দেশাত্ববোধের এক সংকলন

লেখক:

জোহরা শিউলী

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা
মহাদেব সাহা
সন্ধানী প্রকাশনী
ঢাকা, ২০১২
৯০ টাকা
আমার বাংলা ভাষা আমার স্বদেশ
আমার মায়ের স্মৃতি মাটির আবেশ।
আমার বিদ্রোহ আর আমার আবেগ
আমার ফুলের ঘ্রাণ, আশ্বিনের মেঘ।
কবি মহাদেব সাহা তাঁর ‘আমার বাংলা ভাষা’ কবিতায় নিজের ভাষা, স্বদেশের আবেগটা প্রকাশ করেছেন এভাবেই।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য, তার অমর কবিতা; মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির ত্যাগ ও মহিমার এক অলোক সামান্য ইতিহাস। লাখো প্রাণের বিনিময়ে ফুটে ওঠে তার স্বাধীনতার রক্তগোলাপ। বহু অশ্রু, বহু রক্ত, বহু আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে, মাতা-ভগিনী ও বধূদের ত্যাগে এদেশের মানুষ তার প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত ও স্বাধীন করে তোলে। এই মুক্তির বেদিতে কত প্রাণ হলো বলিদান। উৎসর্গ হলো কত জীবন। সে নিদারুণ শোক ও বেদনার কাব্য। বিভিন্ন সময় প্রখ্যাত কবিরা মুক্তিযুদ্ধ অবলোকন করে সেই সময়ের যুদ্ধ-পরিস্থিতি আত্মস্থের মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে রচনা করেছেন তাঁদের কবিতা কিংবা সৃষ্টিশীল নানা কাজ। সে-সময়ে নিজ চোখে দেখা, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসের নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কবি মহাদেব সাহা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পটভূমিতে রচনা করেছেন তাঁর এই কবিতাগুলো। যেমন তিনি তাঁর ‘দেশপ্রেম’ কবিতাটিতে লিখেছেন,
তাহলে কি গোলাপেরও দেশপ্রেম নেই
যদি সে সবারে দেয় ঘ্রাণ,
কারো কথামতো যদি সে কেবল আর নাই
ফোটে রাজকীয় ভাসে
বরং মাটির কাছে ফোটে এই অভিমানী ফুল
তাহলে কি তারও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ উঠবে চারদিকে।
আবার ‘স্বাধীনতার প্রতি’ কবিতাটিতে লিখেছেন,
স্বাধীনতা আর তুমি থেকো না এমন শব্দহীন
সাধ্যাতীত দূরত্বে আমার
সহসা গভীর রাতে বৃষ্টিপাতের মতো বেজে ওঠো,
ছুঁয়ে যাও আমার শরীর
তুমি হও ভূমিলগ্ন খুলে দিয়ে সমস্ত নিষেধ!
নিদারুণ শোক ও বেদনার কাব্য, সেই অপূর্ব বীরত্বগাথা। সাহস ও শৌর্যের অসামান্য কীর্তি সমুজ্জ্বল ও সমুদ্ভাসিত করে রেখেছে বাঙালির আত্মপরিচয়।
প্রধান বাঙালি কবিদের মতো মহাদেব সাহাও এই গৌরবমন্ডিত মুক্তিযুদ্ধ মর্মে ধারণ করেছেন। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের একেকটি সাড়া জাগানো কবিতা। ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা-জাগানিয়া তেমনি এক কবিতা ‘কল্যাণকুশল হন্তা তোমাদের’। এই কবিতায় কিছু চরণ পাই –
হে তোরা ঘাতক, তোরা রাজনীতি, হে ক্রূর শাসন।
তোমাদের এই যৌথ যজ্ঞে বলিদান-বলিদান,
রক্তাহুতি-রক্তাহুতি, দাহ
তোমাদের বিনাশপ্রধান বৃত্তি, পাশবতা, ক্ষমাহীন নিষ্ঠুর নির্দেশ তোমাদের।
‘ফিরে দাও রাজবংশ’ – এই কবিতাটিতে কবি মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে ধরে তার দুঃখবোধের কাব্যগাথা গাঁথলেও আমরা কি কবির আক্ষরিক শব্দের ভাবপ্রকাশ থেকে এটা বুঝি না যে, এই অর্থবোধক কাব্যগাথা এই দুঃখী দেশের প্রতিটি দুঃখী মানুষের মাঝে এখনো বিদ্যমান। মনের গভীর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস থেকে যে কেউ আপনমনে এই পঙ্ক্তিগুলো আওড়াতে পারবে।
স্বাধীনতা আর তুমি থেকো না এমন শব্দহীন, সাধ্যাতীত দূরত্বে, সহসা গভীররাতে বৃষ্টিপতনের মতো বেজে ওঠো, ছুঁয়ে যাও আমার শরীর, তুমি হও ভূমিলগ্ন খুলে দিয়ে সমস্ত নিষেধ! দন্ডিত বালক যেন অনায়াসে ছুuঁত পারে তোমাকে এখন। ‘স্বাধীনতার প্রতি’ কবিতাটিতে আকুল হয়ে কবি মহাদেব সাহা এভাবেই শব্দহীন, গভীররাতের বৃষ্টির মতো কিংবা দন্ডিত বালকের মতো ছুঁয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কিংবা ‘ফারুকের মুখ’ কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, বাড়ছে ভোরের রৌদ্রে, শিশিরের গাঢ় মমতায় সেই দিগ্বিজয়ী কিশোরের মুখ ক্রমশই হচ্ছে বড় যেন রৌদ্রময় বিশাল দুপুর, এক মুখ হচ্ছে ফুটে হাজার গোলাপ; কৌটো খুলে আসছে বেরিয়ে, যেন লাখ লাখ মুখের মিছিল। এসো, ডাকো তাকে সন্তানের স্নেহে ঘুরে ঘুরে ডাকো, সে দেবে প্রবল সাড়া, আছি, আমি আছি; তার দুচোখে নামেনি কোনো রাত্রির অবসন্ন ঘুম। একমুখ ফুটে হচ্ছে হাজার গোলাপ; যেদিকে তাকাই দেখি সারি সারি ফারুকের মুখ। ফারুকের মতো এমন হাজারো কিশোর মায়ের বুক খালি করে হয়েছে শহীদ। তারা কি আমাদের সকলকে রক্তঋণে বেঁধে দিয়ে গেল? যে-মুখ মায়ের বুকে ছিল নিবিড় সান্ত্বনা, পিতার উদার বক্ষে ছিল বিপুল সাহস, ছিল সংসারের খেলা, মুখর গুঞ্জন, অবিরাম আনন্দ ঈদের, সেই মুখ সকলের পবিত্র শপথ, সেই দিগ্বিজয়ী কিশোরের মুখ। এভাবেই একমুখ ফুটে হয় হাজার গোলাপ।
এই বাড়িটি একলা বাড়ি কাঁপছে এখন চোখের জলে
ভালোবাসার এই বাড়িতে তুমিও নেই, তারাও নেই!
এই বাড়িটি সন্ধ্যা-সকাল তাকিয়ে আছে নগ্ন দুচোখ
একলা বাড়ি ধূসর বাড়ি তোমার স্মৃতি জড়িয়ে বুকে

‘তোমার বাড়ি’ কবিতাটিতে কবি এভাবে প্রিয়জনকে হারানোর হাহাকার করা বুকের গভীর থেকে উঠে আসা দুঃখের কথা বলেছেন। স্বাধীনতায় হারিয়ে যাওয়া, শহীদ হওয়ার অনেকের স্মৃতিবিজড়িত হয়ে বেদনাক্লান্ত মনে তাদের সেই একলা বাড়ি, খালি বাড়িটি নিয়ে দুঃসহ আবেগ বয়ে বেড়িয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের কবিতা শিরোনাম হলেও বাদ যায়নি আমাদের গৌরবমন্ডিত একুশের কথা। বায়ান্নর পর পেরিয়ে যাওয়া ৩০ বছর পর তিনি রচনা করেন এ-কবিতা। কবিতাটির নাম দেন তিনি ‘তোমার বয়স হলো তিরিশ বছর’।
তোমার বয়স হলো তিরিশ বছর অমর একুশে তবু তুমি
ফেলছো চোখের জল দিবানিশি,
এখানে দেখবে তুমি মনুষ্যত্বের এ অপার লাঞ্ছনা
শুধু নির্লজ্জ শঠের ভাগ্যে সবখানে সস্তা হাততালি,
দেশজুড়ে দেখে এই জল্লাদের হাসি
এখনো তোমার যায় দিন।
বাংলার চোখে সেদিন ছিল না ঘুম, বহুদিন ঘুমহীন অন্ধকারে কেটেছে সময়। সেখানে ফিরেছে শুধু সন্ত্রাসের বুনো মোষ। হানাদার লম্পট, কসাই, এলোমেলো ছিন্নভিন্ন গ্রাম। বিধ্বস্ত শহরে যেন বেয়াড়া বুনো ষাঁড় ভেঙে দিয়ে গেছে লালিত বাগান। রৌদ্রে, জলে, অবিরাম বৃষ্টিপাতে কিংবা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে টুকরো টুকরো গ্রাম, বস্তি-লোকালয়, বাংলার ধোঁয়াটে আকাশ, কোথাও পুড়েছে মাঠ, প্রাচীন পান্থশালা। ঢাকার রাস্তাঘাট, যানবাহন, রমনার দীপ্ত মাঠ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সেই দীপ্ত ঢাকা কেঁদেছে বিক্ষত শহর হিসেবে। কবি মহাদেব সাহা কবিতার মধ্য দিয়ে বর্ণনা করেছেন – এই ঢাকা তিনি দেখেছেন ডেমরার ঝড়ে ম্লান, ছিন্নভিন্ন। ২৫ মার্চের রাতে অতর্কিত ভীষণ আক্রান্ত। শত্রুর ট্যাংক, বোমা, ঝাঁক-ঝাঁক তীক্ষ্ণ গোলায় দেহ ছিন্ন, ম্লান মুখ। তবু কবির বুকের মধ্যে ফুটে ছিল বাংলাদেশ। সেই ঢাকা, অলিগলি, নিকোনো উঠোন।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা যেমন তিনি তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন, তেমনি বিমুগ্ধ হয়েছেন একজন শ্রমিকের মুখের হাসি দেখেও। তিনি লিখেছেন –
একজন শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমার এই কবিতা,
মানুষের মুখের হাসির মত সার্থক কবিতা আর নেই।
এটি তাঁর ‘ভালোবাসা, গোলাপ ও শিল্পের ব্যাখ্যা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন।
এই কাব্যগ্রন্থটিতে বাংলাদেশের কিছু দেশপ্রেমী স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তিদের প্রতি কবির শ্রদ্ধা এবং বিনম্র ভালোবাসার অভিব্যক্তি।
যেমন পঞ্চাশের পাতায় আছে মাস্টারদা সূর্য সেনের প্রতি শ্রদ্ধা। ‘মাস্টারদা’ কবিতার শেষ তিনটি চরণ –
স্বাধীনতা বলতেই লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মুখ
হয়ে যায় মাস্টারদা সূর্য সেন, হয়ে যায়
অমর মুজিব, স্বাধীনতা, রক্তিম গোলাপ।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন একক কবিতার মধ্যে দিয়ে।
জীবনের বিনিময়ে লেখে ইতিহাস
পৃথিবীতে নামে তাই দূরের আকাশ।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে নিয়ে লিখেছেন –
শহীদ জননী বারবার আমার সাহস হয়ে ফিরে আসেন আপনি ওখানে,
আসেন এখানে আপনি মুক্তিযুদ্ধের মা হয়ে, বাংলার হূদয় হয়ে, নদী হয়ে, মাতৃস্নেহ হয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা বইটিতে ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি পাঠে মনের কোণে ভেসে ওঠে কবি জীবনানন্দের কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে এই ধানসিঁড়িটির তীরে’। কিন্তু আসলে কি তাই? জীবনানন্দের ভাষায় তিনি স্মরণ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কেননা কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন –
আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় মুজিবের বেশে,
হেমন্তের কুয়াশায় এই প্রিয় মানুষের দেশে।

বাদ যায়নি মুক্তিযুদ্ধের কবিতার মধ্যে ১৫ আগস্টকে ঘিরে কবিতা।
সেদিন কেমন ছিলো ১৫ আগস্টের সেই ভোর
সেই রাত্রির বুকচেরা আমাদের প্রথম সকাল।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনটিকে ঘিরে কবিতা ‘সেই দিনটি কেমন ছিলো’ কবিতার শুরুর অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের কবিতা মহাদেব সাহার দেশাত্মবোধের সেই সব কবিতার একটি অনন্য সংযোজনা, যা আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যসংকলন রূপে বাংলা কবিতার জাগরণী ধারাকেই ঋদ্ধ করবে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার