দেশভাগের দলিল

লেখক:

বুলবন ওসমান

 

শিরোনাম বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। আসলে ব্যাপারটির গুরুত্ব অনুযায়ী তা হতে বাধ্য। শিল্পকলার ক্ষেত্রে কথাই তো আছে, ‘ফর্ম’ ফলোজ ফাংশান – তেমনি সাহিত্যে আছে ‘কনটেন্ট ফলোজ ফর্ম’। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট ভারত ত্রিখন্ডিত হয়ে গেল। পূর্ব এবং পশ্চিমের খন্ডদুটি পাকিস্তান, মুসলিমদের দেশ – আর বাকি ভারতবর্ষ হিন্দুস্তান। সঙ্গে সঙ্গে কি দুটি দেশ হিন্দু ও মুসলিম ফ্রি হয়ে গিয়েছিল? না, তা হয়নি। যারা নিরাপদ মনে করেনি সম্প্রদায়ভেদে স্থানান্তর গ্রহণ করে। এই অনিরাপত্তা প্রতিবেশীদের মুখ ব্যাদান থেকেও সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। এই চূড়ান্ত পর্বটি সংঘটিত হওয়ার আগে যেসব অমানবিক ঘটনা ঘটেছে, এ-দেশের ইতিহাসে যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নামে খ্যাত, তার রক্তাক্ত ঘটনা বিপুল। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ রাতারাতি দুটি সম্প্রদায়ের মানুষ তার চৌদ্দ পুরুষের ভিটেয় উদ্বাস্ত্ততে রূপান্তরিত হলো। পৃথিবীতে রাজনৈতিক হানাহানি মানে উদ্বাস্ত্ত নির্মাণের কারখানা। কুটিল রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে পড়ে নিরীহ জনগোষ্ঠী এভাবে যুগের পর যুগ নির্যাতন ভোগ করে এসেছে। তেমনি এই ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের মানুষ রাতারাতি দেশ হারায় এবং স্থানান্তরে যাত্রা করে। যাদের অবস্থা ভালো ছিল তারা সম্পত্তি অদল-বদল করে নেয়, কিন্তু নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পড়ে অকূল সাগরে। তাদের জায়গা হয় রেলস্টেশনে… গাছতলায়… মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য স্থানে।

গত একুশে বইমেলা থেকে আমার একমাত্র বোন মরহুমা আনফিসার স্বামী খন্দকার ওয়াহিদ আসগার কিছু বই কিনে আনে। তার মধ্যে দেখি একটি বই, শিরোনাম ভারতভাগের অশ্রুকণা – লেখক আমাদের দুজনেরই বন্ধু করুণাময় গোস্বামী। চট করে হাতে নিই। গাঢ় নীল ও কালোয় নকশা করা প্রচ্ছদ। বেশ ভারি। করুণাময়কে আমরা চিনি সংগীত-বিশেষজ্ঞরূপে। তাই ভাবি, এটি হয়তো ভারতভাগের ওপর গবেষণাধর্মী বই হবে। কিন্তু ভূমিকায় চোখ বুলিয়ে দেখি এটি উপন্যাস। লেখকের ভাষায় জীবনগল্প।

লেখক লিখছেন, ‘এই কাহিনির বাইরের  স্তরে কিছু ঘটনা আছে, ভেতরের স্তরে কিছু ঘটনা আছে।… বাইরের দিকে আছে ঘটনার চাপ, ভেতরের দিকে আছে অশ্রুপাতের বেদনা। বেদনাই এখানকার মূলধারা।… রাজনৈতিক ঘটনাবলি এখানকার আলোকসম্পাতের মূল বিষয় নয়।… কথাক্রমে যে যেটুকু বলেছেন বলে নায়কের মুখে শুনেছি তাকেই তেমন করে বলেছি।… আমি শুধু নায়কের বেদনা, সেইসঙ্গে এক মহাসুখ-দুঃখকে বিবৃত করার চেষ্টা করেছি।… এই কাহিনির একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ভাবনামতো মানুষে-মানুষে মিলনের বার্তাই এ কাহিনির প্রধান বার্তা।’

তিনি আরো লিখেছেন যে, আকস্মিকভাবে কাহিনির নায়কের সঙ্গে তাঁর আলাপ। আর তাঁর মনে হয়েছে নায়ক যে-গল্প বলেছেন, যা আসলে জীবনগল্প, তা লিখে প্রকাশ করার মতো গল্প বটে। সেই তাগিদে ওই রচনা নির্মাণ।

গল্পের প্রারম্ভিক অকুস্থল ঢাকা। ঘটনাচক্রে প্রাতঃভ্রমণের সময় নায়কের সঙ্গে আলাপ এবং সে-আলাপ ক্রমশ দুজনকে কাছে নিয়ে আসে। আর এই কাছে নিয়ে আসার কারণ নায়কের জীবনের কাহিনি, যা একাধারে গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো। আবার আমার দেশের মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের ট্র্যাজেডির মতোও বটে। কুরুক্ষেত্র যেমন দুটি পরিবারকে কেন্দ্র করে গোটা ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের সংঘাত, ১৯৪৭-এর দেশভাগও তেমনি দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কলহের কলঙ্কময় অধ্যায়। অবশ্য এর মধ্যে পাঞ্জাবে শিখ সম্প্রদায়ও জড়িত হয়ে পড়ে। হাজার বছরের যৌথ জীবন হঠাৎ চৌচির হয়ে ভেঙে পড়ে।

প্রথম কলকাতার নায়িকা শের বানু। বিহারের গুরগাঁও গ্রামের অধিবাসী। পূর্বপুরুষ ছিল হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবার। এদেরই এক সন্তান একজন মুসলিম মেয়ের প্রেমে পড়ে এবং পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। পরে তারা ঘটনাচক্রে ফিরে আসে এবং হিন্দু মায়ের অনুগ্রহে কিছু জমি নিয়ে জীবন কাটাতে থাকে। গ্রামে এরা পাশাপাশি বসবাস করত। এদের দু-পুরুষের জন্ম কলকাতায়। তাদের ব্যবসা উপলক্ষে তারা কলকাতায় থাকত। আর কলকাতা তাদের আসল আস্তানা। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যখন দাঙ্গা চলছে, শের বানুর মা আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন – বাধ্য হয়ে শের বানুর দাদা ওষুধ কিনতে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। শের বানুর বাবা তখন কলকাতায় ছিলেন না। কলকাতায় ফিরে এখানকার ব্যবসা বন্ধ করে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, দাঙ্গার বীজ যখন একবার এই শহরে পড়েছে তা থেকে আসবে আরো বড় দাঙ্গা। তাই আবহমান আশ্রয় গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। তারা কলকাতা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যান। কয়েক দিন ভালো কাটে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে কলকাতার দাঙ্গার জের ধরে বিহারে এবার মুসলিমদের বাড়ি আক্রান্ত হতে শুরু করে।

শের বানুর বাবা গুরগাঁও ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এবার তাদের গুরগাঁও ছাড়ার পালা। কলকাতার মধ্যে পাচ্ছি ‘এতদিন পরে এসেও আমাদের উঠোনের আমগাছটিতে বোল ধরেছে দেখতে পাই, সে বোলের গন্ধ নাকে এসে লাগছে বুঝতে পারি, গাছের ডালে পাখি তাদের মতো করে সুর তুলছে, তাও যেন কানে বাজে…’

আখ্যানভাগের এই অংশ পড়তে পড়তে ভাবি, আরে এ তো আমাদেরই জীবনের কথা। শের বানুরা ছিল বিহারে, আর আমি ও আমাদের আত্মীয়রা ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের ঝামটিয়া গ্রামে। ঝামটিয়া গ্রাম আমার মামাবাড়ি। পৈতৃক ভিটে হুগলির সবলসিংহপুরে। এই দুটি গ্রামের সঙ্গে গুরগাঁওয়ের তো অদ্ভুত মিল। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ শের বানুর দাদা মারা যান। আর ওদের পরিবারের জীবন-কাহিনি শুরু হয় ওইদিন থেকে। এ সময় আমার মামা-নানা-বাবা-খালুরা সবাই তখন কলকাতায় চাকরি করতেন। আমরা গ্রামে। বাড়িতে মা-নানি-মামি-মেজখালা এঁরা সবাই চিন্তায় চিন্তায় দিন কাটাতেন। তখন ফোন ছিল না যে, খবর পাওয়া যাবে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পরও আমাদের পরিবার পশ্চিমবঙ্গে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৫০-এ দুই বাংলায় আবার বড় ধরনের দাঙ্গা। এবার চট্টগ্রামে অপশন দিয়ে কাজে যোগ দেওয়া বাবা (সাহিত্যিক শওকত ওসমান) নীরব থাকতে পারলেন না। আমরা পুরো পরিবার ১৯৫০-এর এপ্রিল-মে-র দিকে চট্টগ্রামে পৌঁছাই। আমরা বাসা নিই ৩৪ বি চন্দনপুরায়। ওখানে পৌঁছে দেখি, আমাদের পাশে চারঘর বিহারি পরিবার আগেই আশ্রয় নিয়েছে।

 

ভারতভাগের অশ্রুকণা আমাকে অশেষ নস্টালজিয়ায় ভুগিয়েছে। কাহিনি শেষ করেও অনেক দিন এই ঘটনাবলি মনের মধ্যে চলচ্চিত্রের মতো বয়ে চলে। আমাদের পরিবারে দেশভাগজনিত কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু দেশভাগের বেদনা ও এর আফটার এফেক্ট এখনো আমাকে তাড়া করে ফেরে।

শের বানুর জীবন আমাদের মতো এমন সবল ছিল না। তার জীবনে এসেছে একের পর এক ট্র্যাজেডি, যার নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কারো হাতেই ছিল না। সবই এত হঠাৎ হঠাৎ যে, মনে হবে এটা উপন্যাস না, নাটক?

বিহারের গ্রামকে গ্রাম পুড়ছে। ক্রমশ এগিয়ে আসছে গুরগাঁওয়ের দিকে। একদিন গভীর রাতে কাউকে না জানিয়ে শের বানুর মা-বাবা তাদের দুই কন্যাসহ বেরিয়ে পড়লেন। কথকের ভাষায় ‘কেউ জানলো না, কাউকে জানানো হলো না, নাদিরা-কুলসুম (দুই গৃহপরিচারিকা) ঘুমিয়ে রইলো, ঘুমিয়ে রইলো বাবার আদরের দুধেল গাভী, ঘুমিয়ে রইলো পুকুরের মাছ, গাছের ডালে ফল, বাগানের ফুল।’… শুরু হলো শাহ বানু-শের বানু ও তাদের মা-বাবার অগস্ত্যযাত্রা।

তারা হাজির হন স্টেশনে। সেখানে জনারণ্য। এই সময় উদ্ভ্রান্তের মতো হাজির স্কুলের হেডমাস্টার। শের বানুর বাবাকে জড়িয়ে ধরেন, তার মেয়ে শীলা এসেছে বান্ধবী শাহ বানুকে বিদায় জানাতে। হেডমাস্টার সুরেশ যাদব বলেন, ‘এ শুধু কিছু পরিবারের চলে যাওয়া নয় শের মুহম্মদ, এ হচ্ছে একটা আদর্শের বিপর্যয়।

ট্রেনের ধকল সয়ে ওরা এসে পৌঁছে বোম্বাই। সেখানে জাহাজ ধরে করাচি। জাহাজ থেকে লঞ্চে। লঞ্চ থেকে নামার সময় পাটাতন থেকে জ্বর-ক্লান্ত শের বানুর বাবা ছিটকে পড়লেন সাগরজলে। দুটি হাত আকাশের দিকে তুলে মিলিয়ে গেলেন।

এখান থেকে তাদের তাঁবুতে তোলে স্বেচ্ছাসেবকরা। এদের মধ্যে শের বানুর এক মামা ডাক্তার ও বোন আমিনাকে দেখে চিনে ফেলেন। তারা পরদিন সকালে সব ব্যবস্থা করবে। এই কথা বলে চলে যায়।

পরদিন সকালে আমিনা স্বামীর আকুল চিৎকারের কথা বলতে বলতে হার্টফেল করে মারা যান। শের বানুর পরিবারে দেখতে দেখতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তিন তিনটি মৃত্যু ঘটে গেল।

করাচিতে শাহ বানু তখন ইকোনমিক্সে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, এই সময় লাহোর থেকে আসা এক পরিবার শাহ বানুর নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে মেয়েটিকে পছন্দ করে। ছেলে এমএ পাশ, পৈতৃক ব্যবসা দেখে। ওদের বোম্বের পরিবারের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সম্পর্ক… বেশ ভালোভাবে আনন্দের মধ্য দিয়ে বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু এই দম্পতির সুখের জীবন দু-বছরও অতিক্রান্ত হয়নি, লাহোরে শিয়া-সুন্নি দাঙ্গায় শাহ বানু ও তার স্বামী আহমেদ রিয়াজউদ্দিন লাহোরের রাজপথে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায়।

পরদিন করাচিতে খবর আসে। পাগলের মতো শের বানুর নানা জনে জনে জিজ্ঞেস করে চলেন, মানুষ এভাবে কত কারণে মারা যাবে? কে এর বিচার করবে? কার বাক্সে এর সমাধানের কার্ড আছে? এই অপমৃত্যুর পর শের বানুর বিয়ে দিয়ে তার নানা-নানি করাচি ছেড়ে লন্ডন চলে যান ছেলের কাছে। ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তানেও থাকলেন না।

দুবছর পর তাদের নানি মারা যান। ডাক্তার নানাও কাশ্মির সীমান্তে এক পাহাড়ি নদীর পারে দুদেশের মানুষদের ঈদের দিন উপহার ছুড়ে দেওয়ার যে-অনুষ্ঠান হতো, তেমনি এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে পিছলে পড়ে মারা যান।

এই কাহিনিতে অপঘাত-মৃত্যুর মিছিল অন্যতম প্রধান উপজীব্য। আর তার মূল ভারত-বিভাগের অপ-ঐতিহাসিক ঘটনাটি।

ছোট বোন শের বানুর জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। তার মেয়ে ইকোনমিক্সে পাশ করেছে। ওদের সঙ্গেই ঘটনাচক্রে মূল কথক সলিমের ছেলের বিয়ে হয়। এভাবে দুটি পরিবার একত্রিত হয়।

দ্বিতীয় কথক সলিম বেগ যৌক্তিক কারণে নিজেকে পাঞ্জাবি বলে পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু তার বাবা ছিলেন উড়িষ্যার অধিবাসী। কাশ্মিরে ফলের বাগানে চাকরিসূত্রে মুসলিম মালিকের মেয়েকে বিয়ে করে। পরে তারা লাহোরে ফলের দোকান করেন। এখানে এক কলেজের প্রিন্সিপালের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং ঘটনাচক্রে তাদের পুত্র-সন্তান মা-বাবার অকালমৃত্যুর কারণে ওই পরিবারে মানুষ হতে থাকে। ওই বাড়ির গৃহিণী ও গৃহস্বামী দুজনই বাঙালি। সলিমের এই মা শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করা মানুষ। তাই এই কাহিনিতে রবি-দর্শন ও রবিচর্চার প্রবল প্রভাব। সলিমের স্ত্রী ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী ও বিদুষী মহিলা। তার প্রভাব সলিমের ওপর পড়েছে একশভাগ। এই দম্পতি সলিমকে নিজেদের পুত্র হিসেবে পালন করেছে। এমনকি নিজেদের পুত্র রতুর চেয়ে সলিমকে স্নেহ দিয়েছে বেশি, তার জীবনের অসহায়ত্বের কথা ভেবে।

ওরা দু-ভাই খুব ভালো ছাত্র। সলিম জাহাজি হবে বলে লন্ডনে স্কলারশিপে পড়তে যায়। ভালোভাবে পাশ করে। জাহাজে চাকরিও পায় অল্পদিনের মধ্যে।

লন্ডনে সলিমের বাবার এক ছাত্র মোহনের পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। এখানে মোহনের ইংরেজ স্ত্রী লুসি ও তার মা ক্যাথরিন এই উপন্যাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। লুসি যেমন ভারতপ্রেমী, ক্যাথারিন তেমনি ভারতবিদ্বেষী। তার অন্যতম বড় কারণ তার স্বামীকে বিষ দিয়ে এক মারাঠি বাবুর্চি হত্যা করে। এই ক্যাথরিন পরে লাহোর গিয়ে সলিমের মায়ের সংস্পর্শে এসে বদলে যান। লুসির মায়ের কাকা নরম্যান ম্যাকমিলন অন্যতম চরিত্র, যিনি রাজকর্মচারী এবং ভারতভাগের সময় সশরীরে ছিলেন।

লুসি চরিত্রটি খুবই মহান। তিনি চিত্রকরও বটে এবং ভারতবর্ষের এই হানাহানির সময়কে তাঁর চিত্রে ধারণ করেছেন।

সলিমের সঙ্গে কাজ করত আব্রাহাম নামে ভারতীয় এক যুবক – সে প্রশ্ন তোলে, হিন্দু আর মুসলমানের দেশ হলো, বাকি যারা ছোট গোষ্ঠী? বৌদ্ধ, ক্রিশ্চান, শিখ, তাদের? ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট আব্রাহামের মা-বাবা আগুনে পুড়ে মারা যান, এ-প্রশ্ন সে তুলতেই পারে।

সেই একই ভাগ্যবরণ করতে হয় সলিমের মা-বাবা-বড়ভাইকে লাহোরে। সলিমের মাকে তরবারি দিয়ে দ্বিখন্ডিত করা হয়। আর প্রিন্সিপাল ও তার ছেলেকে বইয়ের মধ্যে চাপা দিয়ে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়।

সলিমের এই পোড়া বাড়ি দেখতে যাওয়ার ঘটনাগুলো অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ওদের এক পরিচিত জরির দোকান ছিল। তার মেয়েটি নিজ চোখে দেখেছে এই ভয়াবহ দৃশ্য। তার কানে আসে সাধারণ টাংগাঅলারা বলাবলি করছে, শিখ, হিন্দু, মুসলমান আমরা তো সব সময় পাশাপাশি একসঙ্গে থেকেছি, কোনোদিন তো এমন দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাধেনি? চোখের সামনে এ কী ঘটল?

সলিমের জীবনে আরো এক ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করেছিল, সে দেশভাগের কয়েক বছর পর করাচি যাত্রা করে এবং তার অন্যতম উদ্দেশ্য, সেখান থেকে যাবে লাহোর। তার স্ত্রী লিলি লাহোর-ট্র্যাজেডির সাক্ষী। লাহোর শুনলেই সে সুস্থ থাকতে পারে না। জাহাজে তাকে করাচির কথা বলা হয়েছে, এখন ঘটনাচক্রে ছেলের কাছে যেই শোনা যে, তারা লাহোরও যাবে, সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেয়।

১৯৩৬ সালে রবীন্দ্রনাথ লাহোর গিয়েছিলেন চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য নিয়ে – উদ্দেশ্য বিশ্বভারতীয় জন্য চাঁদা ওঠানো। সেই অনুষ্ঠানে সলিমের মা নিজে রান্না করে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছেন, গেয়েছেন রবিগান। সলিমও রবিকে দেখার সুযোগ পান। এসব তার মাথায় সবসময় ঘুরপাক খায়। এসব মনে পড়লেই তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন। সলিমের জন্ম ১৯২১ সালে। আর ঘটনা যখন বলছেন, তার বয়স নববইয়ের কোঠায়। আমাদের সৌভাগ্য যে, তিনি তাঁর জীবনগল্প বলে যেতে পেরেছেন এবং বলেছেন এমন একজনকে, যিনি তার মা-বাবার খুব কাছের মানুষ – তাদের আপন ভ্রাতুষ্পুত্র। এই চমকটি উপন্যাসের অন্যতম নাটকীয়তা। তারা যেন আত্মীয়। এক আত্মীয় আরেক আত্মীয়কে জীবনকথা বলে যাচ্ছেন। অথচ তাদের মধ্যে পরিচয়ের কোনো বন্ধন ছিল না।

এই উপন্যাসে সলিমের কিছু শিক্ষকের চরিত্র চিত্রণ করা হয়েছে, যাঁরা অপূর্ব মানুষ।

শের বানুর নানা ছিলেন ডাক্তার। তিনি এক জায়গায় তাঁর স্টুয়ার্ট নামক শিক্ষকের কথা বলেন – ‘কলকাতা মেডিকেল স্কুলে আমাদের মেডিসিন পড়াতেন স্টুয়ার্ট সাহেব। বেঁটে-খাটো চেহারার এক অসামান্য মানুষ। তিনি বলতেন, মানুষের দেহের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, মানুষের মনের চিকিৎসা দরকার। রোগ দেহে হয়, মনেও হয়। মনের রোগকে বোঝার চেষ্টা করো, চিকিৎসক হিসেবে এটা তোমাদের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব। মানুষের মনকে ব্যাধিমুক্ত করো। শুধু ম্যালেরিয়া-কালাজ্বর-কলেরা দূর করাই যথেষ্ট নয়। ভারতবর্ষ একটা মানসিক রোগের দেশ। তোমাদের দায়িত্ব হবে এই রোগ দূর করে প্রাচীন ভূখন্ডটিকে পরিত্রাণ করা। নইলে অপঘাতে তোমরা মারা যাবে।

… তাঁর সেই সতর্কবাণী বিরাট আকারে ফলতে শুরু করেছে ১৯৪৬ কলকাতা রায়টের পর থেকে।…’

উপন্যাসের পটভূমি পাঁচটি শহর। কলকাতা, করাচি, লাহোর, লন্ডন ও ঢাকা। সবশেষে ঢাকা। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে সলিমের মতো মানুষরা দেখেছেন মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রাম হিসেবে। এটা আমাদের কাছে একটা বড় পাওনা।

উপন্যাসটি শুধু মানব বিপর্যয়ের ঘটনার সমাহার নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজ ও রাজনীতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ। দেশভাগের পটভূমিতে যত বড় বড় রাজনৈতিক প্রস্তাব ও ঘটনা ঘটেছে, আছে তার ইতিহাস। ১৯৩০-এর পাকিস্তানের ধারণা থেকে ১৯৪০-এ লাহোর রিজোলিউশন। ব্যক্তি মাউন্ট ব্যাটেন ও রেড ক্লিফের মনের খবরের হদিসও পাচ্ছি। রেড ক্লিফ ভারতে জন্মেছেন। তাই ভারতভাগের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাধ্য হয়ে এটি করতে হয়। ভারতভাগের পরবর্তী প্রভাব এই উপমহাদেশে এখনো চলছে। সাগরে হাজার হাজার মানুষের অনিশ্চিত যাত্রা থেকে শুরু করে কাঁটাতারে কিশোরীর লাশ একসূত্রে গাঁথা। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

ইতিহাস রানী-বাদশার কাহিনি শোনায়, আর সাহিত্য দেয় রক্ত-মাংসের মানুষের ইতিহাস। তাই সাহিত্য ইতিহাসের মাল-মশলার বড় জোগানদার। এই বইয়ে তা আছে ভূরিভূরি।

এ-বই আরো একটি কাজ করেছে পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দু-সম্প্রদায়ের যারা যাননি তাদের গ্রামগুলো কীভাবে পরিবর্তিত রূপ নিতে থাকে, তার চিত্রও পাওয়া যায়। হিন্দু সম্প্রদায় চলে যাওয়ায় পুজো-পার্বণ কেন্দ্র করে যে ঢুলি ছিল, পূজারি ছিল তারা হয় কর্মহারা। এভাবে সমাজে একটা বড় ধরনের ওলটপালট ঘটে, যার রেশ এখনো চলছে।

একবাক্যে স্বীকার করতে হয় যে, এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা আগে পড়িনি। বন্ধু করুণাময়কে অশেষ শুভেচ্ছা। আর বন্ধু মফিদুল হক তাঁর সাহিত্য প্রকাশ থেকে বইটি প্রকাশ করে একটি মহৎ দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রচ্ছদে অশোক কর্মকার সফল।

শেয়ার করুন

Leave a Reply