‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম বাংলা ভাষার প্রশ্নটি তুলেছিলেন’

লেখক:

সাক্ষাৎকারগ্রহণ : শ্যামল চন্দ্র নাথ

সরদার ফজলুল করিম বিশিষ্ট দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার। জন্ম ১৯২৫ সালে বরিশালের আঁটিপাড়া গ্রামে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে তিনি ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। অনার্স ও এমএ উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা বিভাগে নিয়োজিত হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাম্যবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সরদার ফজলুল করিম পাকিস্তান সরকারের কোপানলে পড়েন। এবং চার দফায় পুরো পাকিস্তান আমলটাই তিনি কারারুদ্ধ থাকেন। কারাবন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণের দাবিতে অন্যান্য রাজবন্দির সঙ্গে তিনি ৫৮ দিনের অনশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং কারাগারে থাকা অবস্থাতেই পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের উদ্যোগে সরদার ফজলুল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন, তবে দর্শন বিভাগে নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। অবসরগ্রহণের পরও দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষায়তনে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের সূতিকাগার। আমরা অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে যদি এর প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি বলে ধরে নিই তবে সরদার ফজলুল করিম এবং তাঁর সমসাময়িকরা হচ্ছেন দ্বিতীয় প্রজন্ম। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, নানা কথার পরের কথা, দর্শনকোষ, এ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, সেই সে কাল, আবক্ষ, রুশোর স্যোশাল কন্ট্রাক্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, রুমীর আম্মা, নূহের কিশতি, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা ইত্যাদি। কাজের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। তার মধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শেরে বাংলা পদক, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার অন্যতম। তাঁর সাক্ষাৎকাটি নিয়েছেন শ্যামল চন্দ্র নাথ।

শ্যামল : আপনি তো আপনার ভাইবোনদের মধ্যে চতুর্থ, ছোটবেলায় আপনার বাবার সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজে সাহায্য করেছেন। ওই বিষয়ে কিছু মনে পড়ে।
সরদার ফজলুল করিম : কৃষক পরিবারের ছেলে আমি। আমাদের পরিবারকে মধ্যবিত্ত পরিবার বলা চলে না। নিু-মধ্যবিত্ত বললে ঠিক হয়। বছরের খোরাক কিছু কম পড়তো তখন। বাজারে গিয়ে তরিতরকারি বিক্রি করেছি ছোটবেলায়। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। বাবা কৃষিকাজ করতেন। একদিন  বাবা বলেছেন, ‘তুই লাঙলটা ধর বা মইয়ে একটু ওঠ, আমি একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।’ আমি যে কৃষিকাজ তেমনভাবে করেছি তা বলবো না। কিন্তু কৃষিকাজে বাবাকে সাহায্য করেছি। বাবা আমাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন। আমি খুব বাধ্য ছেলে ছিলাম। ছোটবেলায় খুব নামাজ পড়তাম, আজান দিতাম। মা প্রতিদিন রান্নার বরাদ্দ চাল থেকে এক মুঠো চাল একটা ভাণ্ডে উঠিয়ে রাখতেন। এ-চালটা ফকির-মিসকিনদের দান করা হতো। আমার মা-বাবা নিরক্ষর কিন্তু মাটির মানুষ ছিলেন। তাঁদের মতো লোকের কথা ছিল না আমাকে স্কুলে পাঠানোর। কিন্তু তাঁরা আমাকে স্কুলে পাঠিয়েছেন। সেজন্য আমি এই মাটির মানুষগুলোর কাছে ঋণী এবং এই মাটির প্রতি আমার মনের মধ্যে একটা শ্রদ্ধা জেগে আছে। তখন শিক্ষকরা একদিকে যেমন স্কুলে শিক্ষাদান করতেন, তেমনি তাঁরা কৃষিকাজেও নিযুক্ত ছিলেন। আমার এক মামা ছিলেন, যাঁর স্মৃতিটা মনের মধ্যে গেঁথে আছে। তিনিই আমাকে প্রথম কালিতে কঞ্চির কলম ডুবিয়ে সিদ্ধ করা তালপাতার ওপর বড়-বড় করে অ, আ, ই ইত্যাদি লিখে দিতেন। আর কিছুই এখন মনে করতে পারছি না।
শ্যামল : ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে আপনার?
সরদার ফজলুল করিম : মনে হয় ১৯৪০ সালে আমার বড়ভাই আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়ায় সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকায় এসে আমি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হলাম। তখন ভর্তির ব্যাপারে কোনো কড়াকড়ি ছিল না। থাকলেও আমি তো ছাত্র মোটামুটি ভালো ছিলাম। সুতরাং ভর্তি হতে আমাকে বেগ পেতে হলো না। মেডিকেল কলেজের মূল বিল্ডিং যেটি এখন, সেটি তখন দোতলা ছিল। তখন এটি ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং। পরে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়। কার্জন হলও বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গ ছিল। কার্জন হলের বিপরীত বিল্ডিং ছিল তখন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় এটি তৈরি। ঢাকায় তখন মাত্র তিনটি কলেজ ছিল। যতদূর আমার মনে পড়ে। জগন্নাথ কলেজ, গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট কলেজ আর সলিমুল্লাহ কলেজ। ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়ার সময় আমার পেছনে একটি গ্র“প দাঁড়িয়ে যায়। যাকে বলা যায় ‘জাতীয়তাবাদী’ অর্থাৎ নন-মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রকার হৃদ্যতা ছিল না। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় আমি যতটা না কমিউনিস্ট, তার চেয়ে বেশি জাতীয়তাবাদী ছিলাম। আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে তখন হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছি। আমি হলে কিংবা হোস্টেলে গিয়ে নিজে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি দাঁড় করিয়েছি। আমি ভেবেছি, আমার বন্ধুরা কেমন করে তাদের অবসর সময় কাটাবে।
তখন উভয় বাংলার সব কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে ছিল। কিন্তু ঢাকা শহরের কলেজগুলো ছিল বোর্ড অব সেকেন্ডারি অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট এডুকেশনের আন্ডারে। ঢাকা বোর্ড ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিডার অর্থাৎ এখান থেকে ছাত্ররা বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তখন ঢাকা বোর্ডে ইন্টারমিডিয়েটে আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম। কোনো মুসলমান ছাত্র এর আগে এরকম রেজাল্ট করেনি। সাধারণত জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররাই তখন প্রথম কিংবা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করত। আমি অবশ্য প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়ার জন্য কখনোই পড়ালেখা করতাম না। ভালো ছাত্রদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না। ভালো সম্পর্ক ছিল ব্যাকবেঞ্চারদের সঙ্গে। ক্লাসের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত সবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। আমি কোনো ছুটিতে আমার নিজের বাড়িতে যেতাম না। বন্ধুদের বাড়িতে যেতাম। ইন্টারমিডিয়েটে দ্বিতীয় হওয়ার পর আমার ইংরেজির অধ্যাপক আমাকে সঙ্গে করে ক্লাসে ক্লাসে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। সবাইকে বলেছিলেন, ‘দেখো, একে কিন্তু আমি আবিষ্কার করেছি।’ আমার এক শিক্ষক ছিলেন পি সি চক্রবর্তী। তিনি দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলেন। তাঁকে স্মরণে পড়ে। কী সুন্দর লোক ছিলেন।
শ্যামল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কথা আপনার কি কিছু মনে পড়ে? যুদ্ধের খবর কি আপনারা নিয়মিত পেতেন?
সরদার ফজলুল করিম : হ্যাঁ, যুদ্ধের খবর আমরা নিয়মিত পেতাম। তখনো রেডিও তেমনভাবে চালু হয়নি, মাত্র চালু হয়েছে। ছাত্ররা তখন দাবি করেছিল হোস্টেলে একটি করে রেডিও পাওয়ার জন্য। তখন পত্রিকাগুলো ছিল যেমন – আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্স, অ্যাডভান্স ইত্যাদি কলকাতা থেকে সকালবেলায় রওনা হতো। কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস। গোয়ালন্দ থেকে কানেকটিং স্টিমার সার্ভিস ছিল নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। বিকেল ৪টা-৫টার মধ্যে পত্রিকা নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে যেত। তারপর নারায়ণগঞ্জ থেকে আবার ঢাকায় আসত। সুতরাং যুদ্ধের প্রায় তাজা খবরই আমরা প্রায় পেতাম। একটা কথা বলা দরকার, সেটা হলো, ঢাকা তখন আন্তর্জাতিক নগরীতে পরিণত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এই ব্যাপারটা আমার মনে করতে ভালো লাগে। বর্তমান প্রজন্মকে আমি এটা জানানোর চেষ্টা করি যে, আমাদের একটা সুন্দর সময় ছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েরা হয়তো মনে করে, আমাদের সময়ে শুধু দাঙ্গাই হয়েছে, কিন্তু এর বাইরে অন্য অনেক কিছুই হয়েছে। না, আমাদের সময়ে শুধু দাঙ্গা হয়নি। দাঙ্গা এখানে হয়েছে কিন্তু এর বাইরে আমরা অন্য অনেক কিছুই করেছি।
শ্যামল : আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, কিন্তু ওই সময়ে আপনি নিশ্চয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতেন। কেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন না।
সরদার ফজলুল করিম : আমি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে ১৯৪২ সালে ভর্তি হই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়ার প্রধান কারণ আমার মুরব্বি আমার বড় ভাই। বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে মাস্টার্স পার্ট ওয়ান করেছেন। আগেই বলেছি, কৃষক-পরিবারের সন্তান আমি। অভিভাবকরা ভাবলেন, কলকাতায় খরচ চালানো কঠিন হবে। বড় ভাইয়ের শিক্ষকরা সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেমন ধরুন, এস এন রায়। সুতরাং আমার ঢাকা আসাই স্থির হলো। কলকাতায় কোনোরকম ইনস্টিটিউশনাল পরিচয় আমাদের ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে প্রথম কিছুদিন ইংরেজি বিভাগে ছিলাম। বক্তৃতা শুনলাম কিছুদিন। দেখলাম, কোন টিচার কী রকম বক্তৃতা দেন। এখন যেটা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সেখানে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস হতো। সব ক্লাসের পাশ দিয়ে ঘুরতাম। দর্শনের হরিদাস ভট্টাচার্যের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হলাম। হরিদাস বাবুর কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমি দর্শনে ভর্তি হবো।’ চলে এলাম দর্শনে।
শ্যামল : আপনাদের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওই সময়ে আপনার শিক্ষকতার প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন।
সরদার ফজলুল করিম : এখন তো সব মনে পড়ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সের কোর্স ছিল তিন বছরের আর এম এ কোর্স ছিল এক বছরের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু এ দুটি কোর্স দুই বছরের ছিল। সিলেবাস থেকে শুরু করে সব দিক থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বতন্ত্র ছিল। অনেকটা প্রাচীনকালের তপোবনের আদলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ-বিশ্ববিদ্যালয়কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে-স্বর্ণযুগের কথা এখনকার শিক্ষকরা জানেন না বা জানলেও স্মরণ করতে চান না। আশুতোষ ভট্টাচার্য-সম্পাদিত আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংকলনে আপনারা সেসব দিনের কিছুটা আভাস পাবেন। ১৯৪৬ সালে আমি এম এ পাশ করি। আমি অনার্স ও             এমএ-তে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলাম। হরিদাস ভট্টাচার্য তখন অবসর নিয়েছেন। তখন এস এন রায়ের ভাই বিনয় রায় বিভাগীয় প্রধান। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি কাল থেকে ক্লাস নেবে।’ আমি পরদিন থেকে ক্লাস নিতে শুরু করলাম দর্শন বিভাগে।
শ্যামল : এরপর তো দেশ ভাগ হলো, ভাষা-আন্দোলনের রক্তিম সূর্য পূর্ব পাকিস্তানের আকাশে ধ্বনিত হতে লাগল; মানে আন্দোলনের পূর্বাভাস। ওই সময়ের কিছু পরে মানে ১৯৪৯ সালে তো আপনি গ্রেফতার হন। ওই সময়ের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে আপনার?
সরদার ফজলুল করিম : দেশ ভাগের ফলে ভারত ও পাকিস্তানে একটি করে কনস্টিটিউয়েন্ট গঠন করা হয়েছিল। ভারতে এক-দুই বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু পাকিস্তানে তখনো আলোচনা চলছে। পাকিস্তান তো একটা পাকিস্তান না। একটা এসেমব্লি হলো। ওই অ্যাসেমব্লি সদস্যরা কোন কোন ভাষায় কথা বলতে পারবে তা অ্যাসেমব্লির মধ্যে লেখা থাকে। সেখানে লেখা ছিল, মেম্বারস মে স্পিক ইন উর্দু অ্যান্ড ইংলিশ। কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের মধ্যে তখন মনে হয় নেতৃস্থানীয় ছিলেন শ্রীশ চট্টোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। এই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অ্যাসেমব্লির এক সভায় প্রথম বাংলা ভাষার প্রশ্নটি তুলেছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তখন কুমিল্লা কোর্টের একজন বড় উকিল ছিলেন। দ্যাট ওয়াজ দি সাবমিশন অব ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইন নাইনটিন ফরটি এইট। কিন্তু সেই বিনীত দাবিটাকে দমন করা হলো। লিয়াকত আলী খান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ভয় দেখালেন এই বলে যে, ‘তুমি প্রভিন্সিয়ালিজম প্রিচ করছ, এটা চলবে না।’ এসব কথা ইতিহাস হয়ে আছে। ’৪৮-এর মার্চ মাসেই মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকায় এলেন এবং রেসকোর্সে বক্তৃতা দিলেন। সে-সময় আমি ঢাকাতে দুটো মিটিং অ্যাটেন্ড করি। একটা হচ্ছে রেসকোর্সের সেই মিটিং। জিন্নাহর কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে। ‘চুপ করো, বৈঠ যাও, খামস সে শুনো।’ রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন : ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু অ্যালোন শ্যাল বি দি স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান।’ ১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের মার্চ – এই কয় মাসেই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্তি হয়েছিল ছাত্রদের। এই মোহমুক্তিটা একটা এগ্রেসিভ রূপ নিল ১৯৫২ সালে। সে জন্য আমি মনে করি এবং অনেকেই এটা বলেছেন যে, ভাষা-আন্দোলনের প্রথম শহীদ বা সৈনিক যদি আমরা কাউকে বলতে চাই তবে বলা উচিত – তিনি হচ্ছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি হচ্ছেন পূর্ববঙ্গের ভাষা-আন্দোলনের প্রথম উপস্থাপক। ১৯৭১ সালে তিনি যেভাবে নিহত হলেন পাক আর্মির দ্বারা, তাতে তিনি তাঁর জীবনের যে-আদর্শ ছিল সে-আদর্শের জন্য সম্পূর্ণ মূল্য দিয়ে গেলেন। আর আমি তো ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি থেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে। আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রথমদিকে আমি শহরে ছিলাম। তখনো হলে আমার সিট ছিল টিচার হিসেবে। আমি নিজেকে টিচার বা লিডার মনে করতাম না। আমি এখনো ছাত্র – এই চিন্তা আমার ভেতর কাজ করে।
শ্যামল : আপনারা যাঁরা কমিউনিস্টকর্মী ছিলেন তাঁদের ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করা হলো। আপনি তো ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হলেন ।
সরদার ফজলুল করিম : পাকিস্তান আমলে আমরা যারা বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের গ্রেফতার করেছিল। পুলিশ যখন আমাদের ধরত তখন তারা আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করত। ঠাট্টা করে বলত, ‘যান, যান, আপনারা জেলখানায় গিয়ে পার্টি করেন। বাইরে কেন এত কষ্ট করেন?’ ১৯৪৮ সাল থেকে সব কমিউনিস্টকর্মীকে মুসলিম লীগ সরকার গ্রেফতার করতে শুরু করে। মুসলিম লীগ প্রশাসন জানত, এই কমিউনিস্টরাই হচ্ছে পাকিস্তানের প্রধান শত্র“। কারণ তখন পর্যন্ত পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্তিটা মুসলিম লীগ কর্মীদের হয়নি।
শ্যামল : আপনি তো বাংলা একাডেমীতে ১৯৬৩ সালে অনুবাদ বিভাগে যোগ দিলেন, ওই সময়ের কোনো স্মৃতিবহ ঘটনা বা দুঃসহ ঘটনা আপনার মনে পড়ে কি?
সরদার ফজলুল করিম : ঠিক বলেছেন, ১৯৬৩ সালে আমি বাংলা একাডেমীতে যোগ দিই। সৈয়দ আলী আহসান সাহেব তখন বাংলা একাডেমীর পরিচালক। সৈয়দ আলী আহসানের বাড়িতে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তিনি আমার সিনিয়র ছিলেন। এবং আমার মেরিট সম্পর্কে তিনি জানতেন। আমাকে এবং আবু জাফর শামসুদ্দীন সাহেবকে বাংলা একাডেমীর অনুবাদ বিভাগে নিয়ে গেলেন সৈয়দ আলী আহসান। পরে আমি জানতে পারি, আমার ব্যাপারে সৈয়দ আলী আহসান হ্যাড টু টক উইথ আবদুল মোনায়েম খান, দি দেন গভর্নর অব ইস্ট পাকিস্তান। সৈয়দ আলী আহসান মোনায়েম খানকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি আমাকে বাংলা একাডেমীতে রাখতে পারবেন কিনা। তখন মোনায়েম খান পরিষ্কারভাবে সৈয়দ আলী আহসানকে বলেন, ‘আই উইল নট লেট সরদার ফজলুল করিম গো ব্যাক টু ঢাকা ইউনিভার্সিটি বাট ইউ ক্যান কিপ হিম আন্ডার ইউ। পরবর্তীকালে মোনায়েম খান পাবলিক মিটিংয়ে এ-ব্যাপারটা উল্লেখ করেন।
শ্যামল : আপনি তো ঊনসত্তরের গণআন্দোলন বা অভ্যুত্থানের সময় তো বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি বিভাগে ছিলেন। ওই সময়ে কী ঘটেছিল।
সরদার ফজলুল করিম : ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন আমি নিজ চোখে দেখেছি। আসাদকে যখন হত্যা করা হলো, সেদিনের কথাও মনে আছে। ১৯৬৯-এ আগরতলা মামলা থেকে যে বঙ্গবন্ধু বের হলেন – এটা একটা বিরাট ব্যাপার। তাঁকে দেখার জন্য আমি গেলাম তাঁর ধানমণ্ডির বাড়িতে। আমি জানতাম যে, জনতার ভিড়ে শেখ মুজিবের কাছে আমি যেতে পারব না। কিন্তু তবু আমি গেলাম, কারণ আমি মনে করতাম জনতাই হচ্ছে শেখ মুজিব এবং শেখ মুজিবই হচ্ছেন জনতা। এভাবে আমার একটা রাইটআপ আছে। রাইটআপটির শিরোনাম : তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।
শ্যামল : আপনি জনতার ভিড়ের কথা বললেন, কিন্তু আপনি ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের জীবন্ত সাক্ষী; কেমন জনসমুদ্র ছিল?
সরদার ফজলুল করিম : বিশাল সমুদ্র। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের বিশাল সমুদ্রে আমি উপস্থিত ছিলাম। আমি বরাবর বর্ধমান ভবনের ছাদে উঠে দেখছিলাম কী রকম গণজমায়েত হয়েছে। তখন রেসকোর্স ময়দানের ওপর পাকিস্তানি বিমান চক্কর দিচ্ছিল বারবার। আর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাংলা একাডেমী আক্রান্ত হলো। সম্ভবত তিনতলায় একটা আধফাটা শেল পাওয়া গিয়েছিল। আমি বলেছিলাম শেলের খোলসটা মিউজিয়ামে রাখতে। এরপর ১৯৭১ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর, বাংলা একাডেমী থেকে মিলিটারিরা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। অতঃপর ১৩-১৪ ডিসেম্বর রাজাকার-আলবদররা বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে-খুঁজে বের করে হত্যা করে। তাদের মধ্যে শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকেও রাজাকাররা হত্যা করে। আসলে কোনো বুদ্ধিজীবীই ভাবতে পারেননি তাঁদের এভাবে ধরে এনে হত্যা করা হবে। আমরা যারা জেলে ছিলাম, তাঁরা বেঁচে গেছি জেলে থাকার জন্য নয় বরং আলবদর-রাজাকাররা আমাদের হত্যা করার সময় পায়নি বলে। দেশটা এত তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়ে যাবে এটা তারা ভাবতে পারেনি।
শ্যামল :  আপনি মুনীর চৌধুরীর কথা বললেন। মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে তো আপনার সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্কে কিছু কি জানতে পারি?
সরদার ফজলুল করিম : মুনীর চৌধুরী আলিগড়ের ছাত্র ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে। ১৯৪৬ সালে ঢাকায় এসে ইংরেজি বিভাগে ঢুকল। তাঁর বাবাও ছিলেন ইংরেজির লোক। আমি যখন এমএ দিচ্ছি সে হয়তো তখন অনার্স দিচ্ছে। মুনীর চৌধুরী সাহিত্যিক ছিল। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁকে কবর নাটক লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটা মনে হয় ভাষা-আন্দোলনের পরের ঘটনা। খুব রসিক লোক ছিল সে। আমার সঙ্গে যেভাবে কথা বলত, মা-বাবার সঙ্গেও ঠিক সেভাবে মজা করে কথা বলত। মুনীর ছিল মাস্টার স্পিকার, মাস্টার ডিবেটার। যে-কোনো সাহিত্যিক ডিবেটে মুনীর একেবারে মাস্টার। আমরা সচেতনভাবে ভালোবাসতাম তাকে। মুনীরের একটা বাক্য আছে তাঁর আত্মজীবনীতে ‘আমি যদি সরদারদের না চিনতাম তা হলে আমার জীবন কি হত আমি জানি না।’ আমি ব্যক্তিগতভাবে মুনীরের নাম দিয়েছিলাম শরহম ড়ভ ড়িৎফং অর্থাৎ ‘শব্দের রাজা’।
শ্যামল : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। অধ্যাপক আব্দুর  রাজ্জাক সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই।
সরদার ফজলুল করিম : তিনি অকৃতদার ছিলেন। ভালো রান্না করতে পারতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষক সংগ্রহ করা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম অংশ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর রাজ্জাক স্যার ছিলেন জ্ঞানী মানুষ। তাঁর বইয়ের অভাব ছিল না। তাঁর বইয়ের একটা পারসোনাল লাইব্রেরি ছিল। যখন যেটা প্রয়োজন, তখন সেটা নিয়ে পড়তেন। তিনি সব ধরনের মানুষের উপকার করার চেষ্টা করতেন। এটা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ।
শ্যামল : দার্শনিক সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে ব্যক্তি ফজলুল করিমের কোনো পার্থক্য খুঁজে পান কিনা?
সরদার ফজলুল করিম : আমি তো আসলে কেউ না। আমার নিজেকে তেমন কিছু মনে হয় না। লোকে বলে, তাই আমার ভালো লাগে। আমি অতি সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষই থাকতে চাই। কোনো পার্থক্য খুঁজে পাই না। কারণ, আমি আমার নীতি ও আদর্শের সঙ্গে কখনো আপস করিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply