দুনিয়াদারি

লেখক:

হামীম কামরুল হক

কোনোমতেই রেহাই মিলছিল না। নতুন কোনো রোগ হলো নাকি? গরমকাল চলে গেছে সেই কবে। তারপরও এক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিকভাবে সে ঘামছিল। দিনরাত্রি। অবিরাম। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েছে। সে-মতো প্রস্রাব কিন্তু হয়নি। সারা শরীরে অদ্ভুত জ্বলুনি আর ঘাম। ভাগ্যিস এ কয়েকটা দিন সায়েকা আর ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছিল না। দোহার গেছে। নানাবাড়িতে শীতের ছুটির এই কটা দিন কাটিয়ে আসবে। তারও যাওয়ার কথা ছিল।

যেদিন থেকে ব্যাপারটা শুরু সেদিন নাজিম পরেছিল কালো প্যান্ট আর একটা হাফ হাতা চেক শার্ট। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। এখন শীতের কাল, যদিও ঢাকা শহরে দিনের বেলা শীত অতটা টের পাওয়া যায় না। তারপরও নাজিম টের পায়, ঘেমে সে একেবারে আপাদমস্তক ভিজে গেছে। চামড়ার স্যান্ডেলেরও তলা ভিজে যাচ্ছে। গোড়ালির কাছের রগ বেয়ে তরতর করে ঘাম নামছে পায়ে। ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পেত, বাসে যে-জায়গাটায় সে দাঁড়িয়ে, সে-জায়গাটাতেও ঘাম গড়িয়ে ভিজে গেছে। জীবনে এতো ঘামা সে আর কোনোদিন ঘামেনি।

সব ভিজে কোমরের সামনের দিকে প্যান্টের চোরা পকেটে মাঝে মাঝেই সে টাকার তোড়ায় ফুলে ওঠা জায়গাটা ছুঁয়ে দেখেছে। টাকাগুলো পাঁচশো হলে এতো মোটা হতো না, সব একশ টাকার নোট। সবমিলে দশ হাজার থাকার কথা। গুনে দেখেনি। তাকে এর জন্য তেমন কিছু করতে হয়নি, কেবল রাজি হতে হয়েছে। ফাইল ছাড়তে হয়েছে। কিছু নোট দিতে হয়েছে। সবই করেছে ফতির সাহেবের কথামতো। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আরে মিয়া কোনো বিপদ হবে না, আমরা সবাই আছি না!’ ‘আমরা সবাই’ কথাটা সেদিন খুব কানে বেজেছিল।

টাকাটা কেন নিল সে? সায়েকা তো কিছু বলেনি, কখনো বলে না যে তার এই-লাগবে, ওই-লাগবে? ছেলেমেয়েদেরও কোনো আবদারের চাপ নেই। এক বড় চাচ্চু যা দেন তা দিয়ে তো ওদের ঘর ভরা, মনও। কোনো ধারদেনা নেই। শোধবোধের কোনো কারবার নেই। তাহলে? কেন নিল সে-টাকা? গত বছর ভাগাভাগিটাও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বাবা মারা গেছেন তাও বছর দুয়েক হয়েছে। কিছুই ভাগাভাগি করে দিয়ে যাননি। চার ভাই মাত্র। কোনো বোনটোন নেই। চারতলা বাড়ির মুখোমুখি দুটো ফ্ল্যাট পেয়েছে সে। কোনো রকম লটারি-টটারি লাগেনি। পুরো বিষয়টা বড় ভাইয়ের কারণে আপসে রফা হয়েছে। মেজভাইটা শুধু দোতলা নিতে একটু গাইগুই করছিল। সেজও তাই চাইছিল। তাই তাদের ওপর-নিচে দুটো ফ্ল্যাট দোতলা-তিনতলা পেয়েছে। বড়ভাইয়ের একটা মাত্র মেয়ে। এতো শিক্ষিত, এতো মেধাবী কিন্তু একেবারে শিশুর মতো সরল। বিয়ের পর আমেরিকা চলে গেছে সেই কবে। স্ত্রীও মারা গেছে বছর দুয়েক আগে। হার্টের রোগী। একতলাটা নিজেই যেচে নিয়েছেন। সরকারের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। দিলখোলা মানুষ। রাজ্যের বন্ধুবান্ধব ছিল একসময়। সারাদিন বাসা গমগম করত। জগতে তার চেয়ে ফুর্তিবাজ কোনো লোককে দেখেনি নিজাম। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর কেমন একটু যেন বদলে গেছেন।

বড়ভাই ছাড়া সবাই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছে, অন্যটাতে থাকছে। বাড়ির চারপাশে খোলা জায়গা। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ওত পেতে আছে। কিন্তু সব ভাই একাট্টা। তারা বেঁচে থাকা পর্যন্ত কোনো কোম্পানির হাতে বাড়ি বিলিয়ে দেবে না। পুরোবাড়ি দেয়াল দিয়ে ঘেরা। পেছনের দিকে রেললাইন। এমনিতে ট্রেন চলে যাওয়া শব্দতে কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু সে-রাতে নাজিম সারারাত কিছুক্ষণ পরপর ট্রেনের শব্দ শুনে-শুনে চমকে চমকে উঠেছে। এত ঘাম হচ্ছে কেন? জীবনে প্রথম, তাও এতো সামান্য, তাতেই এ-ই!

ফতির সাহেব বলেছিল, ‘আরে দিন আর কয়দিন? বাঁচাবেন আর কয়দিন? ছেলেমেয়ের জন্য কী রেখে যাবেন? টাকার গায়ে কিছুই লেখা থাকে না। ওর কোনো সাদা-কালো নেই। জগতের যত বড়লোক আছে, তাদের বড়লোকির উৎসে আছে আপনার ওই কালো টাকা। দিন, সাইনটা দিন।’

নাজিম দিত না। ফতির সাহেবের আরো কত কথা। ‘জীবন কয়দিনের বলেন? আর কবে বুঝবেন? জীবনের নাম হলো শরীর। শরীর চায় ভোগ। ভোগ মানে ভাববেন না, ওই ইন্টারকোর্সের কথা বলছি! হেঃ হেঃ হেঃ! ভোগ মানে আরামে থাকা। শরীর নাই, জীবন নাই। কাজকাম আর আরাম – এই দুই হলো জীবন।’

ফতির সাহেব বেশ কয়েকদিন ধরে এসব বলে আসছিল। মাঝে মাঝে নিজে থেকে চা-শিঙাড়া আনিয়ে খাওয়াচ্ছিল। তাকে দিয়ে কোনো কাজ উদ্ধারের তাল এলেই যে ফতির সাহেব এসব করেন নাজিম বুঝতে পারে। মুখের ওপর তো কোনো কথা বলা যায় না।

বড় ভাইজানের কারণেই এ-চাকরি। সেকেন্ডক্লাস জব।

‘আমি জীবনে কোনো ছোট কাজ করিনি, তোর জন্য আমাকে এটা করতে হলো। একটাই অনুরোধ, আমার যেন কোনো বেইজ্জতি না হয়। থাকার তো আর সমস্যা নেই। বাসাভাড়া দিতে হয় না। তার ওপর এখনো বাসার কাছেই অফিস। পরে বদল হলেও আগারগাঁওয়ে যাবে আর কী। তাও কোনো সমস্যা হবে না। এখন তো চাইলে হেঁটেই যাওয়া-আসা করতে পারবি। আর কী চাই।’

কথা রেখেছিল নাজিম। কোনো কিছুতে জড়ায়নি। সবাই করছে। না করাই নাকি অস্বাভাবিক। সেধে কিছু মাঝে মাঝে দিতেও এসেছে। সে নেয়নি। লোকে বলে, তার তো কোনো দরকার নেই। নিজের বাড়িতে থাকেন। রাজকপাল। আমাদের কী আছে। তার ওপর বাড়িভাড়া পান।

ভাগাভাগির সময় বড়ভাই তাকে ডেকে নিয়ে আলাদা করে বলেছিল, ‘তুই কোনো আপত্তি করিস না। আমারটা তোকেই দিয়ে যাবো। মলি তো আর কোনোদিন দেশে আসবে না। গতকাল ফোনে কথা হলো। নিজে থেকেই বলে, ছোট চাচ্চুকে দিয়ে দিও। এতগুলি ছেলেমেয়ে।’

নিজেকে ছোটবড় কোনো কিছুই মনে হয় না। বউ বলে, ‘তোমার তো কোনো কিছুতে মাইন্ড হয় না। তোমার কোনো মনটন নেই!’ পাঁচ-পাঁচটা ছেলেমেয়ে। স্থায়ী কোনো পদ্ধতিতে যেতে চেয়েও শেষে বাদ দিয়েছে সায়েকা। দরকার কী! সেও আগেরকালের লোকজনের মতো বিশ্বাস করে – জিভ দিয়েছেন যিনি/ আহার দেবেন তিনি। বউদের মধ্যে তারই কোনো লেখাপড়া নেই। কোনোমতে ইন্টার পাস। নাজিমের তো না পারতে এমকমটা শেষ করতে হয়েছিল। তার উঠতে-বসতে বাপ চৌদ্দোবার মনে করাত। বাপ বলত, আর কোনো ভাইয়ের তো মাথায় এতো গোবর নেই। সে এমন পদের হলো কোনখান থেকে।

নাজিম বাপের বেশি বয়সের সন্তান। বেশি বয়সের সন্তান বলে বরং আরো বুদ্ধিমানই হবে মনে করেছিল তার বাপ। নাজিমকে সত্যিই বাঁচিয়ে দিয়েছে ‘সাত চড়ে রা নাই’ স্বভাবটা। কোনোকিছুতে গাও লাগায় না, আবার না করতেও চায় না। আসলে পারেও না। আবার করতে করতে গা ছেড়েও দেয়। আবার বলতে হয়, তখন আবার করে। এই করতে করতে তাকে কোনোমতে টেনেটুনে একটা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে থেকে এমকম পাস করানো গেছে। বাপ তার নামও একটা দিয়েছিল ‘গর্ভস্রাব’। গর্ভস্রাবটা কোথায় গেল? এসেছে গর্ভস্রাবটা? কী করছে গর্ভস্রাবটা? – এসব বহু শুনতে হয়েছে। বাপ মরে যাওয়ার সময়টা সবাই পাশে ছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে। সবাই চারপাশ ঘিরে বসা। প্রায় নববই বছরের নিজাম সাহেব। সবার ভেতরে নাজিমকেই সবার আগে ডেকে বললেন, নাজিব যা বলবে শুনবি। কোনোমতে ভেঙে ভেঙে বললেন। দুহাত ধরে সেদিন হু-হু করে কেঁদে ফেলেছিল নাজিম। নাজিবুদ্দৌল, একরামুদ্দৌলা, হাফিজুদ্দৌলা আর সে – নাজিমুদ্দৌলা, চার পুত্র এই নিজামুদ্দৌলার।

দাদা এসহাকুদ্দৌলা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের উকিল। স্বদেশিদের হয়ে মামলা লড়তেন। পরে মুসলিম লীগে কেন যোগ দিলেন – এই নিয়ে আমৃত্যু আক্ষেপ ছিল এসহাকুদ্দৌলার। নিজামের ব্যারিস্টারি পড়তে বিলাত যাওয়ার কথা ছিল। ঠিক তখন দেশভাগ। কলকাতা থেকে শেকড় তুলে চলে আসতে হলো। প্রথমে রাজশাহী, পরে ঢাকায়। উকিল হিসেবে নিজামের মোটামুটি নাম ছিল, তবে বাপের মতো না। বাপের মতো দাপুটে না হলেও নিজামও ঠাটের জীবন কাটিয়েছেন। কাউকেই তেমন পাত্তা দিতেন না। ছেলেদের ভালোমতো মানুষ করতে পেরেছিলেন, কেবল ছোটটাকে নিয়ে কী করবেন তাই নিয়ে সারাজীবন তার আক্ষেপ ছিল। নাজিমের মুখ খুব চালু না হলেও সে একবার বাপকে বলেছিল, সমস্ত পরিবারেই একটা প্রবলেম চাইল্ড থাকে। আপনাদের কপালে জুটেছি আমি।

সমস্যা যত বেশি মোকাবিলা করা যায়, ততই বলে শক্তি অর্জন করা যায়। নাজিমের বেলায় প্রতিপদে এতো সমস্যা এসেছিল কিন্তু  কই তার তো কোনো কিছুতে কিছু হলো না। সমস্যা তো ওই একটাই – মাথায় কিছু ঢুকত না। স্কুলে থাকতে প্রায় ফেল করতে করতে পাস করেছে। স্কুলে থার্ড ক্লাস নিয়ে বাদবাকিগুলো কোনোমতে সেকেন্ড ক্লাসে উতরে গেছে। কেবল মা ও বড় ভাই তাকে আগলে রেখেছিল। মা তো মারা গেছে কলেজ পাস করার পর। ভাইদের সবার বিয়েশাদি হয়ে বাচ্চাকাচ্চা হয়ে ভরসংসার। নাজিমের সেজভাইয়ের পর বলে চারটা ছেলেমেয়ে হয়ে বাঁচেনি। তার ভেতরে তিনটা ছিল বোন। এরপর নাজিম। সেও মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল।

হ্যাংলা-পাতলা শরীর। লম্বার কারণে ঢ্যাঙা দেখায়। সেই শরীরে দিনরাত এমন ঘাম, তাও এই শীতের দিনে, এ-কারণ তো বুঝতে কষ্ট হয়নি নাজিমের। এখন নিয়ে ফেলেছে, টাকাগুলো কী করা যায়। খুব বেশি তো টাকা না। তারপরও এটুকুই তার জন্য অনেক হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, টাকাটা সে অন্য কোথাও রাখতে পারছে না। সবসময় সঙ্গে সঙ্গে রাখছে। অথচ বাসায় কেউ নেই। ঘর বন্ধ করে বিছানার ওপর টাকার তোড়াটা রেখে সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। আর দরদর করে ঘেমেছে। দিলি দিলি, তাও সব একশ টাকার নোট! লোকজনকে বললে তো নোটগুলো পাঁচশো করিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু এ-টাকা দিয়ে সে করবে কী? তার বদলে ঘাম আর ঘাম। এর হাত থেকে রেহাই মিলবে কী করে? রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসবে? না পাড়া-মহল্লায় যত মসজিদ আছে, বা চলার পথে দানবাক্স যত পায়, তাতে দিয়ে যেতে যেতে শেষ করবে? তাও কেমন দেখায়? নাজিমের পকেট থেকে বাজার করার সময় ছাড়া কেউ টাকা-পয়সা বের হতে দেখেনি। বাসায় গরমে ঘামে টিকতে না পেরে সে রাতের বেলা বেরিয়ে পড়েছিল বারবার। বউ না থাকায় কদিন তো বড়ভাইয়ের সঙ্গে খেতে হচ্ছে। কথাটা সেদিনও বললেন, ‘আমাদের এই জেনারেশনই মনে হয় শেষ। এরপর আর কেউ এমন মিলেমিশে পাশাপাশি থাকবে না রে নাজিম।’

এ-বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করে নবির শেখ, তার বউ হীরামন আর তার দুই ছেলেমেয়ে। নবির শেখও ব্যাপারটা খেয়াল করেছে। বড়ভাইজান বলে, ‘তোর কী হয়েছে রে! এমন ঘামছিস কেন?’

‘না না, কিছু না।’

‘অফিসে কোনো সমস্যা? তুই তো অন্তত অফিসে সমস্যা করার লোক না। কী হয়েছে বল তো?’

‘কিছু না ভাইজান।’

‘তাহলে?’

‘বুঝতে পারছি না, ভাইজান।’

সে কোনোমতো খেয়েদেয়ে উঠে পড়েছিল। নাজিব ভাবলেন বউ বাসায় নেই। অন্য কোনো জটিলতায় পড়ল নাকি? কিন্তু সে তো বেড়াতে গেছে। ঝগড়াঝাঁটির লোক তো নাজিম নন। সুন্দর আর অত্যন্ত স্বাস্থ্যবতী দেখে নাজিমের বিয়েটা তিনি দিতে পেরেছেন। বউদের ভেতরে সায়েকা দেখতে যেমন লম্বা-চওড়া, তেমনি যাকে বলে রূপবতী। আর নাজিব যতদূর জানে, বউকে নিয়ে সুখেই আছে ভাইটা। তার সঙ্গে তো কোনো সমস্যার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি চিন্তায় পড়ে যান।

এর ভেতরে একবারে হুট করে মলি তার এক দঙ্গল, মানে চারটা, ছেলেমেয়ে আর তার সেই বিদেশি জামাই নিয়ে হাজির। কিছু জানিয়ে আসেনি কারণ তাতে সবাই নাকি বাড়তি ঝামেলায় পড়ত। সারাবাড়ি একেবারে মেতে ওঠে। আনন্দে টলটল করে ওঠে ওই বাড়ির প্রতিটি ঘর আর বারান্দা। নাজিম এর ভেতরে একবারে লুকিয়ে-চুরিয়ে অফিস-বাসা করছে। আর দিনরাত ঘামছে। অফিসেও নিজের সিটে বেশিক্ষণ বসতে পারছে না। এমনিতে সে তার সিট থেকে নড়তোই না। নাজিম এতটুকু বুঝতে পারছে যে, তার স্বাভাবিক জীবনটা সে কোনোমতেই চালিয়ে নিতে পারছে না। অদ্ভুতভাবে মনের ভেতরে কোনো চাপ নেই। কিন্তু শরীর তাহলে এমন করছে কেন? স্নায়বিক কোনো সমস্যা হলো না তো। তার এ-কথা ভাবার মতোও যোগ্যতা আগে কোনোদিন ছিল না। অফিসের করিডোরে মিসেস জোলেইখা বেগম একবার জিজ্ঞাস করলেন, ‘কী ব্যাপার নাজিমভাই, আপনাকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছে?’

‘বুঝতে পারছি না!’ বলে কপাল, মুখ আর ঘাড়টায় রুমাল বুলায় আর বলতে গেলে সে জোলেইখাকে এড়ায়। এই মহিলা অফিসে তার সঙ্গেই জয়েন করেছিল। তখনো দুজনের কেউ বিয়ে করেনি বলে অন্য কলিগরা ঠিক করেছিল এদের জুড়ে দেওয়া যায় কি-না। তা তো হয়নি। কিন্তু কী কারণে এখনো জোলেইখা নাজিমের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। জোলেইখার বড় মেয়েরই এখন সম্বন্ধ আসতে শুরু করেছে। কুড়ি বছর হতে চলল চাকরির বয়স। জোলেইখাকে দেখলেই একমাত্র এটা মনে পড়ে। সেদিন তাও মনে পড়ল না।

বাসায় ফিরলে আবার মলির পাল্লায়। সে এসে সারাবাড়ি জাগিয়ে রেখেছে। সেও বলে, ‘কী হয়েছে ছোটচাচ্চু?’ ‘না রে, কিছু না।’ ঠিক এসময় কানে এলো, ‘কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি/ চেহারাটা পালটে সাজে বহুরূপী।’ মলি চিৎকার দিয়ে বলে ‘ইত্যাদি’ হচ্ছে, চলো চলো সবাই।

সেও কি বহুরূপীর মতো হয়ে গেল নাকি? নাজিমের ঘামের পরিমাণ আরো বেড়ে গেল। ভাতিঝির হাত থেকে সে সোজা চলে এলো নিজের ঘরে।

যা করার করতে হবে। রাতও হয়েছে অনেক। আগামীকাল সকালেই বলে সায়েকারা আসবে। মলিই বলে আনাচ্ছে। এর ভেতরে রক্ষা পেতেই হবে। সায়েকা যদি এসে তারই এই বিশ্রী ঘামের ব্যাপারটা দেখে, রীতিমতো সে ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু এতো রাতে সে কী ব্যবস্থাটা করে তাও তো বুঝতে পারছে না।

শীতের রাতে গায়ে বলতে গেলে কিছু না চাপিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। বেরোনোর আগে পলিথিনে মুড়িয়ে নেয় টাকার তোড়াটা, সঙ্গে একটা বাজারের থলে। মিটসেফের ড্রয়ারে পাটের দড়ি কুন্ডলী করে রাখে সায়েকা। সেখান থেকে একটা দড়ি নিয়ে বাড়ির পেছনে চলে যায়। সেখানে গ্যারেজ তৈরি করার পর বেঁচে যাওয়া ইটের ছোট স্তূপ থেকে একটা অর্ধেক ভাঙা ইট নেয়। তার সঙ্গে পেঁচিয়ে পলিথিনটা বাঁধে। নাজিম টের পায়, এটুকু কাজে সে ধুম বৃষ্টিতে ভেজার মতো ঘামছে। তারপর থলেতে ভরে বেঁধে রিকশা নিয়ে সে হাতিরঝিলের রাস্তায় আসে। যদিও সে মনে করেছিল এতো রাতেও অনেক লোকজন থাকবে। কিন্তু একটু অবাক হয়, ব্রিজটাতে কেউ নেই। নাজিম নিজের ভেতরে যাতে কোনো সন্দেহজনক কোনো ব্যস্ততা কেউ ধরতে না পারে সে-ব্যাপারে সতর্ক হয়ে ওঠে। জীবনে এই প্রথম ও শেষবারের মতো সে এমন একটা কাজ করতে চলেছে। স্বাভাবিক পায়ে সে ব্রিজের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থলির ভেতর থেকে আধখানা ইটে দড়ি দিয়ে বাঁধা পলিথিনে মোড়ানো জিনিস বের করে এনেই সামনের দিকে ছুড়ে মারে। থপাস করে একটা শব্দ কানে আসা মাত্র নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপরই ঘুরে দাঁড়ায়। আর ঘুরতেই দেখে তার দিকে তিনজন লোক, ইউনিফর্ম পরা, এগিয়ে আসছে। নাজিমের মুখ সে নিজে দেখলে দেখতে পেত এই শীতের রাতে সাদা হয়ে গেছে। লোক তিনটা তাকে কোনোরকম গণ্য না করে তার পাশ দিয়ে বেগুনবাড়ীর দিকে চলে যায়। নাজিম পরে সম্বিত ফিরে পেলে বোঝে, এরা সিকিউরিটি গার্ড; মনে হয় কোনো ডিউটিতে চলেছে।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার নিজেকে এতো হালকা লাগে। মনে হয় একটু দমকা হওয়া এলেই তার পাতলা ঢ্যাঙা শরীর উড়ে চলে যাবে।

বাড়িতে ঢোকার সময় টের পায় তার শরীর আর ঘামছে না। আর সারা শরীরের ঘামও শুকিয়ে গেছে। একটু শীত-শীতও লাগছে। ফিরে আসার একটু পরেই বড়ভাই নিচে আসতে খবর পাঠান।

গিয়ে দেখে হইচই তখনো চলছে। মলি বারবার বলছে, ‘কোথায় ছিলেন ছোট চাচ্চু? আমরা খুঁজে মরছি!’ সন্ধ্যায় একদফা হয়েছে এখন এই রাত ১১টায় আবার কী! জানা গেল ১২টার সময় মলির বড় মেয়ে তেরেজার জন্মদিন। সেই নিয়ে বিরাট কারবার। বাড়ির সবাই এসেছে। টেবিলে বিশাল কেক। কেকে হ্যাপি বার্থ ডে টু তেরেজা লেখা। তাতে ১২টি মোমবাতি জ্বলছে। পুরোবাড়িতে এমন উৎসব আগে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। বড় ভাইজান হো-হো হা-হা করে হেসেই চলেছেন। রাত ১২টা বাজার আগে তিনি দাঁড়ালেন নাতনির হাত ধরে। তারপর প্রচন্ড শব্দে বেলুন ফাটল। সঙ্গে হাততালি আর হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ তেরেজা। কেকটা মুখে দিচ্ছিলেন বড় ভাইজান। তার হঠাৎ কী হলো – নাতনি আর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে ফেললেন। হঠাৎ একটা ভারী আবহ ছড়িয়ে পড়লেও তালি তখনো থামেনি। নাজিব বেশ কিছুক্ষণ মলি আর তেরেজাকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে আগের মতো সামলে নিলেন।

তারপর কয়েকদিন তো পার হয়ে গেছে। সায়েকারা পরদিনই চলে এসেছিল। দোহার থেকে দশ কেজি নানান জাতের মিষ্টি এনে তা বিলানো হলো। নাজিম দেখলেন সায়েকার শরীরে যেন নতুন লাবণ্য ছড়িয়েছে। ছেলেমেয়েদের আরো ফুটফুটে সুন্দর লাগছে। সব মায়ের চেহারা পেয়েছে। সুন্দর স্বাস্থ্য সবার।

সারাবাড়িতে খুশির আমেজ যেন লেগেই ছিল। মলিরা চলে যাওয়ার আগের দিন রাতে তাকে নাজিব খবর দেন। তাকে একটু অবাক করে জানতে চান, ‘আসলে তোর কী হয়েছিল ওই দিনটায়? যাক এখন তো মনে হয় ভালো আছিস।… ভালো থাকতে হয় রে। আর এজন্য একটা ভালো মন হলেই চলে। আর কিছু লাগে না। জীবনে হাসি এলে হাসবি, কান্না এলে কাঁদবি, তাই না? হাসিকান্না যাদের নেই, তারা মানুষ নাকি! এই যে মেয়েটা এতোদিন পর এলো! কত আনন্দ হচ্ছে। কদিন পর সব নিভে যাবে; কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না। যে-কদিন বাঁচি নিজের মনটাকে ভালো রাখা, নিজের মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা – এই তো, আর কী!’

নাজিম কিছুই বলছিল না। বড় ভাইজান এমন কথা আগেও অনেক বলেছেন, কিন্তু আজকে বলার ভেতরে কী যেন ছিল, নাজিমের চোখ ফেটে কানণা পাচ্ছিল। বড়ভাইকে ধরে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।

নাজিমকে পরেও এ নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেননি বড়ভাই। কোনো জোর করেননি। জোর করে কোনো কিছু করার কোনো মানে নেই। এটাই নাজিব জানেন ও মানেন। নিজের মেয়ে, তাকে কি জোর করে ধরে রাখা যেত! হার্ভার্ড থেকে পাশ করা মেয়ে। কী সরল মেয়েটা তার। জামাই সেখানেরই প্রফেসর। সবারই নিজের জীবন আছে, নিজের দুনিয়াদারি আছে। একজনের ওপর আরেকজনের জীবনটা চাপানো যায় না।

মলিরা চলে গেছে। বাড়ির পেছনে গোলাকার বিরাট বারান্দায় আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে কথাগুলো তার মাথায় যাওয়া-আসা করছিল। কদিন আগেও বাড়িটা কী হইহল্লায় মেতে উঠেছিল। আবার যে-কার সেই। তিনি একবার ছাদের দিকে আরেকবার মেঝের দিকে তাকান। মোজাইকের মেঝে। ওইখানে দাঁড়িয়ে মলির ছোট ছেলেটা কী লাফানোটাই না সেদিন লাফাচ্ছিল। সে-দৃশ্যটা মুছে গিয়ে নাজিমের মুখ চলে আসে। কী হয়েছিল সেদিন ওর? এমন ঘামছিল? আর ওইদিন এমন করে কাঁদলোইবা কেন? না থাক, জানতে চাইব না। সবকিছু জানতে চাইতে নেই। থাকুক না কিছু, কিছু রহস্য থাকুক। মাঝে মাঝে জীবন ভরে উঠবে, এই তো কদিন গেল, এখন আবার সব শূন্য, এই তো হয়ে আসছে।

তিনি মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দৃষ্টিসীমার ভেতর একটা তেলাপোকা ঢুকে পড়ে। দেখেন তেলাপোকাটা পিরপির করে এই বিশাল ফাঁকা বারান্দাটা পেরিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply