ধোঁয়ার অন্ধকার

লেখক:

রেজাউর রহমান

দুপুরের আগেভাগে স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক-ড্রাইভারদের ভিড়ভাট্টা কমে যেতে তেমন সময় লাগে না। তা এক ধরনের তাড়াহুড়োর মধ্যেই ঘটে যেতে থাকে। অবশ্য প্রতিদিন এক রকম যায় না। ধানম–র আবাসিক এলাকার ছোট মাপের স্কুল। কোনো কোনোদিন মাঝারি ধরনের গলিপথ ভেঙে লোকজনের মেইন রোডে উঠে যেতে বিশেষ করে রিকশা-স্কুটার-গাড়ির যানজটের ঘোরপ্যাঁচ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাটা জটিল আকার ধারণ করলে ব্যাপার হয় অন্যরকম। কিছুক্ষণের জন্য হলেও পথ চলাচলে স্থবিরতা আসে, যা নগরবাসীর অভ্যাস হয়ে গেছে।

মুনীরের এসবে কিছু আসে-যায় না। কোনো কোনোদিন তাঁর স্কুল ছেড়ে বেরোতে ৪টা-৫টা বেজে যায়। তিনি বসে-বসে দিনের খাতাগুলো চেক করে ফেলেন। অনেকটাই নির্ভার হয়ে বাড়ি

ফেরেন। তখন নিজের ঘরের শোয়ার চৌকিটা তাঁকে বেশ আকর্ষণ করে এবং তিনি কাপড় ছেড়ে হালকা হয়ে কিছুটা সময় গড়িয়ে কাটিয়ে দেন। নিরিবিলি, নির্ঝঞ্ঝাট।

কয়েকদিন থেকে মুনীর লক্ষ করছেন, টিচার্স রুমের লম্বা টেবিলের উলটোদিকে নিবিষ্ট হয়ে মাথায় হাত রেখে খাতা দেখেন সুনীতা স্যান্নাল। তিনি নিচের দিকে ক্লাস নেন। কিছুদিন হয় তিনি এ-স্কুলে জয়েন করেছেন।

নিয়মিত সময়ে রোকেয়া বুয়া আসেন। তাঁর হাতে ন্যাপকিন-ঢাকা ট্রে। তাতে তিনি তাঁর সাধ্যমতো মুনীর স্যারের জন্য দুপুরের খাবার জোগাড় করে নিয়ে আসেন। কোনো-কোনোদিন তিনি তা জোগাড় করে রাখেন সকালের স্কুলক্যান্টিন থেকে। আলুর চপ, তেহারি বা পাস্তা। তাতে সুবিধা না হলে বুয়া অন্য ব্যবস্থা করেন। স্কুলগেট বরাবর রাস্তার অপর পাড়ে একটা ছাপরা রেসেত্মারাঁ রয়েছে। সেখান থেকে দুপুরের খাবারের মতো কিছু একটা জোগাড় করে ফেলতে তেমন অসুবিধা হয় না।

মুনীর স্যারের সামনে বুয়া আজকের খাবার সাজিয়ে দেন। পেস্নটের পাশে রাখেন চামচ, কাঁটা-চামচ, পরিষ্কার গস্নাস। গস্নাসের পাশে বোতলভরা ঠান্ডা জল। বুয়া এ-কাজটা যত্নসহকারে করেন।  মাসের শেষে মুনীর তাঁকে কোনো উছিলায় সামান্য কিছু টাকা দেন। সবার অগোচরে।

 

রোকেয়া বুয়া খাবার গুছিয়ে দিয়ে ঘুরে চলে যাওয়ার সময় টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে সুনীতা তাঁকে মৃদু স্বরে ডাকেন,  ‘এই যে আপা, একটু শুনুন।’

রোকেয়া বিরক্ত হলেও তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়। ‘বলছিলাম কি… আমি এখানে নতুন, ব্যাপার-স্যাপার ভালো জানি না। ক্ষুধাও পেয়েছে। সকালে নাস্তা খেয়ে আসতে পারিনি…।’

‘এখন কোথায় খাবার পাবো। স্যারের খাবার তো সকালে উঠিয়ে রেখেছিলাম।’

মুনীর চামচ হাতে খেতে শুরু করেন।

রোকেয়া বুয়া গজগজ করতে-করতে তাঁর পাশ দিয়ে চলে যেতে-যেতে বলেন, ‘দেখেন তো স্যার… এখন খাবার কোথায় পাবো? সবাই মনে করে অর্ডার দিলেই…।’

মুনীর খাবার হাতে অস্বসিত্মতে পড়ে যান। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ সামনে রেখে কীভাবে খাওয়া যায়? আবার অপরিচিত নতুন মানুষ। তাঁর জন্য কীভাবে কী করা যায় তাও তো ভেবে পান না তিনি। আবার, কিছু একটা করতেও হয়।

‘দেখুন আপনি নতুন জয়েন করেছেন?’

‘জি আমি সুনীতা। মাত্র কয়েকদিন হয় জয়েন করেছি… এখানকার নিয়মকানুন তো আমার তেমন জানা নেই।’

‘আপনি খাবারের কথা বলেছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু এখন তো স্কুলক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গেছে।’

সুনীতা বিরতি টানার চেষ্টা করেন।

‘আচ্ছা থাক। কাল থেকে না হয়…।’

মুনীর হালকা হাসার চেষ্টা করেন।

‘কিন্তু আজ?… আপনি বরং এক কাজ করুন। আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা বরং খাবারটা শেয়ার করতে পারি।’

সুনীতা লাজনম্র হয়ে উঠে দাঁড়ান।

‘আমি যথেষ্ট ক্ষুধার্ত।’

‘তবে আপনার পেস্নটে যে সামান্য খাবার। একজনের…।’

‘তা ঠিক। তবে একজনের খাবার দুজনে শেয়ার করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।’

সুনীতা হাসেন।

‘মহাভারত টেনে আনলেন? আচ্ছা…।’

মুনীর সুনীতার পেস্নটে আধাআধি খাবার তুলে দেন।

পানি খেয়ে মুনীর উঠে দাঁড়ান।

‘এক কাপ চা হলে মন্দ হয় না। কী বলেন?’

সুনীতা টিটার্স রুমের পুব কোনায় রাখা চায়ের সাধারণ আয়োজন দেখতে পান। ইলেকট্রিক কেটলি, কাপ-পিরিচ-চামচ।

সুনীতা বিনীত হয়ে এগিয়ে যান।

‘এ-পর্বটা আমার ওপর ছেড়ে দেন। আমি কেটলিতে পানি চড়িয়ে দিচ্ছি।’

‘দিন।’ বসে পড়েন মুনীর।

চা খেতে-খেতে তাঁরা সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

‘স্কুলটা কেমন লাগছে?’

‘আমি বরাবরই নিচের ক্লাসের শিশুদের পড়াতে ভালোবাসি। তাদের কাছে গেলে যেমন আনন্দ পাই, আবার তেমনি মনটাও আনচান করে।’

‘সে তো ভালো কথা। শিশুদের ভালোবাসেন। কিন্তু মন আনচান করা কেন?’

সুনীতা তার মনের অবস্থাটা চেপে রাখতে গিয়ে বলে ফেলেন।

‘বিয়ের পর থেকে সারাক্ষণের স্বপ্ন ছিল কোলজুড়ে জেঁকে বসে থাকবে ফুটফুটে শিশু। কোলের শিশুর দেহজুড়ে ছড়িয়ে থাকে কেমনতর নেশাধরা এক মিষ্টিমধুর গন্ধ, যা আমাকে উদ্ভাসিত করে রাখতে পারত সারাক্ষণ। কিন্তু তা আর হলো কই?’

এ-পরিস্থিতিতে তাঁকে কী বলা যায় ভেবে পায় না মুনীর। তারপরও তাঁকে কিছু বলতে হয়।

‘তা তো প্রাকৃতিক নিয়মেই এসে যাবে একদিন। এতো চিন্তার কী আছে?’

সুনীতা চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস চাপেন।

‘অবিনাশের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ন-বছর।’

মুনীর তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ পালটানোর চেষ্টা করে সুবিধা করতে পারেননি।

সুনীতা তাঁর বসার জায়গায় চলে যান। টেবিলে একটু বেশি ঝুঁকে খাতা দেখায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু খাতা দেখা তাঁর এগোয় না। একসময় বাস্তবতা তাঁকে কাজের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আগামীকাল হোমওয়ার্কের খাতাগুলো ছাত্রদের দিতে হবে। সামনে টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। বাড়ি ফিরলে তো এসব গুছিয়ে তোলার সময় কম থাকে। শাশুড়ির হাঁটুতে ব্যথা। হাঁটতে তাঁর অসুবিধা হয়। এর ওপর খালা-শাশুড়ি এসেছেন। দেশ থেকে। তাঁর মুখের-দাঁতের নানা সমস্যা। খেতে পারেন না। তাঁর জন্য ঝাল ছাড়া রাঁধতে হয়। অবিনাশ থাকলেও না-হয় একটা কথা ছিল। সে গেছে ফিলিপাইন। দেড় মাসের জন্য। এনজিওর চাকরি।

আজকাল প্রায়শ এমনটা হয় সুনীতার। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন নানা ধরনের ভাবনা-চিন্তা তাঁকে ঘিরে রাখে। স্কুলটা তাঁর মন্দ লাগছে না। টিচাররা মোটামুটি সিরিয়াস, প্রফেশনাল। স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল ইলোনা মিস তাঁকে বেশ পছন্দ করেন। এছাড়া সিনিয়র-জুনিয়র বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ-সালাপ হয়েছে। বন্ধুত্ব হয়েছে। এর মধ্যে মুনীর স্যার তো খুব ভালো মানুষ। সিধা-সরল। বিশেষ করে, গত দুপুরে মুনীরের নিরাবেগ আমন্ত্রণ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তখন তাঁর মনে হলো, তাঁর জন্য ঘরে বানানো কোনো একটা কিছু, নাস্তা জাতীয় বানিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

 

যথারীতি স্কুল ছুটির পর রোকেয়া বুয়া মুনীরের খাবার সাজিয়ে-গুছিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সুনীতার তা চোখে পড়ে। এদিকে মুনীর তাঁর দিকে খানিকটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে হাসেন।

সুনীতা মুনীরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখান।

‘দাঁড়ান আমি আসছি।’

সুনীতা সুন্দর একটা টিফিন-বক্স তাঁর সামনে খুলে ধরেন।

‘আমি নিজে হাতে বানিয়েছি। সবজি-পোলাও…।’

‘বাহ্ চমৎকার।’

সুনীতা দেখেন, মুনীরের পেস্নটে পরোটা ও বুটের ডাল। তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বুয়া বাইরের হোটেল থেকে এসব এনেছেন আজ।

‘হোটেলের খাবার কেন খান? ভাবি সকাল-সকাল একটা কিছু তৈরি করে দিতে পারেন না?’

‘থাকলে, পারতেন হয়তো।’

‘মানে?’

‘মানে… মানে… আমার বিয়ে হয়েছিল। স্ত্রী চলে গেছেন।’

সুনীতা হোঁচট খেয়ে থেমে যান।

তাঁরা খাবার শেয়ার করেন। চা নিয়ে বসেন। কথাবার্তা খুব একটা জমেনি। সেদিনের মতো তাঁরা যাঁর-যাঁর কাজে ফিরে যান। কিন্তু মুনীরের বিয়ের ব্যাপারটা সুনীতাকে কেমনতর এক ধাঁধায় ফেলে রাখে।

 

সুনীতা ভাবেন, মুনীর তাঁর বিয়ের প্রসঙ্গে যা বললেন তাও হয়তো এক বাস্তবতা। বিয়ে হয়ে গেলেই যে জীবনে পরিপূর্ণতা এসে গেল, তাও তো নয়। অবিনাশের সঙ্গে বিয়ে হলেও অনেক কিছু যে তাঁর পাওয়া বাকি রয়ে গেছে। নিয়মমাফিক তাঁর জীবনে কোলভরে শিশু আসার কথা ছিল। তা তো হয়নি। ডাক্তার-বদ্যি কম করা হলো না। তাঁরা কলকাতাও ঘুরে এসেছেন। সন্তান না হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা গেল, সমস্যাটা অবিনাশের। শুক্রকীট স্বল্পতা (অ্যাজিওস্পার্মিয়া)। তারপরও ডাক্তার তাঁদের আশা দিয়েছেন। এ-অবস্থার পরিবর্তন হয়।  হঠাৎ করে আবার ঠিকও হয়ে যায়।

 

মুনীরের স্কুলের চাকরি নিয়ে অনেকের মতো তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না। বরং তিনি বরাবরই ভাবেন, তিনি ভালো আছেন। শিক্ষকতা নিয়েই তিনি থাকবেন। এর আগে মুনীর সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের একজন মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গায়। তাঁর বাবা-মা দুজনই
সুস্থ- সবল গৃহস্থ। তাঁরা বছর ধরে যথেষ্ট কৃষিপণ্য ঘরে তোলেন। সংসারে কোনো অভাব নেই। একমাত্র ছেলে মুনীরকে তাঁরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। হোস্টেলে রেখে। মুনীর সময়মতো অর্থনীতিতে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তালিকাভুক্ত হন।

মাধ্যমিক বোর্ডের একজন কর্মকর্তা হিসেবে মুনীর কাজ শিখে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। এমন একসময় অফিসের প্রধান কর্মকর্তা তাঁকে ডেকে পাঠান। এবং তাঁকে নির্দেশ দেন, ‘হবিগঞ্জের উদিরচর হাই স্কুলটা ভালো চলছে না। সরকারি অনুদানে বিলম্ব হচ্ছে। ফাইলটা দেখে ছেড়ে দেন।’

রুমে এসে ফাইলটা দেখেন মুনীর। সেখানকার লোকজনও গতকাল তাঁকে সুপারিশ করে গেছে। তারা জানিয়ে যায়, তাদের এ-অফিস থেকে নিয়ে মন্ত্রী পর্যন্ত অবাধ যাতায়াত। ততক্ষণে অফিসের অ্যাকাউন্টস সেকশনের হেড মুনীরের সামনের চেয়ারে এসে বসেন।

‘মুনীর সাহেব… ওই ফাইলটা?’

‘কোনটা?’

‘এক্ষুনি বড় সাহেব না আপনাকে বললেন?’

মুনীর বিব্রতবোধ করেন।

‘দেখুন ওই স্কুলের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাটাস বড় ত্রম্নটিপূর্ণ। আর আমার প্রাথমিক অনুসন্ধানে মনে হলো, এই নামের কোনো স্কুল আদৌ আছে কি-না?’

অ্যাকাউন্টসের হেড হেসে ফেলেন।

‘আছে।’ বলে পকেটে হাত দেন।

‘এই নেন।’ টাকার প্যাকেটটা মুনীরের সামনে রেখে চলে যান তিনি।

মুনীর তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডাকেন।

‘টাকার প্যাকেটটা হেড-অ্যাকাউন্টসকে ফিরিয়ে দিয়ে আসো।’

অ্যাসিস্ট্যান্ট ঘাবড়ে যান।

‘এটা কেমন করে হয়? এতে যে অফিসের ওপরতলার    কর্মকর্তারা… সবাই জড়িত। আপনার বিপদ হবে… বড় বিপদ।’

আর কথা না বাড়িয়ে সেদিন রাগে-ঘৃণায় অফিস থেকে বেরিয়ে যান মুনীর।

পরের দিন তিনি অফিসে যাননি। এর পরের দিন মুনীর রেজিগনেশন লেটার জমা দিয়ে দেশে চলে যান।

বেশ কিছুদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে তাঁর বাবা-মা  আনন্দিত হন। মা শহরে থাকা ছেলের দিনের অভ্যাস রুটিন জেনে নিয়েছেন। তিনি সকাল-সকাল এক কাপ ঘরের দুধের চা-মুড়ি নিয়ে এসে ছেলের মাথার কাছে বসেন। ঘরসংসারের এ-কথা-সে-কথায় ভালো সময় কাটে তাঁদের।

বাবাও তাঁর সকাল-রাত কাবাড়ে জমিজিরাত বেচাকেনার লাগাতার ডিউটি কমিয়ে দেন। বাজার থেকে দেখেশুনে সকলের সেরাটা কেনেন। দুপুরে একসঙ্গে খান।

গত কয়েকদিন মুনীর মায়ের সঙ্গে চায়ের আয়োজন শেষ করে তাঁদের বৈঠকখানায় গিয়ে বসেন। এর দক্ষিণমুখী খোলা বারান্দায় একবার গিয়ে বসলে আর উঠতে ইচ্ছে করে না তাঁর। সামনে তাঁর দিগন্তজোড়া বাড়ন্ত ফসলের ক্ষেত। তাঁর গায়ে এসে লাগে শিরশিরে সকালি ঠান্ডা বাতাস। তখন ছেড়ে আসা চাকরির যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা আর মনে পড়ে না তাঁর।

সকালে চা খেতে-খেতে মায়ের প্রস্তাবটা নিয়ে খানিকটা ভাবালু হন মুনীর। তিনি ভাবেন, জীবনকে ভাগাভাগির মুখোমুখি দাঁড় করালে ‘বিবাহ’ নামক একটা পর্ব যে অনিবার্যভাবেই আসবে। কাজেই তাঁর বিয়েতে আপত্তি নেই জানিয়ে দিলে মা আহ্লাদিত হয়ে বলেন, ‘তোর বাবারও এমনি একটা ইচ্ছা। দেখা যাক…।’

এর মাসেক পরে মুনীর পত্রিকার অ্যাড ধরে ঢাকায় এসে স্কুলের এই চাকরিটা নেন।

 

সপ্তাহ দেড়েকের স্কুল ছুটির পর সুনীতা মুনীরের একত্রে খাবারের পর্বটা আগের মতোই চলতে থাকে। রোকেয়া বুয়া মোটামুটি পেস্নট-গস্নাস গুছিয়ে দিয়ে গেলেও সুনীতা তা আবার নিজের মতো করে সাজিয়ে নেন। চায়ের আয়োজনটাও তাঁরই। আজকাল তাঁদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে আগের মতো টেবিলের দু-মাথায় দুজন আর বসেন না। বসেন কাছাকাছি। খাতা দেখার ফাঁকে-ফাঁকে টুকটাক কথাবার্তা হয় তাঁদের। সুনীতা জানান, অবিনাশ এসেছে বিদেশ থেকে। মুনীর কৌতূহল প্রকাশ করেন।

‘কী আনল আপনার জন্য?’

‘তেমন কিছু না। এই গতানুগতিক কেনাকাটা। শিফন-সিনথেটিক শাড়ি। হাতঘড়ি… এই তো।’

মুনীরকে যে-কথাটা একাধিকবার জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করে বলতে পারেননি সুনীতা, আজ তা সরাসরি বলে ফেলেন।

‘কথায়-কথায় আপনি একবার বলেছিলেন – বউ চলে গেছে। সেই গল্পটা মাঝে-মাঝে বড় শুনতে ইচ্ছে হয়। কেন এমন একটা ভালো মানুষের…?’

‘আমার যে বলতে ইচ্ছে হয় না। বউ চলে গেছে… তা তো   সুখের কোনো কথা নয়। তারপরও আপনি যখন নাছোড়বান্দা, বলতে হয়।’

‘স্কুলে জয়েন করার কিছুদিনের মধ্যে বাবা আমাকে জরুরি তলব করেন। সপ্তাহখানেকের ছুটি নিয়ে চলে আসো। আমরা তোমার বিয়ের অনেকদূর এগিয়েছি। বাকিটা তুমি এলে…। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তোমার। আমি বাড়ি যাই। বিয়েও হয়ে যায়। গোল বাধে তখনই।’

সুনীতা আগ্রহী হয়।

‘সেটা আবার কেমন?’

‘ফুলশয্যার রাতে ঘরে ঢুকতেই আমার সদ্যবিবাহিত স্ত্রী সোমা আমার পায়ে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আপনি আমাকে   বাঁচান। আমি কিছু বুঝতে না পেরে তাকে মাটি থেকে ওঠানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হই।’

‘সোমা কথা বলতে পারছে না। কান্নায় তার হেঁচকি উঠে গেছে। সে তার ডান হাতের বদ্ধমুঠি দেখায় আমাকে।’

‘এটা আমার বিয়ের রাতের উপহার – বিষ।’

আমার মুখ দিয়ে নিদারুণ ভয়ের এক অস্ফুট শব্দ বের হয়।

 

‘বিষ… বিষ… কিন্তু কেন?’

‘আমি বাঁচতে চাই না।’

‘কিন্তু কেন?’ আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করি। আপনি        থামুন। খুলে বলুন… কী হয়েছে?’

‘শোনার কিছু নেই। আমি এ-বিয়ে করতে চাইনি। বাবা-মা জোর করে…। আমি দিদারকে ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকে। সেও আমার মতো হাতে বিষ নিয়ে বসে আছে। আমরা একত্রে আত্মহত্যা করব।’

‘না, তা করতে হবে না। আমি আপনাদের বাঁচিয়ে রাখব… মরতে দেব না। পিস্নজ, বাথরুমে গিয়ে ওই বিষটা ফেলে দিন। দিদারকে ফোন করুন। আগামীকালই তার কাছে আপনাকে পৌঁছে দেব।’

‘কেমন করে? সোমার চোখেমুখে বিভ্রামিত্ম। সে ভাবে, এমন প্রস্তাব কি বিশ্বাস করা যায়? সোমা দিদারকে ফোন করে। কথা বলি আমিও। আমার ঢাকার ঠিকানাটা তাকে জানিয়ে দিই।’

‘আমি সকাল-সকাল বাবা-মাকে জানিয়ে দিই, স্কুল থেকে  জরুরি তলব এসেছে। আজই ঢাকা যেতে হবে আমাদের। তাড়াহুড়া করে নাস্তা সেরেই রওনা হয়ে যাই। রেন্ট-এ কারে।

বিকেলে সোমা-আমি ঢাকা এসে পৌঁছাই। সোমা দিদারকে ফোন দেয়। সে আমার শ্যামলীর বাসার কাছাকাছিই ছিল। তারা তাদের প্রথম সাক্ষাতে কাঁদতে শুরু করে।

আমি তাদের সাবধান করি।

এখন কাঁদার সময় নয়। যত তাড়াতাড়ি পারো ভেগে যাও। সোমা তাড়াতাড়ি করে তার সারা গায়ের গহনা খুলে পোঁটলা করে আমার হাতে তুলে দেয়। আমি তা ফিরিয়ে দিই। তোমাদের লাগবে। সঙ্গে নিয়ে যাও।

গহনার পোঁটলা সোমা ব্যাগে ভরে আমার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বেরিয়ে যায়। দিদারের হাত ধরে।’

‘তারপর?’ সুনীতা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

‘তারপর আর কী? আমি দেশে যেতে পারি না। সোমার বাবা রামদা নিয়ে আমাকে খোঁজেন।’

সুনীতা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

‘এমন একটা ভয়ংকর ঝুঁকি মানুষ নেয়?’

‘নিলাম… দুটি প্রাণ চলে যাবে? তা কেমন করে হয়? আমাকে যে দাঁড়াতেই হতো। তাদের পাশে।’

সুনীতা মুনীরের চোখে চোখ রেখে অনেকক্ষণ সরাসরি চেয়ে থেকে প্রসঙ্গ পালটান।

‘দুপুরের খাবার তো সারলেন। রাতে…?’

‘একটা কিছু করে নেব।’

‘কেমন?’

‘এই ধরেন… ভাতের সঙ্গে আলু-ডিম চড়িয়ে দিই।’

‘প্রতিদিন তাই খান?’

মুনীর হাসেন।

‘অনেকটা তাই।’

‘ঠিক আছে, আজ আমি আপনার সঙ্গে যাবো।’

‘আমার সঙ্গে!’

‘কেন?’

‘আমি আপনার প্রতিদিনকার মেনুটা অন্যভাবে করে দেব আজ।’

মুনীর আর কথা বাড়াতে পারেন না। আকস্মিক এক সংকোচে নিজের মধ্যে নিজে জড়িয়ে যান। সুনীতার চোখমুখে তখন মায়াময় রহস্যের এক বিরল হাসি।

মুনীরের শ্যামলীর বাসায় গিয়ে সুনীতা কিছুটা অপ্রস্ত্তত হন। এত অগোছালো সব! মুনীর ঘর গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

‘সারাদিন তো বাইরে কাটাই। কাজের মানুষ যে রাখবো… তাকে আবার দেখবে কে? তাই বন্ধের দিন আমিই যেটুকু পারি…।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। আজ আমি আপনার কাজের মানুষ। দেখভাল করেন। কিছু না খোয়া যায় আবার?

সুনীতা মুনীরের চোখ বরাবর চেয়ে মিটিমিটি হাসেন।

দু-রুমের ছোট্ট বাসা। আধাখানা কিচেন। ছয়তলার আধলা ফ্ল্যাট বলে ভাড়াও কম। তবে দুপুরে ছাদ গরম হয়ে যায়। ছুটির দিনে ঘুমিয়ে নিতে গেলে তেমন আরাম হয় না। ফ্যানের বাতাসও গরম হয়ে ওঠে।

সুনীতা প্রথমে চুলায় গরম পানি বসান। তারপর কোমর বেঁধে লেগে যান ঘর গোছাতে।

দুকাপ চা নিয়ে টেবিলে রাখেন। মুখোমুখি বসেন দুজন।

‘বিবাহিত বধূয়াকে তুলে দিলেন ওই যুবকের সঙ্গে… এরপর আর কি কোনো মেয়ের দেখা পেলেন না?’

‘খুঁজিনি।’

ততক্ষণে সুনীতা মুনীরকে প্রায় কোলে টেনে নেন। চুমোয়-চুমোয় ভরে দেন। তাঁকে নিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েন।

একসময় তাঁরা উঠে বসেন। মুনীর এমন একটা পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারেননি। তিনি অপ্রস্ত্তত হতে থেকেও উপচেপড়া নারীসঙ্গ তাঁর মন্দ লাগেনি।

‘চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল?’

