পটেশ্বরী

লেখক:

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

ষষ্ঠ কিস্তি

ছয়

একসঙ্গে যুবতী হয়ে উঠতে উঠতে অমৃতার কতকগুলো দিক ক্রমশ ভাস্বর হয়ে উঠছিল আমার সামনে। নগ্নিকা অাঁকার মধ্যে যেমন প্যাশন ওর, তেমনি আকাঙ্ক্ষা ও আবেগ ওর যৌনতা বিষয়ে। সে-প্রসঙ্গে আসবখন সময়মতো, তার আগে নিশ্চয়ই  ও-ই বলবে ওর প্রণয়ের ইতিহাস। আপাতভাবে যার কোনো শেষ নেই। শুরুটাও যে কোথায়, কখন, আমি হয়তো ঠিক জানি না।

কোথায়, কখন কী করছে, রাতের বেলা পাশে শুয়ে শুয়ে বলে যে নি, তাও নয়। শুয়ে শুয়ে, শুনে শুনে ওর নারীত্বেরও কিছুটা অংশভাক হতাম। এর অনেক পরে, ১৯৩৫-এ – আমি তখনো প্যারিসে আর ও সিমলায় – ও আমাকে নবতম জয়লাভের অাঁচ দেবে বলে ইংরেজি চিঠির মধ্যে ফরাসি ঢুকিয়ে লিখল, ‘জে ফে নমব্রোজ কঁকেত্ ফাসিল’। বলে কী? না, আমি সহজে অনেক পুরুষই জয় করেছি। তাদের মধ্যে একজন হলো ফরিদকোটের মহারাজার ছোট ভাই। সে তো আমাকে বিয়ে করতেই চাইছে। ওদের বাড়ি তো আমাকে পাঁচ মিনিট অন্তর  অন্তর নেমন্তন্ন পাঠাচ্ছে, তাতে বাবা তো রেগে আগুন হচ্ছে।

তবে যে সম্পর্কটা নিয়ে বলার জন্য অমরি অত ভণিতা করছিল, সেটা ম্যালকম মাগারিজের সঙ্গে। সেটা বড় গল্প, অমরিই বলবে। তবে অমরির সব প্রেম-পিরিতি সম্বন্ধে একটা কথা অন্তত জানিয়ে রাখি : একবার কোনো পুরুষকে পছন্দ হয়ে গেলে ওর কোনো থামাথামি, লক্ষ্মণরেখা ছিল না। ফ্লার্ট তো করেই যাবে, একটা অ্যাফেয়ার ঘটাতেও পিছপা নয়। লোকটা বিবাহিত কিনা, কোনো বান্ধবীর প্রেমিক কিনা, জানার অপেক্ষাতেও নেই ও। এতটাই ভ্রূক্ষেপহীন যে, ওর চিন্তাভাবনা, ব্যবহারকে আমার নীতির ঊর্ধ্বে মনে হতো। নীতিনিরপেক্ষ। এমরাল।

বলতে নেই, পুরুষদের কাছে অমৃতা ছিল অপ্রতিরোধ্য রকম আকর্ষক। আর ওর সেই টনটনে জ্ঞানটা ছিল। পুরুষের ওপর এই প্রভাবটা ও উপভোগ করত এবং অকাতরে প্রয়োগ করত। কোনো পুরুষকেই দেখিনি এটা কাটিয়ে বেরোতে। তবে অমৃতা নিজের অনুরাগ, অনুভূতির ওপর বেড়ি পরানোর চেষ্টায় থাকত। কারণ ওর ধারণা ছিল, কোনো সম্পর্কে বেশি জড়ালে ছবির কাজে বাধা পড়বে।

যাই হোক, ঘ্রঁদ শোমিয়ের ছেড়ে যেমন একোল দে  বোজার-এ যাওয়া শুরু করল অমরি, আমাদের গোটা পরিবারও পাসির অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে উঠে এসে থাকা শুরু করলাম শঁজেলিজের গায়ের রাস্তা রু দ্য বাসানোয়। ১১নং রু দ্য বাসানো। সে এক ফ্ল্যাট বটে। প্যারিসের সেই বিখ্যাত বেল এপোক আকারে-প্রকারে আলোয় আসবাবে, আয়না ও পিয়ানোয় বাঁধা। মাঝখানে এক প্রিমাদোনার মতো সেজেগুজে, ভাবে-ভঙ্গিতে স্বয়ং ফরাসি বিপ্লবের সেই মহারানি মারি অাঁতোয়ানেত হয়ে আসীন রইল মা মারি অাঁতোয়ানেত শের-গিল। সেও এক সময় ছিল আমাদের জীবনে! অমরির তো অবশ্যই!

বাবাকে তখন ফটোগ্রাফিতে পেয়ে বসেছে। কত যে আমাদের ছবি উঠল ওখানে তা একটু-একটু করে বলতে হবে। অমরি না হয় প্যারিস প্রবাসে ওর মনের কথা, ছবির কথা, প্রেমের কথাগুলো বলবে, আমি বাড়ির ভেতরের কথাগুলো বলি …

‘বাড়ির ভেতরের কথা’ বললাম বটে, তবে বাড়িটার ভেতর কী, বাইরেটাই বা কী – সে ধন্ধ আমার আজো মেটেনি। ফ্ল্যাটটাকে মা সাজিয়েই ছিল যেন সান্ধ্য আসর, জমায়েতের জন্য। গানবাজনা, আড্ডার এক নতুন ঠিকানা হয়েছিল ১১নং রু দ্য বাসানো।

বাবা ছিল কিছুটা যেন বাড়ির ভেতরপরিবেশ। সন্ধের গানবাজনার একটা বিপরীত ছবি ছিল দিনে আর রাতে ভেতরের একটা ঘরে বসে বাবা সংস্কৃত আর ফারসি বইপত্তর নিয়ে পড়া আর লেখায় মশগুল।

একেক দিন দুপুরে দেখতাম হাতে ফাইল নিয়ে বাবা বেরুচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে বলল, সোরবন যাচ্ছি। লেকচার শুনতে।

একদিন দুপুরে অমরিও দেখি তৈরি হচ্ছে। বললাম, এই যে বললি আজ স্টুডিও যাবি না।

– স্টুডিও যাব না বলেছি।

– তাহলে কোথায় যাচ্ছিস?

– সোরবন।

– সোরবন হঠাৎ?

– বাবার লেকচার শুনতে।

– বাবা তো শুনতে যায়।

– মাঝেমাঝে বলতেও। প্রফেসর সিলভ্যাঁ লেভির হয়ে ক্লাস নিতে।

– তাই? কই, মা তো কখনো বলেনি।

– মা জানেও না।

এত আলাপ, আড্ডা, কথার চর্চা যে-বাড়িতে বাবা সেখানেই একটা নিঃশব্দ, নির্জন অস্তিত্বে বেঁধে রেখেছিল নিজেকে। সিমলার ছাদে বসে তারা দেখার মতো। সন্ধেবেলায় মাঝেমধ্যে সরব হতো ওঁর ভয়েটলান্ডার ক্যামেরা। আর ঝলসে উঠত স্থির ছবি। বাবার কথায় – ওটাই আমার ভাষা, চোখের ভাষা।

এরকম এক সন্ধেয় বোজার থেকে ফেরার পথে ল্যাটিন কোয়ার্টার হয়ে ফিরছিল অমরি। হঠাৎ রাস্তার এক মোড়ে দেখল বাবা সন্ধের আকাশের দিকে ঠায় চেয়ে দাঁড়িয়ে। বাবার ধ্যান ভাঙাবে না বলে, ও গুটিগুটি পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

অবশেষে আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে মেয়েকে দেখে সরল প্রশ্নটাই করল, কী রে, তুই কী দেখছিলি?

অমরি বলল, কেন, তোমাকে।

তারপর বাবা, মেয়ে নীরবে পাশাপাশি হেঁটে বাড়ি এলো। পথে একটাই প্রশ্ন করেছিল অমরি, তুমি এই লোক চলাচল আর আওয়াজের মধ্যে অত নিশ্চিন্তে আকাশ দ্যাখো?

বাবা বলল, যেভাবে বাড়ির আড্ডার সময়েও পুঁথি ঘাঁটতে পারি।

এই ছোট্ট একটা উত্তরে অমরির যা কিছু বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছিল। মার গান, মার পিয়ানো, মার সান্ধ্য মজলিশ বাড়ির ধ্বনির দিক, বাবা ও বাবার পড়াশোনো বাড়ির নৈঃশব্দ্যের দিক। যদ্দূর বুঝি, এই নৈঃশব্দ্যের দিকটাও ক্রমশ অমরিকে টানছিল। ও যেন একটু একটু করে বাবা ও মায়ে ভাগ হয়ে যাচ্ছিল। যেহেতু ওর একটা আলাদা ঘর ছিল আর আমি শুতাম মার সঙ্গে, ওর পাশে শুয়ে রাতের কথাবার্তা অনেকটা কমে এসেছিল। তবু খবর ছিল, গভীর রাত অবধি ল্যাটিন কোয়ার্টারের চুরুট-সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়া, মদো গন্ধে ভুরভুর, নিবু-নিবু আলোয় অন্ধকার কাফেগুলোতে তুমুল আড্ডা চালায় ও।

জিজ্ঞেস করেই বসলাম একদিন ভোরে রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে, কদিন এমন করে ভোর দেখেছিস, বল তো?

ও রাস্তার হোর্ডিং দেখতে দেখতে বলল, প্রায়ই তো।

আমি তো অবাক, কীরকম?

ও হোর্ডিং থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, কেন, প্রায়ই তো বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়।

এরপর অনেকক্ষণ আমরা চুপচাপ হাঁটলাম। ও-ই এক সময় কথা শুরু করল একটা গলির মুখে এসে – জানিস ইন্দু, এই গলিরই কোথাও একটা বেশ কিছুদিন থেকেছেন অঁরি মাতিস। সেদিন প্রফেসর লুসিয়ঁ সিমঁ সালটাও বলছিলেন। ১৮৯৪। মানে আজ থেকে পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর আগে।

বললাম, বলিস কী রে? এই ভিড় আর আবর্জনার মধ্যে?

ও বলল, আবর্জনা বলছিস! এই তো জীবন, ইন্দু শের-গিল। ভাড়াটা ছিল যৎসামান্য, আর বাড়ির বাইরে পা রাখলেই ছবির পর ছবি ভাসছে। কাগজকুড়োনির চিৎকার, ছুরি শানঅলার যন্তরের সিঁসিঁ আওয়াজ, জানলা সারানোর মিস্তিরির হাঁক, সামনে নদীর পাড় গিজগিজ করছে নৌকো আর ফেরিবোটে, তাদের দশ-বিশ রকমের হুইসেলের ঐকতান, রেলগাড়ির কু-ঝিক-ঝিক আর বজরা থেকে মাল নামানো-ওঠানোর ক্রেনের কেত্তন… আর কী চাই ইজেল মেলে বসে পড়ার পক্ষে?

ওকে চটাবার জন্যই বললাম, মাথার একটু ছিট।

ও কথাটা লুফে নিয়ে বলল, যেটার অভাব আমার একদম নেই।

তারপর হঠাৎ দেখি আমার পাশ থেকে বিলকুল উধাও। তখন খোঁজ, খোঁজ… ওর পিছু পিছু ছুটলাম। শেষে পেলাম ওকে নদীর পাড়ে একমনে জল দেখছে।

পাশে গিয়ে বললাম, নদী দেখছিস?

ও নদী দেখতে দেখতেই বলল, পল ভালেরির একটা লাইন মনে এলো। বলছেন, একটা সেতু পার হতে হতেও আমি অনেকখানি বদলে যাই।

বললাম, নদী তো পার হোসনি এখনো!

– হব, একটু পর।

– সেটা কখন?

– একটি মেয়ে এলে।

– সে কে?

– আমার মডেল।

– নদীর ওপার থেকে আসবে?

– হ্যাঁ। তারপর ছবির কাজ হলে ওর সঙ্গে ওপারে যাব।

– কেন?

– ওর বাড়ি দেখতে।

– কেন, কী কাজ করে?

– এই ন্যুড মডেলিং।

– শুধু এটাই?

– কে জানে, হয়তো বেশ্যাবৃত্তিও।

আমি নদীর পাড়ে ওকে রেখে চলে এলাম। তারপর বেশ কয়েক বেলা কথা হয়নি। যেদিন হলো, আমার প্রথম জিজ্ঞাস্য ছিল, তোর সেই নগ্নিকা অাঁকা হলো?

ও বলল, চল, কাল তোকে দেখাব।

বললাম, বাড়ি গিয়ে কী বুঝলি?

– ও বেশ্যা নয়।

– তাহলে?

– ও শিল্পী। যথেষ্ট ভালো আঁকে। মডেলিংয়ের টাকায় বাচ্চার খরচ মেটায়।

– স্বামী নেই?

– বিয়েই হয়নি।

আমার কৌতূহলের ঘোর তখনো কাটেনি। জিজ্ঞেস করেই চললাম, তো গিয়ে কী করলি?

ও বলল, ওকে সিটিং দিলাম।

আমি ফের অবাক, সিটিং দিলি?

– হ্যাঁ। ও বলল, আমি কখনো কোনো ভারতীয় মডেল দেখিনি। তাদের শরীরের গড়ন, লাস্য, হাসি, ভ্রুভঙ্গি, স্তন… তখন আমি ওর কথার মধ্যে গায়ের পোশাক একটার পর একটা খুলে, পাশে ফেলে, শেষে বললাম, দ্যাখো।

– ও অাঁকল?

– তার আগে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমার সারা শরীর অনুভব করল। তারপর বলল। তোমার ছবি আমার মনে তুলে রেখেছি। স্পর্শগুলো ধরা আছে আঙুলে। পরে কখনো ভালোবেসে অাঁকব।

– সে কী? অাঁকলই না?

– বুঝলাম পেশাদার ন্যুড মডেলিংয়ে থেকে একটা কোথাও অভিমান জমেছে। অন্য কারো ওপর সেটা আরোপ করতে চাইল না।

– কী করে বুঝলি?

– একটা কথায়। যখন বলল, ভালোবেসে অাঁকাটা স্মৃতি থেকে ভালো আসে। কবিতার মতো।

এর দেড়-দুবছর পর একদিন অমরি বেশ মাথা গরম করে বাড়ি ফিরল। কী ব্যাপার? না, ওর বন্ধু মারি লুইজ শাসানির সঙ্গে একপ্রস্ত ঝগড়া হয়ে গেছে? কারণ, না মারি লুইজ মঁমার্ত্রের ছবির মেলায় অমৃতার একটা ন্যুড স্টাডি বিক্রি হতে দেখেছে। ছবিটা কিনে ছিঁড়ে ফেলার ইচ্ছে হয়েছিল ওর। শেষে মোটা দাম দেখে কেনেনি।

বুঝলাম না, অমরির নগ্নিকা এঁকে কেউ বিক্রি করলে বাইবেল অশুদ্ধ হয় নাকি?

অমরির ওপর মারি লুইজ শাসানির, নাকি মারি লুইজের ওপর অমরির যৌন অধিকারবোধ কতটা কী, পরে জেনেছি। সে-কথা অমরিই বলুক। আমি রু দ্য বাসানোর কথায় ফিরে যাবার আগে এটুকু বলে নিই যে, মঁমার্ত্রের ওই মেলার ছবিটা ছিল সেই পেশাদার মডেলের স্মৃতি থেকে অাঁকা।

পরদিন বিকেলে মাকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে, সম্ভব হলে কিনতে, গিয়েছিলাম মেলায়। শুনলাম আগের দিনই বিক্রি হয়ে গেছে। কে বলতে পারে রাখার জন্য, না পোড়ানোর জন্য!

হ্যাঁ, তাহলে ১১ রু দ্য বাসানো… একদিক থেকে আমাদের আস্তানার বসার ঘরটাই ছিল এক পূর্ণ জগৎ, যার মূল শোভা ছিল একটা জমকালো ফায়ারপ্লেস এবং মার পিয়ানো। কতকগুলো ক্ল্যাসিক ডিজাইনের ভেলভেট গদির চেয়ার ও সোফা ছড়ানো ছিল এবং একধারের জানলার গায়ে একটা লম্বা হল ল্যাম্প। চমৎকার ফুলছাপ ওয়ালপেপারে মোড়া ঘরটার একটা ফ্যাঁ দ্য সিয়েক্ল্, শতকশেষের মেজাজ ছিল। মা দেখে দেখে কিছু রকমারি প্রিন্টের রাগ্ কিনে ছড়িয়ে দিয়েছিল কার্পেটের ওপর। তাতে পর্দা টেনে ঘরের আলো জ্বেলে দিলে সত্যি সত্যিই একটা সালঁ হয়ে উঠত বসার ঘরটা।

বাবা এই সালঁ পরিবেশটাকে প্রায় অমর করে রেখেছে অজস্র ফটোগ্রাফে। সেখানে বিষয় কখনো পিয়ানোয় বসা মা, কখনো আমরা বোনেরা, কখনো অটোম্যাটিক করে স্বয়ং নিজে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই বাবার বিষয় থেকে গেছে অমৃতা। কখনো শিফন ফ্রকে দিব্যি ফরাসিনী, কখনো সেই ফরাসিনীই তবে সিল্কের গাউন, মুক্তোর হার, ক্রোশে বুনুনির টুপি এবং উল ও ফারের ওভারকোটে কী এক সাবেকি মূর্তি! কখনো চুল থেকে পা অবধি এক হিসপানীয় দেখনদারি, যে চেহারায় নিজের একটা ছবি এঁকে নাম দিয়েছিল ‘লাল পশ্চাৎপটে আত্মপ্রতিকৃতি’। আবার কখনো জানলার ধারে কোনো এক বিদেশিনীর ছবির নিচে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ষোলো আনা তিন পয়সা ভারতীয় বধূবেশে অমৃতা!

বাবা শাড়ি-পরা মাকেও পিয়ানোয় বসিয়ে ছবি নিয়েছে। যেটা পশ্চিফমী পোশাকে পিয়ানোয় বসা ছবির চেয়ে ঢের সুন্দর। তবে বাবার তোলা অমৃতার শাড়ি-পরা সেরা ছবি ১৯৩৭-এ, সিমলার বহির্দৃশ্যে। কী এক অপরূপ প্রশান্তি ওর লাজুক, নামানো চাউনিতে! ওকে বলেও ছিলাম সে সময়, তোকে এক নতুন চরিত্রে পাচ্ছি এ-ছবিতে।

ও ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল, নতুন চরিত্রে, না চেহারায়?

বলেছিলাম, নতুন চেহারা ঠিকই, তবে নতুন চরিত্রটা বড় বেশি চোখ টানছে। যেটা ভেতরের বদল।

ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল তখন, তা তো বদলাতেই পারি। তুই বিয়ে করছিস, কদিন পর তুই তো বদলাবি। আমি না হয় না করেই।

বললাম, কেন, তুইও তো বিয়ে করতে পারিস।

– তা তো পারিই। দেখি। তবে বদলাবার জন্য নিশ্চয়ই করব না।

আমার বিয়ে সে-বছরই হলো ২রা অক্টোবর। তার এক সপ্তাহ পরেই অমরি ঘোষণা করল, আসছে বছরই বিয়ে করছি। দেখে নিস।

বাবার সঙ্গে রু দ্য বাসানোর যা সম্পর্ক দেখেছি, প্যারিস শহরের সঙ্গে অমরির সম্পর্কের সঙ্গে কোথাও একটা তার মিল। বাড়ির সবকিছুর সঙ্গে বাবা মিশে আছে, আবার থেকে থেকে উধাও। বাবা বলত এটা নাকি গীতার শিক্ষা। যেখানে কৃষ্ণ বলছেন, পূর্ণ সমুদ্রে কত জলধারা এসে মিশছে, কিন্তু তাকে উদ্বেল করতে পারছে না, তেমনি যাঁর মধ্যে কামনা-বাসনা প্রবেশ করেও তাঁকে বিচলিত করতে পারে না, তিনিই শান্তি অর্জন করেন। কামনা-বাসনায় মথিত মানুষের পক্ষে তা লভ্য নয়।

তাহলে বাবা কি শান্তি অর্জন করেছিলেন? জানি না, বলা সম্ভবও নয়। সারাটা জীবন বাবার ওপর দিয়ে যা গেছে… না, আমি অমরির কথা থেকে সরব না। প্যারিস কেমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওর জীবনে? মাঝে মাঝে সে দিনগুলোয় বলত : মহাকবি গ্যয়টে রোমে বেড়াতে গিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন – ‘এই আমি নতুন করে জন্মাতে এলাম’! প্যারিসে দাঁড়িয়ে ঠিক এই কথাটাই আমিও বলে দিতে পারি।

তবু প্যারিসের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল শহরটার সঙ্গে কবি বোদল্যারের সম্পর্কের মতো। প্রেম-দ্বেষ, রাগ-বিরাগের সম্পর্ক। বোদল্যার বড় প্রিয় ছিল অমরির আর গীতা থেকে বাবা যেমন সমুদ্রের উপমা তুলে এনেছিলেন, বোদল্যারের প্যারিসচেতনার মধ্যেও তেমন একটা নদীর প্রতিমা থাকত। স্যেন নদী। প্যারিসকে বলতেন ‘মগ্ন নগরী’ … ‘ততটা অন্তঃশীলা নয়, যতটা অন্তঃসলিলা’। শহরটির নদীমাতৃক রূপটি পুনঃপুন উঠে আসত ওঁর রচনায়। আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুই-ই সমান লয়ে বয়ে চলে ওঁর প্যারিস গাথায়।

তাহলেও প্যারিস তো বোদল্যারের নিজের শহর। অমৃতা ভিনদেশি, অন্তরঙ্গ হয়েও অদূরে দাঁড়ানো প্রত্যক্ষদর্শী। কবির মতো ওরও ভেতরের টান শহরটার গরিবগুর্বো, ছন্নছাড়া, অন্তেবাসীদের জন্য। এরকমই এক অসহায়, যক্ষ্মাগ্রস্ত নগ্নিকার যে স্টাডি ও করেছিল তখন তা ওর অাঁকা আমার প্রিয়তম ন্যুড। নারীসমাজের প্রতি ওর সমীহ, সহানুভূতি এবং, হয়তো, সংরাগেরও সূচনা তখন। এ-প্রসঙ্গ অমরির নিজস্ব, আমি প্যারিসের অন্য গল্পে যাই …।

 

সাত

ঘোড়শী থেকে সপ্তদশী হতে কত সময় লাগে। আমি সেটা কীভাবে হলাম বোঝাতে হলে নিজের অাঁকা নিজের একটা ছবির দিকে তাকাব। তাকিয়ে চমকে যাব প্রিয়রং লালের অত অগ্নিভ ব্যবহারে। ঠোঁট লালে লাল, গাল ঝলসে যাচ্ছে লালে, প্রসাধনের এই রক্তিম উচ্ছ্বাস, পশ্চাৎপটেও লোহিতের লাস্য – জানি না, এ কি প্যারিসের, না বয়েসের  অবদান। জামার কাটছাঁট, চাহনির ইশারা, বিনুনির চাল, সবই যেন প্রয়োগ হয়েছে ঝাঁঝ বোঝাতে।

সমালোচনার ভাষায় বলা হবে সংরাগ। আমি শুধু বলব বয়েসের আগুন। r (চলবে)

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার