তাবিজনামা

লেখক:

রাশেদ রহমান

আমাদের বয়স কম, গ্রামে কতকিছু ঘটে; দিনেও ঘটে, রাতেও ঘটে; আমরা ওসব দেখেও দেখি না, কানেও তুলি না। ওসব দেখার বা শোনার সময় কই আমাদের! আমরা সাঁঝবেলা মা কিংবা দাদির বকুনি খেয়ে ঘরে না-ফেরা পর্যন্ত, সারাদিনমান ভীষণ ব্যস্ত থাকি। ডাংগুলি খেলা, বনে-বাদাড়ে রাজঘুঘুর বাসা খুঁজে বেড়ানো কিংবা দিগম্বর               হয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া; সাঁতার কেটে যমুনার চরে যাওয়া, সেখানে বালিহাঁসের ডিম           খোঁজা – এসব নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, কোনো কোনোদিন খাওয়া-দাওয়ার কথাও মনে থাকে না। তো, ডাংগুলি খেলতে খেলতে কিংবা ঘুঘুর বাসা খুঁজতে খুঁজতে নদীতে সূর্য

ডুবতে দেখলে মনে হয়, দিন এত ছোট কেন? আহা রে! এখনই ঘরে ফিরতে হবে…!

আমরা দিগম্বর হয়ে নদীতে নামি – তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের বয়স পাঁচ-সাতের মধ্যে। আমার বয়স বারো, নীলুর তেরো, রবির এগারো; আমাদের আরো বন্ধু – সবার বয়সই, এই এগারো-বারো-তেরো হবে আর কি। আমি মন্ডলবাড়ির ছেলে, বালকদিগের সর্দার; একমাত্র আমিই ন্যাংটো হই না, হাফপ্যান্ট পরেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমার আরো দু-তিনটে প্যান্ট আছে, বাকি সবাই প্যান্ট খুলে নামে, ওদের যে একটি করেই প্যান্ট! পরনের প্যান্ট ভেজালে পরে পরবে কী? তাছাড়া আমরা চরের ছেলে তো, ভর কিংবা শহরের ছেলেদের মতো লজ্জা-শরম নাই…।

তো, আমাদের সকাল-দুপুর-বিকাল ভালোই কাটে। গ্রামে যা-ই ঘটুক – যমুনায় নতুন জেগে ওঠা চরে দখল নিয়ে খুনোখুনি, মামলা-মোকদ্দমা; নদীতে গরুর নৌকায় ডাকাতি – এসব আমাদের গ্রামে প্রায়ই ঘটে, এটা বড়দের ব্যাপার; আমরা এসবে কান দিই না। কিন্তু সেদিন রবির কথাটি কানে তুলতেই হলো…।

– খবর শুইনেছিস জহির…?

– কী শুনেক?

– মরিয়মবিবির প্যাটে নাকি বাচ্চা…!

– বলিস কী? কে কইলে…?

– রাস্তাঘাটে কান পাতি থাক। দ্যাখ, সবেই কয়…।

এ কী খবর শুনিলাম! এটা শোনার মতো কোনো কথা হলো? আমাদের বয়স কম হলেও বুঝি – এটা বড়োই পাপপূর্ণ কাজ। শোনাও পাপ, দেখাও পাপ। কার দ্বারা ঘটল এই পাপপূর্ণ কাজ, কে জানে! বয়স আমাদের যতই কম হোক, এটা তো বুঝি –  পুরুষ মানুষ ছাড়া নারীর পেটে বাচ্চা আসার কোনো সুযোগ নাই। মানুষ তো মানুষ, পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে – কুত্তা, বিলাই, গরু, ছাগল, বাঘ, ভালুক – এমনকি সাপ-খোপ-পাখি পর্যন্ত – নারী আর পুরুষ একসঙ্গে মিলিত না হলে নারীটার পেটে বাচ্চা আসে না। একাকী বাচ্চা জন্ম দেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাহলে মরিয়মবিবির পুরুষটা কে…?

আমাদের মাথায় গোলমাল পাকাতে শুরু করে। আমরা ডাংগুলি-বাটুলি গুটিয়ে হাঁটতে থাকি। গন্তব্য নবাপাগলার মাজার। গ্রামের মধ্যে ওখানেই যা একটু ঝোপজঙ্গলের মতো আছে।  গাছ-গাছালির ছায়া আছে। আমরা কড়ইতলায় বসব। এরকম একটা সাংঘাতিক খবরের চাপে বেদিশা অবস্থা আমাদের, যেন নবাপাগলার মাজারে যেসব জোনার থাকে; তাদেরই কেউ আমাদের ওপর ভর করেছে; এখন মাথা ঠান্ডা করা দরকার…।

নবাপাগলার মাজারে, মাজার ঘিরে বড় বড় তিনটি কড়ইগাছ, ঘন ছায়া। কড়ইতলায় বসলে মাথা ঠান্ডা হবে। কড়ইতলা যেতে যেতে নবাপাগলার গল্প খানিকটা বলি – যদি আপনারা শোনেন…।

এটা জানা কথা, নবাপাগলার গল্প বলতে গেলে – শুরুতেই যে-প্রশণটি ওঠে, তা গল্প আমি বা অন্য কেউ বলুক – কে এই নবাপাগলা? নবাপাগলার যে-গল্প আমরা বলি, সবই তো শোনা কথা। গ্রামের কেউ কোনোদিন তাকে দেখেনি। আমার দাদা গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ, বয়স একশর কাছাকাছি, সে-ও নাকি নবাপাগলাকে দেখেনি…।

গল্পটি শুনলে আপনাদের মনে হবে, এটি একটি গাঁজাখুরি গল্প। চরের কোনো গ্রামই একশ বছর টিকে থাকে না। যমুনার খিদে পেলে কাকে রেখে কাকে খায়, ঠিক নাই। আমার দাদা জিদই থেকে আফজালপুর এসেছে। জিদই চরের অনেকদিনের পুরনো গ্রাম ছিল – এখন তার চিহ্নটুকুও নাই…।

তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক – নবাপাগলার বাড়ি কোথায় ছিল? সে কি আফজালপুরের মানুষ? জিদইর আগেই কি আফজালপুরে জনবসতি গড়ে ওঠে? দাদা যেবার আফজালপুরে এলো তার আগেই কি মৃত্যু হয় নবাপাগলার? দাদাকে জিজ্ঞেস করতে হবে…।

তবে কেউ কেউ বলে, দাদাও বলে – সবারই শোনা কথা, মহাস্থানগড়ের বাসিন্দা ছিল নবাপাগলা। বুজুর্গ পীর। তার হাতের ইশারায় নাকি নদীর স্রোত থেমে যেত, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত পানি; সেই স্থির পানির ওপর দিয়ে হেঁটে নদী পার হতো নবাপাগলা। একবার যমুনার ক্ষুধা এতটাই তীব্র হলো যে, ক্ষুধার জ্বালায় বাঘের মতো হিংস্র হয়ে উঠল গঙ্গার এই কুমারী ষোড়শী, তারপর যা হওয়ার তাই, গ্রামের পর গ্রাম যমুনা গ্রাস করতে লাগল; তখন এক পূর্ণিমারাতে নদীর পারে এসে দাঁড়াল এক জ্যোতির্ময়-পুরুষ, দশাসই তার চেহারা; নদীর পারে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বলল, ‘যমুনা তুই থাম, যমুনা তুই থেমে যা, এখনই না থামলে আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন…।’

যমুনার ভাঙন থেমে গেল। বেঁচে গেল আফজালপুর গ্রাম। যেটুকু ছিল গ্রাম আর ভাঙেনি। সেই জ্যোতির্ময়-পুরুষই নাকি আমাদের নবাপাগলা। কেউ কেউ তো বলে – সেই রাতে, সেই জ্যোতির্ময়-পুরুষের পরনে কোনো কাপড়-চোপড় ছিল না। শরীর থেকে বিদ্যুচ্চমকের মতো ঠিকরে পড়ছিল আলো…।

আপনারা কেউ, নবাপাগলার যে-গল্প আপনাদের শোনালাম, বিশবাস করুন বা না-ই করুন আমরা কিন্তু বিশ্বাস করি। চরের সব মানুষই বিশ্বাস করে। ভাদ্র-পূর্ণিমায় ওরস হয় নবাপাগলার। মানুষের ঢল নামে সেদিন মাজারে…।

কড়ইতলায় বসে রবিকে জিজ্ঞেস করলাম – কথাটি কি ঠিক, মরিয়মবিবির পেটে বাচ্চা আসিছে? তুই কার কাছে শুনিছিস…?

– কইলাম তো রাস্তাঘাটে কান পাতি থাক…।

রবি মাঝেমধ্যে অদ্ভুত ঢঙে কথা বলে। এই যে এখন,      যেরকম বলল। রাস্তাঘাটে কান পেতে থাকলে নাকি জানা যাবে, সবাই বলবে – মরিয়মবিবির পেটে বাচ্চা এসেছে…।

– তুই কি নিজের চোখে দেইখেছিস…?

– আমাগোর কামের বেটি মতির মা দেইখিছে। সে রাষ্ট্র কইরেছে বাড়িতে। তাছাড়া মেয়েলোকের পেটে বাচ্চা আসিলে তা ঢাইকে রাখার জিনিস না…।

তাও ঠিক, মেয়েলোকের পেটে কেন শুধু, বিড়ালের পেটে, কুত্তার পেটে বাচচা এলেও ঢেকে রাখা যায় না। আকাশে চাঁদ উঠলে সবার চোখেই পড়ে। আর মতির মা যখন দেখেছে, ঘটনা মিথ্যা হওয়ার সুযোগ নাই; কাজের বেটিদের চোখ বড় ধুরন্ধর। নজর এড়ায় না কিছুই…।

কিন্তু পুরুষ মানুষটি কে…?

আমার বালক-মাথা এলোমেলো হওয়ার জোগাড়। মরিয়মবিবির মতো একজন ছিটগ্রস্ত মেয়েমানুষ, যার গলাভর্তি তাবিজ, দুই বাজুভর্তি তাবিজ; যে-কিনা আমাদের মতো বালকদের পথে-ঘাটে দেখলেই – ‘এই নাতুর পোলা, তুই আমারে বিয়া কইরবি?’ বলে আর খিলখিল করে হাসে;                     তার করোটিতে নাকি একটা বদ-জিন আস্তানা গেড়েছে;              বদ-জিনটারই কাজ নয় তো এটা…?

হতে পারে…।

মরিয়মবিবির যখন আমাদের মতো বয়স ছিল, অর্থাৎ সেই কিশোরীকালেই নাকি জিনটা তার পিছু নিয়েছে। রূপসী মেয়ে দেখলে বদ-জিনদের হুঁশ-জ্ঞান থাকে না, দাদি প্রায়ই বলে…।

রূপবতী মেয়েমানুষ মরিয়মবিবি – তাতে কোনো সন্দেহ নাই। বলা ভালো, তার মতো রূপবতী নারী, পাগল হলে কী হবে – আমাদের চরে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। গলা-বাজুর তাবিজে ঝমঝম শব্দ তুলে মরিয়মবিবি যখন দুপুরবেলা গাঁয়ের পথে হাঁটে – দুপুরে তাকে পায়ে শেকল বেঁধেও ঘরে রাখা যায় না, তখন মনে হয় ইমান আলীর বিধবা মেয়ে মরিয়মবিবি নয় – পথ কাঁপিয়ে হাঁটছে শাজাদপুর শহরের বড় ঘরের কোনো বউ…।

আমাদের চরে, দু-চার ঘর বাদে, বাকিরা কেউ ঠিকমতো খেতে পায় না – এই খবর তো আপনাদের কারো অজানা নাই। বাড়ির পুরুষ মানুষের পাতে যাওবা কিছু পড়ে – মেয়েদের পাতে পড়ে যৎসামান্য। অল্প খেতে খেতে শরীর শুকিয়ে পাটকাঠির মতো সরু হয়ে গেলে, শরীরের রূপ-লাবণ্য সব ঝরে পড়ে। মরিয়মবিবির শরীরও পাটকাঠির মতো সরু, কিন্তু আমরা অবাক চোখে দেখি; তার শরীরের রূপলাবণ্য ঝরে পড়েনি, দূর থেকেও বোঝা যায় – মরিয়মবিবির শরীরে সোনালু ফুল ফুটে আছে…।

মরিয়মবিবির পুরনো গল্প গাঁয়ের সবারই জানা – সময়ে-অসময়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এখন সে একটা নতুন গল্পের জন্ম দেবে। নতুন গল্পটি শোনার জন্য আমরা প্রস্ত্তত। তার আগে, তার পুরনো গল্পটি আপনাদের শোনাই…।

আলীপুর বিয়ে হয়েছিল মরিয়মবিবির। তখনো সে শুধুই মরিয়ম – মরিয়মবিবি হয়নি। চরের মেয়েরা বিয়ের পর বিবি হয়। মরিয়মের বয়স তখন বারো কি তেরো – আমরা তখন শিশু। পরে, বোঝার বয়স হলে, আফজালপুরের পথে-ঘাটে এই গল্প শুনেছি। যা হোক, বারো-তেরোর মরিয়ম বসল বিয়ের পিঁড়িতে। চরের সব মেয়েরই অল্প বয়সে বিয়ে হয়। সরকারের আইনকানুন চর-গ্রামে খাটে কম, তাছাড়া মরিয়ম তো রূপবতী, তার টান বেশি। আলীপুরের রমজান শেখ তার ছোট ছেলে আলালের জন্য টেনেই নেয় মরিয়মকে…।

আলাল মরিয়মের দ্বিগুণ বয়সী, কেউ কেউ বলে দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ ত্রিশের কাছাকাছি বয়স আলালের। এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী, আমরা শুনেছি তার নাম ছিল আলেয়া, সে বেঁচে নাই। আলেয়া বেঁচে থাকলে আমাদের মরিয়মবিবির গল্প অন্যরকম হতে পারত। সে থাক, গল্প যেভাবে সৃজিত হওয়ার কথা, সেভাবেই হয়। আলেয়া নাকি আত্মহত্যা করেছিল। তার নাকি প্রচন্ড পেটের ব্যথা ছিল, কোনো তাবিজ-কবজ, এমনকি নবাপাগলার মাজারে মানত দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। পেটের ব্যথা সইতে না পেরেই গলায় ফাঁস দিয়ে সে আত্মহত্যা করে। এই গল্প রমজান শেখের বাড়ির লোকেরা করত। কিন্তু আমরা শুনেছি অন্য গল্প। আফজালপুর আর আলীপুর পাশাপাশি গ্রাম। কোনো গ্রামের কোনো গল্পই অপ্রকাশিত থাকে না। গল্প বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আমরা বুঝদার হওয়ার পর আমাদের কানে আসে –  আলেয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে গলা টিপে খুন করে বাড়ির পেছনে শেওড়া গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। বাড়ির সবাই মিলে কাজটি করে। আলেয়ার বিয়ের সময় বিশ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার কথা হয়। ওর গরিব বাবা বিয়ের দুবছরেও সব টাকা দিতে পারেনি জামাইকে। এ নিয়ে আলেয়ার ওপর লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শেষ ছিল না। আলাল মাঝেমধ্যেই আলেয়ার শরীরে জ্বলন্ত বিড়ি ঠেসে ধরত। একদিন বিড়ির আগুন আলেয়ার পিঠে ঠেসে ধরতেই সজোরে সে আলালের অন্ডকোষ চেপে ধরে। ‘ও মা গো, ও বাবা গো – আমারে মাইরে ফেইললো গো’ – বলে চিৎকার শুরু করে আলাল। আলেয়াও ভয় পেয়ে দ্রুত ছেড়ে দেয় অন্ডকোষ। আর কিছুক্ষণ চেপে ধরে থাকলে আলালের অক্কা পেতে দেরি হতো না। বাড়ির লোকজন জড়ো হয় উঠোনে। ‘বেহায়া, বেতমিজ! মাইয়ে লোকের এতো বড়ো সাহস? স্বামীর বিঁচি চাইপে ধরে…!’ রাগে থরথর করে কাঁপে আলেয়ার শ্বশুর রমজান শেখ। সেই রাতেই…।

আলেয়ার এই গল্প শুনে আমরা কিন্তু বেশ মজা পেয়েছি। দারুণ সাহস ছিল বেটির…। তবে, খুন যে হলো আলেয়া – এ নিয়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়নি। রমজান শেখ আলীপুরের মাতববর ছুনু ব্যাপারী, আনজু শেখ, কিতাব আলীকে কিনে ফেলে। তারাই আলেয়ার বাবাকে ভয় দেখায় – ‘মাইয়ে শড়া গাছে ঝুইলে মইরছে, মিছামিছি মামলা কইরতে যাইবে ক্যান? পুলিশ তো চিন না? তারা তোমারেই ধইরবে। তাছাড়া কালিহাতী থানা কতদূর – সে কি তুমি জানো? যমুনার ওপার, ধলেশ্বরীর ওপার। থানার পথঘাটই তোমরা খুঁইজে পাবে না…।’

গরিব মানুষের ভয় বেশি, সাহস কম। আলেয়ার বাবা থানায় যাওয়ার চিন্তা বাদ রেখে কাঁদতে বসে…।

আসলে, অপঘাতে মৃত্যু কিংবা খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে আলেয়াবিবির গল্পের সমাপ্তি ঘটে। বছরখানেক পরে মরিয়মবিবির গল্পের শুরু। তবে মরিয়মের গল্প অন্যরকম। বাসররাতেই সৃজিত হয় সেই গল্প…।

তখনো বাসরঘরে ঢোকেনি আলাল, বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসেছে; তারা শুয়ে পড়ার আগেই ঘরে ঢুকলে কেমন দেখায় না? বারবাড়ি বাঁশের মাচায় বসে ঘনঘন বিড়ি টানে সে…।

রাত বাড়ে। আস্তে আস্তে সব ঘরের কুপিবাতি নিভে গেলে আলাল ঘরে ঢোকে। ভীতসন্ত্রস্ত মরিয়মবিবি চৌকির এককোনায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। শব্দহীন কান্না। আলাল ঘরের দরজা বন্ধ করে মরিয়মবিবিকে ধাক্কা মারে – ‘এই মরিয়ম, ঘুমাইয়ে পইড়েছিস নাকি? আয়, তর মুখখানা ভালো কইরে দেখি…।’

হরিণশাবক বাঘের চোখে পড়লে যেরকম চমকে ওঠে, মরিয়মও তেমনি চমকে উঠল। তার চোখের মণি যেন বেরিয়ে আসছে কোটর থেকে। ভীত-বিহবল চোখে আলালের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনে আমার ধর্মের বাপ। বাপ হইয়ে মাইয়ের ক্ষতি কইরবেন না…।’

আলালের মাথায় কেউ যেন সজোরে মুগুর মারল। ‘কয় কি শালি? আমি অর বাপ! জীবনে হুনি নাই – বাসররাইতে ঘরের বউ স্বামীরে বাপ ডাহে…।’

আলাল মরিয়মের মুখ উঁচু করে ধরে – ‘এইডে তুই কী কইলি মরিয়ম…?’

এতক্ষণে শব্দ করে কাঁদে মরিয়মবিবি – ‘যা সত্যি তাই কইছি। আপনে আমার ধর্মের বাপ…।’

মরিয়মের গালে ঠাস করে চড় মারে আলাল – ‘চুপ কর শালি। ভঙ্গি করনের ভুঁই পাস না…?’

চড় মেরেই মরিয়মের ঠোঁটে কামড় বসায় আলাল। তারপর মরিয়মের ব্লাউজের বোতাম খোলে, শাড়ি-ছায়া খোলে; তারপর ঘোড়ার মতো সওয়ার হয় মরিয়মের ওপর। মরিয়ম ‘ও মা-গো’ বলে চিৎকার করে, আলাল একহাতে মুখ চেপে ধরে মরিয়মবিবির…।

বাড়ির নতুন বউ – ভোরবেলা গোসল করতে হয় – এটাই রীতি। বাড়ির কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই মরিয়মবিবি চট-ছালা-কলাপাতায় ঘেরা গোসলখানায় ঢোকে। কোমরে প্রচন্ড  ব্যথা, যেন সাপে কেটেছে, দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন। দুই ঊরু বেয়ে রক্ত ঝরছে, গোসলের পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে রক্ত। পানি লাল। মরিয়মবিবির মনে পড়ছে অসহ্য আতঙ্কময় রাতের কথা, আলাল শেখের পাগলা ঘোড়া হয়ে ওঠার কথা। লোকটাকে বাবা ডেকেও কোনো লাভ হয়নি। আরেকটা রাত তার জীবনে এলে সে আর বাঁচবে না। কিন্তু বাঁচার উপায় কী…?

বিকেলে, সবার অগোচরে; বিয়েবাড়ি, হইহল্লা ছিল – কেউ খেয়াল করেনি, মরিয়মবিবি, বাড়ির পেছনে যে শেওড়াগাছের ডালে একদিন ঝুলছিল আলেয়ার লাশ, সেই গাছে উঠে পড়ে। গাছটি বেজায় বড়সড়। সাধারণত এত বড় শেওড়াগাছ কোনো বাড়িতে দেখা যায় না, কিন্তু রমজান শেখের বাড়ির পেছনের শেওড়াগাছটি যেমন বড় আকারের, তেমনি ঝোপালো। মরিয়মবিবি গাছের মগডালে উঠে বসে, মনে মনে হাসে – কেউ তাকে গাছে উঠতে দেখেনি, সবাই এখন তাকে খুঁজে মরুক…।

সন্ধ্যা নামল, তারপর রাত। নতুন বউয়ের খোঁজ নেই। শাশুড়ি খুঁজে মরে, বড় দুই জা খুঁজে মরে; ননদ-ননাসরা খুঁজে মরে – না, নতুন বউ কোথাও নেই। রান্নাঘর, ঘষিঘর, গোয়ালঘর, মাচার তলা – এবাড়ি-ওবাড়ি; খোঁজার কোথাও বাকি নেই। গেল কই? কোথায় যেতে পারে? পালাবেই বা কেন? পালাতে যে পারে, আলালের পশুকর্মের অসহ্য ব্যথায় মরিয়মবিবি যে চিৎকারটি দিয়েছিল, সেই চিৎকার বড় দুই জায়ের কারো কানে গেলে তারা বুঝত – তারা তো কেউ নতুন বউয়ের চিৎকার শোনেনি। তাই, এখন তারা কিছুই অনুমান করতে পারছে না। বিকেলেও নতুন বউ তাদের সামনে ছিল না, তারা ভেবেছে – সে তার নিজের ঘরে শুয়ে আছে…।

রমজান শেখ ঘরের বারান্দায় বসে হুঁকো টানছে। আলাল বলল, আফজালপুর চইলে যায় নাই তো শালি…?

– না। সেইখেনে গেলে বিয়াই খবর দিত না…?

– হ। তাও তো কথা…।

মরিয়মবিবি গাছে চড়ে বসে আছে – এটা প্রথম দেখে তার ননদ কুসুম। কুসুম ভোরবেলা হাঁস নিয়ে খালপাড়ে যাচ্ছিল। শেওড়াতলা দিয়েই পথ। গাছের নিচে গেলে হঠাৎ তার নতুন ভাবির হাসির শব্দ কানে আসে। ভাবি খিলখিল করে হাসছে। কুসুমের তো ভিরমি খাওয়ার জো। সারারাত ভাবিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। এখন তার হাসির শব্দ! কিন্তু কোত্থেকে আসছে এই শব্দ? ধারেকাছে কোথাও তো কেউ নেই। কী মনে করে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখে, নতুন ভাবি গাছের ডালে বসে হাসছে। তাকে দেখেই কুসুম চিৎকার করে – ‘ও মা-গো, দেইখে যাও, নতুন ভাবি শড়াগাছের ডালে বইসে আছে…।’

খবর গ্রামে রাষ্ট্র হতে দেরি লাগে না। এইরকম একটা মজার খবর – গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ে রমজান শেখের বাড়িতে…।

– এইডা জিনের কাম ছাড়া আর কী…?

– কী সোন্দর চেহারা বউয়ের, তার কপালে…।

– জিনেরা সুন্দরী মাইয়ের পেছনেই লাগে গো…।

– মর্দা ওঝা ডাইকতে হইবে। মাইয়েনোক ওঝার কাম না…।

মরিয়মবিবিকে ঘিরে ধরেছে গাঁয়ের মানুষ। কতজন যে কত ধরনের মন্তব্য করছে তার ঠিক নেই। মরিয়মবিবির শাশুড়ি বারবার জিজ্ঞেস করছে – ‘তোমার কী হইছে গো বউ? গাছে উঠলা ক্যামনে…?’

মরিয়মবিবি কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না…।

রমজান শেখ হঠাৎ হুঙ্কার ছাড়ল – ‘এই তোমরা সব যার যার বাড়িত যাও। এইনে তামশার কিছু নাই। আলাল, বউয়ের পায়ে ছিকল দে…।’

মরিয়মবিবি ঝিম মেরে উঠোনে বসে ছিল। পাড়ার লোকজন রমজান শেখের ধমক খেয়ে চলে যেতেই সে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আলালের ডান হাতে কামড় বসিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, ‘ঘোড়া… ঘোড়ার মরণ আইছে। নাকে-মুখে রক্ত উইঠে মরবো কইলাম। তোমরা সইরে খাড়াও…।’

রাতের ঘটনা কেউ জানে না। কিন্তু এখনকার এই ঘটনা দেখে সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। ঘটনা কোনদিকে যায়, কে জানে!… আর জিনটা কতটা বদ তাও তো জানা নাই। সোলেমান নবীর পালা জিনরা নাকি খারাপ হয় না। তাহলে বদ-খারাপ জিন কে পালে? কার কথা শোনে তারা…?

খবর বাতাসে ভেসে আফজালপুরও আসে। ইমান আলী গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে যাচ্ছিল। পথে মোকছেদের সঙ্গে দেখা। সেও বাজারে যাচ্ছে। মোকছেদ বলল, চাচা যে বাজারে যাইন

–  আলীপুর যাইন নাই…?

– এই বিহানবেলা আলীপুর কী…?

– ক্যান? খবর পান নাই…?

– কী খবর…?

– আপনের বেটিরে নাকি জিনে ধইরছে। সারারাত গাছে বইসে ছিল…।

– কও কী তুমি? কার কাছে শুইনেছ…?

– কী কন এটি! গাঁর ব্যাকটিতে জানে, আপনে জানো না…?

দুধের ভার মোকছেদের হাতে দিয়ে খরগোশের মতো ছুটে এসেছে ইমান আলী। এ কী কথা! তার ভালো মেয়ে শ্বশুরবাড়ি গেল – এখন এই খবর! জিনে ধরেছে…?

ইমান আলীকে দেখেই বাড়ি মাথায় তোলে রমজান শেখ। ‘কী মিয়া? মাইয়ের লগে জিন আছে, আগে কন নাই তো…?’

কী বলবে ইমান আলী? তার মুখে কোনো কথা নাই। মরিয়মের ওপর জিনের আছর আছে – এটা তো জানা নেই তাদের। মেয়ে তো আগে কোনোদিন রাতের বেলা গাছে চড়েনি। মরিয়মের কাছাকাছি যেতেই সে ইমান আলীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল – ‘বাজান, বাজান গো…।’

ইমান আলী মেয়েকে কদিনের জন্য বাড়িতে নিয়ে আসে। গ্রামে জ্যান্ত-পীর নবাপাগলার মাজার। মাজারে মানত দিতে হবে। কত দূর গাঁয়ের মানুষ আসে মাজারে, বাবার দয়ায় তাদের অসুখ-বিসুখ সাড়ে; ভূত-প্রেত ছাড়ে, তার মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবে না বাবা…? ‘বাবা, বাবা গো…।’

তিনদিনের দিন দুপুরে খবর আসে – নাকে-মুখে রক্ত উঠে আলাল শেখ মারা গেছে। খবর শুনে মরিয়মবিবি খিলখিল করে হাসে – ‘ঘোড়া… ঘোড়া মইরেছে… ঘোড়া…।’

সেই থেকে বিধবা মরিয়মবিবি আফজালপুরের পথের মানুষ, গাছের মানুষ…।

মরিয়মবিবি সকাল নাই, দুপুর নাই – পথে পথে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতেই নবাপাগলার মাজার পেছনে ফেলে নদীর পাড় পর্যন্ত চলে যায়। নদীকে ধমকায় – ‘এই যমুনা মাগি, তুই কিন্তু আমার লগে লাগবি না। লাইগলে খবর আছে…।’ আবার হয়তো নবাপাগলার মাজারের কাছে কোনো গাছে চড়ে বসে থাকে, আমাদের মতো ছেলে-ছোকরাদের দেখলে গাছ থেকে নেমে এসে বলে, ‘এই ছেমড়ারা, তরা কেউ আমারে বিয়া করবি…?’ এটা মরিয়মবিবির মুখের বুলি। আগেও সে আমাদের মতো বয়সী ছেলেদের একই কথা বলত…।

যাই হোক, মরিয়মবিবিকে কেউ ঘাঁটায় না। সবাই বিশ্বাস করে, তার ওপর যে-জিনটা আছর করেছে, তার মতো বদ-জিন দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। দেখলা না – আলাল শেখ কীভাবে মরলো নাকে-মুখে রক্ত উঠে! রক্ত নাকি কড়াইয়ে ফোটা গরম পানির মতো ফুটছিল। দেখছো না – নবাপাগলার মাজারে মানত দিলে মানুষের কুষ্ঠ রোগ পর্যন্ত ভালো হয়, কত মানুষের ভূত-প্রেত-জিনের আসর ছাড়লো – মরিয়মবিবিরটা ছাড়ে না কেন? বেটা ইবলিশের চেয়েও বড়ো শয়তান…।

আমাদের বড়ো ভাইয়েরা দেখেছে, আমরা দেখছি –  মরিয়মবিবি পথে হাঁটে, তার গলার তাবিজ, বাহুর তাবিজ ঝমঝম শব্দ করে। সে কোনোদিন খায় কি খায় না – তারপরও, বিধবা হওয়ার এই এতদিন পরেও ঠিকরে পড়ে তার রূপের জ্যোতি। এইসব হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের ছোটভাইয়েরাও দেখত। কিন্তু গল্প হঠাৎ যেদিকে মোড় নিচ্ছে – গল্পের পরিণতি কী হবে, কে জানে…!

গল্পে ঢুকে পড়েছে গ্রামপ্রধান তালেব খাঁ, ইউপি মেম্বার ইয়াকুব আলী, মসজিদের ইমাম নাগর মুন্সি। এত বড় পাপ মেনে নেওয়া যায় না। বিচার হতেই হবে। গ্রামের কোথাও কানপাতা দায় হয়ে উঠেছে – সবখানে আলোচনা একটাই –  কার এত বড় বুকের পাটা, যে-মরিয়মের সঙ্গে থাকে দুনিয়ার বজ্জাত জিন, সেই মরিয়মের সঙ্গে করতে পারল এই কাজ! কিন্তু বিচারে কার নাম বলবে মরিয়ম? দুদিন পর জুমাবার, নামাজ শেষে মসজিদের সামনেই হবে বিচার –  গ্রামের সব পুরুষ-বেটার মনেই ভয়, যদি তার নামটি বলে ফেলে মরিয়ম! বলে ফেললে – সেটি সত্য না মিথ্যা – তা কে শুনবে…?

আমরা বালকের দল ভয়ে কাঁপছি – মরিয়মবিবির কী হবে বিচারে? আমরা বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখছি – মরিয়মবিবির মাথায় ছিট আছে, গাছে চড়ে বসে থাকে,            তাবিজ-কবজের ঝমঝম শব্দ তুলে পথে হাঁটে; কিন্তু তাকে  কারো কোনো ক্ষতি তো কখনো করতে দেখি নাই। তাহলে? এরই মধ্যে আমাদের বালক-কানেও এসেছে, কথা চাপা                থাকে না, পাথরচাপা দিলেও না – মরিয়মবিবি জেনা করেছে, জেনা করা মহাপাপ। যে-নারী জেনা করে, তার বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে, তাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করাই নাকি ইসলামের বিধান…।

এই কদিনেই আমাদের বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। আমরা জেনে গেছি – এখন তো গাঁয়ের পথে-ঘাটে কোথাও দুজন মানুষ একসঙ্গে হলেই মরিয়মবিবির জেনার কথা ওঠে। তাদের কথাবার্তা শুনেই জেনেছি, পুরুষ-মানুষ ছাড়া জেনা করা সম্ভব না; আমাদের গ্রামের কিংবা অন্য কোনো গ্রামের কোনো না কোনো পুরুষ-মানুষ এই কাজের সঙ্গে জড়িত, সে মরিয়মবিবির সঙ্গে মিলিত হয়েছে বলেই না তার পেটে বাচ্চা এসেছে; কিন্তু সেই পুরুষটি কে? বিচার-সভায় মরিয়মবিবি কার নাম বলে –  এটাই এখন দেখার বিষয়। বিচার হলে দুজনেরই হওয়া উচিত…।

আমরা ছেলেমানুষ, দূর থেকেই দেখি, শুনি; অনেকটা বুঝিও এখন – গ্রামজুড়ে চাঞ্চল্য, অস্থিরতা; ফিসফাস। বিচারে কী হবে মরিয়মবিবির? শাস্তি তো নির্ধারিত, বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছুড়ে হত্যা করা। কিন্তু এই কথাও ওঠে – মরিয়মবিবি ছিটগ্রস্ত মানুষ, কেউ হয়তো তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এই অপকর্ম করেছে; তার শাস্তি কমানো উচিত…।

কথা উঠছে পথে-ঘাটে, কোথাও দুজন মানুষ একসঙ্গে হলে তারা নিজেদের মধ্যে বলছে এ-কথা; কিন্তু ভরা-সালিশে গ্রামপ্রধানের সামনে, মেম্বারের সামনে, মুন্সির সামনে, তাদের অগ্নিচক্ষুর সামনে কে তুলবে এ-প্রসঙ্গ? আফজালপুরে তারা যা বলে, তা-ই যে হয় – বহুদিন ধরেই তা দেখে আসছে গাঁয়ের মানুষ। আর এখন, এত বড় একটা ঘটনা – তারা তো আর চুপ করে থাকতে পারে না! মসজিদের সামনে পাথর জড়ো করে রাখা হয়েছে, এখন জুমাবার আসতে যতটুকু দেরি…।

মসজিদের সামনে পাথর জড়ো করার খবর আমাদের কানেও আসে। এ-খবর শুনে আমরা আতঙ্কিত হয়ে উঠি। মরিয়মবিবির শাস্তি তাহলে কমবে না? বিচার যা হওয়ার, হবে তাই! বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছুড়ে হত্যা…।

এখন, এই দৃশ্যটিই শুধু আমার চোখে ভাসে – মসজিদের সামনে গর্ত খুঁড়ে মরিয়মবিবির বুক পর্যন্ত পোঁতা হয়েছে। তার মাথায় পাথর ছুড়ছে গ্রামপ্রধান তালেব খাঁ। পাথর ছুড়ছে ইউপি মেম্বার ইয়াকুব আলী। পাথর ছুড়ছে মসজিদের ইমাম নাগর মুন্সি। মরিয়মবিবির মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে, নাক-মুখ কেটে রক্ত ঝরছে; কিন্তু কী আশ্চর্য – মরিয়মবিবির মুখে একটুও ব্যথার শব্দ নেই, চোখে একফোঁটা কষ্টের পানি নেই…। দৃশ্যটি আমাকে যেন পাগল করে তোলে। আমি কোথাও স্থির থাকতে পারি না। নবাপাগলার মাজার কিংবা নদীর দিকে দৌড় শুরু করি। রবিরা ভাবে, আমি সত্যি সত্যিই একটা পাগল…।

রবি এর মধ্যে আরেকটা নতুন খবর আনল। মরিয়মবিবির  মা নাকি তাকে প্রচন্ড রকম পিটিয়েছে। বাউলির ডাঁট ভেঙেছে পিঠে। রক্ত ঝরেছে অনেক। কিন্তু মার খেয়ে একটুও উহ্-আহ্ করেনি মরিয়মবিবি। এতে নাকি আম্বিয়াবিবির রাগ পঞ্চমে  ওঠে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে মরিয়মের পেটে বাউলির ভাঙা ডাঁট              দিয়ে খোঁচা মারে। আর তখনই মরিয়মবিবি চিৎকার করে – ‘মা, মাগো, তোমার পায়ে পড়ি, আমার ছাউয়ালডেরে মাইরে ফেলো না…।’

ছাউয়াল! মরিয়মবিবি জানে, তার পেটে ছাউয়াল এসেছে…?

কিন্তু আম্বিয়াবিবি, এই, এতদিন পর, মরিয়মের পেটে বাচ্চা এসেছে এটা তো পুরনো খবর – মেয়ের ওপর চড়াও হলো কেন…?

আম্বিয়াবিবি নাকি মেয়ের কাছে পুরুষ-বেটার নাম জানতে চেয়েছে। শুরুতে ভালোভাবেই জিজ্ঞেস করেছে – ‘ক মা, ক, কোন বেডা এই কাম কইরেছে? সেই বেডাও তো দোষী। সেও পাপ কইরেছে। তুই একা শাস্তি পাবি ক্যানে…?’

কিন্তু মরিয়মবিবি যেন বোবা, কথা বলতে পারে না; কোনো কথাই বলছিল না সে। অতঃপর রাগ সহ্য করতে না-পেরে আম্বিয়াবিবি মেয়েকে শূকর পেটানোর মতো করে পেটানো শুরু করে…।

জুমাবার এগিয়ে আসছে। আমাদের অস্থিরতা বাড়ছে। সত্যি সত্যিই মসজিদের সামনে পাথর জড়ো করা হয়েছে। আমরা একদিন দেখে এসেছি। …আর শুধু আমাদেরই বা বলি কেন –  গ্রামপ্রধানদের অস্থিরতাও নাকি বাড়ছে। মরিয়মবিবি তো কারো নাম এখনো বলেনি – কে জানে, কার নাম বলে ফেলে! এরই মধ্যে গল্প নতুন মোড় নিল। মরিয়মবিবি বলতে শুরু করেছে –  তার পেটে এসেছে ঈসা নবী, সে ঈসা নবীর মাতা বিবি মরিয়ম…।

তাই তো! গ্রামের মুরবিব, যারা এনায়েতপুর কিংবা আটরশির মাহফিলে গেছে, তাদের মনে পড়ে; মাহফিলে হুজুরের বয়ান শুনেছে – ঈসা নবীর মায়ের নাম ছিল মরিয়ম। তাঁর পিতা কে, কেউ তা জানে না। সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরতের নিদর্শন ঈসা…।

কিন্তু সেই পুণ্যাত্মা বিবি মরিয়মের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো নারীর তুলনা চলে না। আমাদের আফজালপুরের মেয়ে মরিয়মও তুলনীয় হতে পারে না তাঁর সঙ্গে। পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই কুমারী মরিয়ম সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, সবই আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা; কিন্তু আর কোনো নারীর সেই ভাগ্য হবে না…।

আমাদের বালক-মনে প্রশ্ন জাগে – এই কলিকালে আল্লাহতায়ালা আবার তাঁর সেই ইচ্ছা পোষণ করতে পারেন না…?

মরিয়মবিবির কথা রাষ্ট্র হতে দেরি লাগে না। আফজালপুরের ইমান আলীর মেয়ে মরিয়ম নিজেকে ঈসা নবীর মা বিবি মরিয়ম দাবি করছে – এ কী যে-সে কথা? এই কথা যমুনার সব চরে পাখির ঠোঁটে ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ে। চরের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তা আতঙ্কিত হওয়ারই কথা; আজকের দিনে কোনো নারী নিজেকে বিবি মরিয়ম দাবি করতে পারে, তা কল্পনারও অতীত; কল্পনা করাও পাপ, মরিয়মবিবি তাই করছে। তার পাপে এখন কী গজব যে চরে নামবে, কে জানে…!

গজব নামার আগেই জুমাবার এসে গেল…।

নামাজের পর বিচারসভা বসবে। মসজিদের সামনে লোকে লোকারণ্য। মেয়েছেলেরাও একটু দূরে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আফজালপুরের লোক তো আছেই, আলীপুর থেকেও প্রচুর লোক এসেছে। তারা আসবে না কেন? মরিয়মবিবির গল্প তো আলীপুরেই শুরু। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার দ্বিতীয় রাতেই তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না, সারারাত শেওড়াগাছে বসে ছিল। তার ওপর যে জিনের সওয়ার আছে তখনই তো প্রকাশিত হয়। তার পরের ঘটনা, আপনারা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন; আরো ভয়াবহ। তিনদিনের মাথায় নাকে-মুখে রক্ত উঠে মারা গেল আলাল…।

মরিয়মবিবি নিজেকে বিবি মরিয়ম দাবি করায় গ্রামপ্রধানদের রাগ আরো চড়ে গেছে। যাদের মাথায় এসেছিল, যে-পুরুষের সঙ্গে মরিয়মবিবি জেনা করেছে, সেই পুরুষের যদি খোঁজ               না-মেলে; ছিটগ্রস্ত মহিলা – কেউ হয়তো ভুলিয়ে-ভালিয়ে এই অপকর্ম করেছে, মাজারের কাছে সে তো অনেক সময় ঘুমিয়ে থাকে – ঘুমের মধ্যেও হয়তো কোনো কুলাঙ্গার এ-কাজ করতে পারে – তাহলে সে একা মৃত্যুদন্ড ভোগ করবে কেন, শাস্তি কমানো যেতে পারে – তারাও এখন বিগড়ে গেছে। বলে কী এই নষ্টা-ভ্রষ্টা মহিলা…!

মরিয়মবিবি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল – ‘কী বিচার কইরবেন তোমরা, তাড়াতাড়ি করেন। আমার ঈসার ক্ষিধা নাগছে…।’

মরিয়মবিবির কথা শুনে কারো কারো মাথায় এলো – মহিলা তো বদ্ধপাগল, অসুস্থ। তাকে নিয়ে এসব কেন? কেন এই বর্বরতা? আগে তার চিকিৎসা দরকার। কিন্তু এই চিন্তা জমাট বেঁধে বয়ান আকারে কারো মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই গ্রামপ্রধান তালেব খাঁ হুকুম জারি করল – ‘এই মতি, ময়নাল –  নষ্টা মেয়েনুকটারে গর্তে নামা…।’

‘কেউয়ে আমার গতরে হাত দিবি না’, মরিয়মবিবি বলল, ‘আমি একাই গর্তে নামিব; তার আগে পুরুষ-বেটার নামটা কইয়ে যাই…।’

– নাম…! নাম…!

– এই যে আমার গলার তাবিজ, এইটে নবাপাগলা দিছেন আমারে…।

– নবাপাগলা? তাইনে তো কোন জনমে এন্তেকাল নিছেন…।

– না। মাজারে যাইয়ে দেখেন তোমরা, তাইনে এন্তেকাল নেন নাই। তার দেওয়া এই তাবিজে পুরুষ-বেটার নাম লেখা আছে…।

– তাবিজে নাম…!

– শুইনে রাখেন তোমরা, বেটার নাম কইয়ে যাই…।

তখন মসজিদের সামনে রব উঠল – ‘না, না, না…!

সোশ্যাল মিডিয়া