পটেশ্বরী

লেখক:

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

 

দশম কিস্তি

 

ও যত বলছে ‘আমি ক্ষত রেখে যাব’ আমি হাসছি। সেই ক্ষতেরই যেন আভাস এর পরে পরেই ইন্দুকে লেখা আমার চিঠিতে…

একটি অতি অসাধারণ ইংরেজের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। মা হয়তো ওর বিষয়ে তোকে লিখেছে, যাতে কিনা ওর সম্পর্কে তোর ভয়ানক ভুল কিছু ধারণাও গজিয়েছে। সত্যি বলতে কী, ওরকম অপূর্ব, মনে দাগ-কাটা পুরুষ আমি এর আগে দেখিনি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কী জানিস, অক্টোবরেই ও ভারত ছাড়ছে! কত পুরুষই তো পটালাম কী অবলীলায় অ্যাদ্দিন, কিন্তু এই সম্পর্কটা…

প্রথম থেকেই আমি ক্ষতটা টের পাচ্ছিলাম। যৌনতা ও অধ্যাত্মের কথা থাক। যে-একটা কারণে ম্যালকম মনের ওপর জেঁকে বসেছিল, না থাক… তাহলে অনেক জটিলতার কথা আসবে।

তা আসুক। জটিল মানুষ আমি, জীবন তো আমার জটিল হবেই। ম্যালকম সেটা জানত, কারণ ও-ও তো আমার মতনই।

থেকে-থেকে ও আমাকে ঘেন্নাও করত। সেটা যে আমি বুঝতাম না তাও নয়। যেমন একদিন… আমি বসে-বসে নানা জনের লেখা এক কাঁড়ি ছেঁড়া, পুরনো প্রেমপত্র পড়ছি। কোনোটা শুরু হচ্ছে ‘অমৃতা!’ বলে, কোনোটার প্রথম কথাই হলো ‘এখন আমি একজন সৈনিক!’ ও আড়চোখে এইসব চিঠির সম্ভাষণ দেখে প্রায় শিউরে উঠল। আমার এসবে সুড়সুড়ি লাগুক, না-লাগুক ওর মুখটা যেন তিতিয়ে যাচ্ছিল।

তাও কেন ওয়ার্ডেন নামের পার্সি লোকটার কথাটা তুললাম? ওই ওয়ার্ডেনের মাধ্যমেই কিন্তু ম্যালকমের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ সেই নাচের আসরে। যাহোক, কী বললাম যেন ওয়ার্ডেন সম্পর্কে ওকে?

বললাম, একটা ব্যাপার জানো তো, আজ সকালে আমি ওয়ার্ডেনের সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ ও জিজ্ঞেস করে বসল আমার হাতের আঙুলের ডগায় ও চুমু দিতে পারে কিনা। শুনে ঘেন্নায় গা-টা রি-রি করে উঠল। এইসব আত্মকেন্দ্রিক, স্থূল, বখা মানুষদের ওটাই আমার প্রতিক্রিয়া। ঘেন্না।

এটা বলার পর বুঝলাম ম্যালকম কথাগুলোকে আমার বড়াই বা দেখনদারি হিসেবে নিয়েছে। ভাবখানা এমন – ঠিক আছে, বলেছে বলেছে। তা এত ঘটা করে আমাকে শোনানোর কী আছে।

এরপর ও যেটা করল সে-ও এক ধরনের হামবড়াই। ‘এই দেখো আমি’, এই বোঝাতে কত কিছু বলে গেল; শুনে আমিও কত কী বললাম, আর এভাবেই চলছিল। হঠাৎ ও ভয়ঙ্কর খবরটা দিলো।

আগের দিনই ও স্টেটসম্যানের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছে!

এরপর আর বলার কী থাকতে পারে, জড়িয়ে ধরে ক্রমান্বয়ে চুম্বন করা ছাড়া?

প্রতিবার চুম্বনের পর আমি নতুন করে লিপস্টিক ঘষে নিচ্ছিলাম ঠোঁটে। যেন প্রতি চুম্বনই দিনের মিলনের প্রথম চুম্বন। যেন কোনো চুম্বনই ঠোঁটের রূপরেখা কেড়ে নিতে পারেনি। এভাবে কতবার, কতক্ষণ সে আর মনে রইল না শেষ পর্যন্ত।

যখন হাত ধরাধরি করে দুজনে পাহাড় বেয়ে আরো ওপরে উঠতে থাকলাম। আর ও আমার মুখে কীরকম একটা ঘৃণার চোখে তাকাল।

আমি জানি ও মাঝে-মাঝেই আমাকে ঘেন্নার চোখে দেখে। সত্যি বলতে কী, আমাকে অপছন্দ করার কিছু কম কারণও ছিল না। ভালোবাসতাম বলেই হয়তো ওকে হেনস্থা করার কম চেষ্টা করিনি।

তাহলেও আজকের মতো একটা দিনে, চলে যাওয়ার অশনিসংকেত দেওয়ার পরেও কেন ও এইরকম হলো। ঠাট্টার সুরে বলল, চোখ বড় করে বিশবব্রহ্মা- দেখছ, নিজের চোখের নিচে কালি পড়ছে দেখতে পাও না? মুখটাই বা ঝুলে পড়ছে কেন? খাওয়া-দাওয়া জোটে ঠিকঠাক?

কথাটা শেষ হতে আমরা দুজনেই বেদম হাসাহাসি শুরু করলাম। আমি বললাম, না, আজ আমি পেট ঠুসে ডিনার খাব।

যা শুনে এবার শুধু ও অট্টহাসিতে ফাটল। বিদায়লগ্নের সূচনা হলো হাসির ফোয়ারায়।

তবে এর অনেক আগের একটা দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বিদায়ের সুরটা অনেক আগেই একবার আবছা ধরা দিয়েছিল। শরীরের মিলনের পর অনেকক্ষণ পাশাপাশি শুয়ে ছিলাম আমরা। শেষে আমি উঠে শাড়ি পরতে লাগলাম। দেখি ও অবাক চোখে আমাকে দেখে যাচ্ছে, যেন এই আমাদের প্রথম মিলন, এই প্রথম দেখা।

আমার মনটা কীরকম ভার হয়ে এলো। আমি নিজেও বুঝিনি।

ম্যালকম ফরাসিতে জিজ্ঞেস করল, পুরকোয়া ত্রিসত্ম্? মন খারাপ কেন?

আমি কিছু বললাম না।

ও বলল, আমি জানি কেন?

তাও কিছু বললাম না।

ও বলল, ভয় পাচ্ছ দেরি করে ফেললে বলে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া বাধবে।

এর আগে একদিন মায়ের সঙ্গে দেখা করিয়েছিলেম এক চায়ের আসরে। কারোই কাউকে পছন্দ হয়নি। যতক্ষণ ছিল দুজন দুজনকে চটিয়েই গেছে। শেষে সামাল দিতে ম্যালকমকে নিয়ে পাহাড়ে হাঁটতে চলে গেলাম।

যাহোক ম্যালকম ছাড়ার পাত্র নয়। বলল, ঠিক বললাম কিনা? মন খারাপ।

আমি চুপ থাকলাম।

ও ফের বলল, কেন?

বললাম, কারণ তুমি আমাকে নিয়ে ক্লান্ত।

কথাটা মিথ্যে বলিনি, এবং হয়তো আবেগ দিয়েই বলেছিলাম। তাতে দেখলাম ম্যালকম কীরকম নরম, শান্ত, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। আমার চুলে হাত বুলোতে-বুলোতে বলল, একটা কথা জানো তো…

ওর কথার মধ্যেই জিজ্ঞেস করলাম, কী কথা?

তোমার সঙ্গে প্রথম আলাপের পর বউকে চিঠি লিখতে গিয়ে বেশ অস্বস্তি হতো। মনে হতো বলার ভাষাটা হারিয়ে ফেলছি।

অ্যাদ্দুর বলে ও চুপ করে গেল, যেন ভাষা হারিয়ে ফেলছে।

কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, তো?

ও বলল, আজো কেন জানি না মনে হচ্ছে কিটকে চিঠি লেখাটা বেশ কষ্টের হবে।

– আমাকে বিদায় জানানোর থেকেও?

ও বহুক্ষণ চুপ করে রইল। আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য পা বাড়াচ্ছি দেখে আমার কোটটা গায়ে পরিয়ে দিতে এলো। মুখে এখনো সেই মস্নান হাসি – আমি তো কেবলই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা করছি এতোকাল। তাই বিদায়কালকে ভয় পাই না।

আমি কিন্তু পাই – বললাম আমি। যদিও…

– যদিও…?

– যদিও… আমি চিরটাকাল এ-জায়গা, ও-জায়গা সে-জায়গা হয়ে ঘুরে মরছি।

এর কোনো উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে দরজা খুলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। একটু পরেই বাইরের অন্ধকারে।

অক্টোবরে নয়, তার আগেই সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে যেতে হলো ম্যালকমকে। কারণ লন্ডনের ইভেনিং স্ট্যান্ডার্ডে চাকরি হয়েছে, আগেই পৌঁছতে হবে।

খুব ভোরে ওকে বিদায় জানাতে গেলাম স্টেশনে। অত সকালে ওঠাটা অত কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও। যতক্ষণ না ওর ওই ছোট্ট পাহাড়ি রেলে ওঠার সময় হলো আমরা পস্ন্যাটফর্মের এধার-ওধার করলাম।

ও কামরায় চড়ে বসার পরও আমি পস্ন্যাটফর্মে ও জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কথা বলে গেলাম।

একসময় বিকট আওয়াজে হুইসেল মেরে রেলগাড়ি নড়তে শুরু করল।

আমি ফরাসিতে ওকে বললাম, একসঙ্গে অনেক মধুর সময় কেটে গেল। কিছু কালো, অন্ধকার সময়ও।

ও উদাস চোখে একবার চারপাশ, একবার আমাকে দেখতে থাকল। আমিও ওকে দেখতে থাকলাম যতক্ষণ ট্রেনটা হারিয়ে গেল দৃশ্যের বাইরে মেঘের আড়ালে।

 

দশ

জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে অমৃতার সম্পর্কটা ঠিক কতটা ভালোলাগা আর কতটা ভালোবাসার এটা আমি অতখানি বুঝে উঠতে পারিনি। এটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

তলিয়ে বুঝতে যে পারা গেল না তার বড় কারণ একটা দুর্ঘটনা। কীরকম? না, অমৃতা তখন ভিক্টরকে বিয়ে করতে বুদাপেসেত্ম। সিমলার বাড়িতে তখন ওর ফেলে যাওয়া একঘর চিঠি। মারি লুইজ, কার্ল খন্ডেলওয়ালার চিঠি তো ছিলই, ছিল ম্যালকম মাগারিজ ও নেহরুর চিঠিও।

নেহরুর চিঠির মধ্যে কিছু-কিছু কি প্রেমপত্র ছিল? জানার উপায় নেই, কারণ ঘর সাফ করতে বাবা, মা অমরির রাশি-রাশি চিঠি পুড়িয়ে ফেলল। চিঠিগুলো পড়ে ওদের মনে হয়েছিল, ওসব চিঠি ওর জীবনে আর কাজে আসার নয়।

অতএব…

এটা জেনে অমরি যে কী খেপেছিল ভাবা যায় না।

লিখল – তোমরা আমার সব চিঠি আগুনে দিলে! আসার আগেই তো বসত্মা-বসত্মা চিঠি পুড়িয়ে এসেছি। বাকি সব গুছিয়ে রেখে এলাম। তোমরা সে-সব পুড়িয়ে বিদেয় করলে? ভাবলে এসব চিঠি থাকলে আমার ভয়ঙ্কর অতীত ভবিষ্যতে আমাকে তাড়া করে ফিরবে।

হায়! হায়! হায়! বুড়ো বয়েসে যে তরুণী জীবনের স্মৃতি ঘেঁটে একটু আনন্দ করব সে গুড়েও বালি এখন।

তবু আশায় আছি নেহরুর চিঠিগুলো উনুনে দাওনি।

আশা আশাই থেকে গিয়েছিল, কারণ নেহরুর চিঠিও রেহাই পায়নি। তাতে নেহরু নিয়ে অনেক প্রশ্নই প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেল।

যেমন একটা প্রশ্ন : নেহরুর পোর্ট্রেট আঁকল না কেন অমরি?

অমরির বন্ধু ইকবাল সিংহ একবার ওকে এই প্রশ্নটাই করেছিল। তাতে অমরির জবাব?

না, ওকে আঁকতে চাই না, বড্ড সুন্দর দেখতে।

ভাবো! সুন্দর দেখতে বলে আঁকবে না।

আসলে অমরি এরকমই ছিল। তাই তো ওর ভালোলাগা আর ভালোবাসার ফারাক করতে কত না ফেরে পড়তে হয়।

তবু বলব, আর একশটা লোকের মধ্যে জওহরলালকে ওর ভীষণই অন্যরকম লেগেছিল। কবারই বা দেখা হয়েছে, সাক্ষাৎ! মেরেকেটে তিনবার। আর তাতেই যে কী রোম্যান্স গজাল আমি এখনো ভেবে অবাক হচ্ছি।

অমৃতসর থেকে দিলিস্নতে এসে থাকছিল অমরি তখন। আর একদমই মন বসছিল না। কী জায়গা রে বাবা, আমলার আখড়া! সরকারিপনায় ভরভরন্ত। এখানে কি ছবি আঁকাআঁকি হবে?

তবে হ্যাঁ, ওঁর ছবির একটা বড় প্রদর্শনী হলো। উকিল ভাইদের সঙ্গে। বরদা উকিল ও সারদা উকিল।

ইম্পিরিয়াল হোটেলে সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে এসেছিলেন ফালতানের রাজা। তারিখটা ১৯৩৭-এর ২৭ ফেব্রম্নয়ারি। সেখানেই অমৃতা ও নেহরুর প্রথম দেখা…

 

এগারো

তোমাকে, জওহরলাল, আমার ততটাই ভালো লেগেছিল যতটা আমাকে তোমার লেগেছিল। আমার প্রদর্শনীতে তুমি এলে, আর আমরা কতক্ষণ গল্প করলাম। তুমি বললে, তোমার ছবি আমায় টানছে শক্তি দিয়ে। দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। শক্তি আর দৃষ্টিকোণ দুটোই তোমার আছে।

ভারতে এখন যা আঁকা হচ্ছে সেই সব ন্যাতাপোতা, প্রাণহীন ছবির থেকে কত আলাদা তোমার ছবি!

একটা সত্যি কথা বলব, জওহর? আমার মনে হয় না আমার ছবিগুলোতে তোমার গভীর ঔৎসুক্য ছিল বলে। তুমি আমার ছবিগুলোর দিকে কেমন যেন তাকিয়েই ছিলে, কিছু দেখছিলে না।

তোমার মধ্যে কাঠিন্য নেই। নরম মুখম-ল তোমার। তোমার মুখটা আমার ভারি পছন্দ। অনুভূতি ও আবেগপ্রবণ, রিরংসা আছে, আবার নিস্পৃহও।

কিছুক্ষণ আগে কে যেন একটা বলল তোমার নাকি অসুখ করেছে। আমার জানার কথা নয়, কারণ আমি কাগজটাগজ পড়ি না।

তবে তুমি আমার মনের মধ্যে সারাক্ষণ হাজির। সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবছি। সেজন্যেই হয়তো চমকে উঠলাম তোমার চিঠি পেয়ে। আর বলতে নেই, খুব খুশি হয়েছি তোমার বইটা উপহার পেয়ে।

জওহরলালের আত্মজীবনী যখন, পড়তে তো আমাকে হবেই। পড়তে ভালোও লাগবে কারণ লোক দেখানো ব্যাপারটা তোমার নেই। সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি বলার লোক নও, ‘সমুদ্র যখন আমায় দেখল।’ তুমি বলবে, ‘যখন প্রথম সমুদ্র দেখলাম।’

এজন্যেই তোমাকে আমার আরো জানতে ইচ্ছে করে।

আমি সেই সব লোকের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হই যারা এতটাই সুসংহত যে তাদের ভেতরে অনেক স্ববিরোধও দিব্যি মানিয়ে যায়। আর যারা সারাক্ষণ কোনো না কোনো আফসোসকে প্রশ্রয় দিয়ে চলে না।

আমার তো মনে হয় ধারাবাহিকতাহীনতার মধ্যেই ধারাবাহিকতাকে খোঁজা উচিত। তবে ধারাবাহিকতা বা তার অভাব, যা-ই বলো না কেন, একটা জিনিস মেনে নিতেই হচ্ছে যে, তোমার একটা খুব সুশৃঙ্খল মন আছে।

তো যেজন্য কথাগুলো উঠল সেই কথাটা শেষ করি। হ্যাঁ, আমি তোমার আত্মজীবনী পড়ব। যদিও জীবনী বা আত্মজীবনী পড়তে আমার ভাল্লাগে না। কেমন যেন মিথ্যে মিথ্যে ঠেকে।

নেহরুকে নিজের কথা কতটুকুই বা বলতে পেরেছি তিন-চার বছরে। সব কথাই তো চিঠিচাপাটিতে। তাতে ও-ই বা কতটুকু বলতে পেরেছে। ওর খুব কৌতূহল আমার স্টুডিওটা ঠিক কীরকম।

একবার আমার স্টুডিওতে এলে মন্দ হতো না। ঘরে বিশেষ কিছু নেই। বেশ ন্যাড়াই। ফটফটে সাদা রং করা দেয়াল। তাতে খানদুয়েক চিনা ছবি ঝুলছে। আর একটা আমার বান্ধবী মারি লুইজ শাসানির। যার ওপর পিকাসোর অদ্ভুত প্রভাব।

তুমি এলে স্টুডিও দেখা ছাড়া আর কী-কী ঘটতে পারত এখনই বলব না। তবে না, আমার এই স্টুডিওতে তুমি আর পা রাখতে পারবে না, কারণ এটা দিলিস্ন বা সিমলা কোথাও নেই। এটা প্যারিসে আমার যে-ডেরা ছিল নোত্র দাম দে শঁজের কাছে। মঁপারনাসের পথে। মারি লুইজের সঙ্গে ভাগ করে নিতাম।

তুমি আমার স্টুডিও দেখতে পেলে না, কিন্তু দেওয়ান চমনলাল, হেলেন ও তোমার সঙ্গে আমার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার হরপ্পা দেখতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। হয়নি, সেটা অন্য কথা।

তখন লাহোরে হেলেনদের বাড়িতে অতিথি আমি। চমনলালের নিকটবন্ধু নেহরু। একদিন দেখা করতে এলো এবং আমাদের দেখাও হলো।

আমরা যেদিন দল করে হরপ্পা গেলাম সেদিন ও সঙ্গে থাকলে ভালো হতো না কি? পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ধ্বংসের মধ্যে একটা নতুন প্রণয়ের জন্ম। তবে যেটা হয়নি, সেটা হয়নি। তবে যেটা হলো সেটাও ভুলতে পারিনি। লাহোরে চমনলালদের বাড়ির উল্টো দিকে ফালেত্তি’জ হোটেল। যেখানে আমার এগজিবিশন ছিল। সেখানে ১৯৩৮-এর জানুয়ারির একদিন জওহরলাল এসে উঠেছিল। লাহোরে কংগ্রেস দলের এক সভায় ওর বক্তৃতা ছিল। সন্ধেবেলায় ওই ফালেত্তি’জেই দেখা হলো। ওহো, না, দেখার আগের কথাগুলোও মনে পড়ছে।

মনে রাখার মতোই সব কা-। আমি, অমৃতা, আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার মতো করে নিজেকে আঁকলামই যেন সারাদিন। কালো শাড়ির সঙ্গে মানিয়ে তিববতি অলঙ্কারে সাজলাম। তার আগে নখ আর ভুরুর কী যত্ন! যেন বিয়ের পিঁড়িতে বসছি। যতবার আয়নার মুখোমুখি হচ্ছি চমকে যাচ্ছি।

ঠিক যে-চমকটা জওহর আর চমনলালের চোখে দেখলাম ওরা যখন মিটিং শেষে ফিরল। জওহর তো দেখেই যাচ্ছে, দেখেই যাচ্ছে, যেন এই প্রথম দেখল এবং… না থাক। ভাষায় নয়, ওকে কখনো আঁকলে বোঝাতে পারতাম। সেদিনের সেই চোখ।

তবে ওর সেদিনের সাদা পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামার দশা বেশ করুণই ছিল। ঘামে, ধুলোয় বিতিকিচ্ছিরি। তাতে দুজনে দুজনার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ ফলল। কালো শাড়ি, গয়নায় আমার রূপের ছটা কেউটের ছোবলের মতো হয়ে উঠছিল। আমার চোখ এবং শরীর থেকে ওর নজর নড়ছে না।

সন্ধের ডিনার শেষ হতে আমরা সবাই গিয়ে ফালেত্তি’জে বসলাম। আড্ডায় মশগুল আমরা সবাই, কিন্তু চোখও কিছু কম যায় না। কত যে কী বলে ফেললাম জওহরকে, আর ওর দৃষ্টি থেকেও শুনে নিলাম, তা ছবির ভাষায় তুলে রাখলে হতো।

এসব কথাই বাবার কাছে পৌঁছেছিল সিমলায়। তাতে বিষয়টা এক অন্য মোড় নিল। বাবার এক সুপ্ত বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।  লিখল, নেহরু যদি তোমাকে বিয়ের প্রসত্মাব দেয় তুমি রাজি হয়ে যেও।

হে ভগবান, বাবারই তাহলে ভীমরতি হলো অ্যাদ্দিনে। কত বয়েস হলো দুচির? সেও তো এক ভগবানই জানেন। একমাথা সাদা চুল আর বুক অবধি ঢলে পড়া দাড়িতে বাবার চেহারাটা এখন ঋষি টলস্টয়ের মতোই। তুলনাটা প্রথম শুনেছিলাম মাগারিজের মুখে। শুনে খেয়াল হয়েছিল, ও মা, তাই তো! পরে ওরকম চেহারায় ওরই তোলা এক সেল্ফপোর্ট্রেট ভারি পছন্দ হয়ে যায়। ওর অমন মুখ আমার আঁকা হয়নি।

এই সাত পাঁচ, অগ্রপশ্চাৎ, ওপর-নিচ, ডানে-বাঁয়ে, ভালো-মন্দ, সাদা-কালো, চারদিক ভেবে চলা বাবা শেষে এটা কী প্রসত্মাব দিলো! নেহরু বিপত্নীক এবং চাইলেই বিয়ে করতে পারে বলেই কি বাবার এই পরিকল্পনা? বড় পরিবার, মস্ত স্কলার এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের অগ্রভাগে – এসবও কি প্রিয় দুচির মাথায় খেলছে?

কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। দুটি জিনিস বাদে। এক, যতই প্রেমে পড়ুক জওহরলাল আমাকে অ্যাপোজ করবে বলে মনেই হয় না। দুই, যদি করেও তাতে আমি কী করে হ্যাঁ বলব? আমি তো হাঙ্গেরি যাওয়ার জন্য জাহাজের টিকিট কাটছিই। বাবা তা জানেও, কারণ বাবাকেই টিকিট কাটতে বলেছি। শুধু লাহোরে ছবি বিক্রির টাকায় টিকিটের দামটা দেব আমিই।

আর যাচ্ছি কেন? বাবা তো সবই জানে, এবারের বুদাপেস্ত যাত্রা আমার ভিক্টরকে বিয়ে করার জন্য।

 

বারো

কটাই বা বছর? কটাই বা দিন? সিমলার ইম্পিরিয়াল হোটেলে সেই প্রথম দেখা। ২৭ ফেব্রম্নয়ারি, ১৯৩৭। অমরির ছবির প্রদর্শনী। ফালতানের রাজা এলেন উদ্বোধন করতে। আর অমরির মন জুড়ে রইল কেবল জওহরলাল। অমরি চিঠিতে লিখল কার্ল খন্ডেলওয়ালকে  : আমার যতটা ভালো লেগেছে ওকে, মনে হয়  ওরও ততটাই ভালো লেগেছে আমাকে। এটা লম্বা আড্ডা চলল আমাদের।

শেষ দিনটাও ভোলার নয়। তারিখটা ১৯৪০-এর অক্টোবরের একদিন। তাহলে কদিন হয়? সিমলা ছেড়ে গোরখপুর জেলার সারায়ায় এসে গুছিয়ে বসেছে নবীন যুগল ভিক্টর ও অমরি। সারাদিন গুচ্ছ-গুচ্ছ রোগী-রোগিণীর চিকিৎসা করে ভিক্টর প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে সন্ধেবেলা, আর বাড়ির স্টুডিওতে বসে কাজ করা অমরি একটার পর একটা কাজ নামিয়েই চলেছে, সারায়ার মানুষজন নিয়ে আঁকা ছবি। খুবই পরিশ্রমের মধ্যে যাচ্ছিল দিনগুলো, কিন্তু বাবা-মাকে লেখা ওর চিঠিতে দেখছি দিনগুলো বড় সুখেরও।

সুখের এজন্যই যে, বিলেতে বড় হওয়া মেয়ে চোখ খুলে ভারতবর্ষ দেখছে। সুখটা বহুগুণ বাড়ল অক্টোবরের ওই দিনটায়। দিনটা সেভাবে ক্যালেন্ডারে উঠেছে কিনা জানি না, ইতিহাস মনে রাখবে তার আগের একটা দিন, ৬ অক্টোবর, ১৯৪০; কারণ সেদিন জওহরলাল গোরখপুরে কৃষকদের সম্মেলনে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করল। ব্যাপারটা খুব নাড়া দিয়েছিল অমরির মধ্যে, সে খবর আমার আছে। কিন্তু এর পরেও একটা ঘটনা আছে… আমি বললে সন-তারিখ মোড়া ইতিহাসের মতো শোনাবে। অমরিই বরং গল্প-গল্প করে বলুক… r (চলবে)

 

\ ১৩ \

জওহরলালের সব ব্যাপারই কীরকম গল্প-গল্প হয়ে গেল সামান্য কবছরে।

ও এলও গোরখপুরে অদ্ভুত একটা সময়ে। সারা ভারত ছেড়ে গোরখপুরেই কেন? শুনলাম কিষানদের তাতিয়ে তুলতে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নাকি চাঁচাছোলা ভাষায় বলা ধরেছে ও। ভাল কথা। বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষ নেওয়ারও বিরুদ্ধে ও। ভালো কথা, তাতে ব্রিটিশরা ওকে জেলে না ঢুকিয়ে ছাড়বে কি?

একদিন ভিক্টরকেই প্রশ্নটা করেছিলাম। ডাক্তারবাবু তাতে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে ভাবল। শেষে মাথা দুলিয়ে বোঝাল – না।

তখন নতুন বরকে একটু খোঁচালাম, জানো তো, আমার একটা সুযোগ ছিল নেহরুকে বিয়ে করার?

ও কিছু বলল না, অকারণে, হাতে ধরা স্টেথোস্কোপটা নাড়ানাড়ি শুরু করল।

আমিই বললাম ফের, কী, কিছু বললে না তো?

ও এবার মুখ তুলল, বলার আর কী আছে? হয়তো একটা প্রশ্ন করতে পারতাম।

– তাই করো।

– প্রপোজটা কে করল – তুমি, না উনি?

আমরা দুজনই এবার বিকট হাসিতে ফেটে পড়লাম। ভিক্টরের মধ্যে সিরিয়াসনেস মেশানো হাঙ্গেরীয় হিউমার আমাকে মাঝে-মাঝে পাগল করে দেয়। আমার যেমন কোনো অ্যাফেয়ার গোছের কিছু একটা কথা শুনলে ও ঠোঁটে একটা হাল্কা হাসি ঝুলিয়ে কীরকম আনমনে বলে, আবার একটা টাইমপাস?

আমি যদি তখন বলি ‘না, না, এটা প্রায় সিরিয়াস’ ও মাথা নেড়ে বলবে, ‘মনে হয় না।’ আমি যদি তখন জিজ্ঞেস করি ‘কেন মানছ না এটা সিরিয়াস?’ ও ওর হাসির ঝিলিকটা ফিরিয়ে এনে বলবে, ‘তাহলে আমায় বলতে না।’

যাহোক, গ্রেফতার হোক বা না হোক জওহরলাল যে গোরখপুরে সভা করতে আসছে এতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল। ভেতরে সুখ তো একটা ছিলই ভিক্টরের একটা চাকরি হওয়াতে। মোটের ওপর একটা ভাল চাকরিও। যদিও খাটনির অন্ত নেই। সারাদিনে আমাদের দেখা হয় না বললেই হয়। তবু, পেট চালানোর জন্য হাত পাততে হচ্ছে না, মাথার ওপর… ও হ্যাঁ, যদ্দিন না নিজেদের একটা স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে, চালিয়ে নেবার মতো একটা বাসা তো হয়েছে। যে-পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে আছি তারা আপাতত কিছুদিন নেই, তাই হাত-পা ছড়িয়ে মনের সুখে চলছে।

আর এরই মধ্যে জওহরের আসার সুসংবাদ।

গোরখপুরের কিষান সভায় জওহরের ভাষণের পরই মনে কু গাইছিল। আর কি খুব বেশি দিন ওকে মুক্ত রাখবে সাহেবরা? চিনি কলের শ্রমিকরা আর আখচাষিরা যেভাবে খেপে উঠেছে ওর বক্তৃতায় তারই চর্চা চলছিল গোটা প্রদেশ জুড়ে। চিনি কলে রোগী দেখতে গিয়ে ভিক্টর সমানে গুঞ্জন শুনেছে ‘পারলে নেহরুজিই পারবেন।’ কী পারবেন? না, ব্রিটিশদের তাড়াতে।

ভিক্টরের মুখে কথাটা শুনে একটা নির্ভার, মায়াবী আনন্দ খেলে গেল মনের ভেতরটায়। কিন্তু তখনো কল্পনায় আনতে পারিনি যে ওই হাড়খাটুনির সফরে জওহরলাল নিজেই সময় বার করে চলে আসবে সারায়ায়। আমার সঙ্গে দেখা করতে!

সারায়ার চিনি কলের সামনে জওহলালকে সেই দেখাটা আমি আমৃত্যু ভুলিনি। মাথায় গাঁধী টুপি, গায়ে খাকি শার্ট, সঙ্গে কালো হাফপ্যান্ট, হাঁটু অবধি ওঠা পুরু মোজা, আর বুট জুতো। একটা ছোকরা-ছোকরা সৌন্দর্য সারা শরীরে কিন্তু ভারি সলজ্জ চাহনি।

আমার নতুন বরকে দেখে কেমন লাগল সেভাবে কিছু জানাল না। কিন্তু অ্যাদ্দিন পরও আমার প্রতি ওর টান দেখলাম সেই আগের মতোই। ক্ষণে-ক্ষণে সেই পুরনো স্মৃতিগুলোই ফিরে আসছিল। জোর দিয়ে বলতে পারব না আমি নতুন করে প্রেমে পড়ছিলাম না। পাশাপাশি জওহর আর ভিক্টরকে দেখে এক অচেনা আহ্লাদ বয়ে গেল ভেতরে। সারায়া থেকে গোরখপুর স্টেশন অবধি গেলাম ওকে ট্রেনে তুলে দিতে। তখনও ভাবিনি এই ট্রেনে চড়িয়ে দেওয়াটাই আমাদের শেষ দেখা হবে।

এর কদিন বাদেই নেহরু গ্রেফতার হল। আমরা সারায়ায় বসে দিন গুনতাম কবে মানুষটা দেরাদুন জেল থেকে ছাড়া পাবে।

সেই পেল, আমার মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে! আমার মৃত্যু আর ওর মুক্তির খবর ছবি দিয়ে কাগজে ছাপা হল পাশাপাশি। এটাও নিয়তির এক দুর্জ্ঞেয় খেলা কিনা কে জানে! জওহরের সঙ্গে প্রথম আলাপে, সেই ১৯৩৭-এ যে-আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলাম সেই ‘আমি’-র চোখে কিন্তু এই প্রশান্ত কৌতূহলটা এসেছিল। কী করে, কে জানে!  r (চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Reply