দেখার সঙ্গে অদেখা

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফাMindscape

মানুষের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য আছে নানা উপায়। একজন চিত্রশিল্পীর কাছে অনুভূতির বহু স্তর ধরা পড়ে – তাঁর সৃজনজ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতায়। আজমীর হোসেন এই বিশেষ গুণের চিত্রকর। তিনি নিজের দেখাকে দর্শকের কাছে উপস্থাপনের আগে চিত্রপটে অনেকগুলো বর্ণপর্দা তৈরি করে দৃশ্যের সাধারণ বিষয়কে এমন এক মাত্রা দেন, যা ভাবনার উদ্রেক এবং এক ধরনের কৌতূহল সৃষ্টি করে।

আজমীর প্রবাসে ছিলেন অনেকদিন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে দুটি দলগত প্রদর্শনীতে অংশ নেন। প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী করলেন ঢাকার বনেদি চিত্রশালা বেঙ্গল শিল্পালয়ে। তরুণ শিল্পী আজমীরের জন্য সুযোগটি দারুণ! তাঁর কাজ দেখে মনে হলো – বেঙ্গল কর্তৃপক্ষ তাঁর একক আয়োজন করে যথার্থ কাজটিই করেছে। আমাদের সুযোগ হলো নবীন একজন শিল্পীকে চেনার, যিনি চিত্রপটে বহু বর্ণের পর্দা গড়ে পর্যায়ক্রমে চিত্রকর্মকে পূর্ণতা দেওয়ার প্রয়াস পান।

আগে খুঁজে নিই এই শিল্পীর বৃত্তান্ত। নবীন এই চিত্রকরের জন্ম ১৯৭৬ সালে ঢাকায়। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ এই দুই বছর আজমীর চিত্রবিদ্যায় পাঠ নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। এরপর সে-পাঠ চুকিয়ে পাড়ি জমান কানাডায়। পরে থিতু হন নিউইয়র্কে। প্রথম কবছর ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করতে হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে নিউইয়র্কে শিল্পী জন রুগেরির অধীনে তিনটি অঙ্কন কর্মশালায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের আর্ট স্টুডেন্ট লীগ নামক শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিত্রবিদ্যা লাভ করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করে ২০১২ সাল অবধি তেইশটি দলগত চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন – এর কুড়িটিই যুক্তরাষ্ট্রে, তিনটি ঢাকায়। সম্প্রতি ঢাকার কসমস আতেলিয়ার ৭১ প্রিন্টমেকিং স্টুডিওতে তিনমাসের একটি ছাপচিত্র-কর্মশালা পরিচালনা করেছেন শিল্পী। দেশে ফিরে পরপর দুটি দলীয় চিত্রপ্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন। এটি তাঁর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী।

আজমীর হোসেন তাঁর দেখা নিসর্গ ও চারপাশকে তুলে ধরেন নিজের মনের আয়নায়। জ্যামিতিক রূপায়ণের ধরনটিকে তিনি গ্রহণ করে তুলে আনেন চিত্রপটে। তাঁর কাজ যখন প্রথম দেখি – মনে হচ্ছিল শিল্পী বুঝি বিমূর্ততাতেই যুক্তি খুঁজতে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু একটার পর একটা চিত্রকর্ম দেখতে দেখতে বোঝা গেল – এই শিল্পীর কাজে বাস্তবতার আভাস আছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কের নিসর্গ, বিশাল ল্যান্ডস্কেপ, সমুদ্রের জলরাশি আর ওপরের আকাশ এসে ঠাঁই নিয়েছে যেন তাঁর চিত্রপটে। বিমূর্তের আবহে ভূচিত্রের নানা পরিশীলিত রূপে এসেছে। একে একে উঠে এসেছে রোদ ঝলমল প্রকৃতি, বৃষ্টির আবেগ, জলের বহমানতা। রুকলিন ব্রিজের নিচে নীল জলরাশি এঁকেছেন তিনি। সেই জলের বুকে আলোর মতো ছোট ছোট অসংখ্য জ্যামিতিক ফর্ম ও ডট। এসব ছবির পেছনে গল্প আছে, সে-গল্পগুলো বর্ণনায়, যেন গল্পের বর্ণনা অন্তহীন – ফলে গল্প শেষ হয় না। তার রেশ রয়ে যায়।

আজমীরের বর্ণলেপন-পদ্ধতি অন্যরকম। ঠিক সাধারণ নয়। স্বতন্ত্র এই কারণে যে, তিনি বহু স্তরে বর্ণলেপন করেন। আলো থেকে ক্রমান্বয়ে অন্ধকারের দিকে ‘যাত্রা’ করায় আলো পায় স্বর্গীয় মর্যাদা। বর্ণলেপনে তিনি চিকন সুতা ব্যবহার করেছেন কতক কাজে। সুতা রেখে ওয়াশ দিতে দিতে সূক্ষ্ম অনেক রেখা তৈরি হওয়ায় চিত্র অবলোকনের মজা বেড়ে যায়। সুতার রেখা কখনো আনুভূমিক, কখনো প্রায় ডিম্বাকৃতির মতো বাঁক নিয়েছে। রং লেপনে এই মৌলিকত্ব আমাদের চোখকে প্রশান্তি দেয়, অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করে নতুন এক চিত্রগত আভাসে। রঙের স্বচ্ছতা রেখা, বিন্দু সব মিলিয়ে দৃশ্যের ঐক্য তৈরি করে।

শিল্পী আজমীর হোসেনের চিত্রবিদ্যার সূচনা এদেশে হলেও প্রায় কাদামাটির বয়সে তাঁর পাশ্চাত্যে যাত্রায় মানস গঠন হয়েছে পাশ্চাত্যধারায়। চিত্রচর্চায় পাশ্চাত্যের শিল্পাদর্শ তাঁর রক্তে মিশে গেছে। তাঁর দেখা জীবন ও পরিপার্শ্বের সৌন্দর্যের অন্তনির্হিত রূপকে তিনি সাধকের মতো তুলে ধরেছেন। অনেক সময় নিয়ে বারবার বর্ণলেপন করে চিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছেন। ফলে এসব চিত্রে এক ধরনের গ্রাফিক মান তৈরি হয়েছে। অনেকটা ছাপচিত্রের মতো তাঁর এসব কাজ। অভিব্যক্তির প্রকাশকে আরো নিবিড় করতে জলরঙের সঙ্গে সুতো ছাড়াও তিনি প্রয়োগ করেছেন প্যাপিরাস, টেবিল ম্যাটের টুকরো অথবা কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ। শিল্পী তাঁর সমকালীন আধুনিকতাকে তুলে ধরেছেন এসব উপকরণ প্রয়োগ করে।

গ্রাফিক কোয়ালিটির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এই বিশেষ কৌশলটির প্রয়োগ যদি পরিমিত না হয়, তাহলে সৃজন দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই বিশেষ দিকটি আজমীরের কাজে যে আসেনি এমন নয়। তবে চিত্রকর্মের চিত্রগুণ রক্ষার জন্য তাঁর সচেতনতার পরিচয় আমরা পেয়েছি।

প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘অনুভূতির অনুসৃতি’। আর প্রধান দুটি সিরিজের নাম – মনোভূমি ও মনের চোখে দেখা। সাধারণ সাদা চোখে দেখলে হবে না। মানসচোখের দেখায় হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় চিত্রকর্মকে। এভাবেই রসাস্বাদন করতে হয় শিল্পের। বিশেষ করে সেগুলো যদি হয় আমাদের দেখা থেকে আরো দূরের অদেখার মতো।

মনোভূমি-১ চিত্রকর্মটির কথাই ধরা যাক। এটি কনি আইল্যান্ড থেকে দেখা আটলান্টিকের প্রতিবিম্ব নিয়ে অাঁকা। চিত্রপটকে তিনি ছয়টি প্যানেলে বিভাজন করে তাতে নানারকম পরিবেশ ও বিষয়কে তুলে আনার প্রয়াস পেয়েছেন। চিত্রপট শিল্পীর কাছে তাঁর ভাবপ্রকাশের জানালা, যেটি দিয়ে তিনি নিজের অবলোকনকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন। সুতা প্রয়োগ করে বর্ণপ্রলেপের কারণে এ-কাজটিতে একধরনের কাঠের গ্রেন এসেছে।

মনোভূমি-২ চিত্রকর্মের গঠন ও বর্ণবিন্যাস অন্যগুলোর থেকে আলাদা। মনে হয় সমুদ্রের তলদেশের লতাগুল্ম, জলের বুদ্বুদ এখানে চিত্রিত হয়েছে। মনোভূমি-৫-এ পেয়ে যাই বৃষ্টিপতনের ছনেদাময়তা। আবার ‘মনোভূমি-৩০’ শীর্ষক চিত্রে দেখা গেল চিত্রপট তিনভাগে বিভাজিত। নীলচে কালো থেকে সাদা হয়ে আবার সেই কালো থেকে সাদা, তারপর পর্যায়ক্রমে আবার কালোরঙের গভীরতা। এসবই বর্ণপর্দার ওপরে বা ভেতরে অসংখ্য ডটচিহ্ন মহাশূন্যের গভীরতার রহস্যময়তা তুলে ধরেছে। এগুলো কাগজে জলরং ও মিশ্রমাধ্যমে অাঁকা। মিশ্রতা ততো তীব্র নয়, জলরঙের স্বচ্ছতা এখানে যতটা বহমান। মনোভূমি-৫৬ শুধু জলরং মাধ্যমের ছবি। পরিপাটি জ্যামিতিক ফর্মের কাজ। বেগুনি বর্ণের সঙ্গে কালচে বর্ণের মিশ্রণে পুরো আবহ গড়ে উঠেছে। পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন কাজটি একটু বেশিই যেন কলাকৈবল্যময়। আবার মনোভূমি ৩২ ও ৩৩ শীর্ষক চিত্র দুটির প্যানেল বিভাজন, নানাবর্ণের আলিম্পন রেখা ও ফর্মের শৃঙ্খলায় আমাদের দৃষ্টি মুগ্ধতা পায়। মনোভূমি-৫৫ এই শিল্পীর ভিন্নধরনের কাজ। কোলাগ্রাফ ও মিশ্রমাধ্যমের চিত্রকর্ম। সূর্য প্রকৃতির বুকে যে-আলো ঢেলে দেয়, সে-অনুভূমি পাওয়া যায় এটিতে।

রং প্রয়োগে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পী আজমীর হোসেন। জলরং ও মিশ্রমাধ্যমে তাঁর নৈপুণ্য চিত্রকর্মকে নান্দনিক ঐশ্বর্য দিয়েছে। বিমূর্ততার ভাষায় জীবনের নানা সত্য ও দৃশ্যকে দেখা ও দেখানোর প্রয়াস প্রদর্শিত চিত্রগুচ্ছে নবীনমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। জীবন ও প্রতিবেশের বিষয়গুলো নিয়ে এই নবীনের নিরীক্ষার নানা ধরনে দর্শকের দৃষ্টির মুগ্ধতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

বেঙ্গল শিল্পালয়-আয়োজিত এই একক চিত্রপ্রদর্শনী শেষ হয় ২০ মে ২০১৩, সোমবার।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার