নারীতে-নারীতে সখ্য : প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যে

লেখক:

পূরবী বসু

ইদানীং বেশ কয়েকজন অভিবাসী (প্রধানত উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে) নারীর কিংবা তাঁদের কন্যাদের, অথবা যাঁরা স্বদেশে বসেই লেখেন অথচ যাঁদের মাতৃভাষা মূলত ইংরেজি নয় তেমন কিছু নারীর, ইংরেজি ভাষায় লিখিত উপন্যাস জগৎজুড়ে নাম করেছে। এঁদের মধ্যে কয়েকজন : (মূল ভারত) অনিতা দেশাই, কিরণ দেশাই, থ্রিটি উম্রিগর, অরুন্ধতী রায়, চিত্রা ব্যানার্জি দেবাকরুনী, ঝুম্পা লাহিড়ী, অনিতা রাও বাদামী, অমূল্য মাল্লাদী, ভারতী ব্যানার্জি; (মূল বাংলাদেশ) মনিকা আলী; (মূল হাইতি) এডউইজ ডান্টিক্যাট (Edwidge Danticat); (মূল নাইজেরিয়া) চিমামন্ডা এনগোজি আদিচি (Chimamanda Ngozi Adichie); (মূল চীন) এমি ট্যান। এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বুকার পুরস্কার থেকে শুরু করে পুলিৎজার পুরস্কার পর্যন্ত অসংখ্য আরাধ্য পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন।
আজ আমি এরকম দুজন লেখকের দুটি উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করব, যে-দুখানি উপন্যাস প্রকাশলগ্নে বছরের সেরা উপন্যাসগুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত হয়েছিল আমেরিকায়। বাণিজ্যিক দিক থেকেও খুবই সফল এ-দুটি গ্রন্থ। এর একটির লেখক ভারত থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী থ্রিটি উম্রিগর, অন্যটির রচয়িতা হাইতি থেকে আমেরিকায় বসতি গড়তে আসা এডউইজ ডান্টিক্যাট। উপন্যাস দুটির নাম যথাক্রমে The Space Between Us (২০০৭) ও The Farming of Bones (১৯৯৯)। এত গ্রন্থের ভেতর এই বিশেষ দুটি উপন্যাস বেছে নেওয়ার কারণ, এ দুই উপন্যাসের ভেতর অন্তর্নিহিত একটি মিল রয়েছে, দুটোরই গভীরে সূক্ষ্ম একটি ঐকতান আছে। সমাজের ভিন্ন স্তর থেকে আসা দুটি অনাত্মীয় নারীর ভেতর একই ধরনের মানবিক বন্ধন রচনা, তাদের এই খাঁটি, অনাবিল সম্পর্কের গভীরতা আর সেই সঙ্গে সৃষ্ট অনভিপ্রেত কিছু পারিবারিক জটিলতা কিংবা রাষ্ট্রীয় টানাপড়েনের ঘটনা নিয়েই মূল কাহিনি রচিত। সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই প্রান্তের দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মধ্যে প্রকৃত টান ও বন্ধুতার জোয়ারে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন ভেসে যাবে গতানুগতিক জীবনের বহু ক্ষুদ্রতা, বাছবিচার, বৈষম্য। কিন্তু আসলেই কি তাদের পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতা দিয়ে সমস্ত ভিন্নতা, শ্রেণিবিভেদ পাশ কাটাতে, অগ্রাহ্য করতে সমর্থ হয় এই দুই জোড়া অসম-বিত্তের নারী?
বই দুখানির ভেতর কেন্দ্রীয় দুটি নারী চরিত্র ও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ভেতর এতটা সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও দুটো বইয়ে বর্ণিত ঘটনা, পরিপার্শ্ব, চরিত্র, কাল এবং সংস্কৃতি – সবই একেবারে আলাদা। দুটি উপন্যাসেই দেখা যায়, বহুদিন ধরে একই গৃহস্থালিতে পাশাপাশি থাকার কারণে সমাজের অসম অবস্থান থেকে উঠে আসা দুই অনাত্মীয় নারীর মধ্যে একধরনের সখ্যের, ভালোবাসার, আস্থার ও নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার সেইসঙ্গে এই মানবিক সম্পর্ককে ঘিরে দৃশ্যমান হয় নানারকম দ্বন্দ্ব, জটিলতা। আশপাশের অন্যান্য চরিত্রের অনুপ্রবেশ এবং আনুষঙ্গিক ঘটনাপরম্পরায় বিভিন্ন রকমভাবে সম্পর্কের দোলাচলের আভাসও পাওয়া যায়।
থ্রিটি উম্রিগরের উপন্যাসে বম্বের উচ্চ-মধ্যবিত্ত এক পার্সি পরিবারের গৃহকর্ত্রী সেরা। আর ভীমা হলো সেরার বাড়িতে বিশ বছরের বেশিকাল ধরে ঘরের কাজ করে আসা অত্যন্ত বিশ্বস্ত পরিচারিকা, যে সারাদিন ধরে সেরার ঘরকন্নার কাজ ও তার সেবা করার পর সন্ধ্যায় নিজ গৃহে বস্তিতে ফিরে যায়, যেখানে মাতাপিতাহীন তার চোখের মণি নাতনি মায়া একা ঘরে তার প্রতীক্ষায় বসে থাকে। মায়া ভীমার একমাত্র কন্যার একটি মাত্র সন্তান। মায়ার মা-বাবা দুজনেই এইডস রোগে মারা গেছে প্রায় একই সময়ে ভীমার চোখের সামনে। বহুদিন থেকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়ে এবং তার স্বামীর মারাত্মক অসুখের খবরটা পেয়েছিল ভীমা অতি অকস্মাৎ ওদের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে, এবং বহুদূরের সেই বিশেষভাবে নির্মিত এইডসের হাসপাতালে গিয়ে শেষ দেখাটিই কেবল দেখতে পেয়েছিল সে। সেই হাসপাতালে ভীমার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা, অতি অসময়ে মেয়ে ও জামাইয়ের প্রায় একইসঙ্গে করুণ মৃত্যু এবং তাদের সৎকারের ঘটনার বর্ণনা এই গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
সেরার বাড়িতে বছরের পর বছর কাজ করতে করতে অতি ধীরে ধীরে ভীমার সঙ্গে এই আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছিল সেরার, যদিও নিজের সামাজিক অবস্থান ও আভিজাত্যের প্রতি সজাগ সেরা ও তার স্বামী কখনো ভীমাকে তাদের সঙ্গে একই সোফায় বসে টেলিভিশন দেখতে অথবা একই মগে চা পান করতে দেয় না। যে-সোফা প্রতিদিন নিজের হাতে পরিষ্কার করে ভীমা, যে- গ্লাস নিজের হাতে ধোয়, সে-সোফায় বসা বা সেই গ্লাসে জল খাওয়ার অধিকার নেই তার। তাই তো এই গ্রন্থের পরিচয়পর্বে বলা হয়েছে – ‘Thrity Umrigar’s extraordinary novel demonstrates how the lives of the rich and poor intrinsically connected yet vastly removed from each other, and how the strong bonds of womanhood are eternally opposed by the divisions of class and culture.’ এসব বাহ্যিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও সেরা আর ভীমার পারস্পরিক নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততা তুলনাহীন। এ ছাড়া একে অন্যের ব্যক্তিগত সমস্যার ব্যাপারে এতটাই অবগত, সম্পৃক্ত ও উদ্বিগ্ন যে, এই আপাতবৈষম্য বা বিভাজনকে যুগ-যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক রীতি বা সংস্কারের ধারাবাহিকতার রেশ বলেই মনে হয়। প্রকৃত অর্থে ভীমার প্রতি আচরণে অন্তত সেরার পক্ষ থেকে অন্য কোনোরকম অবহেলা, বৈষম্য বা তাচ্ছিল্যের প্রকাশ লক্ষ করা যায় না। মায়ার কলেজে পড়ার খরচ বা তার মা-বাবার চিকিৎসার জন্য সেরা ভীমাকে যথেষ্ট পরিমাণে আর্থিক সাহায্য করে। তা সত্ত্বেও বাড়ির আরেক সদস্য আধুনিক বিদুষী তরুণী দিনাজ, সেরার একমাত্র কন্যা, যে-বর্তমানে সন্তানসম্ভবা, স্বামী ভিরাফসহ যে এই বাড়িতেই থাকে, ভীমার প্রতি এই বাড়ির কিছু কিছু আচরণ মোটেই পছন্দ করে না। এত বছর একসঙ্গে একই বাড়িতে কাটিয়ে দেওয়ার পরও ভীমাকে পরিবারের অন্য আরেক সদস্যের মতো মেনে না নিয়ে তাকে কাজের লোক হিসেবে গণ্য করা, তার প্রতি কোনোরকম বৈষম্য, ভিন্ন ব্যবহার বা আচরণ, যেমন : নির্দিষ্ট একটি গ্লাসে জল খেতে দেওয়া, মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় দিনাজের কাছে। দিনাজ মায়ের কাছে তার এই মনোভাব প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। শুনে তার মা যা বলে তাতে মনে হয়, এবং কথাটিতে সত্যতাও অনেকটা রয়েছে হয়তো, ভীমার সঙ্গে এতটুকু পার্থক্য বজায় না রাখলে সেরার স্বামী সেটা কিছুতেই মেনে নিত না।
দীর্ঘদিন এই বাড়িতে থাকতে থাকতে ভীমা নিজেও অতি নীরবে এবং নিভৃতে অনেক কিছুই দেখে আসছে। ভীমা দেখতে পায়, কী ঘটে চলেছে এই আপাত সুখী এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারটির অভ্যন্তরে। সেরার মতো ব্যক্তিত্বশালী উচ্চশিক্ষিত নারীকেও লোকচক্ষুর আড়ালে কীভাবে এক আত্মম্ভরী, অত্যাচারী, জটিল মানসিকতার স্বামীর দ্বারা মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে মাঝেমধ্যেই। যতদিন তার স্বামী বেঁচে ছিল, কখনো এর থেকে রেহাই পায়নি সে। কতদিন গেছে, সেরার ক্ষতস্থানে অথবা আঘাতে নীল হয়ে যাওয়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নিজের হাতে মালিশ করে দিয়েছে ভীমা।
আর ওদিকে নিজের ঘরেও ভীমার ইদানীং বড়ই অশান্তি নাতনি মায়াকে নিয়ে, যে-মেয়েটি পড়াশোনা করে তার মা বা দিদিমার থেকে ভিন্ন এবং উন্নত এক জীবনের অধিকারী হবে বলে স্বপ্ন দেখত ভীমা। বড় শখ করে কলেজে পাঠিয়েছিল তাকে পড়াশোনা করার জন্য। কিন্তু অবিবাহিত অবস্থায় তার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনাটি ইদানীং ভীমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে, আঘাত করেছে। সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে ভীমা মায়ার তরফ থেকে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের জন্য দায়ী পুরুষটির পরিচয় আগাগোড়া গোপন করে যাওয়ার ব্যাপারটায়। তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে সে ওই অজানা ব্যক্তিটিকে আড়াল করতে মায়ার মতো মেয়ের জলজ্যান্ত মিথ্যা ও ছলনার আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাটি। সেরা বরাবরের মতো এই দুঃসময়েও ভীমা ও মায়ার সাহায্যে এগিয়ে আসে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মায়ার জন্য এই মুহূর্তে একমাত্র খোলা পথ, গর্ভপাতের, ব্যবস্থা করতে চাইলে কৃতজ্ঞতার বদলে সেরার প্রতি মায়ার অকস্মাৎ অত্যন্ত দুর্বিনীত ব্যবহার, দুর্বোধ্য কথাবার্তা এবং কঠিন ও নিষ্ঠুর মন্তব্যে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে ভীমা। এই রহস্যের জাল ছিঁড়ে সত্য বেরিয়ে এলে দেখা যায়, তা এতখানিই কুৎসিত ও অপ্রত্যাশিত যে, ভীমা কোনোমতেই সেটা মেনে নিতে পারে না। সেরার সহজ-সরল গর্ভবতী কন্যা দিনাজের অনাগত সন্তানের পিতাই যে মায়ার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার জন্যেও দায়ী, আর সেটা যে ঘটেছে সেরার অসুস্থ শাশুড়ির বাসায়, যেখানে মায়া তার দেখাশোনা করতে যেত মাঝেমধ্যে, এ-সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়লে ভীমা অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ে। সেরা বা তার কন্যাকে কিছু না জানিয়ে সোজা আসল অপরাধীর মুখোমুখি হয়, যে তার নাতনিকে প্রতারণা করেছে চরমভাবে। সেরার অপমানিত মেয়েজামাই ভিরাফ তখন মরিয়া হয়ে মনে মনে ভীমার ওপর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে পড়ে। এত বছর ধরে যে-বাড়িতে এমন গভীর আস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভীমা, সেখানেও তাকে মিথ্যা টাকা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পিছপা হয় না ভিরাফ। এই বিশাল অগ্নিপরীক্ষার সময় সেরা তার এতদিনকার পরিচিত ও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন না করে অতি বাস্তববাদী এবং সংসারী একজন মানুষের মতো আচরণ করে। ভীমাকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টার বদলে সেরা তার সঙ্গে এতদিনের সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলে। সব জেনেশুনেবুঝেও আসল সত্যকে-ন্যায়কে অস্বীকার করে বসে সেরা। ভীমার বেতন পরিশোধ করে তাকে তার গৃহস্থালির চাকরি থেকে বহিষ্কার করে দেয়। এমনকি ভীমাকে তার বাড়ি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিতাড়িত করে দিতেও দ্বিধা করে না সেরা। পারিবারিক সম্মান বাঁচানো ও নিজের এবং কন্যার ঘর সামলানো এতটাই বেশি জরুরি ও বড় হয়ে দেখা দেয় সেরার কাছে যে, এত বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে ওঠা নিঃস্বার্থ মানবিক একটি সম্পর্ককে একমুহূর্তে ছিন্ন করে দিতেও বাধে না তার। ভীমা যেন আসলেই সেরার বাড়িতে নিছক কাজের মেয়ে বই কিছু নয়, যারা প্রতিনিয়ত এ-ধরনের অপবাদ মাথায় নিয়েই গৃহস্থালির কাজ করে যায়। সেরার বাড়িতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গৃহকর্ম করার পর, আজ সকল বাঁধন ছিঁড়ে, একগাদা কলঙ্কের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে একাকী রাস্তায় বেরিয়ে আসে ভীমা। পড়ন্ত বেলায় বম্বের ইন্ডিয়ান গেটের অদূরে সমুদ্রের জলে নামতে নামতে ভীমা তার গোটা জীবনের চেহারাটি ওলট-পালট করে দেখে। স্বামী দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা, সেরার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বন্ধুতা এবং অতি করুণভাবে তার পরিসমাপ্তি, কন্যা ও জামাইয়ের অসময়ে মৃত্যু, মায়ার ভবিষ্যৎ, আগামী দিনের অনিশ্চয়তা ইত্যাদি বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ভাবনা তার মন ছুঁয়ে যায়।
থ্রিটি উম্রিগরের ইংরেজি সহজ, সরল, সুখপাঠ্য। চরিত্র চিত্রণে, বিশেষ করে চরিত্রের জটিলতা সৃষ্টিতে এবং সম্পর্কের মোড় ঘোরাতে অসীম মুনশিয়ানার পরিচয় দেন থ্রিটি। বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যেভাবে পরতে পরতে এবং ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে মূল কাহিনি, চিত্রিত হয়েছে তার চরিত্রগুলো আর তাদের ব্যাপ্তি, তাতে সন্দেহ নেই থ্রিটি উম্রিগর একালের একজন অতি দক্ষ ও শক্তিশালী লেখক। তিনি নিজে পার্সি পরিবার থেকে আসার কারণে সে-সমাজের চলাফেরা, দৈনন্দিন জীবন ও মূল্যবোধ অতি বাস্তবতার সঙ্গে অাঁকতে সমর্থ হয়েছেন এ-গ্রন্থে। চলনে-বলনে-পোশাকে-পার্টিতে পশ্চিমি ধারার সঙ্গে যত মিলই থাকুক, বম্বের উচ্চবিত্ত পার্সি সম্প্রদায়ের, প্রাচ্যের কুসংস্কার ও পারিবারিক রীতিনীতি ব্যাপকভাবেই উপস্থিত সেখানে। যেমন, বিয়ের অব্যবহিত পরে একসঙ্গে বাস করার কারণে শাশুড়ি-পুত্রবধূর মধ্যে বিদ্যমান অম্লমধুর সম্পর্ক ও বিস্তর টানাপড়েন, মাসিকের সময় শাশুড়ির নির্দেশে পুত্রবধূর রান্নাঘরে বা প্রার্থনাঘরে যেতে বা ঘরকন্নার কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে, এমনকি, গুরুজনের সান্নিধ্যে আসতেও বারণের রীতি গতানুগতিক উপমহাদেশীয় নিয়ম-নিষেধ ও সংস্কৃতিরই অংশ। এ-গ্রন্থে উম্রিগর সেরা ও ভীমার প্রতি এত বেশি নজর দিয়েছেন যে, উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র যথেষ্ট পরিমাণে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, তাদের জন্যে এ-গ্রন্থে যথেষ্ট জায়গা ছিল না। বইটির কাহিনি যে খুব সম্ভবত সত্য ঘটনাকে ভিত্তি করে লেখা, তার বড় প্রমাণ বইখানি তিনি উৎসর্গ করেছেন ‘সত্যিকারের ভীমাকে এবং তার মতো হাজারো নারীকে’ (For the real Bhima and the millions like her)। গ্রন্থটির পেছনের পৃষ্ঠায় বহুপ্রশংসিত মন্তব্যের ভেতর Washington Post- এর উদ্ধৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘The life of the privileged is harshly measured against the life of the powerless, but empathy and compassion are evoked by both strong women, each of whom is forced to make a separate choice. Umrigar is a skilled storyteller, and her memorable characters will live on for a long time.’
ডান্টিক্যাটের উপন্যাসেও অসম সামাজিক অবস্থান থেকে উঠে আসা দুই নারীর সখ্যের কথা বিস্তৃতভাবে বর্ণিত। আমাবেলের জন্ম হাইতিতে। পৃথিবীর ভেতর আর এ-ধরনের কোনো দ্বীপ আছে কিনা জানি না, কিন্তু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের (আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের নিচের দিকে) ভেতর যে-দ্বীপটিতে হাইতি অবস্থিত, তার আরেকটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে অন্য একটি দেশ, ডোমিনিকান রিপাবলিক। একই দ্বীপ দুটি ভিন্ন স্বাধীন দেশে বিভক্ত – বড়ই বিচিত্র। শুধু তা-ই নয়, এই দুদেশের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষার মান, সাদা-কালো মানুষের আনুপাতিক হার, শিল্পায়ন – সবকিছুতেই আকাশ-পাতাল ফারাক। হাইতি, পৃথিবীর দরিদ্রতম কয়েকটি দেশের একটি, যার অধিবাসীরা মূলত কালো। ডোমিনিকান রিপাবলিকের আর্থিক অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো, বিশেষ করে চিনি রফতানি ও পর্যটন ব্যবসার সাফল্যের জন্যে। এখানে কালো লোক থাকলেও সাদা লোকের আনুপাতিক হার বেশি। শিল্প-কারখানা থাকায় লোকজনের চাকরি ও জীবনযাত্রার মান অনেকটাই উঁচুতে। পাশাপাশি দুটি দেশের ভেতর যদি ভিন্ন পর্যায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে থাকে, তাহলে বরাবর যা হয়, হওয়া স্বাভাবিক, এখানেও তা-ই ঘটেছে। হাইতি থেকে ক্রমাগত মানুষ চোরাপথে ডোমিনিকান রিপাবলিকে ঢুকে পড়ছে। মানুষের এই দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা – উন্নত বা অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনযাপনের জন্যে দেশান্তরী হওয়ার বাসনা কখনো থেমে থাকে না, যতক্ষণ না প্রতিটি দেশে সকল মানুষের জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদা মেটাবার ও সহজভাবে বিচরণের ক্ষেত্র রচিত হয়। ফলে হাইতি থেকে ক্রমাগত মানুষ আসছে ডোমিনিকান রিপাবলিকে। এখানে বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ে তারা বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত খুব অল্প বেতনে আখক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে জীবন কাটায়। এসব ভেসে বেড়ানো পরদেশি শ্রমিকের প্রতি মিশ্র অনুভূতি সাধারণ ডোমিনিকান রিপাবলিকের জনগণের। সস্তায় শ্রম বিক্রি করে বলে এরা বড় জোতদারদের খুব সুবিধে করে। ফলে হাইতির এই অভিবাসী শ্রমিকরা এদেশের জন্যে বেশ উপকারী সন্দেহ নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা বাঞ্ছিত বা আমন্ত্রিত নয়। অর্থনৈতিক স্বার্থে তাদের সহ্য করা হয়, কিন্তু তাদের বিশ্বাস করে না কেউ। এরা প্রায় সকলেই তপ্ত রোদে আখক্ষেতে দীর্ঘ দিবস ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠিন পরিশ্রম করে। ফসল তোলার মৌসুমে বিশাল বিশাল ক্ষেত থেকে শক্ত এবং লম্বা লম্বা আখ ও আখের ধারালো পাতা কাঁচি-ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে তাদের হাত-পা কাটাছেঁড়া হয়ে যায়। এটাকে স্থানীয় ভাষায় ‘farming of bones’ বলা হয়। আমাবেলের প্রেমিক তেমনি হাত-পা ছেঁড়া খসখসে ত্বকের এক আখক্ষেতের তরুণ শ্রমিক, সিবাস্তিন।
আমাবেলের বয়স তখন সবে আট। থাকে মা-বাবার সঙ্গে হাইতিতে। সে-সময়ে, একদিন হাইতি থেকে, অন্য অনেক হাইশিয়ান জনগণের মতো, সীমান্তের স্রোতস্বীলা নদী পার হয়ে লুকিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিকে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে আমাবেলের পরিবার। কিন্তু তা করতে গিয়ে আট বছরের কন্যার চোখের সামনে তার মা-বাবা দুজনেই নদীর জলে ডুবে মারা যায়। আমাবেলের পিতা প্রথমে কন্যাকে মাথায় করে নদী পার করে তাকে এপারের তীরে বসিয়ে রেখে আবার ওপারে গিয়ে স্ত্রীকে ঘাড়ে করে তুলে নিয়ে নদী পার হওয়ার সময় দুজনেই তাদের শিশুসন্তানের চোখের সামনে স্রোতে ভেসে চলে যায় গহিন জলের তলায়। স্থানীয় লোকজন পরে এই কৃষ্ণাঙ্গ শিশু আমাবেলকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। ডোমিনিকান রিপাবলিকের যে-ধনাঢ্য পরিবারে সে বড় হয়, সেই বাড়ির একমাত্র কন্যাটিও প্রায় আমাবেলেরই বয়সী। যেহেতু আমাবেল এ-বাড়িতে আশ্রিত, বড় হওয়ার পর অন্য আরো কয়েকজন আশ্রিতের মতো সেও গৃহের কাজের সহকারী হয়ে ওঠে – সে-হিসেবে সে এই বাড়ির পরিচারিকাই। তবে অন্য পরিচারিকাদের তুলনায় আমাবেলের অবস্থান কিছুটা স্বতন্ত্র। সে মূলত চা বা কফির সরঞ্জাম একত্রিত করে বাড়ির সকলকে নিজের হাতে চা পরিবেশন করে সকালে এবং বিকেলে। মনিব পরিবারের কাছে বেড়াতে আসা অতিথিদেরও আপ্যায়ন করে আমাবেল। এ ছাড়া তার নিজের বয়সী বাড়ির আদুরে মেয়েটির টুকটাক আবদার রক্ষা করে অথবা তার সঙ্গে খেলে কিংবা তাকে সঙ্গ দিয়ে সময় কাটায়। এভাবে আস্তে আস্তে এ-বাড়ির কন্যাটির সঙ্গে তার নিবিড় একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেটা আশ্রিতা আর আশ্রয়দাতার সম্পর্ক নয়। এ-গ্রন্থের পুরো কাহিনিটিই যেহেতু আমাবেলের মুখ দিয়ে বর্ণিত, গৃহকর্তার সে-মেয়েটিকে আগাগোড়া সে সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়া বলেই উল্লেখ করে গেছে, যদিও দেখা যায়, বহু বছর একই বাড়িতে পাশাপাশি বড় হওয়ায় তাদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক সখ্য জন্মেছিল, সেখানে অনায়াসে আমাবেল ভ্যালেন্সিয়াকে নাম ধরে ডাকতে পারত। কিন্তু আমাবেল কখনো নিজের অবস্থানের কথা ভুলে যায় না এবং ভুলেও ভ্যালেন্সিয়াকে নাম ধরে সম্বোধন করে না। অন্যের কাছে তার মনিবকন্যার কথার উদ্ধৃতি দিতে, অথবা নিজের মনে মনে তার কথা চিন্তা করার সময়েও সবসময়েই সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়া বলেই ডাকে বা ভাবে সে। মনিব-গৃহপরিচারিকার সম্পর্কের ব্যাপারে আমাবেল যতই সজাগ ও সতর্ক থাকুক না কেন, দেখা যায় সমস্ত স্বাতন্ত্র্য ও ব্যবধানের বেড়া ভেঙে বাড়ির এই দুই অল্পবয়সী মেয়ের মধ্যে একসময় গড়ে উঠেছে প্রগাঢ় ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বাস ও নির্ভরতা। বিশেষ করে, ভ্যালেন্সিয়ার তরফ থেকে কোনোরকম বৈষম্যমূলক আচরণ কখনো চোখে পড়ে না।
এক সামরিক অফিসারের সঙ্গে বিয়ে হয় ভ্যালেন্সিয়ার। বাবার বাড়িতেই থাকে সে। ভ্যালেন্সিয়ার প্রথম সন্তান যখন জন্ম নেবে, ভ্যালেন্সিয়ার বাবা ডাক্তার ডাকতে যান; কিন্তু ডাক্তার আসার আগেই ভ্যালেন্সিয়ার যমজ শিশুর, একটি ছেলে ও একটি মেয়ের, জন্ম হয়ে যায় আমাবেলের হাতে। এটাই আমাবেলের জীবনে প্রথম স্বহস্তে প্রসব করানো। কিন্তু সে জানে, তার মা যখন বেঁচেছিলেন, এ-কাজ বহুবার করেছেন তিনি। যমজ বাচ্চা প্রসবের বেশ কিছুক্ষণ পরে পারিবারিক ডাক্তার জাভিয়ার আসেন বাড়িতে এবং ভ্যালেন্সিয়াকে পরীক্ষা করেন। দেখেন, সবকিছুই ঠিকঠাকমতো করা হয়েছে। ডাক্তার জানতে চান, আমাবেল নিয়মিত দাইয়ের কাজ করে আসছে কি না। জবাবে আমাবেল জানায়, এটাই তার প্রথম অভিজ্ঞতা। তবে তার মা-বাবা, যারা হাইতিতে বিভিন্ন গাছের লতাপাতা দিয়ে কবিরাজি করতেন, মাঝেমধ্যে দরকার হলে প্রসবও করাতেন তারা। এখানে ডান্টিক্যাট ভ্যালেন্সিয়ার যমজ সন্তানের জন্মকে হয়তো খানিকটা প্রতীকীরূপেও ব্যবহার করেছেন। কেননা, ডাক্তার জাভিয়ার একটি দার্শনিক মন্তব্য করেন যমজ সন্তান সম্পর্কে। তিনি বলেন, ‘Many of us start out as twins in the belly and do away with the other.’
ভ্যালেন্সিয়া আমাবেলকে তার খাটের ওপর উঠে এসে বসতে বলে তার পাশে। কথামতো তা করলে, ভ্যালেন্সিয়া তার এক নবজাতককে আমাবেলের কোলে তুলে দিয়ে তাকে বলে তার স্তন্য পান করানোর জন্যে। আমাবেল প্রথমে ইতস্তত করলেও মনিবকন্যার কথা শোনে এবং তা-ই করে। এই আচরণের মধ্য দিয়ে ভ্যালেন্সিয়া প্রকাশ করে, আমাবেলকে কত আপন, কত কাছের এবং কতটা সমগোত্রীয় বলে মনে করে সে। তার হাতে আজ তার সন্তানদের জন্ম হওয়ায় আমাবেলকে আরো আপন, আরো নিকটের মনে হতে থাকে তার – নির্ভরতাও বেড়ে যায় প্রচন্ডভাবে।
অথচ ভ্যালেন্সিয়ার সামরিক অফিসার স্বামীর মনোভাব একই রকম উদার নয় মোটেই। যে-দিন সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়ার যমজ সন্তানের জন্ম হয়, সে-রাতেই সিবাস্তিনসহ তার দুই বন্ধু যখন রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, একটি ট্রাক অতি দ্রুতগতিতে এসে তাদের একজনকে ধাক্কা দিয়ে অনেক উঁচু থেকে নদীতে ফেলে দিয়ে মেরে চলে যায়। যে মারা যায় সে স্থানীয় হাইশিয়ান অভিবাসীদের আধ্যাত্মিক নেতা কঙ্গোর একমাত্র পুত্র জোয়েল। আর যে সেই ট্রাক চালাচ্ছিল তখন সে আর কেউ নয়, সিনিয়র পিকো, সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়ার স্বামী, নতুন পিতা, যে তার কর্মক্ষেত্রে যমজ সন্তানের জন্মের খবর পেয়ে উত্তেজিত হয়ে অতিদ্রুত গাড়ি চালিয়ে শ্বশুরবাড়ি আসছিল। একজন নিরপরাধ মানুষকে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে খুন করার জন্যে সিনিয়র পিকোর কোনোরকম শাস্তি হয় না বা তার ভেতর কোনো আত্মগ্লানি বা মনোবিকারও লক্ষ করা যায় না। অথচ ভ্যালেন্সিয়ার পিতার মনে অত্যন্ত গভীরভাবে দাগ কাটে এ-ঘটনা। তার নিজের কোনো পুত্র নেই; পুত্র জন্ম দিতে গিয়েই তার স্ত্রী মারা যান। তিনি স্থির করেন, যেভাবেই হোক কঙ্গোর সঙ্গে দেখা করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে তার ক্ষমা চাইবেন এবং এ-ব্যাপারে আমাবেলের সাহায্য প্রার্থনা করেন তিনি। এদিকে জন্মের অব্যবহিত পরেই ভ্যালেন্সিয়ার পুত্রটি ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ করে মারা যায়। তার স্বামী সিনিয়র পিকো যখন সিনিয়রার ইচ্ছাপূরণে মৃত পুত্রটিকে ভ্যালেন্সিয়ার মা ও ভাইয়ের (যে-ভাইয়ের জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু হয়) কবরের পাশে কবর দিতে নিয়ে যায়, ভ্যালেন্সিয়া তাদের আখক্ষেতের সকল শ্রমিককে বাড়িতে ডাকে কফি খাওয়ার জন্যে। মৃত পুত্রের স্মরণে কিছু একটা করার, ভালো কোনো কাজ করার বাসনা জেগেছিল তার মনে। আমাবেলের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানালে কেউ কেউ আসে, যারা আখক্ষেতে কাজে যায়নি সেদিন। সিনিয়রার আদেশে আমাবেল তাদের সকলকে সিনিয়রার অতি প্রিয় লাল অর্কিডের প্যাটার্নের দামি ইউরোপিয়ান চীনামাটির চায়ের কাপে করে কফি ও চা পরিবেশন করে। কিন্তু জেনারেল পিকো, সিনিয়রার স্বামী, ফিরে এসে এ-কথা শোনার পর, রাগান্বিত হয়ে সেই চীনামাটির পুরো সেটটি বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি একটি করে সব কাপ ও অন্যান্য পাত্র পাথরের ওপর গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ভেঙে ফেলে। হাইতি থেকে বেআইনিভাবে ঢুকে-পড়া আখক্ষেতের দিনমজুর এই সাধারণ শ্রমিকরা তার বাড়িতে এসে তাদের নিজেদের পছন্দের পাত্রে কফি খেয়ে যাবে – এটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না জেনারেল পিকোর পক্ষে। তার স্ত্রী যতই তা চেয়ে থাকুক না কেন, শ্রেণিবিভেদকে এত সহজে মুছে ফেলার মানুষ সিনিয়র পিকো নন। সেরার বাড়িতে ভীমার আলাদা গ্লাসে জল খাওয়ার রীতির বা বাধ্যবাধকতার কথা কি মনে করিয়ে দেয় এ-ঘটনা?
হাইতি যত দরিদ্র দেশই হোক, এর সংস্কৃতি পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি। আর তাই দেখা যায়, অতি অনায়াসে আমাবেলের ঘরে প্রায় রাতেই ঘুমুতে চলে আসে তার প্রেমিক হাইতি থেকে আসা আখক্ষেতের শ্রমিক সিবাস্তিন। আমাবেলের গায়েপিঠে আদর করতে করতে সিবাস্তিন তার কাছে হাইতির গল্প বলে, সেখানকার রূপকথা, লোককথা, নানান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা, সেখানকার লোকাচার, বিশ্বাস, নিয়মকানুন, পার্বণের সব বিস্তৃত বিবরণ দেয় সে। আমাবেলের কাছে তার ছোটবেলার কথা শুনতে চায় সিবাস্তিন। তার মা-বাবার কথা প্রতি রাতেই জিজ্ঞেস করে। সিবাস্তিন আমাবেলের মধ্যে হাইতির স্মৃতি উস্কে দেয়, হাইতির প্রতি আমাবেলের মানসিক টান জাগিয়ে রাখতে চায়। তারা দুজনেই স্বপ্ন দেখে, ফসল কাটার মৌসুমটা শেষ হলেই এবার তারা বিয়ে করে হাইতিতে নিজের ভূমিতে ফিরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করবে। আর্থিক যত দারিদ্র্যই থাক না কেন, হাইতিসহ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের লোকজন অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশের মতোই জীবনযাপনে অভ্যস্ত। শারীরিক সম্পর্ক গড়ার আগে বিবাহের পূর্বশর্তের কড়াকড়ি এ-সংস্কৃতিতে নেই। তাই অতি সহজেই সকলে মেনে নেয় আমাবেলের সঙ্গে একই বাড়িতে কাজ করে যে প্রৌঢ় দম্পতি তাদের জীবনাচরণকেও। এই দম্পতি বিবাহিত নয়, কিন্তু বহু বছর ধরে তারা একত্রে বসবাস করছে। পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও আন্তরিক তারা। সবসময় একে অন্যকে my man বা my woman বলে পরিচয় দেয়। একই রকমভাবে আমাবেলের ঘরে প্রায় সময়েই রাত কাটায় তার প্রেমিক সিবাস্তিন। আমাবেলকেও কখনো কখনো দেখা যায়, গভীর রাতে একা একা আখক্ষেতের পাশ দিয়ে তার প্রেমিকের বাসায় যেতে। এ নিয়ে সমাজে কোনো কথা ওঠে না।
কিন্তু এর মধ্যে অকস্মাৎ সমস্ত দেশজুড়ে চরম জাতীয়বাদীদের মদদে ‘হাইতির অভিবাসী হটাও’ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সময়টা ১৯৩৭ সাল। দেশের সামরিক বাহিনী এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সামরিক প্রধান জেনারেল রাফায়েল ত্রুহিয়োর (যিনি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানও হয়েছিলেন) স্বপ্ন ছিল, ডোমিনিকান রিপাবলিকের জনগণের রক্তের পবিত্রতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এই ভূখন্ডকে হাইতির নাগরিকশূন্য করে তোলা। সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়ার স্বামী জেনারেল পিকোও অত্যন্ত সুবিধাবাদী এবং চরম জাতীয়তাবাদী এক লোক। সে উচ্চাভিলাষীও বটে। একদিন এই দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। সামরিক প্রধানের বদান্যতা পাওয়ার জন্যে এবং দ্রুত প্রমোশনের আশায় স্বয়ং সামরিক প্রধান রাফায়েলের একখানা পোর্ট্রেট পর্যন্ত নিজের বসার ঘরে ঝুলিয়ে রাখে সে। হাইতির অভিবাসীদের ওপর অকথ্য অত্যাচারে অকস্মাৎ উন্মাদ হয়ে ওঠে গোটা দেশ। রাতারাতি সমস্ত কিছু, সম্পূর্ণ পরিবেশ বদলে যায়। রাজনৈতিক গ্রেফতার, নির্বিচারে হত্যা, অত্যাচার, বর্ডার দিয়ে জোর করে লোকজনকে হাইতিতে প্রেরণ ইত্যাদি নারকীয় কর্মে মেতে ওঠে একদল ডোমিনিকানবাসী – প্রধানত সামরিক বাহিনী। এরই ভেতর স্থানীয় কিছু সহমর্মী ও হৃদয়বান মানুষ হাইতির এসব ভেসে বেড়ানো অসহায়, নিরপরাধ গরিব মানুষের বিপদের দিনে সাহায্য করবার জন্যে এগিয়ে আসেন। কথা ছিল, অতি গোপনে একটি বিশেষ চ্যাপেলে সিবাস্তিন, তার বোন মিমিসহ বেশ কয়েকজন এবং আমাবেল এসে জড়ো হবে। গির্জার যাজক নিজে এবং স্থানীয় ডাক্তার জাভিয়ার, যিনি সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়াদের পারিবারিক ডাক্তার, সঙ্গে করে নিয়ে যাবে এসব হাইতির লোককে নিরাপদে বর্ডার পার করে দেওয়ার জন্যে। সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়া সেদিন একটু অসুস্থ বোধ করছিল। তার জামার পেছনের দিকে রক্তের ছাপ চোখ এড়ায় না আমাবেলের। সন্তান প্রসবের পর যথেষ্ট বিশ্রাম না নিতে পারায় আবার রক্তপাত শুরু হয়েছিল সিনিয়রার। আমাবেলের একটি হাত পরম নির্ভরতায় শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল ভ্যালেন্সিয়া। তার ধারণা, আমাবেলের মতো করে তার দেখাশোনা আর কেউ করতে পারবে না। কিন্তু চলে যাওয়ার সময় হয়ে আসায় জোর করে ভ্যালেন্সিয়ার অতি আস্থার সঙ্গে ধরে রাখা তার হাতখানি আস্তে ছাড়িয়ে নিয়ে ওষুধ আনার নাম করে আমাবেল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সেই চ্যাপেলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছার আগেই জানতে পারে, এক সামরিক বাহিনী এসে ট্রাকে করে চ্যাপেল থেকে সকলকে বন্দি করে নিয়ে গেছে, যাদের মধ্যে সেই ডাক্তার, গির্জার যাজক, সিবাস্তিন ও তার ভগ্নি মিমিও ছিল। তাদের কোনো হদিস জানা যায় না। আমাবেল দেখে, রাস্তায় এক সামরিক বাহিনীর ট্রাকের ভেতর হাইতির শ্রমিকদের টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বর্ডারের দিকে ইউনিফর্ম পরা সামরিক অফিসারেরা এবং এ-কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে স্বয়ং সিনিয়র পিকো।
প্রেমিকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বহু বাধা, কষ্ট, পদে পদে অনেক বিপদের মধ্য দিয়ে গিয়ে পথে দেখা একদল হাইতির লোকজনের সঙ্গে বর্ডার পার হয়ে অবশেষে তার নিজের জন্মভূমি হাইতিতে ফিরে আসে আমাবেল। শুরু থেকেই তার পথের সাথি হয় ইভস নামে এক যুবক, যে সিবাস্তিনের পূর্বপরিচিত – তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যেতে যেতেও সিবাস্তিনের খোঁজ করে তারা। ইভস ও আমাবেল একই সঙ্গে বর্ডার পার হয়। বাঁচার প্রয়োজনে এবং দীর্ঘদিন একত্রে চড়াই-উতরাই পার হয়ে যেতে যেতে একধরনের নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমাবেল ও ইভসের ভেতর। হাইতিতে ফিরে গিয়ে নিজের কেউ না থাকায় ইভসের পৈতৃক বাড়িতে তার পরিবারের সঙ্গে গিয়ে ওঠে আমাবেল। সেখানে সে পরিচিত হয় ইভসের প্রেমিকা হিসেবে। স্বভাবতই ইভসের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোয় আমাবেল। কিন্তু সিবাস্তিনকে ভুলতে পারে না কিছুতেই। তার জন্যে প্রতীক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। জানা ও সম্ভাব্য সকল স্থানে তার খোঁজ করে আমাবেল। সীমান্ত অঞ্চল অতিক্রম করে আবার ডোমিনিকান রিপাবলিকে ঢুকেও প্রেমিকের খোঁজ নেয়। একেকজন একেক রকম কথা বলে। কিন্তু সত্য বোধহয় এটাই যে, সিবাস্তিনকে হত্যা করা হয়েছে, কেননা এক খ্রিষ্টান যাজকের কাছে সে পুনরায় জানতে পারে, সিবাস্তিনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মিলিটারি ট্রাকে করে এবং পরে শোনা গেছে অন্যদের সঙ্গে তাকেও খুন করা হয়েছে, কেননা সিবাস্তিন একজন নেতা গোছের হাইশিয়ান বলে পূর্বপরিচিত ছিল। হাইতির লোকদের বিরুদ্ধে এ-অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞে সিনিয়রা ভ্যালেন্সিয়ার স্বামী জেনারেল পিকো এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে Farming of Bones বইয়ের এ-শিরোনামটি দেখা যায় দ্ব্যর্থবোধক। এই নাম কেবল হাইতি থেকে বেআইনিভাবে ঢুকে-পড়া দিনমজুরদের আখক্ষেতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রখর রোদ আর গরমের ভেতর লম্বা লম্বা হাড়ের মতো শক্ত আখ কাটা ও পাতা পরিষ্কার করার কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের কথাই বোঝায় না, ১৯৩৭ সালের বিশেষ এক সময়ে, জরুরি অবস্থায় হাইতির লোকজনকে বেছে বেছে দলে দলে হত্যা করা, গুম করা, গণকবর দেওয়া এবং নিপীড়ন করে হাত-পা ভেঙে বর্ডারের ওপারে নিক্ষেপ করাও এ শিরোনামকে ধারণ করে আছে বলে আমার বিশ্বাস। বছরের পর বছর পাশাপাশি বাস করার পর, কাজ করার পরও ডোমিনিকান সামরিক বাহিনী যে-ধরনের জেনোসাইড করেছিল হাইতির অভিবাসী নিরস্ত্র, নিরীহ, হতদরিদ্র শ্রমিকদের ওপর, যেভাবে তাদের নির্মূল করার সংকল্প নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল তারা, তা ১৯৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইংরেজিতে লেখা Farming of Bones-এর ভাষা সরল, কাব্যময়। তরতর করে গোটা বইটি পড়ে ফেলা যায়। বইটি একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা মুশকিল। আমাবেলের বয়ানে লেখা উপন্যাসটিতে একটি পরিচ্ছেদ পর পর (সাধারণত বেজোড় সংখ্যার পরিচ্ছেদগুলোতে) একেকটি গোটা পরিচ্ছেদ রয়েছে, যেখানে আমাবেল হয় তার ছোটবেলায় দেখা হাইতির কোনো পার্বণ, আচার-আচরণ বা ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে অথবা তার মা-বাবার স্মৃতি রোমন্থন করছে, কিংবা স্বপ্ন দেখছে, হয় অতীতের – মা-বাবার নদীতে ডুবে যাওয়ার সেই ভয়ংকর দৃশ্যকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন, অথবা ভবিষ্যতের – সিবাস্তিনকে নিয়ে অনাগত সুখের দিনের রোমান্টিক সব স্বপ্ন। ডান্টিক্যাট একটি বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে সেসব স্মৃতি রোমস্তন বা স্বপ্নের পরিচ্ছেদগুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক ফন্ট এবং মোটা কালি (bold) ব্যবহার করে সেগুলোকে চলমান কাহিনি বা বর্তমান ঘটনার পরিচ্ছেদগুলো থেকে পৃথক করেছেন।
Space Between Us ও The Farming of Bones গ্রন্থের ভেতর যে-সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়, তা শুধু গৃহকর্ত্রী আর গৃহপরিচারিকার মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সখ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দুটো পুস্তকেই বাড়ির অল্পবয়সী মেয়ে দুটোকে, দিনাজ ও ভ্যালেন্সিয়াকে, দেখা যায় অত্যন্ত সহজ-সরল মনের সাদাসিধে ব্যক্তি হিসেবে। দুজনেই বাড়ির একমাত্র কন্যা এবং বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও স্বামীসহ থাকে বাবার বাড়িতেই। মানুষে মানুষে বৈষম্যে-বিভেদে পূর্ণ অবিশ্বাসী, অত্যন্ত উদার ও মুক্তমনের মানুষ এই দুই নারী। কিন্তু তাদের স্বামী দুটি ঠিক বিপরীত চরিত্রের। দুটি গ্রন্থেই তারা একরকম ভিলেনের ভূমিকা পালন করে। Space Between Us ও Farming of Bones-এ যথাক্রমে ভিরাফ আর সিনিয়র পিকোর চরিত্র মানবিক বন্ধন, পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার পরিপন্থী। তারা দুজনেই অত্যন্ত স্বার্থপর, আত্মম্ভরী, অবিবেচক ও নিষ্ঠুর। তাদের উপস্থিতি ও কার্যকলাপ তাদের আশেপাশের অনেকের মর্মবেদনা ও সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুটি গ্রন্থেই দেখা যায়, নারীর সমস্যা ও যাতনা নারীই বেশি ভালো করে বুঝতে পারে, সমাজের যে-অবস্থানেই তারা থাকুক না কেন, কিংবা শিক্ষাগত ও অর্জিত গুণাবলির যতই পার্থক্য থেকে থাকুক তাদের ভেতর। দুটি গ্রন্থেরই একেবারে শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, হতাশাপীড়িত সমাজের নিচের তলার দুই নারী সর্বস্ব হারিয়ে শান্তির অন্বেষণে ধীরে ধীরে তাদের ব্যুহ পরিচিত এবং আত্মার সঙ্গে গাঁথা স্রোতস্বীলা জলাশয়ে নেমে পড়ে, যে জলধারা দুটি তাদের অস্তিত্বের মতোই সদা বহমান, যা কালের সাক্ষী হয়ে বহুকাল ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
Farming of Bones উপন্যাসের শেষে আমাবেল দুই দেশের মাঝখানে সীমান্তের সেই খরস্রোতা নদীর তীরে এসে দাঁড়ায়। মা-বাবা ও সিবাস্তিয়ানের কথা মনে পড়ে তাঁর। আস্তে আস্তে সে তার পরিধেয় সব কাপড়চোপড় একে একে পরতের পর পরত খুলে খুলে পাড়ে রেখে দিয়ে একেবারে নগ্ন হয়ে নদীর জলের ওপর পিঠ দিয়ে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। অক্টোবরে নদীর জল কিছুটা উষ্ণ। আমাবেল এই পরিচিত জলধারা থেকে এক নরম, শান্ত আলিঙ্গনের স্বপ্ন দেখে। স্রোতের টানে সে ভেসে যায়, তাকে টেনে নিতে চায় সেই একই নদী, যেখানে একদিন ডুবে গিয়েছিল তার মা-বাবা তার শিশু-চোখের সামনে। একেবারে শেষ মুহূর্তে ডুবতে ডুবতেও তার মা প্রাণপণে তার একখানা হাত শূন্যে তুলে কী যেন বলতে চেয়েছিল আমাবেলকে। মা কি চেয়েছিল সেও তাদের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ুক জলে, নাকি তাকে বাঁচতে বলেছিল মা? আমাবেল জানে না। সে শুয়ে থাকে নদীর বুকে চিৎ হয়ে। পিঠের নিচে নদীর তলায় পড়ে থাকা অসংখ্য পাথরকুচি আমাবেলের নরম ত্বকে অনবরত সংঘর্ষ করতে থাকে।
১) পুস্তকের নাম : The Space Between Us
লেখকের নাম : Thiriti Umrigar
প্রকাশক : Harper Parper Perennial, New York
প্রথম প্রকাশকাল : First Edition published in 2007
২) পুস্তকের নাম : The Farming of Bones
লেখকের নাম : Edwidge Danticat
প্রকাশক এবং প্রথম প্রকাশকাল : Penguin Books, USA; First Edition published 1999.

লেখক পরিচিতি
থ্রিটি উম্রিগর : জন্ম মুম্বাইয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচ-ডি। বর্তমানে আমেরিকার ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের কেইস ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন খবরের কাগজে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম Bombay Times। The Space Between Us তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Nieman Fellowship পান। ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ড শহরে তিনি স্থায়ীভাবে বাস করছেন। তাঁর আরো কয়েকটি গ্রন্থের ভেতর Weight of Heaven, The World We Found, If Today be Sweet উল্লেখযোগ্য।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার