পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি

লেখক:

আনিসুল হক

‘আপনি আগামীকাল বিকেল চারটায়, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বিকেল চারটায় মারা যাবেন।’ এবিসির কাছে ফোনটা আসে সকাল দশটায়। তখন তিনি তার গুলশান অফিসে এসে কেবল বসেছেন। টেবিলে ভাঁজ করে রাখা ইংরেজি দৈনিকটা মেলে ধরেছেন। তার প্রিয় হলো এগারো নম্বর পৃষ্ঠার কমিক স্ট্রিপ। তিনি সেই পৃষ্ঠার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন।
শীতকাল। বোধহয় পৌষ মাস। এ বছর আবহাওয়ার কোনো মাথামুন্ডু নাই। হঠাৎ খুব শীত পড়ল। শীতে মৃত্যুর খবর ছাপা হতে শুরু করল। আবার এমন গরম, মনে হচ্ছে চৈত্র মাস। এখন এই শীতকালের দিনেও তার এই কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রটা চালু আছে।
উর্দিপরা বেয়ারা কফি দিয়ে গেল। ব্ল্যাক কফি। বিদেশ থেকে আনানো। তিনি কফির কাপে চুমুক দেবেন। এ সময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। তার সঙ্গে মোবাইল
ফোন থাকে দুইটা। একটা নম্বর মোটামুটি অনেকেই জানে। আরেকটার নম্বর প্রায় কেউই জানে না। যে-নম্বরটা প্রায় কেউ জানে না, সেটাতে এই ফোনটা এলো। রিনরিনে কণ্ঠস্বর। অল্পবয়সী একটা মেয়ে।
তিনি ফোন ধরে বললেন, ‘হ্যালো…’
‘আবুল বাশার চৌধুরী বলছেন?’
‘হ্যাঁ, বলছি।’
‘আপনি আগামীকাল বিকেল চারটায়, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বিকেল চারটায় মারা যাবেন।’
শুনে এবিসি একটুখানি থমকে গেলেন। কে আবার সাতসকালে তার সঙ্গে রসিকতা শুরু করল। তিনি অকম্পিত গলায় বললেন, ‘কে? কে বলছেন?’
তখনই অপরপক্ষ ফোনটা কেটে দিলো।
তিনি ফোনটা রেখে দিলেন। এ-ধরনের রসিকতার কোনো মানে হয় না। একটা লোক সকালবেলা তার দিন শুরু করেছে। কেবল দিনের পত্রিকাটায় হাত দিয়েছে। অফিসে এসে প্রথম কফিতে চুমুক দিতে যাবে। দিনের এই সূচনালগ্নে কেউ এ-ধরনের নিষ্ঠুর রসিকতা করতে পারে! নিষ্ঠুর, নাকি কান্ডজ্ঞানহীন। আজকালকার মেয়েগুলো এই রকম স্টুপিড টাইপের হয়!
কিন্তু আমার এই গোপন নম্বরটা সে পেল কোথায়? কেই-বা এই মেয়ে। এত সকালে সে ফোনই বা করল কেন?
পাত্তা দেওয়া উচিত নয়। বিশিষ্ট গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, সফল মানুষ আবুল বাশার চৌধুরী। তিনি জীবনে উত্থান-পতন কম দেখেননি, বাধাবিঘ্ন কম পার হননি। এই শহরে তার জীবন শুরু হয়েছিল এমন সব দিন দিয়ে, যখন দুপুরে লাঞ্চ করার মতো টাকা পকেটে ছিল না। ধূলিধূসরিত পথে তিনি মলিন মুখে ঘুরে বেড়িয়েছেন, বন্ধুদের অফিসে গিয়ে হাজির হয়েছেন হঠাৎ হঠাৎ, যদি দুপুরের খাওয়াটা মুফতে জুটে যায়! তারপর একদিন বন্ধুর সঙ্গে প্রথমে একটা বায়িং হাউসের চাকরি, সেখান থেকে নিজেই ফ্যাক্টরির মালিক।
‘স্যার, আজকে আপনার সারা দিনের প্রোগ্রাম শিডিউল…’
পিএস মেয়েটা এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে সবুজ রঙের শাড়ি। তার চুল ভেজা, সেখান থেকে ভেজা চুলের গন্ধ আসছে। ভেজা চুল নিয়ে একটা মেয়ে অফিসে আসে! আজকালকার মেয়ে! তা-ও তার সেক্রেটারি।
সমস্যা কী?
এ সময় আবার তার মোবাইল বাজে। তিনি মোবাইল ফোনটা হাতে নেন। সবুজ বাতি-জ্বলা পর্দার দিকে তাকান। অপরিচিত নম্বর। ধরবেন কি ধরবেন না, খানিকটা দ্বিধান্বিত বোধ হলো তার। কিন্তু এই মোবাইলটা তার অতিনিকটজনের অতিজরুরি কলগুলো রিসিভ করার জন্যই কেবল নির্দিষ্ট। না ধরার কোনো মানেই হয় না। তিনি একবার তার সেক্রেটারি শান্তার মুখের দিকে তাকান। এতক্ষণ এই ঘরে তার মধ্যে একটা অপার্থিবতার বোধ এসেছিল, শান্তার ভেজা চুল তাকে যেন মাটিতে নামিয়ে আনল। ফোনটা না রিসিভ করার কোনো কারণই নাই।
তিনি মুঠোফোন সেটটা হাতে তুলে নিলেন। সবুজ বোতামে চাপ দিলেন। ‘হ্যালো…’
‘আপনি কাল ঠিক চারটায় মারা যাবেন। ভয় পাবেন না। সবাইকে মরতেই হয়। আমিও একদিন মারা যাবো। কিন্তু আপনি মারা যাবেন আগামীকাল ঠিক চারটায়।’
‘কে?’
সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোনটা কেটে দিলো।
ধেত্তেরি, জ্বালায়া মারল তো!
আবুল বাশার চৌধুরী ওরফে এবিসি টাইয়ের নট ঢিলা করলেন। তার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। তার কপালে মৃদু ঘাম।
শান্তা বলল, ‘স্যার, কোনো অসুবিধা?’
‘না, ঠিক আছে। কোত্থেকে যে ফাউলগুলো এই নম্বরটা পায়।’
উর্দিপরা বেয়ারা কফি নিয়ে ঢুকল ঘরে। খুবই দামি বিদেশি কফি। কফির বিশেষ ধরনের সুগন্ধে ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠতে বাধ্য।
এবিসি বললেন, ‘শান্তা, একটা কাজ করেন তো। আমার রিসিভড কলটা চেক করেন। নম্বরটা টুকে নেন। তারপর খুঁজে বের করেন, ফোনটা কে করছে। পারবেন না?’
শান্তা বলল, ‘চেষ্টা করি, স্যার।’
এবিসি কফির কাপে চুমুক দিলেন। সিংহের ছবি অাঁকা কফির কাপ। তার বড় মেয়ে রাইসা এটা তাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল।
শান্তা তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়েছে। মেয়েটা ভেজা চুলে অফিসে এসেছে কেন?
এবিসির হঠাৎ মনে হলো, মেয়েটা ওই মডেল মেয়েটা নয় তো!
কী যেন নাম, কী যেন নাম। রীতি। রীতি নাকি রিটি। ওই মেয়ে যদি ফোন করে থাকে, তাহলে শান্তাকে এর মধ্যে টেনে আনা উচিত হবে না। এই অফিসের সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়, পিতার মতো শ্রদ্ধা করে, পীরের মতো ভক্তি করে। শান্তাকে তিনি রিটির ব্যাপারটা বুঝতে দিতে চান না।
এ বিষয়টা নিয়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া যায় একমাত্র হাসানুলকে। হাসানুল এ-ধরনের কাজ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। ‘ঘাগু’ বলে একটা শব্দ ছিল না? হাসানুল ঘাগু ধরনের মানুষ।
শান্তা, ‘ফোনটা দেন। আপনি এক কাজ করেন, হাসানুলকে বলেন আসতে। আপনি যান।’
শান্তা ফোন রেখে চলে যায়। তার সবুজ শাড়ির অাঁচল ফুলে আছে। সুতির শাড়ি।
তিনি কফিতে চুমুক দেন। ঠোঁট, কাপ এবং কফি থেকে উত্থিত সুড়ুৎ শব্দে তিনি চমকে ওঠেন। এত নীরবতা চারদিকে।
ঘরটা অনেক বড়। একপাশে চীন থেকে আমদানি করা বড় টেবিল। কালো কুচকুচে। তার পেছনে জানালা। ভেনেসিয়ান ব্লাইন্ডস ওঠানো। পেছনে ঢাকা শহরের রাস্তা আর আকাশ দেখা যায়। একপাশে কালো কাঠের র্যা ক। তাতে শোপিস, বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া ক্রেস্ট আর বেশ কিছু ইংরেজি বই। টেবিলে একটা এলসিডি মনিটরের কম্পিউটার। একটা ল্যাপটপ। দেয়ালে অডিও সিস্টেমের স্পিকার।
ওপাশের দেয়ালে কামরুল হাসানের অাঁকা বড় একটা ছবি। অরিজিনাল।
হাসানুল আসে। সে একটা লাল রঙের জ্যাকেট পরেছে। নীল রঙের মাফলার। এত শীত নাকি ঢাকায়? তার তো ঠান্ডা লাগে না।
‘স্লামালেকুম স্যার।’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। হাসানুল আসেন তো। একটা ফোন আসছে এই নম্বরে। নম্বরটা কার, বের করে ফেলেন তো।’
‘ঠিক আছে স্যার।’ হাসানুলের চোখে-মুখে একটা গুরুতর ভাব। এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই।
‘কী একটা কল আসছে। কথাও বলে না। হ্যালো বলে রেখে দেয়।’
‘আচ্ছা স্যার। আমি দেখছি স্যার।’
হাসানুল রিসিভড কল চেক করে। তারপর নম্বরটা কপি করে নেয় নিজের মোবাইল ফোনের বাটন টিপে। বলে, ‘ঠিক আছে স্যার, আমি দেখতেছি।’
‘দেখেন। আবার অতিরিক্ত তৎপরতা দেখায়েন না। হইচই ফেলে দিয়েন না। যা করবেন, আপনি একা। কাউরে আপনার জানানোর দরকার নাই। বুঝছেন?’
‘জি, স্যার। বুঝছি।’
‘যান। নিজের রুমে যান। কাজটা বিড়ালের মতো আওয়াজ না করে করবেন।’
হাসানুল চলে যায়।
এবিসি নিজের সংলাপে নিজেই চমকিত হন। বিড়ালের মতো আওয়াজ না করে করবেন, কথাটা তিনিই বললেন!
‘আচ্ছা। মেয়েটা কে?’ তিনি বিড়বিড় করেন। সে কেন এ-কথা বলছে। এটা কি কোনো পূর্বাভাস? মৃত্যু নাকি জানান দিয়ে আসে। মৃত্যু কি নিজেই ফোন করে আসতে পারে? তিনি ফিক করে হেসে ফেলেন নিজের কল্পনাশক্তির বহর দেখে।
আজকাল কি মৃত্যু মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে, ই-মেইল করবে, ফ্যাক্স করবে? মৃত্যু কি আধুনিক হয়ে গেছে?
বায়ান্ন বছর বয়স তার। এটা কি ভায়াব্ল-ডায়াব্ল অ্যাজ। এত তাড়াতাড়ি কেউ মরে?
কিছুদিন আগে একটা মৃত্যুর খবর শুনলেন। তাদেরই ঘনিষ্ঠ এক গার্মেন্টস মালিক শাহাবের ছেলে। আটাশ বছর বয়সী ছেলেটা অন্যদিনের মতো জিমন্যাসিয়ামে গেছে। সে পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত ‘জিম’ করছে। সেই ছেলে জিমে গিয়ে পৌঁছেছে। অন্যদিনের মতো শুরুও করেনি। তার বুকে সামান্য ব্যথা। শরীরে ঘাম। সেখান থেকে সে চলে এসেছে নিচে। গাড়িতে উঠে বলেছে, ‘আমাকে একটা হাসপাতালে নাও।’ হাসপাতালে যাওয়ার আগে সে গাড়িতেই মরে শক্ত হয়ে আছে। কোনো মানে হয়? আটাশ বছরের ‘বালকের’ হার্ট অ্যাটাক?
এবিসি নিজের মৃত্যুর কথা কল্পনা করেন। তিনি মারা গেলে কী হবে? রিনা কান্নাকাটি করবে। রাইসা, রনটি বোধহয় ভালোই দুঃখ পাবে। হাজার হলেও বাবা তো, আর বাবা হিসেবে তিনি খারাপ নন। টাকা-পয়সার অভাব হবে না। রিনার নামে ফিক্সড ডিপোজিট যা করা আছে, হেসেখেলে কয়েক পুরুষ চলে যাবে। নিউইয়র্কে বাড়ি কেনা আছে।
তাদের বারিধারার বাড়িটা প্রাসাদোপম, লোকে বলে। বাড়ির উঠোনে গাভির মতো গাড়িগুলো – মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, পোর্শে পড়ে আছে, চরে বেড়ায়। তার বাড়ির পাহারাদার আছে ছয়জন। এই অফিসেও নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই কঠিন-কঠোর। সিসিটিভিতে সারাক্ষণ সবকিছু মনিটর করা হচ্ছে। অস্ত্রধারী পাহারাদার রাখা আছে।
তিনি যেখানে যান, তার গাড়ির সামনে একটা, পেছনে আরেকটা গাড়ি তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। এই কাজটাও করা হয় সন্তর্পণে। কেউ যেন টের না পায়। অতিরিক্ত শক্তি প্রদর্শন অনেক সময় নিজের নাজুকতাই প্রমাণ করে। এবিসি অন্য অনেক গার্মেন্টসের মালিকের মতো মূর্খ নন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ। তিনি রাস্তা থেকে উঠে আসা হঠাৎ বড়লোকদের মতো আচরণ করতে পারেন না।
কিন্তু একটা সামান্য ফোনকল, একটা সামান্য নারীকণ্ঠ আজ তার সকালটাকে এভাবে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। কী করা যায়?
অনেকদিন তিনি তার রেগুলার মেডিক্যাল চেকআপটা করান না। ভেবেছেন, সিঙ্গাপুরে গিয়ে করিয়ে আনবেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের গত মাসের ট্যুরটা এত হেকটিক গেল যে…
কোলেস্টেরলটা গত বছরের চেকআপে একটু বেশি দেখিয়েছিল। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার বলেছিলেন, ‘গত রাতে কী খেয়েছ?’
‘ফাইভ কোর্স ডিনার। বড় পার্টি ছিল।’
‘সেজন্যই আজ এটা বেশি দেখাচ্ছে। দুশ্চিন্তা করো না। রোজ হাঁটো?’
‘না, হাঁটি না।’
‘রোজ হাঁটতে হবে। অ্যাট লিস্ট টোয়েন্টি মিনিটস এ ডে, অ্যাট লিস্ট ফাইভ ডেস এ উইক।’
না। ঠিকমতো হাঁটাও হয় না। তার বাসাতেই জিম আছে। যন্ত্রপাতি আছে। সুইমিংপুলটা নাই। তবে বাসার কাছে র্যারডিসন কি ওয়েস্টিনে যাওয়া যায়। কিন্তু কে যায়। আলসেমি ভর করে।
আলসেমি? না, সে-কথাটাও ঠিক হলো না। ব্যবসার কাজে তো সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকতে হয়। নিজে না দেখলে কিছুই হয় না।
‘স্যার, ফোনটা বন্ধ পাচ্ছি। মোবাইল ট্র্যাকার দিয়ে সার্চ দিলাম। মনে হচ্ছে, হাতিরপুল এলাকা থেকে কলটা আসছে।’ হাসানুল তার রুমে ঢুকে পড়েছে।
‘আচ্ছা। ফোন বন্ধ?’
‘জি, অফ করে রাখা। তা না হলে আমি কল করে একেবারে ভাও করে ফেলতে পারতাম। এখন স্যার আমি জিপিতে ফোন করে এই সিমটা কার নামে, সেটা বের করে ফেলতে পারি। র্যা বকে দিয়েও ট্র্যাক করতে পারি।’
‘না না, তা করতে হবে না। তেমন সিরিয়াস কিছু নয়তো।’
তেমন সিরিয়াস কিছু নয় বটে, কিন্তু এবিসি তার বডিটা একবার থরো চেকআপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন।
দিনের মধ্যে অনেক কাজ থাকে। এফবিসিসিআইয়ের মিটিং, বিকেলে বায়ারের সঙ্গে মিটিং। রাতে সুইডিশ অ্যাম্বাসাডরের রিসেপশন। কাজের তোড়ে তার আর হাসপাতালে যাওয়া হয় না; এবং সকালের ফোনের কথাটা তিনি ভুলেও যান।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা। রিনা জেগে ছিল। শীতের রাতে সে একটা উলেন ম্যাক্সি পরে আছে।
‘খেয়ে নিয়েছ?’ এবিসি বলেন।
রিনা উলের কাঁটা বুনছিল। চোখে চশমা। মুখে মেছতা। আশ্চর্য, এত টাকা, এত বিউটিশিয়ান, এত ডায়েটিশিয়ান তার মুখের মেছতার দাগ দূর করতে পারল না?
‘হ্যাঁ। রাইসা-রনটির সঙ্গে খেয়ে নিয়েছি। খাওয়া মানে বোঝোই তো। ভেজিটেবল সালাদ। তোমার পার্টি কেমন হলো?’
‘সুইডিশ অ্যাম্বাসাডরের বাসায়? ভালোই। আর ভালো। একই রকম। আমি গেলাম যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আমাদের বিজনেসটা আরেকটু এক্সপান্ড করা যায়। বোঝোই তো… রাইসা-রনটি জেগে আছে? যাই…’
‘হ্যাঁ, জেগে আছে। যাও।’
এবিসি বাচ্চাদের রুমের দিকে এগোচ্ছেন। বড় বাসা। ডুপ্লেক্স। পুরোটাই মার্বেল পাথর বিছানো। আর্কিটেক্ট শাহিনা হাসান খুব যত্ন করে প্রজেক্টটা সামলেছেন। এটা তার ফ্লাগশিপ প্রজেক্ট, তিনি বলতেন।
রাইসা আর রনটি কী রকম দ্রুত বড় হয়ে গেল। মেয়েটা তার মায়ের চেয়ে লম্বা হয়েছে। ছেলেটা তার চেয়ে। এবিসি মনে মনে ছেলেটাকে পাশে দাঁড় করিয়ে মাপেন।
এসময় আবার তার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। তিনি খুব স্বাভাবিক অভ্যাসে ফোনটা ধরেই অাঁতকে ওঠেন, ‘হ্যালো’ – সেই কণ্ঠ – ‘আর আপনার সময় আছে মোটে সাড়ে ষোলো ঘণ্টা। আগামীকাল বিকেল চারটায় আপনি মারা যাবেন। কোনো ভুল নেই। আপনি সম্ভবত হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবেন। তবে অ্যাক্সিডেন্টেও…’
এবিসির শরীর ঘামতে শুরু করেছে। বুকে কি খানিক ব্যথাও অনুভূত হচ্ছে। তার কি রক্তচাপ বেড়ে গেল। এই ডাইনি মেয়েটা কে?
এবিসি তার ছেলের রুমে যান। রুম বন্ধ। তিনি নক করেন। ছেলে মিনিটখানেক সময় নিয়ে দরজা খোলে। থ্রি কোয়ার্টার ট্রাউজার পরা। একটা টি-শার্ট। রুমে হিটার চলছে। তাই বোধহয় গরম লাগে না।
‘কেমন আছিস রে পিচ্চু।’
ছেলে ভ্রু কুঁচকে কান থেকে হেডফোন খোলে। সে আইপডে গান শুনছে।
‘কী, বলো?’
‘কেমন আছিস?’
‘ফাইন। তুমি কেমন?’
‘বাপের খোঁজ নিচ্ছিস। ভালো আছি।’ তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। ছেলের অস্বস্তি লাগে। বাপি কি আজ বেশি ড্রিং করেছে। মাত্রা বেশি হয়ে গেলে বাপির আদর অত্যাচারের পর্যায়ে যায়।
‘শোন, আমি না থাকলে সবকিছু যেমন চলছিল, তেমনি চলবে। তোর পড়াশোনা। যা পড়তে চাস পড়বি। বিজনেসে তোকে নাক গলাতে হবে না।’
‘আচ্ছা, যাও তো। আমি কাজ করতেসি।’
‘বাই। গুড নাইট।’
ছেলের তুলনায় মেয়েরা বেশি যত্নশীল হয়। রাইসা কথা বলল সুন্দর করে। ‘বাপি, তোমাকে টায়ার্ড দেখাচ্ছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?’
‘আছে রে মা। তোরা সব ভালো আছিস তো?’
‘হ্যাঁ, বাপি। বাপি, আমি এবার টেস্টে টোয়েন্টি অন টোয়েন্টি পাইসি।’
‘গুড। অঙ্কে তো ভালো হতেই হবে। জীবনের সবই হচ্ছে অঙ্ক। বাবাকে একটা কিস করে দে।’
রাইসা তার বাপের গালে একটা চুমু দেয়।
‘থ্যাঙ্ক ইউ গুড নাইট। শোন, আমি থাকি বা না থাকি, তোরা ভালো থাকবি।’
‘তুমি থাকবা না মানে! তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
‘কোথাও না। এমনি কথার কথা বললাম। যা, পড়ছিলি। পড়…’
‘ওকে গুড নাইট। টেক কেয়ার।’ রাইসা দরজা বন্ধ করে।
বুকটা ব্যথা-ব্যথা করছে। রিনাকে এসব বলা যাবে না। সে অকারণে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
পরের দিন, এবিসি সকালবেলা অফিসে না গিয়ে সোজা ইউনাইটেড হাসপাতালে চলে যান। এক্সিকিউটিভ চেকআপ। ব্লাডপ্রেসার, ব্লাডসুগার, ইউরিন সুগার, কোলেস্টেরল, ইসিজি, ইইসিজি…
সময় লাগল। লাগুক। টাকা বেশি না।
আপাতত সব ঠিক আছে। টেস্টের রিপোর্ট আগামীকাল পাওয়া যাবে।
আগামীকাল? আগামীকাল পর্যন্ত তিনি কি বাঁচবেন? আজ বিকেল চারটা পর্যন্ত তার টাইম।
ডাক্তার মৃদুমৃদু হাসছেন। কার্ডিওলজিস্ট। তার কলেজের বন্ধু। এবিসি বলেন, ‘শামীম, আমার এখন কি হার্ট অ্যাটাকের কোনো চান্স আছে?’
ড. শামীমুজ্জামান ঠাকুর বলেন, ‘না। এ মুহূর্তে না।’
‘আচ্ছা, আজ বিকেল চারটায় কি আমার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে? আর আমি কি সেই অ্যাটাকে মারা যেতে পারি।’
‘আজ বিকেল চারটায়? এভাবে কি বলা যায়! তবে একটা কথা বলি, বেশির ভাগ মানুষ প্রথম অ্যাটাকেই মারা যায়। হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করার আগেই। তবে তোমার সবকিছু নরমাল আছে। হার্ট অ্যাটাক কেন করবে? কালকে বাকি টেস্টগুলোর রিপোর্ট দেখি। তোমার একটু ওভারওয়েট। এক্সারসাইজ করো। ইনশাআল্লাহ বহুদিন বাঁচবা।’
শামীমের কথায় এবিসির যেন ঘাম দিয়ে জ্বর নামে। বাংলাদেশের সবচেয়ে নামিদামি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, তিনি বহুদিন বাঁচবেন। ভয় কী? ওরে ভয় নাই… ওরে নাহি ভয়…
তিনি হৃষ্টচিত্তে গাড়িতে ওঠেন। তার সামনে গাড়ি। তার পেছনে গাড়ি। তারা তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিকেল চারটায় কি তার ওপরে কোনো আততায়ী হামলা করতে পারে? তিনি তখন তার অফিস রুমে থাকবেন। অফিসে তার অনুমতি ব্যতীত পিঁপড়ারও ঢোকার সাধ্য নাই। আজকে একটু অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তিনি চেম্বারে আসেন। কাজ জমে পালা হয়ে আছে। তিনি কাজে নিমগ্ন হন।
সবকিছু ভুলে যান তিনি। তিনি তার কক্ষের অডিও সেটটায় রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দেন। আকাশভরা সূর্যতারা বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান… সাগর সেনের কণ্ঠে গান বেজে ওঠে।
কাজের তোড়েই ভেসে যাচ্ছেন তিনি, সবকিছু ভুলে। দুপুরে লাঞ্চ করেন একটা ক্লাব স্যান্ডউইচ। পানি। আরেকটু কফি। কফিমেট দিয়ে বানানো কফি। কফিটা তাকে যেন চাঙ্গা করে তোলে।
বিকেল পৌনে চারটায় আবার ফোন। তিনি সেটা ধরেন ভুলবশত। তখনই সেই গলা, ‘এবিসি স্যার, আমার ওই ছবিটা ইন্টারনেটে আপনি ছেড়েছেন?’
‘কোন ছবি?’
‘সব ভুলে যাওয়ার ভান করছেন। দেখুন, আমি প্রফেশনাল। আমাকে একাধিক ক্লায়েন্টের সামনেই কাপড় খুলতে হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আপনার মতোই তাদের প্রোডাক্টের মডেল করতে চেয়েছে। কিন্তু আপনি ছাড়া কেউ আমার ছবি তোলেনি। নেভার। আমি সেটা জীবনেও ঘটতে দেব না। আমি একটু ড্রাংক ছিলাম সেদিন। আপনিও ছিলেন। আপনি আমার ছবি তুললেন। আমি মোবাইলটা কেড়ে নিতে উঠলাম। আপনি আমার মুখের ওপরে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বললেন, আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ। আই নিড দিস পিকচার। যখন আমার একা লাগবে, এই ফটোটা আমি দেখব। তোমাকে মনে মনে আদর করব।’
‘না না, ওই ছবি আমি ডিলিট করে দিয়েছি। আমার মনেও নাই।’
‘ডিলিট করলে ওটা ইন্টারনেটে চলে গেল কীভাবে?’
‘অন্য কেউ করে থাকবে। তোমার তো ক্লায়েন্টের অভাব নাই।’
‘না। অন্য কেউ করেনি। কারণ, বিছানায় আমার পাশেই আপনার ঘড়িটা পড়ে আছে। ওই ঘড়ি এই বাংলাদেশে একটাই আছে। আপনিই বলেছিলেন…’
‘সর্বনাশ। ওই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে নাকি?’
‘হুম। আর সেটা আপনিই দিয়েছেন।’
‘না। আমি দিইনি। আমার ওই মোবাইল সেটটা আমি বদলেছি। কিন্তু সেটটা এখন কোথায়?’
‘আপনি জানেন। আর এই যে একটা মেয়ের সর্বনাশ আপনি করলেন, এর পরিণতি এখন আপনাকে ভোগ করতে হবে। ইউ আর ডায়িং উইদিন হাফ এন আওয়ার।’
ফোনটা কেটে দিলো মেয়েটা। এবিসির যেন ভারহীন লাগছে। এখন জানা যাচ্ছে কলার মেয়েটা কে। আর তার রাগের কারণ কী। দুটো কাজ তাকে এরপর করতে হবে। ঘড়িটা সমুদ্রের জলে ফেলে দিতে হবে। আর ওই মেয়েটাকে স্তব্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়েটা বেশি কথা বলছে। হাসানুলকে লাগাতে হবে। হাসানুল পারবে।
আর কোনো দুশ্চিন্তা নাই। এ-ধরনের রাস্তার মেয়েদের এত পাত্তা দিতে হয় না। ওই মোবাইল নম্বরটা তাকে ব্লক করতে হবে। এটাও হাসানুল পারবে।
তিনি পিএস শান্তাকে বলেন হাসানুলকে ডেকে আনতে।
চারটা বাজে প্রায়…
হঠাৎ তার মনে হয়, ভূমিকম্প হচ্ছে। পুরোটা বিল্ডিং কাঁপছে। তার মাথা ঘুরছে। ওই যে ফুলদানি কাঁপছে। টেবিলে রাখা গ্লাসে জল কাঁপছে। তাহলে কি এই ভবন ভেঙে পড়বে।
তিনি রুম ছাড়ার জন্য ওঠেন। ততক্ষণে ভূমিকম্প থেমে যায়।
তিনি ঠিক করেন, এই রুমে তিনি থাকবেন না। এন আর্থকোয়েক ইজ ফলোড বাই অ্যানাদার আর্থকোয়েক। পরের ঝাঁকিটাই বেশি প্রবল হবে।
তিনি দ্রুত উঠে লিফটের দরজায় যান। তার জন্য সর্বদা লিফট দাঁড় করানো থাকে। কর্মচারীরা সন্ত্রস্ত হয়ে তাকে সালাম দিচ্ছে। ভূমিকম্প অবশ্য তাদের নাড়িয়ে দিয়েছে।
লিফটের দরজা খোলে। ভেতরে কর্মচারী তাকে সালাম দেয়। তিনি লিফটে প্রবেশ করেন। দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
১৪ তলায় তারা। লিফট নামছে। ঠাস করে লিফট থেমে যায়। ভেতরটা অন্ধকার হয়ে যায়। এরকম হওয়ার কথা না। ব্যাকআপ লাইন আছে। কখনই লিফট অন্ধকার হবে না। তাহলে হলো কেন? তাহলে কি তিনি এই লিফটেই মারা যাবেন?
ভাবামাত্র ওই অন্ধকারে তার বুকে ব্যথা শুরু হয়। তিনি ঘামতে থাকেন। তিনি বুকে হাত দিয়ে বসে পড়েন। কর্মচারীরা লিফটের দরজা খুলছে। স্যার, ভয় পাবেন না স্যার। এক্ষুনি জেনারেটর চালু হবে – কর্মচারীটা মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে বসে।
টেনে ধরে লিফটের দরজা খোলা হয়েছে। এবিসি সেই দরজাপথে বেরিয়ে আসেন। তার বুকে ব্যথা করছে। তাকে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, ‘গাড়ি রেডি করতে বলো ড্রাইভারকে।’
তিনি দ্রুত হেঁটে নামতে থাকেন সিঁড়ি দিয়ে।
তেতলা পর্যন্ত নামার পর তিনি সিঁড়িতে পড়ে যান এবং গড়িয়ে আড়াইতলার ল্যান্ডিংয়ে গিয়ে পৌঁছায় তার শরীর…
ঠিক চারটায় তিনি মারা যান।

শেয়ার করুন

Leave a Reply