নজরুলচর্চা ও দু-একটি প্রসঙ্গ

লেখক:

বাঁধন সেনগুপ্ত

বেঁচে থাকলে কাজী নজরুল ইসলামের বয়স হতো এখন ১১৫। অর্থাৎ এ-বছর আমরা বিদ্রোহীকবির ১১৬তম জন্মদিবস পালন করেছি। কবির জন্মশতবর্ষে বাংলাদেশে দীর্ঘকালীন প্রস্ত্ততিপর্বের ফলস্বরূপ আমরা কবিকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের অজস্র কর্মসূচি পালনের সাফল্যও সংবাদ এ-পার বাংলায়ও বসে নানা সময়ে পেয়েছিলাম। তুলনায় পশ্চিমবাংলায় বা ভারতের অন্যত্র শতবর্ষে বা তারপরে কাজী নজরুলের সাহিত্য ও সৃষ্টি সংরক্ষণ বা শ্রদ্ধার্ঘ্য বিষয়ক বহুবিধ কর্মসূচি পালনের সংবাদ দেশের বাইরে অন্যত্র কমই পৌঁছেছে।

বিদেশে তো প্রায় কোথাও সে-সব নজরে পড়েনি। ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। সেখানকার খবরাখবর ইংল্যান্ড, জার্মানিসহ সর্বত্রই পাওয়া গিয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এখন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে সম্মানিত। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে চুরুলিয়ার ভূমিপুত্র এই কবিকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছিল। পরের মাসেই কবি স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘একুশে পদক’ স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। বাংলাদেশে আসার পর ঢাকার পিজি হাসপাতালে ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ রোববার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি ৭৭ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ-সংলগ্ন প্রাঙ্গণে কবিকে সমাহিত করা হয়। প্রয়াণের পরের বছরেই ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রয়াত কবিকে জাতীয় কবির সম্মানের কথা প্রথম ঘোষণা করেন। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাঙালির এই প্রিয় কবির সম্মান এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কবির বিষয়ে সর্বত্র গভীর আগ্রহ এতে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

কবির জন্মস্থান পশ্চিমবাংলায়। বলতে গেলে সেখানেই তাঁর সৃষ্টিশীল সমগ্র জীবনটাই কেটেছিল। সেখানেই তাঁর সঙ্গীসাথিরা প্রয়াণের পরেও তখনো অনেকেই বেঁচে ছিলেন। তাঁদের অনেকেই তখনো সাহিত্য, শিল্প-সংগীতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় ও খ্যাতির শীর্ষে। ফলে কবির প্রয়াণকালে তাঁদের মানসিক প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুধাবন করা গিয়েছিল। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬। মনে আছে, সেদিন দুপুরে প্রথম আকাশবাণী দিল্লি থেকে সংবাদটি এখানে বিলম্বে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। নানা ভাষায় সংবাদটি বিশাল ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতায় আকাশবাণী কেন্দ্র থেকেও একের পর এক সংবাদ বুলেটিন প্রচারিত হতে থাকে। ভারতবর্ষের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে।  বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের নজরুলপ্রিয় বাঙালি সমাজ এ-খবর পেয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়-উৎসারিত বেদনার হাহাকার। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই। সারাদিন সকলেই কবির দেহ চুরুলিয়ায় প্রত্যাগমনের আশায় পথ চেয়ে সেদিন অপেক্ষায় ছিলেন। কবির পুত্র সব্যসাচী তাঁর পিতার প্রয়াণ সংবাদ প্রথম অবশ্য জানতে পারেন বেলা প্রায় সাড়ে ১০টায়। বাংলাদেশ রেডিওতে খবরটা শুনে সব্যসাচীর বন্ধুরা তাঁকে টেলিফোনে এই দুঃসংবাদ জানায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে যান কলকাতাস্থ বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূত অফিসে। সেখানেও মৃত্যু সম্পর্কে নাকি তখনো তেমনভাবে কিছু জানা যায়নি। কলকাতার আকাশবাণী থেকে খবর যায় সব্যসাচীর বাড়িতে এবং ছোট পুত্র অনিরুদ্ধের পাইকপাড়ার বাসায়। অনিরুদ্ধপত্নী কল্যাণী ও তাঁর পুত্র কাজী অরিন্দম তখনো বাড়িতে ছিলেন না। তাঁরা মিনার্ভা থিয়েটার হলে গিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে কিশোর পুত্র অরিন্দম পুরস্কার আনতে গিয়েছিল মায়ের সঙ্গে। ফলে অনিরুদ্ধ-জায়া কল্যাণী কাজীও খবর পান প্রথম বেলা প্রায় ১১টায়। বাংলাদেশ থেকে কেউ কবির অসুস্থতা বা প্রয়াণ সংবাদ সেদিন সরাসরি কবিপুত্রকে জানাননি। বাধ্য হয়েই সব্যসাচী প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তাঁর ভবানীপুরের বেলতলা রোডের বাড়িতে যান। মুখ্যমন্ত্রী তখন ছিলেন বর্ধমান জেলার বার্নপুরে। চুরুলিয়া থেকে বার্নপুর প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে। সেখানে কবির চুরুলিয়ার ভ্রাতৃষ্পুত্ররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন বলে পরে জানা যায়। কিন্তু কবির মরদেহ কলকাতায় ফিরিয়ে আনার আবেদনে সেদিন মুখ্যমন্ত্রীর তরফে নাকি তেমন আন্তরিক উদ্যোগ দেখা যায়নি। কলকাতায় কবির ভক্তরা অবশ্য শেষ দর্শনের আশায় মধ্য কলকাতায় সব্যসাচীর ক্রিস্টোফার রোডের ফ্ল্যাটের সামনে দলে দলে গিয়ে ভিড় করতে থাকেন।

বাধ্য হয়েই সব্যসাচী বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে এ-বিষয়ে সেদিন পুনরায় আবেদন জানান। তখন দেখা গেল, সব্যসাচীর পাসপোর্টটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও দূতাবাস কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কবিপুত্র সব্যসাচী ও কবির কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীকে দুপুরের বিমানযোগে দমদম থেকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের তথ্যবিভাগের তদানীন্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে যোগাযোগ করে এ-বিষয়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। বস্ত্তত দিল্লি কর্তৃপক্ষের সেদিন এ-ব্যাপারে তেমন আগ্রহ বা সাড়া মেলেনি। সব্যসাচী ও কল্যাণী একই সঙ্গে এ-বিষয়ে  অর্থাৎ চুরুলিয়ায় নিজ জন্মস্থানে কবিকে এনে কবর দেওয়ার আবেদন জানিয়ে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।

দুর্ভাগ্যবশত সেদিন দুপুরের বিমান কলকাতা থেকে ছাড়তেও বিলম্ব হয়। তাঁরা ঢাকা বিমানবন্দরে গিয়ে তাই বলতে গেলে প্রায় শেষ মুহূর্তেই পৌঁছান। সংবাদে প্রকাশিত, ‘কবির জ্যেষ্ঠপুত্র কাজী সব্যসাচী, কনিষ্ঠ পুত্র অনিরুদ্ধের স্ত্রী কল্যাণী কাজী প্রভৃতি আত্মীয়বর্গ আজ রাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন বলে বাংলাদেশ থেকে জানানো হয়েছে।’ (যুগান্তর, কলকাতা, ৩০ আগস্ট ১৯৭৬)।

কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী পরদিন সোমবার সন্ধ্যায় কলকাতায় ফিরে  আসেন। এসেই বিষণ্ণমুখে সংবাদদাতাদের জানিয়েছিলেন, ‘মা রইলেন চুরুলিয়ায় আর বাবা রইলেন ঢাকায়। এ আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে।’ বারবার কবিপুত্র বলতে লাগলেন, ‘ওরা আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই শেষ দেখা দেখতে পেতাম। আর ওদের এতো তাড়াহুড়ো করারই বা দরকার কী ছিল। ওদের জানানো হয়েছিল যে কবিপুত্র ঢাকা যাচ্ছেন দুপুরের প্লেনে। তবু কিসের এত তাড়াহুড়ো?…’

পশ্চিমবাংলার নজরুল অনুরাগী সাধারণ মানুষের আক্ষেপ ছিল, আজ সম্ভবত বঙ্গবন্ধু থাকলে এমনটি হতো না। অবশ্য সেই রোববার বিকেলে ঢাকায় পৌঁছে সব্যসাচী বিমানবন্দর থেকে সোজা কল্যাণী কাজীসহ কবির কবরস্থানে গিয়ে দ্রুত হাজির হয়েছিলেন। তখন বাংলাদেশের সময় সোয়া ৬টা। তাঁর কথা অনুযায়ী, তার মিনিট কয়েক আগেই কবিকে মাটি দিয়ে সকলে চলে গেছেন। কবির একমাত্র জীবিত পুত্র সব্যসাচী কবরে একমুঠো মাটিও তাই দিতে পারলেন না। সকলের অজান্তে কবির কবরে কবিপুত্রের দুচোখের জল ঝরে পড়ল। মাটি কি অশ্রুজলের চেয়েও দামি!

পরদিন কলকাতায় দৈনিক যুগান্তরের (সম্পাদক : সুকমলকান্তি ঘোষ) হেডলাইন ছিল – নজরুল নেই \ প্রবাসে জীবনাবসান

কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার সমস্ত সরকারি অফিস এবং স্কুল-কলেজে পরদিন সোমবার ছুটি ঘোষণা করেছিল। পত্রিকার পাতা জুড়ে কবির বিয়োগ সংবাদ। এছাড়াও ছিল প্রবোধ সান্ন্যাল, অন্নদাশঙ্কর রায়, মনোজ বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়সহ অন্যান্য কবিবন্ধুর রচনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলিতে পত্রিকার পৃষ্ঠা ভরা। সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর শোকবার্তায় বলেছিলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম আর নেই – এই সংবাদে আমি গভীর মর্মাহত। ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্যে তিনি বহু বছর ধরে বাকশক্তিহীন। কিন্তু সক্রিয় জীবনে তিনি যা লিখেছেন তাতে বাংলা সাহিত্যে তিনি অমর। কবির জাতীয়তাবাদী কবিতা লক্ষ লক্ষ লোককে নিঃস্বার্থ ও দুঃসাহসী কাজে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর মৃত্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। কবির নিকট আত্মীয়বর্গ এবং বাংলা ভাষায় যাঁরা অনুরাগী তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’

মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তাঁর শোকবার্তায় জানান, ‘বাংলার বিদ্রোহী কবি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। একথা বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য। কবি নজরুল তাঁর কবিতায় ও গানে মানুষের শুধু প্রাণই ভরাননি, মানুষকে নতুন প্রেরণার জাতীয় চেতনায় উদ্দীপিত করেছিলেন। তাই তিনি বাঙালি-হৃদয়ে তথা ভারতবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। তাঁর কবিতা ও গান চিরকাল আমাদের ঘরে ঘরে পল্লী প্রান্তরে অনুরণিত হবে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মানুষের সঙ্গে আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের অমর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি।’ কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী কবির দেহ তাঁর জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে দিল্লির অনুমতি আনার বিষয়ে কেন তেমন উদ্যোগী হলেন না? সেদিন কবির মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া, সাংসদ মায়া রায় (মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী), সাংসদ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কর্মসমিতি, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, ড. প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, ফজলুর রহমান, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অরুণ কুমার মৈত্র, এসইউসি, ভারতীয় জনসঙ্ঘ, শিশির কুমার ইনস্টিটিউট, ডিওয়াইও, ডিএসও-সহ অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। শোকসভার আয়োজন হয়েছিল চুরুলিয়া নজরুল অ্যাকাডেমি এবং আসানসোল প্রেস ক্লাবেও।

কলকাতার দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে আকর্ষণীয় শিরোনাম ছাপা হয়েছিল। যেমন – চিরনিদ্রায় চিরবিদ্রোহী বীর, সহধর্মিণী একাকী শায়িত রইলেন, ইন্দিরা মর্মাহত, সব্যসাচীরা ঢাকা গেলেন, শোকাশ্রু, স্মৃতিভারে পড়ে আছেন (ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা) ইত্যাদি। প্রতিটি পত্রপত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাড়াও একাধিক লেখা হয়েছিল তাঁকে নিয়ে সপ্তাহজুড়ে।

পরের দিন কলকাতায় রবীন্দ্রসদনে এক স্মরণসভায় সোমবার পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকবৃন্দ নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। সেই সভায় উপস্থিত থাকার সময় দেখেছিলাম প্রেক্ষাগৃহ পরিপূর্ণ। দেখেছি অসংখ্য মানুষ রবীন্দ্রসদনের বাইরে সেদিন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। হলের দরজা বাধ্য হয়েই খোলা রাখতে হয়েছিল। শোকসভার আহবায়ক ছিলেন কলকাতার শেরিফ রঘুনাথ দে। সভায় পৌরোহিত্য করেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। কবির বন্ধুরাও সেখানে প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন। লেখক সমাজের সকলেই সভায় এসে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। শিল্পীরা শ্রদ্ধা জানান কবিকে গানের মাধ্যমে। ঢাকা থেকে সরাসরি রবীন্দ্রসদনে এসে উপস্থিত হন কবিপুত্র সব্যসাচী ও পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীও। কল্যাণী মঞ্চে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন – ‘এত করে ছুটে গেলাম, বাবাকে শেষবারের মতো একটু দেখতেও পেলাম না।’ না, ওদের কেউ ডাকেনি। শোক-সমবেদনাও জানায়নি। শুধু সমরবাবু  (ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত) ছিলেন। ঢাকায় সব্যসাচী ও কল্যাণীকে তিনি সে-রাতে আতিথ্যদান করেছিলেন।

সমাবেশে সকলেই আবেগে তখন বেশ বিচলিত। ড. রমা চৌধুরীর বুকে মাথা রেখে মঞ্চে তখন কেঁদেই চলেছেন কবির পুত্রবধূ। সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাকে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। মঞ্চে উপস্থিত বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, স্পিকার অপূর্বলাল মজুমদার, বিচারপতি মাসুদ, শেখ আনোয়ার আলি, তুষারকান্তি ঘোষ, প্রবোধকুমার সান্ন্যাল, উপাচার্য সতেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ বিদ্বজ্জন।

কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সকলেই কবির মৃতদেহ তাঁর জন্মস্থানে পত্নীর কবরের পাশে না আনায় হতাশা ব্যক্ত করেন। লেখক মনোজ বসু ও শেখ আনোয়ার আলি নজরুলের মরদেহ এখানে আনা যায়নি বলে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।

স্মরণানুষ্ঠানে প্রবীণা নজরুলশিষ্য শিল্পী আঙ্গুরবালা চোখের জল মুছতে মুছতে গেয়ে শোনান – ‘ওগো পূজার থালায় আছে আমার ব্যথার শতদল’। শিল্পী বীরেন্দ্রচন্দ্রের গান – ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’। সুপ্রভা সরকার গেয়েছিলেন – ‘অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে’। সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় (ওরে নীল যমুনার জল), মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (কে গো আমার সাঁঝ গগনে), অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় (দিতে এলে ফুল হে প্রিয় আজি সমাধিতে মোর), ধীরেন বসু    (শূন্য এ বুকে পাখি মোর) সেদিন রবীন্দ্রসদনে গানে গানে প্রয়াত কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন।

মনে আছে, নজরুলের প্রয়াণের অনেক আগে ষাটের দশকে পূর্ববাংলায় নজরুলের অনুরাগী মহল ঢাকায় কবির প্রাণসখা কাজী মোতাহার হোসেনের বাসভবনে গড়ে তোলেন ‘ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন’। অবশ্য তারও আগে পঞ্চাশের দশকেই ঢাকায় প্রথম গড়ে উঠেছিল বুলবুল ললিতকলা একাডেমী। সেখানেই দেশভাগের পর প্রথম প্রথাগত নজরুলসংগীত শিক্ষাদানের সূচনা। ব্যক্তিগতভাবে আরো আগে অনেকেই সেখানে নজরুলের গানের শিক্ষকতা করতেন। ১৯৬৮ সালে ২৪ মে কবির জন্মদিনে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুল একাডেমীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেখান থেকেই প্রকাশিত হতো নজরুল একাডেমী পত্রিকা নামে একটি মূল্যবান পত্রিকা। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এর মোট বারোটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অবশ্য নজরুলচর্চার প্রথম সরকারি প্রতিষ্ঠান বলতে বোঝাত ১৯৬৪-৬৫ সালে কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড। এটি পরে বাংলা একাডেমীর (একাডেমি) সঙ্গে মিশে যায়। সেখান থেকেই ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রথম নজরুল রচনাবলী। মোট তিনটি খন্ডে – প্রথম খন্ড (১৯৬৬), দ্বিতীয় খন্ড (১৯৬৭) ও তৃতীয় খন্ড (১৯৭০) – তা প্রকাশিত হয়েছিল যা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে এর আরো খন্ড প্রকাশ পায়।

একথা অনস্বীকার্য যে, নজরুলকে নিয়ে এরপর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও গভীর আগ্রহ ও জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ‘জাতীয় কবি’ বলে স্বীকৃত ও সম্মানিত কবি নানাভাবেই বাংলাদেশে চর্চিত। তুলনায় কবির কর্মক্ষেত্র ও জন্মস্থান পশ্চিমবাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাব অবশ্যই বহুকাল নজরে পড়েছিল। কিন্তু আজকাল বাংলাদেশে কেউ কেউ প্রায়শই প্রচার করে থাকেন যে, পশ্চিমবাংলায় নজরুলচর্চা হয় না। পশ্চিমবঙ্গে নাকি নজরুলচর্চা বর্তমানে বলতে গেলে এক প্রকার স্থবির। নজরুলচর্চার বৈশ্বিক চিত্র আলোচনাকালে নির্দ্বিধায় তাই কেউ লিখেন, নজরুলের জন্ম ভারতে হলেও নজরুলচর্চা বর্তমানে সেখানে বিশেষ নেই বললেই চলে। সেখানে নজরুলচর্চা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, অনেকটা  অসংগঠিত। তবে ব্যক্তিগত আয়োজন এবং সংগঠন পর্যায়ের উদ্যোগ ও চর্চায় নজরুল কলকাতার সমাজে নিষ্প্রভভাবে বেঁচে আছেন। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুল গবেষণা ও প্রকাশনা একেবারে নেই বলা চলে।… কলকাতায় গড়ে ওঠেনি কোনো নজরুলচর্চা কেন্দ্র। তবে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে ‘নজরুল চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পত্তন হয়।… ইত্যাদি…।

এসব লেখক পশ্চিমবঙ্গে বিগত ছয় দশকের নজরুলচর্চার বিষয়ে সম্ভবত কোনো খোঁজখবরই রাখেননি। তাই অবলীলায় কোনো তথ্য ছাড়াই এমন  অসতর্ক মন্তব্য করে চলেছেন। তাঁদের অবগতির জন্যে সবিনয়ে জানাতে হচ্ছে, কবির অসুস্থতার পর রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক দশক শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, সর্বত্রই কিছুটা অন্তরালে কবি আলোচিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর চিকিৎসার জন্যে বিদেশে (১৯৫৩) গেলেও তাঁকে সাত মাস পরেই কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। সেই পর্বে কবি নিঃসন্দেহে এখানেও কিঞ্চিৎ আড়ালে ছিলেন।

১৯৫৫ সালে কবির সঙ্গী ও স্নেহভাজন প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল (প্রথম খন্ড)। ১৯৫৪ সালে আজহারউদ্দীন খান লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যে নজরুল। মুজফ্ফর আহমদ এরপর লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা (১৯৬৫)। পাশাপাশি অশোক গুহের অগ্নিবীণা বাজান যিনি (১৯৬৮) এবং অশোককুমার মিত্রের নজরুল প্রতিভা পরিচিতি (১৯৬৯)। পুনরায় এভাবে শুরু হয় ব্যাপক নজরুলচর্চা।

এর আগেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও অনুরাগে পূর্ববাংলা থেকে গোড়ায় প্রকাশিত হয়েছিল আবুল ফজলের গ্রন্থ, বিদ্রোহী কবি নজরুল (১৯৪৭)। আবদুল কাদিরের নজরুল জীবনী (১৯৪১) কলকাতা থেকে প্রথমে প্রকাশিত হলেও লেখকের নজরুলবিষয়ক দ্বিতীয় গ্রন্থ নজরুল জীবন ও সাহিত্য (১৯৪৮) দেশভাগের পর প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে। অসুস্থ হওয়ার পরই পূর্ববাংলায় নজরুলকে নিয়ে প্রথম গ্রন্থ প্রকাশনা শুরু।

অবশ্য পূর্ববাংলায় নজরুলের গান প্রথম থেকেই অনেক বাড়িতে গাওয়া হতো। কিন্তু আজ এ-কথা  মানতেই হবে যে, নির্বাক নজরুলের জীবনে তাতে কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু এরপর মধ্য পঞ্চাশ থেকে পশ্চিমবাংলার সর্বত্র নজরুলের গানের পুনরুজ্জীবন ঘটে। নজরুলের ঘনিষ্ঠ নজরুল গানের প্রধান শিল্পীরা অধিকাংশই কলকাতায় থাকায় তাঁদের কণ্ঠের নজরুলসংগীত পুনরায় দুই বাংলার শ্রোতাদের কাছে সহজেই পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়। কবির কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া, রাধারানী দেবী, দীপালী তালুকদার, পদ্মরানী চট্টোপাধ্যায়, গীতা বসু, ইলা ঘোষ, সুপ্রভা সরকার, প্রতিভা বসু (সোম), হরিমতী, যুথিকা রায়, কানন দেবী, শৈল দেবী ও পারুল সেনসহ সকলেই পশ্চিম বাংলায়ই নিয়মিত নজরুলের গান তখন পরিবেশন করে গেছেন। পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন কমল দাশগুপ্ত, শচীন দেববর্মণ, মৃণালকান্তি ঘোষ, কে মল্লিক, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন রায়, গিরিন চক্রবর্তী, বরদা গুপ্ত, বীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, জগন্ময় মিত্র, জগৎ ঘটক, নিতাই ঘটক, রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়সহ অসংখ্য শিল্পী। শিল্পী কমল দাশগুপ্ত, ফিরোজা বেগম ও আববাসউদ্দীন পরে ঢাকায় চলে গেলেও নজরুল-গানের প্রচারে ছিলেন বিরামহীন।

এছাড়া নজরুলের গানে যাঁরা সুর দিয়েছিলেন কবির অনুমোদিত সেইসব সুরকারের মধ্যে নিতাই ঘটক, চিত্ত রায়, গিরিন চক্রবর্তী, ধীরেন দাস, কে মল্লিক, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়, দুর্গা সেন, সুরেশ চক্রবর্তী, জগন্ময় মিত্র, বিজনবালা ঘোষ, তুলসী লাহিড়ী, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞান দত্ত, মৃণালকান্তি ঘোষ, রাইচাঁদ বড়াল, হিমাংশু দত্ত, অনিল বাগচী, গোপেন মল্লিক, সত্য চৌধুরী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজ মল্লিকসহ প্রায় সকলেই দেশভাগের পরে পশ্চিমবঙ্গেই নজরুল-গানের চর্চা ও প্রসারের কাজে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

পরে ষাটের দশকে সুশীল চট্টোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ধীরেন বসু, পূরবী দত্ত, সরোজ দত্ত, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, অধীর বাগচী, নীতিশ দত্তরায়, অরুণ দত্ত, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিমান মুখোপাধ্যায়, অনুপকুমার ঘোষাল, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার মিত্র, শঙ্করলাল মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক নবীন প্রতিভাধর শিল্পীর কণ্ঠে নজরুলের গান রেকর্ডে ও সিডিতে এবং অসংখ্য গানের অনুষ্ঠানে নিয়মিত পরিবেশিত হয়ে এসেছে। সেগুলো আজো জনপ্রিয়।

কবির প্রয়াণের আগেই নজরুলের অসংখ্য গানের স্বরলিপিও তৈরি করেছেন পশ্চিমবঙ্গে কবির সহযোগী শিল্পীরা। এঁরা মূলত গ্রামোফোনে কবির সহযোগী ও আস্থাভাজন ছিলেন।

কিন্তু ২০১৩ সালেও কেউ কেউ লিখেছেন – ১) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুল গবেষণা ও প্রকাশনা একেবারে নেই বলা চলে। ২) কলকাতায় গড়ে ওঠেনি কোনো নজরুল চর্চা কেন্দ্র। ৩) নজরুল একাডেমী (চুরুলিয়া) ১৯৮০ সাল থেকে নজরুল পদক প্রবর্তন করেছে। সম্ভবত এ-বিষয়ে ভালো করে খোঁজখবর না নেওয়ার ফলে এই বিভ্রান্তিমূলক তথ্য তাঁদের প্রকাশিত রচনায় স্থান পেয়েছে। সামান্য সতর্ক হলেই এই বিভ্রান্তির দায় এড়ানো যেত।

সকলের জ্ঞাতার্থে জানাই, শতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল রচনা স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে স্থান পেয়ে এসেছে।

নজরুলের গান বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে পৃথক বিষয় হিসেবে গৃহীত এবং বহু ছাত্রছাত্রী নজরুল প্রতিভার বিভিন্ন দিক নিয়ে অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং আজো একাধিক গবেষক নানা স্থানে গবেষণারত। নজরুলের নামাঙ্কিত প্রেক্ষাগৃহও স্থাপিত হয়েছে বহু জায়গায়। এছাড়া সম্প্রতি পশ্চিমবাংলায় সরকারি উদ্যোগে গঠিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ কাজী নজরুল আকাদেমি (২০১১)। কলকাতায় রাজারহাটে নির্মিত হচ্ছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আকাদেমির নিজস্ব বিশাল ভবন ‘নজরুল তীর্থ’। প্রায় চার একর জমির ওপর ছয়টি লেনযুক্ত রাজপথের পাশে একদিকে গড়ে উঠেছে নজরুলের নামাঙ্কিত এই আকাদেমি, যেখানে তিনটি প্রেক্ষাগৃহসহ গবেষণাকক্ষ, অতিথিনিবাস, লাইব্রেরি, সংগ্রহশালা, বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে আগত নজরুল গবেষক ও অনুরাগীদের সেখানে গেলে থাকার ব্যবস্থা। নিয়মিত সেখানে নজরুলবিষয়ক ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা, সংগীতের আসর, দেশ-বিদেশে নজরুল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও ভাববিনিময় ইত্যাদি ব্যবস্থা হওয়ার কথা। ২০১৫ সালে সেখানে নজরুল তীর্থ উন্মোচনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছে। সরকারি স্তরে আগেই পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কবির জন্মশতবর্ষ থেকেই নজরুল গবেষক ও নজরুলবিষয়ক অবদানের জন্যে নজরুল পুরস্কার প্রবর্তন করেছেন। এর আগে ১৯৮০ সাল থেকেই চুরুলিয়ার নজরুল অ্যাকাডেমি নিয়মিত ভারত ও বাংলাদেশের নজরুল গবেষক ও গায়ক বা শিল্পীদের নজরুল পুরস্কার (পদক নয়) প্রদান করে চলেছে। কবিপক্ষে গত চল্লিশ বছর ধরেই কবিতীর্থ চুরুলিয়ায় প্রমীলা মঞ্চে প্রতিবছর নজরুলের সাহিত্য, কবিতা ও গান নিয়ে সেমিনার, সংগীত ও নৃত্য, গীতিনাট্য, নাটক পরিবেশিত হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে গ্রাম্য মেলা, কবিগান, লেটোগান সেখানে শোনার সৌভাগ্য হয়। আনা হচ্ছে নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত বক্তা, গবেষক ও শিল্পীদেরও। পশ্চিমবঙ্গে নজরুলকে স্মরণে রেখে পঞ্চাশের দশকেই গঠিত হয় কবির জন্মভিটেয় চুরুলিয়ায় ১) নজরুল একাডেমী (১৯৫৮); ২) পশ্চিমবঙ্গ নজরুল জন্মজয়ন্তী কমিটি (১৯৬২) (সভাপতি : ব্রজকান্ত গুহ); ৩) পশ্চিমবঙ্গ নজরুল অ্যাকাডেমির (১৯৬৬) (উদ্বোধক মুজফ্ফর আহমদ); ৪) অগ্নিবীণা (সম্পাদক : কাজী সব্যসাচী); ৫) নজরুল ফাউন্ডেশন (রমলা চক্রবর্তী); ৬) নজরুল চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র বরদা গুপ্ত ৭) নব অগ্নিবীণা (সভাপতি : কল্পতরু সেনগুপ্ত); ৮) রূপমঞ্জরী (সভাপতি : ধীরেন বসু); ৯) নজরুল ফাউন্ডেশন (সম্পাদক : মজহারুল ইসলাম); ১০) নজরুল সংস্কৃতি পরিষদ (১৯৯৯) (সভাপতি : ড. অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়)সহ একাধিক নজরুলচর্চা কেন্দ্র যা আজো সক্রিয়।

পশ্চিমবঙ্গে এইসব কর্মকান্ড ও নজরুলচর্চার সুফল দুশো পঞ্চাশটি নজরুলবিষয়ক গ্রন্থের প্রকাশ। রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে সকল নজরুলবিষয়ক গবেষণাকর্মের জন্য একাধিক পিএইচ.ডিপ্রাপ্ত গবেষকদল। রয়েছে অসংখ্য নজরুলগীতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি অর্থানুকূল্য থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে শতবর্ষে বিলম্বে হলেও প্রকাশিত হয়েছে সাত খন্ডে কাজী নজরুল রচনাসমগ্র, যাকে বলা হয়ে থাকে সর্বাধুনিক রচনাসমগ্র। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ৯৫ শতাংশ গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে বেসরকারি প্রকাশনার মাধ্যমে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সৌভাগ্যবান। ফলে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের চর্চা ও জিজ্ঞাসা সেখানে অন্তহীন। সেই গৌরব সেখানে নজরুল-অনুরাগী সামজের অবশ্যই প্রাপ্য।

বিশ্বমানবতার কবি নজরুল এদেশে জন্মেছেন বলে যেমন এপার বাংলার নন, তেমনি সেখানে যে-ভূমিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি, শুধু সেখানকারও নন। তিনি সমগ্র মানবজাতির আত্মীয়, আপনজন। কোনো সংকীর্ণতার তিনি শিকার ছিলেন না। তাই তাঁর চর্চা ও অনুসন্ধান সর্বত্রই হওয়া উচিত। ভালোবাসার তালিকায় কম-বেশির হিসাব-নিকাশ নাইবা রইল! বরং চলুক নিরন্তর ভাববিনিময় আর কবির বিষয়ে নিত্যনব পারস্পরিক সাফল্য ও জিজ্ঞাসার অন্তহীন ভাবনাবিনিময়। অভিমান বা অভিযোগ সেই ভালোবাসার কাননে নেহায়েতই অনুপ্রবেশকারী মাত্র।

পরিশেষে কবির গানের কথায় শুধু বলতে হয় –

একটি কথা কয়ে যেয়ো, একটি নমস্কার,

সেই কথাটি গানের সুরে গাইব বারেবার

হাত ধরে মোর বন্ধু ভুলো একটু মনের ভুল \

(গানের মালা, কাজী নজরুল ইসলাম, আশ্বিন ১৩৪১)

সোশ্যাল মিডিয়া