নজরুল ও হুইটম্যান

লেখক:

সনৎকুমার সাহা

বিদ্রোহী’ কবিতা পড়বার সময়ে, অথবা অন্যমনস্ক হয়ে শোনার সময়েও, একটা কথা চকিতের জন্যে মনে ঝিলিক দিয়ে যায় : নজরুল কি হুইটম্যান পড়েছিলেন? ওপর ওপর মনে হতে পারে, নেহাতই ফালতু চিন্তার বেয়াড়া মাতলামি। কোথায় নজরুল, আর কোথায় হুইটম্যান! একজন উনিশ শতকের নামী মার্কিন কবি। প্রতিবাদী বটে। প্রতিষ্ঠানের সুনজরও সবসময় পাননি। তবু খ্যাতিমান। বিশ শতকের প্রথম দিকে বিশ্বযুদ্ধ আর রুশ বিপ্লবের পটভূমিকায় বেশ  প্রাসঙ্গিক। কিংবদন্তিই এরকম। অবশ্য মার্কিন মুলুক তখন অনেক দূর। সেখানকার শিল্পসাহিত্য আমাদের মনে সরাসরি সাড়া জাগায় না। অর্থবিত্তের প্রাচুর্যই মোহিত করে বেশি। গায়ের জোরের পরিচয়ও তাদের পেতে শুরু করেছি। আমাদের শিক্ষিত ভদ্রজনদের অবসরের গালগল্পে মাঝে মাঝে বিষয়গুলো উঠে আসে। তবে বিশ্বচিন্তার ভরকেন্দ্র থেকে যায় য়োরোপে; আর ভাগ্যের গাঁটছড়া বাঁধা থাকে ইংরেজদের সঙ্গে। তারই সূত্র ধরে পাশ্চাত্যে সাহিত্য-শিল্পকলার সুলুক সন্ধান। তাতে ওয়াল্ট হুইটম্যান, ওই ইংরেজি ভাষার পিঠে চেপেই, উন্নাসিক বিদগ্ধজনদের ইতস্তত দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকলেও থাকতে  পারেন। কিছুদিন পর বাংলা কবিতার পালাবদলে এলিয়ট আমাদের সারথি হয়েছিলেন। মূলত মার্কিন হলেও তিনি ইংরেজি কবিতারই নেতৃত্ব দেন। এবং তাঁর কাব্যভাষার ঐতিহ্যচেতনা গভীরভাবে য়োরোপমুখী। হুইটম্যানের কবিতায় স্থান ও কালের মাত্রায় আবেগের প্রত্যক্ষতার অভিঘাত থেকে তা যোজন-যোজন দূর।

এদিকে নজরুলের বেড়ে ওঠা নেহাতই স্রোতের শ্যাওলার মতো। বাংলার বর্ধমানে অখ্যাত গ্রামে জন্ম। অল্প বয়সে পিতৃহারা। পারিবারিক স্নেহবঞ্চিত, নিয়মিত অভিভাবকহীন অনাদরে বেড়ে ওঠা। টুকটাক পড়াশোনা; পাশাপাশি বাবুর্চিগিরি, হাটে-বাজারে ফাই-ফরমাশ খাটা – রুটির দোকানে চাকরি, কখনো বর্ধমানে, কখনো বা  ময়মনসিং-ত্রিশাল-দরিরামপুরে; – আবার রানিগঞ্জে ফিরে আসা, স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি হওয়া, কিন্তু পড়াশোনায় নজর কাড়া সত্ত্বেও ১৯১৭-য় আঠারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তড়িঘড়ি গজিয়ে ওঠা বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে নওশেরায় ছোটখাটো শিক্ষানবিশি শেষে দুবছরের মতো একটানা করাচির সেনাছাউনিতে যুদ্ধে প্রস্ত্ততি নিয়ে থাকা। এদিকে বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯১৮-তে। কিন্তু অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা সেনাছাউনি ভেঙে ফেলতে কেটে যায় আরো বেশ কিছু সময়। ১৯২০-এর জানুয়ারিতে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়। পল্টন আনুষ্ঠানিকভাবে লুপ্ত হয় মার্চে। তাঁর জীবনও কলকাতাতে স্থিতি পায়। তার আগে করাচি থেকে পাঠানো তাঁর দু-একটা লেখা কলকাতার কাগজে ছাপা হয়েছে। উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। কিন্তু এখন কবি বলেই তাঁর পরিচয়। এবং তা শুষে নিয়েছিল ওই সময়ের সমাজ-রাজনীতির কেন্দ্রীভূত আবেগের সারাৎসারকে। ১৯২১-এ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা দিয়ে তাঁর অপ্রত্যাশিত বিস্ময়কর উত্থান। এক বছর পর বই হয়ে বেরোয় অগ্নিবীণা। ‘বিদ্রোহী’ তার প্রধান কবিতা। এটা ঠিক, অযত্নে আগাছার মতো বড় হলেও তাঁর স্বাভাবিক স্ফূর্তি তাতে দমেনি। লেটোর দলে গান লিখেছেন। যাত্রাদলে গান শুনেছেন। লোকজ-বাহনে পুরাণকথা আত্মস্থ করেছেন। পাশাপাশি কৈশোরেই মসজিদে করেছেন ইমামতি। মাজার শরিফে খাদেমগিরি। চলমান গণজীবনে মিশে গেছেন অনায়াসে। প্রাণের ঐশ্বর্য এবং বেহিসেবি-অতিপ্লাবী প্রাচুর্য তাঁকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে। তিনি পরোয়া করেননি। প্রকৃতির সহজ উৎসারণে লাগাম টানেননি। জাতি-ধর্ম-বর্ণের বৈচিত্র্য – সব তিনি নিজের করে নিয়েছেন। যুক্তি-অযুক্তি-অবাধ্যতা-সংস্কার, কিছুই বাদ যায়নি। মানুষ যেমন-যেমন, – দোষে-গুণে আলাদা-আলাদা নয়, ভালো-মন্দ সবমিলে, – ঠিক তেমন-তেমন আপনার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন। হয়তো সজ্ঞানে চিন্তা করে নয়, তাঁর ভেতরের অনিরুদ্ধ প্রবল উচ্ছ্বাসেই। তাঁর ব্যক্তিসত্তা তাতে অনেক বেশি স্বাধিকারী হয়ে উঠেছে। ভেতরের প্রতিভা আত্মসঞ্জাত। তাহলেও তাঁর ব্যবহারের গতিপ্রকৃতির ওপর ছাপ ফেলে দেশ-কাল। সেই অনুপাতে তিনি স্বয়ংসিদ্ধ নন। এবং বাইরের প্ররোচনার, অথবা প্রণোদনার, কথা ওঠে সেখানেই।

একটু খেয়াল করলেই ধরা পড়ে, আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে অনায়াস সম্পর্ক ছিল তাঁর। লালন-গগনের ধারায় হতে পারতেন তিনি কোনো নাম-গোত্রহীন কীর্তিমান বাউল, অথবা কোনো আসর-মাতানো কবিয়াল; যাত্রাদলেও ভিড়ে পড়তে পারতেন তিনি। তারিফও নিশ্চয় জুটত তাঁর। কিছুই বেমানান হতো না। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে টেনে নিয়ে গেল পল্টনে। বড় শহরের নাগরিক বেষ্টনীতে তার ভেতরেও বিশেষ এক পাঁচমিশেলি জীবনযাত্রায়। সেখান থেকেই  দু-চারটে অক্ষম নাগরিক-কবিতা রচনায় হাতেখড়ি। লোককবি হওয়ার সম্ভাবনারও সেইখানে ইতি। যদিও ঐতিহ্যের স্মৃতি তাঁকে রসদ জুগিয়ে চলেছে বরাবর। একথা ঠিক পল্টনে থাকাকালেই কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকায় তিনি লেখা পাঠান। তা ছাপাও হয়। সেই সূত্রে ওই পত্রিকার সঙ্গে তখন সংশ্লিষ্ট কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে তাঁর চিঠিতে যোগাযোগ। তাঁর লেখা মুজফ্ফর আহমদকে আকৃষ্ট করেছিল; এবং তিনিই নজরুলকে কলকাতায় ফিরে পুরোপুরি সাহিত্যে আত্মনিয়োগে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু তখনো নজরুল নিতান্তই  অপরিচিত একটি নাম। তাঁর লেখা কোথাও কোনো সাড়া জাগায়নি। বিশেষ সাহিত্যগুণ তাঁর ফোটেনি। আবেগের উচ্ছ্বাস মাত্রাতিরিক্ত বেশি। রচনা তাতে টাল খায়। সোজা হয়ে দাঁড়ায় না। বিষয়-বিষয়ী ঐক্য-সামঞ্জস্যের দিকে তা যায় না। যাওয়ার চেষ্টাও ঠিক চোখে পড়ে না। তখনো তিনি অপরিণত। সম্ভাবনার আভাসটুকুই শুধু আন্দাজ করা যায়। প্রতিভার পরিমাপ তাতে মেলে না।

তবে তা মিলতে খুব দেরিও হয় না। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আচমকা বিস্ফোরণ এক প্রবল ঝাঁকুনিতে গণচিত্তে তুফান তুলে তাকে দিগ্বিদিকে পরিব্যাপ্ত করে। ১৯২১-এর ডিসেম্বরে লেখা এই কবিতা। কলকাতায় ফেরার পর দু-বছরও তাঁর কাটেনি। এমনি সময়ে তাঁর চৈতন্যের আকাশে আকর্ষণে-বিকর্ষণে সঞ্চিত ও সঞ্চরমান বহুমুখী শক্তিপুঞ্জের বিরল সমীকরণ এক ঘটে যায়। জন্ম নেয় অবাক করা অসামান্য এই কবিতা। সুপরিমিত সর্বাঙ্গসুন্দর বলে নয়; মানবসত্তার মৌল আকুতির পরিপূর্ণ উচ্চারণ নির্দ্বিধায় উৎসারিত হয়েছে বলে। মোসলেম ভারত পত্রিকা কবিতাটি ছাপার জন্যে নিলেও তা মুদ্রিত-পুনর্মুদ্রিত হয় একাধিক অন্য কাগজে। এই একটি কবিতাই তাঁকে কিংবদন্তির নায়ক করে তোলে। যদিও তার আগে কলকাতাবাসের সময়টুকু তাঁর নিষ্ফলা যায় না। ‘আগমনী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘খেয়াপারের তরণী’ এইসব কবিতা তাঁর এর ভেতরে ছেপে বেরোয়। পাঠকপ্রিয়তাও পায়। তার প্রধান  কারণ তাদের সমকালীনতা ও প্রতিবাদমুখরতা। সাম্রাজ্যবাদী অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। এবং সেখানে পূর্বাপর যৌক্তিক বিবেচনার চেয়ে আবেগই বেশি ক্রিয়াশীল। সেইসঙ্গে যোগ হয় এমন একটা দেখার ধরন, যা অনেক সহজ ও খোলামেলা। মনে হয়, দূরবিদেশে পল্টন জীবনের অভিজ্ঞতা এখানে তার ছায়া ফেলে। নতুন স্বাদ একটা যোগ হয় তাঁর রচনায়। তার চাহিদাও একটা তৈরি হয়। তবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মহাপ্লাবনের মতো একতোড়ে সব বাঁধ ভেঙে ফেলে। পরপর যেন একই ঘোরে লিখে চলেন ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘ধূমকেতু’। রবীন্দ্রনাথও তাদের মুক্তকণ্ঠে উৎসাহ জোগান। এইসব কবিতা নিয়েই ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় অগ্নিবীণা। ঔপনিবেশিক শাসন তাকে বাজেয়াপ্ত করে। তাঁরও জনপ্রিয়তা এতে বাড়ে বই কমে না। আজ পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, নজরুলের কবিত্ব প্রতিভার বুঝি সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছিল ওই সময়েই। তাঁর সৃষ্টিশীলতা আর ওই জায়গায় ধরে রাখা যায়নি। কালের রাখাল হয়ে একই রকম ভাবনার তিনি পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন। কবিতাও শিথিলবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সৃষ্টিক্ষম শেষ ১০ বছরের মতো কালপর্বে অবশ্য তিনি গানের দিকেই বেশি ঝুঁকেছেন। অসাধারণ সাফল্যও তাতে জুটেছে। কিন্তু নিজেকে নিজে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাওয়া, এটা কি আর ঘটেছে?

