দ্বন্দ্বের মাঝখানে

লেখক:

প্রশান্ত মৃধা
জাহেদ দেখল, নয়াবাড়ির কেয়ারটেকার বুড়োমেয়া একটা ঝাঁকায় কী যেন ঢেকে নিয়ে যাচ্ছে। বুড়োমেয়ার মুখটা উলটোদিকে ঘোরানো। হতে পারে, জাহেদ যে তাকে দেখছে, সেটা সে বুঝতে দিতে চায় না। হতে পারে, সে যে জাহেদকে দেখেছে, এটাও যেন ঘটেনি। তাই জাহেদ যখন দাঁত ব্রাশ করতে করতে কলেজের পোলের ওপর দাঁড়িয়ে, সে-সময়ে বুড়োমেয়ার রিকশা হঠাৎ তার নির্দেশে ডাইনে ঘুরে যায়। ও-পথে চেয়ারম্যানবাড়ির পোল পার হয়েও বাজারে যাওয়া যায়। জাকির বুঝল, সেই পথে বাজারের দিকে যাচ্ছে বুড়ো। কিন্তু এত সকালে, ওই ঝাঁকায় কী? তাকে দেখেও ওই না  দেখার ভান করলো কেন বুড়োমেয়া?
এমনিতে জাকির প্রতিদিন এত সকালে ওঠে না। আজো উঠত না। সকালে বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। সাহেবের ছেলে লিটন আর ছেলেবউ আসবে। কাল রাতে নাইটকোচে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে। আরো আগেই আসত বাস, প্রায় অন্ধকারই থাকত তখন। জাকির সেইমতো প্রস্তুতিও নিয়েছিল। উঠেওছিল একবার। কিন্তু সে-সময়ে লিটন ফোন করে বলেছে, দেরি আছে আসতে। ফুলতলায় বাস খারাপ হয়েছিল, এইমাত্র ছাড়ল। এতে জাকিরের আরো কিছুক্ষণ, প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর সুযোগ হয়।
ফুলতলা, ফুলতলা থেকে খুলনা তারপর রয়েলের মোড়ে খুলনা শহরের যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে নাইটকোচ রূপসা ব্রিজে উঠবে। ব্রিজে ওঠার পর একটানে দশানি কি স্টেডিয়ামের সামনের স্ট্যান্ড পৌঁছবে বাস। ফলে, জাহেদ এক ঘণ্টা কি তার বেশি সময়ের হিসাব মিলিয়ে নিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারে না। ভেবেছে, একবার ফোন করে লিটনকে বলে, রূপসা ব্রিজে উঠলে যেন তারে ফোন করে। কিন্তু তাও যেন কী ভেবে বলেনি। কিন্তু অনেকদিন বাদে লিটনের সঙ্গে তার দেখা হবে, লিটনের বউ আসছে, সে আনতে যাবে, ড্রাইভারকে বলেছে, ড্রাইভার না আসলে সে নিজে যাবে গাড়ি নিয়ে – এইসমস্ত ভেবে জাহেদ বিছানা ছেড়ে ওঠে। তারপর ব্রাশে দাঁত ঘষতে ঘষতে কলেজের পোলের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। লুঙ্গিতে ভাঁজ করে রাখা তার মোবাইল ফোন। জাহেদ একবার ভেবেছে লিটনকে ফোন করে জানায়, আনতে যাওয়ার আগে দাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে পরোটা আর বুন্দে আর আলু -পটোলের ঘ্যাট নেবে নাকি? এজন্যে বাঁহাতে লুঙ্গির ভাঁজ  থেকে
মোবাইল বের করবে, সেই সময়ে দেখে বুড়োমেয়ার রিকশা আসছে কলেজের শহিদ মিনারের পাশের রাস্তা দিয়ে।
এত সকালে রাস্তা প্রায় রিকশাশূন্য। শহীদ মিনার পুলের ওপর থেকে অন্তত দেড়শো গজ দূরে। রাস্তা রিকশা ও মানুষহীন না হলে জাহেদ সেদিকে তাকাতও না। সে সবে ব্রিজের রেলিংয়ে ডান হাতের কনুই ঠেকিয়ে নিচের খালের জলের দিকে তাকিয়েছে, একবার মাথা তুলে দেখেছে সোজা দক্ষিণে, এ-সময়ে হঠাৎ ডাইনে তাকালে সে দেখে বুড়োমেয়ার রিকশা আসছে। জাহেদ দাঁড়ায়। যে-দূরত্ব তাতে সে ঠিক দেখছে কি-না তা ঠাওর করে। তারপর সোজা হয়ে যখন পুরোপুরি খেয়াল করে, তখন বোঝে, হ্যাঁ, রিকশায় বসা লোকটা বুড়োমেয়া। শহীদ মিনারের পাশ থেকে এদিকেই আসছিল রিকশা। হঠাৎ জাহেদের মনে হয়, তারে দেখে ডাইনে রিকশা ঘুরে গেল। এতক্ষণ বুড়োমেয়া  রিকশা আর এই সকালে
রিকশায় বুড়োমেয়া এসব তার মাথায় ছিল, হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে গেলে জাহেদ বুড়োমেয়ার পায়ের কাছে একটা ঝাঁকা দেখে। ওপরে লুঙ্গি দিয়ে ঢাকা দেওয়া।
জাহেদ সিদ্ধান্ত বদল করল। লিটনকে ফোন করবে না। এখন বাসস্ট্যান্ড যাবে, লিটন আর বউমাকে এনে বাসায় রেখেই যাবে নয়াবাড়ি। কী নিয়ে বাজারের দিকে গেল বুড়োমেয়া? তারে দেখে রিকশাইবা ঘুরালে কেন?
জাহেদ ফোন কানে দিতে দিতে ঘরে ফেরে। লিটন কতদূরে জানতে হবে। নিশ্চয়ই লিটনকে নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে বুড়োমেয়া বাজার থেকে নয়াবাড়িতে ফিরতে পারবে না।

দুই
বুড়োমেয়ার নয়াবাড়ির কেয়ারটেকার হওয়ার ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে।
নয়াবাড়ি বলে প্রায় তিন বিঘার বাগানবাড়ি কিনেছিল জাহেদের সাহেবের বড়ো ছেলে মিল্টন। মিল্টন জাহেদের প্রায় সমবয়সী। বাপের বিষয়-সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো কিছুতেই তার কোনো খেয়াল ছিল না। জাহেদের বিবেচনায় শুধু কম্পিউটার আর গাছপালা পুকুর – এই সমস্তে খুব মাতামাতি ছিল মিল্টনের। এই
বাড়ির পেছনে যে পুকুর সেই পুকুরের চারপাশে নারকেল-সুপারি এমনকি তালগাছও লাগিয়েছে। পেছনে ফাঁকা ধানক্ষেত, তারপর চেয়ারম্যান বাড়ি। চেয়ারম্যানবাড়ির রাস্তায় দাঁড়ালেও মিল্টনের লাগানো নারকেল-সুপারি গাছ দেখা যায়। এই কবছরে নারকেল গাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কলম্বো নারকেলের চারা! তালগাছগুলোও যে বাড়ির সীমানায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাবে কিছুদিন বাদে, তাও বোঝা যায়।
এসব বাদে পেঁপে কি আমড়া কি সিজনে দুটো-চারটে বেগুন চারা কি কাঁকরোলের মূল আর কুমড়ার বিচিও পুঁতত মিল্টন। ঢাকায় থাকত খুব কম সময়। মাথায় তার সবসময় এই বাগান আর গাছ লাগানো। এ-কাজে তার সাগরেদ ছিল বকো। মিল্টনের নির্দেশমতো, মিল্টন ঢাকায় থাকলে তার নির্দেশমতো বকোর যেন একমাত্র কাজ ছিল মিল্টনের বাগান তদারকি। বাদুড়ে লিচু খায় কি-না, কাঠবাদাম গাছের নিচে মাটি দেওয়া হয়েছে কি-না – এই করে বকোর সময় কাটত। বকো যেন এ-বাড়ির অন্য কাজের ছেলে নয়, সেসব কাজ করত মিল্টনের নির্দেশমতো। অন্যের নির্দেশ বকো শুনত ঠিকই; কিন্তু মিল্টনের কাজ ঠিকমতো না করা হলে অথবা বাকি থাকলে বলত, ‘বড়দার খেত দেইহে নিয়ে তারপর কইরে দেবানে।’ এই নিয়ে জাহেদ কতদিন বলছে, ‘এ তোরে মিল্টন খাওয়ায়, না কাকায়?’ বকো মিল্টনের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘সেয়া ক’তি পারি না। তয় বড়দা যা কইয়ে গেইচে, সেইয়ে আগে – তারপর অন্য কতা। আম্মার ধারে জিগোন। কী আম্মা, আমারে বাগান দেকতি কইয়ে যায়নি বড়দা?’
এ-সময় জাহেদ মিল্টনকে কেষ্টনগরের এই জমিটার খোঁজ দেয়। মিল্টন তখন ঢাকায়। জাহেদ তাকে ফোনে জানিয়েছিল, কেষ্টনগরে একটা জমি আছে, প্রায় বিঘে তিনেক, উঁচু জমি, বেশি মাটি ফেলতি হবে না। পুকুর খুঁচলি সেই মাটি দিয়েই বাগানে উঁচু করা যাবে। রাস্তার পাশে!’
মিল্টন জমি দেখে। তার বাপকে বলে। মিল্টনের বাপের হয়তো অত ইচ্ছা ছিল না; কিন্তু মিল্টনের মা, জাহেদ, বকো আর মিল্টনের ইচ্ছায় সে রাজি হয়। মিল্টনের বাপ ভাবল, ছেলের কারণে আরোকিছু জমি কেনা হলো। দেখতে দেখতে ওই জমিও শহরে ঢুকে যাবে। রাস্তা হয়েছে, ইলেকট্রিসিটি গেছে, জায়গার দাম বাড়তে কতদিন! মিল্টনের মায়ের ইচ্ছা এই জন্যে, ছেলেটার আর কোনো নেশা নেই, এই এক বাগান করা ছাড়া। হলে মন্দ কী? জাহেদের ইচ্ছা, এ-জায়গাটা কেনা হলে তার ম্যানেজারির দায়িত্ব বাড়ল, হয়তো মিল্টন চাইলে বেতনপত্তরও বাড়বে। বকোর ইচ্ছার কারণ, সে নিজের মতো একটা কাজ পেল। মিল্টনের ইচ্ছা, সে নয়াবাড়িকে প্রকৃতই বাগানবাড়ি করে তুলতে পারবে।
শহরের উপান্তে প্রায় তিন বিঘে জায়গা কম নয়। জমি উঁচু করতে একপাশে পুকুর কাটল। পুকুরের ঘাট বাঁধাল। পুকুরের দক্ষিণদিকে একখানা ঘর তুলল। সেখানে কেয়ারটেকার থাকবে। সেই ঘরের পাশে আরেকখানা ঘর, আটকানো থাকবে। শুধু মিল্টন গেলে খোলা। সেখানে বসে একটা ল্যাপটপ নিয়ে মিল্টন কাটিয়ে দিতে পারবে সারাদিন কি কখনো কখনো রাতও। একটানে মোটরবাইকে ওইটুকু জায়গা, এই প্রায় দুই কিলোমিটার, রাতে ফিরে আসতে কোনো সমস্যা নেই।
পুকুরের বাঁধানো ঘাটলার দুপাশে লাগিয়ে দেবে ডালিমগাছ। তার পাশে জামরুল ও বাতাবি লেবু। ডালিমের ডাল যেন ঘাটলায় বসলে গায়ে পড়ে, ডালিম যেন গায়ে মাথায় লাগে। পুকুরের বাকি
তিন পাশ জুড়ে থাকবে নারকেলগাছ। দক্ষিণের কোনায় ঘরের সীমানায় একটি -দুটি তালগাছও লাগানো যেতে পারে। বাড়ির গেট
থেকে বাঁধানো পাকা রাস্তা থাকবে পুকুরের ঘাট পর্যন্ত। তারপর  রাস্তা পুকুরের প্রাপ্ত ধারে চলে যাবে ওই কোনার ঘরের দিকে। যেন মোটরবাইক নিয়ে যাওয়া যায়। বর্ষার দিনে ঘাটলায় বসে থাকার সময় বৃষ্টি আসলে যেন পায়ে কাদা না  লাগিয়ে চলে যাওয়া
