তিনটি স্মৃতিকথা ও দেশভাগ

গৌতম রায়

দেশভাগ-বিষয়ক তিনটি স্মৃতিকথা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই নিবন্ধ। স্মৃতিকথাগুলো বহু বছর আগেই বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সমাদৃতও। এগুলো হলো – মিহির সেনগুপ্তের বিষাদবৃক্ষ, সুনন্দা শিকদারের দয়াময়ীর কথা এবং সীমা দাশের দ্যাশ থেকে দেশে। প্রসঙ্গত, এর মধ্যে সীমা দাশের বইটি প্রকাশিত হয়েছে সবচেয়ে শেষে – বইয়ে লিখিত সময়কাল হলো ২০১০ সাল। আবার মিহির সেনগুপ্তের বিষাদবৃক্ষ বইটি স্মৃতিকথা হলেও চরিত্রে একটু আলাদা। লেখক এখানে সরাসরি কিছু রাজনীতির কথা বলেছেন এবং রাজনৈতিক বিশেস্নষণ করেছেন, যা নিশ্চিতভাবেই তাঁর পরিণত বয়সে অর্জিত। ঠিক স্মৃতিসঞ্জাত নয়। এর ফলে মূল রচনাটি আরো বর্ণময়তা ও ব্যাপ্তি অর্জন করেছে ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে ক্ষুণ্ণ হয়েছে তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্যও।

এখানে উলেস্নখ করা যেতে পারে, এই নিবন্ধে ও অন্যত্র বারবার ‘দেশভাগ’ শব্দটি লিখিত ও উচ্চারিত হলেও আসল আলোচ্য বিষয় কিন্তু দেশভাগ নয়, বঙ্গবিভাজন। বাংলাভাগ ও দেশভাগ আলাদা। যেমন চলিস্নশের দশকে মুসলিম লিগ নেতারা দেশভাগ চেয়েছিলেন; কিন্তু বঙ্গবিভাজন চাননি। তাঁদের দাবি ছিল, অখ- বাংলাদেশই পাকিস্তানে সংযুক্ত হোক। আবার কংগ্রেস নেতারা প্রাথমিকভাবে ভারতভাগেরই বিরোধিতা করেছিলেন; কিন্তু পরে তাঁরা বলতে শুরু করেন, যে-দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম নেতারা দেশভাগ চাইছেন সেই যুক্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাবকেও বিভাজিত করতে হবে। দেশের শেষ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন এই যুক্তির ন্যায্যতা মেনে নেন।১

আবার চলিস্নশের দশকে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নেতারা যে-দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে এত মাতামাতি করেছিলেন তার ওপর তাঁদের বিশ্বাস যে অটল ও নির্ভেজাল ছিল এমন নয়। তার প্রমাণ হলো, সাতচলিস্নশের গোড়ায় যখন বঙ্গবিভাজন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তখন এই দুপক্ষের নেতারাই আবেগতাড়িত হয়ে স্বাধীন বঙ্গ গঠনের জন্য তৎপরতা শুরু করেন। স্বাধীন বঙ্গ মানে তৃতীয় একটি রাষ্ট্র, যেখানে হিন্দু ও মুসলিমরা থাকবে দ্বিপক্ষ চুক্তি ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং তা হবে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আলাদা। এই যুক্তি যে স্পষ্টতই দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী তা কি স্বাধীন বঙ্গের দাবিদাররা উপলব্ধি করেননি? কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় লিগ নেতাদের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ খারিজ হয়ে যায়। হতাশ ও মনঃক্ষুণ্ণ কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, অখিল দত্ত প্রমুখ এবং লিগ নেতাদের মধ্যে প্রাদেশিক লিগ সম্পাদক আবুল হাসিম ও সুরাবর্দি স্বয়ং।২

 

বঙ্গবিভাজন

১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড কর্নওয়ালিশ অখ- বাংলাদেশ, বিহার ও উড়িষ্যার কতকাংশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এই বন্দোবসেত্মর সার কথা হলো, এই তিনটি প্রদেশের জমিদারদের তিনি যার যার অধীনস্থ জমিতে স্থায়ী মালিকানা দিয়ে দেন। বলে দেওয়া হয়, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব ব্রিটিশ সরকারকে দিতে পারলেই জমির মালিকানা অটুট থাকবে। না হলে তা নিলাম করে দেওয়া হবে ওই পরিমাণ রাজস্ব দিতে সমর্থ অন্য কোনো জমিদারকে।৩ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কিছু কিছু জমিদারি হাতবদল হলেও এভাবে, এই চিরস্থায়ী বন্দোবসেত্মর সূত্রে বাংলার কৃষিব্যবস্থায় উদ্ভব হয় এক স্থায়ী জমিদার শ্রেণির। আর তার নিচে থাকে রায়তরা। রায়তদের স্তরবিভাজনের বিষয়টি এলো পরে।৪

প্রসঙ্গত, কোনো দুয়ার আঁটা, আবদ্ধ জনজীবনে হয়তো এই ব্যবস্থা স্থিতিশীল হতে পারত; কিন্তু বাংলাদেশে তা সম্ভব ছিল না। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও বহির্বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে বিদেশের বাজারে বাংলার কৃষিপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়। এই চাহিদার তালিকার শীর্ষে ছিল পাট, ধান ও চা। বিশেষ করে পাট। অর্থাৎ কৃষি ফসল আর শুধু জীবনধারণের জন্য থাকে না, তার বাজারিকরণ হয়। এই নতুন কৃষিবাজারের সুযোগ নিয়ে একদল মুসলিম রায়ত ধনসম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে শুরু করেন। যদিও কৃষিব্যবস্থায় তাঁরা ছিলেন জমিদারের অধীনস্থ। ১৮৮০ সালে দুর্ভিক্ষ কমিশনের (Famine Commission) এক রিপোর্টে বলা হয়, পাটচাষের মুনাফা থেকে এই প্রদেশের (বাংলার) বহু স্বত্বাধিকারী রায়ত ধনবান হয়ে উঠেছেন। ১৮৯৪ সালের আরেকটি রিপোর্টে বলা হয়েছে – বাখেরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, ত্রিপুরা এবং নিম্নবঙ্গের কিছু জেলায় এখন অনেক রায়তের অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল এবং তারা পেশাদার মহাজনের ঋণজাল থেকে মুক্ত।৫ পাটচাষিদের এই ক্রমোন্নতি বিশ শতকের গোড়ার দিকেও অব্যাহত ছিল। পাটের দামও বাড়তে থাকে। লেভিঞ্জ কমিটির রিপোর্টে (১৯১৩-১৪) দেখা যায়, শুধু ১৯০৬ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাট বিক্রি হয়েছে চলিস্নশ কোটি টাকার। বলা বাহুল্য, এই বিপুল বাণিজ্য পূর্ববাংলার একদল মুসলিম রায়তকে উত্তরোত্তর ধনী করে তোলে। করোগেটেড টিনের শেড দিয়ে এদের ঘরের ছাদ তৈরি হয়, পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে শুরু করে।৬ এভাবেই সে-সময়ে উদ্ভব হয় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল, তা ছিল আধুনিক শিক্ষার প্রতি মুসলিমদের ক্রমবর্ধিত আগ্রহেরই ফল। ওই বছরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন শিক্ষক এস.জি. পাপনিদকর এক প্রতিবেদনে লেখেন, পৃথিবীর সর্বাধিক পাট উৎপাদনকেন্দ্র পূর্ববাংলায় কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নতির একটা ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলেই বাংলাদেশে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ সম্ভব হয়েছে।৭

এদিকে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল আরো অনেক আগেই, বলতে গেলে চিরস্থায়ী বন্দোবসেত্মর সঙ্গে সঙ্গে। হিন্দু জমিদাররা তাঁদের বিশাল জমিজমা তদারকির অসুবিধা বুঝতে পেরে বর্ধিত খাজনার ভিত্তিতে পরবর্তী স্তরে পত্তনি দিতে শুরু করেন। পত্তনিদাররা আবার তাঁদের নিচের স্তরে দেন দরপত্তনি। এভাবে জমিদার ও মূল কৃষকের মাঝখানে স্তরবিভাজিত এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়, যাঁরা কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলেও বাস্তবে ছিলেন অনেক দূরের লোক। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। বলা যায় তাঁরা ছিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবসেত্মর সুবিধাভোগী শ্রেণি। এঁদের ঐতিহাসিকরা ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ বলে অভিহিত করেছেন। যেহেতু গ্রামে তাঁদের কোনো কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হতো না তাই তাঁদের অনেকেই শহরে এসে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে শহরের সরকারি ও বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির মেধাভিত্তিক চাকরিগুলো ছিল এঁদেরই দখলে।৮

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তদের সম্পর্কে আলাদা করে উলেস্নখ করার কারণ এই যে, সমাজচেতনা নির্মাণ ও রাজ্য রাজনীতিতে এই শ্রেণিটিই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। বিশ শতকের বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, দাঙ্গা ও শেষ পর্যন্ত চলিস্নশের দশকে বঙ্গবিভাজনের বাতাবরণ সৃষ্টিতে এই মধ্যবিত্তের (হিন্দু ও মুসলিম) ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক। এ-বিষয়ে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আতিউর রহমান ও লেনিন আজাদ লিখেছেন, বিশ শতকের শুরুতে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত যত বিকশিত হতে থাকল ততই তারা প্রাগ্রজ বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে থাকল…। অনুপস্থিত বাঙালি ভূস্বামীদের প্রতি মুসলিম কৃষকদের যে সুপ্ত ক্ষোভ ছিল তার সঙ্গে যুক্ত হলো শহরাঞ্চলের বিভিন্ন পেশা, চাকরি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে সৃষ্ট নতুন দ্বন্দ্ব। ফলে শ্রমিক বা কৃষকের মধ্যে নয়, বরং বাঙালি মধ্যবিত্তের এই দুই প্রতিযোগী সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রথমে সাম্প্রদায়িক প্রতিযোগিতা, সাম্প্রদায়িক সংগঠন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এমনকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারও সূত্রপাত হয়।… ১৯২০ সালের আগে বাংলায় তেমন কোনো দাঙ্গার খবর পাওয়া যায় না, যদিও হিন্দু ভূ-স্বামীদের শোষণ ১৭৯৩ সালের পর থেকেই কম-বেশি চালু ছিল।৯

আগেই দেখানো হয়েছে যে, কৃষিব্যবস্থার নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলো থেকেই বাংলায় হিন্দু ও মুসলিম মধ্যবিত্তের উদ্ভব হয়েছিল।
কৃষিবাজারের অনিশ্চয়তা, নিয়মিত উত্থান-পতন এদের শহরের মেধাভিত্তিক চাকরিগুলোর দিকে আকৃষ্ট করে। বস্তুত, ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ যে পূর্ববঙ্গের শিক্ষিত মুসলিমরা এমনকি ফজলুল হক পর্যন্ত সোৎসাহে সমর্থন করেছিলেন তার কারণ হলো এই বিভাজনের ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের একতরফাভাবে সরকারি চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা অর্জনের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। আসলে শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশের বিচারে হিন্দুদের চেয়ে অনেক পশ্চাৎপদ ছিলেন বলেই মুসলিমরা সে-যুগে বিচ্ছিন্নতাই শ্রেয় বলে মনে করতেন। ১৯৪৭ সালের বঙ্গবিভাজন পর্যন্ত এই মানসিকতা অপরিবর্তিতই ছিল। বলা যায়, মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদা ও অসমেত্মাষের দিকটি সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ ছিল মুসলিম মধ্যবিত্তকে চাকরি দেওয়ার চুক্তি। তাতে দরিদ্র মুসলিম রায়তের স্বার্থসিদ্ধির কোনো প্রস্তাব ছিল না। চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর বৈরিতাপ্রবণ দুই মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় দ্রম্নত চুক্তি বাতিল করে এবং পূর্ববাংলার বিভিন্ন জায়গায় আবার দাঙ্গা শুরু হয়।

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সংকট যত তীব্র হয় এই দ্বন্দ্বও তত জোরদার ও বেপরোয়া রূপ নিতে থাকে। যা হয়েছিল চলিস্নশের দশকে। বলা বাহুল্য, এর কারণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ-যুদ্ধের ফলে বাংলায় যে-অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল তা এককথায় অভূতপূর্ব। খাদ্যশস্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়, হু-হু করে দাম বাড়তে থাকে, ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে পূর্ববাংলায় ত্রিশ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। সেই সময় (চলিস্নশের দশকে) এই দ্বন্দ্বের আবার দুটি অনুষঙ্গ তৈরি হয়েছিল। এক. বাংলার মুসলিম দলগুলোর জমিদারি উচ্ছেদের দাবি এবং পূর্ববঙ্গে মুসলিম জোতদারদের শক্তি বৃদ্ধি। মন্বন্তর ও অন্যান্য কারণে হিন্দু জমিদাররা কার্যত তাঁদের জমিজমা সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতা হয়ে উঠেছিল তাঁদের স্থায়ী আস্তানা। দ্বিতীয় অনুষঙ্গ হলো, জিন্নাহ-প্রদত্ত এক বিচিত্র দ্বিজাতিতত্ত্বের আবির্ভাব ও পাকিস্তান প্রস্তাব। বস্তুত, মুসলিম মধ্যবিত্তরা পাকিস্তান প্রস্তাবের বৌদ্ধিক ন্যায্যতা নিয়ে যতটা চিন্তিত ছিলেন তার চেয়ে বেশি তাঁদের উৎসাহের কারণ ছিল সম্ভাব্য বঙ্গবিভাজন, যাতে হিন্দু প্রতিনিধিরা সংখ্যালঘু হয়ে গেলে তাঁদের আধিপত্য নিষ্কণ্টক হবে। এটি তাঁরা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় অর্জন করলেও হিন্দুদের আন্দোলনের ফলে ফসকে গিয়েছিল। এ-প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক তানভীর মোকাম্মেল লিখেছেন, যে-মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা কলকাতা বেতার, পোর্ট ট্রাস্ট বা মিউনিসিপ্যালিটিতে ছোট চাকুরে ছিলেন পাকিস্তানে এসে তাঁরা সব উচ্চপদে আসীন হলেন। সেই সময় ঢাকায় ভালো ঘর না পাওয়া গেলেও চাকরির বেশ উঁচু পদ পাওয়া গিয়েছিল।১০

অন্যদিকে চিরস্থায়ী বন্দোবসেত্মর সূত্রে হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্তের যতদিন দিব্যি অর্থাগম হচ্ছিল, জমিস্বার্থ ছিল প্রকৃত লাভজনক – ততদিনই তাঁরা ঐক্য ও অখ-তা রক্ষায় আগ্রহী ছিলেন। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের পর পূর্ববাংলায় জমির মালিকানা হয়ে দাঁড়ায় কার্যত এক বোঝা। তাঁরা তখনই বঙ্গবিভাজনে উৎসাহী ও দৃঢ়সংকল্প হয়ে ওঠেন। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে হিন্দু মহাসভার নেতারা যখন বঙ্গবিভাজনের দাবি তোলেন ঠিক পরের দিনই তা সমর্থন জানিয়েছিলেন বঙ্গীয় জমিদার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা, যেমন কিরণশঙ্কর রায়, শ্রীশচন্দ্র নন্দী, বিজয়প্রসাদ সিংহরায় প্রমুখ। অতীতে যাঁদের পূর্বপুরুষরা রবীন্দ্রনাথসহ ছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রবল বিরোধী।

যাঁরা এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু। তার একটি কারণ অবশ্য তিনি ছিলেন প্রথিতযশা আইনজীবী, পূর্ববাংলায় তাঁর কোনো জমিস্বার্থ ছিল না। বাংলাভাগ হওয়া বা না হওয়া পুরোটাই তাঁর কাছে ছিল বৌদ্ধিক বিচারের বিষয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দেশভাগ কখনো সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বঙ্গবিভাজন যখন অনিবার্য তখন গভীর বেদনায় সরদার প্যাটেলকে এক চিঠিতে (২৭ মে) তিনি লেখেন, ‘আমি কেবল একথা বলতে পারি যে, বাঙালি হিন্দুরা যে সকলেই দেশভাগ চাইছেন তা নয়, পশ্চিমবঙ্গে এই দাবি জোরদার হয়ে উঠেছে হিন্দু মহাসভাকে কংগ্রেস সাহায্য করতে এগিয়ে আসায় এবং বিশেষত আগস্ট মাসে কলকাতা-দাঙ্গার পর। কিন্তু পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ হিন্দুই যে দেশভাগে অনিচ্ছুক সে বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।… তাছাড়া, দেশভাগের দাবি সীমিত আছে কেবল মধ্যবিত্তদের মধ্যে…।’১১

 

তিনটি স্মৃতিকথা

আলোচ্য তিন লেখক-লেখিকাই শরৎবাবু-বর্ণিত অনিচ্ছুক হিন্দু এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এই তিনটি রচনারই উপাদান হলো দেশত্যাগের অনীহা ও দেশত্যাগজনিত বেদনা বা বিষাদ। বস্তুত, এই বিষাদ বিভাজন-পরবর্তী দুই বাংলাতেই অনেক উৎকৃষ্ট সাহিত্যের জন্ম দিয়েছে এবং হয়তো ভবিষ্যতে আরো দেবে। এই জাতীয় রচনার গুরুত্ব হলো, এগুলোতে আছে দেশভাগ ও দেশভাগ-পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর লেখক-লেখিকাদের অনুভূতিসিঞ্চিত দৃষ্টিপাত, যা সাধারণ রাজনীতি বা তত্ত্বকথার আয়নায় প্রতিবিম্বিত হয় না। অথবা বলা যায়, ঠিক পাঠ্যবইয়ের মতো ইতিহাস নয়, এই স্মৃতিকথাগুলোতে বর্ণিত হয়েছে এক অন্যমাত্রার ইতিহাস, যার বিবরণ প্রথাগত ঐতিহাসিকদের আয়ত্তের বাইরে। সে-কারণে রচনাগুলোর তাৎপর্যও আলাদা।

 

বিষাদবৃক্ষ

বিষাদবৃক্ষ লেখার আগে মিহিরবাবু আরো তিনটি বই লিখেছিলেন, যদিও তার কোনোটারই বিষয় দেশভাগ ছিল না। চতুর্থ গ্রন্থটির রচনাশৈলীতে অবশ্য তাঁর পূর্ব-অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায়। বরিশালের প্রান্তিক গ্রামে এক ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবারে লেখকের জন্ম। মিহিরবাবু লিখেছেন, ‘আমার আলেখ্যর জন্যে সময়কাল হিসেবে আমি ন্যূনাধিক দশ বছরের মতো একটা পরিসর নিয়েছি। সেই দশ বছরের সময়কালটি উনিশশ একান্ন-বাহান্ন থেকে উনিশশ বাষট্টি-তেষট্টি পর্যন্ত বিসত্মৃত।’ (পৃ ৩১)। তাঁর বাড়ির পেছনদিকে ছিল একটা সরু খাল। ‘দুপাশের বাড়িঘর, আগান-বাগানের মাঝখান দিয়ে তার গতি লীন হত গিয়ে বড় খালে। বড় খালটিও ওইরকমভাবে গিয়ে পড়ত নদীতে।’ (পৃ ৯)। বাড়ির পেছনের এই ছোট খালটিকে লেখক তাঁর বরিশালি ভাষায় বলেছেন, ‘পিছারার খাল’। মিহিরবাবুর বর্ণনায় – ‘এই খালটি আমাদের বড় আত্মীয় ছিল।’

এই পিছারার খালটিকে ঘিরে কতগুলো হিন্দু পরিবারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক অবনতি, আঁকড়ে থাকা জমিদারি ঠাঁটবাট, সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলা, মুসলিম তালুকদার ইত্যাদি শ্রেণির প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি মিহিরবাবু বর্ণনা করেছেন নিপুণভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশেষত আমাদের পরিবারের বা তার থেকেও ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে যেসব মধ্যস্বত্বভোগী আছে তাদের সমূহ সংকট। তাদের মধ্যস্বত্বের খাজনার পরিমাণের ব্যাপারটা অঙ্কে আসে না। কিছু খাসজমির উপজ তাদের বাঁচিয়ে রাখে।… এই খাসজমি যদি তারা নিজেরা চাষ করে তবুও কথা ছিল। কিন্তু তা কী করে হবে? তারা যে জমিদার। জমিদার জমি চষে না। প্রজাপত্তনির প্রজারাই তা চষে। জমিদার ফসলের ভাগ পায়। এই ব্যবস্থার জন্যে যখন প্রজাপত্তনি, মধ্যস্বত্ব যায় তখন খাসজমিও যাবার রাস্তা ধরে…।’ (পৃ ১৪)।

লেখক সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছেন পূর্ববাংলায় দেশভাগের পক্ষে বাতাবরণ তৈরির মূলে ছিল জমিস্বার্থ। জমির মালিকানার হ্রাস-বৃদ্ধি যে কীভাবে পূর্ববাংলার হিন্দু ও মুসলিম মানসিকতা প্রভাবিত ও চালিত করেছিল তার যথাযথ বিবরণ আছে মিহিরবাবুর বিষাদবৃক্ষে। তিনি লিখেছেন, ‘পিছারার খালের চৌহদ্দিতে যেমন, গোটা পূর্ব বাংলায়ও তেমনি, সামন্তশ্রেণী বলতে হিন্দু সামন্তদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু তা ছিল মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর সামগ্রিক হিসেবে। তার অর্থ এই নয় যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জমিদার বা অন্য মধ্যস্বত্বভোগীরা সাধারণ এইসব মানুষকে শোষণ বা নির্যাতন করত না। আমার পরিম-লে আমি অনেক তথাকথিক তালুকদার দেখেছি যারা সাম্প্রদায়িকভাবে মুসলমান এবং শ্রেণীশোষণ বা নির্যাতনে ওখানকার হিন্দু জমিদার বা তালুকদারের তুলনায় কিছুমাত্র ভিন্ন নয়। সেক্ষেত্রে লিগপন্থীরা সাধারণদের বুঝিয়েছিল যে পাকিস্তান কায়েম হলে সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদ হবে এবং অবস্থাপন্নদের সংযত রাখার জন্যে ইসলামি বিধি মতে ‘জাকাত’, ‘খয়েরাত’ ইত্যাদি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু পাকিস্তান কায়েম হবার পর এমনকি মধ্যস্বত্ব প্রথা উচ্ছেদ হবার পরও এই প্রতিজ্ঞা পালনের কোন প্রচেষ্টাই হয়নি। না হওয়ার কারণটিও অবশ্য শরিয়তি ব্যবস্থার অন্তর্গত, অন্যের ‘হক্কের সম্পত্তি’ দখল করা না-জায়েজ, হারাম – এমত নির্দেশ। সে সম্পত্তি হিন্দুর হলে জায়েজ এবং মুসলমানের হলে না-জায়েজ, এসব বিতর্কে তখন অন্তত কেউ যাননি…।’ (পৃ ২২৩)।

আরেক জায়গায় মিহিরবাবু লিখেছেন, ‘আশেপাশের মুসলমান গ্রামগুলিতে যথেষ্ট উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবার বিশেষ ছিল না। মাঝারি মাপের যারা তারাই এখন সব ছেড়ে যাওয়া হিন্দুদের সম্পদ নিয়ে নিজেদের ঘর এবং জীবন সাজাতে চেষ্টা করছে। এই সময়টা থেকে বড়, মাঝারি এবং কিছু ছোট কৃষক পরিবারও ছেড়ে যাওয়া

হিন্দুদের সম্পত্তির পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনায় বেশ সচ্ছল হয়ে ওঠে। রাতারাতি তাদের বাড়ি-ঘরদোরের চেহারা বদলে যেতে থাকে এবং তারা বেশ হোমড়াচোমড়া হয়ে দাঁড়ায়।’ (পৃ ৩৩)।

অন্যদিকে ‘পিছারার খালের আশেপাশের হিন্দু সমাজটি তখন একেবারেই ভেঙে গিয়েছিল। ফলে অবশিষ্ট হিন্দু অধিবাসীদের মধ্যে একটা নৈতিক অধঃপতন আসেত্ম আসেত্ম পরিলক্ষিত হতে থাকে। পারিবারিক শাসন আলগা, অভিভাবকেরা উদাসীন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই, বিবাহের বয়স অতিক্রামত্মা মেয়েদের বিয়ে-থা দেওয়া হচ্ছে না। সে এক মাৎস্যন্যায়ী অবস্থা।’ (পৃ ৪৩)।

বিদ্বজ্জনরা বিভিন্ন নিবন্ধে দেখিয়েছেন, পূর্ববাংলায় নিম্নবর্গীয় ও নমঃশূদ্ররা বরাবরই ছিল একটি দোদুল্যমান শ্রেণি। নিম্নবর্গীয় পরিচিতি সত্তা হিন্দু বা মুসলিমের সত্তা থেকে স্বতন্ত্র – এরকম একটা বোধ বরাবরই তাদের মধ্যে অটুট ছিল। তারা কখনো দাঁড়িয়েছে মুসলিমদের পাশে, কখনো হিন্দুদের। দেশভাগের প্রাক্কালে মুসলিম লিগের বন্ধু হিসেবে যোগেন্দ্রনাথ ম-ল হয়ে উঠেছিলেন নমঃশূদ্রদের অবিসম্বাদী নেতা। পরবর্তীকালে জিন্নাহর প্রথম সরকারে পূর্ববাংলা থেকে আমন্ত্রিত একমাত্র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ১৯৫০ সালেই অবশ্য যোগেন্দ্রনাথ জিন্নাহর মন্ত্রিসভায় তিনি যে কতটা অবহেলার পাত্র তা বুঝে যান এবং একটি দীর্ঘ পদত্যাগপত্র লিখে ভারতে চলে আসেন। তা সত্ত্বেও অনেকদিন পর্যন্ত নিম্নবর্গীয়দের ধারণা ছিল, মুসলিম দাঙ্গাবাজরা তাদের স্পর্শ করবে না। মুসলিমদের প্রধান শত্রম্ন হলো হিন্দু। কিন্তু যেখানে জমিস্বার্থই প্রধান এবং রাষ্ট্র যখন সরাসরি মদদ ও প্রশ্রয় দিচ্ছে তখন নিজেদের আর কতদিন নিরাপদ রাখা সম্ভব। নিম্নবর্গীয়দের ওপর আক্রমণ মিহিরবাবু প্রত্যক্ষ করেছেন পঞ্চাশের দশকের শেষে। তিনি লিখেছেন, ‘আটান্ন-ঊনষাট সাল। পিছারার খালের আশেপাশের ভদ্র হিন্দু গেরস্তরা প্রায় শতকরা নিরানববই ভাগ তখন গ্রাম ত্যাগ করেছেন। শুধুমাত্র নিরুপায় হয়ে কিছু ভদ্র হিন্দু এবং নিম্নবর্ণীয়রা, যুগী, নাপিত, ধোপা, কামার, কুমোরেরা গ্রামে রয়ে গেছে। নিম্নবর্ণীয়দের তখনও ভরসা আছে যে মুসলমান শাসকশ্রেণী তাদের উপর আঘাত হানবে না।… পরে আর নিম্নবর্ণীয় বা বর্গীয় হিন্দু-মুসলমানদের অভিন্ন স্বার্থের কথা ক্ষমতাসীন কায়েমি স্বার্থান্বেষী সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকদের মনে থাকে না।… উচ্চবর্গীয়দের সম্পত্তি দখল হলে তাদের নজর পড়ে অপবর্গীয়/ বর্ণীয়দের গেরস্থালিতে। অতএব দখলকারিরা কায়দা পাল্টাতে শুরু করে।… তাঁতি বা যুগীদের ভিটেমাটি দখল শুরু হয়।… তখন আমাদের সংহতি সংগীতের সেইসব পংক্তিগুলো হারিয়ে যেতে থাকল –

হিন্দু ও মুসলিম এক পরানের

আমরা করি না বিবাদ…।’ (পৃ ২২১)

একটি ন্যায্য প্রশ্ন হলো, মিহিরবাবু তাঁর এই বইয়ের নাম বিষাদবৃক্ষ রেখেছেন কেন? যে-পিছারার খালের বর্ণনা দিয়ে তিনি তাঁর লেখা শুরু করেছিলেন তার পাড়ে আছে একজোড়া রেন্ট্রি গাছ – লেখকের ভাষায় একত্রে সেই মহাবৃক্ষ বহু ইতিহাসের সাক্ষী। এই বৃক্ষের নিচে একদা সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন। হিন্দু-মুসলিম বা নিম্নবর্গীয়দের বহু গান, কথকতা, যাত্রাপালার আসর বসত ওই বৃক্ষের আশপাশে – তারপর দেশভাগ হলো, একে একে চলে যেতে লাগল হিন্দুরা, সেই মর্মান্তিক ঘটনারও সাক্ষী ওই মহাবৃক্ষ। হিন্দুরা চলে যাওয়ার ফলে সেই পিছারার খাল আর বড় খালের দুই পাড়ে সৃষ্টি হলো এক বিশাল শূন্যতা। ‘সেই শূন্যতা আমি স্বয়ং উপলব্ধি করেছি, উপলব্ধি করতে দেখেছি ওখানে থেকে যাওয়া হিন্দুদের এবং মুসলমানজনেদেরও। এমনকি যারা হিন্দুদের দেশত্যাগজনিত কারণে সমূহ লাভবান, তাদের বাড়ির যুবজনেরা বা মেয়েরা এই শূন্যতার কারণে যে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করত তাও তো দেখেছি। এই শূন্যতা ভরাট করার উপায় এখানের মুসলমান সমাজের মানুষদের তখন ছিল না। পিছারার খালের আবেষ্টনীর মুসলমান এবং তফসিলিভুক্ত মানুষের মধ্যে কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসিত্মত্ব ছিল না। যা দু-একজন এই শ্রেণীচরিত্রের ছিলেন, তারা শ্রেণী গঠন করেননি, শুধুই মধ্যবিত্ত হিসেবে স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির ফয়দা তুলেছেন। মধ্যবিত্তশ্রেণী বলতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভদ্রবাবুরাই ওখানে সমাজের স্তম্ভ এবং এ কারণেই তাদের দেশত্যাগ এই বিরাট শূন্যতার বাতাবরণ তৈরি করেছিল।’ (পৃ ১৩০)

এই সাংস্কৃতিক শূন্যতার বিষয়টি কোনো দেশভাগের ইতিহাস বইতে পাওয়া যাবে না। এই শূন্যতা কোনো সংবেদনশীল হৃদয় ছাড়া অনুভব করা অসম্ভব। এটাই একটা স্মৃতিকথার সাফল্য এবং হয়তো এ-কারণে তা অনেক গুরুত্বপূর্ণও বটে। আরো বোঝা যায়, লেখক পূর্ববাংলাকে ভালোবেসেছিলেন সেখানকার একজন মানুষ হিসেবে, হিন্দু-মুসলমান সহাবস্থান ধরে নিয়েই। সে-কারণেই ওই শূন্যতা তাঁর চোখে প্রকট হয়ে উঠেছিল। বিষাদবৃক্ষ হলো আসলে সেই শূন্যতারই কাহিনি।

 

দয়াময়ীর কথা

একটি অসম্ভব সুন্দর, সম্পূর্ণ ব্যাকরণসম্মত স্মৃতিকথা হলো সুনন্দা শিকদারের দয়াময়ীর কথা। ব্যাকরণসম্মত এই অর্থে যে, লেখিকা এখানে শুধু আদ্যোপান্ত স্মৃতিচারণই করেছেন – জিন্নাহ, নেহরু, কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ প্রসঙ্গ তাঁর রচনায় একবারো আসেনি। দয়ার জন্ম ১৯৫১ সালে ময়মনসিংহের দিঘাপাইত গ্রামে। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত দশ বছর তিনি কাটিয়েছেন ওই প্রত্যন্ত গ্রামে। দয়ার কৃতিত্ব এই যে, পরিণত বয়সে নিজের আত্মকথা লেখার সময়েও তিনি তাঁর বোধবুদ্ধি ও সারল্য দিয়ে সেই দশকটিকে বিচার করেছেন। নিঃসন্দেহে দয়াময়ীর কথা পঞ্চাশের দশকের পূর্ববাংলার একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। লক্ষ করার মতো, লেখিকার ক্ষোভ বারবার ফুটে উঠেছে সে-যুগের হিন্দু ভদ্রলোকদের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে। যেমন ‘আমার পালিকা মায়ের কথা আমার কাছে ছিল যেন নিয়তির বাণী।’ ‘দয়া ভুইল্যা যাইও না মাজম আমাদের কামলা, মোসলমানের পোলা, গরু-বাছুর, খ্যাত-খামার দেখনের মানুষ, তোমার রক্তের সম্পক্কের কেউ না। মিলন-মিশনের কাম নাই।’ (পৃ ১১)। এই হলো এক হিন্দু উচ্চবিত্ত মহিলার অন্তরের কথা। আর তাঁর প্রজা দরিদ্র বর্গাচাষি মাজম ফজরের নামাজের সময় বলে, ‘ও মা, দয়া তুই কি পাগুলনি; আল্লাহর সঙ্গে দুগ্গা-লক্ষ্মীর কুন কাজিয়া নাই। বেহেসেত্ম সগ্গলের মধ্যে ভাব-ভালবাসা, কুন কাজিয়ার জায়গা নাই। ওইসব মাইনষে করে।’ (পৃ ১২)।

দয়াময়ীর কথা পড়লে বোঝা যায় সে-সময়ের পূর্ববাংলার প্রান্তিক গ্রামগুলোতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ তেমন তীব্র ছিল না। দাঙ্গা, খুন-খারাবিও নয়। সাধারণ কিছু ছোঁয়াছুঁয়ির সমস্যা বাদ দিলে দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি অটুট ছিল। তবু বহু হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। দিঘাপাইত গ্রামটা ছিল শান্ত। কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা নেই। তবু চারিদিকে যে একটা অশান্তির হাওয়া বইছে তা ওই নিস্তরঙ্গ গ্রামে বসেও টের পাওয়া যেত। সুনন্দা শিকদার লিখেছেন, ‘বড় তাড়াতাড়ি পাল্টে যাচ্ছে চারিদিকের দৃশ্যপট।… পলুদাদের বাড়িটা কি তাড়াতাড়ি ভিটে হয়ে গেল। চলে গেল গরুর গাড়িতে করে থালাবাসন, কাঁঠাল গাছের পিঁড়ি, পোঁটলায় ভর্তি চিড়ে-মুড়ি, ট্রাঙ্ক, শতরঞ্চি দিয়ে বাঁধা বিছানা-বালিশ।… চোখ মুছতে মুছতে কেউ যেতেন, কেউ আবার চিৎকার করে বলতে বলতে যেতেন – ‘ও গো চলি জন্মের মতন, যদি কোন অপরাধ কইরা থাকি মাপ কইরা দিও।’ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্রায় প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখতাম। অনেকে আবার বলতেন, ‘ওরে বুড়ি যাইতেছি সারা জীবনের মত। গাঁওয়ের কারো সঙ্গে তো আর দেখা হইব না। হিন্দুস্থানে গেলে তুই দেখা করিস।’ (পৃ ১৯) কোনো সন্দেহ নেই যে, দুই বাংলাজুড়ে লাখ লাখ মানুষের এই আকস্মিক বিচ্ছেদই হলো বঙ্গবিভাজনের অন্যতম ট্র্যাজিক পরিণতি।

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ না থাক, ছোঁয়াছুঁয়ির সতর্কতা ছিল তীব্র। দয়াময়ীর কথায় তার অজস্র নিদর্শন আছে, ‘মা কে সিরাজদা একটা কথা বলত, তোমারও পিসিমা কম না। এতকাল তোমাগো সঙ্গে আমাগো সম্পক্ক, তাও তোমারে ছুঁইলে তোমাগো জাত যায়। দয়া একটা ছুট পোনাই, অরে কারো সঙ্গে মিলবার দেও না। তোমাগো ঘরবাড়ি পুড়ল, দ্যাশ ছাইড়ত্যাছো, কিন্তু জেদটা ঠিক পুইস্যা রাখছ।… রাগ কইরো না পিসিমা, অনেক দুঃখে এই কথা কইলাম। তুমি আমারে ঘরে ডাইক্যা কোনদিন এক গিলাস পানি খাওয়াইছো?’ (পৃ ২৯)

সুনন্দা শিকদারের মতে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বঙ্গবিভাজনের মূলে আছে ওই ছোঁয়াছুঁয়ির সমস্যা। হিন্দুদের শরীর মুসলমানে স্পর্শ করলে হিন্দুদের জাত যায়। এর অর্থ হিন্দু ও মুসলমান দুটি আলাদা জাতি। এসে যায় জাতিবিরোধ। এই বিরোধে হিন্দুরাই যে সেই সময় হয়ে পড়েছিল দুর্বল প্রতিপক্ষ, সেকথা সবাই জানে। সে-কারণেই তো দলে দলে হিন্দুদের দেশত্যাগ। কিন্তু হিন্দুরা কি ছিল একেবারেই নির্দোষ, অবলা একটি জাতি! বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সুনন্দা শিকদার তাঁর সোবহান দাদার মুখ দিয়ে, ‘নোয়াখালিতে হিন্দুদের উপর মুসলমানেরা ভীষণ অত্যাচার আর জুলুমবাজি করেছে। হিন্দু মেয়েদের অপমান করেছে। তবে দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানদের এত অপঘিন্না হিন্দুরা করেছে তারও তুলনা নেই।… হিন্দুরা কুনদিন মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দেয় নাই। ছুঁইলে জাত যায়। আলাদা হুঁকা, আলাদা বাসন। মুসলমান মেহমানেরে বাইরে বসাইয়া খাওয়ায়। অনেক বছর ধইরা এই ভুলগুলা হিন্দুরা করছে। তবে যেভাবে মোসলমানেরা শোধ তুলতাছে, এইডা কিন্তু আমাগো পছন্দ না।’ (পৃ ৮৯)

 

দ্যাশ থেকে দেশে

স্মৃতিকথা হিসেবে দ্যাশ থেকে দেশে সার্থক ঠিকই কিন্তু বইটিকে দেশভাগ বিষয়ক স্মৃতি আলেখ্যগুলোর তালিকায় স্থান দেওয়া উচিত কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সম্পূর্ণ বইটি তিনটি আলাদা খ– বিভক্ত। এর মধ্যে দেশভাগ ও দেশত্যাগের যাবতীয় স্মৃতি সংকলিত হয়েছে দ্বিতীয় খ–, যার নাম ‘দ্যাশ থেকে দেশে আসার বৃত্তান্ত’। এই খ-টি মোট দুশো পাতার বইতে দখল করেছে মাত্র ছাবিবশ পৃষ্ঠা। অর্থাৎ দেশভাগ এই লেখিকাকে শৈশবে যতটা আলোড়িত করেছিল পরবর্তীকালে তার রেশ আর তেমন তীব্র ছিল না। এই বইটি আরো এক বিচারে পূর্বে আলোচিত দুটি বইয়ের থেকে আলাদা। তা হলো, আগের দুটি বই পড়লে বোঝা যায় তাদের লেখক-লেখিকাদের মনে দেশভাগজনিত বিষণ্ণতা একটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। কিন্তু আলোচ্য বইয়ের লেখিকা সীমা দাশ কলকাতায় এসে আরো বৃহৎ কর্মকা–র সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এবং আরো অনেক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, যেগুলো তাঁর দেশত্যাগের বেদনা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। সম্ভবত সেটাই বাঞ্ছনীয়। তাই অতীতচারণ করতে গিয়ে তিনি পূর্ববাংলার জীবনকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, কলকাতার গণনাট্য সংঘ, সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস ইত্যাদি স্বনামধন্য চরিত্রও সেখানে সমমর্যাদা পেয়েছে। দ্যাশ থেকে দেশে তাই আদ্যোপান্ত একটি স্মৃতিকথা হলেও পুরোপুরি দেশভাগ বিষয়ক স্মৃতিকথা নয়।

আরো একটি বিষয় অবাক করার মতো। লেখিকা যতদিন পূর্ববাংলায় ছিলেন (শৈশব), কোনো মুসলমান চরিত্র তাঁর সেই শৈশবের স্মৃতিতে নেই। সীমা দাশের জন্ম পটুয়াখালীতে ১৯৩৮ সালে। বাংলার বিভাজনপূর্ব রাজনীতিতে পটুয়াখালী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তার এক বছর আগে ১৯৩৭ সালে এই পটুয়াখালী আসনে মুসলিম লিগ নেতা ঢাকার নবাব নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করেছিলেন সদ্য গঠিত কৃষক প্রজাপার্টির নেতা ফজলুল হক। শুধু বাংলা নয়, সারা ভারতের দৃষ্টি ছিল পটুয়াখালীর দিকে। এই নির্বাচনে জিতে হক সাহেব বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। শুধু তাই নয়, তাঁর জয় প্রমাণ করে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতিতে নেতা নির্বাচন বা বর্জনের ক্ষেত্রে কৃষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর অ্যান্ডারসন নিজে নাজিমুদ্দিনের হয়ে প্রচার করে তাঁকে জেতাতে পারেননি। এসব ঘটনা সীমা দাশের বাবা, কাকা বা পড়শিজনদের মধ্যে কেমন প্রভাব ফেলেছিল তা এই স্মৃতিকথাটি পড়লে বোঝা যায় না। লেখিকার জন্ম একটি সংগীতমগ্ন, সংস্কৃতিমনা পরিবারে। বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর চর্চা, প্রয়োগরীতি ইত্যাদি এই স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বারবার। আবার লেখিকা ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার স্মৃতি উলেস্নখ করেছেন, ‘মাঝরাতে হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসছে কোলাহল চিৎকার – আল্লা হো আকবার ধ্বনি।… আমাদের পাড়াটায় সবাই হিন্দু।… দূর থেকে তারা দেখতে পায় আগুন যেন আকাশ ছুঁতে চলেছে। এরই মধ্যে শোনা যায় দুরকম ধ্বনি – ‘বন্দে মাতরম’, ‘আল্লা হো আকবর’… বাড়ির উঠোনে তখনও তীর, ধনুক, লাঠি, ইঁট, বালি পড়ে। এই আগুন জানিয়ে গেল ভেতরে ভেতরে হিন্দু মুসলমান একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে।’ (পৃ ১১৯-১২০)।

এই দাঙ্গার পর তাঁদের পরিবারটি আর বেশিদিন পূর্ববাংলায় থাকেনি। বোঝাই যায় ওই দাঙ্গা সেই শান্তিপ্রিয়, সংগীতপ্রেমী পরিবারটির অন্তস্তলে বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল, পুড়ে গিয়েছিল তাঁদের দোকানটিও। সীমা দাশের বাবা তখন থেকেই কলকাতায় চাকরির সন্ধান শুরু করে দেন। এরপর আসে দেশত্যাগের গল্প। তার আগে অবশ্য লেখিকা স্বাধীনতা ও দেশভাগের দিনটি বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘স্বাধীনতার দিন বাড়ীতে দুরকমের পতাকা টাঙানো হয়েছিল। একটা পাকিস্তানের অন্যটা কংগ্রেসের।… মুসলমান পাড়ার তুলনায় এ সাজ জৌলুসহীন, ওদের ওখানে কোন কংগ্রেসের পতাকা নেই। কেবল শ’য়ে শ’য়ে জিন্নাহর ছবি। দূরে মুসলমান পাড়ায় আমরা ছোটরা কয়েকজন হাঁটতে হাঁটতে গেছি। ওরা কি করছে দেখি গে। ওদের টানাটানি, আপ্যায়নের ঠেলায় আমরা তো অস্থির। প্যাকেট প্যাকেট মিঠাই, তবক দেওয়া সব মুসলমানি মিষ্টি। তখন ছোট হলেও মনে সুখ পাচ্ছি না। যেন হেরে গেছি আমরা।’ (পৃ ১২৩)

এখানে লেখিকার সরল সত্য ভাষণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়েছে। প্রথমত, দেশভাগ হওয়ামাত্রই যে মুসলিমরা হিন্দু বিতাড়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তা নয়। দুটি আলাদা সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত হলেও বিদ্বেষ তখনো ছিল না। যা এসেছে পরে, বিভিন্ন সামাজিক শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। দ্বিতীয়ত, লেখিকা মনে সুখ পাচ্ছিলেন না। তাঁর মনে হচ্ছিল তাঁরা হেরে গিয়েছেন। কেন এই পরাজয় বোধ?

এই বোধের উত্তর কোনো স্মৃতিকথাতেই নেই। কিন্তু নিঃসন্দেহে এই পরাজয়ের পীড়নই ছিল অন্তত প্রথম পর্যায়ে দেশত্যাগের আসল কার্যকারণ। এই দেশত্যাগের বিষণ্ণতা সবার জন্যই একরকম, ‘সবার চোখে জল। কেউ বলে আবার আইস্যো। কেউ বলে আমাদের ভুলবা না তো। গিয়াই পত্র দিও। সবার কান্না দেখে মনটা হু হু করে ওঠে।’ (পৃ ১৩২) পরে আবার, ‘সব ছবি হয়ে যাচ্ছে, স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে,… ওই তো দূরে স্টিমার ঘাট, ওই তো পাবলিক থিয়েটার হল, ওই তো বাজার, ওই আদালত, পোস্টাপিস, কালীবাড়ি, ওই তো ওখানে সতীন সেনের বাড়ি।… আমরা আবার আসুম। মায়ের চোখেও জল।’ (পৃ ১৩৬)

 

এই তিনটি স্মৃতিকথারই লেখক-লেখিকারা হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি এবং তিনটি রচনারই মূল সুর একটাই, দেশভাগ না হলেই ভালো হতো। কিন্তু একথা তো ঠিক, পূর্ববাংলার দরিদ্র মুসলিম কৃষকরা সর্বামত্মঃকরণে দেশভাগ চেয়েছিলেন। পাকিস্তান নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের তাঁদের কাছে কোনো তাৎপর্য ছিল না। তাঁরা ভেবেছিলেন, পাকিস্তান হলে বুঝি জমিদারি উচ্ছেদ ও তাঁদের দারিদ্রে্যর অবসান হবে। অর্থাৎ কৃষকদের বিদ্রোহের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানপ্রাপ্তি। এর জন্য কৃষকদের দায়ী করা যায় না, দায়ী হলো তারা – যারা কৃষকদের সামনে সেই মরীচিকা তুলে ধরেছিল। দেশভাগ হলো আসলে সেই মরীচিকার কাহিনি আর ওপরে বর্ণিত স্মৃতিকথাগুলো হলো তার উপকাহিনি বা শাখা-প্রশাখামাত্র। আমাদের প্রার্থনা ও লক্ষ্য হওয়া উচিত এহেন মরীচিকার মায়াজালে জড়িয়ে হিন্দু বা মুসলিমরা যেন আর বিপথগামী না হয়।

 

গ্রন্থসূত্র

১. Bengal Divided : Hindu Communalism and Partition, 1932-1947, Joya Chatterji.

২. আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলার রাজনীতি, আবুল হাসিম।

৩. The Agrarian System of Bengal, Anil Chandra Banerjee, Vol-II.

৪. প্রাগুক্ত।

৫. Identity of Bengalee Muslims, Mohammad Shah Ed. .

৬. Pakistan As A Peasant Utopia: The Communalization Of Class Politics In East Bengal, 1920-1947, Taj ul-Islam Hashmi.

৭. হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক, নতুন ভাবনা, ড. পঞ্চানন সাহা।

৮. Bengal : The Peasant Question 1920-47, Partha Chatterjee.

৯. তদেব, ড. পঞ্চানন সাহা।

১০. অন্যকথা সাময়িকপত্র, তানভীর মোকাম্মেল।

১১. India’s Partition, Strategy, Process and Mobilisation, Mushirul Hasan Ed. . r

শেয়ার করুন

Leave a Reply