নীপার ছবি : বর্ণ-সুরে যাপন

লেখক: মইনুদ্দীন খালেদ

বাংলায় বলি বিমূর্ত, ইংরেজিতে অ্যাবস্ট্রাক্ট। বিমূর্ত বলতে বস্ত্তনিরপেক্ষ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আসলে বিমূর্ত বা বস্ত্তনিরপেক্ষ বলে কোনো কিছু অনুমেয় করা চলে কি! হয়তো চলে। ভারতীয় দর্শন তা-ই বলে। বস্ত্তর অতীত, বস্ত্ত-উত্তীর্ণ এসব শব্দে কোনো এক মায়া, মমতা ও করুণার কথা বলা হয়ে থাকে। ব্যাখ্যাতীত অবস্থায় পৌঁছে নিবিড় পর্যবেক্ষণপ্রবণ জীবনানন্দ-মন তাই বারবার প্রকৃতিবিষয়ক কবিতায় ‘করুণা’র পরশ বুলিয়েছেন। অদৃশ্য ধরতে গিয়ে বাতাসে রং লাগিয়ে বলেছেন সবুজ বাতাস।

বস্ত্তকে নিংড়ে নিয়ে পাওয়া যায় যে নির্যাস বা মধু অথবা গভীর মনোনিবেশে আরাধনা কোনো এক মার্গে পৌঁছলে অন্তর্চক্ষু দেখে যে আকারহীন বর্ণময় দেশ, সেই দেশের যাত্রিক মাকসুদা ইকবাল নীপা। বস্ত্ত বা প্রকৃতি নিরীক্ষণ করে যেন তাঁর মন বলে, না, নেই কিছু উপরিতলে; আছে যা তা স্থাণু নয়, নিয়ত চলছে পালাবদল তাতে; এ-পৃথিবী বর্ণবিভূতির নিত্যপরিবর্তনশীলতার লীলা। আর এখানেই গান হৃদয়ের, প্রকৃতির। নিসর্গের সর্বস্বতা বা নির্যাসটুকু বর্ণে বর্ণিত করে নীপা অবশ্যই হয়ে উঠেছেন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট বা বিমূর্তরীতির শিল্পী।

আমরা যখন এ-দেশে বিমূর্তশৈলীর শিল্পের কথা বলি তখন আমাদের মনে পড়ে যায় মোহাম্মদ কিবরিয়ার কাজ। নীপা কিবরিয়ার চেয়ে তিন প্রজন্ম নবীন। কিবরিয়াই প্রথমজন, যিনি এ-দেশ থেকে জাপানে গিয়ে চিত্রকলার উচ্চতর বিদ্যাশিক্ষা করেছেন। নীপাও দীর্ঘকাল তালিম নিয়েছেন জাপানের শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিবরিয়ার মতো না হলেও নীপার কাজে বাংলাদেশ ও জাপানের শিল্পভাবনার সংশেস্নষ রয়েছে। জাপানিরা পরিশ্রুতি ভালোবাসে একটু বেশি পরিমাণে। নীপার বর্ণময় শিল্পযাত্রাতেও পরিশোধন আছে। তবে নীপা নিশ্চিতভাবেই ইম্প্রেশনিস্ট আদর্শের অনুসারী। কিবরিয়া ইম্প্রেশনিজম নয়, অন্তর্গূঢ় জ্বালায় দগ্ধ মথিত মানবসত্তা পরিব্যাপ্ত হয়েছে তাঁর বেশিরভাগ কাজে। কিবরিয়ায় অসিত্মত্বের আগ্নেয় উদ্গিরণ বর্ণপ্রপাতের মতো পরিদৃশ্যমান বটে, কিন্তু নীপার আগুন উষ্ণ পুষ্পময়তার গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে।

তবে সুখদোলার বর্ণমধুর প্রকাশ নীপার শিল্পপ্রয়াসের শেষ কথা নয়। যে অপার বর্ণবিভূতি আমাদের বিহবল করে বিমূর্ত দেশে প্রেরণ করে এবং আমাদের আপ্লূত করে রাখে অফুরান করুণায়, সেই গভীরের বাণী বর্ণে সমুচ্চারিত রয়েছে নীপার কাজে। নীপা নিসর্গলীন বর্ণময় করুণার কাছে আত্মোৎসর্গ করেছেন। তাঁর সুন্দরের প্রতি যে পক্ষপাত তা প্রথমত শিল্পী বলে, দ্বিতীয়ত নারী বলে – এমনও ভাবা যেতে পারে। যে-সুন্দর নিশ্চেতন করে মানুষের মন তা বৈশ্বিক, তা আছে একই আকাশের নিচে বাংলায় ও জাপানে; ঋতুর পালাবদলে নিসর্গলোকে। বাংলা-জাপান সহাবস্থানের স্বাক্ষর আছে এ-শিল্পীর কাজে। নীপার প্রদর্শনী হয়ে গেল জাতীয় জাদুঘরে। এ-প্রদর্শনী দেখে শিল্পপ্রিয় দর্শক নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন এই সত্য যে, ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পভাষার সম্ভাবনাকে শিল্পী নতুন করে যাচাই করেছেন এবং ফলিয়েছেন নতুন শিল্পফসল। ইম্প্রেশনিস্টদের প্রেরণা ছিল জাপানের ঐতিহ্যিক উডকাট প্রিন্ট। কিন্তু সেই প্রেরণা এখন আর সচল নয়; যদিও জাপানের শিল্পধারা পরিমিতি আর বিশুদ্ধতাকে বেশি মাত্রায় অনুমোদন দিয়ে সচল রয়েছে। অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন, অ্যাদুয়ার্দ মনে ইম্প্রেশনিজমকে তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। মনের ‘রুয়ঁ ক্যাথিড্রাল’, ‘ওয়াটার লিলি’ আর ‘খড়ের গাদা’র পর বর্ণের মাত্রা প্রসারণের আর কী-ই বা বাকি রইল। বর্ণই তো প্রকৃতি, বর্ণই ঈশ্বর। তাকে নিয়ে শেষ পালাটা যেন মনেই রচনা করেছেন। বিমূর্ত শিল্পের আদিপিতা কান্দিনিস্কি ‘খড়ের গাদা’ দেখে তো অভিভূত। এখানে খড়ের গাদা কোথায়; এ যে সত্মূপীকৃত রং। কিন্তু সত্মূপ বা কোনো ফর্মই তো নেই; আছে শুধু রং। ভাগনারের সংগীত যেন এখানে ভাষা পেয়েছে। আসলে রূপ নেই, রূপবন্ধ নেই, আছে শুধু রঙের বিচিত্র চাল ও অভিব্যক্তি। গতিময়, গুঞ্জরণশীল রঙের পরিমার্জনা সংগীতকে দৃশ্যমানতা দিয়ে চলেছে।

ইন্দ্রিয়ের বিপ্রতীপ চালে শিল্পের মর্মকে তীব্রতর অভিঘাতে বোঝা যায়। নীপার বর্ণময় স্পেস যতখানি চোখের কাছে প্রতিভাত, তার চেয়ে বেশি আবেদন তৈরি করে কানের কাছে। দৃষ্টিগ্রাহ্যকে শ্রুতিগ্রাহ্য করা অথবা তার বিপরীত নিয়মেও শিল্পের অনুধাবন বিশেষ মাত্রা পায়। বর্ণের আভা আছে; আবার রঙের পুরু ক্বাথ যখন নরম-কোমল রূপ নেয় তখন রক্তের চাঞ্চল্য তাকে স্পর্শ করে দেখতে চায়। সিক্ত ভাব, জলের তারল্য এসবেও আমাদের মন সন্তরণস্পৃহ হয়ে ওঠে। বর্ণের অভিব্যক্তিই নীপার ছবিতে গভীর মনোযোগে দেখার বিষয়। বর্ণে বর্ণে সত্তার বিবিধ মুখরতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কাজে। কখনো এসব বর্ণস্বর সুউচ্চ, নিনাদিত, কখনো-বা তা অতল দিঘির মতো স্তব্ধ, কখনো আবার অস্ফুট ও অন্তর্লীন। তবে সুরের বিচিত্র আবর্তন অনুবাদ করার এক একনিষ্ঠ ধ্যান রয়েছে শিল্পী নীপার। বর্ণের ছান্দসিক যে মেজাজ ইম্প্রেশনিস্টরা রচনা করেছেন তাতে তাঁদের সহপাঠ ছিল দোবুসি ও শপ্যাঁর সংগীত। কথা প্রসঙ্গে নীপা জানালেন, গান শুনতে শুনতে তিনি ছবি আঁকেন। দোবুসি তাঁরও প্রিয়। দোবুসির সংগীতের শিরোনাম হয়েছে তাঁরও ছবির নাম।

আসল কথা, আলোর অর্কেস্ট্রা বুঝতে চেষ্টা করা। এই প্রকৃতি বিচিত্র রঙে প্রভাসিত। অনেক রং মানে অনেক রকম আলো। অনেক রকম আলো মানে অনেক রকম গতি। আর গতিকে ধ্বনি-তরঙ্গের হিসেবে বুঝতে গেলে পরিণামে সংগীতের কাছে আসতে হয়। তাই মানুষ রূপ দেখে না, রূপের জ্যামিতির হিসাব মেলাতে চায় না। ওই যে রঙিন তরঙ্গরাশি চোখের মণিতে সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে মসিত্মষ্ক ও হৃদয়ের কোষে অনুরণন তুলছে, তা-ই হয়েছে নীপার গবেষণার বিষয়। ধানের ক্ষেতে বাতাস বয়ে গেলে একটা চৌকোণ সবুজ স্পেস হয়ে যায় শ্যামল বাংলার সংগীত। পাকা ধানের ক্ষেত টকটকে হলুদের উষ্ণ গান শোনায়। এমনই আরো অনেক বর্ণময় প্রান্তর, জলাভূমি, পাহাড়, বনভূমি নিয়ত মানুষ পাঠ করে চলেছে। যদি গাছের বা ফুলের নাম-পরিচয়ের প্রশ্ন তোলা হয় তবে কজনই আর উত্তর দিতে পারে। তবে অবাক হয়ে মন ভরে প্রায় সবাই পান করে রঙিন নির্যাস। এই চিরহরিৎ দেশে প্রকৃতি আমাদের বর্ণ-পরিধির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রঙের কবিতা শোনাচ্ছে, বর্ণিল সংগীত শোনাচ্ছে। নদীমাতৃক গ্রীষ্মম-লীয় বাংলা আর ভূমধ্যসাগরলগ্ন সূর্যালোকিত ফরাসি দেশে; – এই দুই দ্রাঘিমায় ইম্প্রেশনিস্ট শিল্প ভূমিষ্ঠ হওয়ার যথাযথ কারণ রয়েছে। অন্তত নীপার ছবি তা-ই বলছে।

রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুর, নরম আলোর অপরাহ্ণ, চাঁদের আলোর মায়াময় আবেশ এসব অনুভব যেমন আছে নীপার কাজে, ঠিক তেমনি আছে কলেস্নালিত জলের শব্দ, ভেজা মাটির রূপ আর বিচিত্র বর্ণের ফুল-ফসলের ঘ্রাণ। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও শিল্পসৃজনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ঘ্রাণহীন কোনো বস্ত্ত নেই। ভেজা মাটির শুধু নয়, নয় শুধু ফুল-ফসল আর বৃক্ষের ডালপালা ও পাতার, মরুময় দেশও গান গায়, ঘ্রাণ আছে মরুভূমির ধূলিরও।

সুন্দরের টানে জৈবিক আশেস্নষে বর্ণের সঙ্গে নিজের সৃজনসত্তা নিয়ে শিল্পের খেলায় মেতেছেন নীপা। নিসর্গের সঙ্গে যখন ইম্প্রেশনিস্ট প্রেম হয় তখন রঙের রক্ত-রস শুষে নেওয়ার বাসনা কোনো বাধা মানে না। নীপার বর্ণযোজনেও সেই প্রেমার্তি আছে, নিজেকে বর্ণপস্নাবিত করে রাখার সুখ আছে। নয়নাভিরাম মন অকূল সুন্দরের কাছে এসে নিজের অনিত্যতা অনুভব করে; আর তখন অতীন্দ্রিয় কোনো কুহক মানুষী সত্তাকে নিমজ্জিত করে বিষাদময়তার সাগরে। ‘আমার বিষাদ নীলে’ নামক ছবিতে নীপা বিশদ করে দেখিয়েছেন মানব-অসিত্মত্বের সেই কষ্ট। এই কষ্ট বা যাতনা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায়। আমি যে বিপুল স্পেসে কত ক্ষুদ্র তার অভিজ্ঞতা হয় আমাদের নীল আকাশ, নীল সমুদ্র আর পাড়হীন মৃন্ময়লোকে বসবাস করে।

বর্ণ অধরালোকে ভ্রমণের বাহন। এ-জীবন রঙের প্রপঞ্চে অনুভব করে জীবনের রহস্য। বিচিত্র বর্ণের আলোর মধ্যে আমাদের বেঁচে থাকা। কালো-অন্ধকারেও আমরা আলোর সংকেতে পাঠ করি। কালোও আমাদের অপরিমেয় গভীর স্পেসে টেনে নিয়ে যায়। এ-জীবন তো এই নিখিলের বর্ণিল সাগরে ডুবসাঁতার; বর্ণাপস্নুত মাকসুদা ইকবাল নীপার ছবির দিকে তাকালে প্রকৃতির ভেতরে চলে যেতে হয়। নীপা নিসর্গের সঙ্গে লীন হতে চেয়েছেন; দূর থেকে দেখে নিসর্গকে অাঁকেননি। শুধু বর্ণের জৌলুসে মুগ্ধ হয়ে নয়, শিল্পী দেহ-মনে অনুভব করেছেন লাল, নীল, হলুদ, সবুজের রাগ-অনুরাগ কড়ি ও কোমলে।