যায় ওই ছোটো ঘরটায়।
আর, এর বাইরে বাকি জায়গায় লাগিয়ে দেবে কয়েক প্রকার লেবু। কোনার দিকে নারকেল গাছ, তার পাশে বাতাবি লেবু, ভেতরের দিকে কাগজি কি সরবতি লেবুও থাকতে পারে। এছাড়া জামরুল, ফাঁকে ফাঁকে সুপারি গাছ থাকবে সীমানায়; এমনকি ভিতরেও, পাতলা পাতলা ¬- এক সারিতে। একটা কতবেল, কিছু আশ্বিনী আম, যদি ল্যাঙড়া বা ফজলির ভালো কলপ পাওয়া যায়। শুধু পশ্চিম সীমানায় এক কোনায় কিছু জায়গা ফাঁকা রাখবে। মিল্টন জানে, তার মায়ের অনেক দিনের ইচ্ছে যদি বয়স্ক মেয়েদের পড়া শেখানো আর সেলাই শিক্ষাকেন্দ্র করা যায়। আর বাকি থাকে পশ্চিম থেকে উত্তরদিকে রাস্তার পাশ ঘেঁষে কিছু জায়গা। সেখানে দেয়াল তুলবে না। তারকাঁটার বেড়া দিয়ে দেবে কাপিলার কচার। কারণ, এই জায়গা পৌরসভার ভেতর ঢুকলে রাস্তা আরেকটু বড় হতে পারে। গেটটাও বানাবে একটু ভেতরের দিকে।
মিল্টনের এই পরিকল্পনামতো প্রায় সবই হয়। ভাসার দিক থেকে আনে কিছু কলপ, আম লেবু ও জামরুলের। নারকেলের চারা আনে লকপুর থেকে। বকোর মতো সাগরেদ থাকলে এ-কাজে মিল্টনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। হয়ওনি। মোটরবাইকের পেছনে বকোকে চড়িয়ে মিল্টন কোথায় কোথায় চলে যেত। দুপুরে কতদিন বাড়িতে ফিরত না। এখানে সেখানে খেয়ে নিত। ঘরে পড়ে থাকত মিল্টনের ল্যাপটপ। তার মা ভাবত এই ছেলে দিয়ে কী হবে? এমন গাছপাগল ছেলে।
কিন্তু বাগান দাঁড়িয়ে গেলে, বছর ঘুরতে না  ঘুরতে মিল্টনের মাথার থেকে বাগানবাড়ির ভূত যেন একটু দূরে সরে যায়। শহরে থাকলে সে বাগানবাড়িতে যায় ঠিকই, সারাদিন সেখানে থাকে, কিন্তু হাত থাকে ল্যাপটপে, কানে ইয়ারফোন। সেখানে আগের মতো নিজ হাতে গাছের পরিচর্যা করে না, যা করার বকোই করে। মিল্টন কীসব প্রোগ্রাম তৈরি করে। সেইসব কোথায় কোথায় পাঠায়। এসব তার মাকে বলেছে সে। যখন তার বাবার জেদাজেদিতে তার আইসমিল অথবা ফিলিং স্টেশন দেখা শোনা করার কথা ওঠে তখনই মিল্টনের এক কথা, আইটি সেক্টরে পড়াশোনা করে এখন নদীর পাড়ে বরফমিলে বসে বরফ বানাও, আব্বা আমারে দিয়ে করানোর আর কাজ পায় না? মিল্টনের মা অবশ্য মিল্টনের কথার এতকিছু বোঝে না। এটা জানে, সে বা তার স্বামী এই ছেলেকে জোর গলায় তেমন কিছু বলার ক্ষমতা রাখে না। কারণ, ছেলে সেই কবে দিল্লিতে পড়তে যাওয়ার জন্যে টাকা নিয়েছিল, দিল্লিতে যাওয়ার পর আর ছেলেকে টাকা-পয়সা তেমন পাঠাতে হয়নি। ফিরে আসার পরে আজ পর্যন্ত বাপ-মায়ের কাছে একদিনের জন্যেও হাত পাতেনি। সত্যি, মিল্টনের বাপ ওই জমিটা কিনে দিয়েছে, গাছ লাগানো,  পুকুর কাটা, ঘাটলা বানানো, ঘর তোলা সবই সে করেছে নিজের টাকায়। টাকা কীভাবে পায়, কোথায় পায় – তা প্রায় তারা কেউই বোঝে না। শুধু লিটন তার মাকে এইদিন বুঝিয়ে বলেছিল, বড়দাকে কেন কম্পিউটারের লোকজন টাকা দেয়। ফলে তাদের বসে থাকা বড়ো ছেলেকে বরফকলে বসতে বলা বা ফিলিং স্টেশন দেখাশোনার বাধ্য করার আগে একদিন মিল্টন জানায়, বছরখানেকের জন্যে সে জার্মানি যাচ্ছে। একটা স্কলারশিপ পেয়েছে।
এই সময়ে বুড়োমেয়ার খোঁজ পড়ে। সুমেলার মা অনেকদিন ধরেই এই বাড়িতে রান্না করে। সকালে আসে সন্ধ্যায় যায়। তার স্বামী, যাকে এ-বাড়ির প্রায় সবাই বুড়োমেয়া বলেই ডাকে, সেও এখন আর কাজি-আড়তে জোগালদারের কাজ করতে পারে না। ওদিকে সুমেলার মার সন্ধ্যায় বা রাতে নিজের বাসা সেই মুনিগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়া, সেখানে থাকার জন্য ছাপড়া ঘরের ভাড়া দেওয়া – এসব মিলিয়ে মিল্টনই প্রস্তাব করে যে, বুড়োমেয়া আর সুমেলার মা বাগানবাড়িতে থাকলে বাগানবাড়িও দেখা হয়, সুমেলার মাও অতদূর মুনিগঞ্জ না-যেয়ে পারে। সেইমতো বুড়োমেয়া আর সুমেলার মা বাগানবাড়িতে থাকে। যদিও বিষয়টিতে জাহেদের সায় ছিল না। জাহেদ মিল্টনকে বলেছে, বুড়োমেয়াকে বাগানবাড়িতে ওঠানোর আগে উচিত ছিল অন্তত তার সঙ্গে আলাপ করা। কেননা, জাহেদ শুনেছে অথবা আগেই জানত, কাজির আড়তের জোগালদার হিসেবে বুড়ামেয়ার হাতটানের স্বভাব ছিল। অত বড়ো বাগানবাড়ি, অতগুলো গাছ – এই বছর দুয়েকে কোনো কোনো গাছে ফল ধরতে শুরু করেছে, বুড়োমেয়া কী দিয়ে দিয়ে কী করে কোনো ঠিক আছে? শুনে মিল্টন তার স্বভাবসুলভ উদাসী ভঙ্গিতে বলেছিল, জাহেদ ভাই, তুমি আছো, তোমার চোখ ফাঁকি দিয়ে করবেডা কী?
তা সত্যি, মিল্টন জার্মানি চলে যাওয়া এই বছরখানেক বাদেও তেমন কিছু ঘটেনি। শুধু ভেতরে ভেতরে বিষয়টা মেনে নিতে পারেনি বকো। মিল্টনের সঙ্গে ঢাকা গেছে। মিল্টন প্লেনে ওঠার পর কয়েকদিন ঢাকায় লিটনের কাছে থেকেছে। লিটন তাকে বলেছে, সে কয়েক মাসের ভেতরে বিয়ে করবে, তখন বকো ঢাকায় এসে থাকবে কি-না? বকো কিছু বলেনি। ঢাকা শহরে থাকতে তার ভালো লাগে না। এ-কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে জানালেও, জানিয়েছে ঠিক আছে মাঝে মাঝে এসে থাকবে যখন আম্মা আসবে। বকো জানত, আম্মা আসলে তো আর আম্মা একা আসবে না, সঙ্গে আত্মীয়স্বজন আরো কেউ না কেউ আসবে, তখন লিটনভাই আর ভাবি সব সামাল দিতে পারবে না, বকোকে তখন আসতেই হবে।
কিন্তু এই সময় মিল্টন জার্মানি রওনা হওয়ার পরে শহরে ফিরে বকো সত্যি অন্য মানুষ। জাহেদ তাকে সকাল হলে ফিলিং স্টেশনে যেতে বলে। যায়, কিন্তু বকো কাজে উদাসীন। বলা নেই কওয়া নেই বাড়ি যায়। বাড়ি নদীর ওপার। কয়দিন থাকে আবার ফিরে আসে। কাউকে কিছু না জানিয়ে আবার চলে যায়। কখনো ঢাকায় যায় লিটনের কাছে। ফিরে আসে। লিটনের বিয়ের কথা হলে কয়দিন সেখানে থাকে। আবার নদীর ওপার যায়। তখন মিল্টনের মা জাহেদকে বকোর ঘটনা কী জানার খোঁজ নিতে বলে। জাহেদ একদিন নদীর ওপার যেয়ে শোনে, বকো বিয়ে করেছে। বউ বকোর মায়ের সঙ্গে থাকে। লিটনের প্রোডাকশন হাউসের কাজের জন্যে বকো মাঝেমধ্যে ঢাকায় যায়। তার প্রিয় বড়দা দেশে নেই, বাগানবাড়ি দেখতে যাইতে তার আজকাল আর ভালো লাগে না। যদিও পরদিন জাহেদ আবার নদীর ওপার যায় এবং বকোর বউকে একখানা শাড়ি দিয়ে আসে। আর বকোকে বলে, এই শাড়ি পরাইয়ে তোর বউরে নিয়ে একবার যাইয়ে আম্মারে দেখাইয়ে আসতে কইচে।
এইদিন লিটন তার মাকে ফোন করে বকোকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যে। বকো জানায় নতুন বউ, নদীর ওপারে নতুন বউরে নিয়ে মার একলা থাকা! শুনে, লিটনের মা জাহেদের সঙ্গে আলাপ করে বলে, ঠিক আছে, নয়াবাড়িতে পশ্চিমের কোনায় জাহেদ একখানা ঘর তুলেছে। কোনো কোনোদিন জাহেদ নিজের বাড়ি বাসাবাটি পর্যন্ত যেতে পারে না, ভেবেছিল ওখানে থাকবে। আপাতত ওই ঘরে বকোর মা আর বউ থাকুক। জাহেদ এ-বাড়ির নিচতলার বাইরের কোনার ঘরে থাকবে, আগে যেখানে থাকত।
সেই থেকে বকোর মা ও বউ নয়াবাড়ির পশ্চিমের কোনার ঘরে থাকে। সকাল হলে এ-বাড়িতে চলে আসে, সন্ধ্যার পরে যায়।

তিন
লিটন আর তার বউকে বড়োবাড়িতে নামিয়ে দিয়ে জাহেদ মোটেরসাইকেল নিয়ে নয়াবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। বুড়োমেয়া বাজার থেকে ফেরার আগেই বাগানবাড়ি পৌঁছবে সে। কিন্তু ইতোমধ্যে জাহেদের দেরি হয়ে গেছে। দেরি হতো না, জাহেদ স্টেডিয়ামের সামনে পৌঁছানোরও বেশ পরে নাইটকোচ পৌঁছেছে। খানজাহান আলি কলেজের সামনে একজনের মাল নামাতে কী সমস্যা হয়েছিল, তাই নিয়ে হেলপারকে মেরেছে। এসব মাঝেমধ্যে হয়। কিন্তু জাহেদ হিসাব করে দেখেছে, যেদিন তাড়া থাকে সেদিনই এটা বেশি হয়। আজই হেলপারকে মারার এ-ঘটনা ঘটল। এ নিয়ে জাহেদের মেজাজ বেশ চড়ে যায়। একবার তো সে ভেবেছিল, লিটনকে বলে। কিন্তু কোনোকিছু প্রমাণ করার আগে, শুধু একটা ঝুড়ি দেখে কিছু বলা কি ঠিক? জাহেদ বাড়িতেও কাউকে কিছু বলেনি। লিটনের সঙ্গে বকোও এসেছে, তাকে লিটনের সামনে বলেছে, আমি মোটরসাইকেল নিয়ে নয়াবাড়ি যাই, বড়ো কাকায় ডাকলে বকো যেন তাকে সে-কথা বলে। তখন অবশ্য বকো একবার চাইছিল, জাহেদের মোটরবাইকের পেছনে বসে একবার নয়াবাড়ি যায়। জাহেদ তা বকোর চোখ দেখে বুঝেছে, কিন্তু পাত্তা দেয়নি।
জাহেদ বাগানবাড়ি পৌঁছে দেখে, বুড়োমেয়া ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। হাতে একটা বিড়ি। গেটের বাইরে মোটর বাইক রেখে ভেতরে ঢোকার সময় পয়লা জাহেদকে দেখেও যেন না-দেখার ভান করে। জড়োসড়ো ভাবও আছে। কিন্তু বুড়োমেয়া এত তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়ায়, জাহেদের মনে হলো, সেই যা-ই নিয়ে যাক, নাগেরবাজার পর্যন্ত যায়নি। বড়জোর দশানির মোড়ে অথবা মিঠাপুকুরের কাছেই বেচে দিয়ে ফিরে এসেছে।
জাহেদ পুকুরের ঘাটলার কাছে এসে বলল, ‘বুড়োমেয়া, আছো কীরাম? সকালে কী নিয়ে গেলা চেয়ারম্যানবাড়ির রাস্তায়?’
জাহেদ এখন প্রায় বুড়োমেয়ার সামনে। জাহেদের পুকুরের ঘাট থেকে এই পর্যন্ত হেঁটে আসার ফাঁকটুকুতে সে কী উত্তর দেবে তাই যেন ভেবে নিল, ‘ওই কয়ডা জামরুল -’
‘জামরুল! জামরুল নিয়ে তুমি বাড়ির দিক যাবা, না যাইয়ে বাজারের দিক গেলা কেন?’
‘বাড়ির জইন্য রাকচি -’ বলে পাশে রাখা একটা ছোটো অ্যালুমিনিয়ামের গামলা দেখাল। জামরুলগুলো সুন্দর। সাদা ও বড়ো। দেখেই বোঝা যায় রসালো। জাহেদ জানে, পুকুরের ঘাটলার পাশের জামরুল গাছ দুটোর জামরুল এগুলো নয়, এই জামরুল প্রায় পশ্চিমের কোনায় বকোরদের ঘরের কাছের গাছটার। গতবার খেয়েছে সে।
‘এই কয়ডা রাহিছ বাড়ির জন্যি আর একঝাঁকা নিয়ে বেচিচো?’ বলতে বলতে জাহেদ দেখে, পাশেই বেড়ার কাছে ঝুড়িটা উলটো করে রাখা।
‘না, বেশি না, অল্প কয়ডা।’
‘অল্প কয়ডা! আর কথা কইয়ো না, ওই ঝাঁকাভরতি – আমি দেহিচি না? দেহিচি তো –
‘না। আসলে কাইল ওই বকোর মা আর বউ বাধাইছে ঝগড়া। তারপর ওগো ঘরের পাশে বড় জামরুল গাছটার ডাল ভাঙ্গিছে। আমি ফজরের সময় উইঠে দেহি কী অতবড় এট্টা ডাল ভাইঙ্গে পইড়ে ঝুইলে রইচে, তারপর আর কী করি। ভালোগুলো রাইখে বাকিগুলো দশানির মোড়ে একজনের বেচতি দিয়ে আইচি -’
জাহেদের জন্যে এই পর্যন্ত আর শোনার প্রয়োজন ছিল না। মিল্টনের প্রিয় জামরুল গাছের ডাল ভেঙেছে বকোর মা আর বউ এটুকু শোনাই যথেষ্ট। জাহেদ বুড়োমেয়ার মুখের দিকে তাকায়। থুতনির দাঁড়িসহ তার গাল যেন এখন ঝুলে পড়েছে। জাহেদ মুখটা পুবদিকে ফেরানোয় সেখানে আলো চোখ পড়ছে। ফলে বুড়ামেয়ার দিকে চোখ যতটা বড়ো করে সে তাকাতে চেষ্টা করেছে, ততটা পারছে না। জাহেদ উলটা ফিরল। আবারো একবার বুড়ামেয়ার দিকে তাকাল। এই মানুষটার ভেতর- বাইর বোঝার সাধ্য কারো
নেই, মনে হলো তার।
জাহেদ খুব দ্রুত হেঁটে বকোদের ঘরের কাছাকাছি জামরুল গাছটার নিচে দাঁড়াল। হ্যাঁ, একখানা বড়ো ডাল ভেঙে গাছের কাণ্ডের গায়ে লেগে আছে। এই গাছটা রণবিজয়পুর থেকে সেবার বর্ষার সময় কিনেছিল মিল্টন। কেনার সময়ই গাছটা বেশ বড়ো ছিল। জাহেদের মনে আছে গাছঅলা বলেছিল, এক-দুই বছরের ভেতরে এই গাছ ফলবে। বোম্বাই জামরুল ধরবে এক -একটা –
খালি রস, ছাবা হবে না। আর মিষ্টি। এসব কথাই ঠিক। লোকটা বলেছিল, একটু উঁচু জায়গায় লাগাইয়েন, গাছটার গোড়ায় যেন পানি না জমে।
সেই গাছের একটা ডাল ভাঙা দেখে, এইভাবে প্রায় হাত ভাঙার মতো একটা ডাল কাৎ হয়ে আছে দেখে জাহেদের ভেতর হু-হু করে উঠল। জার্মানিতে এখন গভীর রাত না হলে সে মিল্টনকে
এখনই ফোন করত। কিন্তু তার আগে বিষয়টির একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। সে চেচাঁল, ‘বকোর মা-খালা, ও বকোর মা-খালা?’ জামরুল গাছতলায় দাঁড়িয়ে ডাকল জাহেদ। বকোদের ঘরের দিকে গেল না। গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে তার অসহায় লাগে। মনে হয়, মানুষ এত নির্দয়। এ-কথা বড়োকাকায় শুনলি! লিটনকে বলা যাবে না। লিটনের মাথা গরম। আগে এ নিয়ে আম্মার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বকোর মা ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়ায়। ঘুমাচ্ছিল না। উঠেছে অনেক আগে। হয়তো বড়োবাড়ির দিকে যাওয়ার জন্যে জোগাড় হচ্ছিল। এ-সময়ে জাহেদের গলা শুনে তার মনে হলো, হয়তো লিটন তার বউ নিয়ে এসেছে সঙ্গে বকোও এসেছে, সেজন্যে কোনো খবর দিতে এসেছে জাহেদ। অথবা ডাকতে এসেছে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
বকোর মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘ও জাহেদ, কী হইচে?’
‘হবে আর কী? এইদিকে আসো -’
জাহেদের গলার স্বরের সঙ্গে উত্তেজনায় বকোর মা ভ্যাবাচেকা খেল। জাহেদ তখন একবার বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখল বুড়োমেয়া ওই জায়গায় বসে আছে কি-না। তাতে তার বোঝাপড়ার কিছু সুবিধা হতো। বুড়োমেয়া উঠে ঘরের ভেতর গেছে। অথবা, দক্ষিণ দিকের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কেষ্টনগরের বিলে পাতা জাল তুলতে।
বকোর মা জাহেদ কাছাকাছি আসার আগেই জামরুল গাছের ভাঙা ডালটা দেখে। তার চোখ এত বড়ো একখানা ডাল ভাঙার বিস্ময় প্রকাশের আগেই জাহেদ বলে, ‘এই দেহো, এই ডাল ভাঙা! দেকচো –
বকোর মা বলে, ‘ও খোদা, এইয়ে হ’ল কহোন?’
জাহেদ বকোর মার চোখ ও মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ডাল ভাঙা নিয়ে তার প্রায় তারস্বর চিৎকার এরপর থামে না, ‘এই ডাল ভাঙল কেডা – এত বড়ো একখানা ডাল!’
জাহেদ বলে, ‘থাক আর চেঁচাইয়ে লাভ নেই -’
বকোর বউ ততক্ষণে ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছে।
বকোর মা বলে, ‘চেঁচাব না, এত সুন্দর লটোক গাছের ডাল ভাঙবে, আর চেঁচাব না? জানে তোমার দয়ামায়া কিছু নেই? রুহুতে পানি নেই… তুমি কও কী, ও জাহেদ?’
শুনে, জাহেদ দ্বিধায় পড়ে। বকোর মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর হাতের বাঁদিকে তাকিয়ে বুড়োমেয়াকে খোঁজে। সুমেলার মা কি এতক্ষণে বড়োবাড়ি চলে গেছে। নাকি লিটন আসবে বলে কাল রাতে আর এ-বাড়িতে আসেনি।
‘চেঁচাইতে মানা করি না -’ এবার জাহেদ গলা তোলে, ‘কই মায়া কান্দা কাইন্দে না। ওই ঢঙের কান্দা দেকলি যা ইচ্ছে করে -’
বকোর মা জাহেদের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাহেদের এই আচরণ তার বোধের বাইরে। হঠাৎ জাহেদ কেন এ-গলায় কথা বলছে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একটু অনর্থ চোখে সে জাহেদের দিকে তাকায়।
জাহেদ বলে, ‘কান্দো কোন ঢঙে? ডাল ভাঙছে তুমি আর তোমার পুতের বউ কাইল রাত্তিরে আর এহোন আমারে দেইচে কাইন্দে ভাসাও – মিল্টনের কী পছন্দের গাছ! রণবিজয়পুর দে আনিলাম আমি আর মিল্টন। হায় হায় গাছটার এহেবারে তেইশ মাইরে দেচো -’
জাহেদ এই পর্যন্ত একবার উঁচু গলায় এরপর আবার গলা নামিয়ে কথা বলে। সে বুড়ামেয়ার কথা আর এই মুহূর্তে বকোর মার আচরণ – দুটো মিলিয়ে হিসাব মেলাতে পারছে না।
এদিকে জাহেদের কথা শেষ হওয়ার আগেই বকোর মা বলতে থাকে, ‘তোমারে এইয়া কইচে কেডা? কাইল সন্ধ্যার সময়ও দেকলাম গাছটা ভালো … রাইতে একবার ওঠলাম, তখন এট্টু ঝড় হইল, কিন্তু সেই ঝড়েও তো গাছের ডাল ভাঙার কথা না -’
‘ঝড় না, ঝড় না – ঝড়ে গাছের ডাল ভাঙলি এইভাবে ভাঙে না। দেইহেই বোঝা যায়, ডাল এইদিক টাইনে নামাইয়ে ভাঙা হইচে। দেহো, এই দেহো, এই জায়গায় যেভাবে ডাল ভাঙিছে, এইভাবে কহোনো ঝড়ে ভাঙে না -’
জাহেদের দক্ষ চোখ। বহুদিন গাছগাছালি বাগান এই বাড়ি ঘরদোর এইসমস্ত নিয়ে আছে।
কিন্তু বকোর মা কথা থেকে সরে যায়নি। প্রথমে সে ভেবেছিল, জাহেদ যেমন প্রায়ই এটাসেটা নিয়ে তাদের উঁচুগলায় কথা বলে, একইভাবে অনুমানে হয়তো বলেছে যে সে অথবা বকোর বউ গাছের ডাল ভেঙেছে। এটা ঠিক, ঝগড়া তারা করে; এ প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তাদের শাশুড়ি পুতের বউয়ের ঝগড়া আজকাল প্রতিবেশীরাও কানে লাগায় না। সে ঝগড়া শুরু হয়, এক সময় থেমেও যায়। যদিও এ নিয়ে বকোর দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। মাকেই-বা কী বলে সে, বউকেই-বা কী করে বোঝায়। কিন্তু বকোর মা ও বউয়ের এই ঝগড়ার খবর খুব দ্রুত যে বড়োবাড়ি পৌঁছে যায়, তাও বকোর মায়ের জানা আছে। এ নিয়েও বকোর মার কখনো কখনো লজ্জাই লাগে লিটনের মায়ের সামনে পড়তে। সে বলছে, এইভাবে ঝগড়া করলে তাদের আবার নদীর ওপার পাঠিয়ে দেবে। শহরে তাদের থাকা লাগবে না। যদিও বকোর মা জানে এসবই কথার কথা। তবু ভদ্দরলোকের বাড়িতে থেকে এইভাবে ঝগড়া করা কোনো ভালো কথা না। এজন্যে তারা আজকাল আর আগের মতো ঝগড়াও করে না। কিন্তু সেজন্যে ঝগড়া করতে করতে গাছের ডাল ভাঙা? হা, তাও ভাঙতে পারে। কিন্তু ওই জামরুল গাছের ডাল! ওই গাছে এত জামরুল ধরার পরও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে শুধু, একদিন একটা জামরুলে হাত দেয়নি। বরং দিন পনেরো আগে যখন বকো এসেছিল তখন বকোকে দিয়ে জাহেদকে খবর পাঠিয়েছে, ঘরের ওই পাশে বেড়াটা ফাঁকা হয়ে গেছে, একটু নতুন তারকাটা কিনে যদি ঠিক করে দেয়। সারাদিন তারা বলতে গেলে থাকে না। সুমেলার মাও থাকে না। বুড়োমেয়া মাঝে মাঝে যায় দক্ষিণের বিলে মাছ ধরতে। সেই সময় যদি কেউ ঢোকে? এমন তো হয়েছে, সন্ধ্যাসন্ধি বাড়ি পৌঁছে বকোর মা একবার সব গাছের কাছে গিয়েছে, দেখেছে কেউ ঢুকেছিল কি-না। বুড়োমেয়া তখন থাকে কোথায়? আর এখন তাদের শুনতে হচ্ছে যে, তারা শাশুড়ি-পুতের বউ ঝগড়া করে গাছের ডাল ভেঙেছে। এমন কাজ করার আগে যেন তাদের আর এই বাড়ির দিকে মুখ দেখাতে না  হয়।
ফলে, বকোর মা প্রায় খেঁকিয়ে উঠল, ‘কও ও জাহেদ, কও, কইয়ে যাও এই কথা কইল কেডা যে আমি আর বউ গাছের ডাল ভাঙছি?’ বলে, বকোর বউকে হাতের ইশারায় ডাকে।
বকোর বউ অবশ্য কিছু বুঝতে পারেনি। ঘুম থেকে উঠে ঘরের ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। একবার ঘরের ভেতরে গেছে তারপর হাতের তালুতে গুঁড়ো মাজন নিয়ে একমনে আঙুলে দাঁত ঘষছে। এইমাত্র শাশুড়ির এই ইশারায় সে মগের পানিতে হাত ধুয়ে শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে আসে। বকোর মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়।
‘ভাঙো নাই তা’লি তোমরা?’
বকোর মা জাহেদের দিকে তাকাল। হতে পারো তুমি বড়োসাহেবের খাস লোক, প্রায় ম্যানেজার – কিন্তু তার বকোও এখন লিটনের সঙ্গে থাকে, আগে থাকত মিল্টনের সঙ্গে, মিল্টন তারে কত ভালোবাসত, পারলে এক কাপ চাও খা’ত না বকোরে ছাড়া – সেই বকোর মা আর বউরে তুমি এমন অপবাদ দাও? জাহেদের সাহসের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি তো? বকোর মা ভাবে, তাহলে এই কথা বড়ো ভাবির কানে তুলতে হবে। জাহেদের কী সাহস! এই জায়গায় এট্টু মাথা গোঁজার ঠাঁই দেচেন, সেই জন্যি এত বড়ো কথা শোনাও ভাগ্যে ছেল?
বকোর মা বলে, ‘তোমারে কইচে কেডা যে, আমরা ডাল ভাঙছি?’
‘আগে কও, তুমি আর তোমার বউ ডাল ভাঙচো কি-না?’
‘না, ভাঙি নেই – আমাগো সাতে কথা কইয়ে বোঝে না?’
এর ভেতর বকোর বউ বলে, ‘ডাল ভাঙা তো ভালো, গাছ ছুঁইয়ে দেহি একবার? পাহার দি, আর আপনি কন ডাল ভাঙছি?’
বকোর মা অবশ্য কথা থেকে সরে যাওয়ার মানুষ না, ‘ও জাহেদ, ও বাপ কইয়ে যাও – কেডা কইচে আমরা ডাল ভাঙিচি?’
জাহেদ এড়াতে চাইছিল। ভাবল, এ-ব্যাপারে কথা এভাবে না বললেও চলত। কাজিয়া ফ্যাসাদ এখন কোনদিকে যায়? বরং, জানতে চাইত ডালভাঙার ব্যাপারে তারা কিছু জানে কি-না। জাহেদের হঠাৎ যেন মনে হয়, ব্যাপারটা উলটো হতে পারে। হয়তো কাল রাতের ছোট্ট একপশলা ঝড়ের পর বুড়োমেয়া গাছ থেকে জামরুল পেড়েছে। সে-সময়ে এদিকের জামরুল ভরা ডালখানা
টেনে জামরুল পাড়তে গিয়ে ডালটা ভেঙে ফেলেছে। আজ সকালে সেই জামরুল বেচতে যাওয়ার সময় জাহেদ দেখে ফেললে, তারপর জাহেদ এখন জিজ্ঞাসা করতে আসলে সে এই গল্প বানিয়েছে। বলেছে, ডাল ভেঙেছে বকোর বউ আর মা। জাহেদ বুঝল, কথাটা একটু ঘুরিয়ে বললে ভালো হতো। উলটো দিক থেকে বললেও পারত। জাহেদ ভাবে, সে এখন কথা ঘুরাবে। যদি না  পারে, তাহলে
বলেই দেবে বুড়োমেয়া বলেছে।
বকোর মা আবার জানতে চাইল, ‘ও-বাপ জাহেদ কও দেই, কইচে কেডা আমরা ডাল ভাঙিছি?’
জাহেদ একবার ভেবেছিল বলবে না, আবার কী মনে করে ভাবল, সে এখন বুড়োমেয়ার ঘরের কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বিল থেকে মাছধরা জাল নিয়ে ফিরলেই বলবে, আসো, ক’লা তো বকোর মা আর বউ ডাল ভাঙিছে। কিন্তু কী ভেবে এখনই তার হাতে এই সমাধান না -করে সে বড়োবাড়ি গিয়ে আম্মার কাছেই বিষয়টা বলবে
বলে ঠিক করে। কিন্তু কী মনে করে এক মুহূর্তেই বিষয়টা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে বলে, ‘ওই বুড়োমেয়া দেহি কয়, ভাঙছো তুমি আর তোমার পুতের বউ -’
বকোর মা ফোঁস করে, ‘ও আমার খোদা, সেইয়ে কইচে? ডাহো, ডাহো বুড়োমেয়ারে মুকাবেলা হইয়ে যাক – সামনাসামনি আইসে কউক আমরা ডাল ভাঙিচি -’
‘ক’ল তো – এই তো ক’ল, এট্টু আগে, আমি শুইনে তোমারে ডাকতি আসলাম, তারপর চাইয়ে দেহি নেই -’
‘ও বা জাহেদ, দেহো যাইয়ে নিজে জামরুল পাইড়ে বেইচে দিয়ে আইচে। পাড়ার সোমায় ডাল ভাঙিচে আর এহোন কয় আমরা ভাঙিছি – নিজে ভাইঙে -’
জাহেদ বকোর মায়ের তৎপরতা, বুড়োমেয়াকে ডাকতে বলার ভঙ্গি – সবমিলিয়ে নিজের ভেতরে একপ্রকার অনুমান ও সিদ্ধান্ত করে নেয়, আর যাই হোক এই কাজ করেনি বকোর মা অথবা বউ কেউ ই। ডাল খুব ভোরে জামরুল পারতে যেয়ে বুড়োমেয়াই ভেঙেছে! কিন্তু নিজে গাছের ডাল ভেঙে বকোর বউ আর মায়ের এই বদনাম দেওয়া কেন?’
এই সময় জাহেদের ফোন বাজে। লিটনের কল। নয়তো এখন সে সত্যি বুড়োমেয়ার জন্যে অপেক্ষা করত। তাকে নিয়ে চলে যেত বড়োবাড়ি।
কান থেকে ফোন নামিয়ে জাহেদ বকোর মাকে বলে, ‘তুমি যাবা না বড়োবাড়ি? তোমার ছ’ল আইচে। আইচে লিটন আর লিটনের বউ -’
‘এট্টু পরে যাব -’ কিন্তু এই কথা বললেও বকোর মা জানে সে এখনই যাবে না, বুড়ামেয়ার জন্যে অপেক্ষা করবে।

চার
মোটরবাইকে ওঠার পরে এই দেড়-পৌনে দুই কিলোমিটার পথ জাহেদ খুব ধীরে চালিয়ে আসে। আসতে আসতে হিসেব মেলায় কেন বুড়োমেয়া বকোর মা আর বউর নামে এই কথা বলল। মাঝখানে একদিন বুড়োমেয়া আম্মার কাছে বলেছে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই শাশুড়ি-পুতের বউ একচোট ঝগড়া করে কারণে-অকারণে। তখন জাহেদ বুড়োমেয়ার কাছে জানতে চেয়েছে, কারণে- অকারণে
কীরম? বুড়ামেয়া জানিয়েছিল, এই কাল সকালে ঝগড়া করেছে, রাত্রে ভাতে পানি দেওয়া নিয়ে। বকোর মা কয়, এই বাড়ি দিয়ে ভাত নিয়ে যাওয়ার পর, সে বউকে বলেছে ভাতে পানি দিতে। বউ বলে সে শোনেনি। বকোর মা বলে, মোবাইলে তো কত কতা শোনো, ভাতের কতা শোনো না। যে-গরম, সকালে ভাত গেজলে উঠেছিল। এই তর্কাতাকি পরে ঝগড়ায় রূপ নেয়। এইসব। এ-কথায় অবশ্য বুড়ামেয়ার বউ সুমেলার মাও সায় দেয়। ফলে, প্রায়ই যে তারা ঝগড়া করে বিষয়টা কমবেশি তাদের জানা আছে। তখন আম্মা বুড়োমেয়াকে জানায়, আজ বকোর মা আসলে বলে দেবে, এইরম চেঁচামেচি আর ঝগড়া করলে তাদের আর থাকা লাগবে না। চলে যাক নদীর ওপার। আগে যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। এমনকি বকো আসলেও বলবে, তোর যদি লিটনের বাসায় থাকতে ইচ্ছা না করে তুইও
তবে চলে যা। হয়তো, এই সবই ছিল একপ্রকার হুমকি। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সত্যি সত্যি এরপর আর শাশুড়ি পুতের বউ তেমন ঝগড়া করেনি।
তাহলে? জাহেদ হিসেব মেলায়। বাগানবাড়িতে আম-কাঁঠাল, নারকেল সুপারি, জাম জামরুল, পেয়ারা-ডালিম মিলে গাছ কম নেই,
কলাগাছের ঝাড়ও আছে পুকুরের পাড়ে কি মাঠের কোনায়। এসবই দেখাশোনার দায়িত্ব এতকাল বুড়োমেয়ার ছিল। কিছুদিন হলো সেখানে বকোর মা ও বউ এসেছে। বকোর মা সারাদিন বড়োবাড়িতেই থাকে। সুমেলার মাও। বাড়িতে বকোর বউ প্রায় একলাই। হয়তো কোনোদিন সকালে শাশুড়ির সঙ্গে একবার আসে, দুপুরের পরপর চলে যায়। ইদানীং ফিলিং স্টেশন আর বরফকলের কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় জাহেদও ও-বাড়ির তেমন খোঁজ নিতে পারে না। ফলে বুড়োমেয়া একাই ছিল ওই বাগানবাড়ির সর্বেসর্বা। ঝামেলা পাকিয়েছে বকোর মা আর বউয়ের আসা। তাও সমস্যা হয় না, যদি বকোর বউ সারাদিন প্রায় ওই বাড়িতেই থাকত। এই জন্যে আজকাল বুড়োমেয়ার কাছে খুব শোনা যায়, বকোর মা-বউ খুব ঝগড়া করে। একদিন তো জাহেদকে পেয়ে বুড়োমেয়া বলেছিল, ভাবি যে কী আইনে উঠইছেন, এহোন কই আমি কয়দিন বাদে সারাপাড়ার মানুষ কবে। এর চাইয়ে বাইদের ক্যাচক্যাচিও (বেদের ঝগড়া) ভালো। জাহেদ একটু অবাক চোখে তাকিয়েছিল। বকোর বউর গলা অমন হতে পারে। মেয়েটি মুখরা কিন্তু বকোর মাকে তার কখনো তা মনে হয়নি। বুড়োমেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভেবেছে,  বকোর মা ওই নিচু গলার স্বরে ওমন বেদে বিটিদের মতো স্বর পায় কোথায়?
জাহেদ এসে আজ ভোরে বুড়োমেয়াকে ঝুড়ি নিয়ে যেতে দেখাসহ সব ঘটনা লিটনের মা, লিটন ও লিটনের বউকে বলে। এ-সময় সেখানে সুমেলার মাও ছিল। লিটনের মা বলে, ‘বাদ দে, পরে শোনব – ওরা নাস্তা করুক। জাহেদ, তুই বকোরে ডাক, গেল কোথায়?’
দোতলায় ওঠার সময় জাহেদ দেখেছে, বকো গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছে। জাহেদ বুঝেছে, বকো তার বউর সঙ্গে কথা বলছে। জাহেদ বকোকে ডাকবে কি-না ভাবতেই লিটন বলে, ‘জাহেদ ভাই, সমস্যা আমি বুজিচি, ওই বকোর মা আর বউ থাকায় বুড়োমেয়ার বাগান হাতানোয় সমস্যা হইচ্চে -’
‘হয়।’
‘কীসে?’ লিটনের মা জানতে চায়।
‘আম্মা, সেয়া তুমি বোঝবা না -’
এ-সময় নিচে একটু শোরগোল ও চিৎকার। বকোর বউয়ের গলা। বাড়ির পুরুষরা সবাই এখনো ওঠেনি। এই সময়ে লিটনের মা জাহেদকে বলে, ‘জাহেদ, দ্যাক্দি -’
জাহেদ নিচে নামে। লিটন ও লিটনের বউ দোতলার সামনে বারান্দায় দাঁড়ায়। বকোর বউ বলছে, ‘জাহেদভাই, এই যে আনচি বুড়োমেয়ারে – কয়েন কয়েন, আমি আর আম্মায় কবে জামরুল গাছের ডাল ভাঙচি। নিজে জামরুল পাইড়ে বেইচে এহোন আমাগো নাম দে – কয়েন – কী কতা ক’ন না কেন?’
জাহেদ বলে, ‘ও বুড়োমেয়া, কতা কও -’
লিটন তার বউর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী বোঝলা?’
নিজের বেচাকেনায় সমস্যা হয় সেই জন্যি দোষ বকোর মা-বউর। বড়দা যে কী দেইহে এই লোকরে এত বিশ্বস্ত ভাবে?
‘না, মানে -’ বুড়োমেয়া উপরে তাকায়।
জাহেদ বলে, ‘এত মানে মানে করেন কেন?’
‘করবে না?’ ‘ফুলতলায় কোচ নষ্ট হ’লি সে (বকোর) আমারে ফোন করলি উইঠে জানলাদে দেহি রাত্তির কতটুক। তখন বুড়োমেয়া জামরুল পাড়তিল – আমি বাইরইয়ে বারান্দায় আসলি কয় বাদুড়ে জামরুল খাইয়ে যায়। তারপর মনে হয় ডালডোল ভাঙিচে। এহোন দোষদে আমাগো -’
বুড়োমেয়া এবার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। লিটন ঘুরে ঘরের দিকে যেতে যেতে বউকে বলে, ‘কিছু বোঝলা? বোঝবা, কয়দিন থাকো -’

শেয়ার করুন

Leave a Reply