এখন যদি নিরাসক্ত মন নিয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবি, তবে তেমন আলোচিত নয়, একটা বিষয়, মনে হয়, আরো একটু গুরুত্বের দাবি নিয়ে সামনে চলে আসে। এটা তাঁর জীবনের পল্টনপর্ব। ওই সময়ে যাঁরা সেনাদলে নাম লিখিয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই ছিলেন ভাগ্যান্বেষী। কিন্তু মোটামুটি লেখাপড়া জানা। আপৎকালীন অবস্থায় অন্যান্য দেশেও এমন ঘটে। বিশেষ করে দুই মহাযুদ্ধের কেন্দ্রভূমি য়োরোপে। অনেক কবি-মনীষার রয়েছে সেখানে যুদ্ধের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। সেইসঙ্গে জীবনের অসহায়তা, করুণা ও ক্ষণিকতা মুখোমুখি দেখার ও বোঝার। নজরুলের প্রায় সমবয়সী ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েন (১৮৯৩-১৯১৮) ওই প্রথম মহাযুদ্ধেই, তার অবসানের ঠিক পূর্বমুহূর্তে, মারা যান। তাঁর অপ্রকাশিত কবিতা সংকলনের ভূমিকায় তিনি লিখে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ‘ – My subject is war and the pity of war, the Poetry is in the pity’। আগের শতকে টলস্টয় তাঁর War and Peace-এ মুখোমুখি হয়েছিলেন জীবনভাবনার এই মৌল বাস্তবতার। নজরুল পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। রণাঙ্গনেও যাননি। কিন্তু তাঁরই মতো অপেশাদার লেখাপড়া জানা সৈনিকদের ছাউনিতে কাটিয়ে এসেছেন প্রায় তিন বছর। মহাযুদ্ধের মানবিক অভিঘাত তিনিও নিশ্চয় টের পেয়েছেন। তাঁর মতো অনুভূতিপ্রবণ আবেগতাড়িত মানুষের একটু বেশিই পাওয়ার কথা। সেইসঙ্গে মৃত্যুকে সামনে রেখে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের অকিঞ্চিৎকরতাও হয়তো তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। যখন তিনি ফিরে আসেন, এদের অনুসরণ সম্ভবত তখনো তাঁর মাথায় থামেনি। অনিত্যতার ও অস্থিরতার তাড়নাও নিশ্চয় জোরদার হয়েছে। আরো একটা সংযোগ তখন ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। করাচিতে থাকায় অনেকটা আরবি-ফারসি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের প্রান্তসীমায় ছিল তাঁর বসবাস। সমকালীন ঘটনার সামাজিক রাজনৈতিক অাঁচও তাঁর মনে দাগ কাটে। অগ্নিবীণার বেশ কটি কবিতায় তার ছাপ আছে। পরে তিনি হাফিজ ও ওমর খৈয়াম অনুবাদ করেন। লেগে থেকে ফারসি শেখেন তিনি করাচিতেই। তবে তাঁর ভাবজগতে আরো বেশি আলোড়ন তোলে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। বৈষম্যহীন সমাজের যুক্তিসিদ্ধ নয়, আবেগঋদ্ধ আবেদনে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেন। তাঁর ব্যক্তিস্বভাবের গড়নের সঙ্গেও তা খাপ খায়।

অনুমান করা যায়, এর বাইরেও ছিল সাহিত্য-শিল্পে আগ্রহী অন্তত কিছু মানুষের আনাগোনা, তাঁদের কারো কারো সঙ্গে জানাশোনা ভাববিনিময় – হতে পারে তা বাংলার অথবা এমনকি বাইরের। পাশ্চাত্যে সাহিত্যিক আবহাওয়ার খবরাখবর এভাবে এসে যাওয়াও বিচিত্র নয়। করাচি বন্দরনগরী। সেখানে আসে দূর-দূরান্তের নাবিকেরা, আসে যুদ্ধের ডামাডোলে ইঙ্গ-মার্কিন নৌসেনারা। কবিতাপাঠের অভ্যাস নিশ্চয় ছিল তাদের কারো-কারো। অন্য নানা বন্দরের গল্পকথা থেকে জানা যায়, হুইটম্যান-ভক্তও ছিল তাদের কেউ কেউ। এমন কারো সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়েছিল কি না জানি না। তবে তার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি তিনি হুইটম্যান খুঁটিয়ে নাও পড়ে থাকেন, তবু তাঁর কবিতার ভাবনা-কল্পনার বিষয় যে তাঁর কানে পৌঁছায়নি, এটা জোর দিয়ে বলা যায় না। আর প্রতিভাবান কোনো কবিকে প্রেরণা জোগাতে অন্য কারো কীর্তির বা ব্যক্তিকথার সবকিছু নয়, এককণা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। বাকিটা তাঁর বস্ত্তভূমি; আর তাঁর ভাবনা-কল্পনা। তারপরেও সে-সময়ে হুইটম্যান যদি নজরুলের কাছে পুরোপুরি অচেনা থেকে যান, তাহলেও মেনে নিতে হয় বাস্তবের প্ররোচনা। স্থানকালের বিভিন্নতা সত্ত্বেও ঘটনারাশির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজনের ভেতর সমজাতীয় ভাবনার পরিমন্ডল সৃষ্টি করতে পারে। কোনো সাধারণ তত্ত্ব এটা নয়। তবে অসম্ভবও নয়। এমনটি মনে রেখেও নজরুল পড়তে গিয়ে, বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, হুইটম্যানের কথা ভাবা যায়। তবে তার আগে মার্কিন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে দুটো কথা জেনে নিলে বোধহয় সুবিধা হয়। নজরুলের দিক থেকেও এটুকু বলে রাখা ভালো, অন্তত ১৯২৬-এ হুইটম্যান তাঁর অজানা ছিলেন না। ইতস্তত চিঠিপত্রে তাঁকে তিনি ‘ঋষি’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অবশ্যই এতে আতিশয্য আছে। তবে সমাজ-সচেতন বাঙালি সাহিত্যিক মহলে তিনি তখন বেশ পরিচিতই। জনপ্রিয়ও। বোঝা যায় তা কিছু পরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ওপর তাঁর প্রভাব থেকে। এসবই কিন্তু নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ রচনার পরের ঘটনা।

 

দুই

হুইটম্যানের জন্ম ১৮১৯ সালে, নিউইয়র্কের পাশে ওয়েস্টহিলস নামে এক গ্রামে। বাবার নামও ওয়াল্ট হুইটম্যান। কাঠমিস্ত্রি ছিলেন তিনি। ছোটখাটো আবাসন ব্যবসাও ছিল তাঁর। তবে বড়লোক হতে পারেননি। ওই সময়ে তেমন অবস্থা থেকে বড়লোক হওয়ার ফিচলেমি তাঁর জানা ছিল না। জানা ছিল না ছেলেরও, যিনি পরে কবি হয়ে বিশ্বখ্যাতি কুড়োবেন, কিন্তু অভাব-অনটনের স্থায়ী সুরাহা কিছু করে যেতে পারবেন না। অনেকে বলেন, টাকা কামানোর দিকে তাঁর আদৌ মন ছিল না। পুঁজি খাটিয়ে বড়লোক হতে গেলে যে অন্যের শ্রমের লভ্যাংশ নিজের করে নিতে হয়, এটা তিনি অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেননি। আবার প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উদ্যোগ যে ন্যায়সংগত, এটাও অস্বীকার করতে পারেননি। দোটানায় অব্যবস্থিতচিত্তই ছিলেন; যদিও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ও মানবিক সহমর্মিতায় খাদ ছিল না এতটুকু। এর অনেকটাই তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া। আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ১৭৭৬ ছিল তাঁর কাছে অশেষ গৌরবের, স্বাধীনতা সংগ্রাম, তাঁর  প্রেরণার  উৎস এবং থমাস জেফারসন ও থমাস পেইনের তিনি ছিলেন অনুরাগী অনুসারী। ফরাসি বিপ্লবে মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের মতো আমেরিকার সংবিধানে অধিকার সংরক্ষণ আইনের (Bill of rights, 1789) প্রতিও তাঁর ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন।

যদিও কয়েমি স্বার্থের সঙ্গে আপস করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তখন দাস প্রথার বিলোপ ঘটানো থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হয়। এর জন্যে অপেক্ষা করতে হয় এক গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-৬৫)।

তখন বাবা হুইটম্যান আর নেই। ছেলে হুইটম্যানের কবিতায় তার মশাল অনির্বাণ জ্বলে। সব মানুষের সমান অধিকারের কথা তিনি অসংকোচে শুনিয়ে চলেন। গৃহযুদ্ধের অবসানে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। তবে মার্কিন মুলুকে বর্ণবৈষম্য আইনসিদ্ধভাবে ও সামাজিকভাবে দূর হতে লেগে যায় আরো ১০০ বছর। কবি হুইটম্যান তার অনেক আগেই গত।  ১৮৯২ সালে। নজরুলের তখনো জন্মই হয়নি। তবু পরে তাঁর পল্টন জীবনকালে তিনি প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। আমেরিকার সীমা পেরিয়ে গোটা পৃথিবীজুড়েই। মহাযুদ্ধে চারদিকে টালমাটাল অবস্থা। ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে জীবন কী ও কেন – এ-প্রশ্ন সরাসরি সব জায়গাতেই মানুষের চেতনাকে বারবার আঘাত হেনে ক্ষতবিক্ষত করে। হুইটম্যানের আবেগঋদ্ধ মানবিক উচ্চারণ তখন প্রাণে উন্মাদনা জাগায়। অবশ্য মানতেই হয়, যুদ্ধের ও তার পরের  ‘নিত্য-নিঠুর-দ্বন্দ্ব’, ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পৃথিবীজুড়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিরুপায় সংকট, আবার মহারণের হুংকার এইসব মানুষকে ক্রমাগত হতাশায়, নির্বেদে ও জটিলতার দুর্মীমাংসেয় পারস্পরিক সম্পর্করাশির জটাজালে জড়িয়ে ফেলতে থাকে। তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে কবিতাতেও। ভাবনায়, রূপকল্পনায় ও ভঙ্গিমায় তা ধরা পড়ে। মানবচৈতন্যের মানচিত্র বদলে যায়। বদলে যায় কবিতাও। তবে প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালেও সাধারণভাবে আবেগের চেহারা আগের জায়গা থেকে খুব একটা  পালটায়নি। হুইটম্যান আগের মতোই সাড়া জাগান। এদিকে এখানকার ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় তার দিকে আগ্রহী দৃষ্টি পড়ে। হয়তো তখনই প্রথম।

উনিশ শতকের প্রথমভাগে য়োরোপে রোমান্টিক আন্দোলন পূর্ণতা পায়। তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য – একমাত্র নয় – অমিত সম্ভাবনা নিয়ে ব্যক্তির আত্মঘোষণা। তার পেছনে ছিল যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে ফরাসি বিপ্লব ও ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লব।  ফরাসি বিপ্লবের পর মানবাধিকার সনদের ঘোষণা একরকম ধর্মীয় ও সামন্ততান্ত্রিক বাধা থেকে ব্যক্তির মুক্তির স্বীকৃতি। সাহিত্যে ও শিল্পকলায় তার প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ে তাৎক্ষণিক। সবটাই তার কল্যাণকর ছিল না। কিন্তু ব্যক্তির সম্ভাবনার সঙ্গে সমষ্টির কল্যাণভাবনাও জড়িয়েছিল। এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানের অভিযান তার পেছনে প্রায় ২০০ বছর ধরে কর্মক্ষেত্র রচনা করে চলেছিল। এই আন্দোলনের ঢেউ আমেরিকাতেও লাগে। সেখানেও অতি অনুভূতিপ্রবণ ব্যক্তির চৈতন্যে আঘাত হানে। ব্যক্তির মুক্তির সঙ্গে মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা ওই ভূখন্ডেও অনেককে ভাবায়। দুইয়ের সমীকরণের পথ তাঁরা খোঁজেন। শিল্প-সাহিত্যের প্রতিনিধিদের ভেতরে মার্ক টোয়েন তাঁদের একজন। একজন ওয়াল্ট হুইটম্যানও। সক্রিয়বাদী সাংগঠনিক উদ্যোগে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া তাঁর নয়। কিন্তু বোধের মুক্তি তিনি চান। হ্যাঁ না – কিছুই  বাদ যায় না তাতে। যদিও শেষ বিচারে সব বাধা ভেঙে ফেলার আকুতিটাই বড় হয়ে ওঠে। ব্যক্তির বেলাতে। সমষ্টির বেলাতেও। দুইয়ের ভেতরে যে বিরোধ থাকতে পারে, তাঁর স্বপ্নকল্পনার রোমান্টিক উচ্ছ্বাসে তা ভেসে যায়। অন্তত প্রথমদিকে তো বটেই, উনিশ শতকের চল্লিশের বা পঞ্চাশের দশক সেটা। য়োরোপে, বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেনে, রোমান্টিক আন্দোলনে তখন ভাটার টান। সফল শিল্প-বিপ্লব, সাম্রাজ্যের বিস্তার ও তার স্থিতিশীলতায় গৌরব, এসব সেখানে শিল্প-সাহিত্যের কারিগরদের চিত্তের ঔদার্যকে ক্ষুণ্ণ করে। বৈষয়িক শ্রীবৃদ্ধির দায়িত্বটাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে-অনুপাতে অবিমিশ্র মানবিক সহমর্মিতা পিছু হটে। উনিশ শতকের গোড়ায় অতি সাধারণ মার্কিন পরিবারে কারো ছেলেবেলা যেমন কাটে, হুইটম্যানের তা থেকে আলাদা তেমন কিছু ছিল না। দু-চার বছর স্কুলে গেছেন। পড়াশোনায় ভালো করতে হবে, এমন কোনো তাগাদা কেউ দেয়নি। তাঁরও কোনো গরজ ছিল না। ১১ বছর বয়সে রোজগারের ধান্দায় বেরিয়েছেন। ঘর-সংসারে অভাব-অনটন এর মূল কারণ নয়। ওইরকমই তখন চলছিল। প্রথম কাজ পান এক আইনব্যবসার প্রতিষ্ঠানে ফাই-ফরমাস খাটা। তারপরে ঢোকেন ছাপাখানায়। একটা থেকে আরেকটায়। ১৭ বছর বয়সে গ্রামের স্কুলে মাস্টারিও করেছেন কিছুদিন। স্বভাবজাত ভাষার যে দখল ছিল তাঁর, তাতেই চলে গেছে। এর পরে কাজ জুটেছে খবরের কাগজে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাবার কাছ থেকে পাওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নিজেও বেশিদিন কোথাও খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তখন হয়ে ওঠার সময়। স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়কেরা মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছেন। স্মৃতি তাঁদের মিলিয়ে যায়নি। গণতন্ত্রকে কার্যকর রূপ দেওয়ার অনেক কিছুই বাকি। স্বপ্নে ও বাস্তবে বিরোধ বাধে প্রায়ই। আবার বাস্তবের আয়োজনে একই সঙ্গে মিশে থাকে অনিবার্যভাবে যা চাই, আর, যা চাই না, দুই-ই। বিশুদ্ধবাদী হওয়া তাই এরকম প্রায় অসম্ভবই। হুইটম্যানের মতো প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন তরুণের মনে এসবই দাগ কাটে। অস্থিরতাও তাঁর বাড়ে। এদিকে দাসপ্রথা নিয়ে বিরোধে  উত্তর ও দক্ষিণ দাঁড়িয়ে যায় মুখোমুখি। গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫) এড়ানো যায় না। হুইটম্যান তাঁর যুক্তি বুদ্ধি আবেগ সব নিয়ে দাসপ্রথার বিরোধিতায় তাঁর কলমকে সক্রিয় রাখেন। তাঁর এক ভাই যুদ্ধে যান। গৃহযুদ্ধের অবসানে ফিরে এসে ব্যবসায় নামেন। সফলও হন। তবে কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান টাকার পেছনে ছোটেননি। কষ্টে-সৃষ্টে দিন কাটে তাঁর। কবিখ্যাতি জুটেছে তাঁর জীবদ্দশাতেই। কিন্তু নিন্দাও পিছু ছাড়েনি। যারা রক্ষণশীল, আর যারা কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধি, তাদের সার্বক্ষণিক চেষ্টা ছিল তাঁকে অপাঙক্তেয় করার; ফলে কবিতা লিখে, আর কবিতার বই ছেপে, সচ্ছল হওয়া তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।

হুইটম্যান বিয়ে করেননি। তাই বলে সাত্ত্বিক প্রকৃতির তিনি ছিলেন না। প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি দুটোকেই স্বাভাবিক প্রবণতায় মেনে নিয়েছেন। জনশ্রুতি, বয়স যখন বিশের কোঠাতে, তখন বাবা হয়েছিলেন তিনি। য়োরোপীয় বংশোদ্ভূত, এক অজানা নারী তাঁর সন্তানের মা। পরে আরো অনেক নারীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। কেউ কেউ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে এসে বিয়ে করতেও আগ্রহ দেখান। তিনি রাজি হননি। অশালীন আচরণও কারো সঙ্গে করেননি। ১৮৭৩-এ তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন। আরো প্রায় ২০ বছর বাঁচেন। কবিতাও লেখেন। কিন্তু আগের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দামতা অনেকটা থিতিয়ে আসে। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে যে-কোনো মানুষের সঙ্গেই তিনি ছিলেন খোলামেলা। অন্তরঙ্গ ও আবেগপ্রবণ। কিন্তু বিশেষ কারো সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কের বাধ্যবাধকতায় তিনি জড়াতে চাননি। ব্যক্তিগত বিষয়েও বিশেষ ও নির্বিশেষের গণতান্ত্রিক মীমাংসার সঠিক সূত্র তাঁর অজানাই ছিল। আবেগের পক্ষপাতিত্ব তাঁকে কোনো পথ দেখায়নি। তাই বলে জীবনবিমুখ তিনি ছিলেন না। এবং পুরোপুরি ছিলেন ইহবাদী। সুন্দরের অনুধ্যানে, এবং তার উপভোগেও। সবচেয়ে প্রতিনিধিস্থানীয় কবিতা-সংকলন তাঁর Leaves of Grass – প্রথম প্রকাশ ১৮৫৫-তে, তারপর পরিবর্তন, পরিবর্ধন ঘটে চলেছে সংস্করণের পর সংস্করণ। প্রথম সংস্করণে ছিল ১২টি কবিতা। ১৮৬০-এ তৃতীয় সংস্করণে কবিতাসংখ্যা শতাধিক। ১৮৮২-তেও বেরোয় পূর্ণতর সংস্করণে। মাঝখানে ঘটে গেছে গৃহযুদ্ধ। কবিকে মুখোমুখি হতে হয়েছে নতুন নতুন প্রশ্নের। তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতে নিজেকে জেনেছেন, জানিয়েছেন। কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি। ব্যক্তিগত সুবিধার লোভে আপসও করেননি। রুচিবাগীশদের মামলায় কোনো কোনো কবিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। তিনি তাদের কাছে নতিস্বীকার করে ওই কবিতাগুলো তুলে নেননি। বই আর তখন বাজারে বিকোয়নি। এখন এই সংকলন যে পাওয়া যায়, সাধারণত তাঁর প্রথম কবিতা  ‘One’s-Self I Sing’ – ১৮৬৭ সালের লেখা। গৃহযুদ্ধ পেরিয়ে সংঘাতময় বাস্তবতায় মানব-মানবীর ঘনিষ্ঠতায়-সাহচর্যে তাঁর আত্মোপলব্ধি; – গোটা Leaves of Grass-এর কবিকেই যেন এ দ্ব্যর্থহীন চিনিয়ে দেয়। আমরা পড়ি –

One’s-Self I sing, a simple separate person,

Yet utter the word democratic the word En-Masse.

Of  physiology from toy to toe I sing,

Not physiognomy alone nor brain alone is worthy for

The Muse, I say the Form complete is worthier far,

The Female equally with the Male I sing.

 

The Life immense in passion, pulse and power,

Cheerful, for freest action form’d under the laws divine,

The Modern Man I sing.

 

কটি শব্দ আলাদা-আলাদা, এবং একত্রে তাঁর সত্তাকে ধরতে চায়। বৈপরীত্যের মিলন, কিন্তু পরিপূর্ণ বাস্তব। একা মানুষ – separate person, কিন্তু Democratic, En-Masse – সবার হয়ে কথা বলে। এবং তা অখন্ড ব্যক্তির, এমনকি শুধু চৈতন্যেরও নয় – nor brain alone; নারীর বন্দনা সে গায়, একইভাবে যেমন গায় পুরুষের বন্দনা। যে-জীবন immense in passion, pulse and power,  প্রকৃতির আপন বিধানে মুক্ত ও আনন্দময়, সেই বিকশিত মানুষের গান তাঁর গলায়। হুইটম্যানের এই আত্মবন্দনার প্রতিধ্বনি কি শুনি প্রায় ছয় দশক পরে এই বাংলায় পল্টনফেরত নজরুলে? এখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশের প্ররোচনায় কণ্ঠ কি তাঁর কোমলতার দিকে বাঁক নেয় গত শতকের তিরিশের দশকে? তারপরে তো তিনি নির্বাক!

বিশেষ করে যে-দুটো কবিতায় অশ্লীলতার দায়ে ১৮৮২ সালে Leaves of Grass-এর প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তার একটি ‘To a Common Prostitute’ (১৮৬০), কবিতাটির শুরু এই রকম –

Be composed – be at ease with me – I am Walt

Whitman, liberal and lusty as Nature,

Not till the sun excludes you do I exclude you,

Not till the waters refuse to glisten for you and the

leaves to rustle for you, do my words

refuse to glisten and rustle for you.

সততা ও মানবিকতার অকুণ্ঠ উচ্চারণই এখানে আমাদের মনোযোগ কাড়ে। প্রাক-গৃহযুদ্ধের আমেরিকায় প্রগতির স্বপ্নেও ছিল প্রত্যাশার রঙিন ছবি। কিন্তু যুদ্ধশেষে আরো অনেক জায়গার মতো এখানেও হয়তো শান্তি বজায় রাখার জন্যেই আপস করতে হয়। রক্ষণশীলতার লেজের ঝাপট ভালোমতোই দাগ কাটে। রেহাই পান না হুইটম্যানও। তবে তিনি ছাড় দেন না। কোনো ভন্ডামির আশ্রয় নেন না।

১৮৭১-৭২ সালের দিকে তিনি লেখেন এক অসাধারণ কবিতা, ‘The Mystic Trumpeter’। দেশে গৃহযুদ্ধের পালা শেষ। অশুভ তবু মাথা গজায়। বিস্তার তার বাইরেও। কোথাও বা তারই হিংস্র দাপট। এসবই তাঁকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করে! দগ্ধ করে। বেদনা তাঁর জ্বলন্ত লাভার মতো এই কবিতায় গলে গলে পড়ে। তিনি লেখেন –

I see the enslaved, the overthrown, the hurt, the

opprest of he whole earth,

I feel the measureless shame and humiliation of my race,

it becomes all mine

Mine too the revenges of humanity, the wrongs of ages,

baffled feuds and hatreds,

utter defeat upon me weighs – all lost – the

foe victorious…

কিন্তু হতাশাই তাঁর শেষ কথা নয়। ‘মিস্টিক ট্রাম্পেটরের’ পাগল-করা সুরে তিনি শোনেন –

O glad, exulting, culminating song!

A vigor move than earth’s is in the notes,

Marches of victory – man diserthral’d – the conqueror at last,

Hymns to the universal God from universal                                                        man – all joy!

A reborn race appears – a perfect world – all joy!

Women and men in wisdom innocence and                                                                   health – all joy!

Riotous laughing bacchanals fill’s with joy!

War, sorrow, suffering gone – the rank earth purged –

Nothing but joy left!

The ocean fill’d with joy – the atmosphere all joy!                            Joy! joy! in freedom, worship, love! joy in the ecstasy

of life!

Enough to merely be! enough to breathe!

Joy! joy! all over joy!

এই ভাব কি আমরা নজরুলের ভেতরেও ফুটে উঠতে দেখি না – বিশেষ করে ১৯২০-২৭, এই সময়ের কোনো কোনো কবিতায়? সময় যত এগিয়েছে, তত কিন্তু এর তেজ স্তিমিত হয়ে এসেছে। তাঁর আত্মমুখী প্রবণতা একটু একটু করে বেড়েছে। চারপাশের বাস্তবতা কি তাঁর চেতনায় সম্ভাবনার আগুন একবার জ্বলে উঠলেও তাতে জ্বালানির জোগান ঠিকমতো দিতে পারেনি? নিজেই তাকে তা ভিন্নরূপে মজিয়েছে? এবং আমরাও তাতে মজেছি? তাকে আমরা পেয়েছি আমাদের আটপৌরে জীবনের ধরাছোঁয়ার ভেতরেই, যদিও সুন্দর আরেকরকম বিকশিত হয় তাতেও!

তবে বিশের দশকে তখনো তাঁর মাথায় ছিল গোটা পৃথিবীর প্রেক্ষাপট। দেশে দেশে মনুষ্যত্বের ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভেতরে উত্তেজনা ছড়ায়। স্বাধীনতার স্বপ্নকেও তিনি তার সঙ্গে মেলান। সত্যাগ্রহ, খিলাফত আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম-প্রস্ত্ততি, এসবে তিনি সাড়া দেন স্বতঃস্ফূর্ত। অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনার ধার ধারেন না। ব্যক্তিগত পাওনা-গন্ডার হিসাব করেন না। তাঁর ব্যক্তিস্বরূপ বিশ্বরূপের সবটাকে গ্রাস করতে চায়। প্রবল আবেগে সমূহ অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে মাথা ঠোকেন। প্রতিবন্ধকতা যত থাক, যেমন থাক, মুক্ত-স্বাধীন-বন্ধনহীন ব্যক্তিসত্তার আবির্ভাব উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন। হুইটম্যানের আকুতি কি তাতে সংক্রমিত হয়? বিষয়টির দিকে এবার নজর দিই।

 

তিন

উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে ওয়াল্ট হুইটম্যান এক অপরিচিত নাম। তবে তখনই তাঁর টুকিটাকি ভাবনা আকার পেতে শুরু করেছে। একটা ছোট নোটবইয়ে তাদের দেখা মেলে। তাদের কিছু কিছু পরে ওইরকমই অথবা একটু-আধটু অদল-বদল করে, Leaves of Grass-এ জায়গা করে নেয়। এই নোটবইয়ের কথা ও কবিতার টুকরোগুলো থেকে ওই সময়ের হুইটম্যানকে অকৃত্রিম চেনা যায়। আমাদের চোখ আটকে যায় এই জায়গায় – ‘I never yet know how it felt to think I stood in the presence of my superior’। আরো স্পষ্ট করে তারপর জানাচ্ছেন, ‘If the presence of God were made visible immediately before me, I could not abase myself.’ এর সঙ্গে যুক্ত তাঁর ব্যক্তি-স্বাধীনতার বোধ – এই স্বাধীনতা একজনের নয়, প্রত্যেকজনের। এবং মর্যাদাও তাদের সমান। তাঁর ঈশ্বরের কল্পনির্মাণও তার সঙ্গে মিলিয়ে – ‘He has the divine grammar of all tongues, and says indifferently and alike, How are you friend? to the President in the midst of his cabinet, and Good day my brother, to Sambo among the hoes of the sugar field, and both understand him and know that his speech is right.’

রাষ্ট্রের প্রধান ও নিগ্রো ক্রীতদাস, দুইয়ের ভেতর তাঁর ঈশ্বর কোনো তফাত করেন না।

আত্মোপলব্ধির এই জায়গা থেকে ওই সময়েই তিনি লেখেন,

I am the poet of slaves and of the masters of slaves,

I am the poet of the Body and I am –

সাত বছর পর আকার পায় পুরো কবিতা ‘Song of Myself’। একেই তিনি নানাভাবে নানাদিকে ছড়ান পরে আরো কটি কবিতায়। আগে যে ‘ One’s Self I Sing’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি, তা এইরকম একটি। ‘Song of Myself’’-এ পড়ি –

I am the poet of the Body and I am the poet of    the Soul

The pleasures of heaven are with me

and the pains of hell are with me,

But first I graft and increase upon myself,

the latter I translate into a new tongue.

 

কবিতাটির শুরু এইভাবে –

I celebrate myself, and sing myself –

 

Leaves of Grass-এর আরেকটি কবিতা ‘I Sing the Body Electric’, – এতে ‘Song of Myself’-এর ধারাবাহিকতা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি স্পষ্টতর হয় তাঁর আদিম-সরল দেহাত্মবাদ। কোনো ঘোরপ্যাঁচের তিনি ধার ধারেন না। অনিরুদ্ধ উচ্ছ্বাসে ঘোষণা করেন –

The love of the body of man or woman balks                                                                account,

the body itself balks account,

That of the male is perfect, and that of the                                                           female is perfect.

আরো তিনি ছুড়ে দেন এই সাহসী প্রশ্ন –

And if the body does not do fully as much as                         the soul?

And if the body were not the soul, what is the soul?

এই সঙ্গে পড়ি নারীর দেহ-রূপের বন্দনা –

This is the female form,

A divine nimbus exhales from it from head to foot,

It attracts with fierce undeniable attraction…

এ সবই তাঁর ভেতর থেকে উঠে আসা। কোনো মলিনতা নেই। মেলান তিনি এর সঙ্গে তাঁর মানবতার বোধকে। তাঁর কল্পস্বর্গ প্রাণস্পন্দনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। যদিও শুরুতে একগন্ডুষে পান করেন বৈপরীত্যের সমগ্রতা।

এবার নজরুলের দিকে ফিরে তাকাই। অগ্নিবীণায় তাঁর যে আত্মঘোষণা, এ অনেকটাই হুইটম্যানের অনুরূপ। মনে হয়, ভেতরের তাগিদ যেন তাঁদের একইরকম। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যে তাঁর দর্পিত অগ্নিস্রাবী উচ্চারণ –

ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,

উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!

বল বীর –

চির উন্নত মম শির!

– তা আমাদের হুইটম্যানের প্রথম দিকের নোটবইয়ের ভাবনা-চিন্তার ধরনের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। বৈপরীত্যের সমাহার ছিল তাতেও, যেমন আছে ‘বিদ্রোহী’তে। ক্রীতদাসের ও ক্রীতদাসের প্রভুর, দেহের ও আত্মার, স্বর্গীয় আনন্দের ও নারকীয় যন্ত্রণার, সবার – সবকিছুর প্রকাশ দেখেন হুইটম্যান নিজের ভেতর। এই আত্মস্বরূপে বিশ্বরূপ একাকার হয়ে যায়। নিজেকে তিনি বিচ্ছিন্ন করেন না। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ও, দেখি, একদিকে বলে –

আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!

আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর,

আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার, আমি উষ্ণ চির অধীর!…

আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, আমি অবসান, নিশাবসান।

আরো বলে,

আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস

মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস।

অন্যদিকে একইরকম মন-প্রাণ ঢেলে উচ্চারণ করে –

আমি নৃত্যপাগল ছন্দ,

আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।…

আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,

আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।…

আমি অর্ফিয়ুসের বাঁশরী,…

তবে সূক্ষ্ম তফাত্ একটু আছে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ তার অন্তরের সব অবরোধ ভেঙে ফেলতে চায়, অনুভবের সব বৃন্ত ফুটিয়ে তুলতে চায়। সেখানে কোনো খাদ নেই; এবং তার উচ্চারণ অকুণ্ঠ। তবু তা ব্যক্তির সীমাতেই বাঁধা, যদিও সেই ব্যক্তি তার সব সম্ভাবনার বিস্ফোরণের শিহরণ আমাদের চিত্তে সরাসরি জাগায়। আমরা উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপি। হুইটম্যান কিন্তু ব্যক্তিকে সমগ্রের প্রেক্ষাপটে দাঁড় করান। ‘Song of Myself’-এ তিনি জানান,

My Tongue, every atom of my blood form’d

from this soil, this air,

Born here of parents born here from parents

the same, and their parents the same…

আরো বলেন, I celebrate myself to celebrate every man and woman alive…।

তবু কবিতার উপান্তে এসে নজরুল যখন বিদ্রোহের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্দেশ করেন –

মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না –

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত।

তখন তাতে হুইটম্যানের ‘I am the sworn poet of every dauntless rebel the world over…’ এই বাণীরই তরঙ্গাঘাত যেন শুনি। নজরুলের হুইটম্যান পড়া-বা-না-পড়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। চৈতন্যের গভীরে তাঁদের সংবেদনার আলো জ্বলে একইরকম। এইটুকুই যা বলবার।

আসলে মানবিক বোধের উৎসমূলে বাজে তাঁদের একই সুর। নজরুলের হৃদয়-বীণার তারে ঘা-লেগে তা জেগে ওঠে বোধহয় তাঁর পল্টনে যোগ দেওয়ার ফলেই। বহু বিচিত্র মানুষের তিনি ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। ভাবনার আকাশ তাঁর উন্মুক্ত করেছে। গোটা জগৎ যাওয়া-আসা করে সেখানে অনায়াসে। সমসাময়িক রুশ-বিপ্লব তাঁকে রোমাঞ্চিত করে। বঞ্চিত মানুষের অধিকার-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর সহজ সহমর্মিতা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এইখানেই আপনা থেকে তিনি চলে আসেন হুইটম্যানের পথে। যদিও হুইটম্যান তখন গত। ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতার মালমশলাও ছিল তাঁর ভিন্ন। তবু মানুষি আবেগে ও মানুষি প্রত্যয়ে তাঁর কণ্ঠে শুনি নজরুলের পুরোগামী বার্তা। নজরুল তার সব নাও শুনে থাকতে পারেন। কিন্তু খোলামেলা বাতাসে তাঁর ভাবনা উড়ে এসেছে নিশ্চয়। চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেখানে মানুষ – অবিভাজ্য, অপৃথকীকৃত, বৈষম্যমুক্ত মানুষ। মানব-মানবী, দুই-ই।

হুইটম্যান দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করেন, ‘The true religious genius of our race now seems to say, Beware of churches! Beware of priests!’ আরো লিখে যান –

If I build God a church it shall be a church to men and women.

If I write hymns they shall be all to men and women,

If I become a devotee, it shall be to men and women.

‘Gods’ (১৮৭০) কবিতায় উচ্চারণ করেন, ‘…perfect Comrade, …Be

then my God. … then, thou, the Ideal Man…. Be

then my God. …’। Leaves of Grass-এ ‘Song of

the Open Road’ কবিতায় তিনি সরল-অমলিন বিশ্বাসে গেয়ে ওঠেন,

Comrades, I give you my hand!

I give you my love more precious than money,

I give you myself…

নজরুলও অনুরূপ বলতে পারেন,

কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম নেশা,

ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা।

ভাঙি’ মন্দির, ভাঙি’ মসজিদ

ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত

এক মানবের একই রক্তে মেশা

কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা!

বলতে পারেন, ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছো জুয়া’। (‘জাতের বজ্জাতি’, বিষের বাঁশী, ১৯২৪) ‘কান্ডারী হুঁশিয়ারে’ শুনি তাঁর মন্ত্রঃপুত বাণী –

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কান্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।

(সর্বহারা, ১৯২৬)

‘সন্তান মোর, মা’র’ – এই ভাবনাই আরেক রূপকল্পনায় ফুটে উঠতে দেখি  হুইটম্যানেও। ‘Song of Myself’ কবিতার কথা যে বলেছি, তাতে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’সত্তাও এখানে একক মহিমায় ভাস্বর নয়, সমগ্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। জল-হাওয়া-মাটিই হলো মা, – আদিমাতা। হুইটম্যান তার কথা বলেন। নজরুলও তাই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের বিভেদ প্রত্যাখ্যান করেন দুজনেই।

নারী-ভাবনাতে দুজনের মিলের জায়গাটা চোখে পড়ার মতো। তবে প্রেক্ষাপটে ও মেজাজে তফাৎ কিছুটা থেকে যায়। নজরুল লিখেছেন –

সাম্যের গান গাই –

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোন ভেদাভেদ নাই!

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

(‘নারী’, সাম্যবাদী, ১৯২৫)

উদ্দেশ্য মহৎ। উদার সমদর্শিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ভাগাভাগির জায়গাটাও তিনি চিনিয়ে দেন, যদিও মূল্য আরোপ করেন সমান-সমান। যেমন  –

শস্যক্ষেত্র উর্বর হল পুরুষ চালাল হল,

নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।

নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে

ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। (ওই)

ছবিটা আমাদের মনে ধরে। প্রেরণাও জোগায়। তবু কর্ম-বিভাজনের সঙ্গে-সঙ্গে সমাজ-সংসারে ক্ষমতার বৈষম্যও যে ঢুকে পড়ে, বাস্তবের এই মূলকথাটা এতে আড়ালেই থেকে যায়। সদিচ্ছা দিয়ে কবির দায় হয়তো মেটে। কিন্তু বাস্তব তাতে ভোলে না। কবিকেও তার তল পর্যন্ত তাই তন্নতন্ন করে দেখতে হয়। অবশ্য শুধু ওপরতলে প্রত্যক্ষের মায়াতেই যদি সে না ভোলে তবে। প্রত্যক্ষের আবেগ হুইটম্যানেও প্রবল। তবে Leaves of Grass-এর পদাবলিতে এই বিভাজনটি নেই। তিনি যা দেখেন, তাতে তাঁর চেতনাতে এর কোনো স্থায়ী ছাপ পড়ে না।

সাম্যবাদীতে বারাঙ্গনার মানবিক অধিকারকেও নজরুল মূল্য দিতে চেয়েছেন। বলেছেন, ‘নাই হলে সতী, তবু তো তোমরা মাতা ভগিনীর জাতি’। করুণা ও সহমর্মিতাই এখানে প্রধান সুর। একৈকান্তিকতা নয়। বহু-মানুষের সমাজ-সংস্থানে দূরত্বটাই মান্য। হুইটম্যান কিন্তু এই দূরত্বের অলীকতাকেই ভাঙতে চেয়েছেন। তাঁর ‘To a Common Prostitute’ কবিতায় আমরা তা দেখেছি। বৈষয়িক ক্ষতি স্বীকারও করেছেন তার জন্যে। তবু চৈতন্যের সমতাকে সংকুচিত করেননি।

অন্যায়ের প্রতিবাদে নজরুলও ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। ওই সময়ে পরাধীন দেশে স্বাধীনতার আন্দোলনে গোপনে নয়, প্রকাশ্যে, তিনি শামিল হয়েছেন; জ্বালাময়ী ভাষায় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন; বারবার তাঁর লেখা বাজেয়াপ্ত হয়েছে; জেলে গেছেন, অত্যাচার সয়েছেন, তবু পরোয়া করেননি। তাঁর ‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল, কররে লোপাট/ রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ বেদী’ অথবা, ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল/ এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল’ – ইত্যাদি গান তাঁকে জনগণের অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষার প্রাণপুরুষ করে তুলেছে। তাঁর সত্য-আবেগের মোহিনী মায়া নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবার ভেতরে তিনি ছড়িয়েছেন। জনগণের কাছে তিনি সংস্কৃতির আকর্ষণীয় পুরুষ হয়ে উঠেছেন।

অগ্নিবীণার প্রথম কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’ (১৯২২), যদিও এর আগে লেখা কবিতাও এই বইতে আছে। এতে যখন পড়ি –

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়।

অথবা,

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!

আসছে নবীন-জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন!

তাই সে এমন কেশে বেশে

প্রলয় বয়েও আসছে হেসে

ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর।

তখন মনে হয়, হুইটম্যান যেন আগে থেকে তাঁর বীজতলা সার-মাটি দিয়ে তৈরি করে রেখে গেছেন। তাঁর  ‘One’s Self I  sing’ বা ‘The Mystic Trumpeter’-এর ভাবজগৎ এই উল্লাসেরই পটভূমি রচনা করে। আরেক কবিতা ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’তে যখন নজরুলের ‘প্রাণ হাসে,’ ‘মন হাসে’ তখন হুইটম্যানের ‘The Mystic Trumpeter’-এ ‘Nothing but joy left,’ ‘A reborn race appears – a perfect world  – all joy!’ ‘Joy! Joy! all over joy!’ – এই পদগুলো যেন স্বাগত জানাতে প্রস্ত্তত থাকে। হয়তো তা তখন নজরুলের অজ্ঞাতেই।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার