প্রকৃতি প্রেমিকের চিত্রপট

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফা

ছবি আঁকতে শিল্পীদের কেউ বাইরে তাকান, কেউ তাকান ভেতরে। নিসর্গের সরল অনুবাদ করেন কেউ, কেউবা আবার নিসর্গকে চোখ থেকে বুকে নিয়ে ছবি আঁকেন। সময়ের হাত ধরে আলোছায়ার তারতম্যে প্রকৃতিরও রূপ বদলায়। নিজের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও সময়ের পরিবর্তন হতে নিশ্চয় কিছু যোগ হয় ছবির মধ্যে। না হলে ছবি তো ঠিক ছবি হয়ে ওঠে না।

শিল্পী আবদুল মান্নানের অনেকগুলো চিত্রকর্মের সামনে এসে মনে হলো – নদীঘেরা নিসর্গের মাঝেই যেন দাঁড়িয়ে আছি। চার দেয়ালের মধ্যে থাকা ছবিগুলো প্রায় কাছাকাছি হয়েও সময়ের নিরিখে নানা ব্যঞ্জনার, নানা রূপের। ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ শিরোনামে ঢাকার ধানমণ্ডির গ্যালারি চিত্রকে গত ৪ নভেম্বর শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে শিল্পীর তৃতীয় একক প্রদর্শনী। গত তিন বছরে আঁকা তাঁর অর্ধশতাধিক চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে।

গত শতকের ষাটের দশকের শিল্পী আবদুল মান্নান নদীমাতৃক বাংলা নিসর্গের এক সরল অনুবাদক। নদী-প্রবাহিনী বরিশালের গৌরনদীতে ধান-নদী-খালের ঐতিহ্যে যাঁর জন্ম, তিনি তো এমন সুজলা বাংলার ছবির প্রেমে মজবেনই। নদীর সঙ্গে মেঘের মিতালি, আকাশের সঙ্গে জলের সংহতি, বাতাসের বেগে দুলে-ওঠা চিরল ঘাস ও গাছের পাতার স্পন্দন দেখে আমাদের নাগরিক চোখ মোহিত হয়। চিত্রপটের সীমাবদ্ধ পরিসরে অসীমের সেই মোহিনীরূপ তুলে আনেন মান্নান – তুমুল দক্ষতায়।

প্রকৃতিকে শিক্ষক মনে করেন আমাদের চিত্রশিল্পীরা। মান্নানের ভাবনাও অনুরূপ। বাংলা প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের আধার এর বহতা জলাধার, উদার আকাশ, আকাশে মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি মাটি আর সবুজের ঐশ্বর্য থেকে তিনি শিখেছেন। তাকে নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করে প্রকৃতির নিরন্তর অনুবাদে হাত পাকিয়েছেন মান্নান।

ষাটের দশকের এই শিল্পীর কর্মজীবনের দীর্ঘ ৩৪ বছর কেটেছে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেখানে তিনি নানা অনুষ্ঠানের শিল্প-নির্দেশনা করতেন, দৃশ্যপট ও প্রতিকৃতি আঁকতেন। কর্মসূত্রেও শিল্পের অব্যাহত চর্চার ভেতরে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তাঁর কর্মজীবনে দেশ-বিদেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে বিটিভিতে যত অনুষ্ঠান হয়েছে, তার বেশিরভাগ প্রতিকৃতি আঁকতেন শিল্পী আবদুল মান্নান। এতে প্রতিকৃতি আঁকিয়ে হিসেবে এদেশে তাঁর একটা স্বীকৃত অবস্থান তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে তাঁর আঁকা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন প্রতিকৃতি নিয়ে প্রথম একক প্রদর্শনীর দুটি পর্ব আয়োজিত হয় ঢাকার চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে। প্রদর্শনীটি সুধীমহলে প্রশংসিত হয়েছিল।

বিটিভির পরিচালক ডিজাইন পদে থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে শিল্পী আবদুল মান্নান একজন পেশাদার চিত্রকর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০১০ সালে  ধানমণ্ডির সড়ক ৪ এর ২১-সংখ্যক বাড়িতে গ্যালারি চিত্রকে ‘মেঘের পরে মেঘ’ শিরোনামে এ তাঁর দ্বিতীয় একক চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আকাশে মেঘের নানা দোলাচল, ক্ষণে-ক্ষণে রূপবদলকে তিনি তুলে এনেছেন সেই প্রদর্শনীতে। মেঘমালার মধ্যে নানারূপ ইমেজের আসা-যাওয়া দেখেছেন আর সেগুলোর চিত্রায়ণ করেছেন আকাশে মেঘের স্বাধীন চলাচলের মতো মুক্তমনে স্বাধীন হাতে তুলি চালনার একাগ্রতায়। শিল্পীর এ-প্রদর্শনীটি ছিল সমকালীন শিল্পভুবনে নতুন করে তাঁর আবির্ভাবের জানান দেওয়া।

ছয় বছর পর ২০১৬ সালে এসে শিল্পী আবদুল মান্নান তাঁর তৃতীয় একক চিত্র-প্রদর্শনী করছেন। এবার তিনি আরো পরিণত ও পরিশীলিত। এ প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘প্রিয় বাংলাদেশ’। মূলত কাগজ ও ক্যানভাসে জলরং ও অ্যাক্রিলিক রঙে তিনি এঁকেছেন। এখানেও তাঁর চিত্রকর্মে আমরা প্রত্যক্ষ করি বাংলার ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য, বিশেষ করে আকাশ আর মেঘের রূপান্তরিত অবয়ব। গ্রীষ্মের রোদেলা নিসর্গ, বর্ষার বৃষ্টিসিক্ত প্রকৃতি ও মেঘমেদুর আকাশ, শরতের নীল-সাদা আকাশ ও তিরতিরে জলে তার ছায়াপাত, হেমন্তের হলুদাভ জমিন, কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতের সকাল, পুষ্পিত বসন্ত-বাহার তাঁর চিত্রপটে ঠাঁই নেয়। আমাদের চোখকে স্বসিত্ম দেয়।

দক্ষিণ বাংলার নদী ও নদী-তীরবর্তী অববাহিকা, পূর্বের পাহাড় আর দক্ষিণ-পূর্বের সমুদ্রের বিশালতা এসবের আদর্শ-রূপ জায়গা নিয়েছে তাঁর আঁকায়। তাঁর চিত্রপটে আকাশের জায়গা বড়, তার তুলনায় নদ-নদী-জলযান-মানুষ-পাহাড়-বৃক্ষের জায়গা অপ্রতুল। ফলে এ-প্রদর্শনীর বেশিরভাগ চিত্রকর্মে চলিষ্ণু মেঘের চেহারার বিভিন্নতা যেন বড় হয়ে উঠেছে। আবার কোনো কোনো কাজে মাটি থেকে উত্থিত গাছের পাতাহীন আঁকাবাঁকা ডাল যেন মেঘের বুকে উঁকিঝুঁকি মারছে। সোজা কথায় – শিল্পী তাঁর নিজের দেখাকে চিত্রপটের নির্ধারিত স্পেসে দেখাতে চেয়েছেন দর্শকদের।

এ প্রদর্শনীতে চারটি প্রতিকৃতিচিত্র স্থান পেয়েছে। শিল্পী পরম শ্রদ্ধায়, সযত্নে বাঙালি মানসের শ্রেষ্ঠ তিন ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি এঁকেছেন।

শিল্পী আবদুল মান্নানের ছবিতে প্রকৃতিই প্রধান, অন্যকিছু এর অনুষঙ্গ মাত্র। শত সংকটেও প্রাকৃতিক বৈভব নিয়ে সুখী বাংলাদেশের অবয়ব তৈরি হয়েছে মান্নানের তুলিতে। তাঁর চিত্রপটে আমরা বাতাসের বেগ অনুভব করেছি, সিডর নিয়েও তিনি এঁকেছেন। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের রূদ্ররূপকে এড়িয়ে শিল্পী তাঁর ভালোলাগা-ভালোবাসার বাংলাকে চিত্রিত করেছেন গভীর মমতায়। ভালোবাসার গুণে আরো রূপবতী হয়ে উঠেছে তাঁর চিত্রার্পিত বাংলা। রঙের রসায়নে মেঘ-জলের আবহে প্রকৃতির লীলায়িত লাবণ্য চিত্রায়িত করে প্রায় সত্তরে এসে সৃষ্টিশীলতায় আরো প্রাণবান, আরো তরুণ হয়ে উঠেছেন শিল্পী আবদুল মান্নান।

৪ নভেম্বর শুরু হয়ে এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ১৬ নভেম্বর, ২০১৬ তারিখে।   r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার