দুজন ভীরু ও  একজন সাহসীর গল্প

হাসনাত আবদুল হাই

রাস্তাটা হঠাৎ যেন দৌড় দিয়ে এসে ঢুকেছে এখানে, এখন চারিদিক অন্যরকম দেখাচ্ছে। গাড়ির ভিড় নেই, যান্ত্রিক শব্দ আর মানুষের স্বরের কোলাহল শোনা যাচ্ছে না। ডিজেল, অকটেনের কড়া গন্ধে ভিজে যাচ্ছে না লাংস, বিদ্যুচ্চমকের মতো গাড়ির হেডলাইট ঝলসে দিচ্ছে না দুই চোখ। দেখে মনেই হয় না এলোমেলো দালানে ভিড়াক্রান্ত, ট্রাফিক জ্যামে নিথর একই শহরের মধ্যে তারা আছে। রাস্তার দুপাশে গাছপালা সবুজ আভা ছড়াচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্রিট লাইটের আলোয়, সামনে সবুজ কার্পেটে মোড়া আয়তাকার লন, ডানদিকে লেকের পানিতে আলোর রেখা ব্যালেরিনাদের মতো এগিয়ে আসছে, একের পর এক। আর মিরাকল অব মিরাকলস্, ওপরে দেখা যাচ্ছে, অনেকখানি খোলা আকাশ, যেখানে তারাগুলো জ্বলছে আর নিভছে জাদুকরের হাতের মধ্যে। আভিজাত্যের গর্বে মৃদু হাসি জায়গাটাকে প্রসন্ন করে রেখেছে। পাজেরোর জানালার কাচ নামিয়ে দিয়েছে জেন। বিস্ময়-বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, দিস্ ইজ অ-সাম! সে প্রায়ই অবাক হলে এ-কথাটি বলে। রানা বলল, হোয়াট ইজ অ-সাম? জেনের দৃষ্টি তখনো গাড়ির বাইরে। সে রাস্তার দিকে না তাকিয়ে বলল, দিস্ চেঞ্জ। মনে হচ্ছে এলিসের মতো র‌্যাবিট হোল দিয়ে অন্য জগতে ঢুকে পড়েছি। দি সাইট ইজ অ-সাম। সো গ্রিন, সো পিসফুল। শুনে রানা হাসল, কিছু বলল না। সে গাড়ি পার্কিং লটের দিকে নিয়ে ফাঁকা জায়গা খুঁজছে। সন্ধ্যা না হতেই এখানে গাড়ি জমতে শুরু করেছে। বিএমডাবস্নু, জাগুয়ার, লেক্সাস, পোর্শ, মার্সিডিজ। যারা গাড়ি পার্ক করে হেঁটে যাচ্ছে বেশিরভাগই তাদের দুজনের একই বয়েসি। ইন দেয়ার আর্লি টোয়েন্টিজ। জেনারেশন জেড। দি মিলেনিয়ালস্।

একতলা বিল্ডিংটার বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না, সবুজ আইভি ঢেকে দিয়েছে, ওপর থেকে নিচে। স্প্যানিশ ডিজাইনের কাঠের কালো দরজার সামনে স্ক্যাল অ্যান্ড বোনের সাদা রঙের ছবি যেন এমবোস্ করা। ঝক ঝক করছে। তারা দরজার কাছে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে খুলে দিলো কেউ। ঢুকতেই দেখা গেল দুজন যুবক মাথায় লাল ব্যান্ডানা বেঁধে, এক চোখ কালো কাপড়ের প্যাঁচে ঢেকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। ভেতরে আরো কয়েকজন একই পোশাকে কাস্টমারদের টেবিলের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, ওয়েলকাম ড্রিংকস দিচ্ছে হাতের ট্রে থেকে। বেশ বড় আকারের ঘরটায় ডিম লাইটে যতটুকু উজ্জ্বল হতে পারে, তেমন। পেছনের দেয়ালে সিলিংয়ে বাঁধা প্রজেক্টর থেকে সিনেমা দেখানো হচ্ছে। জনি ডেপ পাইরেটের পোশাকে, হাতে তলোয়ার, কেইরা নাইটলে দুর্দান্ত চাউনি দিয়ে গেঁথে ফেলছে সামনের মানুষকে। জেন কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ওয়াও! পাইরেট অফ দি ক্যারিবিয়ান! এখানে কি সিনেমাটার প্রমোশন হচ্ছে? সে ঘুরে তাকালো রানার দিকে।

রানা বলল, না। অ্যাটমসফিয়ার ক্রিয়েট করার জন্য ব্যবস্থা। এই রেসেত্মারাঁ কয়েকদিন পরপর একটা থিম নিয়ে ভেতরটা সাজায়। কোনোদিন ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াসের ডেকর। কোনোদিন ট্রান্সফর্মার। আবার কোনোদিন হয়তো ব্যাটম্যান বা আয়রনম্যান। সিনেমাগুলো দেখানোর জন্য প্রজেক্ট করে না, অ্যাটমসফিয়ার ক্রিয়েট করার উদ্দেশ্যে কিছু দৃশ্য দেখায়। শুনে জেন বলল, দিস ইজ অ-সাম। থিম পার্কের সঙ্গে পরিচয় আছে। কিছু থিম রেসেত্মারাঁ? নোপস্। দিস ইজ কোয়াইট
সামথিং। কে বলে তোমাদের এই শহর ডাল? দিস ইজ জাস্ট ওভার দি টপ। ওয়েট রানা, ড্যাড আর মম্কে টেলিফোন করে জানাই। তার উচ্ছ্বাসের মাত্রা কমে না। রানা বলল, তোমার ড্যাড আর মম্ কি এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছে? এখানে সন্ধ্যা মানে নিউ জার্সিতে খুব ভোরবেলা। আরো কিছুক্ষণ পরে ফোন করো। আমরা এখনই চলে যাচ্ছি না। ঘণ্টাদুয়েক তো থাকবই। ইফ নট মোর। যদি তোমার পছন্দ হয়। বলে সে জেনের দিকে তাকাল। হোয়াট ডু ইউ মিন? পছন্দ হয়? আই অ্যাম অলরেডি হেড ওভার হিলস্ অ্যাবাউট দিস্ পেস্নস। আরো আছে নাকি এমন জায়গা এ-শহরে? রানা ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, এ ফিউ। এই তো এলে এখানে। দেখবে কত কিছু। দেশে থাকতে যা শুনেছ তা যে খুব বাড়িয়ে বলা তার প্রমাণ পাবে। উই আর নট এ রিচ কান্ট্রি, বাট উই হ্যাভ এ রিচ কালচার। কিছুটা আমাদের নিজস্ব, কিছুটা ধার করা। কসমোপলিটান বলতে যা বোঝায়। ফিউশন অফ কালচার।

জেন চেয়ারে বসতে বসতে বলল, মিছেই বিদেশি মিডিয়ায় তোমাদের দেশ সম্বন্ধে দুর্নাম করে। কদিন হলো এখানে এসেছি, খারাপ কিছু চোখে পড়ল না। তারপর হেসে বলল, ট্রাফিক জ্যাম ছাড়া। সে তো অন্য দেশেও আছে। রানা বলল, তোমার ড্যাড আর মম্ তো তোমাকে আসতেই দিতে চাননি। আমাকে প্রায় পার্সোনাল বন্ড দিতে হলো তোমার সেফটির গ্যারান্টির জন্য।

জেন বলল, ওয়ান-ইলেভেনের পর অনেক আমেরিকানের দৃষ্টিভঙ্গি আর মত বদলে গিয়েছে বিদেশ সম্বন্ধে। আমার মা-বাবাও তার মধ্যে পড়েন। সরল মানুষ হলে যা হয়। রানা দেয়ালে জনি ডেপের তলোয়ার চালনা দেখতে দেখতে বলল, একটা, দুটো ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার মতো। তার জন্য জেনারালাইজেশান করা কি ঠিক? তোমার দেশেও মাঝেমাঝে ক্যাম্পাসে লোন-উলফ শুটার গোজ বার্সাক। এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে অ্যাট র‌্যান্ডম। ভায়োলেন্স কোথায় নেই? দেখতে হবে সেগুলো ব্যতিক্রম কিনা। মানে নরমাল লাইফের ব্যতিক্রম।

ওয়েটার এসে মেন্যু দিয়ে যায় তাদের হাতে। জেন লম্বা মসৃণ মোটা কাগজের মলাট খুলে ভেতরের আইটেম দেখতে দেখতে বলল, মেক্সিকান, থাই, ভিয়েতনামিজ, ইতালিয়ান! দিস ইজ অ্যামেজিং। এত রকমের খাবার এক রেসেত্মারাঁয়? আরে, আরে বিফ স্টেকও আছে দেখছি। কোথায় এনেছ তুমি রানা? ফ্যান্টাস্টিক। কর্নোকপিয়া অব ফুড একেবারে। অ-সাম।

কালো মুখোশে মুখের নিচের দিক ঢেকে ছয়জন যুবক কখন ঢুকেছে রেসেত্মারাঁর ভেতরে তারা দুজন টেরই পায়নি। কোনো কাস্টমারই দেখেনি তাদের। সবাই গল্পে, কথা বলায় ব্যস্ত। হয়তো তাদের অর্ডার দিচ্ছে ওয়েটারকে। জেন যখন দেখল তার মুখে এপিটাইজার। রানার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, সো ইমাজিনেটিভ। পাইরেটদের দিয়েই আজ সন্ধ্যায় ইন্টেরিয়র ডেকর শেষ করে দিতে চায়নি এরা। এবার এনেছে রবার্সের দল। স্ট্যান্ড অ্যান্ড ডেলিভার বলার জন্য। হাতে পিস্তলও আছে! রানা অর্ধেক মুখোশে ঢাকা আগন্তুক যুবকদের আর তাদের হাতে পিস্তল, চাপাতি, গ্রেনেড দেখে বলল, এদের আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে নতুন গ্রম্নপ তৈরি করেছে এনটারটেইন করার জন্য। ঠিকই বলেছ, রেসেত্মারাঁর কর্তৃপক্ষ খুব ইমাজিনেটিভ। শুধু ভালো খাওয়াতে চায় না। এনটারটেইনও করাতে চায়। ট্র্যাডিশনালভাবে গান অথবা নাচ না দেখিয়ে এক্সাইটিং আইটেমের আয়োজন করে। তার স্বরে গর্ব আর তৃপ্তি।

মাথায় লাল ফেটি পরা ওয়েটাররা যে যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে থাকল স্থির হয়ে, কারো হাতে ড্রিংকসের গস্নাস, কেউ খাবারের পেস্নট দুহাতে ধরে আছে, কারো হাতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল। দেখে মনে হলো যেন পরিচালকের নির্দেশে আধুনিক নাটকের অভিনেতারা যেমন করে থাকে সেই ভঙ্গিতে তারা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মঞ্চে যেসব নতুন অভিনেতা প্রবেশ করেছে তাদের সংলাপ আর মুভমেন্টের জন্য অপেক্ষা করছে তারা। বেশকিছু কাস্টমারও এখন খাওয়া আর কথা বলা বন্ধ করে তাকিয়ে আছে মুখোশ পরা ছয়জন যুবকের দিকে। তাদের চোখে কৌতূহল আর মুখে স্মিত হাসি! বেশ আমোদ বোধ করছে বদলে যাওয়া দৃশ্য দেখে।

 

দুই

সামার ভ্যাকেশন এসে যাচ্ছে। রানা দেশে যাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার জন্য। এর আগের সামারে তাঁরা দুজন এসেছিলেন। ক্যাম্পাসের কাছে এক হোটেলে কদিন কাটিয়ে রানাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন দেশভ্রমণে। রেন্ট-এ-কার কোম্পানির গাড়ি করে তাঁরা ঘুরেছেন কোস্ট-টু-কোস্ট। পথে যাত্রাবিরতি দিয়ে থেকেছেন মোটেলে, হাইওয়ের ওপরেই। খুব এনজয় করেছিলেন তাঁরা এইভাবে দর্শনীয় স্থানগুলো দেখে দেখে। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে রানা তার স্কুল সুইটহার্ট জেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ক্যাম্পাসে তার সরোরিটিতে। জেন ছুটির সঙ্গে সঙ্গেই সামার ক্যাম্পে যায়নি। তার বাবা-মা কেপ কডে সমুদ্রতীরে একটা বিচ হাউস ভাড়া নিয়েছেন এক মাসের জন্য। সেখানেই ফ্যামিলি নিয়ে ভ্যাকেশন করার পস্ন্যান তাঁদের। ফ্যামিলি মানে জেন আর তার ছোট ভাই জিমি। রানাও এখন প্রায় ফ্যামিলি মেম্বার হয়ে গিয়েছে। স্কুলে সিনিয়র ক্লাস থেকে ওরা দুজন স্টেডি যাচ্ছে। একই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করার ফলে সেই রিলেশনশিপ অটুট আছে। আসলে তারা এক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তিই হয়েছে একসঙ্গে থাকার জন্য। রানা থাকে ডরমিটরিতে, জেন সরোরিটির রেসিডেন্ট।

রানার বাবা-মা জানেন তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ক্যাম্পাসে এসে দেখা হওয়ার পর তাঁরাও জেনের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁদের পছন্দ হয়েছে জেনকে। যদি তারা বিয়ে করে শেষ পর্যন্ত তাহলে খুশিই হবেন। মেয়েটির ব্যবহারে তাঁরা মুগ্ধ। ভদ্র, বিনয়ী এবং সরল।

তাঁদের কোস্ট-টু-কোস্ট বেড়িয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার পর জেন বলল, তার বাবা-মা রানার বাবা-মাকে কেপ কডে বিচ হাউসে কয়েকদিন থাকার জন্য ইনভাইট করেছেন। একসঙ্গে ভ্যাকেশন করতে চান তাঁরা। জেন অবশ্য জানে, বাবা-মায়ের আসল উদ্দেশ্য; রানার বাবা-মা কেমন মানুষ তা তাঁরা সামনা সামনি দেখে জেনে নিতে চান। তাঁদের মধ্যে অবশ্য মোবাইলে কথা হয়েছে কয়েকবার। ভাইবারেও কথা বলেছেন। চেহারা চেনা হয়ে গিয়েছে, গলার স্বরও এখন অপরিচিত নয়। তবু সামনা-সামনি দেখতে চান তাঁরা। যাঁদের ছেলেকে মেয়ে ভবিষ্যতে বিয়ে করতে পারে তাঁদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হলে ভালোই হবে। রানার ফ্যামিলি কেমন বোঝা যাবে। অবশ্য জেনকে বিয়ের পর রানার সঙ্গে দেশে গিয়ে থাকতে হবে না। রানা এদেশেই থাকবে জানিয়ে দিয়েছে। তবু তার ফ্যামিলি কেমন জানা দরকার।

সমুদ্রতীরে ভ্যাকেশনের কথা শুনে রানার বাবা-মা রাজি হয়ে গেলেন। বেশ রিলাক্স করা যাবে সি বিচে। বিশ দিন গাড়ি করে এদেশের একমাথা থেকে অন্যমাথা চষে বেড়ানোর পর এটা হবে সত্যিকারের ভ্যাকেশন। তাঁরা জেনের সঙ্গে তার গাড়িতেই রওনা হলেন এক সকালে। জেন গাড়ি চালাচ্ছে আর কথা বলে যাচ্ছে। এফএম রেডিওতে একটু পরপর সংবাদ হচ্ছে। তারপর গান। গান না বলে হইচই, কোলাহল বলাই ভালো। একটানা চিৎকার করে কথাগুলো বলে যাচ্ছে গায়ক। সঙ্গে প্রচ- শব্দে মিউজিক হচ্ছে। হিপহপ, মাঝে মাঝে হেভি মেটালও হচ্ছে। একটানা গান নেই বটে, কিন্তু মিউজিক কান ফাটাবার মতো। রানা এদেশে থেকে এইসব গানের ভক্ত হয়ে গিয়েছে। বিশ দিন কোস্ট-টু-কোস্ট ট্রাভেলের সময় সে রেডিওতে হিপহপ আর হেভি মেটালই শুনেছে বেশি। এডেল নামে একটা স্কটিশ মেয়ে দু-দুবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, তার ‘হ্যালো’ গানটির জন্য। তাদের দুজনের বেশ পছন্দ হলেও রানা মুখ বেঁকিয়েছে শুনে। বলেছে, এটা গান হলো নাকি? ভেরি রেট্রো। ষাটের দশকের জোয়ান বায়াজের মতো। শুধু গিটার ব্যবহার করে না; এইটুকু পার্থক্য। রানার বাবা বলেছেন, খুব রিলেট করতে পারে শ্রোতার সঙ্গে ওর গানের কথা। ওই যে গানটা, ‘হ্যালো, ইট ইজ মি’। কি বিনয়, আন্তরিকতা আর দরদ নিয়ে বলে কথাগুলো। মন কেড়ে নেয়। রানা হেসে বলে, ভেরি সেন্টিমেন্টাল। হেভি মেটালের একেবারে উলটো। কোনো এগ্রেসন নেই। কেপ কডে পৌঁছাল তারা বিকেলে। জেনের বাবা-মা তখন সমুদ্রস্নান শেষে লাঞ্চ করে বিচ হাউসের সামনে ইজিচেয়ারে বসে ন্যাপ নিচ্ছেন। তাঁদের পায়ের শব্দে জেগে উঠে দাঁড়ালেন দুজন একসঙ্গে। প্রথমে করমর্দন, তারপর হাগিং। দুটোই শেষ হতে চায় না। এই প্রথম সামনাসামনি দেখা তাঁদের কিন্তু এমন অন্তরঙ্গতা দেখালেন জেনের বাবা-মা যে মনে হলো অনেকদিন থেকে জানেন একে অন্যকে। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ এমনই। বিশেষ করে ওল্ড জেনারেশন, তাঁদের বয়েসি যাঁরা। রানার বাবার পছন্দ হলো জেনের বাবাকে। তার মাও পছন্দ করলেন জেনের মাকে। দেখে রানা আর জেন দুজনই খুশি হলো। জেনের বাবা বললেন, কাপড় বদলে কিছুক্ষণ সমুদ্রে স্নান করতে পারো। ইট ইজ স্টিল ওয়ার্ম। রানার বাবা বললেন, থ্যাংকস। আমরা দুজনই সমুদ্র ভয় পাই। কাছে যাই না। সি বিচে ঘোরাঘুরি করি দেশে।

জেনের বাবা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বললেন, আই কান্ট বিলিভ। সমুদ্রের চেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে না প্রকৃতির অন্য কিছু। ইট ইজ মুডি অলরাইট। কিন্তু ভাব জমাতে সময় নেয় না। বেশ আজ তাহলে রেস্ট ডে। সন্ধ্যায় বিচে বার-বি-কিউ হবে। কাল সকালে বোট নিয়ে যাব সমুদ্রে মাছ ধরতে।

শুনে রানার বাবা সন্ত্রস্ত হয়ে বলেন, সমুদ্রে মাছ ধরা খুব রিস্কি হবে না? বড় বড় ঢেউ উঠতে পারে। বোট উলটে যাওয়ার সম্ভাবনা। তিনি আমতা আমতা করেন। জেনের বাবা রানার বাবার পিঠ চাপড়ে বলেন, কাম অন ফেলা। বি আ স্পোর্ট। তারপর বললেন, ইট ইজ ভেরি সেইফ। ভেরি ভেরি সেইফ। দেখবে কত লোক বোট নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। মেনি পিপল ওল্ডার দ্যান আস্। কাম অন ইয়ংম্যান। বলে তিনি আবার রানার বাবার পিঠ চাপড়ান। বিচ থেকে বোট বেশ অনেকদূর গিয়ে স্থির হলো। ড্রাইভার নোঙর জাতীয় কিছু পানিতে ফেলে বোটটাকে এক জায়গায় রাখল। জেনের বাবা ছিপ বার করলেন চারটে। একটা দিলেন রানার বাবাকে। নিজে ছিপ ফেলে বললেন, এভাবে ছুড়ে মারো। নট ভেরি ডিফিকাল্ট। বলে তিনি এক হাতে বিয়ারের ক্যান খুলে মুখে দিলেন। দুপুর পর্যন্ত কোনো মাছ ঠোকরাল না কারো বড়শি। তাঁরা বোটে বসেই সঙ্গে আনা লাঞ্চ করলেন। রানা একপাশে ঝুঁকে হাত দিয়ে সমুদ্রের পানি ছুঁতে গিয়ে নিচে পড়ে গেল। বোটটা দুলে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। রানার বাবা-মা চিৎকার দিয়ে উঠলেন। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন দুজনই ডেকের ওপর। জেনের বাবা নিশ্চিন্ত মুখে বললেন, ডোন্ট ওরি। রানা সেইফটি জ্যাকেট পরে আছে। হি উইল নট ড্রাউন। রানা ডুবল না বটে; কিন্তু সাঁতরে বোটের কাছেও আসতে পারল না। বড় বড় ঢেউ এসে তাকে ক্রমেই বোট থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। দেখে তার বাবা-মা ভীত হয়ে পড়লেন।

একসময় ঝপাৎ করে বোট থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল জেন। সে সাঁতরে গিয়ে এক হাতে টেনে ধরল রানাকে। এভাবে ধরে রেখেই সাঁতার দিয়ে টেনে নিয়ে এলো রানাকে বোটের কাছে। দড়ির মই ঝোলানো হয়েছে ততক্ষণে। প্রথমে রানাকে ওপরে উঠতে সাহায্য করল জেন, তারপর উঠে এলো নিজে। তার সারা গা খালি, শুধু  হট প্যান্ট, টি-শার্ট আর লাইফ জ্যাকেট পরে আছে। রানার বাবা মুখ ঘোরালেন। জেনের বাবাকে বললেন, তোমার মেয়ে না থাকলে আজ রানার যে কি হতো বলা যায় না।

জেনের বাবা হেসে বললেন, কিছুই হতো না। ভেসে ভেসে বিচে গিয়ে উঠত দেরিতে হলেও। দি সি রিটার্নস এভরিথিং, এভরি বডি, ডেড অর অ্যালাইভ। সে কিছুই রাখে না। বলে তিনি মুগ্ধ চোখে সমুদ্রের দিকে তাকালেন। তিনি সত্যিই সমুদ্র ভালোবাসেন, বুঝলেন রানার বাবা। রাতে খেতে খেতে রানা জেনকে বলল, মেনি থ্যাংকস। সে এতক্ষণ লজ্জায় কথা বলতে পারেনি। হোয়াট ফর? জেনের মুখে হাসি।

এই যে রেসকু করলে আমাকে। খুব সাহস তোমার। কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লে আমার বিপদ দেখে। ইউ আর রিয়েলি ব্রেভ। জেন আগের মতোই হেসে বলল, নাথিং স্পেশাল। অ্যানিওয়ান ক্যান ডু দ্যাট। ইভেন মাই কিড ব্রাদার জিমি। রানা বলল, নট মি। আমার অত সাহস নেই।

জেন বলল, ইউ নো হোয়াট? কারেজ ইজ আ মিস্টেরিয়াস থিং। ইউ ডোন্ট নো ইফ ইউ হ্যাভ ইট আনটিল দি সিচুয়েশন চ্যালেঞ্জেস ইউ। সাহস নিয়ে কেউ ঘুরে বেড়ায় না। সাহস সুপ্ত থাকে ভেতরে। বিপদের মুখোমুখি হলে বেরিয়ে আসে। যাদের আসে না তারা ভীরু। ইউ আর নট এ কাওয়ার্ড? আর ইউ?

রানা অন্যমনস্কের মতো বলল, আই ডোন্ট নো। জেন তার বুকের পাঁজরে হালকা গুঁতো মেরে বলল, ও কাম অন। ইউ আর আ ম্যান। ইট মাস্ট বি দেয়ার ডিপ ইনসাইড ইউ। ওই যে বললাম, বিপদ না আসা পর্যন্ত বোঝা যায় না সাহস আছে কিনা। দ্যাটস দ্য মোমেন্ট অব ট্রুথ।

 

তিন

এবার সামার ভ্যাকেশনে রানা দেশে যাবে। জেনকে বলল, চলো আমার সঙ্গে। সেই কবে থেকে যাবে যাবে করছ। এই পর্যন্ত যাওয়া হলো না তোমার। কবে হবে? জেন বলল, দাঁড়াও বাবা-মাকে বলি। তাঁরা আবার আমার জন্য একটা ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করেছেন এই সামারে। তাঁদের বলতে হয়।

জেনের বাবা শুনে বললেন, বেড়াতে যাবে রানার দেশে সে তো ভালো কথা। কিছু সেইফটির কথা ভেবেছ?

সেইফটি? জেন বুঝতে না পেরে তাকাল বাবার দিকে। তার পাশে রানাও জিজ্ঞাসু চোখে দাঁড়িয়ে। তাদের কথা হচ্ছে, জেনের বাবা-মায়ের নিউ জার্সির সাবার্বান বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে। তার পেছনেই নিজেদের ছোট ফরেস্ট। জেনের বাবা বললেন, এই তো গত বছর জঙ্গিরা রেসেত্মারাঁয় ঢুকে কতজন বিদেশিকে ঠান্ডা মাথায় খুন করল। ইট ইজ নট আ সেইফ কান্ট্রি ফর ফরেনার্স। অ্যাট লিস্ট নট নাউ। আরো অপেক্ষা করে দেখ।

রানা বলল, সিচুয়েশন এখন নরমাল। বিদেশিরা যাওয়া শুরু করেছে। ভয়ের কিছু নেই। সরকার সিকিউরিটির ব্যবস্থা জোরদার করেছে। অনেককে ধরেছে। অনেকে মারা গিয়েছে। জেনের বাবা বললেন, সিচুয়েশন খারাপ হতে সময় নেয় না। হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যেতে পারে। হোয়াই টেক দি রিস্ক? জেন যাবে, নিশ্চয়ই যাবে তোমাদের দেশে বেড়াতে। আমরাও যাব। জাস্ট ওয়েট ফর সামটাইম।

রানা মরিয়া হয়ে বলল, শি উইল বি সেফ। আমি পার্সোনাল গ্যারান্টি দিচ্ছি। ওর কিছু হবে না। হতে দেবো না। আই উইল বি হার বডিগার্ড। বলতে বলতে সে ইমোশনাল হয়ে যায়। জেন অবাক হয়ে তাকে দেখে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন জেনের বাবা রানার দিকে। তারপর বললেন, হ্যাঁ তোমার দেশে সাহসী ছেলেমেয়েও আছে। ভেরি ভেরি কারেজিয়াস। ওই যে ছেলেটা যে রেসেত্মারাঁয় থেকে গেল তার বান্ধবীদের জন্য। তাকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল জঙ্গিরা। সে যায়নি। বলেছে, বন্ধুদের ছেড়ে যাবে না। দ্যাট ইজ রিয়েল কারেজ। এখানে মিডিয়া তার খুব প্রশংসা করেছে। তার ইউনিভার্সিটি শোকসভা করে সম্মান জানিয়েছে। তার নামে ভার্সিটির একটা ফ্লোরের নাম রেখেছে। এ রিয়েল হিরো। হ্যাঁ, তোমাদের দেশে এমন ছেলেও আছে। কিন্তু… বলতে গিয়ে তিনি থেমে গেলেন। তারপর জেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি যেতে চাও? আর ইউ সিরিয়াস? যদি সিরিয়াস হও নিষেধ করব না। শুধু ঝুঁকির কথা বলছিলাম। সাবধানে থেকো। বিপজ্জনক জায়গাগুলো থেকে দূরে থাকবে।

জেন বলল, ঝুঁকি কোথায় নেই ড্যাড? এখানেও আছে। আছে না? জেনের বাবা মাথা নেড়ে বললেন, আছে। এখানেও আছে। সবখানেই আছে। ওকে। ইউ ক্যান গো। কিন্তু প্রত্যেকদিন সকাল-বিকেল ফোন করবে। ভাইবারে কথা বলবে। না হলে আমরা দুশ্চিমত্মায় থাকব। তারপর রানার দিকে তাকিয়ে বললেন, রানা আই ক্যান ট্রাস্ট ইউ। ইউ উইল লুক আফটার হার। সি দ্যাট নো হার্ম কামস্ টু হার। শি ইজ প্রিশাস টু আস। ইউ টু।

রানা বলল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। সে নির্বিঘ্নে ফিরে আসবে। যেমন হাসতে হাসতে যাবে, সেভাবেই ফিরবে। জেনের মা বললেন, জাস্ট বি কেয়ারফুল। এদেশে গাড়ি চালাবার সময়ও তো আমরা কেয়ারফুল থাকি। তুমি তো দেখেছই।

রানা বলল, আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। ওকে নিয়ে এমন কোথাও যাব না, যেখানে বিপদের ঝুঁকি আছে। আই উইল বি বাই হার সাইড অল দি টাইম। জেন হেসে বলল, লাইক মাই বডিগার্ড।

 

চার

মুখোশ পরা যুবক ছয়জন ঘরে ঢোকার পর লাইট নিভিয়ে দিলো। ব্যাগ থেকে মোমবাতি বার করে জ্বেলে রাখল টেবিলের ওপর। ঘরটা হঠাৎ আবছা অন্ধকারে ঢেকে গেল। কাউকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ভৌতিক দেখাচ্ছে চারদিক। জেন দেখে উৎফুলস্ন স্বরে বলল, ক্যান্ডল নাইট ডিনারের ব্যবস্থা করছে মনে হয়। দিস ইজ গোয়িং টু বি ফান। থ্যাংকস রানা ফর ব্রিংগিং মি হিয়ার। হোয়াট আ পেস্নস। অ-সাম। রানা তখন অন্য কিছু চিমত্মা করতে শুরু করেছে। জেন তার ভাবান্তর দেখতে পেল না। মুখোশয়ালারা একটু পর সবার কাছে এসে মোবাইল নিয়ে নিল। জেন মিনতির স্বরে বলল, ক্যান আই কল মাই মম্? মুখোশপরা যুবকটি ধমকের সুরে বলল, নো নয়েজ। নো টক। চুপচাপ বসে থাকো সবাই। না হলে বিপদ আছে। জেন রানার দিকে তাকিয়ে বলল, এরা কি নতুন কোনো কিছু পারফর্ম করতে যাচ্ছে? খুব সাসপেন্স সৃষ্টি করেছে যাই বলো। বেশ ন্যাচারাল ওদের অভিনয়। মনে হচ্ছে সত্যি রবার্স। অথবা হাইজ্যাকার। মুখোশপরা একজন যুবক গিয়ে ম্যানেজারকে বলল, আপনার ওয়েটারদের সব এই ঘরে এসে থাকতে বলুন। ইনক্লুডিং শেফ। সবাই এই ঘরে থাকবে। কোনো কথা বলবে না। ম্যানেজার বলল, অনেক কাস্টমার খাবার পায়নি। সেসব তৈরি হয়ে আছে কিচেনে। সার্ভ করলে হয় না? ছেলেটি কাউন্টারে থাপ্পড় মেরে মুখ ভেংচিয়ে বলল, থাকুক খাবার। ডোন্ট টক। যা বলি তাই করো নিঃশব্দে। বুঝতে পারছ না কী হচ্ছে। কী হতে যাচ্ছে। স্টুপিড কোথাকার। রাত এগারোটার দিকে মুখোশপরা যুবকদের কয়েকজন কিচেনে গিয়ে ঠান্ডা খাবারগুলো এনে কাস্টমারদের টেবিলে রেখে ঠান্ডা স্বরে বলল, খাও। শব্দ করো না। মে বি ইউর লাস্ট সাপার। জেন আর রানা তাকিয়ে দেখল, যে খাবারের অর্ডার দিয়েছিল তারা টেবিলে সেসব আনা হয়নি। সে একজন মুখোশপরা ছেলেকে বলল, এটা আমাদের অর্ডারের খাবার না। দেয়ার ইজ আ মিসটেক।

ছেলেটি চাপা হুংকার দিয়ে বলল, শাটআপ। যা পাচ্ছ তাই খাও। শ্বশুরবাড়ি পেয়েছ নাকি?

শুনে রানা এবার বেশ ঘাবড়ে গেল। তার সন্দেহ দৃঢ় হলো এরা কোনো পারফরম্যান্স করতে আসেনি। এদের মতলব খারাপ। সে জেনের দিকে তাকাল। সে হাসিমুখে সবকিছু দেখছে কোনো কিছু সন্দেহ করছে না। মনে হচ্ছে, এখনো এনজয় করছে যা হচ্ছে তা দেখে। পারফরম্যান্স হচ্ছে একথাই ভাবছে। রাত সাড়ে এগারোটায় সুযোগ পেয়ে রানা বাথরুমে গেল সন্তর্পণে, মুখোশপরা ছেলেদের নজর এড়িয়ে। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে পেশাব করল সে। তাকিয়ে দেখল দেয়ালে একটা কাচের সস্নাইডিং জানালা। টানতেই খুলে গেল। কোনো গ্রিল নেই। ভেতর থেকে বের হওয়া যাবে কসরত করে। ওপাশে লন। লনের শেষে লেকের পানিতে বিদ্যুতের আলো ভেঙে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে জমছে তীরের দিকে। লেকের বুক শান্ত, ঢেউ নেই। কালচে দেখাচ্ছে। গেটের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছায়ার মতো অনেক লোক, বড় বড় গাড়ি পজিশন নিয়ে আছে। তাদের সবার পেছনে একটা ট্যাংকও দেখা গেল।

বাথরুমের দরজা খোলার জন্য কাছে আসতেই সে ভেতর থেকে শুনল একজন ক্রুদ্ধস্বরে বলছে, রাত বারোটার পর থেকে প্রতি আধঘণ্টায় একজন করে হোস্টেজ হত্যা করব আমরা। বাইরে ফেলে দেবো মৃতদেহ। আপনারা আমাদের ডিমান্ড অনুযায়ী প্রিজনারদের ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন? কখন বলা হয়েছে। বিশ্বাস করছেন না বুঝি? শুনুন কী আছে আমাদের কাছে। একটু পরই বিকট শব্দে ফেটে পড়ল একটা বোমা বাইরে। গ্রেনেডও হতে পারে।

রানা থরথর করে কাঁপছে। সে এখন বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে কী হতে যাচ্ছে। তারা অভিনয় করছে না। দে আর অন আ ডেঞ্জারাস মিশন। কিছুক্ষণ ভাবল সে। তার মাথার ভেতর সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। সে এখন অন্য মানুষ। কিছুক্ষণ চিমত্মা করে সে বাথরুমের বাইরের দিকে দেয়ালে যে কাচের সস্নাইডিং জানালা তার কাছে গেল। খুব আসেত্ম টেনে খুলে নিয়ে বাইরে তাকাল। লন ফাঁকা। তবে গেটের কাছে এখন ছায়ার মতো লোকের অ্যাকটিভিটি বেড়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে তারা অ্যাকশনে যাবে। সে বেসিনের কংক্রিটের স্ট্যান্ডে উঠে জানালা দিয়ে বের হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হলো। তার বুক ধড়ফড় করছে, কেউ যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। বাইরে বেরোতে গিয়েও বের হলো না, কি যেন মনে পড়ল। সে ধীরগতিতে নেমে এলো। বাথরুমের দরজা খুলে রেসেত্মারাঁর ভেতরে ঢুকল। মোমবাতিগুলো কাঁপছে। দেয়ালে কাস্টমারদের বসে থাকা ফিগারের ছায়া। পেস্নটোর গুহায় বসে থাকা মানুষের দৃষ্টান্তের কথা মনে পড়ল। তারা বাস্তবতার চেহারাটা ভেতরে বসে বুঝতে পারছে না। দেয়ালে ছায়া দেখেই চুপ করে আছে। কী হচ্ছে বাইরে তা জানতে পারলে হয়তো চিৎকার করে উঠত। একটা বাধা দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে কিছু করত। হোক না তাদের হাতে কিছু নেই, কিন্তু সংখ্যায় তারা বেশি। সে কি সাবধান করে দেবে সবাইকে? টেবিলের দিকে  এগোতে এগোতে ভাবল সে। না থাক। এমনও তো হতে পারে যে, মুখোশপরা যুবকেরা ফাঁকা আওয়াজ করছে। বস্ন্যাকমেইলের সাহায্য নিয়েছে। যা বলছে তা করবে না। কাস্টমারদের ধরে নিয়ে আধঘণ্টা পরপর হত্যা করে বাইরে ফেলে দেবে না। নেহাতই একটা হুমকি তাদের। সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার। টেবিলে বসে দেখল জেন আগের মতোই হাসিমুখে বসে। পেস্নট থেকে ঠান্ডা খাবার মুখে তুলে নিতে নিতে বলল, মনে হচ্ছে এরা আসলে কিডন্যাপিং অথবা হাইজ্যাকিংয়ের শো পারফর্ম করছে। সো ফার সো গুড। কোথাও খুঁত নেই। আমাদের হোস্টেজ বানিয়েছে। টেক্সটবুক কেইস অফ হাইজ্যাকিং। খুব ভালো স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছে যাই বলো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কিছু চাইছে না। মনে হচ্ছে ওদের ডিমান্ড বাইরের কারো কাছে। হ্যাঁ, তাই তো হওয়ার কথা। হোস্টেজদের কাছে কী চাইবার থাকতে পারে? আমরা তো সিটিং ডাকের ভূমিকায় আছি। দ্যাটস রাইট। সিটিং ডাক। জেন কথা বলছে স্বাভাবিক হয়ে। একটা মুখোশপরা ছেলে টেবিলের কাছে এসে ধমক দিয়ে বলল, কথা বলো না। বলেছি না চুপ করে বসে থাকো। রানার দিকে তাকিয়ে বলল, এই বিদেশিনীটা একটু বেশি কথা বলছে। বাড়াবাড়ি করলে তাকেই প্রথমে নিয়ে বাইরে ফেলা হবে। বলে দাও ওকে। সে হিংস্র চোখে রানার দিকে তাকাল। তারপর বলল, বেশ আছো। ইট, প্রে অ্যান্ড লাভ। এই তো তোমাদের জীবনদর্শন। মূল্যবোধ। পৃথিবী কীভাবে চলছে, কিছুই বুঝতে পারছ না। আমরা বুঝিয়ে দেবো। ছেলেটা চলে গেলে জেন বলল, কী বলে গেল সে? একটু রেগে গিয়েছে মনে হলো? আমরা কি হোস্টেজের ভূমিকা ঠিকভাবে করতে পারছি না? তা হতেই পরে। রিহার্সাল ছাড়াই এসেছি। তারা আমাদের কী করতে হবে সে সম্বন্ধে কিছু বলেনি। রানা তার হাত চেপে ধরে বলল, আসেত্ম কথা বলো। আসেত্ম। জেন দেখল তার হাত কাঁপছে। সে অবাক হয়ে বলল, হোয়াট হ্যাজ হ্যাপেনড টু ইউ? তোমাকে স্কেয়ার্ড দেখাচ্ছে। ডোন্ট বি স্কেয়ার্ড। ইট ইজ অল মেক বিলিভ। এরা অভিনয় করছে, পারফর্ম করছে। অ্যানাদার থিম ফর দি নাইট। পাইরেটের শোর পর কিডন্যাপিং। হাইজ্যাকিং। তুমি অমন শুকনো মুখে থেকো না। এনজয় দি শো।

রানা জেনের হাত জোরে চেপে ধরে বলল, মনে হচ্ছে এরা স্ক্রিপ্ট ভুলে গিয়েছে। আবোল-তাবোল বলছে। আমাদের ধমক দেওয়ার কথা না। তবু ধমক দিয়ে গেল। অস্ত্র দেখিয়ে গেল। জেন বলল, ওরা ইমপ্রোভাইজ করছে। জাজ মিউজিকের মতো। জাজ মিউজিকে কোনো স্কোর থাকে না। এদের এই শোতেও মনে হয় এখন কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। তারা ইমপ্রোভাইজ করছে। ভেরি ইমাজিনেটিভ। রানা জেনকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। তার আবার কাঁপুনি শুরু হয়েছে। সে শুধু বলতে পারল, আমাদের চুপচাপ বসে থাকতে হবে। তারপর সে দেখল রেসেত্মারাঁর দরোজা থেকে তারা কতদূরে বসে আছে। দূরত্বটা মাঝারি। তাদের আর দরোজার মাঝখানে বেশ কটা টেবিল। যেখানে কাস্টমাররা বসে আছে। যদি একজন করে নিয়ে হত্যা করে ওদেরকেই নেবে প্রথমে। তাদের কাছে আসতে সময় নেবে। ততক্ষণে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। দি টেবিল মে বি টার্নড অন দেম। টেবিলের দিকে তাকিয়ে তার ইডিয়মটার কথাই মনে পড়ল।

ঠিক বারোটার সময় দরজার সামনে থেকে একজন কাস্টমারকে ধরে নিয়ে দরজার বাইরে গেল মুখোশধারী এক যুবক। একটু পর দুটো গুলির শব্দ শোনা গেল। ভারী কিছু যেন পড়ে গেল মাটিতে। কাস্টমাররা এবার উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, বিশেষ করে যারা দরোজার সামনে। জেন ব্যস্ত হয়ে বলল, কী হচ্ছে ওখানে। গুলির শব্দ হলো মনে হচ্ছে? কাস্টমারটাকে ধরে নিয়ে গেল কেন? সে ফিরে আসছে না যে? এটাও কি পারফরম্যান্সের অংশ? দারুণ টেনশন তৈরি করেছে এরা? এতটা ভালো হচ্ছে না, এতক্ষণ ধরে।

রানা কাঁপতে শুরু করেছে। জেন আবছা অন্ধকারে টের পেল না। একটু পর রানা উঠে দাঁড়াল। সে মনস্থির করে ফেলেছে। জেনকে বলল, বসো চুপচাপ। ওদের চটিও না। অভিনয় হলেও ওদের মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওরা ইমাজিনারি রোলকেই বাস্তব মনে করতে পারে। রিমেমবার দি শ্যাডোজ ইন দি কেভ? জেন বলল, তুমি আবার কোথায় যাচ্ছো? রানা বলল, বাথরুমে। জেন বলল, এই তো এলে সেখান থেকে। আবার কেন? রানা বলল, তখন ব্যবহার করতে পারিনি। ভেতর থেকে অকুপাইড ছিল। সে যেতে উদ্যত হলো। জেন বলল, তাড়াতাড়ি এসো। আমার এখন অস্বসিত্ম লাগতে শুরু করেছে। সিক্সথ সেন্স বলছে, সামথিং ইজ রং। রানা যেতে যেতে বলল, নাথিং ইজ রং। ডোন্ট ইউ ওরি।

বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো রানা। কেউ দেখতে পায়নি। তারপর সন্তর্পণে দেয়ালের সস্নাইডিং জানালা দিয়ে শরীর বাঁকিয়ে বেরিয়ে এলো সে। ধপাস করে পড়ল লনের ঘাসের ওপর। মাটি বলে খুব একটা লাগল না। লাগলেও ব্যথা অনুভব করার মতো মনের শক্তি নেই তার এখন। হামাগুড়ি দিয়ে যেতে থাকল সে। গেটের দিকে যারা চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল তারা খুব অ্যাকটিভ। মনে হচ্ছে অ্যাকশনে যাবে। প্রস্ত্ততি শেষ। তাদের পেছনে ট্যাংক। মাথায় হেলমেটের অংশ দেখা যাচ্ছে। ক্যামোফ্লেজ করা। সবুজ লতা-পাতায় মোড়ানো।

রানা গেটের দিকে গেল না। রেসেত্মারাঁর দরজা দিয়ে গেট পরিষ্কার দেখা যায়। যেভাবেই যাক, হেঁটে, দৌড়ে, হামাগুড়ি দিয়ে মুখোশপরা যুবকরা তাকে দেখে ফেলবে। সে হামাগুড়ি দিয়ে লেকের দিকে যেতে থাকল। লেকের তীরে পৌঁছে দেখল কোনো নৌকা নেই, কেউ নেই। সে কাদামাটিতে শুয়ে হাঁফাতে থাকল। হ্যাঁ, এভাবেই থাকতে হবে সকাল না হওয়া পর্যন্ত। ততক্ষণে শোডাউন শেষ হয়ে যাবে। সে উঠে দাঁড়াতে পারবে। হয় গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবে, না হয় লেকের পাড় দিয়ে হেঁটে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে রাস্তায় উঠবে। সে ভিজে মাটিতে শুয়ে থাকল চিৎ হয়ে। আকাশ দেখা যাচ্ছে। হলুদ তারাগুলো জ্বলছে আর নিভছে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে একটু পরপর। তার ঠান্ডা লাগছে ভিজে মাটিতে শুয়ে। কিন্তু উত্তেজনায় বেশিক্ষণ মনে থাকছে না সেই অনুভূতি। সে এখনো কাঁপছে। হঠাৎ আরো দুটো গুলি হলো। সে মাথা অল্প উঁচু করে দেখল রেসেত্মারাঁর দরজার সামনে আর একজন কাস্টমার পড়ে গেল কাটা কলাগাছের মতো। দেখে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে কাঁপতে শুরু করল জোরে জোরে। অনেকদূরে রয়েছে সে, কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু ভয় তাকে জাপটে ধরে আছে।

 

পাঁচ

রানা জেনের বাবাকে বলছে, ডোন্ট ওরি। নাথিং উইল হ্যাপেন টু হার। আই উইল বি হার বডিগার্ড। নো হার্ম উইল কাম টু হার। সিচুয়েশন এখন নরমাল। এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল। জেনের বাবা রানার কাঁধে হাত রেখে বলল, হ্যাঁ। তা আমি জানি। শি উইল বি সেইফ দেয়ার। ইউ উইল টেক কেয়ার অফ হার। তোমাদের দেশের ছেলেরা খুব সাহসী। গত বছর রেসেত্মারাঁয় যে ছেলেটি বন্ধুদের জন্য প্রাণ দিলো তার কথা মনে আছে। প্রয়োজনে তুমিও স্যাক্রিফাইস করবে যদি তেমন পরিস্থিতি দেখা দেয়। আই নো ইউ উইল প্রটেক্ট মাই ডটার। তবু বাবার মন তো। একটু দুশ্চিমত্মা থেকেই যায়। সে যদি ফ্লোরিডায় যেত ভ্যাকেশনে তাহলেও কিছুটা চিমত্মা থাকত আমার। আসলে খুব প্রটেকটিভ প্যারেন্টস আমরা দুজন। বুঝতেই চাই না মেয়ে বড় হয়েছে এবং শি ক্যান টেক কেয়ার অফ হারসেলফ। ইট ইজ নট ওড ফর হার। তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতে হবে। যাও, তোমরা ভ্যাকেশন করে এসো তোমার দেশে গিয়ে।  কিপ আস পোস্টেড। রোজ ফোন করবে। ভাইবারে কথা বলবে। তাহলেই আমরা নিশ্চিন্ত থাকব। বলে তিনি রানাকে বুকে জড়িয়ে হাগ করলেন। জেনকেও। এরপর বললেন, হু নোজ। হয়তো নেক্সট ইয়ার আমি আর জেনের মা তোমাদের দেশে যাব ভ্যাকেশন করতে। তোমার বাবা ইনভাইট করে দিয়েছেন। অট টু গো দেয়ার। রয়াল বেঙ্গল টাইগার দেখতে হবে। দি লংগেস্ট বিচ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। সো মেনি রিভার্স টু সি। ভেরি ইন্টারেস্টিং দেশ তোমাদের। হ্যাভ এ নাইস ট্রিপ। বন ভয়াজ।

নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছেন তিনি জেন আর রানাকে। তাঁর সঙ্গে স্ত্রীও রয়েছেন। দুজনে কয়েকবার হাগ করলেন তাদের দুজনকে। জেনের মুখে হাসি। তাকে উত্তেজিত দেখাচ্ছে। সে ভবিষ্যতের কল্পনা করছে।

 

রানা সমুদ্রে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। ক্রমেই সরে যাচ্ছে বোট থেকে। তার বাবা-মা লজ্জিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। জেনের বাবা চিৎকার করে বলছেন, এদিকে সাঁতরে এসো। আমরা কাছে আছি।

রানা সাঁতার জানে না। সে লাইফ জ্যাকেট পরে সমুদ্রে কোনো মতো ভেসে আছে। কিছু পরপর ঢেউ এসে ডুবিয়ে দিচ্ছে তাকে। তখন লোনা পানি যাচ্ছে মুখের ভেতর। সে হাঁফিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে সব শক্তি টেনে নিচ্ছে ঢেউ। চারিদিকে তাকিয়ে সে দেখে বড় বড় ঢেউ এগিয়ে আসছে। একটা ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে তার মুখে মনে হয় হাঙর আক্রমণ করছে বুঝি। সে বাঁচার আশা ছেড়ে দেয়। বোঝে, এই তার শেষ, প্রায় জ্ঞান হারাবার মতো হয়েছিল। এই সময় কিছু একটা টেনে ধরল তার কাঁধ। হাঙর? সে সভয়ে চোখ মেলে দেখল জেন তার কাছে এসে হাত ধরে টানছে। তার মুখে হাসি। সে বলছে, টেক ইট ইজি। আমি টেনে নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে। তুমি শরীর ভাসিয়ে দাও। জাস্ট ফলো মি।

জেন টেনে টেনে তাকে নিয়ে গেল বোটের কাছে। দড়িঅলা মই ফেলা ছিল। সেটা আঁকড়ে ধরে থাকল রানা কিছুক্ষণ। সঙ্গে সঙ্গে উঠতে পারল না। জেন ওপরে উঠে তাকে টেনে তুলল। বোটে ওঠার পর বেশ বিব্রতবোধ করল সে। জেনের বাবা হেসে বললেন, এ-রকম অনেকেরই হয়। ফ্যাটাল কিছু না। লাইফ জ্যাকেট থাকলে ভয়ের কিছু থাকে না। সুনার লেটার ইউ আর হোম অ্যান্ড ড্রাই।

 

যদিও শীতকাল না, কাপড় বদলে জেন আর রানা এসে বসল ফায়ারপেস্নসের সামনে। রানা সামনে দু-হাত মেলে আগুনের ওম নিতে নিতে বলল, তুমি খুব সাহসী। শুনে জেন হাসল। তারপর বলল, কারেজ ইজ এ মিস্টেরিয়াস থিং। তোমার মধ্যে আছে কিনা তুমি আগে থেকে জানতে পারো না। যখন সাহস দেখানোর মতো একটা পরীক্ষা আসে তখনই বুঝতে পারো তোমার মাঝে আছে কিনা। বিপদই পৃথক করে দেয় ভীরু আর সাহসীদের। আনটিল দ্যাট ক্রাইসিস ফেসেস ইউ, কারেজ আছে কি নেই বোঝা যায় না। ইয়েস, আ ক্লিয়ার অ্যান্ড প্রেজেন্ট ডেঞ্জার ইজ দি টেস্ট। তার আগে কেউ বলতে পারে না সে ভীরু না সাহসী। কারেজ ইজ আ মিস্টেরিয়াস কোয়ালিটি ইন আওয়ার ক্যারেক্টার।

রানা বলল, তুমি প্রমাণ করলে তোমার সাহস আছে। না হলে অমন করে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতে না। জেন হেসে বলল, সময় এলে তুমিও প্রমাণ করতে পারবে কি আছে তোমার ভেতরে। ভীরুতা, না সাহস? তারপর হেসে বলল, এসো আলোচনার টপিক বদলাই। কারেজের ওপর সেমিনারের মতো হয়ে যাচ্ছে।

জেনের বাবা ঘরে ঢুকে বললেন, হাই গাইজ। হোয়াট আর ইউ ডুয়িং বিফোর দ্য ফায়ারপেস্নস? এখনো শীত নামেনি। দিস ইজ হাই সামার। চলো বেরিয়ে পড়ি। আজ আমরা লবস্টার ডিনার করব।

 

ছয়

ঘরের ভেতরটা এখন অন্ধকার দেখাচ্ছে। অনেকগুলো মোমবাতি নিভে গিয়েছে। পুড়ে শেষ হয়েছে কয়েকটা। দেয়ালে কাস্টমারদের ছায়া এখন অস্পষ্ট দেখাচ্ছে।

রানা জেনের পাশে বসে তার হাত চেপে রেখেছে। জেন প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? জানো না এরা কি করছে এখন? কাস্টমারদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। গুলির শব্দ হচ্ছে। যে কাস্টমার বাইরে যাচ্ছে সে ফিরে আসছে না। হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং রানা। আই অ্যাম স্কেয়ার্ড। তারপর রানার শরীরে হাত বুলিয়ে বলল, তুমি ভিজে গিয়েছ। কাপড়ে ভেজা কাদা। কী হয়েছে তোমার? কোথায় গিয়েছিলে?

রানা বলল, বলেই তো গেলাম বাথরুমে। খুব পিচ্ছিল। পুরো মেঝেতে ময়লা-পানি। পড়ে গিয়েছিলাম। তাই কাপড় ভিজে গিয়েছে। তাদের কথার মাঝখানে ক্যাট-ক্যাট করে শব্দ হতে থাকল বাইরে। একটু পর একটা শেল এসে রেসেত্মারাঁর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। চেয়ার-টেবিল উলটে গেল, ভেঙে টুকরো টুকরো হলো। তারপর আরো শেল এসে পড়ল ভেতরে। একটার পর একটা। রানা বুঝল বাইরে যারা অপেক্ষা করছিল তারা অ্যাকশন শুরু করেছে। নেগোসিয়েশন হ্যাজ ফেইলড। সে জেনকে বুকে জড়িয়ে ধরল। জেন কাঁপছে। কাঁপা গলায় বলল, রানা হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং! মুখোশধারী একজন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে
একে-ফোর্টি সেভেন। রানা প্রমাদ গুনল। এবারে তাদের নিয়ে যাবে। মুখোশধারী কাছে আসার আগেই প্রচ- শব্দে একটা শেল রেসেত্মারাঁর দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকে সব তছনছ করে দিলো। মুখোশধারীর ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে থাকল মেঝেতে। রানা জেনকে জড়িয়ে ধরে বলল, হিট দ্য ফ্লোর। ফ্লোরে শুয়ে পড়।

জেন ফ্লোরে শুয়ে ফোঁপাতে শুরু করল। একটু পর বলল, ওহ্ মাই গড।

কয়েকটা মর্টার শেল পড়ল রেসেত্মারাঁর ছাদে। ছাদের অর্ধেক ভেঙে ঝুলে পড়ল নিচে। সিমেন্টের টুকরো আর বালিতে ঢেকে গেল জেন আর রানার শরীর। জেন এখন কোনো কথা বলছে না। সে স্থির হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। চারিদিকে প্রচ- গোলাগুলি আর শেল বিস্ফোরণের ভেতর রানা জেনের কানের কাছে মুখ এনে বলল, জেন, জেন। আর ইউ অলরাইট? জেন উত্তর দিলো না। হয় সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে, নয়তো…। রানা ভাবতে পারে না। সে জেনের কানের কাছে মুখ এনে বলল, হ্যালো, ইট ইজ মি।  ক্যান ইউ হিয়ার মি? বলার পরই সে অবাক হলো। এডেলের ‘হ্যালো’ গানের কথাগুলো বলছে সে। অথচ এডেলের গান তার এতদিন পছন্দ হয়নি। সে জেনের মুখের কাছে মুখ এনে বলল, জেন, জেন। প্রচ- শব্দে একটা শেল ফাটল রেসেত্মারাঁর ভেতর। রেসেত্মারাঁ কেঁপে উঠল। ধুলো উড়ছে। কংক্রিটের টুকরো ভেঙে পড়ছে চারিদিকে। দেয়ালে কোনো ছায়া নেই। অন্ধকার মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে তীব্র আলোয়। রানা এবার স্বর উঁচু করে বলল, ‘হ্যালো, ইট ইজ মি। ক্যান ইউ হিয়ার মি?’ r

শেয়ার করুন

Leave a Reply