দরজা

দেবেশ রায়

যে-কোনো ফোন বাজলেই প্রথমে চমকে উঠতে হয়। ঠিক চমকও নয় যেন। গলা বা বুকের দিকটায় একবারই ঢিপ করে ওঠে। করে কী করে না। বাড়িতে ফোনের সংখ্যা তো গুনে শেষ করা যাবে না। বি-এস-এন-এলের সেই সাবেকি ফোন দুটো। টাটার একটা ওয়াকি। ডাক্তারবাবুর একটা মোবাইল­ – বাড়ির জন্য। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে থাকে তিনটি মোবাইল। অন্বিতার নিজের দুটো ও আরো একটা নতুন কিনেছে ওই নোট বাতিলের পর দোকানে টাকা দেয়ার সুবিধের জন্য। মেয়ের একটা দামি মোবাইল ছিলই। এখন ঠিক কটা অন্বিতা জানে না। তারা তিনজনই যখন বাড়িতে থাকে, সকাল নটা-সাড়ে নটা পর্যন্ত ও রাত সাড়ে নটা-দশটার পর, তখন, সব সময়ই কারো না কারো, কোনো-না-কোনো ফোন বাজবেই। তখন ফোন বাজলে বুকের ওই ঢিপটা হয় না। যার ফোন সে বুঝে নেয়। কিন্তু যখন অন্বিতা একা থাকে – তখন ফোন বাজলেই বুকের ওই ঢিপটা হয়, কী জানি বাবা, কী আবার হল।

ফোন বাজলে বুকের যে-ঢিপটা হয়, সেটাকে অন্বিতা ধরে নেয়, কোন ফোনটা বাজছে সেটা সে বাজামাত্র বুঝতে পারার অক্ষমতা বলে। যখন তারা সবাই একসঙ্গে থাকে, তখন কিন্তু অন্বিতা চিনতে পারে, অন্য ঘর থেকে এনেও দেয়, যার ফোন তাকে। কিন্তু একা হলেই গুলিয়ে যায়! তখন সব ফোনই যেন তার।

সন্ধে সাতটা নাগাদ ফোনটা এল। একটি ছেলের গলা, ‘ডাক্তারবাবুকে ধরে নিয়ে গেল – ’

মানে কি কথাটার? কে ফোন করছে? ‘আপনি কে বলছেন? কী বলছেন? কাকে চাইছেন?’

‘আমি সুমন। সুমন। আপনি ম্যাডাম তো?’

‘আমি সুমন নামে কাউকে চিনি না’ – অন্বিতা ফোনটা বন্ধ করে দেয়ার পর দেখে ফোনটা এল ডাক্তারবাবু যে-মোবাইলটা বাড়িতে রেখে যান, সেটিতে। ওটাতে কখনোই অন্বিতার ফোন আসে না। অথচ বলল, ‘আপনি ম্যাডাম তো?’ ম্যাডাম মানে তো তাকেই চাইছিল। সন্ধেবেলা আর কোন ডাক্তারবাবু বাড়ি থাকে? থাকলে ম্যাডামই থাকে বাজে

নিশ্চিত হতেই ফোনটা আবার বেজে উঠল, ওই ফোনটাই। অন্বিতা একটু ভাবল, ফোনটা ধরবে, না, নামিয়ে রেখে দেবে। বারবার যাতে বিরক্ত করতে না পারে।

কিন্তু ফোনটা তুলে সুইচ অফ না করে তাকিয়ে দেখল – কত নম্বর থেকে ফোনটা করা হচ্ছে। দেখে, ফোন নম্বরটাকে তার চেনা মনে না হলেও একেবারে অচেনা ঠেকল না। যেন নম্বরটা তার চেনা থাকা উচিত। অন্বিতার কোনো নম্বরই মনে থাকে না। এই ফোনে ফোন করেছে, ডাক্তারবাবুর কোনো দরকারি ফোনও তো হতে পারে। অন্বিতা এবার একটু নিচু গলাতেই ‘হেলো’ বলল।

‘আপনি ম্যাডাম তো?’

‘আমি কে সেটার দরকার কী। আপনার কাকে দরকার?’

‘আমাদের ডাক্তারবাবুর ম্যাডামকে খুব দরকার।’ অন্বিতা একটু চুপ করে থাকে। যে বলছে, তার গলায় কেমন অনিশ্চয়তা, যেন কথাটা গুছোতে পারছে না।

‘আপনি কে বলছেন, কোথা থেকে বলছেন, আপনাদের ডাক্তারবাবুর নাম কী, সে সব তো কিছুই বলছেন না!’

‘ও। আমি সুমন। আমাদের সার্ভে পার্কের ক্লিনিক থেকে বলছি। এটা তো আমাদের ডাক্তারবাবুরই নম্বর। আমি আগেও এই নম্বরে ফোন করেছি। আমার ম্যাডামকে দরকার।’

অন্বিতা হয়তো ভিতরে-ভিতরে একটু ভয় পায়। আজ তো শুক্রবার। শুক্রবার তো সার্ভে পার্কের ক্লিনিকেই থাকে। ছেলেটি তো ডাক্তারবাবুর নাম অন্তত একবার বলবে!

‘আরে, আপনাদের ডাক্তারবাবুর নাম কী?’ সেই ধমকেই হোক, বা ছেলেটি হয়তো একটু গোছাতে পেরেছে, ‘ডক্টর গুহনিয়োগী। স্যারকে তো এই মাত্র ধরে নিয়ে গেল।’

‘ধরে নিয়ে গেল? কারা ধরে নিয়ে গেল? ডাক্তার গুহনিয়োগীকে?’

‘হ্যাঁ, ম্যাডাম-’

‘মানে ডাক্তারবাবুকে ক্লিনিক থেকে বের করে নিয়ে গেল? ধরে নিয়ে গেল মানে? দলবেঁধে? গাড়িতে?’

‘তারা তো পেশেন্টই ছিল – ’

অন্বিতা সব কথাই সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে চায় – এখন এমনটাই তার স্বভাব বা অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে। যেন দ্বিতীয়বার জিগ্গেস করে বোঝার মত কোনো ঘটনা তার রোজকার জীবনে ঘটতেই পারে না বা ঘটা উচিত নয়। রাস্তায় কোনো স্পিড ব্রেকার দেখতে না পেলে গাড়ির ভিতরে বসেও যেমন হোঁচট খেতে হয় একেবারে হুমড়ি খেয়ে।

তেমনি হুমড়ি খেয়েও অন্বিতা অভ্যাসবশে না-ভেবে ও না-বলে পারল না, আর, সেই এক সেকেন্ডেরও কম সময় জুড়ে ভাবনাটা সেরে সে একটু নিচু গলাতেই জিগ্গেস করতে পারল, ‘কে ধরে নিয়ে গেছে? পেশেন্ট পার্টি?’

ডাক্তারের বউ আর মেয়ের মা হলে প্রথমেই তো মনে আসে – পেশেন্ট পার্টি পেটাল কী না বা মেয়েটা রেপ হয়ে গেল কী না।

এমন একটা চরম অবস্থা যে-কোনো সময় ঘটে যাওয়ার মত স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এতই স্বাভাবিক যে এমন ভয়কে অস্বাভাবিকও মনে হয় না। বা, এমন ভয় যখন সত্য হয়ে ওঠে না, তখন কোনো আশঙ্কা কেটে যাওয়ার মত স্বস্তিও জোটে না। অথচ যতক্ষণ বাড়ির কর্তা বা মেয়ে বাড়ির বাইরে ততক্ষণ যে-কোনো ফোনেই চমকে উঠতে হয় বা এমন কি মোবাইল ফোনের কোনো হোয়াটসঅ্যাপ বা এসএমএসেও। এ যেন বাড়ির ছাদটা মাথার ওপর কখন ভেঙে পড়ে এই ভয় নিয়ে দিন কাটানো। অথচ তাদের এই বাড়ির তেমন কোনো বিপদের ভয় নিজের মনের অসুখ ছাড়া কিছুই নয়। নিজের মনের অসুখ, কে আর মানতে চায়। অন্বিতার একারই যদি এমন হতো তা হলে না-হয় অন্বিতা নিজের এমন আতঙ্কের দিনরাত যাপনকে অসুখ বা বাতিক বলেই ভেবে নিতে পারত। কিন্তু প্রতিদিনই তো সে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনদের ফোন করে। ফোন ধরেই ‘হেলো’ বলার সঙ্গে-সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে দেয়ার আওয়াজ পায়। কেউ-কেউ তত সাবধান নয়। বলেই ফেলে – ও তুই! বা, ও তুমি! আমি ভাবলাম, কে না কে? অন্বিতা একটু যেন যাচাই করতেই মিথ্যে রসিকতায় জিগ্গেস করে, কেউ কি তোমায় টিজ করছে? টিজড হতে তো ভালই লাগার কথা। খুব-যে ঠিকঠাক উত্তর পায় তাও না। একদিন ওর এক ফুলমাসি শুধু বলেছিল – আর পারি না রে, ফোন তুললেই নানা রকম অফারের কথা বলে। সব যে বুঝি, তাও না। অন্বিতার ফুলমাসি না-বোঝার মত মানুষ নন। কেমন ভয় করে রে! এত লোক, বা দোকানদার আমাদের চেনে কী করে? আমাদের ফোন নম্বরই বা পায় কোত্থেকে। কেউ-কেউ তো এমন মিষ্টি করে আপনজনের মত কথা বলে যে আমারই ভয় হয়, আমিই চিনে উঠতে পারছি না, নিশ্চয়ই নিজের জন কেউ। অন্বিতাই তখন ফুলমাসিকে হেসে বুঝিয়েছে, ও-সব তো রেকর্ড করা গলা ফুলমাসি, কারো কারো কথা-বলাই এমন যে তোমার কত চেনা ঠেকবে। এটা তো একটা প্রফেশন। খুব ডিম্যান্ড। ফুলমাসি বলেছিল – আরে, সে কি আর জানি না, তবু সেটা বুঝতে তো সময় লাগে, যদি সত্যি নিজের কেউ হয়। সেদিন একজন জিগ্গেস করল – আপনার ডান গোড়ালির ব্যথাটা কেমন আছে – আমি তো চমকে উঠেছি। কী করে সব জানে রে? ফুলমাসির এই কথায় অন্বিতা হেসে উঠে বলেছিল, গুগ্লে।

আশ্চর্য, অন্বিতা যদি কখনো কাউকে, ফুলমাসির কথাগুলোই বলে, তার বিস্ময়ের কথা, তার ক্ষণিক বিশ্বাস থেকে হঠাৎ জাগা স্থায়ী ভয়ের কথা, কে তাকে চেনে ও কে তাকে চেনে না এমন বিভ্রমের কথা, তাকে এত অচেনা-অজানা মানুষ জানে – এ যেন অচেনা জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলার মত, বা হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনায় রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে ঘিরে অসংখ্য অপরিচিত অথচ প্রত্যেকেই তাকে সাহায্য করতে চাইছে আর প্রত্যেককেই খুব পরিচিত সন্দেহভাজন বলে মনে হয় অথচ সেই ঘের থেকে তাড়াতাড়ি বেরতেও পারছে না, একবার পুলিশের কথা মনে হয়, আবার পুলিশ কী থেকে কীসে জড়িয়ে দেবে এমন ভয়ে কুঁকড়ে যেতে হয়, একমাত্র পরিত্রাণ মোবাইল ফোনে চেনা কাউকে ডাকা – এই সবের কিছু-কিছু টুকরো-টুকরো, তখন সে যাকে বলছে সেও হাসাহাসি করে, মজা করে, ফুলমাসিকে অন্বিতা যেমন বলল, প্রায় তেমনি সব কথা বলে।

বিপন্নতার বোধ, আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক, বাড়ির লোকের বাড়ি না-ফেরার ভয়, মেয়ের ধর্ষিতা হওয়ার ঘটনা – এমনই ছড়িয়ে পড়েছে, হাওয়ায়, মাটিতে, ঘুমে, যেন কোনো বড় শহরের মাটির তলার জলনিকালী বা বর্জ্যনিকালী পরিকল্পিত নালাগুলি, কোনো একটা বিভ্রাটে শহরের ওপরে উঠে আসছে, ও নিশ্চিতভাবে সেটা ফ্লাইওভারে-ফ্লাইওভারে দ্রম্নত উচ্চতর শহরটাকে নিজের স্রোতের ভিতর টেনে নিচ্ছে, অথচ, আশ্চর্য, এটা বোঝাই যাচ্ছে না। এর জন্য কোনো শারীরিক কষ্ট হচ্ছে না, বরং শারীরিক একটা আরামই বোধ হয় কখনো-কখনো।

অন্বিতা তো এখন সোফাতেই বসে আছে। কারণ, তার বাড়িতে সবই শরীরের আনুমানিক আরামের আসন ও আউটডোর, ড্রয়িংরুম, বেডরুম ও লিভিং স্পেসের পৃথক আরাম মেপেই। তার হাতে দুটো মোবাইল। সামনে বি-এস-এন-এলের রিসিভার, পাশে রিমোটও চার্জ দেয়া, একটা টাটার ওয়াকিও আছে। অনেক সময়ই তো অন্বিতা একসঙ্গে একাধিক ফোনে কথা বলে। কিন্তু সে বুঝতেই পারছে না, তার ডাক্তারস্বামীকে তাঁর একটা বেশ ভাল ও বড় ক্লিনিক থেকে, সার্ভে পার্ক তো শহরের সবচেয়ে খ্যাতিমান নতুন বসবাসের জায়গা, ধরে বা তুলে নিয়ে গেছে কারা তা সেই ক্লিনিকের অন্যান্য পেশাদার কর্মীরা বলতে পারছে না আর অন্বিতা ভেবে বের করতে পারছে না – কী হয়েছে, সেই প্রাথমিক খবরটা সে পাবে কী করে। ছেলেটি যে-মোবাইলে কথা বলছে, সেটা খোলাই আছে ও সেই মোবাইলে ওই ক্লিনিকে যেসব কথাবার্তা চলছে তার টুকরো গুঞ্জন শোনাও যাচ্ছে, যদিও সেই গুঞ্জনের কোনো অর্থ বুঝতে পারছে না অন্বিতা, যেমন হঠাৎ মিছিল-টিছিলের কারণে রাস্তায় আটকা পড়লেও ও জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেও বোঝা যায় না, কী মিছিল, কেন মিছিল, কাদের মিছিল – সে-হয়তো বাড়িতে ফিরে টিভিতে জানা যায়, তেমনি। অন্বিতার স্বামী বেশ নামকরা ডাক্তার, বেলভিউয়ের সঙ্গে যুক্ত, কলকাতা শহরে তাঁর আট-আটটি ক্লিনিক, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া রোগী দেখা হয় না, তাঁকে তাঁর সবচেয়ে বড় ক্লিনিক থেকে ধরে বা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মিনিট কয়েক আগেই হবে, অথচ অন্বিতা জানতেই পারছে না ঘটনাটা কী। এটুকুই মাত্র জেনেছে – তাঁকে ক্লিনিক থেকে তুলে নেয়া হয়েছে।

অন্বিতার যেমন হওয়া উচিত ছিল, তেমন কিছুই কেন ঘটছে না ভেবে অন্বিতা অস্থির হয়ে ওঠে। নিজেকে দোষীও মনে হয়। তার এমন কারো কথা মনে পড়ল না, যার কাছে সবটা বলে সে সাহায্য চাইতে পারে। বা, এমন কি যাকে সে ডাকতে পারে। প্রথমেই তো পুলিশের কথা মনে পড়ে। এমন জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সাহায্য চাইবার নম্বরও তার মোবাইলে আছে। সেই নম্বরটায় ডায়াল করে সে কী বলবে? আমার স্বামী ডাক্তার অমুক। আমি এইমাত্র ফোনে খবর পেলাম তাঁকে তাঁর এই ঠিকানার ক্লিনিক থেকে তুলে নিয়ে গেছে কারা। এমন একটা কথা পুলিশকে বলা যায়? পুলিশ ভাববে স্বামী-স্ত্রীর গোলমাল। নইলে তো অন্বিতারই পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত। একা? পুলিশ মানে, কোথায়? তার এক বন্ধুর দেওর পুলিশে কাজ করে। সে-বন্ধু হয়তো নিজের দর বাড়াবার জন্য তার দেওরের পোলাটাকে অনেক বাড়িয়ে বলেছে। অন্তত এতকাল তো তেমনি ভেবে এসেছে অন্বিতা। আজ সে তার সাহায্য চাইলেও, অন্বিতা তার নিজের সন্দেহ থেকে বেরবে কী করে। পুলিশ তো এমন বিপদ-আপদের কথা সব সময়ই শোনে ও পারলে সাহায্যও তো করে নিশ্চয়ই। কিন্তু পুলিশকে তো অন্বিতা সারা জীবনে এই একবারই ফোন করছে। সে কী করে জানবে পুলিশ তাকে কী জিগ্গেস করবে ও সে তার কী উত্তর দেবে। কিন্তু তার স্বামীকে কারা ধরে নিয়ে গেছে, তার আন্দাজ দিতে না পারলে পুলিশ কী করবে? পুলিশ যদি জিগ্গেস করে – আপনি কোত্থেকে কথা বলছেন তখন তো অন্বিতাকে বলতে হবে বাড়ি থেকে। তা হলে তো পুলিশ তাকে যুক্তিসংগতভাবেই বলতে পারে – স্পটে যারা ছিল তাদের কাউকে লোকাল থানায় রিপোর্ট করতে বলুন। তা হলে অন্বিতা কি সার্ভে পার্ক ক্লিনিকে ফোন করে ওদের তাই করতে বলবে।

অন্বিতা মোবাইলটা কানে লাগায়। ওদিকের মোবাইলটা খোলাই আছে। সেখান থেকে নিরর্থ গোলমালের আওয়াজ আসছে – জলভর্তি দিঘির ওপারের বস্তিতে আগুন লাগলে যেমন তাদের বাড়ি থেকে শোনা যায়। ঠিক দিঘি নয়, আবার দিঘি বলতে যে-চৌকো জলাশয়ের ধারণা তার মনে ছবি হয়ে আছে – এই জলভরা জায়গাটা তো তেমনি। ইংরেজিতে ওয়াটারস্পেস বলে একটা কথা চালু হয়েছে – কলকাতার ভিতরের ডোবা, খাল, পুকুর গোছের জায়গা বোঝাতে। ধারণা, আর সেই ধারণার সঙ্গে মেলে না এমন শব্দের গরমিলের মধ্যে মোবাইলটা কানে ঠেসে অন্বিতা শুনতে পায় ‘পুলিশ’ শব্দটি বারকয়েক, ‘ম্যাডাম’ শব্দটি মেয়েলি গলায় বার দু-এক, ‘সেন্সলেস’ শব্দটিও একবার বেশ জোরে, একজন খুব চিৎকার করে বলে, ‘আনটিল ম্যাডাম কিছু করতে বলেন, আমি নিজের থেকে কিছু করব না। তেমন কিছু করতে গিয়ে আমিই ফেঁসে যাই আর কী? আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি না। তা হলেও তো ফেঁসে যেতে পারি।’

অন্বিতা একটা অর্থ তৈরি করতে পারে, বেশ সোজা বলেই পারে। ক্লিনিকের লোকরা তাকে জানিয়ে দিয়ে, তার নির্দেশের অপেক্ষা করছে। সে, অন্বিতা যা বলবে, তারা তাই করবে। সেই জন্যই তারা মোবাইলটা খোলা রেখেছে। কেউ-কেউ ভাবছে – সে, অন্বিতা, ম্যাডাম, খবরটা শোনামাত্র কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন – তাই জানাতে দেরি হচ্ছে। কেউ-কেউ ভাবছে – সে, অন্বিতা, ম্যাডাম, খবরটা শুনে সেন্সলেস হয়ে গিয়ে থাকতে পারেন ও তেমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তেমন কিছু ঘটে থাকলেও তারা তো ক্লিনিক ছেড়ে যেতে পারে না। ডাক্তারবাবু তো যে-কোনো মুহূর্তে ফিরেও আসতে পারেন।

খুলে রাখা মোবাইলের এই সব গুঞ্জন থেকে অন্বিতার প্রথম সন্দেহ হয় – এটা তো তাকে অপহরণের একটা প্ল্যানও হতে পারে। খোলা মোবাইলের টুকরো কথাবার্তা থেকে তার সেই না-হওয়া সন্দেহ নিরসন হয় – যেন তার তেমন সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিংবা অন্তত উচিত ছিল।

আর, এমন ঔচিত্যের কথাতেই তার মনে এল – এতক্ষণ ধরে মোবাইলটা খুলে রাখা হয়েছে কেন। এমন একটা মোবাইল খোলা রেখে দু-চারজন মিলে এমন কথা চালাচালি করে তাকে তো সত্যি-সত্যি এমন ভাবাতে বাধ্য করতে পারে যে অন্বিতা এখনই সার্ভে পার্কে পৌঁছুবার জন্য বেরিয়ে পড়বে ও তারা, সেই অপহরণকারীরা, তাকে গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে ‘অজ্ঞাতস্থান’-এর দিকে চলে যেতে পারে। রাতে তার স্বামীকে ফোন করে মুক্তিপণ চাইবে।

অন্বিতা মোবাইলটা বন্ধ করে দিল।

তারপর উঠে তাদের বসবাসের তিনতলার বারান্দা থেকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখে নিল, তাদের বাড়ির সামনে কোনো অচেনা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কী না, যে-গাড়িটি তার গাড়িটিকে অনুসরণ করে ‘পূর্বপরিকল্পনা’ অনুযায়ী কোনো একটি জায়গায় তার গাড়ি থেকে তাকে বের করে নিজেদের গাড়িতে তুলে নেবে।

একটা বেশ বড় রাস্তা থেকে তাদের এই গলিটা বেরিয়েছে। দুধারে সব মিলিয়ে আট-দশটি বাড়ি। প্রত্যেক বাড়ির গাড়িই প্রত্যেকের চেনা। ভাড়াটেদের গাড়িও। এমন কি কোন গাড়ি কটার সময় কোথায় দাঁড়ায়, তাও। এক ঝলক তাকিয়ে অন্বিতা বোঝে গাড়ি চিনে ‘অপহণকারী’দের গাড়ি চেনা সম্ভব নয় – এই সব গাড়িই এই সব রঙেই রাস্তাঘাটে চলাফেরা করে অষ্টপ্রহর।

ডাক্তারবাবুকেও তো একই উদ্দেশ্যে ‘অপহরণ’ করা হয়ে থাকতে পারে ও পশ্চিম বাংলা সীমানা পেরিয়ে গিয়ে, রাতে, তার কাছে মুক্তিপণের ফোন আসতে পারে। তারা পুলিশে যেতে নিষেধ করে। তেমন নিষেধের আগেই তো তা হলে পুলিশকে তার জানিয়ে রাখা উচিত। অন্বিতা খুব মনে করতে পারে না, তখনো তার বিয়ে হয় নি, খাদিম বলে কোনো জুতো কোম্পানির বড় ভাইকে এমনই ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল, পুলিশও খোঁজ করছিল এরাও বাড়ি থেকেও অপহরণকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি করছিল, শেষে একটা রফাও হয় ও অপহরণকারীরা তাঁকে লেকটাউনে একটা জায়গায় ছেড়ে দিয়ে যায়। খাদিম লেকটাউন – এ-সব এত চেনা জায়গা ও লোক, তা হলে কি এমন বিপদ নতুন কিছু নয়, তা হলে অন্বিতার ভয়টাও নতুন কিছু নয়। তা হলে মোবাইলে যে-খারাপ খবরটা এলো, এমন খবর চিরকাল এমনই খারাপ হয়ে আসছে। তা থেকে উদ্ধারের উপায়ও তা হলে সবার জানা, তার থেকে যারা বড় তাদের অন্তত। এমন একটা খবরের পরও অন্বিতা যে কাউকে ফোন পর্যন্ত করতে পারছে না, ঘটনাটা তেমন কিছু নয়, নিশ্চয়ই। অন্বিতা নিশ্চয়ই তার নিজের মেজকাকাকে ফোন করে জিগ্গেস করতে পারে সে কী করবে।

যেন এমনটি রোজকারই একটা ব্যাপার ও ফোনে যেমন বিজ্ঞাপন আসে, তেমনি এমন খবরও ফোনে আসতেই পারে – এমন নিশ্চয়তা, বা প্রায় স্বস্তিই, অন্বিতা এতটুকু সময়ের মধ্যে পেল কী করে সেটা বেশ রহস্যময় আর তার যে হঠাৎ মনে হল তাকে সাহায্য করার অনেক লোক আছে, শুধু তাদের ফোন নম্বরগুলি তার মনে পড়ছে না – এই যা, কিন্তু একজনকে ফোন করতে পারলেই সবাই জেনে যাবে ও কত রকম বুদ্ধি বেরবে কতজনের মাথা থেকে – এটা সংকট থেকে তার পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থেকে তৈরি সক্রিয়তাও হতে পারে বৈ কী। কিন্তু মেজকাকা তো আরো অনেক কিছু জানতে চাইবেন ও তার বন্ধুরাও, তাদের সে বলবে কী করে সে এইটুকুই মাত্র জানে, তাও কয়েক মিনিট আগে।

অন্বিতা সময়টা ছোট করতে চাইল, যাতে তার নিজের কাছে এটা ধরা না-পড়ে যে খবরটা প্রথম জানার পর সে কতক্ষণ কিছুই করছে না, কী ঘটেছে তা পর্যন্ত জানে নি।

কীভাবে সে ঘটনাটা আর-একটু ঠিকঠাক জানতে পারে সেই উদ্দেশ্যে সে ওই নম্বরটিতেই আবার ডায়াল করল ও আবারও সেই অজস্র কথা শুনতে পেল। ব্যাপারটা কী – ফোনটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে, নাকি ইচ্ছে করে বন্ধ করে নি। কিন্তু সে কেন তার স্বামীকেই ফোন করছে না? তা হলেই তো সব কিছু সে জেনে যেতে পারে।

সে তার নিজের মোবাইল থেকে তার স্বামীর মোবাইলে ফোন করল। এই নম্বরটা ডাক্তারের একেবারে ফ্যামিলি-নম্বর। বাড়ির লোকজন ছাড়া কেউ এ-নম্বরটা জানেও না।

রিং হল না। ফোন বলল, দিস নম্বর ইজ নট প্রেজেন্টলি অ্যাভেইলেব্ল। তারপর সেই একই কথা হিন্দিতে ও বাংলায় ‘এই নম্বরটি বর্তমানে উপলব্ধ হচ্ছে না, আর কিছুক্ষণ পরে পুনরায় চেষ্টা করুন।’

অন্বিতা মিনিটখানেক আগে যে-স্বস্তিটুকু কোত্থেকে জোগাড় করেছিল, যেন এমন ঘটনা রোজই ঘটতে পারে, মেজকাকা, বন্ধুরা ইত্যাদি সেটা নিমেষে কেটে গেল। সে তো তার স্বামীর ক্লিনিকগুলির কোনো নম্বরই জানে না। ক্লিনিকের নম্বর দিয়ে তার কী কাজ? দরকারে তো সে ডাক্তারবাবুকেই ওটই নম্বরে ফোন করতে পারে। আর, যদি-বা সার্ভে পার্ক ক্লিনিক থেকে সেই ছেলেটি ফোন করেছিল, সেটা তার নিজের মোবাইল না কী ক্লিনিকের, তাই-বা কে জানে। তবু তো নম্বরটা ছিল। সেখানে ফোন করতে পারত। সে ফোন তো ডাক্তারবাবুর ওই ফোনটার সঙ্গে লেগে আছে। এটাকে কি লাইন জ্যাম করা বলে? অন্বিতা বুঝতে পারে না, তার বাড়িতে সে কতটাই ঘেরাও হয়ে আছে। বা, ঘেরাও হয়ে আছে কী না।

অন্বিতা এবার সত্যিকারের আন্দাজ করতে পারে – ছেলেটার গলা থেকে ওই খবরটা জানার পর অনেকটা সময়ই কেটে গেছে ও এত বড় দুঃসংবাদের পর সে কিছু তো করেই নি, দুঃসংবাদের পুরোটা সে জানেও না এখনো। সেই হাওড়া না হুগলিতে কোথায় এক গাইনেকোলজিস্ট ডাক্তারকে, যে নার্সিং হোমে সে নিয়মিত কাজ করে সেখানে কী একটা গর্ভপাত ঘটাতে তাকে বাধ্য করার জন্য এমন মারে যে ডাক্তারটি মরেই যায়। পরে, তাকে খালের জলে ভাসিয়ে দেয়। বিচার হয়েছিল অনেক দিন ধরে, দোষীরা ধরাও পড়েছিল। ফাঁসিও হয়ে থাকতে পারে। ডাক্তারবাবু খুব মন দিয়ে মামলাটা পড়তেন আর অনেক সময় ডাক্তারি মহলের খবরও দিতেন কেসটা নিয়ে। কিন্তু ডাক্তারবাবু তো গাইনেকোলজিস্ট নন। কিন্তু খুন করে তো খুনিরা যাকে খুন করেছে, তার ডেথ সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ডাক্তারবাবুর ওপর অত্যাচার করতে পারে। ডাক্তাররা রোগীকে প্রাণে বাঁচান বলেই কি রোগীরা ডাক্তারদের প্রাণে মারবে? এতই নির্ঝঞ্ঝাট সুখী জীবন তাদের যে ডাক্তারবাবুর ক্লিনিকের ফোন নম্বরগুলি পর্যন্ত তার কাছে নেই। আর, এ কী ব্যবস্থা যে একজন ডাক্তার তার নিয়মিত ক্লিনিকে গেছেন আর সেখান থেকে তাকে কারা ধরে নিয়ে গেছে। তাই তো বলল ছেলেটা, ‘ধরে নিয়ে গেল’, তাই তো বলেছে? যদি স্বাভাবিক ঘটনা হয়, তা হলে ক্লিনিক থেকে তাকে জানাবে কেন। তার স্বামীকে যে-কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারে আর তার স্ত্রী সে-কথা জানতে পর্যন্ত পারে না! পারবে না? হয়তো পারত যদি সব নম্বরগুলি তার কাছে থাকত? কেনই-বা থাকবে? মানুষ কি আগে থাকতে শবদাহের গাড়িও বুক করে রাখবে?

অন্বিতা বোঝে সে একা পেরে উঠবে না। বিন্নিকে এখুনি বাড়ি আসতে বলবে। বিন্নিরা এ-সব ফোনাফুনির বুদ্ধি অনেক বেশি জানে। একটু সংকোচ হয় – মেয়েটাকে এই গোলমালের মধ্যে টানাটানি করতে। কিন্তু গোলমালটা তো তার বাবাকে নিয়ে। অন্বিতা তাকে কী করে বাঁচাবে। অন্তত জিগ্গেস করবে সার্ভে পার্কের ফোন নম্বরটা জানে কী না।

কিন্তু রিংই হল না। একটা কি আওয়াজের পর ইংরেজিতে, হিন্দিতে ও বাংলায় খুব ঘনিষ্ঠ স্বরে ‘নট প্রেজেন্টলি অ্যাভেইলেব্ল’, ‘বর্তমানে উপলব্ধ হচ্ছে না, কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করবেন।’

অন্বিতা ভয় পেয়ে গেল। তাকেই কি বাড়িতে আটকে ফেলা হয়েছে? সে যাতে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে? পুলিশ তো কত রকমের। যখন-তখন যার-তার বাড়িঘর রেইড করছে। পুলিশ সেজেও করছে। ডাক্তারবাবু কি আর সব ইনকামের ট্যাক্স দেন? তাঁর তো ইনকাম ট্যাক্সের উকিল আছেন। পুরনো নোট খারিজ হওয়ার সময় ডাক্তারবাবু কার-কার অ্যাকাউন্টে কিছু-কিছু টাকা সরিয়ে ফেলেছিল। সে তো সবাই করেছে। করে, আবার বাহাদুরিও দেখিয়েছে। আর, কতই-বা টাকা ডাক্তারবাবুর? কিন্তু সেই সব ঘোরপ্যাঁচে আটকে যাওয়ার মত বড় লোক বা নামজাদা লোকও তো নয় ডাক্তারবাবু।

অন্বিতা ডাক্তারবাবুর ক্যাবার্ডের ড্রয়ারগুলো খোলার চেষ্টা করে। অনেকগুলি খোলে না। তার চাবি ডাক্তারবাবুর কাছে। যে-কয়েকটা খোলে সেগুলো আঁতিপাঁতি করেও কোথাও তাঁর প্যাডট্যাড কিছু পায় না, যাতে ক্লিনিকগুলির ঠিকানা পাওয়া যায়। কোথাও কিছু নেই। হয়তো কোথাও আছে – কিন্তু অন্বিতা জানে না। জানার যে এমন প্রয়োজন হবে তা কে জানে?

ঘরটা ও-রকমই রেখে অন্বিতা বাইরে আসে। সে ঠিক করে ফেলেছে – গাড়ি নিয়ে এখুনি সার্ভে পার্কের ক্লিনিকে যাবে। ড্রাইভারকে ডাকার আগে সে ভয় পায় একটু – তাকে বেরতে না- দেয়ার জন্য ইতিমধ্যেই গার্ড বসানো হয়ে গেছে কী না। ড্রাইভারকে ওপর থেকেই বলে, ‘গাড়ি বের করো।’

তাড়াতাড়ি সালোয়ার-কামিজ পরে তৈরি হয়ে চুলটা আঁচড়াতে-আঁচড়াতে কান খাড়া করে রাখে, গাড়িটা রাস্তায় বের করার আওয়াজ হয় কী না অর্থাৎ গাড়িটাকে কেউ আটকায় কী না। গেট খুলল, গাড়ি বেরল, গেট বন্ধ হওয়ার আওয়াজ হল না। অন্বিতার জন্য ওটা খোলাই থাকল। তা হলে গেটে পাহারা বসে নি।

ডাক্তারবাবুকে তাঁর ক্লিনিক থেকে কারা ধরে নিয়ে কোথায় গেছে, সেই বিপদে এতটা সময় একা কাটানোর শেষে, অন্বিতা নিজে প্রস্ত্তত হয়ে বেরতে গিয়ে আচমকা আবিষ্কার করে যে তাকে কেউ কোথাও নিয়ে না-গেলেও তাকে বাড়িতেই আটকে ফেলা হচ্ছে তার বাইরের সমস্ত যোগাযোগ তাকে না-জানিয়ে বন্ধ করে দিয়ে।

বেরবার আগে বাইরেটাকে আঁচ করে নিতে সে টিভির খবরের চ্যানেল খোলে ও দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই দেখে ও শোনে।

বারুইপুরে এক ছাত্রীর অশালীন ছবি তোলার ও দেখানোর প্রতিবাদ করায় মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে ও প্রধান আসামি ঝাড়খণ্ড পালিয়েছে।

দার্জিলিঙে বিপন্ন পর্যটকদের কলকাতায় ফিরিয়ে আনার জন্য বাসের ব্যবস্থা হয়েছে।

বেলভিউ নার্সিং হোমের অ্যাডভাইসিং গ্যাস্ট্রো-এনটেরেলজিস্ট অনুপম গুহনিয়োগীর কোনো ডাক্তারি ডিগ্রি নেই। কলকাতায় তাঁর আটটি ক্লিনিক। আজ সি-আই-ডি রোগী সেজে সার্ভে পার্কের ক্লিনিক থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এখন সি-আই-ডি লালবাজারে তাঁকে জেরা করছে।

টিভি স্ক্রিন জুড়ে দুই বিজ্ঞাপনের মাঝখানে ক্ষণস্থায়ী ছবিতে বেশ একটা ভিড়ের মধ্যে একটু মাথা নিচু করে নির্ভুল তার স্বামী, আজ হাফ-হাতা ইটরঙের বুক খোলা জামা পরে বেরিয়েছিল ও প্রতিদিনই তার বেরনো ও গাড়িতে ওঠা, তেতলা থেকে দেখে বলে, মাথার মাঝখানে সামান্য একটু টাক পরিপাটি করে ঢাকা, মুখোমুখি সেটা অন্বিতা দেখতে পায় না। টিভির ক্যামেরাগুলি কি মাথার ওপর থেকেই ছবি তোলে? নইলে কপাল থেকে নাক-ঠোঁট-থুতনি এমন টানটান দেখায় কেন? বা, পুলিশ যে-সব খুনি, জালিয়াত, চোর-ডাকাত বা ধর্ষকদের ধরে, তারা মুখটা একটু নিচু করেই পুলিশের সঙ্গে হাঁটে? দু-দিক থেকে কেউ কি ডাক্তার গুহনিয়োগীর বাহু দুটো ধরে রেখেছিল? বোঝা গেল না। আসামিদের তো তেমনি করেই ধরতে হয় – যাতে দৌড়ে পালিয়ে না যায়। হাতে কি হ্যান্ডকাফ দেয়া ছিল?

ওইটুকু সময়ে আর কতটা দেখবে অন্বিতা? এখন তো ঘনঘন দেখাবে। তখন খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখবে।

অন্বিতা এত স্বাভাবিকভাবে টিভির সুইচ অফ করে দেয়, যেন, সন্ধে থেকে সার্ভে পার্কের ওই আধা-খিঁচড়ে ফোনটা নিয়ে এমন ছটফট করছিল যে তার সিরিয়্যালটা দেখা হয় নি, এখন বেরবার আগে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শেষটুকু দেখে বুঝে নিল গল্পটায় নতুন কিছু ঘটল কী না।

দেয়ালজোড়া টিভি স্ক্রিনের বক্সটাও দেয়ালে আটকানো। সেখানেই কেন যে ভাজা-মৌরির কৌটোটা থাকে? আর, থাকে বলেই তো একটা জয়পুরি কাজ করা কৌটো এনে রেখেছে অন্বিতা। তার বাড়িতে কোনো কিছুই বেমানান থাকতে পারে না। ডাক্তারবাবু তো অঢেল টাকাই আয় করেন, রাতদিন খেটেই, ব্যবসাপাতি করে নয়। সেই টাকা নিজের ইচ্ছেমত ও নজর দিয়ে বাড়িটা গুছিয়ে তুলতে পারবে না অন্বিতা?

এক চিমটি মৌরি মুখে দিয়ে কৌটোটা বেশ যত্ন করে আঁটতে-আঁটতে অন্বিতা এই গার্হস্থ্য ভাবনাটা ভেবে ফেলে এটা না জেনেই যে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে সেটাই তার শেষ গার্হস্থ্য ভাবনা হয়ে যাবে – পেছন থেকে দুজন পুলিশ ডাক্তারবাবুর ডানা দুটো ধরে না রাখলেও পারত। ডাক্তারবাবু জালিয়াত হতে পারেন কিন্তু দৌড়ে পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার মত ছোটলোক জালিয়াত নন। জালিয়াতেরও তো ছোটলোক-বড়লোক থাকে।

এই গর্বটুকুই যে তার শেষ গর্ব হবে সেটা না-জেনেই ঘরের চৌকাঠ ডিঙোয় অন্বিতা। সিঁড়ির দিকে ঘোরে।

দেশের আরো অন্তত লক্ষ-লক্ষ দর্শকের সঙ্গে অন্বিতাও তো এইমাত্র টিভি থেকে জানল যে বিখ্যাত ডাক্তার অনুপম গুহনিয়োগী, এম-আর-সি-পি, বেলভিউ নার্সিং হোমের অ্যাডভাইসিং কনসালট্যান্স অনুপম গুহনিয়োগীর কোনো ডাক্তারি ডিগ্রিই নেই।

দেশের লক্ষ-লক্ষ দর্শক-পাঠকের ভিতর শুধু অন্বিতাই ও তার মেয়ে ও তার কিছু আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবই কেবল জানে যে এই গুহনিয়োগী তার স্বামী।

কেউ জানার আগে পুলিশ জেনেছে বলেই তার সব ফোন জ্যাম করে দিয়েছে। যেন এটা চাকরের কাছ থেকে বাজারের হিসেব নেয়া – বাজার থেকে কত পয়সা সে চুরি করেছে বা ড্রাইভারের কাছ থেকে পেট্রলের হিসেব নেয়া। অথচ অন্বিতার ভোটার কার্ড আলাদা, আটার কার্ড আলাদা, পাসপোর্ট আলাদা, এ-টি-এম কার্ডগুলো আলাদা, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট আছে বটে কিন্তু সেটার খবর সে জানে না।

সবদিক থেকে তাকে একটা আলাদা লোক হিসেবে একটার পর একটা চিহ্নে দাগিয়ে-দাগিয়ে হঠাৎ আজ সন্ধেবেলায় তার স্বামীর গ্রেপ্তারের খবরটাই তাকে জানানো হয় না – সে শুধুই এক জালি ডাক্তারের বউ বলে এবং সুতরাং সেই জালিয়াতির শরিক। তার ফোন জ্যাম, হয়তো নজরবন্দি, হয়তো তাকে ধরা হয় নি সে কার কার কাছে যাচ্ছে, ডাক্তারবাবুর জালিয়াতির সঙ্গী-সাঙাৎ ও তার জালিয়াতি থেকে পাওয়া টাকাপয়সা কোথায় কীভাবে ছড়ানো আছে সেটার তত্ত্ব-তালাশ করতেই। তার পেছনে গোয়েন্দা লেগে গেছে – তার গ্রেপ্তারের ছবি টিভিতে দেখাবে না। কিন্তু তাকেই গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তার দিয়ে একেবারে ঘিরে ফেলা হচ্ছে, যাতে সে ফসকাতে না পারে। ডাক্তারবাবু তো হেফাজতে। কিন্তু অন্বিতাই তো ছেড়ে-রাখা ডাক্তার। অন্বিতাই তো ডাক্তারের জালিয়াতির জিম্মাদার।

অন্বিতা ঠিক বলল কী না, নিজেই শুনতে পায় না, ‘লালবাজার’। ড্রাইভার হয়তো তার চাইতে অনেক বেশি জানে। সে হয়তো সেদিকেই যাচ্ছে।

 

লালবাজারকে একটা জায়গা বলেই আবছাভাবে জেনে আসছে অন্বিতা ছোটবেলা থেকেই। লোকের মুখে, কন্ডাক্টরদের চিৎকারে। লালবাজার যে-এমন একটা বিরাট এলাকা, যাতে এমন ব্যারাকের মত সব বাড়ি তা সে ভাবতেও পারে নি।

তার ড্রাইভার, একটা জায়গায়, অনেক সারি দেয়া গাড়ির মধ্যে তার গাড়িটা ঢুকিয়ে দিল। অন্বিতা নামতে গেলে সে বলল, ‘আপনি গাড়িতেই বসে থাকুন, আমি জেনে আসছি।’

অন্বিতার ভাল লাগল। এই লোকটির তো এই দায়িত্ব নেয়ার কথা নয়। সে তো স্বেচ্ছায় অন্বিতাকে এটুকু ঝামেলা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

ফিরল বেশ কিছুক্ষণ পর।

অন্বিতাকে নামতে বলল না। বলল, ‘এখন স্যারকে পুলিশ জেরা করছে। স্যারের সঙ্গে স্যারের উকিল আছেন?’

‘স্যারের উকিল? কে?’

‘তা তো বলতে পারব না। আমি বললাম, ওঁর স্ত্রী এসেছেন দেখা করতে। তো বললেন, জামা-কাপড় যদি এনে থাকেন দিয়ে যেতে পারেন। ওষুধপত্র। আমরা পৌঁছে দেব।’

‘কী আনব? ওঁর সঙ্গে কথা বললে তো জানতে পারব।’

অন্বিতা নিজে না জেনে, তার জীবনের এমন অভাবিত সংকট নিয়ে বাইরের কারো সঙ্গে এই প্রথম কথা বলল।

ড্রাইভার উত্তরে বলল, ‘একজন মহিলা অফিসার কথা বললেন। খুব ভদ্র। বললেন, এই জেরা শেষ হতে সময় লাগবে। ওঁকে এখানে অপেক্ষা করতে হবে। আমি জানাচ্ছি। যদি ওঁরা আগে ডেকে নেন তো নেবেন।’

অন্বিতা নামার ভঙ্গিতে দরজায় হাত দেয়।

ড্রাইভার তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘না, না, আপনি গাড়িতেই বসে থাকুন। ওখানে কী বসে থাকবেন? আমি ওখানে আছি। কিছু বললে আমি এসে জানাব।’

লোকটি তার সম্মান রাখার চেষ্টা করছে।

গাড়ির এয়ারকন্ডিশনার চালানো। একটু অদ্ভুত লাগছে। তার পাশাপাশি কেউ নেই। পেছন দিয়ে বহু গাড়ির দ্রম্নত যাতায়াতের আওয়াজ উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে বা কাছে আসছে। সম্ভবত বাইরের রাস্তা থেকে যানবাহনের কিছু এলোমেলো আওয়াজ। ড্রাইভার গাড়ির ভিতরের আলো জ্বেলে রেখে গেছে। বোধহয় অন্বিতার সুবিধে হবে ভেবে।

বা, হয়তো গাড়ির ভিতর লোক আছে জানিয়ে রাখতে।

একটু উদ্ভট ঠেকতে শুরু করেছে অন্বিতার। সামনে ড্যাশবোর্ডের আলো জ্বলছে। ফলে গাড়ির সামনের কাচের ওদিকের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অথচ, তার পেছনে আলো ঝলমল ও আওয়াজময় চলাচল চলছে। তাকে যেন এমন একটা দশায় আটকে ফেলা হয়েছে। সে তো গাড়ি থেকে নেমে একটু দাঁড়াতেও পারে বাইরে। তার সঙ্গে কথা তো হয়েছে এক ড্রাইভারের। সে-ও তো অন্যের কথা শুনে এসে বলেছে।

তবু অন্বিতা বোধ না করে পারে না যে সে এক নিষেধের মধ্যে আছে। সে শুধু মাঝে-মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরেটা দেখছিল।

তারপর কোনো এক সময়, রাত্রির কোনো এক প্রহরে, লালবাজারের ভিতরের ও বাইরের যানবাহন, মানুষজন ও প্রাকৃতিক নানা আওয়াজ বদলে-বদলে যাওয়ার পর ও কোনো এক ঘণ্টাধ্বনিতে রাত্রির সময় চিহ্নিত হওয়ার প্রয়োজন হঠাৎ সূচিত হলে ড্রাইভার এসে অন্বিতাকে ডাকে। তারা লালবাজারে পৌঁছুবার আধঘণ্টা পরেও সেটা হয়ে থাকতে পারে বা কলকাতা বন্দর থেকে কোনো সমুদ্রগামী জাহাজের সংকেতবাহী দী – র্ঘ ভোঁ রাত্রি জুড়ে ধ্বনিত হওয়ার পরও হতে পারে। সময় যেন চিহ্নহীন হয়ে গেছে অন্বিতার পক্ষে, তার অজানিতেই। অথবা গতিহীন। তার অজানিতেই। মৃতদের যেমন হয়।

এক সময় তাকে পাথরের ইট-বাঁধানো সেই প্রশস্ত বিস্তার কোনাকুনি সশব্দ পেরতে হয় তার পদক্ষিপের আওয়াজ তুলে-তুলে, তার একক পদক্ষিপের আওয়াজ তুলে-তুলে আর সেই পাষাণ বিস্তার যেন ভেসে যায় আলোর বন্যায়। কোনাকুনি পেরিয়ে অন্বিতাকে যেখানে এসে বাধ্যত দাঁড়াতে হয়, সেখানে প্রায় ধাক্কা খাওয়ার আগে অন্বিতা বুঝতেই পারে না সেখানেই তাকে থামতে হবে।

দাঁড়ানোর পর দেখে ও বোঝে। তার ড্রাইভার দাঁড়িয়ে। আর চৌকাঠের ভিতরে একজন মেয়েপুলিশ, আরো ভিতরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে। তার সেই ঘাড় যে-অভ্যন্তরের দিকে ঘোরানো, অন্বিতা দেখে – সেটা একটা প্রবেশ পথ, পাশেই একটা খুব সাদা দরজা, সেটা একটা পথ, মাঝে-মাঝে আলোর গোল-গোল বৃত্ত অদৃশ্য সিলিং থেকে পড়া আলোয় – সে-আলো অতটা উচ্চতা গড়াতে মস্নান হয়ে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছয় যেহেতু সেখানে একটা মেঝে আছে। আলোর সেই বৃত্তগুলি যেন ওই পথটিকে সুড়ঙ্গের মত করে দিয়েছে, তার শেষ বোঝা যায় না – এতই লম্বা সে পথ, প্যাসেজ, করিডর, টানেল।

ড্রাইভারের হাতের ইঙ্গিতে অন্বিতা বোঝে, তাকে ভিতরে, সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকতে হবে। অন্বিতা পা ফেলে।

অন্বিতা পা ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে সেই মেয়েপুলিশ চলতে শুরু করে, ঘাড় না ফিরিয়েই অন্বিতা একবার পেছন ফিরে ড্রাইভারের দিকে তাকায়। ড্রাইভার হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে তাকে এগিয়ে যেতে – স্রোতে কিছু ভাসিয়ে দিয়ে যেমন, দু-হাতে জল ঠেলে সেগুলোকে আরো স্রোতের ভিতর ঠেলে দেয়া হয়।

সেই মেয়েপুলিশের পেছন-পেছন অন্বিতা চলতে থাকে। এমনই অন্ধ সে চলন যে অন্বিতা তাকে সব সময় দেখতেও পায় না। কোনো এক আকস্মিকে সে দেখে, ঠিক দেখেও না, বোঝে, সেই মেয়েপুলিশটি তার সামনে-সামনে যাচ্ছে না, তার পেছন-পেছন আসছে। এতই লম্বা সে সুড়ঙ্গ যে অন্বিতা ডাইনে-বাঁয়ে বাঁক নিয়েছিল কী না তা ভুলে যায়। তাকে হয়তো চওড়া, উঁচু, খাড়া সিঁড়ি বেয়েও উঠতে হয়েছে। তাকে হয়তো অনেক বন্ধ দরজাও পেরতে হয়েছে। সে হয়তো ভুলেও গিয়েছে – সে হাঁটছে তার স্বামী ডাক্তার গুহনিয়োগীর সঙ্গে দেখা করতে। আবার, তার মনেও পড়েছে।

কোনো এক সময় কোনো একটা ঘরের দরজা খুলে যায়।

সাদা, লম্বা, খাড়াদুটো কপাট।

অন্বিতা তার পেছনে-পেছনে আসা সেই মেয়েপুলিশটিকে কোথাও দেখতে পায় না, দেখতে চায়ও না। তার বাঁ হাতের সেই দরজার কপাট এমন যান্ত্রিক নৈঃশব্দ্যে সম্পূর্ণ খুলে যায়, যেন সেটা একটা অলঙ্ঘনীয় আদেশ। তাকে এই দরজা দিয়ে ঢুকতেই হবে।

সে ঢোকার পর তার পেছনে কপাট দুটো একই যান্ত্রিক নৈঃশব্দ্যে ও নিশ্চয়তায় বন্ধ হয়ে যাবে সম্পূর্ণ যে অন্বিতা বা কেউ তা খুলতে পারবে না, সেই যন্ত্র ছাড়া।

ঘরটার ভিতরে ঢুকে অন্বিতা দেখে, বড় ঘরের আর-এক প্রান্তে উজ্জ্বলতর আলোতে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন রঙের জামা পরে বসে আছে। সেই জায়গাটায় পৌঁছুতেও অন্বিতাকে কয়েক পা করিডর পেরতে হয়।

পৌঁছে সে স্পষ্টই দেখে, তার স্বামী ডক্টর গুহনিয়োগী সেই ইটরঙের হাফশার্টে, যেটা পরে উনি সকালে বেরিয়েছিলেন। কালো কোট পরা এক ভদ্রলোক। দু-তিনজন ফুলশার্ট-পরা ভদ্রলোক। একজনেরই ইউনিফর্ম পরা, তার টুপিটি কোলের ওপর।

অন্বিতাকে দেখে তিনিই দাঁড়িয়ে উঠে বললেন – ‘বসুন, বসুন।’

একটা কাঠের খালি চেয়ার ফাঁকা ছিল। হয়তো অন্বিতা সেই চেয়ারের মাথাটা ধরে দাঁড়াবে বলেই। অন্বিতা তেমনই দাঁড়ায়।

সকলেই অন্বিতার দিকে তাকিয়ে, যেন, তার আসারই কথা, যেন তার আসার জন্যই সবাই অপেক্ষা করছে। যেন, তাকে এখানে পুলিশই নিয়ে এসেছে।

ডক্টর গুহনিয়োগী তাঁর চেয়ারে হেলান দিয়ে যেন স্মিত মুখেই তাকিয়ে ছিলেন। তাকানো শেষ হলে বললেনও, ‘বোসো।’ যেন তিনিই গৃহকর্তা।

পুলিশ যাকে কয়েক ঘণ্টা আগে জালিয়াতির দায়ে গ্রেপ্তার করেছে ও তার নিজের তৈরি সারাটা জীবন যখন ধসে পড়েছে, তখন ডাক্তার গুহনিয়োগী এতটা ঠান্ডা ও নিশ্চিন্ত থাকেন কী করে। না কী পুলিশের কথাগুলি ইতিমধ্যেই মিথ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে?

এমন প্রমাণ তো উল্টেপাল্টে দিতে পারেন এক উকিল-ব্যারিস্টাররাই – এমন একটা শোনা কথা মনে পড়ায় অন্বিতা কালো কোট-পরা মানুষটির দিকে তাকাল – সম্ভবত তিনিই ডক্টর গুহনিয়োগীর আইনজ্ঞ।

যেন স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছে এমন নিকট স্বরে অন্বিতা ডক্টর গুহনিয়োগীকে জিগ্গেস করে – ‘আমাদের বিয়ের কথার সময়ও তো তুমি একবারও বলো নি যে তুমি ডাক্তার নও।’

এমন একটা সোজা কথার পুরো অর্থ বুঝতে ঘরের এতগুলো লোকের এতটা সময় লাগে!

তারপর হঠাৎ একজন ফুলশার্ট হাততালি দিয়ে বলে ওঠেন, ‘তা হলে, মিস্টার মিত্র, আপনি তো প্রায় প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে আপনার ক্লায়েন্ট কখনোই কোথাও নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দেন নি ও পুলিশের হাতে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। তাঁকে সবাই ডাক্তার ভেবে নিয়েছে। তার জন্য তো তিনি দায়ী নন। এখন তাঁর স্ত্রী বলছেন, নিজে, বিয়ের সময়ও উনি এই পরিচয় দেননি যে তিনি ডাক্তার নন।’

ডক্টর গুহনিয়োগীর নিশ্চিত স্বর শোনা গেল, তাঁর স্ত্রীকে বলছেন – ‘ছ-বছর বিলেতে থাকা পাত্রকে তোমাদের বাড়ির লোকরা যদি এম-আর-সি-পি ধরে নেয়, তার জন্য কি আমি দায়ী?’ আর-একজন ফুলশার্ট একই রকম হাততালি দিয়ে বলে ওঠেন, ‘কিউরিয়স অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং। মিস্টার মিত্র, আপনি মিসেস গুহনিয়োগীর অভিযোগের উত্তরে কী বলবেন সো-কল্ড ডক্টর গুহনিয়োগীর আগাম জামিনের পক্ষে। উনি তো ওঁর বিয়ের সময়ও পাত্রীপক্ষকে বা তাঁর স্ত্রীকেও বলেন নি যে তিনি ডাক্তার নন।’

সেই কালো কোট হেসে বলেন, ‘অভিযোগ তো ওঁর নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দেয়া নিয়ে। ডাক্তার পরিচয় না-দেয়া নিয়ে নয়। আপনাদের কতদিন বিয়ে হয়েছে মিসেস গুহনিয়োগী?’

‘এ মামলার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। দরজাটা খুলিয়ে দিন। আমি বেরিয়ে যাব।’

অন্বিতা এদের সবার দিকে পেছন ফিরে বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply