পাইনের ছায়ে হাইডির গাঁয়ে

লেখক: রিজওয়ানুল ইসলাম

হাইডির গল্পের কথা আমি প্রথম শুনি আমার শিল্পীবন্ধু নীলার কাছে। সুইজারল্যান্ডের উত্তর-পূর্বদিকে পাহাড়ের গায়ে একটি গ্রাম। সেখানে এক অনাথ ছোট্ট শিশু হাইডি তার মাসির কাছে বড় হচ্ছিল। কিন্তু মাসি যখন চাকরির জন্য বাড়ি থেকে দূরে (ফ্রাঙ্কফুর্ট) চলে গেলেন, তখন তাকে তার দাদুর কাছে রেখে যান দেখাশোনার জন্য। দাদু প্রথমে ব্যাপারটা পছন্দ না করলেও একটু একটু করে ভালোবাসতে শুরু করে তার নাতনিকে; কিন্তু পাহাড়ের গায়ের গ্রামটিতে দীর্ঘ শীতকাল কাটানো অত্যন্ত কষ্টকর। সেই পরিবেশে দাদু এবং নাতনি কীভাবে তাদের জীবন কাটায় এ নিয়ে গড়ে উঠেছে হাইডির গল্প। সেখানে এসেছে তার পাড়ার বন্ধু পিটারের কথা, তাদের ছাগলের কথা, হাইডির ফ্রাঙ্কফুর্ট যাওয়া, সেখানে ক্লারার সঙ্গে বন্ধুত্ব, পাহাড়ি গ্রাম থেকে দূরের শহরে গিয়ে তার খাপ খাওয়াতে অসুবিধা এবং তা থেকে অসুস্থতা, তার দাদুর কাছে ফেরত আসা ইত্যাদি।

সুইস লেখিকা Johanna Spyri-র লেখা এ-বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। আর এ-গল্প এতই মনোমুগ্ধকর যে, বইটি পৃথিবীর অনেক ভাষায় অনূদিত হয়ে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। নির্মিত হয় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। শুধু তাই নয়, যে-জায়গার পটভূমিতে রচিত হয়েছে এ-গল্প, সে-জায়গাটি দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ থেকে সৃষ্টি হয় পর্যটনশিল্পের প্রসারের সুযোগ। কোথায় সেই স্থান?

সুইজারল্যান্ডের অন্যতম শহর জুরিখ থেকে রেললাইন চলে গেছে আরো উত্তর-পূর্বদিকে। আর সে-লাইনে জুরিখ থেকে প্রায় সোয়া ঘণ্টা পর পৌঁছে যাওয়া যায় মাইয়েনফেল্ড নামে একটি ছোট্ট গ্রামে। রেলস্টেশন থেকে গাড়িতে কয়েক মিনিটের মধ্যে গ্রামের বসতি ছাড়িয়ে পুবদিকে পাহাড়ের দিকে গেলে যে-জনপদ তাই এখন পরিচিত হাইডি গ্রাম নামে।

আমার বন্ধু নীলার খুব প্রিয় বই হাইডি; অনেকবার পড়েছে সে এ-বই। আর গ্রামটি দেখার জন্য তার খুবই আগ্রহ। গল্পটি তার মুখে একটু শুনেই আমি এবং গীতশ্রীও আগ্রহী হয়ে উঠলাম। সুতরাং শুরু হয়ে গেল পরিকল্পনা এবং তা বাসন্তবায়নের ব্যবস্থা। ঠিক হলো সুইজারল্যান্ডে নীলার পরের যাত্রাতেই যাওয়া হবে হাইডি গ্রামে।

সেবার জেনেভায় গ্রীষ্ম ভালো চলছিল; দীর্ঘ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ গরম। সেরকম একটি দিনে জেনেভা রেলস্টেশনে জুরিখের ট্রেনে উঠে পড়লাম আমরা তিনজন – সময়টা এমনভাবে দেখে নিলাম যে, জুরিখ নেমে আধঘণ্টার মধ্যেই পাওয়া যাবে মাইয়েনফেল্ডের ট্রেন।

সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা কে না জানে। আর তা উপভোগ করার একটি ভালো উপায় হচ্ছে ট্রেনে ভ্রমণ। গাড়িতে গেলে গাড়ির চালককে চোখ রাখতে হয় রাস্তায়; তাই সহযাত্রীরা উপভোগ করলেও চালকের পক্ষে দুপাশের সৌন্দর্য বেশি দেখা হয় না। এবার তাই আমার সত্যিকারের সুযোগ হলো ক্যালেন্ডারের ছবির মতো সব দৃশ্য দেখার আর সেগুলোকে মনে গেঁথে রাখার। জুরিখ পৌঁছাতেই পার হলাম দুটি বড় লেক, আঙুরের ক্ষেত আর কোথাওবা হলুদ ফুল ফুটে থাকা সূর্যমুখীর ক্ষেত। কোথাও আঙুরের ক্ষেত রেললাইন থেকে একটু দূরে; আর তখন দেখা যায় গাছগুলো কেমন সুন্দর সবুজ চিরুনির শলার মতো বিছানো। আবার কখনো গাড়ি যাচ্ছিল একেবারে ক্ষেতের ধার ঘেঁষে; তখন কাছ থেকে আঙুরের থোকাগুলো ঝুলতে দেখা যাচ্ছিল।

লেক কখনো ছিল হাতের ডানদিকে, কখনো বাঁদিকে। কখনো দেখা যাচ্ছিল ট্রেন থেকে অনেক নিচে, আবার কখনো একেবারে কাছে। জুরিখ থেকে মাইয়েনফেল্ডের যাত্রার প্রথমেই ট্রেন যাচ্ছিল লেকের পাড় ঘেঁষে, যেখানে লোকেরা কেউ সাঁতার কাটছিল, আবার কেউ কেউ শুয়ে রোদ পোহাচ্ছিল। একটা জায়গায় রেললাইন পানির এত কাছে ছিল যে, আমি জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে পানিতে ঘুরে-বেড়ানো মাছও দেখতে পাচ্ছিলাম।

ট্রেনের ভেতর আমাদের কামরায় যাত্রীর ভিড় তেমন ছিল না। আমরা তিনজনে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করতে করতে যাচ্ছি। একসময় নীলা স্মৃতি থেকে তুলে আনল তার এক কষ্টকর ট্রেনযাত্রার কাহিনি – কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি। সেবার ওর ছিল দার্জিলিংয়ে গানের অনুষ্ঠান। কলকাতা থেকে আরো দুজন শিল্পীর সঙ্গে ট্রেনে যাওয়া, আর কী যে ভিড় ছিল সেই ট্রেনে – সে-গল্প করছিল ও। আমি জানি না, তখন বিধাতা কি আড়াল থেকে হাসছিলেন আর বলছিলেন, তোমাদের দেখাব সুইজারল্যান্ডের মতো দেশেও কখনো কখনো বিভ্রাট ঘটে যেতে পারে, আর যাত্রায় হতে পারে দুর্ভোগ। ভাগ্যের কী পরিহাস, সেটা দেখতে আমাদের বেশি দেরি হয়নি। ফেরার পথে আমাদের পোহাতে হয়েছিল কিছুটা হলেও দুর্ভোগ।

যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম মাইয়েনফেল্ড। ছোট্ট ছিমছাম স্টেশন। যে-হোটেলে আমি রুম বুক করেছি তার একটি গাড়ি উপস্থিত থাকবে আমাদের জন্য – এরকম বোঝাপড়া হয়েছিল মেইলের মাধ্যমে। কিন্তু কোথায় সেই গাড়ি! পস্ন্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে স্টেশনের আশপাশে সেরকম কোনো গাড়ি দেখতে পেলাম না। কয়েকটি বাস বিভিন্ন দিকে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ড্রাইভাররা একটি জায়গায় গল্পগুজব করছে। তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম আমার হোটেলের দিকে কোনো বাস যাবে কিনা। তার কথা থেকে বুঝতে পারলাম যে, একটি বাস হোটেলের কাছ দিয়ে যাবে; কিন্তু বাস থেকে নেমে মিনিটপাঁচেক হাঁটতে হবে। আমাদের সঙ্গে অল্প হলেও মালপত্র রয়েছে। আমার সহযাত্রী দুজনই মহিলা। তার ওপর সূর্য তখন বাংলাদেশের মতোই তেজ দেখাচ্ছে। তাই বাসে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মাত্র ট্যাক্সির শরণাপন্ন হলাম। তাতে আমার পকেটের ওপর একটু চাপ পড়লে কী আর করা যাবে!

হোটেলে ঢুকতেই মনে হলো আমরা একটি রেসেত্মারাঁর মধ্যে ঢুকেছি। লাঞ্চের সময় বলে সেখানে ছিল খদ্দেরের ভিড়। প্রথাগত কোনো রিসেপশন না দেখে সেখানেই একটি কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – এই হোটেলের রিসেপশন কোথায়? সামনের মহিলাটি বললেন, এটিই রিসেপশন এবং আমাদের বুকিং আছে বলতেই তিনি একটি লোককে ডেকে আনলেন। আমার নাম বলতেই লোকটির চেহারা এমন হলো যে, তা দেখে মনে হলো, স্টেশনে গাড়ি না থাকার জন্য তার কিছুটা হলেও ভূমিকা আছে। আমাদের চেক-ইনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এলে কী করে? আমি সুযোগ পেয়ে আমার অভিযোগের কথা জানালাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি মৌখিকভাবে কোনো দুঃখ প্রকাশ করলেন না – যদিও তাঁর দেহভঙ্গিমায় একটু অপরাধীর ভাব ছিল। পরে অবশ্য অন্য কয়েকটি সেবার মাধ্যমে তিনি তাঁর এই গাফিলতি থেকে সৃষ্ট অসুবিধা এবং বাড়তি খরচ পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সে-কথায় ফিরব পরে।

আমাদের কামরাগুলো ছিল হোটেলটির দোতলায়। আমাদের সব লাগেজ চেক-ইন করানো লোকটিই পৌঁছে দিলেন। পরে তাঁর সঙ্গে আলাপে বুঝতে পেরেছিলাম, তিনিই এই হোটেল চালান – এর মালিকদের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে। সেই অর্থে তিনি এর ম্যানেজার। তিনি রিসেপশনে চেক-ইন আর ক্যাশিয়ারের কাজ থেকে শুরু করে রেসেত্মারাঁয় ওয়েটারের এবং গাড়ি চালানোর কাজও করেন। সোজা কথায়, তিনি অন্তত চারজনের কাজ একাই করেন। সুইজারল্যান্ডে (এবং অনেক উন্নত দেশেই) কাজের লোকের বেতন অনেক বেশি, তাই ব্যবসায়ের সাফল্যের জন্য একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে, কত কম লোক দিয়ে কাজ সারা যায়। আমরা যে-হোটেলে উঠেছি তা পরিচালনায়ও ওই একই বিষয় লক্ষ করলাম।

 

দুই

আসার আগেই ইন্টারনেটে পাওয়া একটি ম্যাপ থেকে আমি হাইডির গ্রাম, তার বাড়ি এবং যেসব জায়গায় সে-সময় কাটাত তার একটি ধারণা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই জায়গাগুলো ঠিক কোথায় এবং হোটেল থেকে কত দূরে তা বোঝার জন্য শরণাপন্ন হলাম হোটেলের সেই ম্যানেজারের। তিনি আমাদের বললেন, বেশিরভাগ জায়গাই হাঁটার মতো দূরত্বে। কীভাবে যাওয়া যায় তাও তিনি দেখিয়ে দিলেন। রেসেত্মারাঁয় বসেই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম অনেক লোক সেই পথে যাওয়া-আসা করছে। ভারতীয় চেহারার একটি জোড়াকে দেখলাম ছাতা মাথায় ঘনিষ্ঠভাবে হেঁটে আসছে। আমাদের দেশে রোদ থেকে রক্ষার জন্য ছাতার ব্যবহার দেখা গেলেও সুইজারল্যান্ডে তা কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু আইডিয়াটা আমিও কাজে লাগালাম, যখন আমরা বেরোলাম হাইডির গ্রাম দেখার জন্য। আমাদের সঙ্গে একটি ছাতা ছিল যেটা আমরা নীলাকে দিলাম, যেন সে রোদ থেকে তার মাথাটা ঢাকতে পারে। আমি এবং গীতশ্রী মাথায় টুপি পরে নিলাম।

লাঞ্চের পর সামান্য বিশ্রাম নিয়েই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মিনিটপাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম অভীষ্ট জায়গায়, যেখানে তখনো (বিকেল প্রায় ছটা) খোলা ছিল স্যুভেনিরের দোকান। হাইডির বাড়ি দেখার টিকিটও বিক্রি হচ্ছিল। দোকানের মহিলা জানালেন, যদিও ছটায় সব বন্ধ হওয়ার কথা, গ্রীষ্মকাল বলে আরো কিছুক্ষণ খোলা থাকবে। তিনি তাঁর স্যুভেনির বিক্রিতে এতই আগ্রহী ছিলেন যে আমাদের বললেন, তোমরা যদি কিছু কিনতে চাও তাহলে আগেই কিনে ফেলো, যেন আমি দোকান বন্ধ করার কাজ শুরু করতে পারি। আমরা সে-পরামর্শে কান না দিয়ে তাঁকে আশ্বসন্ত করলাম, আমরা রাতে থেকে যাব এবং পরদিন আবার আসব স্যুভেনিরের খোঁজে।

এখানে বলে রাখা ভালো, হাইডির গ্রাম এবং বাড়ি বলে আমরা এখন যা দেখি সেটা উপন্যাসটিতে বর্ণিত আসল জায়গা এবং বাড়ি নয়। আমাদের হোটেল ম্যানেজার বললেন, আদি গ্রামটি সেখান থেকে আরো ঘণ্টা দু-একের হাঁটাপথ – পাহাড়ের ওপরে। পর্যটকরা যা দেখে সেটি কয়েকজন উদ্যোক্তার সৃষ্টি করা আদি গ্রাম এবং বাড়ির নকল – একটি পর্যটন প্রকল্প।

পুরো জায়গাটি একটু পাহাড়ের ঢালমতো – আর সেখানে দুটি ছোট বাড়ি। তার মধ্যে একটি নিচে, আর একটি – যা হাইডি আর ওর দাদুর গ্রীষ্মকালীন নিবাস হিসেবে দেখানো – আরো একটু উঁচুতে। নিচের জায়গাটিতে আরো রয়েছে একটি খামার, যেখানে বেশ কিছু ছাগল এবং হাঁস-মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। সবকিছুর মাঝখানে একটি জলের কল এবং চৌবাচ্চা। একটি গ্রামের কেন্দ্রস্থল যেমন হতে পারে, তেমনি চেহারা জায়গাটির।

আমরা ওপরের দিকে একটু হেঁটে প্রথমেই চলে গেলাম গ্রীষ্মকালীন নিবাসটিতে। স্থাপত্যের দিক থেকে সেটি সুইস শ্যালে ধরনের একটি ছোট্ট বাড়ি। তার নিচের তলায় হাইডি আর ওর দাদুর শোবার ঘর। একপাশে (বাড়িটিরই একটি ঘরে) হাইডির প্রিয় ছাগলের গোয়ালঘর। উপন্যাসটিতে এই ছাগলগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ওদের দেখাশোনা করা যেমন হাইডির কাজ ছিল, তেমনি ওরা তার খেলার সাথিও ছিল। ওদের নিয়ে হাইডি ঘুরে বেড়াত পাড়াময়। মাঝে মাঝে সে এভাবে চলে যেত অনেক দূর। সে যেসব জায়গায় এভাবে ঘুরে বেড়াত তা এখন ‘হাইডি ট্রেইল’ নামে ম্যাপে পাওয়া যায়। সেই ট্রেইল গিয়ে শেষ হয়েছে একটি জলের ফোয়ারায়। এখন সে-ফোয়ারাটি বাঁধানো রয়েছে হাইডির একটি মূর্তিসমেত, সে-জায়গাটি অবশ্য হাঁটার দূরত্বে নয়; আমাদের সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন হোটেলের ম্যানেজার।

গ্রীষ্মকালীন শ্যালেটির একটি ঘরে রয়েছে দুধ জাল দেওয়া এবং তা থেকে মাখন ও পনির বানানোর বিভিন্ন সরঞ্জাম। গরু-ছাগল পোষা এবং দুধ প্রক্রিয়াজাত করা নিশ্চয়ই হাইডির দাদুর অন্যতম কাজ ছিল। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি কাছাকাছি কোথাও রয়েছেন; এক্ষুনি এসে আবার কাজ শুরু করবেন।

শ্যালেটির পেছন থেকেই পাহাড় উঁচু হয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে, আর তার গায়ে ঘন পাইনের বন। যদিও গ্রীষ্মের সেই বিকেলে রোদের তাপে আমরা হাঁসফাঁস করছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল, একটু পরেই পাইনের বনে উঠবে ঝড় আর শোঁ-শোঁ শব্দ শুনে ভয় পেয়ে হাইডি মুখ ঢাকবে তার লেপের তলায়।

যদিও ছটা বেজে গিয়েছিল বেশ খানিকক্ষণ আগেই, হাইডির নিচের বাড়িটি তখনো খোলা ছিল দর্শনার্থীদের জন্য। ঢুকেই দেখা গেল বাড়ির ভাঁড়ার, যেখানে রয়েছে খাবার এবং মদ জমা করে রাখার ব্যবস্থা। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে সামনেই হাইডির শোবার ঘর। দেয়াল ঘেঁষে ছোট্ট একটি বিছানা, আর দেয়ালটিতে ছোট্ট জানালা। হাইডি বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকত আকাশের দিকে। তার পাশের একটি ঘরে ডাইনিং টেবিল এবং চেয়ার। আর একটি ঘরে হাইডির বন্ধু ক্লারার হুইলচেয়ার। গল্পটিতে পিটার ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্লারার হুইলচেয়ারটিকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিল পাহাড়ের নিচে। তারপর ক্লারা হাইডি আর পিটারের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করে এবং পেরেও যায়।

বাড়িটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে মনে হচ্ছিল, আমি গল্পটির সঙ্গে কিছুটা হলেও একান্ত হয়ে গেছি। তবে আমাদের চেয়েও বেশি অভিভূত মনে হলো নীলাকে। সে বারবারই বলছিল, ‘কী যে ভালো লাগছে এখানে আসতে পেরে। বইটিতে যা যা পড়েছি সব যেন এখানে দেখতে পাচ্ছি।’ আরো ভালো লাগল যখন বাড়িটির পেছনের দিকের লনে গিয়ে একটি বেঞ্চে বসলাম। কয়েকটি মোরগ-মুরগি চরে বেড়াচ্ছিল আর এটা-সেটা খুঁটে খাচ্ছিল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে দূরের পাহাড় আর তার গায়ের সবুজ গাছপালা একেবারে ক্যালেন্ডারের পাতার মতোই মনে হচ্ছিল।

 

তিন

পরদিন সকালে হাতে একটু সময় ছিল; ভাবলাম নিচে নেমে মাইয়েনফেল্ড গ্রামটি (বা শহরের কেন্দ্রটি) দেখে আসা যাক। কিন্তু যাওয়া যায় কীভাবে! ট্যাক্সি পাওয়া যাবে কিনা এসব খোঁজখবর করতে জানা গেল, হোটেলের সেই ম্যানেজার সেখানে যাবেন একটু পরে এবং তিনি আমাদের নামিয়ে দিতে পারেন। আমরা সে-প্রস্তাব লুফে নিলাম।

ছোট্ট গ্রামটির মাঝখানে নেমে বোঝা গেল, মূল রাস্তা একটিই, যেটি রেলস্টেশন থেকে এসে আর-এক দিকে চলে গেছে। আর সে-রাস্তাটির দুধার থেকে ছোট ছোট কয়েকটি রাস্তা বেরিয়ে গেছে। কোনো কোনো রাস্তা আর এগুলোর পাশের চত্বর পাথরে বাঁধানো। এক চত্বরের মাঝখানে বহুকোণবিশিষ্ট চৌবাচ্চা; তার মাঝে একটি সন্তম্ভ, যার চারদিকে চারটি জলের কল থেকে জল পড়ছে অবিরত। এ-ধরনের জলের কল ইউরোপের অনেক পুরনো শহরেই দেখা যায়। সেগুলো দেখলেই আমার মনে হয়, ইস্, কত জল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!

রাস্তাগুলোর দুপাশে কিছু বাড়িঘর এবং অন্যান্য স্থাপনা। তাদের মধ্যে কোনো কোনোটি দুশো বছরের বেশি পুরনো – একটির গায়ে লেখা দেখলাম ১৭৯৭। বাড়িগুলোর স্থাপত্যও দেখার মতো – কোথাও হয়তো রাস্তা থেকেই সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। এক জায়গায় দেখলাম রাস্তার ওপরেই খিলানের মতো করে নির্মিত
ইট-পাথরের তোরণ।

হাঁটতে হাঁটতে আমাদের মনে হলো, একটু কফি খেলে মন্দ হয় না। সহজেই পাওয়া গেল একটি ছোট্ট ক্যাফে, যার ভেতরে ঢুকে মনে হলো, আমরা কোনো গ্রামের চায়ের দোকানে এসে গেছি। একটি লম্বা টেবিলের দুপাশে কয়েকজন বসে খবরের কাগজ পড়ছে এবং তাদের সামনে চা-কফির কাপ। খুব ইচ্ছা করল তাদের সঙ্গে বসে যাই আর আড্ডা দিই কিছুক্ষণ। কিন্তু সেখানে আমাদের তিনজনের বসার মতো জায়গা ছিল না। তাছাড়া আমরা চাইছিলাম রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় বসে কফি এবং হাওয়া দুটিই একসঙ্গে খাব। কাছেই পেয়ে গেলাম সেরকম একটি ক্যাফে। সেখানে কাজ করছিল এক সুন্দরী তরুণী – কফি তৈরি করা থেকে শুরু করে টেবিলে পরিবেশন করা, বিল আনা এবং পয়সা নেওয়া – সব কাজ সে একাই করছিল। তার সঙ্গে আলাপ হলো সামান্য, জানতে পারলাম সে এসেছে পর্তুগাল থেকে, জীবিকার অন্বেষণে। গ্রীষ্মকালে সুইজারল্যান্ডে কাজের কোনো অভাব নেই। তাছাড়া এখানে বেতন তার দেশের চেয়ে অনেক বেশি। সে-কারণে সে এসেছে কিছুদিন কাজ করতে। কিছু পয়সা জমাতে পারলে তার পরের সেমেস্টারে বেতন দেওয়াটা সহজ হবে। আগে অন্যান্য জায়গায় দেখেছি, এখানেও বুঝতে পারলাম, আর্থিক কারণে অভিবাসন শুধু স্বল্প আয়ের দেশের লোকেরাই করে না, এক ধনী দেশ থেকে আরো বেশি ধনী দেশে যায় লোকে।

ফেরার পথে আমরা একটি ট্যাক্সি নিয়ে এলাম হাইডি গ্রামের সেই স্যুভেনিরের দোকান পর্যন্ত। আসতে আসতে ভাবছিলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে হাইডির ফেরত আসার কথা। তাকে একজন লোক দিয়ে পাঠানো হয়েছিল ট্রেনে করে। মাইয়েনফেল্ড স্টেশনে নামিয়ে তাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি ঘোড়ার গাড়িতে। জানি না, কোন রাস্তা দিয়ে সে-গাড়ি এসেছিল। তবে আমাদের ট্যাক্সির রাস্তা ছিল বেশ আঁকাবাঁকা, আর নিচ থেকে বেশ কিছুটা পাহাড়ের ওপর এ-গ্রাম। ঘোড়ার গাড়িতে আসতে তখন কত সময় লেগেছিল কে জানে!

স্যুভেনিরের দোকান ঘুরে এটা-সেটা কিনতে কিনতে লাঞ্চের সময় হয়ে গিয়েছিল। লাঞ্চ করতে করতে হয়ে যাবে ট্রেনের সময়। হাইডি ট্রেইল এবং ফোয়ারা দেখার আর বিশেষ সময় ছিল না। আমরা খেয়েদেয়ে যাত্রার প্রস্ত্ততি নিলাম। ব্যবস্থা ছিল যে, হোটেলের ম্যানেজার আমাদের রেলস্টেশনে নামিয়ে দেবেন – আসার সময় তিনি তাঁর কথামতো আমাদের আনার জন্য স্টেশনে যাননি বলে নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফেরার সময় আমাদের নামাবেন। শুধু তাই নয়, তিনি যখন শুনলেন আমাদের হাইডি ট্রেইল আর ফোয়ারা দেখা হয়নি, তখন তিনি স্টেশনে যাওয়ার সময় আমাদের নিয়ে গেলেন সে-পথে, গাড়ি থামালেন ফোয়ারার কাছে, আর সময় দিলেন আমাদের নেমে দেখার এবং ছবি তোলার। অবাক হইনি, কারণ সুইসরা তাঁদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে দেবে কেন? r

শেয়ার করুন