প্রথমত সে কবি, শেষ পর্যন্ত সে কবিই

লেখক:

উৎপল কুমার বসু
সুনীলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৫২-৫৩ সালে, যতদূর মনে পড়ে কৃত্তিবাসের প্রস্তুতিলগ্নে দীপক মজুমদারের বাড়িতে। কৃত্তিবাসের সূচনা হয়েছিল মূলত ‘সিগনেটে’র দিলীপকুমার গুপ্তের সহায়তা ও পরামর্শ নিয়েই। দূরদর্শী এই ডি. কে. সত্যি সত্যিই ছিলেন একজন জহুরি। কৃত্তিবাসের প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয় যাঁদের নাম (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার ও আনন্দ বাগচী), তাঁদের তখন বয়স ১৮-১৯। প্রথম সংখ্যার পর থেকে সুনীলের একক দায়িত্বে পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের সেই সময়টা আমাদের হয়ে ওঠার পক্ষে ছিল এক মূল্যবান সময়। দিলীপবাবুর বাড়িতে কমলকুমার মজুমদারের নেতৃত্বে ‘হরবোলা’ নাট্যগোষ্ঠীর নাট্যচর্চার সুবাদে আমাদের আড্ডা জমে উঠত। সুনীলের নেতৃত্বে কৃত্তিবাসে তখন একে একে লিখতে শুরু করেছেন শঙ্খ ঘোষ, সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরা। আমরা তো লিখতামই।
আমার প্রথম কবিতার বই চৈত্রে রচিত কবিতা (১৯৬১) প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাস প্রকাশনা থেকে। সুনীল তখন থাকত উত্তর কলকাতায় আর আমি দক্ষিণ কলকাতায়। আমাদের নিবিড় বন্ধুত্বের সুবাদে মাঝে-মাঝে আড্ডা জমত এর-ওর বাড়িতে। আড্ডা চলতে-চলতে রাত হয়ে গেলে আমরা বন্ধুদের বাড়িতেই থেকে যেতাম। কতদিন আমি যে সুনীলের ওই ২২, শ্যামপুকুর স্ট্রিটের বাসায় থেকে গেছি! শ্যামপুকুরের ওই ঠিকানাই ছিল কৃত্তিবাসের ঠিকানা। তারাপদ রায় তো তার ছেলের নামই রেখে ফেলল কৃত্তিবাস।
আমি ’৬৪-তে বিদেশে চলে গেলে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি দেশে ফিরি ’৭৭ সালে। সুনীল তখন আনন্দবাজার গোষ্ঠীর অন্যতম এক প্রধান লেখক। আমি দক্ষিণ কলকাতার মেঘমল্লারের বাসিন্দা হই। সুনীল তো আগে থেকেই ম্যান্ডেভিল গার্ডেনসের ‘পারিজাতে’ থাকত। আমরা প্রতিবেশী হয়ে গেলাম। আমাদের পুরনো বন্ধুত্ব আমার জমে উঠল। আমরা মাঝে মাঝেই সপরিবারে ওদের বাড়িতে যেতাম, ওরাও আসত। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা সবই সমানে চলত। কৃত্তিবাসের অক্রূর দত্ত লেনে নিয়মিত যেতাম। সুনীল থাকত মধ্যমণি হয়ে। কত মানুষই না আসত ওখানে! ওই সময় আমরা মাঝে-মাঝে চলে যেতাম অটোমোবাইল ক্লাবে। নানারকম পান ভোজনে আমাদের আড্ডা জমে উঠত। সুনীলের অনর্গল কথা বলার পাশে পাশে উদাত্ত গলার গান আমরা প্রাণভরে উপভোগ করতাম।
কবিতা দিয়ে শুরু করলেও তার গদ্য অত্যন্ত ঝরঝরে। একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে পারা যায় না। কত বিষয়েই না ও লিখেছে। গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণসাহিত্য, নাটক, চিত্রনাট্য, শিশুসাহিত্য। সাহিত্যের এতগুলো শাখায় অনায়াস বিচরণের সাফল্যে তার জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। কৃত্তিবাস ছাড়াও অসংখ্য গ্রন্থ সম্পাদনা করেছে ও। শুনেছি ওর গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা নাকি আড়াইশো। জনপ্রিয় না হলে কি এটা সম্ভব। তবু বলব সুনীলের প্রথম পরিচয় কবি; শেষ পরিচয়ও কবি – অবশ্য এটা একান্তভাবে আমারই অভিমত।
অনুলিখন : সুশীল সাহা

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার