প্রাচীনকালের যেসব ভয়

লেখক:

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

এখানে আসবার পর দেখি পাহাড়গুলি তিনদিকে দৌড় দিচ্ছে। প্রাচীন গাছগুলির তলায় হাঁটতে হাঁটতে আমি পুরানো দিনগুলির কথা ভাবি। তখন তোমার হাঁটুতে ব্যথা হতো না। এখন ব্যথা হয়। তোমার শরীর আমাকে গুছিয়ে রাখতে হয়। একসময় তোমার শরীর হো-হো করে হাসত, ফিসফিস করে কথা বলত। এখন হাসে না। এখন ফিসফিস করে না। এখন তুমি আচমকা বলো, চল্লিশ বছর একসঙ্গে থেকেছি। স্বামী ভালোলাগে না। বিয়ে মদির মনে হয় না।

আমি বলি, কী করতে চাও?

তুমি কয়েক লহমা চুপ থেকে বলো, কিছুই না।

কিংবা তোমার কাছে চলে আসা।

আমি বলি, তুমি কখনো আসবে না।

আসতে তো পারি।

এসব বলার জন্য বলা।

তুমি তাই মনে করো।

তোমার স্বামীকে ছাড়বে না। আমাকেও ছাড়বে না।

– স্বামী ছাড়া আমার চলবে। তোমাকে ছাড়া চলবে না।

আমরা এসব বলি। তারপর চেয়ে থাকি দূরে, যেখানে সূর্যাস্ত হচ্ছে, যেখানে পাহাড়গুলি তিনদিকে দৌড়

দিচ্ছে। যেখানে পাখিগুলি প্রাচীন গাছ খুঁজে বেড়াচ্ছে সেখানে। সূর্য হঠাৎ মিলিয়ে যায়, অন্ধকার ঘিরে ধরে আমাদের। শাদা আলো এবং লাল আলো ইট থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকে। আমি অনেকক্ষণ শাদা আলো এবং লাল আলোর দিকে চেয়ে থাকি। বাতাস নেমে আসে পাহাড় থেকে। পাহাড়ের মাথায় চাঁদ একসময় দেখা দেবে। চাঁদ দেখা দিলে আমার ওঠার সময় হয়। আমি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াই।

তুমি কেন বলো আমাকে ছাড়া তোমার চলবে না। তুমি কেন বলো স্বামীকেও তোমার দরকার।

আমি তো জানি তোমার স্বামীকে তুমি ঘৃণা করো। মানুষ কেন ঘৃণা করে? আমরা কি বৃক্ষলতাকে ঘৃণা করি? করি না। আমরা কি পাখিদের ঘৃণা করি? করি না। আমরা শুধু ঘৃণা করি মানুষকে। মানুষ কেবল ঘৃণা করে মানুষকে।

 

দুই

প্লেনের জানালায় চোখ রেখে আমি বাইরে তাকিয়ে থাকি। বাইরে নীল ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত, শূন্যের ভেতর ঝকঝক করছে। কী দেখার আছে। আকাশ তো আকাশ। ফসলের মাঠ তো ফসলের মাঠ। ঘরবাড়ি তো ঘরবাড়ি। প্লেন থেকে দেখা নিসর্গ মনে হয় খালি, পলকে-পলকে বদলে যায়। আমি দেখি কিংবা দেখি না।

আমি নিজকে শুনিয়ে বলতে থাকি : আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি।

 

তিন

বাড়ি যাবার ভাবনায় তোমার কথা মনে পড়ে। তোমার শরীরের কথা মনে পড়ে। তোমার অনাবৃত বুকের কথা। কোমল সুঠাম সুখ ভারানত বুক, উদ্ধত, সুখে থরথর বুক, আমার দিকে পথ খুঁজছে। আমি এই পথ, উদ্ধত, সুখে থরথর পথের দিকে তোমার অনাবৃত করার চেষ্টার দিকে তাকিয়ে থাকি। শরীর কাঁদছে কিংবা শরীর হাসছে, শাড়ি শরীরকে আটকাতে পারছে না। আমি তোমার দিকে তাকিয়ে হাসি, ভারানত তোমার বুকের দিকে হাত বাড়াই। হাতের মধ্যে দমকে দমকে তোমার শরীর এসে যায়।

 

চার

সেইসঙ্গে আমার মনে জাগে : তুমি তোমার স্বামীকে ঘৃণা করো। তবু স্বামীর সঙ্গে থাকো।

তুমি আমাকে ভালেবাসো। কিন্তু আমার সঙ্গে থাকো না। তোমার বেঁচে থাকার লজিক আমি বুঝি না। ঘৃণার মধ্যে থাকাটা হয়তো তোমার পছন্দ। ভালোবাসার মধ্যে থাকাটা তোমার পছন্দ না। আমার মনে হয়, ঘৃণা ও ভালোবাসার মধ্যে তুমি কোনো ফারাক টানো না। বলতেই হয় তোমার ক্ষমতা অসীম।

 

পাঁচ

আমার ভেতরে ক্ষয় হচ্ছে। যেমন বৃক্ষে ক্ষয় হয়। বৃক্ষ টের পায় না। হঠাৎ একদিন আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাব, আমার ক্ষয় ধরা ভালোবাসার মধ্যে।

 

ছয়

একটা গল্প বলি।

ব্রিটিশ আমলে, ’৪২-এর আন্দোলনে গান্ধিজীর ডাকে জেগে উঠেছিল বাংলা।

আমি দেখিনি। জেনেছি বইপড়ে। নিরস্ত্র মানুষ; যুবক-যুবতী-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পতাকা হাতে নিয়ে, মুখে গর্জন করে ব্রিটিশ সৈন্যদের হটিয়ে দিয়েছিল। বন্দুকের গুলি মানুষদের ঠেকাতে পারেনি। ব্রিটিশ সৈন্যরা পিছনে হটে, বন্দুক ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ সেনাপতিরা বুঝতে পারেনি, কী দারুণ ক্ষয় ধরেছিল ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে। দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসন এক লহমায় উড়ে গিয়েছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে।

হয়, এরকম হয়। ক্ষয় ধরা টের পাওয়া যায় না। আমিও কি টের পেয়েছি কী দারুণ ক্ষয় ধরেছে তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে।

আরেকটা গল্প বলি।

মুজিবভাই ডাক দিলেন পরাধীন বাংলাকে স্বাধীন হওয়ার জন্য। কৃষক লাঙল ফেলে, মাঝি নৌকো ফেলে, ছাত্র-যুবক বই-পুস্তক ফেলে, তরুণ-তরুণী ভালোবাসার কথা ফেলে খালিহাতে যুদ্ধে চলে গিয়েছিল। পাকিস্তান টের পায়নি কী দারুণ ক্ষয় কুরে-কুরে খেয়ে নিয়েছে একসময়কার এই শক্তিশালী স্টেটকে। একটা বিরাট বৃক্ষ যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, তেমনি এই রাষ্ট্রটা মুখ থুবড়ে পড়েছে গ্রামেগঞ্জে শহরে-নগরে। একটা আওয়াজ ফুৎকারে উড়িয়ে নিয়েছে চতুর্দিকে দেশটাকে। আমরা তো আওয়াজ শুনেছি; জয় বাংলা। শব্দ শব্দ, কি-না করতে পারে। আমাদের চোখের সামনে বিস্ফোরিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্র, জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। আমরা কোলে তুলে নিয়েছি নবজাতককে, মমতায় ভালোবাসায়।

হয়, হয়, এভাবেই অসম্ভব সত্য হয়। হয়, হয়, এভাবেই সত্যের ধারালো অস্ত্রে কুটিকুটি হয় পুরনো ঘুণধরা বলা-কওয়া, চলাফেরা।

আমরা তিনজন মুখ থুবড়ে পড়ে গেছি আমাদের বিবিধ সম্পর্কের ভিতর। সম্পর্ক একটা বিরাট বৃক্ষের মতো চতুর্দিকে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেখানে আছে কেবল ঘৃণা, গ্লানি, অবসাদ এবং শূন্যতা।

 

সাত

আমাদের অনেক সাহস এবং সংকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমরা সাহসী হয়নি। সংকল্প নড়বড়ে হয়েছে দিনের পর দিন। আমরা শুধু ইচ্ছার ভেতর বসবাস করেছি।

সেই বসবাসের একটা গল্প বলি।

তখন আমি লন্ডনে, পড়ার জন্য এসে থেকে গেছি। থাকি অ্যাসকটে, নিরিবিলি এক গ্রামে, উঁচু-উঁচু এক বৃক্ষের পাড়ায়। সেও তখন লন্ডনে, থাকছে ক্যামডেন টাউনে। পেইন্টিং শিখতে এসে, অধিকাংশ সময় ঘুরে বেড়ায় আমার সঙ্গে। আমাদের দেখে, অনেকেই ভাবে, আমরা স্বামী-স্ত্রী কিংবা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড। আমাদের চলাফেরা থাকা-খাওয়া ঘোরাফেরা তা-ই মনে করায়। হঠাৎ একদিন কিংবা অনেকদিন পর আমরা ঠিক করি সম্পর্কটা সামাজিক করি, যখন একসঙ্গে থাকি তখন বিয়ে করেই একসঙ্গে থাকি। ঢাকার বন্ধুরা,           মা-বাবারা, লন্ডনের আত্মীয়-স্বজনরা, স্বস্তি পাবেন।

আমরা একবার ঠিক করি, লাস্ট ট্রেনে, ওয়াটারলু স্টেশন থেকে অ্যাশকট চলে যাব, থেকেই যাব একসঙ্গে, শেষ পর্যন্ত।

ওয়াটারলু স্টেশনের বাইরে একটা পোড়োবাড়ির মতো কফিশপ আছে, সেখানে দেরি করব, সে আসবে তার ছবি অাঁকার সরঞ্জাম নিয়ে। একটা স্যুটকেস যদি সে আনে, ভালো। একটা স্যুটকেসও মনে হয় একটা অতিরিক্ত বোঝা। স্যুটকেসে যা থাকে তা আমরা কিনে নিতে পারব। একটা বৃক্ষে আকাশ স্পর্শ করার মতো যা থাকে একটা স্যুটকেসে তাও থাকে না। বোঝা টেনে কী লাভ।

কাফেটার নাম : স্পেলেনডিড কাফে। একটা বার আর একটা কফির দোকান মিলিয়ে এই কাফেটা, যেখানে আমি আর ও মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতে আসি। লন্ডনের অনেক আবিষ্কারের মতো এই কফিশপটা আমাদের আবিষ্কার। রেগুলারদের মধ্যে আমরা দুই বাঙালি, জনা-তিনেক আফ্রিকান, আর বাদবাকি জনা-চারেক ইংরেজ, লরি ড্রাইভার। গোটা চারেক টেবিল, তার মধ্যে একটা টেবিলে কার্ড খেলা হয়। আমরা এলে অনেকক্ষণ বসি, ও স্কেচ করতে থাকে, সবাই দেখে, খুশি হয়। রেগুলার আসি বলে সবাই চেনাজানা। কাফের মালিক বয়স্ক, আমাদের দেখলে, একা কিংবা দুজনকে দেখলে মালিকটি উঠে দাঁড়ায়, আমরা যা খেতে চাই এনে দেয়, তারপর আবার সে কার্ডের টেবিলে। কাফেটা নোংরা, মনে হয় না ঝাঁট দেওয়া হয়, টেবিলটার পিছনে একটা দরজা, কিচেনের দিকে গেছে।

জানি, আজ আসতে দেরি হবে। আমি একটা রেড ওয়াইনের অর্ডার দিই, বাইরে কেনা রুটি আর সসেজ বার করে খেতে শুরু করি, টের পাই সারাদিন কিছু খাইনি। দোকানের মালিক কিংবা তার স্ত্রী, বাইরের থেকে আনা খাবার খেতে আপত্তি করে না। ওয়াইন এনে দিয়ে মালিকটি ফের খেলার দিকে ফিরে যায়। আমি ওয়াইন সিপ করতে করতে, রুটি আর সসেজ খেতে খেতে খেলা দেখি, আর এলোমেলো কীসব ভাবতে থাকি। খেলোয়াড় হচ্ছে মালিকটি, আর একজন তরুণ এবং তরুণী, আর একজন লরি ড্রাইভার। তারা খেলায় নিমগ্ন, তাদের চোখ কার্ডের ওপর, মাঝেমধ্যে টেবিলের ওপর থাবড়া মারে। একটু পরে মালিকটি উঠে যায়, কিচেন থেকে স্ত্রী আসে অ্যাপ্রোনে হাত মুছতে মুছতে।

আমাকে দেখে বলে, তোমার বন্ধুটি এখনো এলো না। আমি বলি, আজ বোধহয় লেট করবে।

মহিলা কার্ডের টেবিলে বসতে বসতে বলে, জায়গাটা খারাপ। ওকে মানা করো দেরি না করতে।

আমি বলি, বলব।

মহিলা নিজেই বলে, আমিও বলে দেব।

তারপর বলে, খেয়ে নাও। পেট ভরা না থাকলে কোনো সুখ নেই।

আমি হেসে সায় দিই।

সত্যি অনেক রাত হয়েছে। আমি অস্থির হয়ে উঠি। লাস্ট ট্রেন ছাড়ার সময় কাছে এসে গেছে।

কাফের মহিলাটি তখন বলে ওঠে, ওই তোমার বান্ধবী।

ওর ঠোঁটে হাসি, সঙ্গে ছবি অাঁকার সরঞ্জাম নেই, স্যুটকেস নেই, কিছু নেই।

হাসি ছড়িয়ে সে বলে, আজ নাইবা গেলাম। আরেকদিন যাব।

ওকে ক্যামডেনের বাসে তুলে দিয়ে, আমি ওয়াটারলু স্টেশনের দিকে ফিরে যাই। আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই। ওর মনে কোনো দ্বিধা নেই। দিন তো শেষ হয়ে যাচ্ছে না।

আর একদিন, সামনের একটা উইকএন্ডে, ওকে নিয়ে অ্যাশকট যাব, একসঙ্গে থাকব বলে।

আমাদের সেই  দিন আর আসে না। আমরা স্পেলেনডিড কাফেতে বসে গল্প করি। কার্ড খেলা দেখি, ও স্কেচ করতে থাকে। মহিলাটি অ্যাপ্রোনে হাত মুছতে মুছতে বলে, তুমি কেমন আছ?

একটা বন্ধুত্বের পরিবেশের মধ্যে আমাদের দিন কাটতে থাকে।  আমার ভিতরকার অস্থিরতা একদিন মরে যায়। মনে হয়, আমরা মৃত্যু পর্যন্ত এই কাফেতে আসব, কার্ড খেলা দেখব, ও স্কেচ করবে, কাফের মহিলাটি হেসে হেসে বলবে, ভালো থেকো, সামনের দিনগুলো যেন ভালো থাকে। সময়ের চক্রান্তে আমরা কি কয়েদি হয়ে গেছি? কে জানে।

 

আট

ইংল্যান্ডে এপ্রিল এসেছে। এপ্রিল হচ্ছে নিষ্ঠুরতম মাস। কথাটি এলিয়টের। আমরা এলিয়টের কথা বলতে বলতে, ওয়াটারলু ব্রিজ পেরিয়ে আমাদের পুরনো আস্তানায়, স্পেলেনডিড কাফেতে পৌঁছে যাই। আমাদের কাপড়-চোপড় ভেজা, চুলে ঝিকমিক করছে বৃষ্টির ফোটা, আর ঠান্ডা বাতাস মনে হয়, উড়িয়ে নেবে যুগ-যুগান্ত পেরিয়ে এলিয়ট-কথিত নিষ্ঠুরতম মাসের ভিতরে। মাস নিষ্ঠুর, মানুষজন নিষ্ঠুর, ঘরবাড়ি নিষ্ঠুর : আর নিষ্ঠুরতম লন্ডন শহর।

মহিলাটি হেসে উঠলো আমাদের দেখে, জানতাম তোমরা আসবে। না এসে পারবে না। টেমসের ঢেউ তোমরা দেখবে না, বৃষ্টির উদ্দামতা তোমরা দেখবে না, বাতাসের  উথালপাতাল তোমরা দেখবে না, কে দেখবে বলো। তোমরা হচ্ছো এ-শহরের জাত বাসিন্দা, যেমন  আমি এ-শহরের জাত কফি-বিক্রেতা। তোমরা কফিতে চুমুক দাও, আমি তোমাদের জন্য মাছ ভেজে আনছি।

মাছভাজা খেতে খেতে কফিতে চুমুক দিতে দিতে, বয়স্ক লোকটি একটি রেড ওয়াইন টেবিলের ওপর রেখে বলে ওঠে, এই বটলটা আমাদের কাফের ওপর।

বয়স্ক লোকটি একটু ওয়াইন গ্লাসে ঢেলে নেয়, আমাদের গ্লাস দুটিতে ঢেলে দেয়, তারপর বলে, চিয়ারস।

এপ্রিলের ঠান্ডা দিন, বৃষ্টি ভেজা দিন, বাতাসে উড়াল দেওয়া দিন, কোথায় ভেসে যায়।

ও আস্তে আস্তে বলে, তোমাকে বলার সময় পাইনি। আমার  হাসব্যান্ড এসেছে আমাকে ফিরিয়ে নিতে। আমি খানিকক্ষণ চুপ থাকি। বৃষ্টি এবং বাতাস করতালি বাজাতে থাকে স্পেলেনডিড  কাফের শিরোনামটিতে।

ও আবার বলে, আমি ফিরে যাব কথা দিয়েছি। ওর ঘর-সংসার করার জন্য নয়। আমি ফিরে যাব আমার নিজের মতো জীবনযাপন করার জন্য। হাসব্যান্ডটি কথা দিয়েছে আমার জীবনযাপনে হস্তক্ষেপ করবে না।

আমি বলে উঠি, এসব তুমি বিশ্বাস করো?

বিশ্বাস করি এবং করিও না।

তাহলে।

ও মাফ চেয়েছে। আমি মাফ করে দিয়েছি। শোনাচ্ছে ক্রাইস্টের মতো  কথা।

তাই। ক্রাইস্টের মতো কথাই।

আমি ওয়াইন সিপ করতে থাকি। কফির চামচ নিয়ে খেলতে থাকি। কোনো কথা আমার ঠোঁটে জোগায় না।

জানো।

বলো।

পাহাড়ি টিলা আমার জীবনের দুর্দান্ত আকর্ষণ।

তো।

ও আমার জন্য ঢাকা-সিলেট রোডের ওপর একটি কটেজ বানিয়ে দিয়েছে।

হাইওয়ের একটা জায়গা ছোট ছোট টিলায় ভর্তি। পাশে নদী। নদীটার নাম পাহাড়ি নদী। বানানো নাম না।

বানানো নামের মতো মনে হয়।

সেখানে কটেজটি। টিলার ওপর। চারপাশে শালগজারি সেগুনের গাছপালা।

সত্যি সুন্দর।

সেখানেই থাকব।

 

জানো।

বলো।

কেন মাফ করে দিয়েছি, জানবে না।

বলো।

হাসব্যান্ড তো অন্য নারীতে আসক্ত ছিল। আমাকে ছাড়েনি।

কিন্তু থাকতো ওর সঙ্গে।

তারপর।

ও মারা গেছে।

কবে? কেন?

ক্যান্সারে।

এ-কথা শোনার পর আমি থমকে গিয়েছি। হতভাগাটা বলেছে : ও তো চলে গেল। তুমিও তো আমার সঙ্গে থাকো না। আমার দিন কীভাবে কাটবে, বলো। এ-কথা শোনার পর আমি ক্রাইস্ট হয়ে যাই। আমি ওকে মাফ করে দিই। ঠিক করি ফিরে যাব। তবে ওর সঙ্গে থাকব না। নিজের মতো থাকব।

আমি চুপ করে থাকি। আমার বলার কথা খুব সম্ভব শেষ হয়ে গেছে।

 

তুমি এতো চুপ কেন?

ভাবছি।

মন খারাপ হচ্ছে?

তাও না।

তাহলে।

এই লন্ডন শহরে, নিষ্ঠুর এপ্রিল মাসে, কেউ আমার সঙ্গে নেই, এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।

শোনো।

বলো।

তুমি ফিরে চলো।

কোথায়?

ঢাকায়।

আমার সেই কটেজে একসঙ্গে থাকব। তুমি ফের লেখা শুরু করবে। আমার স্কেচ বুক ভরে উঠবে।

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। রেড ওয়াইনের বটল প্রায় শেষ।

তুমি ফিরে যাবে, কথা দাও।

হঠাৎ অচমকা, বলে ফেলি, যাব। ফিরে যাব। আমার লেখার মধ্যে ফিরে যাব।

ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এপ্রিলের নিষ্ঠুর বৃষ্টি আবার শুরু হচ্ছে। শুকনো পাতা উড়ছে। আমরা দুজনই একসঙ্গে গুডবাই জানাচ্ছি লন্ডনকে।

গুডবাই গুডবাই।

গুডবাই এলিয়ট। গুডবাই পিন্টার। গুডবাই বেকন।

গুডবাই হেনরি মুর।

গুডবাই স্পেলেনডিড কাফে। গুডবাই কার্ডের টেবিল। গুডবাই হাসিখুশি বৃদ্ধ দম্পতি।

আমরা ফিরে যাচ্ছি ঢাকায়। আমাদের পুরনো শহরে।

 

নয়

ওরা চলে যাবার ঠিক বিশদিন পর ঢাকা এসে পৌঁছোই।

ওরা দুজনই এয়ারপোর্টে এসেছে আমাকে রিসিভ করতে। তারপর সরাসরি ওর কটেজে।

সত্যি সুন্দর। একটা টিলার ওপর নিরিবিলি কটেজ। শালগজারি আর সেগুন গাছ চারদিকে ছড়ানো। আমি দেখি আর মুগ্ধ হই।

ও বলে, টিলার  ঢালে ওই নদীটি, যার কথা তোমাকে বলেছি। চলো দেখে আসি।

ওর হাসব্যান্ড আচমকা বলে ওঠে, আমাকে দৌড়াতে হবে ব্যবসার কাজে, ঢাকায়। আমি ফের এসে তোমাদের সঙ্গে জয়েন করব।

আমরা গাছপালা, নদী, টিলা ছড়ানো মাঠঘাটের মধ্যে হারিয়ে যাই। ও আমার হাত ধরে। ওই ধরাটাই জোর, বেঁচে থাকার শক্তি।

 

দশ

আমি ফের লেখায় ফিরে যাই। লেখা লেখা লেখা, যে-কাজটা থেকে সরে গিয়েছি, সে-কাজে ফের ফিরে আসি। ও ওর ছবির জগতে ডুব দেয়। রঙের মধ্যে তৃপ্তি আছে, রং মানুষকে বিভোর করে রাখে।

মধ্যে মধ্যে, রাতে, বন্দুকের আওয়াজ শুনি। আমি ভয় পাই। ও শুধু বলে, দুপক্ষ দুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ওরা রাজনীতির লোক।

আমি কিছুই  বুঝি না। ইংল্যান্ড যাবার আগে গ্রামদেশ সম্বন্ধে যা কিছু জেনেছি সব হাহাকার মনে হয়। এখন মনে হয় কিছু বুঝি না।

ও কি ছবি অাঁকতে পারছে? হয়তো পারছে। জানি না।

 

এগারো

আমি মধ্যে মধ্যে গাছপালার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। পাহাড়ি নদীটা ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশেছে। ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে গেছে। স্রোত নেই। পাহাড়ি নদীটা থেকে বালু তোলা হচ্ছে, দিগন্ত পর্যন্ত নৌকা             দেখি না।

গাছপালাগুলি ওর, ওদের। গাছগাছালি থেকে যে বনের আবহ তৈরি হয় সে-আবহ আস্তে আস্তে নষ্ট হতে চলেছে। প্রায়ই গাছপালা কেটে নিচ্ছে লোকজন। এরাও নাকি রাজনীতির লোক।

হঠাৎ একদিন, ছমাস পর, আচমকা আমার মনে হয় এবং  ওর-ও মনে হয়, গাছপালাগুলো কেঁদে কেঁদে সরে যাচ্ছে। নদীটা কেঁদে কেঁদে সরে যাচ্ছে।

প্রকৃতি-নিসর্গ বলতে কিছু নেই। সব বানানো। হিংস্র মানুষ নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এসব রচনা করেছে। ওর হাতে আমার হাত। একটা ভয় ধরেছে। নির্মম-নিষ্ঠুর ভয়। বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে, প্রাচীনকালের যেসব ভয়ের কথা লেখা আছে, তেমন ভয় আমাদের ঘিরে ধরে।

আমাদের মনে হয় : মহাযুদ্ধের পরেকার একটা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বসে আছি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার