পক্ষীজীবন

লেখক: মাহবুব তালুকদার

 

একবার পাখিদের এক মহাসমাবেশ হয়েছিল। হাজার হাজার পাখি মিলিত হয়েছিল সেই মিলনমেলায়। কত বাহারি আর অপরূপ তাদের শরীরের গঠন। কারো কারো গায়ের রং রংধনুকেও হার মানায়। তাদের রং দেখে বহুবর্ণ ফুলগুলো পর্যন্ত লজ্জা পেয়ে যায়। আমি বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম, পৃথিবীতে কত সুন্দর সুন্দর পাখি আছে, আছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি। তাদের বসার ভঙ্গি, ওড়ার ভঙ্গিও কত অভিনব। কেউ পাখা মেলে ওড়ে, কেউ পাখা না মেলে বাতাসে ভেসে যায়। সেসব দেখে মনটা অহংকারে ভরে উঠেছিল। আমিও তাদের মতো পাখি। যদিও আমি রঙিন পাখি নই, আমি নিতান্তই কালো, নিকষ কালো একটি কাক।

বিধাতা আমাকে সুরেলা শব্দের কণ্ঠ দেননি, দিয়েছেন কর্কশ শব্দের স্বর। আমার ডাক শুনে কেউ কান পেতে থাকে না, সম্ভব হলে শ্রবণযন্ত্রটি বন্ধ করে রাখে। বিধাতা আমাকে রূপও দেননি, আমার দিকে কেউ বিমোহিত হয়ে তাকায় না। কবে যেন একটা গান শুনেছিলাম, ‘রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব।’ কিন্তু আমার কণ্ঠে এ-গান শুনলে কেউ আমাকে ভালোবাসবে না। কাউকে ভালোবাসার জন্য যে-গুণের প্রয়োজন হয়, তা আমার আছে। অফুরন্ত ভালোবাসা আছে আমার এই বক্ষপুটে। কিন্তু কে তার খবর রাখে? জীবজগতে একটা প্রবাদ আছে : ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’ এরকম কিছু একটা। আমার রূপ নেই বলে কারো দৃষ্টি রূপের সীমানা পার হয়ে গুণের সীমায় পৌঁছাতে পারে না।

অনেক সময় মনে হয়, আমি অপাঙ্ক্তেয় অস্পৃশ্য। কারা আমাকে অস্পৃশ্য করেছে? এক শব্দে বলতে পারি, মানুষ! মানুষ আমাকে তাচ্ছিল্য করে নাম দিয়েছে কাউয়া। সেদিন একজন রাজনৈতিক নেতা বলেছেন, তাঁর দলে নাকি কাউয়া ঢুকে পড়েছে। কথাটা নিশ্চয়ই তিনি আদর করে বলেননি। কাউয়া অর্থ নিকৃষ্ট জাতের প্রাণী বা পাখি। তবে এখানে মনে হয়, কাউয়া অর্থ উড়ে এসে জুড়ে বসা। কিন্তু আমরা তো কারো এলাকায় উড়ে এসে জুড়ে বসি না। বরং আমাদের এলাকায় অন্যরা উড়ে এসে জুড়ে বসে। কথাটা পরে ব্যাখ্যা করব।

মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই জীবনের সব কথা নয়। জীবনটা অনেক সুন্দর। এই যে আমি বিরান বনভূমিতে গাছের ডালে বসে জীবনের কথা ভাবছি, এর চেয়ে সুখের আর কী আছে? আমি তো ইচ্ছা করলেই উড়ে যেতে পারি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, যা মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী পারে না। এই বনভূমির সবটাই মনে হয় আমার নিজস্ব এলাকা। কখনো কখনো আমি মানুষের বসতির দিকে যাই। গাছের ডালে বসে ওদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা শুনি। মনে হয় বিশ্ব-সংসারটা অনেক অনেক বড়। একবার কাতু আমাকে অনেক দূরে কোথাও নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে গাছগাছালি কিছুই নেই। আছে কেবল ইটের পরে ইট সাজিয়ে মানুষের ঘরবাড়ি। কাতু আমাকে বলেছিল, এর নাম হচ্ছে শহর। শহরে যেসব লোক বাস করে, তারা গ্রামের মানুষের চেয়ে আলাদা। শহরের মানুষেরা উড়তে না পারলে কী হবে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে তারা গাড়ি ব্যবহার করে। কাতু আমাকে গাড়িও চিনিয়েছিল। গাড়িগুলো ঘরবাড়ির মতোই। রাস্তার ওপর দিয়ে গড়গড়িয়ে চলে। কাতু বলেছিল, একরকম গাড়ি আছে, তা নাকি আমাদের মতো আকাশে ওড়ে। আমি অবশ্য তেমনটি দেখিনি। কাতু বলেছে, সেই উড়োপাখি একদিন সে আমাকে চিনিয়ে দেবে। এই যা, বলতে ভুলে গেছি। কাতু হচ্ছে আমার স্বামী, আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে থাকি।

গল্পটা শুরু করেছিলাম আমার আত্মকথা দিয়ে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনেক চিন্তা আমার মনে আসে। আবার ইতিবাচক চিন্তাও যে মনে হয় না, এমন নয়। মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে কুৎসিত করে তৈরি করার জন্য। কারণটা বোঝা খুবই সহজ। আমি যদি সুদর্শনা হতাম, তাহলে টিয়া-ময়না বা অনেক সুন্দর সুন্দর পাখির মতো আমার স্থান হতো মানুষের বাড়ির খাঁচায়। সারাজীবন বন্দি হয়ে থাকতে হতো শৌখিন মানুষের কারাগারে। এই যে দুটি ডানা মেলে আমি আকাশে উড়ে যেতে পারছি, এর অনুভবই আলাদা। এমন স্বাধীনতা আমি কোথায় পেতাম? আরেকটা কথা আছে। মানুষের খাদ্যতালিকায় আমার বা আমাদের নাম নেই। থাকলে খবর ছিল। অনেক পশুপাখি মানুষ নিধন করে নিজেদের উদরপূর্তির জন্য। ডাহুক, বক, ছোট ঘুঘু পাখিও বাদ যায় না তাদের জিহবার লালসা থেকে।

ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি যখন খুব ছোট, সবে উড়তে শিখেছি, তখন থেকেই আকাশ জয়ের স্বপ্ন আমার। আমার মা খুবই উদ্বিগ্ন ছিল আমাকে নিয়ে। বলেছিল, বেশি দূরে যাস না। পথঘাট চিনতে পারবি না।

আমি হেসে বলেছিলাম, আকাশের আবার পথঘাট আছে নাকি?

শোনো মেয়ের কথা! আকাশের পথঘাট না থাকলেও পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ তো আছে। সেটা বোঝার সময় এখনো তোর হয়নি।

কেন মা? তুমিই তো বলেছো, সকালবেলা যেদিক থেকে সূর্য ওঠে সেটা হচ্ছে পূর্ব। আর সন্ধ্যাবেলা যেদিকে সেটা অস্ত যায়, সেটা হচ্ছে পশ্চিম। পশ্চিম মুখ করে থাকলে ডান দিকে উত্তর আর বাঁ-দিকে দক্ষিণ। এই দিগ্বিদিক চেনা তো তোমার কাছেই শেখা।

তুই আসলেই খুব লক্ষ্মী মেয়ে। একদিন বলাতেই সব শিখে গেছিস। কিন্তু আমার ভয় হয়-

আবার কিসের ভয়?

অনেক সময় সূর্য দেখা যায় না। আবার দুপুরবেলা সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে, তখন দিক চেনা মুশকিল।

এসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই সবকিছু জেনে-বুঝে যাব।

কিন্তু মায়ের উদ্বিগ্নতা যে অমূলক নয়, তা বোঝা গেল একটা দুর্ঘটনার পরে। সে-সময়ে একদিন বেশি উড়তে না পেরে একটা বাড়ির উঠানের এককোণে বসে পড়েছিলাম। বন তো জন্ম থেকেই দেখে আসছি, কিন্তু মানুষের বাড়িঘর কখনো দেখিনি। মায়ের মুখে মানুষের কথা শুনলেও তাদের সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা হয়নি। ভেবেছিলাম মানুষ ও তাদের ঘরবাড়ি সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতা হবে। কিন্তু মানুষ যে আমাদের মতো গাছে না থেকে মাটিতে বসবাস করে, এটা আমার আগে জানা ছিল না। অবাক হয়ে দেখছিলাম মানুষের কা-কারখানা। ওরা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে যায়, আমাদের মতো উড়তে পারে না। মায়ের মুখে মানুষের কথা আগে শুনলেও ওদের এই অসহায়ত্ব দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আহা রে! আমরা যে নিমেষে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যেতে পারি, ওদের যেতে হয় টুকটুক করে হেঁটে। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, সব মানুষকেই দেখলাম সারাশরীর কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে ঢেকে রেখেছে। তাহলে আসলে মানুষটা কী, দেখতে কী রকম, সে-কথা কে বলতে পারবে?

আমি যখন এসব কথা ভাবছি, হঠাৎ দেখি একটা বাচ্চাছেলে আমাকে ধরে আমার পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেছে। কী আশ্চর্য! আমি তো ওদের কোনো ক্ষতি করিনি, তাহলে ওরা আমাকে বাঁধবে কেন? আমি প্রথমে কা কা বলে ছেলেটাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে আমার কথা কিছুই বুঝল না। উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কোনো লাভ হলো না। তাহলে এ-অবস্থায় আমার কী করণীয় তা ধারণা করতে চেষ্টা করলাম। ছেলেটা আমাকে তুলে নিয়ে গেল বাড়ির দহলিজে। এক মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, এটা কী হচ্ছে?

এই পাখিটাকে ধরেছি। আমি একে পালব। ছেলেটি বলল।

টিয়া নয়, ময়না নয়, এই কাক পালবে তুমি?

কেন মা? কাক কি খারাপ?

কাক কোনো ভালো পাখি নয়।

তাতে কী? আমি ওকে কথা বলতে শেখাব।

কাক বলবে কথা? দেখছ না ওদের গলার আওয়াজ কেমন কর্কশ।

তাহলে এটাকে জবাই করে খেয়ে ফেলি।

হায় আল্লাহ! ছেলেটার দেখছি বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই। মা বলল, কোনো কোনো পাখি খাওয়া যায়, কিন্তু কাকের মাংস খাওয়া যায় না।

কেন খাওয়া যাবে না? ভালো করে রান্না করলেই তো হয়।

এ ছেলেকে কিছুতেই কিছু বোঝানো যাবে না। শোনো আমান, কাক সবসময় নোংরা ঘাঁটে, নোংরা খায়। তাই কাকের মাংস হালাল নয়।

হালাল কাকে বলে মা?

আমাদের ধর্মে কিছু কিছু জীবজন্তু-পাখি জবাই করে খাওয়া হালাল করা হয়েছে, অনেকগুলো জীবজন্তু খাওয়া নিষেধ করা হয়েছে। যেমন কুকুর, বিড়াল, শূকর – এসব।

তাহলে এই কাককে নিয়ে আমি কী করব? আমান বলল।

এটাকে জঙ্গলে গিয়ে ফেলে দিয়ে এসো। আপনা থেকেই উড়ে চলে যাবে।

এটা তো পুরো কাক না, কাকের বাচ্চা। ও হয়তো উড়তেই পারবে না। তাছাড়া দেখছ না কেমন ঝিমুচ্ছে? ও হয়তো অনেকক্ষণ থেকে কোনো খাবারই খায়নি। আমান জিজ্ঞাসা করল, মা, ওকে কি নাশতা করাতে পারি?

এখানেই তুমি কিছু খাবার এনে দিতে পারো।

ছেলেটি ও তার মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে গেল। সত্যিই তো, সকাল থেকে আমি কিছুই খাইনি। ছেলেটা কী করে বুঝতে পারল যে, আমি ক্ষুধার্ত?

সত্যি বলতে কি, মানুষ সম্পর্কে আমি এক গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। কখনো মনে হচ্ছে ওরা খুব নিষ্ঠুর, কখনো মনে হচ্ছে খুব উদার। পরবর্তীকালে আমি অবশ্য মানবিক বলে একটা কথা শুনেছি! মানুষ খুব মানবিক, এরকম একটা কথা! মানুষ থেকেই মানবিকতার উৎপত্তি, মানুষ তো মানবিক হবেই। তবে অনেক দেখেশুনে মনে হচ্ছে, পৃথিবী মানুষের বদলে অমানুষে ভরা। তাদের চেহারা মানুষের মতো হলেও ভেতরে মানুষের কোনো নামগন্ধ নেই। যথাস্থানে এর পরিচয় পাওয়া যাবে।

আমান আমাকে নিয়ে এলো ওদের বাড়ির পেছনদিকে। এদিকে একটা বাঁশঝাড় আছে, আছে আরো অনেক গাছগাছালি। আমাকে একটা নিচু আমগাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে আমান বলল, তুমি চলে যাও।

না, আমি যাব না। আমি বললাম।

আমান আমার কথা শুনতে পেল না।

কী ব্যাপার? উড়ে যাচ্ছ না কেন? আমান আবার বলল।

আমার এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে। আমি জানালাম।

আমান আমার কথা শুনতে পেল না।

আমান আমাকে রেখে চলে যাচ্ছিল। আমি কা কা করে ডেকে বললাম, আমি এখন যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিদিন আসব। তুমি খুব ভালো। আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই।

আমার এত কথাতেও আমান পেছনে ফিরে তাকাল না। সম্ভবত সে আমার কথা শুনতে পায়নি। নাকি সে আমাদের ভাষা বুঝতে পারেনি!

আমি বাসার দিকে উড়াল দিলাম। বাসা খুঁজে পেতে একটু অসুবিধা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম। অনেকক্ষণ আমাকে না দেখে মা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। আমাকে ফিরতে দেখে মা বলল, কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আমি ভাবলাম কোনো বিপদ-আপদ হলো নাকি? এই বয়সে একা একা বাইরে ওড়াউড়ি ঠিক নয়।

আমি সবিস্তারে মাকে আজকের সব ঘটনা খুলে বললাম।

মা আমার কথা শুনে ভৎর্সনা করে বলল, খুব বেঁচে গেছিস আজকে। ওরা তোর কোনো ক্ষতি করতে পারত।

কী আর ক্ষতি করবে? আমরা তো পোষমানা পাখি নই যে, আমাদের খাঁচার ভেতর ভরে রাখবে।

আরো বড় ক্ষতি তো হতে পারত।

আমরা হালাল পাখি নই। সেজন্য মানুষকে আমাদের কোনো ভয় নেই।

মা বলল, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। আমাদের তিনি সুন্দর করে সৃজন করেননি, আমাদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন, কিন্তু গান দেননি। একসময়ে নিজের রূপ ও গুণের কথা চিন্তা করে আমার খুব আফসোস হতো। এখন দেখি তিনি যা করেছেন, আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেছেন।

এরপর আমি যখন আরো বড় হয়েছি, আমার মধ্যে পুরোপুরি পাখিত্ব এসেছে, আমি বুঝতে শিখেছি, প্রাণিজগতের সৃষ্টির মধ্যে একটা ভারসাম্য আছে। পশুপাখি বা কীটপতঙ্গের একেকজনের একেকরকম গুণ। সেটা বাইরে থেকে ঠিক বোঝা যায় না। একটু চিন্তা করলে, অনুধাবন করলে বিষয়টা স্পষ্ট হয়। সৃষ্টিকর্তা একেকজনকে একেকরকম ক্ষমতা দিয়েছেন। কেউ হয়তো ভালো দৌড়াতে পারে। কেউ হয়তো তেমন দৌড়াতেই পারে না। কেউ হয়তো গাইতে পারে, নাচতে পারে না, কেউ হয়তো নাচতে জানে, গাইতে জানে না। আমরা জন্মগতভাবে যা-কিছু পেয়েছি, তার জন্য হতাশার কোনো অবকাশ নেই। অন্যের ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করতে যাওয়া বোকামি মাত্র। আমি যা-কিছু পেয়েছি, তার জন্য আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

কাতুর সঙ্গে আমার জীবনের গল্পটা খুবই মামুলি, আবার আমার কাছে মোটেই মামুলি নয়। আমি দেখলাম, একদিন একটা কাক পুকুরপাড়ে গাছে বসে খুব জোরে কা-কা করে ডাকছে। আমি উড়ে কাছে গিয়ে বললাম, কী ব্যাপার? এত চেঁচাচ্ছ কেন?

আমি না চেঁচালে তুমি কি এখানে আসতে?

সেটা অন্য কথা। কেন চেঁচাচ্ছ বলো।

আমার বড় একা লাগছে। সে বলল।

তাহলে আমার কিছু করার নেই। আমি ভেবেছিলাম কেউ হয়তো বিপদে পড়েছে। কাকদের বিপদ দেখলে সবাই এগিয়ে আসে। যা হোক, আমি চলি।

বা রে! আমি একা একা বসে থাকব নাকি?

আরো জোরে চেঁচাতে থাকো। নিশ্চয়ই অন্যরা তোমার ডাক শুনে কাছে আসবে।

আমার অন্য কাউকে দরকার নেই। তোমাকে দরকার।

কথা নেই, বার্তা নেই, আমাকে তোমার দরকার বললেই হলো? আমাকে তোমার কিসের দরকার বলো শুনি?

সরাসরি আমি কথাটা তোমাকে বলছি।

বলো। সরাসরি কথাই আমার পছন্দ।

কা। আমি তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চাই।

কা! কা! চেনা নেই, জানা নেই। আমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চাইলেই হলো?

কা! কা! কা! চেনাজানা হতে কতক্ষণ? আমার বাসায় চলো। চেনাজানা করে ফেলব।

তোমাদের পুরুষ কাকদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।

কয়টা পুরুষ কাককে দেখেছো এ পর্যন্ত?

কাউকে দেখিনি। দেখতেও চাই না।

কেন? কী হয়েছে? কাউকে না দেখে পুরুষদের সম্পর্কে এমন ধারণা হলো কেন?

আমি দেখিনি, তবে শুনেছি। তোমরা খুব স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝো না।

আমার অবাক লাগছে এই ভেবে যে, যাদের তুমি দেখোনি, কেবল তাদের কথা অন্যের কাছে শুনে তাদের সম্পর্কে এমন খারাপ ধারণা করলে কেন?

তোমাকে সব কথা বলতে পারব না। সোজা কথা বলছি। আমার জন্মের পর আমার জন্মদাতা কাক আমার মাকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু আমার মায়ের কোনো দোষ ছিল না।

খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এমন ঘটনা পক্ষীদের জীবনে না ঘটাই উচিত।

ওর কথা শুনে আমার মনটা বিগলিত হলো। সত্যি তো! সব পুরুষই যে খারাপ হবে তার কোনো মানে নেই। অবশেষে আমরা দুজন একসঙ্গে উড়ে কাতুর বাসায় চলে গেলাম। দুদিন ধরে মা বাসায় নেই। সুতরাং কাতুর ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে পরে আলাপ করলেই চলবে।

আমার ও কাতুর দাম্পত্য জীবন এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। পাখির জীবন যে এত রোমাঞ্চময়, এত রোমান্টিক, তা আগে জানা ছিল না। কাতু তা বুঝিয়ে দিলো আমাকে। ভালোবাসা – এই ছোট শব্দটা যে আমাদের জীবনে কত গভীর সত্য, তা এখন বুঝতে পারি। এর উপলব্ধি, অনুভব মনের ভেতরে বহুবর্ণ রং ছড়ায়। ভালোবাসায় আক্রান্ত কাক আর কাক থাকে না, তার দেহের ভেতরে লাল রঙের বিস্তার তাকে অন্য এক অনুভূতির জগতে তুলে নিয়ে যায়। আমার অনেক সময় জানতে ইচ্ছা হয়, মানুষ কি আমাদের মতো ভালোবাসতে পারে? ওদের ভালোবাসার ভাষা কী? নিশ্চয়ই মানুষেরও একরকম ভালোবাসা আছে। নইলে ওদের সন্তান হয় কী করে? কাতু অবশ্য আমাকে বলেছে, ভালোবাসা সন্তান হওয়ার পূর্বশর্ত নয়। ভালোবাসার সঙ্গে সন্তান হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কথাটা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। কারো সন্তান হবে, কিন্তু তার পেছনে ভালোবাসা থাকবে না, এটা কী করে হয়?

সন্তানের প্রসঙ্গ যখন উঠল, তখন আমার জীবনের একান্ত গল্পটা বলে দেওয়া দরকার। সেটা এক অদ্ভুত ঘটনা। এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে তা আমি ভাবতে পারিনি। একদিন দুপুরে আমি যখন একা একা বাসায় রয়েছি, কাছাকাছি একটা গাছের ডালে বসে একটা কোকিল মিষ্টিমধুর স্বরে ডাকতে শুরু করল। কোকিলের ডাক আগে শুনলেও এত মধুর কণ্ঠের আওয়াজ আমি আগে শুনিনি। ওর শব্দতরঙ্গ আমার কানের ভেতর দিয়ে মর্ম স্পর্শ করল। সমস্ত বনভূমি যেন মুখরিত হয়ে উঠল একটি কোকিলের তানে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে তার কাছাকাছি গিয়ে বসলাম। কিছু বলতে লজ্জা হচ্ছিল। আমার কণ্ঠস্বরের কর্কশতা প্রকৃতি ও পরিবেশকে নষ্ট করে দেবে এই ভয়ে।

কিছুক্ষণ পরে কোকিলটি ওর তান থামাল। আমি ওর আরো কাছাকাছি গিয়ে বসলাম।

কোকিল আমাকে দেখে মৃদুস্বরে বলল, আমরা বন্ধু হতে পারি?

নিশ্চয়ই! কিন্তু আমার মতো একজন গুণহীন পাখিকে তোমার বন্ধু করে কী লাভ বলো!

সে বলল, লাভটাই কি জীবনের সবকিছু? সবাই কি লাভ-লোকসানের হিসাব করে জীবনপাত করবে? খুব ভালো লাগল ওর কথা শুনে। পাখিদের তো এমনই হতে হবে। পাখিরা যদি স্বার্থহীন না হতে পারে, তাহলে জীবজগতে আর কে স্বার্থহীন হবে?

কোকিল বলল, চলো! তোমার বাসায় যাই।

চলো।

আমার বাসস্থান দেখে কোকিল আত্মহারা। এত সুন্দর বাসা সে আগে কখনো দেখেনি। কোকিলটা ফিরে যাওয়ার আগে আমাকে বলল, একটা কথা বলব?

বলো।

আমি তোমার বাসায় ডিম পাড়তে চাই।

মানে?

সে আমতা আমতা করে জানাল, আমরা মানে কোকিলরা ডিম পাড়তে পারি। কিন্তু আমাদের ডিম ফুটে বাচ্চা বড় হয় তোমাদের ঘরে। কাক বা অন্য কোনো পাখির ঘরে আমরা ডিম পেড়ে যাই। তোমরা তা দিয়ে আমাদের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে দাও।

কী আশ্চর্য! এমন তো কখনো শুনিনি। আমি অবাক হয়ে বললাম।

যাওয়ার সময় সে আমাকে বলে গেল, তুমি যদি আমাকে এ-ব্যাপারে সাহায্য করো, আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। তবে তোমাকে আরেকটা কথা বলি।

বলো।

আমি কিন্তু তোমার অগোচরে তোমার বাসায় এসে ডিম পেড়ে যেতে পারতাম। তুমি হয়তো ভাবতে এ-ডিম তুমিই পেড়েছ। নিজের ডিম ভেবে যত্ন করে তুমি তাতে ওম দিতে। কিন্তু আমি তা করিনি, যদিও কোকিলদের অনেকেই তা করে থাকে।

কেন তা করোনি? আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

ব্যাপারটা প্রতারণা হয়ে যেত। নিজের সন্তানের জন্ম নিয়ে আমি প্রতারণার আশ্রয় নিতে চাইনি।

এ-কথা বলে কোকিল চলে গেল।

সন্ধ্যার পর কাতু বাসায় ফিরলে ঘটনাটা জানালাম তাকে। কাতু বলল, ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। আমরা জীবনরহস্যের অনেক কিছু জানি না বলে আমাদের কাছে এটা অস্বাভাবিক মনে হয়। কোকিল যে পরের ঘরে ডিম পেড়ে যায়, তা সবাই জানে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।

তাহলে তুমি বলছো, আমি কোকিলকে বলব আমাদের বাসায় সে ডিম পেড়ে যেতে পারে।

অবশ্যই বলবে। কাউকে সাহায্য করা পাখিদের ধর্ম।

এরপর আর কোনো কথা চলে না। দুদিন পরে কোকিলটা এলে আমি তাকে আমার সম্মতির কথা জানালাম। সে খুব খুশি হলো। আমার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে সে আদর করল আমাকে।

কয়েকদিনের মধ্যেই সে জানাল, তার ডিম দেওয়ার সময় হয়েছে। আমি তাকে ডিম দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলাম।

কী আশ্চর্য! আমি কেবল পরের ডিমের কথা বলছি, নিজের ডিমের কথা বলা হলো না। আসলে কোকিলের কথা বলতে বলতে নিজের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। ডিম পাড়ার মরশুমে আমিও দুটো ডিম পেড়েছি। সেগুলো যত্নসহকারে ওম দিচ্ছি। এই ওম দেওয়ার ব্যাপারটাও এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমার বুকের তলে ওদের উত্তাপ দিতে গিয়ে মনে হয়, একরাশ মমতা ও স্নেহ যেন ছড়িয়ে দিচ্ছি ওদের শরীরে। ওরাও যেন ভালোবাসা দিয়ে আগলে ধরে আছে আমাকে। কোকিলের ডিমে তা দিতে গিয়ে কি একই অনুভূতি হবে আমার? কি জানি!

ডিমের কথা ভাবতে গিয়ে আমি ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা বাচ্চাদের কথা ভাবতে থাকলাম। ওরা যখন পৃথিবীর মুখ দেখবে, আলো-বাতাসের স্পর্শ পাবে, কেমন অনুভূতি হবে তাদের? আমারই-বা মনের অবস্থা কী হবে, ভাবতে গিয়ে শিহরিত হলাম! আমার স্পর্শে পক্ষীশাবকরা পৃথিবীতে এসে নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করবে, এই ভাবনা এক অনন্য অনুভবের জন্ম দিলো আমার মনে! আমি বুঝতে পারলাম, আমার ভেতরের বাৎসল্যরস উপচে উঠছে দেহমন জুড়ে। সন্তানের মা হতে পারা যে কী জিনিস, তা কেবল যারা সন্তানের জন্ম দিয়েছে তারাই বুঝতে পারে।

একদিন যে-সন্তানরা ছিল কল্পনায়, তারা বাস্তবে রূপ পেল। আমার ঘরে এলো দুটো সন্তান, আমার ও কোকিলের। ওদের দুজনকে পেয়ে আমার জীবন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। আমার সন্তানের নাম দিলাম কাকা আর কোকিলের সন্তানের নাম কুহু। কাকা আর কুহুকে নিয়ে আমার দিনগুলো যেন সুখের সাগর ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি ওদের বুঝিয়ে দিলাম ওরা দুজন পরস্পর ভাই। সম্প্রদায়গত বিভাজন সত্ত্বেও অপরকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে মহানুভবতা রয়েছে, এটাই হচ্ছে পাখিদের জীবনের শিক্ষা। এই শিক্ষা জীবনভর মনের মধ্যে লালন করতে হবে। পাখিদের রাজ্যে আমরা এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি গড়ে তোলায় ব্যাপৃত।

একটা জরুরি কথা এখানে বলা দরকার। কাকা ও কুহু বাইরে যায়, তখন আমি খুব উদ্বিগ্ন অবস্থায় থাকি। যতক্ষণ ওরা বাসায় ফিরে না আসছে ততক্ষণ আমার মধ্যে একটা ভয় বাসা বেঁধে থাকে। পাখিদের জগতে সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, গুম হওয়া। আমার স্বামী কাতু যে বেড়াতে গিয়ে আর বাসায় ফিরে আসেনি, আজকাল মনে হয় সেটাও ছিল গুমেরই ঘটনা। কুহুর মা সেই যে বাসায় ডিম পেড়ে গেল, তারপর আর আমাদের এখানে ফিরে আসেনি। আমি তো দিনের পর দিন অপেক্ষা করে আছি, কখন সে ফিরে আসবে! দু-একদিন কুহু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, আমার মা কোথায়?

বেড়াতে গেছে। নিশ্চয়ই সে ফিরে আসবে।

না, আসবে না। আমার মন বলছে, নিশ্চয়ই সে গুম হয়ে গেছে। তুমি আমার মাকে এনে দাও।

আমি কী করে আনব? তুই বরং গাছের মগডালে বসে তোর মাকে ডাকতে পারিস। আমার ডাক শুনলে তোর মা আসবে না।

কুহু প্রায়ই গাছের মগডালে উঠে ওর মাকে ডাকে। কখনো মিষ্টিমধুর স্বরে গান গাইতে থাকে। কিন্তু ওর মা আর আসে না।

একদিন কুহু তার মায়ের জন্য একেবারে ভেঙে পড়ল। বলল, আমার মা নিশ্চয়ই মরে গেছে।

অমন অলক্ষুনে কথা বলতে নেই কুহু। আমি তোর মা।

মিথ্যা কথা! তুমি আমার মা হতে পারো না।

মানে?

তুমি ভিন্ন জাতের পাখি। আমিও ভিন্ন জাতের। আমাদের মধ্যে কোনো মিল নেই।

তুই আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিস। আমি তোকে পেটে ধরিনি ঠিক, কিন্তু প্রতিদিন ওম দিয়ে তোকে জীবন দিয়েছি। একজন মা সন্তানের জন্য যা করে তাই করেছি আমি।

তাতেই সব হয়ে গেল? অভিমানভরে বলল কুহু।

কেন হবে না? কাকার সঙ্গে কোনোদিন তোকে আমি আলাদা করে দেখিনি। যেটুকু পেয়েছি খাবার এনে তোদের দুজনকে খাইয়েছি সমান করে। এরপরও আমাকে তুই মা বলে ডাকবি না?

আমি খুব দুঃখিত। আমার মন ভালো নেই। বলে কুহু উড়াল দিয়ে অন্য বনে চলে গেল।

কুহুর মায়ের অন্তর্ধান নিয়ে আমি খুবই শঙ্কিত। সত্যি সে গুম হয়েছে কিনা কিংবা মারা গেছে কিনা, জানার কোনো উপায় নেই। কাতু যখন চলে গিয়েছিল তখন মনে ক্ষীণ আশা ছিল একদিন সে ফিরে আসবে। দিনে দিনে সেই আশা হতাশায় রূপান্তরিত হয়েছে। কাতু আর ফিরে আসেনি। কাতু নিশ্চয়ই গুম হয়েছে।

আচ্ছা, মানুষও কি এমনভাবে গুম হয়? কাউকে কোনো জানান না দিয়ে সে-ও কি লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যায়? কার কাছে এ-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে?

আজকাল কুহু মাঝে মাঝে বাসায় ফেরে না। রাতে অন্য কোথাও থাকে। আমি কিছু বলতে পারি না। মেয়ে বড় হয়েছে। তাকে কি আর আগের মতো খবরদারি করা যায়? তাছাড়া আমার একটু ব্যক্তিগত অভিমানও আছে। কুহু আমাকে মা বলে স্বীকার করে না। মনে করে, আমি তার আসল মা নই। কিন্তু যে মা তাকে অস্ফুট ডিম হিসেবে আমার বাসায় ফেলে রেখে চলে গেল, একদিনের জন্যও কোনো খোঁজখবর করল না, সে-ই হলো তার আসল মা? আমি কেউ নই!

দিনগুলো একরকম কেটে যাচ্ছিল আমার। তারপর এলো সেই ভয়াবহ রাত। সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বাতাসের দমকার সঙ্গে বৃষ্টির প্রকোপ বাড়তে থাকল। সন্ধ্যার দিকে বোঝা গেল, এটা সাধারণ কোনো ঝড় নয়, প্রকৃতি-বিধ্বংসী চরম দুর্যোগপূর্ণ কোনো অচেনা তা-ব। এর নামই বুঝি কেয়ামত! বাসায় আমি আর কাকা ছাড়া অন্য কেউ নেই। অন্য কেউ বলতে কুহু। গতকাল সে বাড়ি ছেড়ে গেছে। তবে এখন সে রাতে ফিরে না এলে আগের মতো উৎকণ্ঠা নিয়ে জেগে থাকি না। মনে হয়, একসময় সে ফিরে আসবেই। অন্যদিকে কাকাও ওর সঙ্গে বাইরে উড়ে যেতে চাচ্ছিল। আমি বারণ করেছি, ভালোই করেছি। এই প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে সে কোথায় যেত? ঝড়ের গতিবেগ দেখে কাকা ভয়ে কাঁপছে। আমি তাকে অভয় দিয়ে বলেছি, আমি তোর মা। আমি তো তোর সঙ্গে আছি।

রাত গভীরতর হলো, আমাদের ভয় আরো বাড়ল। ঝড়ের গতিবেগ সহ্য করতে না পেরে মাঝে মাঝে একটা-দুটো বড় গাছের পতনের শব্দ শোনা গেল। কী ভয়ংকর সেই পতনের আওয়াজ! কাকা তখন আমাকে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করল, মা, আমাদের গাছটাও কি ভেঙে পড়বে?

আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বলি, আমাদের গাছটা অত বড় নয়। তাছাড়া আমাদের বাসার ওপরে আছে বিশাল এক বটগাছ। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের রক্ষা করবে। তুই কোনো চিন্তা করিস না।

কথাটা বললাম বটে, কিন্তু আমারই কি চিন্তা কম হচ্ছে? হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখতে পারছি না। এহেন দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। কিন্তু তারপর এলো সেই মহাপ্রলয়ংকর মুহূর্ত। বিকট এক শব্দ করে ওপরের বটগাছটা আছড়ে পড়ল আমাদের মাথার ওপর। বুঝতে পারলাম, বটগাছ সমূলে উৎপাটিত হয়ে আমাদের গাছের গায়ের ওপরে পড়ছে। আমরা যেন ক্রমাগত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। কাকা আর্তচিৎকার করে উঠল, মা! মা!

কিন্তু আমি ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছি। ওর ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থা নেই আমার। আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, বুঝতে পারলাম আমাদের আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষই আমাদের ধ্বংসের প্রধান কারণ। আমাদের ছোট বাসস্থানের নাম-নিশানা পর্যন্ত আর নেই। কিন্তু আমি চোখে দেখতে পাচ্ছি না কেন? কী হয়েছে আমার। বুঝতে পারলাম, একটা ডালের আঘাত পেয়ে আমার দুটো চোখই হারিয়েছি। পরক্ষণে মনে হলো, কাকার কথা। কাকা কোথায়? এই তো কাকা আছে আমার বুকের পাশেই। আমি কাকাকে ডাকলাম – কা! কা! কা! কা! কিন্তু কাকা সাড়া দিচ্ছে না কেন? ওকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে মনে হলো, একটা নিষ্প্রাণ দেহ যেন নিথর হয়ে আছে আমার বুকের তলে। তবে কি কাকা মরে গেছে? আমি প্রাণপণে আর্তচিৎকার করলাম। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে সমস্ত বনভূমিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো আমার চিৎকার।

পরদিনের কথা। চোখে যন্ত্রণা হচ্ছে। দেখতে না পারলেও বুঝতে পারলাম সকাল হয়ে গেছে। চারপাশে একটা ঝিম ধরা ভাব। কিন্তু আমি তো নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। কাকা যে নেই, এটা ভেবে বুকের ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে আমার। দিগ্বিদিক থেকে অসংখ্য কাক ছুটে এলো আমাকে সমবেদনা জানাতে। তারাও আমার সঙ্গে চিৎকার জুড়ে দিলো। কাকার মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। আমাদের গাছের ডালে ডালে এখন অসংখ্য কাক আর্তস্বরে মাতম করছে। ওরাও বুঝতে পেরেছে আমি অন্ধ! আমাদের এহেন পরিণতিতে সারা বনভূমিতে এখন কেবল কাকের আর্তনাদ।

আবার একদিন পর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে গেল। জীবনের নিয়মই এই। সবকিছু একসময়ে মেনে নিতে হয়। সময়ই বোধহয় সব শোকের অবসান ঘটিয়ে দেয়। পৃথিবী আবার আগের মতো চলতে থাকে। যেন কোথাও কিছুই হয়নি। বেঁচে থাকতে হলে আগের সব ঘটনাকে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে হয়, আমরা অতীত নিয়ে বেঁচে থাকি না, বর্তমান নিয়ে বাঁচি।

দুদিন ধরে বাসায় পড়ে আছি। চোখের যন্ত্রণা, শরীরজুড়ে ব্যথা, নড়তেও পারছি না। গত দু-তিনদিন কোনো দানাপানি পড়েনি পেটে। মনে হচ্ছে, এভাবেই আমি মারা যাব। আমার সামনে এখন কেবল মহামৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা। কখন আসবে সেই মৃত্যু বরণডালি হাতে নিয়ে? বলবে, এই যে আমি এসে গেছি। তোমার জীবন আমার এই ডালিতে ঢেলে দাও। সেসব কথা ভেবে এখন আমার মৃত্যুই কাম্য। কিন্তু কোথায় সেই মৃত্যু?

সহসা একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনলাম। কেউ যেন কাছে এসে আমাকে স্পর্শ করেছে। এ-স্পর্শ তো আমার চেনা। তবু জিজ্ঞাসা করলাম, কে তুমি?

আমি তোমার মেয়ে কুহু। আমি এসেছি মা। কুহু বলল!

তুই না বলেছিস, আমি তোর মা নই। তাহলে কেন এলি? তুই তোর মায়ের কাছে ফিরে যা।

কুহু বলল, আমার সেই অভিমানের কথা তুমি এখনো মনে রেখেছ? তুমি আমাকে ডিম থেকে ওম দিয়ে জন্ম দিয়েছ। অসহায় দিনগুলোতে পালন করেছো, আহার তুলে দিয়েছো আমার ঠোঁটে। যাকে আমি জীবনে চোখে দেখলাম না, সে আমার মা হলো কী করে? তুমিই তো আমার আসল মা। তোমার ঠোঁটদুটো একটু খোলো দেখি।

আদর করতে এসেছিস?

না, শুধু আদর নয়। কুহু শান্তকণ্ঠে বলল, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি মা। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply