পা ও কিডনির গল্প

লেখক:

আন্দালিব রাশদী

বাংলাদেশে নজরুল ইসলাম নামের মানুষের অভাব নেই। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামের সংখ্যাও কম নয়। পাত্রের নামের সঙ্গে নজরুল থাকলেই পাত্রীপক্ষ ধরে নেবে মানুষটি ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো মহান পুরুষ। তাঁর এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী, আর হাতে রণতূর্য, কণ্ঠে তাঁর সাম্যের গান। তাঁর বাগিচার বুলবুলিকে ফুলশাখাতে দোল না দিতে গানে গানে অনুরোধ করতে হয় – এমন তো নয়।

তাহলে হুমায়ুন আহমেদ হবার কারণে আমাকে কেন এতো কথা শুনতে হবে? ছায়ার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যাপারটা প্রেমট্রেমজনিত নয়, পুরোপুরি সেটল্ড ম্যারেজ। আমাদের পক্ষ – পাত্রপক্ষ পাত্রীকে কতটা নাস্তানাবুদ  করেছে অনুমান করতে পারি। আমার বড় দুলাভাই নিশ্চয়ই তাকে কলেমা তামজিদ মুখস্থ বলতে বলেছেন, কোন পরিস্থিতিতে তায়াজ্জুম জায়েজ জিজ্ঞেস করেছেন, পুত্রসন্তানের খৎনা করানো পিতা-মাতার জন্য ওয়াজিব না সুন্নত জানতে চেয়েছেন।

ছায়া একটি প্রশ্নের জবাবও দিতে পারেনি। দুলাভাই বলেছেন, তাতে সমস্যা নেই। আমি মেয়েটির ঠোঁট নড়া দেখেছি অর্থাৎ সে বলতে চেয়েছে। আর তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে তিনি ছায়াকে ‘স্বামীবাধ্য রাখিবার তদবির’ শিখিয়ে দিয়েছেন। আমার জন্য আগেও দুজন পাত্রী দেখা হয়েছে। তারাও তিন প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। তিনি তাদের কাউকেই এই তদবির শেখাননি। সোজা কথা সুন্দরের কাছে সব কুপোকাত। ছায়া আর দুজন – শেফালি ও তারান্নুমের চেয়ে ঢের বেশি আকর্ষণীয়। সে-কারণেই বড় দুলাভাই তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং তার ঠোঁট যে নড়ছে তা নিবিড়ভাবে দেখতে পেয়েছেন।

আমাকে যারা দেখতে এলেন চার সদস্যের টিমে ছায়ার বড় দুলাভাই আশফাকুজ্জামান আমার বড় দুলাভাইয়ের মতো পন্ডিত নন, সিরাজউদ্দৌলা নাটকে তিনি লর্ড ক্লাইভের মতো বাংলা বলেন, তার স্ত্রী মায়া সারাক্ষণই বকবক করেন, ছায়ার ছোটমামা বোরহানউদ্দিন খান এবং ছায়ার একমাত্র ফুপা রুহুল কুদ্দুস। রুহুল কুদ্দুস সাহেবকে এই টিমে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হয়নি, তিনি চোখে খুবই কম দেখেন, পুরু গ্লাসের বাইরে থেকে তাকালে চোখ দুটি ট্রাকের হেডলাইটের মতো মনে হয়। বোরহান সাহেব ডায়াবেটিক, ঘরে ঢুকেই বললেন, বাথরুমটা কোনদিকে, ভেতরে বদনা আছে তো? আমি আবার টিস্যু ব্যবহারের পক্ষে নই।

শুনেই আমার বড় দুলাভাই বলে উঠলেন, অ্যাকজেক্টলি আমার মতো। আমিও টিস্যু ব্যবহার করি না। আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় নেয়ামত পানি রেখে আমি কাগজ ছিঁড়তে যাব কোন দুঃখে।

তখনই মনে হলো দুই পরিবারের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্য আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। উভয় পরিবারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ আত্মীয় টয়লেট টিস্যু খারিজ করে দিয়ে বদনা ও পানির ওপর ভরসা করেন।

পাত্রীর বড় বোন মায়া গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আপনার নাম হুমায়ুন আহমেদ। বেশ, বলুন তো ‘ময়ূরাক্ষী’ কিসের নাম? ‘যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ’ লেখাটিতে মাননীয় মন্ত্রীর নাম কী? শ্যামল ছায়ার রাজাকার কমান্ডারকে কী করা হয়?

প্রশ্নগুলোর উত্তর যে হুমায়ূন আহমেদ নামের লেখক ভালো দিতে পারতেন, এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। পরীক্ষা পাশের জন্য টেক্সট বই যতটুক পড়া দরকার, তার বেশি দুপাতাও আমি পড়িনি। আর বানোয়াট গপ্পো-উপন্যাস পড়ে সময় নষ্ট করার চেয়ে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো আমার কাছে বেশি আনন্দের। প্রশ্ন শুনে আমার জবাব না পারার অভিব্যক্তি দেখে তিনি বললেন, ময়ূরাক্ষী একটি নদীর নাম, মাননীয় মন্ত্রীর নাম সালাহউদ্দিন খান ভুলু। রাজাকার কমান্ডারকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়, বৃষ্টি নামে।

জবাব দিয়ে তিনি পিটপিট করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, গান গাইতে পারেন? ছায়া কিন্তু গানের পাগল।

স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী বিদায় অনুষ্ঠানে একবার কোরাসে গলা মিলিয়েছি। তিনি বললেন, বেশ, এক যে ছিল সোনার কন্যা গানটা গান। এটা ছায়ার খুব প্রিয়। অন্ধকার রাতে ছাদের ওপর পাশাপাশি শুয়ে এ-গানটা গাইবেন। ছায়া খুব খুশি হবে। গানটা কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের নিজের লেখা।

আমি যে গানটা কখনো শুনিনি।

কী আশ্চর্য! এই গানটা শোনেননি? বাংলাদেশের সবাই গানটা জানে। বেশ, আমিই গাইছি, শুনুন :

একটা ছিল সোনার কন্যা মেঘবরণ কেশ

ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ

দুই চোখে তার আহারে কী মায়া

নদীর জলে পড়ল কন্যার ছায়া\

 

তিনি ভালোই গাইছিলেন কিন্তু বাদ সাধলেন আশফাকুজ্জামান। বললেন, জান, দিজ ইজ নট দ্য রাইট প্লেস টু সিং।

সরি ডিয়ার। গানটা কোনোদিন শোনেনি তো, তাই।

আমার বড় দুলাভাই এই সংগীতশিল্পীকে বললেন, তোমার নামটা কি শুনি। তোমার গলায় তো হামদ আর নাতের জন্য আল্লাহপাক সুর দিয়েছেন, সোনার কন্যা গান গেয়ে গলাটা নষ্ট করছ কেন।

পাত্রীপক্ষে বোরহানউদ্দিন খান বললেন, আমিও তো তাই বলি। মেয়েটাকে ভালো করে বলে দিন। ও আমাদের কথা শোনে না। ছায়ার যে-ছবি দেখেছি, যে-বিবরণ শুনেছি আমি প্রস্তাবের শুরু থেকেই রাজি। পাত্রীপক্ষের প্রভাবশালী সদস্য মায়া বলে গেলেন, বিয়েতে আমি হুমায়ূন আহমেদের সব বই দেবো। একবার পড়া শুরু করলে আর হানিমুনে যেতে ইচ্ছে করবে না। আমার হানিমুনের সময় আমি কক্সবাজারে হোটেল লাবণীর বারান্দায় বসে তাঁর তেরোটা উপন্যাস শেষ করেছি আর আশফাক ঝাউগাছের নিচে বসে আঙুল চুষেছে।

আশফাকুজ্জামান বললেন, ইংরেজিতে যা বললেন তার মানে তারিখ চূড়ান্ত করার আগে দুজনের দেখা হওয়া দরকার। আগে থেকে কিছুটা চেনাজানা না হলে পরে সমস্যা হতে পারে।

মায়া তার স্বামীকে ধমকে ওঠেন, তুমি কি আমাকে আগে থেকে চিনতে? সবার সামনে বলো -তোমার কোনো সমস্যাটা হয়েছে?

বোরহানউদ্দিন খান বললেন, শরিয়ত মেনে এগোনো ভালো।

শরিয়ত মানা হয়নি। তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার পরপর মায়াই তার ছোট বোন ছায়াকে ডেকে এনেছেন টিএসসি চত্বরে। আমাকেও যেতে বলেছেন। খোলামেলা জায়গায় দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলেছেন, জাস্ট ফিফটিন মিনিটস। ঠিক পনেরো মিনিট পর আসব। হুমায়ুন তোমার যা বলার এর মধ্যে বলে নিও। ছায়া যদি কিছু বলতে চাস এর মধ্যেই। ছোটমামা এই দেখাদেখির ব্যাপারটা পছন্দ করবেন না।

তিনি বয়সে আমার ছোট হলেও সম্ভাব্য স্ত্রীর বড় বোন হিসেবে আমাকে তুমি সম্বোধন করতে শুরু করেছেন।

ছায়াকে ছবিতে যতটা সুন্দর মনে হয়েছে, বাস্তবে দেখছি আরো বেশি সুন্দর। সুন্দর দৃঢ়চিত্তের মানুষকেও দুর্বল করে দেয়, নার্ভাস করে তোলে। আমি টের পাচ্ছি আমার শরীর ঘামতে শুরু করছে। স্পর্শ করার আগেই আমার এ-অবস্থা, পরে কি হবে!

মিনিট পাঁচেক নিশ্চুপ থাকা পর ছায়াই মুখ খুলল, পছন্দ হয়েছে?

হয়েছে, খুব পছন্দ হয়েছে।

কিন্তু আমাকে পছন্দ হয়েছে কি-না এ-প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করিনি। যদি বলে, হয়নি! পনেরো মিনিটের জায়গায় বিশ মিনিট সময় পেলেও আমাদের মধ্যে চার-পাঁচটির বেশি বাক্যবিনিময় হয়নি।

আমাদের পক্ষ ছায়ার গায়ে হলুদের ভিডিও করে এনেছে। ক্যামেরা থেকে আমার ল্যাপটপে। বারবার রিউইন্ড করে ছায়াকেই দেখেছি। সারারাতই। খুব ভোরের দিকে যখন ঘুমাতে যাবো কলিংবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলতেই এক বোরকাপরা ভদ্রমহিলা যে সঙ্গে-সঙ্গেই রুমে ঢুকে পড়বেন বুঝতে পারিনি। মুখের কাপড় সরাতেই চিনে ফেললাম। ছায়া! বললাম, জি বসুন। কী ব্যাপার?

ছায়ার মুখ ভালো করে ধোয়া হয়নি। হলুদের ছোপছোপ দাগ মুখে রয়েই গেছে। ছায়া যে মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো একটি মেয়ে শার্টের বোতাম না লাগানোর ভ্রান্তিজনিত বিব্রতদশাকেও তা ভুলিয়ে দেয়। কী ঘটছে আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

ছায়া বলল, হুমায়ুন ভাই, আপনি কাইন্ডলি আমাকে রিজেক্ট করে দিন।

মানে? আপনার সঙ্গে এনগেজমেন্ট হয়েছে, কাল আপনার গায়েহলুদ হলো, আজ আমারটা। দুদিন পর বিয়ে। কার্ড ডিস্ট্রিবিউশন শেষ। আপনি কী বলছেন এসব?

আপনি সবাইকে বলে দিন ছায়ার চরিত্র খারাপ। এমন মেয়েকে বিয়ে করা যায় না। এটা বললে মিথ্যা বলা হবে না।

আমি কেন একজন ভদ্রমহিলা সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে যাবো?

ছায়া বলল, তাতে আপনার অসুবিধে কী? মামুনের সঙ্গে আমার অনেকদিনের সম্পর্ক। মাঝখানে রাগারাগির কারণে আমরা দূরে সরে গিয়েছিলাম। কাল গায়েহলুদের সময় বুঝতে পারলাম আমি আসলে দূরে সরে যেতে পারিনি। মামুনকে চিনেছেন তো? শুটার মামুন, ভূতের গলির। বছরের চার মাস ঠিক থাকে, চার মাস আন্ডারগ্রাউন্ডে, চার মাস জেলে।

এখন কোথায়?

জানি না। মাস চারেক আগে যখন শেষ দেখা, আমাকে বলেছে, দেখে নেবে। যদি সংসার আমাকে করতেই হয় মামুনের সঙ্গেই, অন্য কারো সঙ্গে আমাকে মেনে নেবে না।

আপনি কি মামুনের ভয়ে বিয়ে থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন?

ঠিক তা নয়, আমি কালই বুঝতে পারি যে, আমি ওকে প্রচন্ড ভালোবাসি? বছরে চার মাস সংসার হোক কি দুমাস, আমি মামুনের সঙ্গেই থাকব। এখন আপনি বিয়েটা ভেঙে দিন।

আমি কেন ভাঙতে যাব? আপনারা আজকের গায়েহলুদে কাউকে পাঠাবেন না। বিয়ের দিনও আসবেন না। তাহলেই তো হয়ে গেল। তাছাড়া বিয়েটা তো আমাদের কারো প্রস্তাবে নয়। আপনাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছে, আপনাকে আমাদের পছন্দ হয়েছে, এনগেজমেন্ট হয়েছে, পাকা দিন-তারিখ ধার্য হয়েছে। বিয়ে ভাঙার দায় আমি কেন নিতে যাব? আপনার অভিভাবকদের বলুন যে, আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না। সিদ্ধান্তটা আজ রাতের মধ্যে জানান। আমার বড় বোন কালরাতে লন্ডন থেকে রওনা হচ্ছে; তাকেও বলে দিই আপাতত আসার প্রয়োজন নেই।

শুটার মামুনকে বিয়ে করব শুনলে আমার মা-বাবা আমার পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবে। ঘর থেকে বের হতে দেবে না। তাদের দোষ দিচ্ছি না, আপনিও আপনার মেয়েকে এমন কারো সঙ্গে বিয়ে দেবেন না, যে বছরের আট মাস থাকে জেলখানায় আর আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেজন্যই বলছি, আপনি অন্তত করুণা করে হলেও আমাকে প্রত্যাখ্যান করুন। মেয়েদের বেলায় চরিত্রের দোষ সবাই বিশ্বাস করে। ছেলেদের বেলায় বলা হয়, পুরুষ মানুষ এমনই হয়। চরিত্রের দোষ কথাটা ছেলেদের বেলায় প্রযোজ্য নয়।

আমি আরেকবার ছায়ার দিকে চোখ তুলে তাকাই। অনুচ্চস্বরে নিজেকে শোনাই – অসম্ভব!

তারপর বলি, এই যেমন এতো সকালে হুট করে আমার এখানে চলে এলেন, আমার গায়েহলুদের লোকজন আসার আগে আপনি হুট করে আপনার মামুন সাহেবের কাছে চলে যান, আর ফিরবেন না। তারপর সমস্যা কোনো না কোনোভাবে মিটে যাবে।

ছায়া বলল, কিন্তু মামুন কোথায় আমি তো জানি না। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে, প্রতিমন্ত্রীকে গুলি করেছিল।

তার মানে, সেই মামুন? পৃথিবীতে পুরুষ মানুষের এতোই অভাব যে, একটা ক্রিমিনালকে আপনার বিয়ে করতে হবে?

ছায়া বলল, ওকে ক্রিমিনাল বলবেন না, হি ইজ ফাইটিং ফর অ্যা কজ।

শুনুন আপনি বাড়ি ফিরে যান, মাথা ঠান্ডা করুন। মামুনের বদলে চেনাজানা অন্য কোনো ছেলে থাকলে তার বাড়িতে গিয়ে উঠুন। আপনার মতো এমন সুন্দর একজন মেয়েকে কেউ প্রত্যাখ্যান করবে না।

ছায়া বলল, তাই যদি করতে হয়, ইউ আর মাই নেক্সট বেস্ট চয়েস। অবশ্য মামুনের ব্যাপারটা জানার পরও যদি আপনি রাজি থাকেন। ঠিক আছে আমি ফিরে যাচ্ছি। যদি সন্ধের মধ্যে মামুনের কাছে পৌঁছতে না পারি আপনার কাছে আসতেই বাধ্য হবো, কিন্তু তার আগে আপনাকে কথা দিতে হবে, বাকি জীবন আপনি মামুন প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে পারবেন না। আরেকটা কথা, আপনার সঙ্গে আমাকে কি এই রুমে থাকতে হবে? এটার তো অ্যাটাচড বাথরুম নেই। আমি বাথরুমের প্রাইভেসি ছাড়া কারো সংসারই করতে পারব না।

মামুন প্রসঙ্গটি পাশ কাটিয়ে এবার বললাম, আমরা ভেতরের বেডরুমে থাকব। ওটার সঙ্গে অ্যাটাচড বাথ, বাথটাব সবই আছে। আপনার অসুবিধে হবে না। আপনি কি বোরকা পরেন? আমি আপনাকে আগে বোরকা পরা দেখিনি।

না, এটা বুয়ার বোরকা। নতুবা বাসা থেকে বের হতে পারতাম না।

ছায়া উঠে পড়ে। বলে, আমি চললাম, দোয়া করবেন, মামুনকে যেন বের করতে পারি।

আমি বললাম, আমি কি আপনাকে আপনাদের বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসব?

না, আমি মামুনকে খুঁজতে যাচ্ছি। থ্যাংক ইউ।

যেতে যেতে ছায়া বলল, বিছানার ওপর আন্ডারওয়্যার ফেলে রেখেছেন কেন? শার্টের বোতাম ঠিক করে লাগান। লুঙ্গির গিঁট ধরে রেখেছেন যে! খুলে যাওয়ার ভয় থাকলে ট্রাউজার্স পরবেন।

তার কথায় মেজাজ খারাপই হয়ে গেল। ছায়া বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দ করে দরজা বন্ধ করলাম, ঠোঁট নেড়ে নিচুস্বরে গালও দিলাম – বেয়াদব মেয়ে।

বাসা থেকে রাস্তায় নামার দরজা দুটো। একটা দিয়ে যখন বোরকাপরা মহিলা বের হয়, অন্যটা দিয়ে ফজর শেষ করার পর মর্নিংওয়াক সেরে বাবা ভেতরে ঢোকেন।

ঢুকেই চিৎকার করে বলে ওঠেন, হুমায়ুনের ঘর থেকে বোরকাপরা কে বের হলো? রাত্রে ওর ঘরে ছিল নাকি? কাল বাদে পরশু বিয়ে। এতোটা অধঃপতন। ছিঃ! দুশ্চরিত্র ছেলে!

 

দুই

যথারীতি আমার গায়েহলুদ হলো।

বউমা কেমন আছে, আমার মেজমামার – এ-প্রশ্নের জবাবে মিমির বড় বোন রিমি বলল, খুব টায়ার্ড হয়ে পড়েছে। বের হওয়ার সময় দেখলাম ঘুমিয়ে আছে।

আমি আশ্বস্ত হই। তাহলে মামুনকে পায়নি। এখন নেক্সট বেস্ট চয়েসই ভরসা।

ছায়া নতুন শহরের মেয়ে। ইন্দিরা রোডে ধানসিঁড়ি অ্যাপার্টমেন্টসে থাকে। ভাড়াবাড়ি। নিজেদের বাড়িও আছে, পাশেই মনিপুরীপাড়াতে। ডেভেলপার নিয়ে নিয়েছে, বড় ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। ছায়ার বাবা পাবেন নয়টি ফ্ল্যাট। শেষ পর্যন্ত একটি কি দুটি ছায়ার ভাগে পড়বে। আমি নতুন ও পুরনো ঢাকার মাঝামাঝি, বকশীবাজারে। বাড়িটা নিজেদেরই। পুরনো বাড়িই রয়ে গেছে। বাবা ঋণ করে বাড়ি করবেন না, জীবদ্দশায় তার হাতে তৈরি বাড়ি ভাঙতেও দেবেন না।

ছায়ার সৌন্দর্যই যথেষ্ট ছিল। সঙ্গে যোগ হয়েছে ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য মালিকানা। নিজেকে বোঝাই – তবু ছায়া ভালো, শুটার মামুন হোক কিংবা কসাই কামরান, কিছু তো লুকোয়নি। অন্য কেউ হলে লাগাতার পাঁচ বয়ফ্রেন্ডের নাম বেমালুম ভুলে কুমারী কিশোরীর অভিনয় করে যেত। এটুকু সময়ের মধ্যেই বলেছে, আমাদের সম্পর্কটা কিন্তু অনেকদূর গড়িয়েছে।

বিয়ের অনুষ্ঠান ছায়াদের বাড়ির পাশেই সোবহানবাগ কমিউনিটি সেন্টারে। ছায়ার বাবা বিয়েতে পাত্রীপক্ষের বড় আত্মীয় দেখাতে দুজন বর্তমান ও দুজন সাবেক মন্ত্রীকে দাওয়াত করেছিলেন। দুজন সাবেক এবং একজন বর্তমান মন্ত্রী এসেছেন। বর্তমান মন্ত্রী আবার দপ্তরবিহীন। একজন রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল এবং একজন পদধারী অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শকও ছিলেন।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে আমি ও ছায়া গোলাপ ও রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো বরের গাড়িতে চড়ে বকশীবাজারে বাসরঘরের দিকে যাত্রা করার জন্য গাড়ির কাছাকাছি আসতেই আশপাশেই একনাগাড়ে বেশকটা গুলির শব্দ। একটা একেবারেই পাশে থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক। চিৎকার দিয়ে আমি রাস্তায় পড়ে যাই। পিস্তলধারী চেঁচিয়ে বলে, ছায়া তোমার হাজব্যান্ডকে কনগ্রেচুলেশন্স। জানে মারতে চাইনি, শুধু ডান পায়ে, তাও হাঁটুর নিচে।

তারপর ১৫০ সিসি একটা বাইকে চড়ে শুটার দুজন দ্রুত আসাদগেটের দিকে ছুটতে থাকে।

ছায়া চেঁচিয়ে ওঠে, বাবা রক্ত! বাবা অ্যাম্বুলেন্স।

আর এগোতে পারেনি। ছায়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। আমি জ্ঞান হারাইনি; কিন্তু গুলি কোথায় লেগেছে বুঝতে পারিনি।

সাজানো বরের গাড়ির ড্রাইভার রক্তাক্ত মানুষ গাড়িতে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বলে, গাড়িতে রক্ত লাগবে।

সুতরাং ছায়াদের পুরনো টয়োটায় ঢুকিয়ে আমাকে আনা হলো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে, কদিন পর পঙ্গু হাসপাতালে। টানা তিন মাস পড়ে থাকতে হলো হাসপাতালের বিছানায়। তারপর এক মাস বকশীবাজারে হুমায়ুন ও তার স্ত্রীর জন্য সাজানো বাসরঘরে। ছায়ার বাবা মামুন ওরফে শুটার মামুন ও অপর একজনকে আসামি করে মামলা করলেন। মামুন গ্রেফতার হলো এবং সরকারদলীয় একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় দ্রুত জামিনও পেল।

হতভম্বদশার মধ্য দিয়ে দিন কাটতে লাগলো আমাদের দুজনের। মাল্টিপল ফ্র্যাকচার চাপা দিতে জিপসোনা প্লাস্টার পা ঢেকে রাখল, ততদিনে পায়ে ভয়াবহ ইনফেকশন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হেদায়েত হোসেন খান বললেন, দ্রুত অ্যামপিউট না করলে হাঁটুর ওপর ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়বে।

বিয়ের দিন জামাতাকে নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থতার দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে ছায়ার বাবা ব্যাংকক জেনারেল হসপিটালে দুই দফায় সাতাশ দিন রেখে প্রথমে পা অ্যামপিউট ও পরে প্রসথেটিক পা সংযোজন করিয়ে এনেছেন। এই কৃত্রিম পা যতটা না কাজের, তারচেয়ে বেশি ফ্যাশনের। এই পাকে মোজা পরানো যায়, জুতো পরানো যায়, এমনকি ফুলপ্যান্টও পরানো যায়। সেজেগুঁজে বসে থাকলে হুট করে পায়ের ব্যাপারটা বোঝা যায় না। উঠতে গেলে এগোতে গেলে, ডানে, বাঁয়ে কিংবা পেছনে যেতে চাইলে শুধু এই পা ভরসা করা যায় না, বাড়তি সাহায্য লাগে।

ডাক্তার বলেছেন, আরো ভালো রোবোটিক লেগ সংযোজন করা সম্ভব। কৃত্রিম পায়ে হাইড্রোলিক পেশার ব্যবহার করে পায়ের চলাচলের শক্তি পাওয়া সম্ভব। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের অলিম্পিকে খেলোয়াড়রা এ-ধরনের পা ব্যবহার করে থাকে।

ছায়া অনেকটা নির্বাক হয়ে গেছে। দুবারই আমার সঙ্গে ব্যাংকক এসেছে। সেবাযত্নের ত্রুটি করেনি।

কিন্তু মায়া এমনভাবে চেঁচিয়ে কথাটা বলেছে যে, তা আমাদের দুজনের কানেই এসেছে। কথাটা সবাইকেই বলা। বাবা তুমি মামলায় মামুন ও অপর একজনকে আসামি করেছো। দুজনকে করোনি কেন?

বাবা বলেছেন, আরেকজন তাহলে কে?

কেন? আমাদের ছায়া। শুটার মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ-নাটক তো সে-ই সাজিয়েছে।

মানে?

মানে বুঝতে পারছো না? ছায়ার গায়ে তো গুলির বাতাসও লাগেনি। অথচ নিরপরাধ বেচারা হুমায়ুনের পা-টা কেটেই ফেলতে হলো। তোমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বলো না, ছায়াকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে ভালো করে ডলা দিক। সব বলে দেবে। শেষ পর্যন্ত এটাই প্রমাণিত হবে, শুটার মামুনকে দিয়ে কাজটা সে-ই করিয়েছে।

মায়ার কথায় তাদের বাবা হাফিজউদ্দিন ভুঁইয়া শুটার মামুনের বিরুদ্ধে মামলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। শুটার মামুনের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের ব্যাপারটি তো মিথ্যে নয়। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পনেরো দিনের মধ্যে ছায়া তিনদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যায়। মধ্যরাতে অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে ছায়ার ফোন না এলে তো তার ছবিসহ নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেশের সব বড়-বড় পত্রিকায় ছাপা হতো। চতুর্থ দিন ভোরে ছায়া বাসায় ঢুকে বলে, ট্রেনের বার্থে ঘুমানো দারুণ মজার ব্যাপার। চান্স পেলে আবার যাবো।

ছায়া মামুনের সঙ্গে পতেঙ্গা গিয়েছিল। ফেরার সময় গ্রেফতার হতে পারে এই ভয়ে কমলাপুর পৌঁছার আগেই চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। মামুনের এই দুঃসাহস তাকে আরো মুগ্ধ করে।

সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় মামুনের দেওয়া ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে। বাড়িটা বাইরে থেকে বাংলো প্যাটার্নের ভালো লাগার মতো, ভেতরে গিয়ে টের পায় এটা আসলে একটা এক্সক্লুসিভ হৌর হাউস। যৌনকর্মীরা এখানে বিশিষ্ট খদ্দেরদের সেবা করে থাকে। লোকজন তাকেও তা-ই মনে করেছিল।

পরে সে যখন মামুনকে চার্জ করে মামুন জানায়, পকেটে ঠিকানা লিখা দুটো কাগজ ছিল। পুলিশের এডিসি আতাউল্লাহকে যেটা দেবার কথা ভুলে তা ছায়াকে দিয়েছে। আতাউললাহ বিপদে-আপদে তাকে অনেক সাহায্য করেছে, একবার হাতেনাতে ধরেও ছেড়ে দিয়েছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে তাকে একটু ফাও ফুর্তির ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিল। তিনি শুধু অনুগ্রহ করে যাবেন, আর যত ধরনের খরচ সবই দেবে মামুন।

হাফিজউদ্দিন ভুঁইয়ার মামলায় আমাকে সাক্ষী করা হয়েছিল। ছায়া চেয়েছিল কিন্তু তাকে সাক্ষ্য দিতে দেয়নি। ভিকটিম হিসেবে সাক্ষ্য দিতে ক্র্যাচে ভর দিয়ে আমি নিজে আদালতে হাজির হয়ে মূল বক্তব্যেই বলেছি, আমার গুলিবিদ্ধ হওয়া ও পা কেটে ফেলার বিষয়টি সত্য, তবে মামুনই যে কাজটা করেছে এটা নিজ চোখে দেখিনি, অন্য কেউও হতে পারে। আসামিপক্ষের উকিল জেরা করে যে-কথাটি বের করবেন ভেবেছিলেন তা এমনিতে বলে দেওয়ায় তিনি আদালতকে বললেন, মাচ অবলাইজড। সাক্ষীকে জেরা করার প্রয়োজন নেই।

সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মামুন বেকসুর খালাস হয়ে গেল। ছায়া ক্রুদ্ধস্বরে জিজ্ঞেস করল, মামুনের নাম বললে না কেন?

মামুন যদি তোমাকে এই মামলায় ফাঁসিয়ে দেয় সেই ভয়ে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আরো একটা ভয় ছিল আমার ভালো পা-টাও হারাতে চাইনি। তার হাতের সই বড় নিখুঁত। ইচ্ছে করলে আমার হার্ট টার্গেট করে গুলি করতে পারত, করেনি। এই ঋণটা শোধ করার একটা ব্যাপারও তো ছিল। তাছাড়া আমি নিজেও ঠিক প্রতিশোধপরায়ণ টাইপের নই।

 

তিন

সংগত কারণেই আমাদের পক্ষে বউভাতের অনুষ্ঠান হয়নি। প্রায় ছমাস পর তার জন্য নতুন পরে প্লাস্টিক পেইন্ট করা বাসরঘরটিতে নিয়মিত বসবাস করতে থাকি।

পা অ্যামপিউট করার আগে পর্যন্ত ক্রমাগত যন্ত্রণা তার জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তোলে। জীবনটা মূলত পেইনকিলার-নির্ভর হয়ে ওঠে। আগের চাকরিটা ছিল চুক্তিভিত্তিক। দাতা সংস্থার হয়ে সারাদেশ ঘুরে কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ডিজিএফ, ভিজিডি, পল্লী রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি – এসবের কাজের অগ্রগতি দেখে বেড়াতাম, ঢাকায় এসে রিপোর্ট দিতাম। তিন বছরের চুক্তির অর্ধেক না ফুরোতেই একটা পা গেল। আমি প্রায় পুরোপুরি বিছানাবন্দি। আমার খিটখিটে মেজাজ আমার এবং ছায়ার – আমাদের দুজনের জীবনই দুর্বিষহ করে তোলে। আমার বিছানার একপাশে পড়ে থাকে আমার কৃত্রিম পা।

দুর্যোগ আমাকে ছাড়তে চায় না। মাত্র পনেরো কি বিশ মিনিট এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করার পর হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ি। সেরকম কোনো লক্ষণ আগে দেখা না গেলেও ডাক্তার বললেন, কিডনি কাজ করছে না – অ্যাকিউট রেনাল ফেলিউর। চতুর্থ দিনই হোমোডায়ালিস শুরু করতে হলো। একটি ভালো কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা জরুরি হয়ে পড়ল। এর জন্য নিশ্চয়ই ছায়া দায়ী নয়, কিন্তু এ-দায় আমি তার ওপরই চাপাচ্ছি।

বাড়ির ভাগবণ্টন নিয়ে দুবোনের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সুযোগ পেলে মায়া আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে শুটার মামুনকে নিয়ে ষড়যন্ত্রটা সে-ই করেছে। আমার মাথায় খুন চাপে। গলাটিপে হত্যা করব। হাসপাতালের কেবিনটা সিঙ্গেল বেড। রাতের বেলা ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে ছায়া ঘুমায়। আমি বিছানায় উঠে বসি, একটু এগিয়ে যাই। দেখি আমার আলগা পা দুহাতে বুকের কাছে জড়িয়ে ছায়া ঘুমোচ্ছে। আমার ভেতরের ঘাতক আমারই পা-টি দেখে হঠাৎ নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। আমার মনে হয়, আমার আত্মা আমার ওই কৃত্রিম পায়ের ভেতর, ছায়াই তা আগলে রেখেছে। তাকে হত্যা করলে অরক্ষিত হয়ে পড়বে আমার আত্মা। আমি আবার বিছানায় শুয়ে পড়ি।

চার

আমাকে একটি কিডনি দিতে সবার আগে এগিয়ে আসে ছায়া। আমাদের ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করে, কিন্তু কিডনির টিস্যুর ক্রস-ম্যাচিং ছায়াকে প্রত্যাখ্যান করে। ডায়ালিসিস করে আরো কিছুদিন টিকে থাকা যাবে, কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে কিডনি প্রতিস্থাপনের বিকল্প নেই।

ছায়া অস্থির হয়ে আছে দশ লাখ লাগুক বিশ লাখ লাগুক এমনকি আরো বেশি লাগলেও একটি কিডনি কিনবে। তার ফ্ল্যাটের আগাম বিক্রয় বিজ্ঞপ্তি প্রথম আলো ছেপেছে। একটার পর একটা ফোন আসছে। ফোন পেয়ে ছায়া বলছে, সব টাকা একত্রে দিতে হবে।

অন্য কারো ফোন পেয়ে বলছে, দেখুন না ভাই চেষ্টা করে, টাকার জন্য ভাববেন না। ম্যাচিং হলেই অর্ধেক টাকা দিয়ে দেব।

ফোনে মায়াকে সতর্ক করছে, সাবধান হাসপাতালে আসিস না। ভালো হবে না বলছি।

একদিন সুখবর এলো, মিলেছে। ম্যাচিং হয়েছে।

আমার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে। অপারেশন থিয়েটারে পাশাপাশি দুটো ওটির বেডে আমরা দুজন। মানুষটি বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তাহলে কিডনিটিও ভালো হওয়ার কথা। মানুষটি বেশ সুদর্শনও। মুখভর্তি ঘনকালো দাড়ি। কবির বেদির মতো দেখতে। এর পরের অংশটুকু আর আমার স্মৃতিতে নেই।

পোস্ট অপারেটিভ রুমে জ্ঞান ফেরার পরও একধরনের অসাড়তা শরীরকে আঁকড়ে ধরে থাকে। আমি মাথা উলটে দেখি সেই সুদর্শন মানুষ আমার দিকে চেয়ে আছেন।

যখন কথা বলার শক্তি অর্জন করি আমি তাকে ধন্যবাদ দিই। বলি, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।

তিনি বললেন, দুটো কিডনি পচিয়ে ফেলার চেয়ে অন্তত একটা দিয়ে দেওয়া ভালো। তাই ভাবলাম আপনাকেই দিই। এক প্রতিমন্ত্রীর ছেলেকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে আমার মৃত্যুদন্ড হয়েছে। অন্তত একটা অঙ্গ কাজে লাগুক।

আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। খুনির কিডনি আমার শরীরে।

তিনি বললেন, আমাকে একটি টাকাও দিতে হবে না। চিকিৎসাটা ভালো করে করান।

আমরা একসঙ্গেই হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে অব্যাহতি পেয়ে কেবিনে ফিরে যাচ্ছি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কিডনি ডোনারের সঙ্গে আর দেখা নাও হতে পারে ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নামটা প্লিজ।

সুদর্শন মানুষটি বললেন, মামুন, আমি শুটার মামুন। নেভার মাইন্ড।

শেয়ার করুন

১ thought on “পা ও কিডনির গল্প

Leave a Reply