সুনীতা সরাসরি তাঁর চোখের দিকে চেয়ে হাসেন।

‘এমন অবস্থার পরই তো চা মুখে রুচে বেশি। তা ঠান্ডাই হোক আর গরমই হোক।’

সুনীতা তাঁর শাড়ি-কাপড় গোছাতে-গোছাতে বলেন, ‘এবার আমার রান্নার পালা। আজ হবে খিচুড়ি-আন্ডাকারি।’

মুনীর সরাসরি সুনীতার দিকে চাইতে লজ্জা পেলেও তাঁর দেহসৌষ্ঠবের রূপ অনুভব করে বিস্মিত হন। ভরা নারীদেহের ভাঁজে-ভাঁজে যে এত রূপ-সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি তা তাঁর জানা ছিল না। মুনীর প্রসঙ্গ পালটাতে সচেষ্ট হন।

‘তোমার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে না? অবিনাশ তো দেশে ফিরেছে।’

‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে? রাত ৯টার আগে সে ফেরে না।’

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সুনীতা আন্ডাকারি, আলুর দম, খিচুড়ি, পোড়া শুকনো মরিচ-পেঁয়াজ কুচি, শর্ষে তেলের ভর্তার আয়োজন গুছিয়ে ফেলেন। তাঁরা খেতে বসেন।

মুনীর বিস্মিত হয়ে সুনীতার দিকে চেয়ে থাকেন।

‘কী দেখছো?’

‘দেখছি তোমাকে।’

খাওয়া শেষে হাঁড়ি, বাসন-কোসন ধোয়া-পাকলি করে। মুনীরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে তাঁর ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়ে সুনীতা বলেন, ‘এবার আমাকে এগিয়ে দাও। আজ থেকে আর আপনি নয়, তুমি।’

 

প্রায় মাস-দেড়েক সময় ধরে সুনীতা-মুনীরের এই রুটিন   অভিসার চলতে থাকে। ছুটি হলে খাতা দেখার সেশন সংক্ষেপ্ত করে তাঁরা মুনীরের বাসায় চলে যান। আজকাল মুনীর মাঝে-সাজে বাজারসওদা করেন। মাছ-তরকারি কেনেন। কেনেন মুরগিও।  সুনীতার মুরগি খুব পছন্দ। তা তিনি রাঁধেনও ভালো।

প্রথম-প্রথম এ-পরিস্থিতিটা মুনীরের কিছুটা বাধো-বাধো লাগলেও এখন পুরো পরিস্থিতিটা তাঁর কাছে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আনন্দঘন হয়ে উঠেছে।

 

মাস দুই পর একদিন সকাল থেকে সুনীতা যতবার মুনীরের সামনে পড়েন, ততবারই সামান্য সলজ্জ হয়ে দাঁড়ান। আলতো হাসেন। এবং বলেন, ‘কথা আছে।’

‘কী কথা?’

‘সময় এলে শুনবে।’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যান। আবার ঘুরে এসে সামনে পড়েন। লাজনম্র হয়ে হাসেন সুনীতা।

‘একটা খবর আছে।’

সেই রহস্য উদ্ঘাটন হয় যখন তাঁরা খালি টিচার্চ রুমে গ্রিন টি নিয়ে বসেন।

মুখম-লে প্রশান্ত সুখের এক অভিনব আমেজ ফুটিয়ে সুনীতা বলেন, ‘আমি অমত্মঃসত্ত্বা। আমি গতকাল অবিনাশকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। শরীরটা কদিন থেকে কেমন-কেমন লাগছিল। পাড়ার ডাক্তার তাৎক্ষণিক টেস্ট করেন এবং একজন ভালো গাইনোকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে থাকার উপদেশ দেন। আর প্রথম মাসতিনেক সাবধানে চলাফেরা করতে বলেন। অনেকদিন পরে  কনসিভ করেছি কি-না।’

মুনীর চা খাওয়া রেখে সটান সুনীতার দিকে চেয়ে থাকেন। তিনি দেখেন, তাঁর চোখেমুখে এক অভিনব পরিপূর্ণতার আভাস। এতদিন ধরে তিনি যেন এ-মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। এ-সুখটুকু পাওয়ার আশা নিয়ে কাটিয়েছেন কতটা বছর।

সুনীতা স্বচ্ছন্দ হয়ে মুনীরের চোখ বরাবর চেয়ে বলেন, ‘তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা বোধ করি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

পরের সপ্তাহে সুনীতা স্কুলে আসেননি। দুপুরে খাবার নিয়ে বসে মুনীর তাঁকে ফোন করেন।

‘আমি তো ভেবেছিলাম, আমার জীবনে একাকী খাওয়ার পাট চুকে গেছে। আজ যে আসোনি?’

‘আর বলো না… গতকাল গোসল করতে গিয়ে কলের নিচে মাথা রেখে ঠান্ডা পানির আরাম উপভোগ করছিলাম। মাথার ওপরকার স্টিলের কলটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মাথা তুলতে গেলে মাথায় শক্ত আঘাত পাই। মাথার খুলিটা ফেটেই গেল নাকি?’

‘নাহ্… এ আর এমন কী? সেরে যাবে।’

‘স্থানীয় ডাক্তার দেখালাম। তিনি ড্রেসিং করে জানালেন, আঘাতটা গভীর। ব্যথা হবে। কয়েকটা সিটামল খান। উপশম না হলে মাইল্ড একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দিলাম। আশা করি কাজ হবে।’

একটু ভেবে ডাক্তার সাহেব আবার বলেন, ‘দেখেন… আপনি যেহেতু অমত্মঃসত্ত্বা…। এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে সংযত বা সিলেকটিভ হওয়া ভালো। এক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করে নিলে ভালো হয়।’

মুনীর চিমিত্মত হন।

‘একজন গাইনোকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলে নাও না। নির্ভার হওয়া যায়।’

‘আমি ভ্রূণ নিয়ে কোনো রকম রিস্ক নিতে চাই না। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কী দরকার? দু-একদিন দেখি না। হয়তো এমনি সেরে যাবে।’

‘তাও হতে পারে… দেখো।’

পরের দিনও সুনীতা স্কুলে আসেননি।

এর পরের দিনের সকাল-সকাল খবরটা সবার মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সুনীতা মিস গতরাতে মারা গেছেন। তিনি নাকি অমত্মঃসত্ত্বা ছিলেন।

মুনীর খবরটা শুনে সেখানে দাঁড়াতে পারেননি। তাঁর মন তখন হাহাকার করে ওঠে। ‘…কী শুনলাম …এও কি সম্ভব!’ তাঁর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নামে। খবরটা তাঁর বিশ্বাস হতে চায় না। টিফিন ব্রেকে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম স্কুল ছুটির ঘোষণা দেন। আর ঘণ্টাখানেক পরে সব শিক্ষককে তাঁর রুমে ডাকেন।

সময়মতো শিক্ষকরা প্রিন্সিপাল ম্যাডামের রুমে এসে জড়ো হন। মুনীরের আসতে একটু দেরি হয়। ভাইস প্রিন্সিপাল ইলোনা মিস ততক্ষণে তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শুরু করেছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে সুনীতার মৃত্যুসংবাদটা আবার দেন। তিনি বলেন, মেয়েটার সন্তানের বড় শখ ছিল। এরপর তিনি মৃতের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাইকে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানান।

প্রিন্সিপাল ম্যাডামের বক্তব্যের পর্বে তিনি শিক্ষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে সুনীতার অনেক গুণগান করেন এবং সংক্ষেপে সবার দায়দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘কেউ মরে গেলে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। প্রথমত আমরা মৃতের জন্য দোয়া করতে পারি। আর দুঃখী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি। তাদের সমব্যথী হওয়ার চেষ্টা করা যায়। আমাদের দুটো মাইক্রোবাস রেডি। আমরা সুনীতার বাড়ি যাবো। তাদের সান্তবনা দেওয়ার চেষ্টা করব। আর বিশেষ করে, পুরুষ সহকর্মীদের আমি অনুরোধ করব, তাঁরা যেন সুনীতার সম্মানার্থে শ্মশানঘাটেও যাওয়ার চেষ্টা করেন। মৃতের অমেত্ম্যষ্টিক্রিয়ায় অ্যাটেন্ড করাও জরুরি। এতে পরিবারে বল-ভরসা বাড়ে।’

মিটিং শেষ হয়। সবাই সুনীতাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হতে থাকেন। আর এদিকে মুনীর স্কুলের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সোজা ঠাকুরগাঁওয়ের বাসস্ট্যান্ডের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকেন। ঢাকা শহরে আর এক মুহূর্ত নয়। একটু পরেই যে এই শহরের কোনো এক শ্মশানঘাটে গর্ভবতী সুনীতার হিমশীতল দেহে আগুন জ্বলে উঠবে। আর তাঁদের দেহ-পোড়া ছাইভস্ম বাতাসে উড়বে। উতলা-বেতালা হয়ে। ধোঁয়ার অন্ধকারে ছেয়ে যাবে চারিদিক। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার