পরিবার, পারিবারিক বন্ধন, পিতৃতন্ত্র : ঋত্বিকের সিনেমায়

লেখক:

ইরাবান বসুরায়

ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ফিল্ম নাগরিকে ছিল একটি পারিবারিক কাহিনি, মেঘে ঢাকা তারায়ও তাই, কোমল গান্ধারে তার আভাস, সুবর্ণরেখায় দুভাগে ভাগ হয়ে আছে এই পারিবারিক কাহিনি, তিতাস একটি নদীর নামে তারই ভাঙাগড়া, যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতে পারিবারিক জীবন ভেঙে যাওয়া। অন্যদিকে অযান্ত্রিকে কোনো পরিবার নেই, আর বাড়ি থেকে পালিয়েতে আছে পারিবারিক বন্ধন থেকে পালিয়ে গিয়েও আবার সেখানে ফিরে আসার কথা। তিতাস একটি নদীর নাম ছাড়া বাকি সবকটিরই ধারক হলো হিন্দু বাঙালি মধ্যশ্রেণির পরিবার, মূলত শহরের।

বস্ত্তত বিদেশি শাসনের ছত্রছায়ায় যে-মধ্যশ্রেণির উদ্ভব, উপনিবেশের সন্তান হওয়ায় পুরো বুর্জোয়া মানসিকতা অর্জন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি পুরনো সামন্ততন্ত্রের উত্তরাধিকারও একেবারে ছাড়তে পারে না তারা। পারিবারিক সংগঠনের মধ্যে তাই থেকে যায় এই দুয়ের সহাবস্থান, তার সংঘাতও। ঋত্বিকের ফিল্মে সে-ছবিটি বারবার দেখা গেছে। প্রথম ফিল্ম নাগরিক সম্পূর্ণভাবেই একটি পরিবার-আশ্রিত কাহিনি। যদিও রামু এর কেন্দ্রীয় চরিত্র, তবু রামুর অস্তিত্ব ও অবস্থান তার পরিবারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, এবং সেখানে কোনো অস্বস্তি বা অসন্তোষ নেই। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ পেরিয়ে এসেও এই পারিবারিক কাঠামোটির খুব একটা রদবদল হয়নি। বিচ্ছিন্নতাবাদের মানসিকতা তখনো, জীবনানন্দের আবিষ্কার সত্ত্বেও কোনো সামগ্রিক প্রবণতা হয়ে ওঠেনি। যৌথ পরিবার ভাঙলেও তা ভাঙছে ব্যক্তিস্বার্থে, একাকিত্বের দূরত্বে নয়। রামু তাই সম্পূর্ণই এক পারিবারিক চরিত্র এবং ঋত্বিক তার এই অবস্থানে কোনো দ্বিধা আনেননি। পরিবারের সঙ্গে তার কোনো সংঘাতের জায়গাই তৈরি হয়নি। নাগরিক সম্পূর্ণভাবেই পারিবারিক বন্ধনের ছবি। অভিযোগ, হতাশা, ক্ষোভ থাকলেও বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা নেই। দারিদ্র্য রামু ও তার প্রেমিকা উমার পরিবারকে বিধ্বস্ত করেছে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। এমনকি উমার বোনের গৃহত্যাগও বিপর্যয় বলে চিহ্নিত হয় মাত্র, তাতে পরিবারের বন্ধন টুটে যায় না। যদিও ব্যক্তিগত সুখের সন্ধানেই শিউলির চলে যাওয়া, দুস্থ জীবনের গ্লানি আর সহ্য করতে না-পারা পারিবারিক টানের ওপরেই জয়ী হয়, তবু তা বিরাট কোনো ফাটল বলে চিহ্নিত হয় না। রামুর পরিবারে বাবা নৈরাশ্যবাদী, মা কিছুটা বিলাপ-অভ্যস্ত, বোন বিরক্ত ও তিক্ত। রামু ভুল আশাকে অাঁকড়ে রাখতে রাখতে ক্লান্ত, তবু সার্বিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তারা এক পারিবারিক বন্ধনের ওপর জোর দিয়েই ঐক্য গড়তে চায় ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য।

বাড়ি থেকে পালিয়েতে বাবার পীড়নের পাশে মায়ের স্নেহ যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি কাঞ্চন বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর তার বাবার উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর স্নেহাকুল মনটিকেই বোঝানো হয়। মিনিদের পর্বেও ঋত্বিক ওই পারিবারিক ভালোবাসার বন্ধনটিকেই প্রতিষ্ঠা করেন। কাঞ্চনও শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় সেই পরিবারের স্নেহছায়াতেই। পারিবারিক বন্ধনের এই একমাত্রিক সুখী চেহারাটি পরে আর ঋত্বিক দেখাতে পারেননি। মেঘে ঢাকা তারায় এসে তাঁকে রচনা করতে হলো এর উলটোপিঠ। সেখানেও এক নিম্নবিত্ত পরিবারের কথাই বলা হয়েছে, মা-বাবা দুই ভাই, দুই বোন, প্রায় আদর্শ বাঙালি পরিবার একটি। আবার নাগরিকের তুলনায় এই পরিবারটি আর্থিক দিক থেকে সামান্য এগোনো, আশ্রয়চ্যুত হওয়ার ভয় নেই তাদের।  নীতা চাকরি করে, সামান্য হলেও রোজগারহীন নয় তারা। নগরজীবনের কেন্দ্রে নয়, তাদের বাস নগরের উপকণ্ঠে। এর থেকেও বড়ো পার্থক্য ঘটে যায় পারিবারিক পটটির ভিতরমহলে। পারিবারিক যে-বন্ধন ছিল নাগরিকের চরিত্রগুলির সান্ত্বনা, এই ফিল্মে তা অদ্ভুতভাবে শিথিল, এতটাই যে, সন্দেহ হয় আদৌ কোনো বন্ধন আছে কিনা। বাইরের দিকের আবরণটি কিছুদূর পর্যন্ত থাকে, ভাইবোনদের নিয়ে নীতার বাইরে বেরোনো, কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদিতে, আর ভিতরে থেকে যায় দূরত্ব রচনার যাবতীয় সযত্ন প্রয়াস। একটি পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় আলাদা আলাদা একক, স্বার্থরোধের চাপে নিকটতম সম্পর্কগুলি কেউ বা বিদ্বিষ্ট, কেউ বা উদাসীন আর কেউ অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। এই ফিল্মে ঋত্বিক খুব নগ্ন করে দেন পরিবার-সম্পর্কিত অতিকথাগুলিকে, ভেঙে দেন স্নেহ, ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক প্রবৃত্তি সম্পর্কে রোমান্টিক ধারণাকে। নীতা বাড়ির বড়ো মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও প্রাপ্য মর্যাদা পায় না, তাকে প্রায় সকলেই দেখে টাকা রোজগারের এক যন্ত্র হিসেবে। মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিল্ম। সম্ভবত নীতার পরিণতির কারুণ্যই দর্শককে এই ফিল্ম সম্পর্কে উৎসাহী করে তুলেছিল। নইলে এখানে ঋত্বিক যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তার ভেতরের নোংরা উন্মুক্ত করে দেখিয়েছেন, তাতে পরিবারপ্রথা নিয়ে গদগদ হওয়া বাঙালি মানসের উৎফুল্ল হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে ‘মা’ এই শব্দটি এবং এই কনসেপ্টটি বাঙালি মানসে এক পবিত্রতার প্রতীক। তাছাড়া হিন্দু বাঙালি চেতনায় পুরাণবাহিত সংস্কারের সঙ্গে  জড়িত হয়ে থাকে তার মাতৃ-আরাধনার নানা আয়োজন, বঙ্কিমচন্দ্র যাকে দিয়েছিলেন এমন এক আবেগতাড়িত কিন্তু আপাত-যুক্তিসিদ্ধ রূপ যাতে তা দেশচেতনাকেও আত্মসাৎ করে। হিন্দু বাঙালি পুরুষ তো এখনো বিয়ে করতে যায় মায়ের জন্য দাসী আনছি বলে। ফলে স্বর্গের থেকেও গরীয়ান হওয়ার দৌড়ে জন্মভূমির সঙ্গে পাল্লা দিতে হলেও ‘মা’ ধারণাটি পূজনীয়ই থেকে যায়। আর ঋত্বিক আঘাত হানেন সেখানেই, কিছুটা যেন তাঁর নিজের মাতৃকা-ভাবনার বিপরীতে গিয়েই। যদিও এটি তিনি করেন কোনো সামগ্রিক বিচারের বোধ থেকে নয়, মূলত অর্থনৈতিক কারণ যে-সম্পর্কের মায়াজালগুলি ছিঁড়ে দেয় সেটা বোঝাতেই। পাশাপাশি তিনি দেখান বোন গীতার চূড়ান্ত স্বার্থসর্বস্বতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঙালি মধ্যশ্রেণির অনেক মায়াজালই ছিঁড়ে দিয়েছিল। কালোবাজারির অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসে আর বোধহয় সুস্থতায় বিশ্বাস রাখা যাচ্ছিল না। আর পূর্ববঙ্গের গ্রাম অথবা মফস্বল থেকে আসা গীতার সামনে ছিল নগরজীবনের বিলাসিতার আকর্ষণ, তাকে রোজগার করতে হয়নি, ফলে কষ্টও বুঝতে হয়নি। সে শুধু পারিবারিক জীবনের যৌথতার বদলে সেখান থেকে নিজের ভাগ বুঝে নিতে অথবা প্রাপ্যেরও বেশি আদায় করতে বা ছিনিয়ে নিতেই শিখেছে। পারিবারিক সম্পর্ক তার মনে কোনো দ্বিধা আনেনি।

এক পাশে থাকে দুই ভাইয়ের দুধরনের নির্লিপ্ততা। বড়ো ভাই শংকর যেমন তার  গান নিয়ে মগ্ন, ছোট ভাই তেমনি ব্যস্ত তার খেলা নিয়ে। শংকর তবু নীতা সম্পর্কে মমতা বোধ করে, ছোট ভাইয়ের তা মনে করার সময় নেই, ভাবনাও নেই। তার নির্লিপ্ততাও স্বার্থপরতাই, তবে তা সরাসরি অন্যকে আঘাত করে না। কিন্তু পারিবারিক বন্ধন, যা নিয়ে বাঙালি মধ্যশ্রেণির উচ্ছ্বাসের  শেষ নেই, যা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়েছে পাতার পর পাতা, ঋত্বিক তার ভেতরের চেহারাটি দেখিয়ে দেন নিষ্করুণভাবেই।

কোমল গান্ধারে সেভাবে কোনো বড়ো পরিবারের কথা নেই। তবে টুকরো দু-একটি কথায় পারিবারিক কয়েকটি খন্ডচিত্র বেরিয়ে আসে; তা পারিবারিক টানের নয়, পীড়নের। জয়ার পরিবারের কাউকে ফিল্মে দেখা যায় না, কিন্তু জানা যায় নাটক করতে আসার জন্য শুধু বকুনি নয়, বাড়িতে তাকে মারও খেতে হয়। পিতৃতন্ত্র পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে এভাবে চাপিয়ে দিতে চায় তার প্রভুত্ব, আধিপত্য। সামান্য একটি ইঙ্গিতেই ঋত্বিক সে-দিকটি সম্পর্কে দর্শককে অবহিত করে দেন। অনসূয়ার পরিবার বলতে কেবল তার দাদাকে দেখা যায়। শান্তা সম্পর্কে যে তাদের কাকিমা, সেই পরিচয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; কেবল তাদের বাড়িতে এসে দাদার কাছে অনসূয়া সম্পর্কে অভিযোগ করার দৃশ্যে কিছুটা মজা তৈরি হয়। কাকিমার সামনে পা তুলে বসে থাকা নিয়ে আপত্তি করলেও দাদা তা শোনে না। সেটা কিছুটা যেমন হাসির খোরাক, তেমনি শান্তা সম্পর্কে অপরিসীম উপেক্ষারও দ্যোতক তা। একে অবশ্য বলা যাবে না পারিবারিক সম্পর্কের কোনো বিশেষ চেহারা, কারণ শান্তা অনসূয়াদের পরিবারভুক্ত হওয়ার কোনো নিদর্শন রাখতে পারেনি। অন্যদিকে ভৃগুর পরিবারে দেখা গেছে কেবল তার বউদিকে, এবং তা এতই সামান্য সময়ের জন্য যে, ভৃগুর কোনো পারিবারিক পরিচয়ই গড়ে ওঠেনি। মেঘে ঢাকা তারার মা থেকে অনসূয়ার মা একেবারেই আলাদা; কিন্তু তাঁর প্রসঙ্গ কেবল স্মৃতিতেই, আর পারিবারিক পরিচয় ছাড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একটা ‘ভাবনা’, একটা ‘আদর্শ’।

পারিবারিক বন্ধন যে প্রকৃত অর্থেই বন্ধন হয়ে উঠতে পারে, আকর্ষণের বদলে তা হয়ে উঠতে পারে ফাঁস, সেটি খুব স্পষ্ট হয়ে যায় সুবর্ণরেখায়। এখানে প্রথম পর্বে যা ছিল টান ভালোবাসা, পরে তা-ই হয়ে দাঁড়ায় পিতৃতন্ত্রের  অধিকারবোধ। সীতা-ঈশ্বর সম্পর্ক আমূল বদলে যায়। পিতৃহীন সীতার কাছে ঈশ্বর ছিল পিতৃপ্রতিম, পরে বদলে যাওয়া ঈশ্বর হয়ে দাঁড়ায় শাসক ও নিয়ন্ত্রক। পিতৃতন্ত্র স্বেচ্ছাচারী, নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে সে শুধু সচেতনই নয়, তা চাপিয়ে দেওয়া ও বজায় রাখার জন্য সে নিষ্ঠুর অত্যাচারীও বটে। ঈশ্বর সে-ভূমিকাটি পালন করে যথাযথভাবেই।

তিতাস একটি নদীর নামে ঋত্বিক মধ্যশ্রেণির জীবন থেকে সরে আসেন শ্রমজীবী  শ্রেণির জীবনে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার সম্বন্ধে মধ্যশ্রেণির পরিশীলিত আদর্শায়িত ধারণা তাদের নেই, তার বদলে প্রাত্যহিকতার প্রত্যক্ষ চাহিদার ফলে গড়ে-ওঠা নিষ্করুণতাই নিয়ন্ত্রণ করে তাদের পারিবারিক সম্পর্ককে। সেখানে রোমান্টিকতার অবকাশ নেই, সবই অত্যন্ত স্পষ্ট। শুরুর দিকে রাজার ঝি-র পরিবারের সামান্য কিছু প্রসঙ্গ থাকলেও তা মামুলি একটি পারিবারিক চিত্রই তুলে ধরে, খুবই সংক্ষিপ্ত তা, বিস্তৃতির কোনো সুযোগও ছিল না। এই ফিল্মে বাসন্তীর আর কাদেরের পরিবার পুরো পরিবার হিসেবে উপস্থিত। বাসন্তীর পরিবারটির মধ্য দিয়েই অসচ্ছল মালো জীবনের একটি ছবি তুলে ধরেছিলেন ঋত্বিক। অকালে বিধবা হওয়া মেয়েকে নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা যেমন রাগ আর গালাগাল হয়ে ফেটে পড়ে, তেমনি বাসন্তীর নিজের জীবনের অপূর্ণ সন্তানাকাঙ্ক্ষা অনন্তকে অাঁকড়ে ধরতে গিয়ে মায়ের কাছে বাধা পেলে তাও হয়ে ওঠে হিংস্র। কিন্তু তা তো কোনো পারস্পরিক বিদ্বেষ নয়, অকপটে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করার নিরাভরণ ভঙ্গি মাত্র। এই আক্রমণ যেমন স্বাভাবিক, তেমনি অনন্তের জন্য উদয়তারার সঙ্গে মারামারির পর বাসন্তীকে মায়ের শুশ্রূষা করায় যে আন্তরিকতা ও স্নেহ তাও সমানই স্বাভাবিক। স্বার্থের সংঘাত যেমন আছে, তেমনি তা এমন কোনো অনপনেয় দূরত্বও তৈরি করে না। অন্যদিকে কাদেরের পরিবার তার ছেলে সাদের, সাদেরের বউ আর কাদেরের নাতিকে নিয়ে। সেখানেও পারস্পরিক ভালোবাসা, রাগারাগি, বেয়াই সম্পর্কে কটাক্ষ আর তার পুত্রবধূর আহত অভিমানের তীব্র প্রকাশ সবই আছে। কিন্তু তা কখনো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে না, স্বাভাবিকতার  অংশ হয়ে থাকে। ঝগড়ার শেষে তাই কাদেরের রাগত ভঙ্গির সঙ্গেই মিশে থাকে ছেলের আবদার মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি। ফলে তাদের পারিবারিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটে না। তিতাস একটি নদীর নামে পারিবারিক জীবনকে এর বেশি জায়গা দেওয়া যেত না, ঋত্বিক সে-চেষ্টাও করেননি।

যুক্তি তক্কো আর গপ্পো পরিবার ভেঙে যাওয়ার গল্প। ফিল্মের প্রথমদিকেই নীলকণ্ঠের স্ত্রী তাকে ছেড়ে যাচ্ছে, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। ফলে এই ফিল্মেও পরিবার নিয়ে কোনো মধ্যশ্রেণিসুলভ ভাববিলাসের জায়গা নেই, বরং তাকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টাই আছে। দুর্গা যে নীলকণ্ঠকে ছেড়ে যাচ্ছেন তা নীলকণ্ঠের চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতার কারণেই। তাঁর নিজের পরিবার-ধারণায় নীলকণ্ঠের কোনো জায়গা নেই, ছেলেকে নিয়েই তাঁর একক। নীলকণ্ঠকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ফিল্মে ‘পরিবার’ নামক ফ্রেমটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। যদিও এর মধ্য দিয়ে ঋত্বিক ধাক্কা মারেন ‘পরিবার’ বা পারিবারিক ‘মূল্যবোধে’র সনাতন ছকটিকেই। মনে করিয়ে দেন, পরিবার মানে কোনো অচলায়তন নয়, নিকটতম সম্পর্ককেও অস্বীকার করতে হয়। প্রয়োজনে। এর বিপরীতে ঋত্বিক অবশ্য এক অন্য রক্তসম্পর্কহীন পরিবারের স্বপ্নকল্প রচনা করতে চান, নচিকেতা, জগন্নাথ, বঙ্গবালাকে পরপর জুটিয়ে। তবু নীলকণ্ঠ শেষ পর্যন্ত পরিবারের কাঠামোতেই ফেরার চেষ্টা করতে চায়, দুর্গার বারণ সত্ত্বেও তার কোয়ার্টারে গিয়ে হাজির হয় সত্যকে দেখার উছিলায়। নীলকণ্ঠ মনে রাখেনি, আবেগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে লাভ নেই। ‘পরিবার’ এই ধারণাটিই দুর্গার কাছে বদলে গেছে, নীলকণ্ঠের জন্যই।

পরিবার, পারিবারিক বন্ধন, পিতৃতন্ত্র ইত্যাদিকে ঋত্বিক চরম মাত্রায় ধরেন একটি বিশেষ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে; তা হলো ভাইবোনের সম্পর্ক। পরিবারের মধ্য থেকেও ঋত্বিক বেছে নেন আরো একটি ছোট একক – ভাইবোন। নাগরিক, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখায় এই সম্পর্কটি চোখে পড়ার মতো, কোথাও তা প্রবল গুরুত্বই পেয়েছে। আপাতভাবে এই সম্পর্কটি বেশ সরল, কারণ পারিবারিক অবস্থানে ভাই ও বোন একই সমতলে, একই প্রজন্ম তারা। যদিও ঋত্বিক দেখিয়ে দেন, সেই সমতলিক অবস্থানে থেকে যায় কত স্তর, কত মাত্রা।

অযান্ত্রিক বা বাড়ি থেকে পালিয়েতে এরকম সম্পর্কের কোনো অবকাশই ছিল না, যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতেও নয়। তিতাস একটি নদীর নামে সামান্যতম এক উল্লেখ আছে এই সম্পর্কের – উদয়তারা খুশিতে উপচে পড়ছিল তার দাদা বনমালী তাকে নাইয়র নিতে আসবে বলে। নাগরিকে ভাইবোনের সম্পর্কে কোনো জটিলতা নেই, সংসারের দৈনন্দিন স্বাভাবিকতার ছন্দেই তা প্রবহমান। এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল মেঘে ঢাকা তারায়। নীতা ও ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক মামুলি, ভাইয়ের স্বার্থবোধ ও আত্মকেন্দ্রিকতা তেমন বিধ্বংসী নয়, দিদির সঙ্গে তার আদান-প্রদানও সামান্য। দাদা শংকরের সঙ্গে নীতার যোগ অনেক গভীর। নীতা দাদাকে বোঝে, ভালোবাসে পরিবারের আর সবার ধারণার বিপরীতেই গিয়ে। দাদা কত বড়ো হবে, তা হয়তো জানে না সে; কিন্তু সব ঝড়ঝাপ্টা থেকে দাদাকে নানাভাবে আড়াল করে রাখে নীতা। এখানে যেমন নীতা দাদার আশ্রয়দাত্রী, তেমনি তার নিজের চরম বিপর্যয়ে সে আশ্রয় খোঁজে দাদার কাছেই। যদিও দাদাকে নীতার আশ্রয় দেওয়া পুরোপুরি বাস্তব সমাধান, শংকরের কাছে নীতার আশ্রয় চাওয়া মানসিক সান্ত্বনা। গীতার বিয়ের রাতে আর কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে নীতা। শংকর পরিবারের মধ্যে প্রায় একঘরে, তার স্বরের কোনো মূল্য নেই। তবু বোনকে সে তার মতো করেই আশ্রয় দেয়, বিয়ের রাতে নীতাকে গান শেখায়। গান, না দুজনের সম্মিলিত ব্যথার উচ্চারণ! শংকর ফিরে এলে সে-ই তো একমাত্র হতে পারে নীতার শেষ অবলম্বন। মহাকাল পাহাড়ের নীতাকে দেখতে যাওয়া যেমন তারই কর্তব্য, তেমনি তা তারই একমাত্র অধিকার। পরস্পরকে অাঁকড়ে ধরার এই ইতিকথায় ঋত্বিক রচনা করেন এক মানবিক সম্পর্কের উজ্জ্বল দলিল, নিকটাত্মীয়তার মধ্যেও যে মানবিকতার বোধ প্রায়ই উবে যায়, যেমন গেছে এই ফিল্মেরই অন্যত্র।

কোমল গান্ধারে ভাইবোনের সম্পর্ককে খুব বেশি বিস্তারিত করেননি ঋত্বিক, যদিও ছোট ছোট মুহূর্তেই ধরিয়ে দিয়েছেন তাদের পারস্পরিক সংযোগ ও সহমর্মিতাকে। ছোট ছোট দু-একটি সংলাপে, খুনসুটিতে যেমন তা ধরা পড়েছে, তেমনই শেষ মুহূর্তে অনসূয়াকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়া ও আবার ফিরিয়ে এনে বজবজে পৌঁছে দেওয়ায় যেমন আছে নীতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোর মনোভাব, তেমনই নিঃশব্দ সমর্থন। দাদা হিসেবে কখনো এই চরিত্রটি কোনো অধিকারবোধে আক্রান্ত হয়নি, অনসূয়ার ব্যক্তিত্বকে কখনো অসম্মান করেনি।

এই ফিল্মে এই সম্পর্কটি অনাবিল স্নিগ্ধতার স্পর্শে মধুর। পরের ফিল্ম সুবর্ণরেখায় তা বদলে গেল পুরো।

সুবর্ণরেখায় ঈশ্বর-সীতা সম্পর্ক দুটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রথম ভাগে ঈশ্বর প্রবল স্নেহপ্রবণ, সীতাকে সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে আড়াল করার জন্যই সে নবজীবন কলোনি ছেড়ে এসেছিল বিশ্বাসঘাতক অভিধা বরণ করে। যদিও মনে হতেই পারে, সীতা আসলে তার অজুহাত মাত্র; ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের মোহকেই সে সীতার নাম দিয়ে আড়াল করতে চাইছে। তবু সীতা যে তার পরম অবলম্বন, সীতা যে কখনো কখনো হয়ে ওঠে মৃত মায়েরই প্রতিরূপ, প্রথম পর্বে ঈশ্বরের আচরণে ও উক্তিতে সেই স্বীকার আছে। সীতার মধ্যেও আছে দাদার প্রতি গভীর আস্থা। কিন্তু এই স্নেহ-ভালোবাসার ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে আধিপত্যবাদের নোংরা চেহারা। সীতা যতক্ষণ একান্তই ঈশ্বরের সম্পত্তি, তার বাধ্য, সব ব্যাপারেই তার ওপরই নির্ভরশীল, ততক্ষণ ঈশ্বরের স্নেহ বর্ষিত হচ্ছে তার ওপর। কিন্তু সেই স্নেহ কখনো সীতার স্বতন্ত্র স্বাধীন ইচ্ছাকে জানতে চায়নি, জানলেও তাকে মূল্য দেয়নি। সীতার যে স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে তাই স্বীকার করতে চাওয়া হয়নি এই স্নেহ-ভালোবাসায়। বস্ত্তত ঈশ্বরের ভালোবাসার ধরনে সীতা পুতুল মাত্র, কোনো মানবী নয়। সীতার মানবী হতে চাওয়াতেই মুহূর্তেই বেরিয়ে আসে পিতৃতন্ত্রের উচ্চারণ। যখনই সীতা আলাদা হয়ে উঠতে চাইল, তখনই সংঘাত, আর সেই সংঘাতে ভালোবাসা নয়, ঈশ্বরের অস্ত্র হলো  প্রভুত্বের স্বর, দমিয়ে রাখার ভঙ্গি, তর্জন এমনকি বোনকে শারীরিক আঘাতও। এর মানে এ নয় যে, ঈশ্বরের মন থেকে মুছে গেল সীতার প্রতি সব ভালোবাসা। শুধু সেই স্নেহ, সেই ভালোবাসার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো দাবি, তা চেয়ে বসল আনুগত্য, না পেলে তা আদায় করতে চাইল জোর করে। দ্বিতীয় পর্বে ঈশ্বরের মধ্যে দেখা গেল পিতৃতন্ত্রের নোংরা চেহারাটাই। অন্যদিকে সীতা দাদার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা থেকে সরে এলো নিজের সত্যের উপলব্ধি। এতদিন যে মাতৃস্নেহে দাদাকে সে দেখাশোনা করেছে, এবার তার বদলে তাকে স্পষ্ট জানাতে হচ্ছে যে, দাদা অন্যায় করছে। ঈশ্বর যদি ভাইবোনের সম্পর্ক ছাড়িয়ে হয়ে উঠতে চায় পিতৃতন্ত্রের প্রতিভূ, তবে সীতা আত্মসমর্পণের বদলে হয়ে ওঠে সেই পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। সম্পর্কের নৈকট্যের মধ্যে সমত্বের বোধ হারিয়ে যায়, বড়ো হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান, যা আর পারস্পরিক ভালোবাসাকে টিকতে দেয় না।

পরিবারের ভেতর থেকে এই ছোট একককে আলাদা করে বেছে নিতে হয়নি ঋত্বিককে। পারিবারিক সংগঠনের স্বাভাবিক গড়নের মধ্যেই এককগুলি চিহ্নিত করে নেওয়া যায়। এই এককের বৈশিষ্ট্য এই যে, একই প্রজন্মের হওয়ায় তাদের মনোভঙ্গির মধ্যে সংযোগ বেশি হওয়ার কথা, সেই সংযোগের টানাপড়েনকে অবলম্বন করে ঋত্বিক পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ককে বুঝতে চেয়েছেন, তাকে যাচাই করেছেন নানাভাবে। মধ্যশ্রেণির মূল্যবোধের এই সম্পর্কের গুরুত্ব জানতেন বলেই তাকে মায়াঞ্জন মুছে সত্যভাবে দেখাতে চেয়েছেন। তাতে কখনো পরিবার হয়ে উঠেছে                টান-ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা, কখনো সে-বন্ধন শিকল মাত্র। সেইসঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন পিতৃতন্ত্রের দাপট, তার অধিকারবোধ, তার আধিপত্যকামিতা, যা এমনকি কাজ করে যায় স্নেহ-ভালোবাসারও ভেতরে ভেতরে। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার