপিটে, একরোখা। সারাজীবন গার্লস গাইড করেছি। খেলাধুলো করেছি। এজন্যে কত বকা খেয়েছি তোমার কাছে। এখন যদি আমার এরকম অবস্থা না হতো, আমি নিশ্চয় মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্যে প্রস্ত্তত হতাম।  কিন্তু এখন এ-অবস্থায় আমি কোথাও যেতে পারবো না।  তাছাড়া বেলাল –

কথা শেষ করতে পারল না মাহমুদা। হঠাৎ চোখে পানি চলে এলো তার। অথচ এতো সহজে তার চোখ অশ্রুপ্লাবিত হয় না।

মেয়ের কথা শুনে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন রাফিয়া। বললেন, মা, এসব কথা ভেবে এখন মন খারাপ করিস নে। এ-পাড়ার সকলেই যে যার মতো চলে গেছে। শুধু আমরা আর দু-একটা ঘর যেতে পারিনি। নিচের তলায় সৌম্যেরা যেতে পারেনি। বলছে, যা কপালে থাকে তাই হবে।

রাফিয়া ঠিক বলেছিলেন। নিচের তলার সৌম্যেরা যেতে পারেনি। তাদের অনেক ধরনের বাধা আছে। বিশেষ করে সৌম্যের জন্যে।

সৌম্যের মা মাঝে মাঝে ওপরে ওঠেন। রাফিয়ার সঙ্গে গল্প করার জন্যে। দেশের অবস্থার জন্যে বিলাপ করতে। কবে যে দেশটা এসব মনহুসদের হাত থেকে মুক্তি পাবে বলেন তো রাফিয়া?

রাফিয়া তার উত্তর জানেন না দেখে আপনমনে বলেন, আপনার মেয়েটি ঠিক এই বিপদের সময়ই অন্তঃসত্ত্বা হলো। এখন গ্রামের অবস্থা এতো খারাপ যে, গর্ভবতী মেয়েরাও নাকি রক্ষা পাচ্ছে না।  গর্ভবতী মেয়েদেরও তারা চিরে ফেলছে পেট। তারপর বেয়নেটের আগায় বাচ্চাটাকে ঝুলিয়ে –

চুপ, চুপ, বলে ওঠেন তখন রাফিয়া। সৌম্যের মায়ের কথা শুনে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। ঘন ঘন মাহমুদার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকান।

সৌম্যের মা বাধা পেয়ে কথা ঘুরিয়ে বলেন, বনে-জঙ্গলে তাই আজকাল গর্ভবতী মেয়েদের লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। কেউ, কেউ জঙ্গলের ভেতরে প্রসব করছে, কেউ ধানক্ষেতে, কেউ কচুরিপানার ভেতরে,  কেউ আবার গরুর খাটালে রাখা গোবরের নাদায়। শুনলাম একটি মেয়ে নাকি কালভার্টের  নিচে প্রসব করেছিল আর শেয়ালে  এসে বাচ্চাটাকে মুখে তুলে নিয়ে চলে গেছে। প্রসবের পর মাটা নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল। কী সাংঘাতিক কথা বলেন দেখি?

সৌম্যের মা ফিসফিস করে এইসব কথা রাফিয়াকে বলেন আর রাফিয়া ভয়ে মরে যান।

 

মায়ের কথা শুনে  অনেকক্ষণ মাহমুদা চুপ করে থেকে বলেছিল, আর তুমি যদি আমাকে ছেড়ে না-ই যাও, তাহলে বাবাকে অন্তত বলো এখান থেকে সরে যেতে। আমাদের চেয়ে তো বাবার জীবনের মূল্য বেশি, মা।

সেদিন মেয়ের কথার কোনো উত্তর দিতে পারেননি রাফিয়া।  কারণ তিনি জানেন, এ-অবস্থায় মেয়েকে ফেলে তিনি বা মনসুর সাহেব কোথাও যাবেন না। তাতে যদি মৃত্যু হয়, তবু ভালো। তবে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তার গর্ভবতী মেয়েটিকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে। কথা ছিল বাইশ তারিখের রাতেই তারা একজনের সহায়তায় এ-পাড়া ছেড়ে চলে যাবেন, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি।  তার আগেই –

 

এ-পাড়াটা অনেকটা নিরাপদ ভেবেছিলেন মনসুর সাহেব। কারণ এ-পাড়ায় খ্রিষ্টান কিছু অধিবাসী আছে। তারা বর্তমানে গলায় লম্বা, লম্বা ক্রুশ ঝুলিয়ে বাইরে বেরোয়। যেন তারা বুঝে গেছে এই তান্ডব শুধু হিন্দু আর মুসলমানের প্রতি। এতে খ্রিষ্টানদের কোনো ভাগ নেই। যেন তারা অন্য কোনো গ্রহের অধিবাসী। এখানে শুধু কিছুদিনের জন্যে বাস করতে এসেছে। যেন তারা বাঙালি হয়েও বাঙালি নয়! যেন এদেশ তাদের দেশ নয়! তারা আলগা হয়ে অবস্থান করছে মাত্র। আশ্চর্য, একটি ধর্ম কি মানুষকে এভাবে নিরাপত্তা দিতে পারে? নাকি এর পেছনেও আছে রাজনৈতিক কোনো কারণ। নাকি পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ধর্ম খ্রিষ্টান হওয়ার জন্যে এবং তাদের হাতে বিশ্বরাজনীতির দাবার চাল কুক্ষিগত করে রাখার জন্যে তৃতীয় বিশ্বের কারো সাহস নেই তাদের ধর্মাবলম্বীদের ঘাঁটায়?  বাঙালি হলেও তাদের সাত খুন মাফ? মনসুর সাহেব জানেন, বিগত কয়েক মাসে অনেক হিন্দু কমিউনিটির মানুষ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। অনেকে রাজাকারদের প্ররোচনায় গ্রহণ করেছে ইসলাম। প্রাণের নিরাপত্তার জন্যে আর কি তারা বর্তমানে করতে পারত?

কিন্তু না, এই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পাড়াটিও তাদের জন্যে আর নিরাপদ নয়। এখানে মিলিশিয়াদের দাপট বেশি। বেশিরভাগই বিহারি মিলিশিয়া। মাঝে মাঝে বাঙালি রাজাকার। তারাই রাতের বেলা টেনে নিয়ে আসে পাকিস্তানি হানাদারদের। দিন এবং রাত  সর্বক্ষণ তারা এ-পাড়াটিকে পাহারায় রাখে। মাঝে মাঝে কোনো বাড়িতে ঢুকে হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে যায়। আচমকা কোনো তরুণী মেয়ে চোখে পড়ে গেলে আঁচল ধরে টানাটানি করে। কোনো তরুণী মেয়ে মিলিশিয়াদের চলার পথে পারতপক্ষে যাতায়াত করে না। শহরের সব তরুণী মেয়ে যেন রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। বিগত কয়েক মাস ধরেই তারা উধাও। তবু স্কুল বা কলেজ কিছু কিছু চলছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষাও নাকি হয়েছে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কারা সেই ম্যাট্রিক পরীক্ষায় শামিল হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না।

পৃথিবীর ম্যাপে রাতারাতি বাংলাদেশ বলে যে রাষ্ট্রটির আবির্ভাব ঘটেছে তাকে বর্তমানে  বাঁচিয়ে রাখাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে কঠিন এক কাজ। হাজার বছরের পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ থাকা বাংলা মায়ের এ এক আচমকা স্বপ্ন – প্রসব, এই স্বাধীনতা।

বাঙালি এই সোনার খন্ডটিকে  নিয়ে কীভাবে যে নিরাপদে একে বাঁচিয়ে রাখবে তারই জন্যে সংগ্রাম করে চলেছে। দেশের আজ  এমন কোনো সচেতন মানুষ নেই যে, দেশের এই সংকট সময়ে বসে আছে চুপ করে। দেশের ভেতরে বসে যেমন তারা কাজ করছে; দেশের বাইরে, সীমান্তের ওপারে, এমনকি বিশ্বে যেখানে যত বাঙালি আছে সকলেই একযোগে কাজ করে চলেছে স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে পৃথিবীর বুকে গৌরবের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

এই দেশটি বেঁচে থাকার ওপরে বাঙালি জাতির আজ বেঁচে থাকা।

এ-কথা সকলেই এখন জানে।

কিন্তু ঠিক এই সময়েই মাহমুদা গর্ভবতী। তার নড়াচড়া করারও এখন ক্ষমতা নেই।

মনসুর সাহেবের মতো ইতিহাসের ছাত্রী মাহমুদাও ঘরে বসে বসে কত কথা যে ভাবে। দেশের কথা ভাবে। সমাজের কথা ভাবে। নিজের অল্পদিনের দাম্পত্য জীবনের কথাও ভাবে। ভার্সিটি পড়ার সময়ই বেলালের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। তারপর প্রেম। তারপর বিয়ে।

একবার বিয়ের আগে বেলালের সঙ্গে খুব রাগারাগি হয়েছিল তার। বেলালকে বিয়ে করবে না মনস্থির করেছিল। আর সে-খবর বন্ধুদের মুখে পেয়ে ক্যাম্পাসে সারাদিন গলায় একটা বোর্ড ঝুলিয়ে ঘুরেছিল বেলাল। বোর্ডে লেখা ছিল, আমি ‘রু’কে ভালোবাসি।

বোর্ডে সেই লেখা পড়ে বন্ধুরা মুখ-চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। রু বলে তাদের আশেপাশে কেউ ছিল না। কারণ মাহমুদার ডাকনাম যে রুমি কেউ জানত না। পরে জানতে পেরে সকলের সে কী মাতামাতি আর হাসিঠাট্টা। তারা রুমিকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিল তাদের কাছে। তারপর বেলালের কাছে সোপর্দ করেছিল।  সেদিন বন্ধুদের মধুদার ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে আপ্যায়ন করতে হয়েছিল বেলালকে।

এই বাসাটা ভাড়াবাসা। আগে মনসুর সাহেব তার পরিবার নিয়ে রাজারবাগের কাছে থাকতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জায়গাটা বিপজ্জনক বলে এদিকে চলে এসেছেন। মনসুর সাহেবের এই একটি মাত্র মেয়ে, মাহমুদা। আরেকটি ছেলে আছে, সে বর্তমানে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়ে আছে। এখন সেখানে থাকাটাই মনে হয় অনেকটা নিরাপদ। সেই ছেলের খবরও তিনি ঠিকমতো বলতে পারবেন না। শুধু বেঁচে আছে – এটুকুই জানেন। কিন্তু মেয়ের জামাইকে  নিয়ে তার আরো অশান্তি। জামাই কাজি বেলাল হোসেন চট্টগ্রামের জেটিতে চাকরিরত অবস্থায় ছিল সাতাশে মার্চ। সেইদিন কারবালা নেমে এসেছিল চট্টগ্রামে। তার আগে থেকেই অবশ্য বাঙালি নিধন চলছিল। মানুষজনের ভেতরে একধরনের হতবুদ্ধিভাব কাজ করছিল। এখনকার মতো স্পষ্ট তখন সবকিছু ছিল না। কারণ তখনো, মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত আলোচনা চলছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর। কিন্তু পঁচিশে মার্চ রাতে সব হতবুদ্ধি ভাব কেটে গেল। শাদা এবং কালোয় বিভক্ত হয়ে গেল সবকিছু। তারপরও বাঙালি সৈন্যদের ঠিকমতো দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি  কেউ।  তাই এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে বাঙালি সৈন্যরা অস্ত্র খালাস করতে গিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাকর্তার নির্দেশে। সেদিন ছিল সাতাশে মার্চ। সেদিন একশরও বেশি বাঙালি সৈন্যদের সাহায্যে এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করা হয়। ভারী ভারী সব অস্ত্র। তখনো কেউ জানত না এসব অস্ত্র বাঙালিদের নিধন করার জন্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে। অস্ত্র খালাস করার পর ক্লান্ত, অভুক্ত, সরলমনা, বাঙালি সৈন্যদের জেটির প্লাটফরমে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো।

মাহমুদা তখন ঢাকায়। কিন্তু পরে সবকিছু জানতে পেরেছিল সে। তার চোখের সামনে যেন সিনেমার মতো ভেসে উঠত ছবিটা। আর ভেসে উঠলেই তার ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যেত। ওইদিন  কি বেলালও ছিল সেই জেটিতে? থাকবে না-ই বা কেন।  সেখানেই তো তার অফিস। রোজ সকালে সেখানেই তো সে যেত কাজ করতে। পোর্ট অফিসার হিসেবে।

 

এই ঘটনার পর মনসুর সাহেব চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে কর্মরত তার জামাইয়ের খবরও আর পাননি। তখন সে কোথায় ছিল, অফিসে নাকি বাইরে, সে-কথাটাও আজ পর্যন্ত বলতে পারেনি কেউ। এসব কথা তার মেয়ে মাহমুদাকে এখনো বলতে পারেননি তিনি। মেয়ে তার গর্ভবতী। কত আনন্দিত হয়েছিলেন প্রথমে মেয়ের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবরটা পেয়ে। কিন্তু এখন মন থেকে সব আনন্দ মুছে গেছে। তাকে এখন এসব কথা বলা যাবে না। যতদূর সম্ভব গোপন রাখতে হবে। তাকে বলা হয়েছে, বেলাল পালিয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি কোনো জায়গায়, নিরাপদ কোনো স্থানে। সুযোগমতো যোগাযোগ করবে।

কিন্তু আজ চার মাস হতে চলল, কোনো খবর নেই।

তবে মাহমুদা কি কিছু বুঝতে পারে না? মাহমুদা কি এতোই নিরেট। সে সব বুঝতে পারে। আবার যেন কোনো কোনো সময় কিছুই বুঝতে পারে না। বুঝতে চায় না। মায়ের কাছে বেলালের প্রশংসা করে। তার দুষ্টুমির গল্প করে। এমনভাবে করে যেন চারপাশে সবকিছু ঠিক আছে। সবকিছু ঠিকমতো চলছে। দেশে যে একটা মুক্তিযুদ্ধ চলছে আর সেইসঙ্গে চলছে বাঙালিকে জাতি হিসেবে নির্মূল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র, এটা যেন মাহমুদা তার মাথাতেই আনতে চায় না।

অথবা হয়তো জানে।  সকলের অগোচরে জানে। মনের ভেতরে যে-মন, সেই মনের কাছে গভীর দুঃখের কথাটা গুনগুন করে বলে সে। তারপর গোপনে শোকের বিলাপ তোলে। আবার হয়তো আশান্বিতও হয়। এমনকি পৃথিবীতে ঘটেনি যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পরে ঘরের মানুষ ঘরে ফিরে এসেছে? এ-পৃথিবীতে এ পর্যন্ত কি কম যুদ্ধ হয়েছে? একেক যুদ্ধ একেক রকম।

মনসুর সাহেবও অনুভব করেন তার মেয়ে হয়তো সবই জানে এবং বোঝে। কারণ মেয়ে তার বুদ্ধিমতী। কিন্তু আশ্চর্য মেয়েটির সহ্যশক্তি। সে চুপ করে সারাদিন ঘরে বসে থাকে। টেলিভিশন দেখে না, খবরের কাগজ পড়ে না,  রাতের বেলা গোপনে রেডিও শোনে না, শুধু চুপ করে জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে।  সেই জানালা দিয়ে সে কতদূরই বা আকাশ দেখতে পায়, কারণ গলির ওপাশেই তো অন্য বাড়ির দেয়াল। দৃষ্টি ছড়ানোর আগেই আটকে যায় দেয়ালে।

রাফিয়া একবার থাকতে না পেরে জামাইয়ের কথা তুলতে গিয়েছিলেন, তখন মাহমুদা হাত তুলে বলেছিল, তার কথা বলতে হবে না মা। আমি জানি।

সেদিন মেয়ের কথা শুনে আর হাত নাড়ানোর ভঙ্গি দেখে রাফিয়া আর মনসুর সাহেব দুজনে গোপনে খুব কেঁদেছিলেন।

মাহমুদা বাবা-মায়ের এইসব গোপনতা জানে। সে তো বেলালকে  ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, করেনি? তাহলে বেলালের ভালোমন্দ সে জানবে না, তা কী করে হয়? তার অস্তিত্বের কোথায় বেলাল খোঁড়ল খুঁড়ে বসে আছে, তা কি এই পৃথিবীর আর কেউ জানে?

না।

বিগত আটমাস ধরে মাহমুদার শরীরে যে-পরিবর্তন ঘটে চলেছে তার খবর তো জানে মাহমুদা। সেই অচেনা প্রাণটি তো এই দুর্যোগে পৃথিবীতে আসবে বলে স্থির করেছে। অথবা অন্তরীক্ষে বসে কেউ স্থির করেছে তার আর বেলালের অনাগত সন্তানটি দেশের এই দুর্যোগকালে জন্মগ্রহণ করবে। মৃত্যুর যক্ষপুরীতে সে ঝান্ডা উড়িয়ে নিয়ে আসবে জীবনের জয়ধ্বজা। নইলে যে মাহমুদা ও বেলাল বিয়ের পরপরই বাচ্চা নেবে না বলে মনস্থির করেছিল, সেই প্ল্যান সব ভেস্তে গেল কী করে? গত বছরের অক্টোবরে বিয়ের পর থেকে তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেল কী করে। সে আর বেলাল তো এজন্যে একেবারে প্রস্ত্তত ছিল না।

যখন সে টের পেল গর্ভবতী, তখন মাহমুদার ভেতরে একটা ভাঙচুর শুরু হয়েছিল। সে এতো তাড়াতাড়ি মা হতে চায়নি। সংসার শুরু হওয়ার আগে তার কিছু স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নগুলো তখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে সে মানতে না পারলেও বেলাল সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, এটা একদিক থেকে তো ভালোই হলো রুমি, তাড়াতাড়ি করে আমাদের বাচ্চা বড় হয়ে যাবে, আমাদের চোখের সামনে সে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে পড়বে। আমাদেরকে সে তখন উলটো দেখাশোনা করবে। খুব ভালো হবে, রুমি সোনা। আমরা তার ওপর সংসারের দায়িত্ব ছেড়ে তখন শুধু ঘুরে বেড়াবো। নেপালে যাবো, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঢুঁ মারবো। দেখতে যাবো মানস সরোবর।  পাহাড়ের ওপরে উঠে যাবো তুমি আর আমি। কত বড় একটা দেশ ভারত। সারাজীবন ধরে ঘুরলেও দেখা শেষ হবে না। তারপর আমরা যাবো ইংল্যান্ড। সেখানে আমাদের ছেলে বা মেয়েকে পড়তে পাঠাবো। তাকে দেখার অজুহাতে আমরা যাবো ইংল্যান্ড। তারপর আমরা যাবো ব্যাংকক, মালয়েশিয়া, জাপান। তারপর আমরা যাবো চীন দেশে। কুন্মিং বলে একটা জায়গা আছে চীনে, জানো? সেখানে আছে শুধু পাথর দিয়ে তৈরি এক পাথর অরণ্য। নাম স্টোন  ফরেস্ট। সে নাকি একটা দেখার মতো জিনিস, আমার এক চাচা একবার সেখানে ব্যবসা উপলক্ষে গিয়েছিলেন।

রাতের বেলা বিছানায় বেলালের হাতের ওপর মাথা রেখে এইসব স্বপ্নের কথা শুনত মাহমুদা। বেলাল ভ্রমণকাহিনি পড়তে খুব ভালোবাসত। কত মোটা মোটা বই পড়ত সে ভ্রমণের। ইংরেজিতে লেখা বই। জানত হয়তো কোনোদিন সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে না, তাতে কী। স্বপ্ন দেখতে দোষ কী?

মাহমুদার কথা ছিল, সে বাচ্চা হওয়ার পরপরই বেলালের কর্মস্থলে চলে যাবে। যাওয়ার সময় মা-বাবাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। বেলালের কর্মস্থলে একটা বাড়ি ভাড়া নেবে তারা। সেখানেই সংসার শুরু করবে দুজনে। বিয়ের পর তো তারা দুজনে একসঙ্গে সংসার করারই সুযোগ পায়নি।

তারপর বাচ্চা একটু বড় হলে স্থানীয় কোনো স্কুলে চাকরি নেবে সে।

বেলালের মা ছিলেন না। বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন। সেই সংসার নিয়ে তিনি খুব ব্যস্ত থাকতেন। তবু বেলালের বিয়ের সময় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক খরচ করে বড় ছেলেকে বিয়ে  দিয়েছিলেন। বেলালের বাবাকেও তাই খুব ভালোবাসত মাহমুদা।

কিন্তু গত বছর বিয়ে হওয়ার আগে থেকেই তো দেশে একটার পর একটা ঝামেলা লেগে থাকল। ঊনসত্তরের ঘূর্ণিঝড়। উহ্,              সে-কথা ভাবলে এখনো মাহমুদার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এগারোই নভেম্বর সেই ঘূর্ণিঝড়ে মানুষ, গরু সব মরে গাছে ঝুলে-ঝুলে ছিল। উপকূলে, উপকূলে হাহাকার পড়ে গেল। তারপর হলো দেশে সাধারণ নির্বাচন।  বঙ্গবন্ধুর নৌকায় পড়ল দেশের সমস্ত বাঙালির ভোট। সেটাও একটা উত্তাল সময়ের ভেতর দিয়ে। তারপর শুরু হলো বিজয়ী প্রার্থীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা। শুধু আলোচনা আর আলোচনা। আলোচনা যেন আর শেষ হয় না। এতোসব বাহানার আলোচনায় দেশের মানুষের ভেতর শুরু হয়ে গেল অস্থিরতা। এতো অস্থিরতা এতো বছর কোথায় লুকিয়েছিল?  বাঙালির স্বপ্নের জগতে জেগে উঠল স্বাধীনতার স্পৃহা। পুরনো ধ্যান-ধারণা সব দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়তে লাগল। ঘণ্টাধ্বনি বাজতে লাগল বাঙালির ঘরে-ঘরে। ওঠো বাঙালি, জাগো বাঙালি, অস্ত্র হাতে তুলে নাও বাঙালি। দেশ স্বাধীন করো বাঙালি।

ঘুমন্ত বাঘ যেন আড়মোড়া খেতে খেতে উঠে বসল।

এখন ভাবলে মনে হয় যেন সব গল্পকথা।

তারপর তো শুরু হলো এই।

আর এদিকে, এরকম অসময়ে, নির্বাচন, ভোট, ডামাডোল, অস্থিরতা, বাগ্বিতন্ডা, সবকিছুর ভেতরে, ব্যক্তিগত সব প্রোগ্রাম ভন্ডুল করে দিয়ে মাহমুদা হলো গর্ভবতী।

নতুন একটি প্রাণের অঙ্কুর যেন মাহমুদার প্রায় অজ্ঞাতেই তার পেলব শরীরে ঠাঁই নিল, বড় নীরবে, বড় নিভৃতে, যেন বড় চতুরতার সঙ্গে।

উত্তাল দেশ, উত্তাল সময়, উত্তাল দেশের মানুষ। আর মাহমুদার শরীরও উত্তাল। পৃথিবীতে এত অযুত সময় থাকতে মাহমুদার শরীরও এই সংকট সময়ে উত্তাল। দিনের পর দিন যেন বড় প্রদীপ্ত উদ্দামতায় বড় হতে লাগল মাহমুদার গর্ভ। যেন এ-গর্ভ আকাশ ছোঁবে!  যেন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় জন্ম নেবে এই বাঙালি           সন্তান। মাহমুদার সন্তান।

মাহমুদা সংকোচে যেন আজকাল বাবা-মায়ের চোখের সামনে দাঁড়াতে পারে না। কারণ তাকে ঢাকায় রেখে বেলাল তার কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেছে।

 

পঁচিশে মার্চ রাত থেকে শুরু হলো গণহত্যা। রাজারবাগের কাছেই ছিল তখন তাদের বাসা। সারারাত আতঙ্কে কেটেছিল তাদের। তারপরও মহান সেই স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুটা তারা ছাদের কার্নিসে লুকিয়ে বসে দেখল।

পঁচিশে মার্চ সারারাত আর ছাবিবশে মার্চ বিকেল চারটে পর্যন্ত পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেল রাজারবাগ পুলিশদের। সাতশো পুলিশ প্রাণ বিসর্জন দিলেন।  তিনশো আত্মসমর্পণ করলেন। কিছু অস্ত্র ফেলে            ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লেন, আবার অস্ত্র জোগাড় করে যুদ্ধ করবেন বলে। আর সেদিনই মনসুর সাহেব প্রাণপণে চেয়েছিলেন মাহমুদাকে জামাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু সম্ভব ছিল না। সমস্ত দেশের টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও  জামাইয়ের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করে উঠতে পারলেন না।

কিন্তু ভাগ্যিস মেয়েকে তিনি পাঠাননি। তার একদিন পরেই তো বেলালের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। যদি তার লাশ  নদীতেও ভেসে উঠত, তাহলেও না-হয় ভালো ছিল। মনসুর সাহেব জানতেন বেলাল মারা গেছে। অনিশ্চয়তার চেয়ে নিশ্চিত হওয়া ভালো, তাহলে ভবিষ্যতের কিছু পরিকল্পনা করা যায়।

মাহমুদা এতসব কিছু জানে না। জীবন এখন তার কাছে বহতা নদীর মতো। যেমন যেভাবে চলছে চলুক। তার শরীরের ভেতরে আত্মগোপন করে যে বসে আছে, সে প্রতিনিয়তই তার অস্থিরতা জ্ঞাপন করে চলেছে। সে এই পৃথিবীতে আসতে চায়। সে এক অন্ধকুঠুরিতে গোপনে বসে থাকতে অনিচ্ছুক। সে মাহমুদার কাছে যেন প্রতিমুহূর্তে বার্তা  দিয়ে চলেছে, আমি এই আসছি মা।  আমি এই এলাম বলে। আর মাহমুদার তখন বুকের ভেতরে আবেগ চেপে রেখে বলতে ইচ্ছে করে, কেন তুই এই অসময় বেছে নিলি বাছা? এখন যে সারাদেশ কাঁদছে। এখন যে আমরা স্বজন-হারানো শোকের ভেতরে দিন যাপন করছি, এখন যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতরে নিক্ষিপ্ত হয়ে আছি। তুই এলে আমি তো তোকে হাসিমুখে বুকে তুলে নিতে পারবো না!

কিন্তু এসব কথা মাহমুদার মনের ভেতরে গুঞ্জন করে ফেরে। আর কাউকে কিছু বলতে পারে না। কাকেই বা বলবে? বেলাল? বেলালকে কী বলবে? বেলাল যেখানে আছে, সেখান থেকে কি মাহমুদার এই আর্তি শুনতে পারবে? মাহমুদা কি আর জানে না বেলাল তাকে ছেড়ে  কতদূরে  চলে গেছে! একদিন বেলাল  হাসতে- হাসতে বলেছিল, তুমি আর আমি একদিন একটা ভেলায় চড়ে সাগরে ভাসবো, যেমন নুলিয়া বাচ্চাগুলো ভাসে, ঠিক তেমনি। নদী আর সমুদ্র আমার কী যে ভালো লাগে। আর সেজন্যেই তো চট্টগ্রাম পোর্টের এ-চাকরিটা আমি ইচ্ছে করে নিয়েছি।

আর মাহমুদা সেদিন সমুদ্র ভয় পায় বলে আর্তনাদ করে উঠে বলেছিল, না, না, না। আমার ভয় করে!

মাহমুদার ভয় দেখে হাসতে-হাসতে বেলাল বলেছিল, এই বুঝি ডানপিটে মেয়ের কথা হলো?

বাহ্, হবে না? তুমি জানো আমার ওয়াটার ফোবিয়া আছে?

তাই? অবাক হয়েছিল তার কথা শুনে বেলাল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলেছিল, জলাতঙ্ক আর ওয়াটার ফোবিয়া কি এক?

আজ যদি বেলাল তাকে এই কথা বলত তাহলে মাহমুদা বলে উঠত, তাই হবে বেলু, আমি আর তুমি সমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে ঘুরে বেড়াবো। বর্তমানে যে জীবনের ভেতর দিয়ে চলেছি, এর চেয়ে সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো কত যে সুখের।

বেলাল, বেলালের কাছে কত যে না বলা কথা থেকে গেল মাহমুদার।

 

এই ঘরে তিনটে জানালা। প্রতিটা জানালা খুব শক্ত করে বন্ধ করা আছে যেন ভেতর থেকে কোনো শব্দ বাইরে কারো কানে না যায়।  জানালায় মোটা কাপড়ের পর্দাটানা আছে, যেন আলোর শিখা কোনোক্রমেই বাইরের পরিবেশে তার অস্তিত্ব জানান দিতে না পারে।

 

আজকাল রাতগুলো মাহমুদার কাছে বিভীষিকা বলে মনে হয়। আজকের রাতটা আরও বেশি। কারণ আজ মনসুর সাহেব ঢাকা মেডিক্যালে মাহমুদাকে ভর্তি করাবার জন্যে সিট খুঁজতে  গিয়েছিলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত ফিরে আসেননি। যে-ডাক্তারটি মাহমুদাকে  পরীক্ষা করত মাঝে মাঝে, সে-ই বলেছিল দু-একদিন আগেই যেন মাহমুদাকে মেডিক্যালে ভর্তি করে দেওয়া হয়।

রাফিয়া স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দুপুর বসে থেকে এখন ফিট লেগেছেন। মাহমুদা নিজেই মায়ের মাথায় পানি ঢেলে মাকে জাগিয়ে তুলেছে।

পাশের বাসার লোকমান সাহেব খবর পেয়ে গোপনে দেখা করতে এসেছিলেন। বলে গেছেন তিনি কাল সকালেই বাইরে বেরিয়ে যেভাবে হোক খবর নিয়ে আসবেন। হয়তো এমন হতে পারে, রাস্তায় কোনো গন্ডগোল দেখে তিনি কোনো আত্মীয়বাসায় রাত কাটাচ্ছেন।

সকলের বাসায় তো টেলিফোন নেই।

মেডিক্যাল কলেজটাও তো এখান থেকে দূর কম নয়।

বিছানায় কাত হয়ে পড়ে থাকতে থাকতে মাহমুদা ভাবল, আচ্ছা, আজ এই মুহূর্তে আমাদের এই বাংলায় কত মেয়ে গর্ভবতী হয়েছে আমার মতো? তারা সব কোথায় কীভাবে আছে? কীভাবে তারা বাচ্চা প্রসব করছে? কীভাবে বহন করছে প্রসব-বেদনা? কীভাবে তারা ভরাগর্ভ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলার বনবাদাড়, নদীনালা,  কচুরিপানা, গরুর খাটাল আর কালভার্ট? আর সেইসব বাচ্চা যদি কোনোদিন জীবন্ত অবস্থায় এদেশে বড় হয়ে ওঠে, এবং তখনো যদি চলে এই মুক্তিযুদ্ধ, তাহলে একদিন তারাও কি দেশজুড়ে এক হানাদার বাহিনীর এতোসব অত্যাচারের, অন্যায়ের, অবিচারের বদলা নেবে?

তাদের মায়ের, বোনের অপমানের বিচার করবে? নিয়ে যাবে তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে?

নাকি সব মাফ করে দেবে?

তারা কি হবে দেশপ্রেমিক? নাকি হবে নপুংশক রাজাকার?

এইসব কথা কি ইতিহাসে কোনোদিন লেখা থাকবে? নাকি থাকবে না?

 

এতসব ভাবনার ভেতরেই, হায়, আমার বাবা কোথায় গেল? বাবা আজ কেন বাড়ি ফিরে আসছে না? বাবাও কি হারিয়ে যাবে  আমার বেলালের মতো? মাতম করে উঠল সে গোপনে।

মাহমুদার অর্ধচেতন শরীরে এখন যেন নানা ধরনের বিলাপ পাকিয়ে উঠতে লাগল।

আর ঠিক সেই সময়ে শরীর তার হঠাৎ মোচড়  দিয়ে উঠল। তলপেটে অসহ্য টনটনে ভাব। কে যেন সেখানে খামচি মেরে ধরেছে। অথচ আজ তার প্রসবের তারিখ নয়। আরো কিছুদিন বাকি আছে। নাকি আজই সে আসবে চলে পৃথিবীতে? নাকি সে আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়?

ব্যথায়, যন্ত্রণায়, আক্ষেপে যেন এই মুহূর্তে প্রাণটা বেরিয়ে যাবে তার। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মেঝেয় শুয়ে পড়ল মাহমুদা।  গড়িয়ে যেতে লাগল এমুড়ো থেকে ওমুড়ো। আবার উঠে বসল মাটিতে।  আর্তনাদ করতে লাগল। কিন্তু না, বাইরে  তার আর্তনাদ পৌঁছবে না। সে মুখ টিপে ধরল নিজের।

পাশের ঘরে রাফিয়া তখনো অর্ধচেতনের মতো পড়ে আছেন। মেয়ের আর্তচিৎকারে তিনি বিছানায় উঠে বসে কোনো রকমে চলে এলেন মাহমুদার ঘরে।

মাহমুদার পেট থেকে গলগল করে এবার তরল পদার্থ বেরোচ্ছে।  রক্ত, নাকি পানি?  মাহমুদা কি প্রাণে বাঁচবে?  মনে হচ্ছে যেন এখুনি এপার অথবা ওপার। যেন এখুনি এমন কিছু ঘটবে যার জন্যে মাহমুদা এই মুহূর্তে প্রস্ত্তত নয়। অথবা প্রস্ত্ততও। এখন সবকিছু যেন সবকিছুর জন্যে প্রস্ত্তত, আবার কোনোকিছু যেন কোনোকিছুর জন্যে প্রস্ত্তত নয়!  তবে মাহমুদা হাল ছেড়ে দেবে না। সে হাল ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নয়।

হামাগুড়ি দিয়ে সে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল, আকাশটা কালির দোয়াতের মতো। আকাশ এতো কালো কেন? এতো কালি আকাশ কোথায় পেল? আগুনের লেলিহান শিখাটাই বা কোথায়? নাকি সবকিছু এখন ছাই? ভাবল সে। আরো ভাবল,  একটা মাত্র চাঁদের অভাবে আকাশটা কি এরকম কালো হতে পারে? এরকম ভয়াবহ রকমের কালো? তাহলে তারাদের কাজ কী? তারারাইবা আজ কোথায়? এতো কালোর ভেতরে আমি কীভাবে জন্ম দেবো নতুন কিছুর। পৃথিবীটা এর আগে যে চোখে দেখেনি,  সেই সোনার তাল আমার মানিকটিকে আমি এই অন্ধকারের ভেতরে কেনইবা জন্ম দেবো?  সে তো অন্ধকারের জীব নয়, সে হলো এই বাংলার আলোকিত এক সম্ভাবনার উদিত সূর্য।

সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই এখন, এই অসময়ে, এই কালোর ভেতরেই জন্ম নেবে। কিন্তু তার জন্মের মুহূর্তটি সে ভরে দেবে অপার্থিব এক আলোয়।

সে এ-পৃথিবীর অন্ধকার চোখে দেখতে আসেনি। সে আলোর শিশু হয়ে আসছে।

 

কিন্তু এখন অবস্থা দেখে বুক ফেটে গেল তার। সে হন্যে হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল। আধো অন্ধকারে হারিকেনের  টিমটিমে আলোয় এদিকে কী নাচে? ওদিকে কী নাচে? কুয়াশার মতো সবকিছু যেন আড়ালে চলে যাচ্ছে এখন। এখন তার চারদিকে যেন বড়-বড় মাকড়সা জাল বুনে ফেলছে বড় দ্রুততার সঙ্গে।  সেই জালে যেন আটকে যাচ্ছে মাহমুদার হাত-পা। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। চোখ বড়-বড় হয়ে যাচ্ছে। চোখের পর্দায় রক্তের ফোঁটা জমে যাচ্ছে। একটার পর একটা ফোঁটা জমে যাচ্ছে। অচিরেই চোখ দুটো যেন রক্তাক্ত হয়ে যাবে তার।

এখন বাবাকে চায় মাহমুদা। সেই যে ছেলেবেলায় যখন  অন্ধকার ভয় পেত মাহমুদা, তখন সে বাবা, বাবা বলে ডুকরে কেঁদে উঠত আর তখুনি বাবা বলে উঠতেন, এই যে আমি, মামণি। বোকা মেয়ে, ভয় পেতে হয় নাকি? অন্ধকারকে কী ভয় পেতে হয়? অন্ধকারই তো আলো দেখলে পালিয়ে যায়।

আমার বাবাটা এখন কোথায়?

বাবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠল মাহমুদা।

আমার বাবাটা কোথায়? হায়, আমার বাবা, আমার জনক, আমার প্রতিপালক।

বলতে বলতে সে গড়াগড়ি খেতে লাগল মেঝেয়। পরমুহূর্তে স্বামীর কথা মনে পড়ল। আর বেলাল, বেলাল কোথায়? বেলাল, তুমি কোথায়? তুমি কোথায় আমার প্রেম? আমি তোমাকে এখন কাছে চাই। আর যদি দেখা না হয়? আমাদের আর যদি দেখা না হয়?

মাহমুদার বিলাপিত শরীর গোপনে যেন শোকগাঁথা বুনে চলল।

 

রাফিয়া এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। কিন্তু মেয়ের অবস্থা দেখে তার মাথা ঘুরে গেল। এখন, এ-অবস্থায়?  রাফিয়া তো বাচ্চা প্রসবের বিশেষ কিছু জানেন না। মেয়ের ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে বসে ক্রন্দনরত হয়ে তার গায়ে হাত বোলাতে লাগলেন। পরে ঝটিতি উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন। মুখে চেঁচিয়ে বললেন, সৌম্য, সৌম্য।

তার ডাক শুনে সৌম্য নামের মানুষটি দরজা খুলে দাঁড়াল। সৌম্যের একটি পা ট্রেনে কাটা গেছে বহুদিন আগে। সে হাঁটতে পারে না। বয়স তার তিরিশের মতো। তবু ক্রাচে ভর দিয়ে দরজা খুলল সে। নিচু গলায় বলল, বলেন আন্টি।

তোমার মাকে একটু ওপরে পাঠাবে সৌম্য? মাহমুদার মনে হয় প্রসবব্যথা উঠেছে, বাবা।

একটু পরেই খুব নিঃশব্দে সৌম্যের মা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন।

মাহমুদা তখন একটা ঘোরের ভেতরে। ব্যথায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে সে এখন। কিন্তু মুখে তার কোনো ভাষা নেই।  মনে হচ্ছে যেন এভাবেই সে গহিন সমুদ্র পাড়ি  দিতে পারবে। পাড়ি তাকে দিতেই হবে। সে পড়ে থাকবে না এখানে। এখানে শুধু রাতের আধিক্য। মাহমুদা চলে  যাবে সেই দেশে যেখানে শুধু আলো আর আলো। যেখানে শকুন নেই, আছে মাছরাঙা পাখি।  রক্ত নেই, আছে রক্তরাঙা শিমুল।  রাত নেই আছে প্রভাতের  আগমনী বার্তা। এখানে মাহমুদার বড় কষ্ট। প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার মতো কষ্ট। এই কষ্ট বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না মাহমুদা। মাহমুদা এবার মরে যাবে। বেলালকে আরেকবার চোখে না দেখেই মরে যাবে সে।

মাহমুদার গলা চিরে এবার আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, আহ্।

রাফিয়া তার কাছে বসে গায়ে হাত দিয়ে কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন, খুব কি কষ্ট হচ্ছে মা?

হ্যাঁ। বলে উঠল মাহমুদা। কিন্তু মুখে কোনো বিলাপের শব্দ তুলল না।

সৌম্যের মা মাহমুদার পায়ের কাছে বসে পড়ে বললেন, দেখি মেয়ে, আমাকে একটু দেখতে দাও।

না। বলে উঠল মাহমুদা।

লজ্জা করে না মা, বললেন সৌম্যের মা।

না, না।

এখন লজ্জা করার সময় নয়, মাহমুদা। আমাকে দেখতে দাও।

 

ততক্ষণে মেঝেয়  হাত-পা ছড়িয়ে ফেলেছে মাহমুদা। দুই হাত দুই দিকে, দুই পা দুই দিকে। তারা গোল হয়ে ঘুরছে। যেন প্রদক্ষিণ করছে চারদিক। সবদিকেই কিছু না কিছু করার আছে। সবদিকেই আছে কোনো না কোনো  কাজ।  সেগুলো যেন শুধু খুঁজে বের করতে হবে।

সৌম্যের মা বলে উঠলেন, আল্লাকে ডাকো, মা। তিনি তোমাকে সহ্যশক্তি দেবেন। এতো রাতে তোমাকে তো কোথাও নেওয়া যাবে না। কিন্তু আমি এসব কাজ মোটামুটি জানি, অসুবিধে হবে না। শুধু তুমি আল্লাকে ডাকো,  তিনি এক জান থেকে দুই জান করনেঅলা।

আ-ল্-লা-হ্। হঠাৎ যেন খলখল করে হেসে উঠল মাহমুদা। চমকে দূরে সরে গেলেন সৌম্যের মা। চমকে উঠলেন রাফিয়াও।  মাহমুদার চেহারা এখন অন্যরকম। ঘরের হারিকেনের আলোয় চুলগুলো তার উড়ুখুড়ু হয়ে মুখের চারপাশে ঝুলে ছড়িয়ে পড়েছে।  কেউটে সাপের বাচচার মতো দেখতে হয়েছে তারা। চোখ দুটো বেরিয়ে পড়েছে কোটর ছেড়ে। পরনের শাড়ি সে ছেড়ে ফেলেছে অনেক আগেই। এ-সময় শরীর কোনো ভার নিতে রাজি নয়। শুধু  দলামোচড়া পেটিকোট আর জামায় তাকে মনে হচ্ছে কোনো ভিনদেশের মানুষ। অচেনা, কিছুটা যেন ভীতিকর। যেন দরজা খুলেই সে ছুটে যাবে বাইরে। এইখানে সে পড়ে থাকবে না। যেন দোজখের এ-আবদ্ধতা তার নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়। সে এখন জন্ম দেবে নতুন কিছুর। সে এখন কারো কথাই শুনবে না। কারো আশ্বাস সে মানবে না। এখন যা কিছু হবে তার ভেতরে থেকেই হবে। এখন তার সঙ্গী হবে তার মতো সব মেয়ে। বাংলার মেয়েরা। তাদের স্বামীরা সব যুদ্ধে গেছে, কেউ বা হারিয়ে গেছে, কিন্তু যাওয়ার আগে তারা তাদের নারীদের গর্ভবতী করে গেছে।  মাহমুদার মতো তাদের রমণীরাও এখন জন্ম দেবে শিশুর। জন্ম দেবে নতুন, নতুন সব শিশু;  যেসব শিশু একদিন হবে তরুণ এবং হবে তারা দেশরক্ষার প্রহরী, হবে তারা মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার। পানির ট্যাংকে, কালভার্টের নিচে, নৌকোর পাটাতনে, খালে-বিলে, নালায়, জলাশয়ে, কচুরিপানার ভেতরে একভাবে জন্ম দিয়ে চলবে বাংলার নারী। যতবার হানাদার নিশ্চিহ্ন করবে বাংলার তরুণ, ততবার নতুন করে জন্ম দেবে বাংলার এসব মা। সেসব সন্তান হবে নতুন সব মুক্তিযোদ্ধা। এই দেশ কোনোদিনও তারুণ্যের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে না। তারা বড় হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। প্রতিদিন নতুন, নতুন জন্ম  হবে তাদের।  জন্ম, জন্ম। নতুন। একেবারে আনকোরা।

বাংলার মা বন্ধ্যত্ব কাকে বলে জানে না।

আ-ল্-লা-হ্! বলে খলখলিয়ে উঠল মাহমুদা আবারও। কোথায় আ-ল্-লা, চাচি? কোথায় আ-ল্-লা? আ-ল্-লা!

এ কি হাসি, নাকি বিদ্রূপ? এ কি হাসি, নাকি কান্না?

হঠাৎ নিচে শোরগোল  উঠেছে। এখন সবকিছুই হঠাৎ করে। সবকিছুই আচমকা, যেন অলঙ্ঘনীয়ভাবে আচমকা। নিচে কান্নার রোল উঠেছে। গুলির শব্দ উঠেছে। বুটজুতোর লাথি পড়ছে দরজায়।  দরজা ভেঙে পড়ছে অলঙ্ঘনীয়ভাবে। কিন্তু মাহমুদার এখন কোনোদিকেই খেয়াল নেই। সে আর এখন ভীত নয়। সে এখন সেই গার্লস গাইডের মাহমুদা। ঝুঁটিবাঁধা, ডানপিটে, একরোখা, টানটান।

সে এখন জননী হতে চলেছে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার