ফুলবনির মানুষজন

লেখক: অমর মিত্র

মনীশ বলল, কাকাকে নাকি দাদুর মতোই দেখতে।

মৃণাল বলল, ছবি দেখলে কিছু বোঝা যায় না দাদা।

কাকা এত বড় আঘাত পেল, খুব চেষ্টা করা হলো, হলো না। বিড়বিড় করল মনীশ।

মৃণাল থাকে জমসেদপুর। তার মেয়ে এবার মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। কলকাতায় একটা আস্তানা করবে সে, এরকম নানা কথা ভাবছে। মেয়ে থাকবে হোস্টেলে। তাকেও তো যেতে হবে মাঝেমধ্যে। চাকরির আর তিন বছর আছে, আত্মীয়স্বজন সব কলকাতা আর মেদিনীপুর এবং এই ফুলবনি। অনেকদিন সে ফুলবনি ছাড়া। কিন্তু তার একটি আস্তানা আছে এখানে। মেজদার কাছে চাবি। মেজদা, বড়দা আর ছোড়দা এখানে থাকে। আর থাকে মেজকার তিন ছেলে। ছোট কাকা। ছোট কাকি নেই। অন্য দুই কাকিমা বেঁচে। কত বড় পরিবার, ফুলবনিতে এই বৈশাখ মাসে লু বয়। বাতাসে আগুনের ঢেউ থাকে। কিন্তু গত কয়েকদিন এক টুকরো মেঘ এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূরে জঙ্গল পেরিয়ে লালগড়ের দিকে নাকি পরশু নামিয়েছে এক পশলা। লালগড়ে তাদের এক পিসি থাকেন। এবং বেশ সুস্থই আছেন। এসেছেন। এসে খুব কাঁদলেন। নিজের বাবার ছবির সমুখে গিয়ে বললেন, নীলুকে তুমি টেনে নিলে বাবা?

নীলু ছোট কাকার ছেলে। সদ্য প্রয়াত। কাকা একেবারে একা হয়ে গেলেন। তাঁর অন্য ছেলে বিলু থাকে বহরমপুর। কাকা বেশ লম্বা মানুষ। কৃষ্ণকায়। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরেন। মাথার চুল কাঁচা-পাকা। স্তম্ভিত হয়ে বসে আছেন। এখন বিকেল। শ্রাদ্ধের কাজ শেষ। নীলুর মেয়ে অন্বেষা মেদিনীপুর হাইস্কুলের টিচার। গত বছর চাকরি পেয়েছে। বিয়ে হয়নি এখনো। নীলুর ছেলে সূর্য সেকেন্ড ইয়ার। বাংলা অনার্স। কবিতা লেখে নাকি গোপনে। এ নিয়ে খুব চিমত্মা ছিল নীলুর। তাদের ফ্যামিলিতে কেউ কি কবিতা লিখেছে কখনো। ফিজিক্স অনার্স ছেড়ে বাংলা নিল। মনীশ দেখল মু–ত মস্তক সূর্য তার দাদুর সামনে চেয়ার টেনে এনে বসল। চুপ করে আছে।

মৃণাল ঝুঁকে এলো, কী হয়েছিল দাদা, হঠাৎ, ভাবতেই পারিনি।

হাই প্রেসার ছিল, ফার্মেসি করেছিল, অথচ নিজেকে চেকআপ করাত না।

মৃণাল আর নীলু প্রায় এক বয়সী। নীলু খুব সাহসী। ডানপিটে। মৃণাল ছিল নীলুর অনুগত। নীলু মাঝখানে খুব ঝামেলা পুইয়েছে। শুনেছিল মৃণাল। একবার ফোন করেছিল তখন। নীলু বলেছিল তার কাছে মাসে দশ হাজার টাকা দাবি করেছিল উগ্রপন্থীরা। সম্ভব! সে লালগড় গিয়েছিল পিসির নাতির অন্নপ্রাশনে। তাকে ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে টাকা দাবি করেছিল তারা। আসলে হয়তো পার্টিই নয়। পার্টির নামে টাকা আদায়। অনেক দরাদরির পর পাঁচ হাজার দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল। ফুলবনিতে ফিরে পাঁচ দিয়েছিল তাদের লোকের হাতে। তারা মনে হয় আরো দূরের, ভোলাভেদা কিংবা পূর্ণাপানির লোক। সেই সময়টায় একা নিজেকে রক্ষা করেছিল নীলু। কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। কিন্তু যখন সুসময়  এলো, হুট করে চলে গেল। খুব চেষ্টা করা হয়েছিল বাঁচানোর। কলকাতা নিয়ে গিয়েছিল মনীশ। ফুলবনির অনেকেই নীলুর জন্য কষ্ট পেয়েছে। মনীশরা বডি নিয়ে যেদিন ফেরে, রাত বারোটার ওপর হয়ে গিয়েছিল। তখন কত লোক। সেদিন সন্ধ্যায় খুব ঝড় হয়েছিল। বাতাসের কী রোষ! কী রাগ! সমস্ত ক্ষোভ যেন উগরে দিচ্ছিল। তাদের গাড়ি তখন হাইওয়ের ওপর। মনীশ বলতে বলতে চুপ করে যায়। উঠে পড়ে।

কাকার দিকে এগোয় মনীশ। খেয়েছেন কি? নীলু তাদের সবার চেয়ে ছোট। পঞ্চাশ হয়েছে সবে। বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেনি। ব্যবসা করত। ব্যবসা এখন কে দেখবে? সূর্য নিতান্তই নাবালক। কাকা সাতাত্তর। কাকাকে দেখতে হবে ওষুধের দোকান। মনীশ বলল, কাকা একটু শুয়ে নিতে পারতেন?

কেন? তিনি মুখ তুললেন।

মনীশ কিছু বলতে পারে না। এই বিঘেখানেক জমিতে সাতটি দালান। পুরনো লম্বা দালানবাড়িটিও রয়েছে। ওই বাড়িটি মনীশের ঠাকুরদা গুরুদাস চন্দ্র করেছিলেন বছরষাটেক আগে। তার আগে ওখানে মাটির ঘর ছিল। হাওড়ার শালকিয়ার মানুষ গুরুদাস এখানে এসেছিলেন ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে। ১৯৪১। ওই বছর ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কী অদ্ভুত মানুষ ছিলেন তাদের ঠাকুরদা। মনীশ যখন দেখেছে তাঁকে, তিনি শয্যাশায়ী। পক্ষাঘাতে একটা দিক পড়ে গিয়েছিল। জড়িয়ে কথা বলতেন। জিজ্ঞেস করতেন, ও মনু, আজ কি পুন্নিমে হলো?

কতবার জিজ্ঞেস করতেন। উত্তর পেলে ভুলতে সময় লাগত না। আজ সেই পূর্ণিমা। আজ তাঁর পৌত্রের পারলৌকিক কাজ হলো। গুরুদাসের শেষ সমত্মান অবিনাশ। সমস্ত দিন চুপচাপ। এখন বললেন, আমার কী রে, আমার দিন তো শেষ হয়ে গেছে, কত দেখতে হবে জানিনে।

সূর্য বলল, দাদু তুমি রেস্ট নাও।

অবিনাশ বললেন, তুই তোর মার কাছে যা।

সূর্য বসেই থাকল। তার মা একা নেই। অনেকেই ঘিরে আছে তাঁকে। মনীশ চেয়ার টেনে বসল। বিষ্ণুপুরের বোন এসে বলল, কাকা যাই, ট্রেন ধরব।

ঘাড় কাত করলেন অবিনাশ। তারপর কী মনে হতে বললেন, কাল সকালের ট্রেন ধরিস, আজ থেকে যা, আজ তো বুদ্ধপূর্ণিমা, পূর্ণিমা না?

তাই কী হয়েছে?

পূর্ণিমার দিনে সবাইকে সন্ধের পর বাড়ি থাকতে হতো, মনে আছে?

মলিস্নকা বিমর্ষ মুখে হাসে, বলে, জানি, সেসব দিন আর ফিরে আসবে না।

আজ পূর্ণিমা, আজ যেতে নেই।

মলিস্নকা তার ছেলের দিকে তাকান। ছেলের সঙ্গে এসেছেন। ছেলে বলল, ফিরতে হবে দাদু।

না, আজ পূর্ণিমা, বাড়িতে তোর বাবা আছে তো?

হ্যাঁ।

আর এক ভাই আছে তো?

হ্যাঁ। মলিস্নকার ছেলে অভিষেক ঘাড় কাত করল।

তাহলে আজ না গেলে কী হবে?

মলিস্নকা চোখে আঁচল দিলো, ঠিক আছে কাকা থাকলাম।

কাকা আবার চুপ। মৃণাল এসে বসে। মৃণাল ভোরে রওনা দেবে। ঝাড়গ্রাম যাবে। ঝাড়গ্রামে ওর শ্বশুরবাড়ি। ঝাড়গ্রাম থেকে কলকাতা যাবে দুদিন বাদে। মনীশ এখানে থাকে। ভেবেছিল কদিন দার্জিলিং ঘুরে আসবে। টিকিট কাটা ছিল।

ক্যান্সেল করেছে। কাকাকে রেখে যাবে না। ঠিক হবে না। কাকা তাঁর নাতি সূর্যকে জিজ্ঞেস করলেন, বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে?

সূর্য চুপ করে থাকে। কাকা ডাকলেন, আয়, কাছে আয়।

সূর্য চেয়ার নিয়ে সরে যেতে কাকা তার পিঠে হাত রাখলেন, বললেন, তুই কবিতা লিখিস, তা নিয়ে তোর বাবার খুব চিমত্মা ছিল।

সূর্যের চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে। বছর কুড়ির সদ্য যুবক নিজেকে সামলায়। বলল, আমাদের প্রপিতামহ তো কবি ছিলেন দাদু?

কই না তো? বিস্মিত হলেন অবিনাশ, কে বলল?

আমার মনে হয় দাদু।

অবিনাশ বললেন, তুই তাঁর কথা জানিস, স্বর্গীয় গুরুদাস চন্দ্রের কথা?

জানি।

কী জানিস?

তুমি বলো না দাদু।

মৃণালের মনে হয় কাকা আর তার ভাইপো দুজনে অদ্ভুত এক আলাপ করছে। নীলুর কথা বলছে না। যাঁর কথা বলছে তাঁকে দ্যাখেনি সূর্য। তিনি সেই ১৯৪১-এ চার ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলেন। মৃণাল জিজ্ঞেস করল, তোকে তোর বাবা বলেছিল আমাদের ঠাকুরদার কথা?

মাথা নাড়ে সূর্য। তবে কে? সূর্য হাত বাড়িয়ে নিজের দাদুকে ছোঁয়। অবিনাশ অবাক হয়ে মু–তমস্তক পৌত্রকে দেখছেন। তিনি বলেছিলেন, মনে পড়ে না; কিন্তু বলার দরকার ছিল। জানা দরকার ওর। ও তো অন্যরকম জীবনের কথা ভাবতে আরম্ভ করেছে, যা নীলুর চিমত্মার বিষয় হয়ে উঠেছিল। ছেলেটার মুখের ভেতরে চোখের চাহনিতে কি তাঁর বাবার মুখের ছায়া পড়েছে? গুরুদাস চন্দ্র আর কবছর বাদে যাত্রা করবেন প্রায় নিরুদ্দেশে। শালকিয়াতে পড়ে       থাকল তাঁর স্বজন-পরিজন, অন্য ভাইরা।

 

দুই

বাংলা সন ১৩৪৮, ইংরেজি ১৯৪১, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কদিন বাদেই রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ হবে। গুরুদাস চিঠি পেয়েছিলেন ফুলবনির। ফুলবনি মেদিনীপুর জেলায়। অনেক দূর। তাঁর জেঠতুতো বোনের বিয়ে হয়েছিল সেখানে। এই বোনটিকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন :

 

স্নেহের রমলা

আশা করি সর্ব বিষয়ে কুশল। আমরা এক রকম আছি, ব্যবসায় মন্দা চলিতেছে। কিছুই করিয়া উঠিতে পারিতেছি না, শালকিয়ার দোকান তুলিয়া দিয়া আমি অন্য কিছু করিব ভাবিতেছি, কী করা যায় বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না, ফুলবনি কেমন জায়গা?

ফুলবনি থেকে চিঠির উত্তর এসেছিল মাসখানেক বাদে। তখন ১৩৪৭-এর চৈত্র। রমলা বিবরণ দিয়েছিল ফুলবনির। জঙ্গলের দেশ। বিকেলে পশ্চিম দিকে পাহাড় দেখা যায়। চৈত্র থেকে গরম বাতাস বয়। যেমন গরম চৈত্র-বৈশাখে, তেমন শীত কার্ত্তিক-অঘ্রাণে। এখানকার জমি মাটির রং লাল। সাঁওতাল, মুণ্ডা, আদিবাসীদের বাস এখানে। তুমি এসে ঘুরে যাও কদিন।

গুরুদাস আবার পত্র দিয়েছিলেন। জবাব এসেছিল। জমি খুব সস্তা। তুমি এসে দেখে যাও দাদা। তিনি একা দেখবেন কেন? শালকিয়া বাজারের দোকান বসে গিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। ব্রিটিশ সরকার চাল সংগ্রহ করতে আরম্ভ করেছিল। ধীরে ধীরে সব জিনিসের দাম বাড়ছিল। একে বলে মন্দা। তখন যুদ্ধের বাজারের মন্দা শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ লাখপতি হচ্ছে, কেউ নিঃস্ব। গুরুদাস চন্দ্র যুদ্ধের বাজারে সুবিধা করে উঠতে পারছিলেন না। শরিকি সমস্যাও ছিল।

কিন্তু দেখা নয়, তিনি সপরিবারে ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে গঙ্গার পশ্চিমকূল থেকে আরো পশ্চিমে ফুলবনির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলেন। বুঝেছিলেন নতুন কোথাও না গেলে, জীবনে ঝুঁকি না নিলে না খেয়ে থাকতে হবে। সস্তার জমি আর বন-পাহাড় তাঁকে টেনেছিল। ঘিঞ্জি শহর থেকে বের হতে চাইছিলেন। শহর ক্রমশ ফিরিঙ্গি সৈন্যের বুটের শব্দে ভয়ের হয়ে যাচ্ছে। গুরুদাস যখন স্ত্রী লক্ষ্মীরানিকে বললেন, ফুলবনি যাবেন জায়গা কেমন তা দেখে নিতে। লক্ষ্মীরানির কোলে তখন ছ-মাসের ছেলে। অবিন, অবিনাশ। লক্ষ্মীরানি জিজ্ঞেস করেছিলেন সব। তারপর বলেছিলেন, চলো একেবারে সবাই যাই, দেখতে যাবে, আবার ফিরবে, তার চেয়ে যাই সকলে মিলে, এখেনে থাকার চেয়ে সেখেনে থাকা ভালো হবে মনে হয়।

সূর্য বলল, দাদু তুমি পথের পাঁচালী পড়েছ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের?

মনীশ জিজ্ঞেস করল, কেন?

সূর্য বলল, ১৯২৯-এ পথের পাঁচালী প্রকাশিত হয়ে গেছে। দুর্গার মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কাশী চলে গিয়েছিলেন ভাগ্য-অন্বেষণে।

অবিনাশ বললেন, তখন এমনি হতো। সে আমলে মানুষের সাহস ছিল, গুরুদাস চন্দ্র, আমার বাবা চাষ জানতেন না। শালকের মানুষ, কৃষি জানেন না। ব্যবসাপাতি করে বাঁচবেন সেই উদ্দেশ্যে গঙ্গায় ভাসলেন। ফুলবনির ভগ্নিপতি চিঠি লিখে বলেছিল, ঘাটাল পৌঁছতে। ঘাটাল থেকে স্থলপথে ফুলবনি।

আকাশে যুদ্ধবিমান। শহরে সেনাবাহিনীর বুটের শব্দ। তিনি নদীপথে গঙ্গা ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমে এগিয়ে রূপনারায়ণ নদে পড়ে একটি খাল ধরে শিলাবতী নদীতে ঢুকেছিলেন। মাঝি পথ চিনত। শিলাবতী বেয়ে ঘাটাল শহর। ঘাটাল থেকে ফুলবনি অনেক দূর। কিন্তু স্থলপথে যাওয়া যায়। গরুর গাড়িতে করে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে প্রায় নিরুদ্দেশ যাত্রা করলেন। গরুর গাড়িতে চেপে দিনতিনেক লেগেছিল শালবনি পৌঁছতে।

সূর্য বলল, দাদু বিভূতিভূষণের একটি গল্প এমন আছে, গুরুদাস চন্দ্র বই পড়তেন?

জানি না, বাবার মুখে তো আমি শুনিনি কোনোদিন তাঁর নাম, আমি কলেজে ঢুকে পড়েছি পথের পাঁচালী, আর সিনেমাও দেখেছি সেই সময় বোধহয়।

সূর্য বলল, দাদু আমার মনে পড়ে যাচ্ছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নদীর ধারে বাড়ি’ গল্পের কথা। সেখানেও যুদ্ধের সময় সওদাগরি অফিসের কেরানিবাবু কলকাতার বসতি তুলে, চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিল বনগাঁ – রানাঘাট লাইনে গাংনাপুর স্টেশনে নেমে দশমাইল দূরের এক নদীর ধারের গ্রামে।

বিমর্ষ অবিনাশ বললেন, গল্পে যা হয়, জীবনে কি তা হয়?

সূর্য বলল, বিভূতিভূষণ সেই গল্পে বলছেন, বিলেত থেকে লোক গিয়ে আমেরিকায় বাস করে আমেরিকা যুক্তরাজ্য স্থাপন করেছিল। অজানায় পাড়ি না দিলে মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে না। জীবনে ঝুঁকি নিয়েই মানুষ বড় কিছু করতে পারে। বাঁচতে পারে ভালোভাবে।

কবিতা লেখার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে ফিজিক্স অনার্স ছেড়ে তুই বাংলা অনার্স নিলি, তোকে নিয়ে তোর বাবার খুব আশা ছিল সূর্য, আশাভঙ্গের দুঃখ ছিল। অবিনাশ বললেন।

আমি যা করেছি মন চেয়েছে বলেই করেছি। বলল সূর্য। দপ করে জ্বলে উঠল যেন তার চোখ।

অবিনাশ আর সূর্যের কথা শুনছিল মৃণাল ও মনীশ। তাদের পেছনে অভিষেক। অভিষেকের বছরতিরিশ বয়স। সে বিডিও অফিসে চাকরি করে। চুপচাপ থাকে। অবাক হয়ে শুনছিল সব। কিছুই জানে না। মা তো বলেনি। বলেনি কারণ সে শুনতে চায়নি। মা তো বলেছে অনেকবার যে, মায়েদের আদি বাড়ি ছিল হাওড়া জেলার শালকিয়ায়। সে তো কোনোদিন শুনতে চায়নি মায়ের ঠাকুরদা ফুলবনি এসে পৌঁছলেন কী করে? তিনদিন লেগেছিল ফুলবনি আসতে। সন্ধে হলে কোনো গ্রামে আশ্রয়। খোলা মাঠে রান্না করে খাওয়া। সকালে আবার যাত্রা শুরু। ক্রমশ বদল হয়ে যেতে লাগল মাটি। লালচে রং। পাথরের চাঙড় হেথা-হোথা পথে চড়াই-উতরাই কম নয়। কখনো ধু-ধু প্রান্তর। মাঠের শেষই হয় না। মাঝেমধ্যে বড় বট-অশ্বত্থ। তার ছায়ায় নেমে ফলার করা। বড়, মেজ, সেজ আর দুই মেয়ের ছোটাছুটি। আবার চলা শুরু। বাতাসে আগুনে ভাব যায়নি তখনো। মাসটা জ্যৈষ্ঠের শেষ। একবার পথ ভুল করেছিল গাড়োয়ান। বাঁকুড়ার দিকে চলে গিয়েছিল গাড়ি। পথে জিজ্ঞেস করে আবার ফিরেছিল ঠিক রাস্তায়। সমস্ত পথ দুই মেয়ে, চার ছেলে কলকল করতে-করতে থেমে গিয়েছিল। আর কতদূর সেই ফুলের বন ফুলবনি? পিসির বাড়ি? চাষের জমি কেমন সিঁড়ির  মতো উঠে গেছে। তারা কেউ এমন দ্যাখেনি। যেতে যেতে গাড়োয়ান বলল, সেদিকে একটা ডাঙা আছে, যেখেনে বক রাক্ষসের হাড় দেখা যায়। সেখেনে গনগন করে আগুন। হুঁ, গনগনির ডাঙা। সেই ডাঙাকে ডানদিকে রেখে গরুগাড়িদুটি ফুলবনির পথ ধরল। এবার জঙ্গল দেখা গেল। সবুজ পাতায় ভরা গাছ। জঙ্গলের পাশ দিয়ে গাড়িদুটি চলল। অমন বন কোনোকালে দ্যাখেনি গুরুদাসও। মুগ্ধ হয়ে ছেলেমেয়েদের বলল, দ্যাখ, দেখে নে জঙ্গল কাকে বলে। কত বড় বড় শালবন। এরে বলে শালগাছ। শালকেতে থাকলে দেখতে পেতিস? হাঁ ভাই কী কী গাছ আছে এই বনে?

গাড়োয়ান বলেছিল, ওইটে মহুল গাছ, হরীতকী আছে, পিয়াল, অজ্জুন, চাকুন্দা গাছ, কতরকম যে গাছ আছে তার শেষ নেই, পাখির ডাক শুনছেন বাবু?

কী পাখি?

বনের পাখি, একটা ডাকে অন্যটা সাড়া দেয়।

তারা শুনতে পাচ্ছিল। বন পেরিয়ে আবার লাল মোরামের রাস্তা। বেলা পড়ে আসছে। গাড়োয়ান বলল, বাবু ওই দ্যাখেন পাহাড়। পাহাড়! পাহাড় দেখা যাচ্ছে দূর পশ্চিমে। নীল। মেঘের মতো ঢেউ তাতে। লক্ষ্মীরানি মাথার কাপড় যে পড়ে গেছে সে-খেয়াল নেই। অবাক হয়ে পাহাড় দেখতে লাগল। পাহাড় কোনোদিন দ্যাখেনি সে। শালকেতে থাকলে দেখতে পেত এমন বন, এমন পাহাড়? গাড়োয়ান বলল, ওইদিকে পাহাড় যে আরম্ভ হলো আর শেষ নাই।

কতদূর হবে? জিজ্ঞেস করেছিল লক্ষ্মীরানি।

গাড়োয়ান বলেছিল, পাহাড় না মা হাঁটে, ছল করে মানষির সঙ্গে, যত যাবে, তত পিছবে, ভুলোর মতো ছুটায়ে নিয়ে যাবে।

পাহাড়ে কি পৌঁছনো যায় না?

যায় মা, কিন্তু অনেক ঘুরের পর, এই দেখছ কাছে, কিন্তু পথ আর ফুরায়নি।

পেছনের গাড়ি থেকে গুরুদাস ডেকেছিল, পাহাড় দেখলে, শালকের চেয়ে ভালো হল কি না বলো।

হ্যাঁ। মাথায় কাপড় তুলতে তুলতে অস্পষ্ট জবাব দিয়েছিল লক্ষ্মীরানি।

শালকে তুমি গেছ দাদু? সূর্য জিজ্ঞেস করে।

গিয়েছিলাম, এক রাত্তির থেকে চলে এসেছিলাম।

কেন, চলে এলে কেন, ওপারেই তো কলকাতা।

অবিনাশ বললেন, ইটচাপা ঘাসের মতো লেগেছিল শালকে, শুধু দালানকোঠা, ভেঙে-ভেঙে পড়ছে, আমাদের শরিক জেঠা-কাকাদের অংশ মেরামত করার ক্ষমতা তাঁদের নাই।

সূর্য বলল, সেই পাহাড় যা দেখেছিল তোমার ঠাকুরদা-ঠাকুরমা, সব আছে এখনো।

আছে, পৃথিবীতে সব থেকে যায়, মানুষের সামান্য আয়ু।

গোরাবাড়ির জঙ্গল দেখেছিল মনে হয়? সূর্য বলল।

হ্যাঁ, তাই-ই হবে।

সেই গনগনির ডাঙাও আছে দাদু। সূর্য বলল।

সবই আছে, চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা… সব, শুধু যে যায়, চলেই যায়। বৃদ্ধের গলা কেঁপে যায়।

তোমরা চলে এসে ভালো করেছিলে। সূর্য বলল, এর পরের বছর তো দুর্ভিক্ষ এসে গেল।

তুই জানিস? অবিনাশ জিজ্ঞেস করলেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস আছে অশনিসংকেত। বলে মাথা নামায় সূর্য। চুপ করে গেল। বাবার কাজ করল আজ। নিরাকার দেহে অন্ন আর জল নিতে এসেছিলেন তিনি। পঞ্চাশের মন্বন্তরে কত মানুষের অন্ন আর জল ছিল না। বেঁচেও না, মরেও না। শুনেছে সে মায়ের কাছে। মা শুনেছিল নিজের ঠাকুমার কাছে। কলকাতার রাস্তায় পড়ে থাকত অন্নহীন মৃতদেহ। শালকে কি আলাদা ছিল কিছু? শালকের রাস্তাতেও নিশ্চয় ফ্যান দাও মা করতে করতে মরে পড়েছিল অনেক অন্নহীন।

অবিনাশ জিজ্ঞেস করলেন, কবে পড়লি তুই, তোর বাবা তো পড়েনি এসব?

কবে পড়েছি মনে নেই দাদু। সূর্য বলল পুব আকাশে তাকিয়ে। বেলা শেষ হয়ে গেল।

 

তিন

পাহাড় আর অরণ্য দেখতে দেখতে পৌঁছনো গেল এই ফুলবনি। রমলার শ্বশুরবাড়ি। তারা সাহায্য করেছিল খুব। জমি সস্তা। বিঘে-দুই কিনে মাটির বাড়ি খড়ের চাল দিয়ে বসতবাটি নির্মাণ করে গুরুদাস বাস করতে আরম্ভ করেন সেই অচেনা গঞ্জে। আর কিনেছিলেন বিঘে পঁচিশ জংলা জমি, পাথুরে। চাষবাস করবেন। সব বুঝিয়ে দিয়েছিল রমলার শ্বশুর। মানুষটির অন্তর ছিল শুদ্ধ। তিনি চেনা আদিবাসী চাষিদের ডেকে ভাগে চাষ করে দিতে বললেন। যে-বছর বৃষ্টি হতো ভালো, ধান পেতেন, না-হলে জমির ধান পাকার আগেই জমিতে মরত। ফুলবনিতে জলের খুব অভাব। গ্রীষ্ম ভয়ানক। শীত খুব তীব্র। বর্ষা খুব বেশি হয় না। মাটিতে জল পড়লেই শুষে নেয়। পুঁজি ফুরিয়ে যাচ্ছিল তাড়াতাড়ি।

তখন কী করবেন? ব্যবসাপাতি। ছোটখাটো ব্যবসা। কোনোটায় লাভ করেছেন, কোনোটায় পুরো লোকসান। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবেন, কী করে তা হবে? চার পুত্রের কনিষ্ঠ এই অবিনাশ ছাড়া কেউ গ্র্যাজুয়েট হয়নি। তবে সে আমলে কজনই বা গ্র্যাজুয়েট ছিল? ছেলেরা বড় হতে নেমে পড়েছিল ব্যবসায়। তারাও যে সফল হয়েছিল তা নয়। তিনি কি না করেছেন, দোকানে কাজ করেছেন, মিলিটারি ক্যাম্পে ভাত সাপস্নাই করিয়েছেন বড় ছেলেকে দিয়ে। ফুলবনিতে একটা ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্পে গিয়ে ফাই-ফরমাশও খেটেছে মেজজন। অবিনাশ যখন কলেজে গেছেন, সব সামলে নিয়েছেন গুরুদাস। তিনি ভাগ্য বদলাতে এসেছিলেন, বদলে নিয়েছিলেন তো সত্য।

সূর্য বলল, দাদু সন্ধে হলো প্রায়।

অবিনাশ আচ্ছন্নের দৃষ্টিতে তাকালেন সকলের দিকে। অনেকজন হয়ে গেছে। সদ্য বিধবা পুত্রবধূও এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বললেন, আজ বুদ্ধপূর্ণিমা।

হ্যাঁ বাবা, আপনি ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। অনুনয় করল সূর্যের মা চন্দনা।

যখন সন্ধে হতো, সেই শুক্রবারের কথা কেউ জানো?

কী কথা? সূর্য জিজ্ঞেস করল।

অবিনাশ বললেন, নদীর নামটি অঞ্জনা, তাহার নামটি রঞ্জনা, বাবা একদিন বসিয়ে দিলেন রেডিওর সামনে, রাত আটটার আগে কাজ শেষ করে নাও সবাই, ছেলের বউরা, দুই মেয়ে, ছেলেরা সব রেডিওর সামনে এসে বসল, সব শুক্রবারেই রেডিও-নাটক, মনে আছে তোর মনীশ?

মনীশ বলল, মনে আছে, আমিও শুনেছি।

আর কী মনে আছে?

মনীশ চুপ করে আছে।

তোমরা জানো বউমা?

কেউ কোনো কথা বলল না। তখন অবিনাশ বললেন, চাঁদ উঠেছে তো?

হ্যাঁ, জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল সকলের অলক্ষ্য মৃণাল ভাবছিল গিয়ে টেলিভিশনে আইপিএল দেখবে। সে পায়চারি করছিল। পিতামহর এই কাহিনি সে শুনেছে অনেক। এখন আর নতুন কিছু মনে হয় না। নীলুর মৃত্যু একেবারে দুমড়ে দিয়েছে কাকাকে। নীলু যখন উগ্রপন্থীদের নামে হুমকি পাচ্ছিল, তাকে ফোন করেছিল। তার শ্বশুরমশায় ঝাড়গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ। এসপিডিএম – সব মহলে ভালো যোগাযোগ। মৃণাল বলেছিল, ব্যবস্থা করবে পুলিশি সাহায্য দিয়ে।

যারা হুমকি দিচ্ছিল তারা সুযোগসন্ধানী। মাওবাদী কি না সন্দেহ। মৃণাল ভুলে গিয়েছিল বলতে।

অবিনাশ বললেন, মৃণাল যেও না, আবার কবে আসবে জানি না, আমিই বা কতদিন থাকব।

থাক ওসব। মৃণাল বলল।

আমরা মনে করি যা, সব তো ঠিক মনে করি না, তুমি পারনি, পারনি আমি জানি, খেদ নেই তাতে।

মৃণাল মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। অবিনাশ বললেন, আলো নিভিয়ে দাও বাইরের।

কেন? জিজ্ঞেস করল মনীশ।

অবিনাশ বললেন, জ্যোৎস্না হয়েছে, সামনে দেখ কত বড় চাঁদ!

সূর্য বলল, দাদু তুমি কী? কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল।

হ্যাঁ, আমি তাই চাই। অবিনাশের গলা ধরে গেল।

দাদু কথাটা কি সত্যি?

হ্যাঁ রে সত্যি, দুঃখ বয়ে বেড়ালে তোর কবিতাও হবে না, তোর ফুলবনি যাত্রা থেমে যাবে।

মু–তমস্তক গৌরবরণ যুবক বলল, মা জ্যোৎস্নারাতে লুকোচুরির কথা বলেছিলে না তুমি?

তোর বাবা বলেছিল আমাকে। মুখে আঁচল চাপা দিলো চন্দনা, তাঁর ঠাকুরদা সকলকে নিয়ে পূর্ণিমারাতে খেলতেন লুকোচুরি।

স্বর্গীয় গুরুদাস চন্দ্র।

সামনে খোলা উঠোন। প্রাচীন এক শিউলি গাছ। দুটি আমগাছ, একটি নিম। জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত খোলা জায়গায়। গাছের ছায়া পড়েছে তার ভেতর।

সন ১৩৬০ বঙ্গাব্দ, বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে গুরুদাস বললেন, এসো, আমরা সকলে জোছনায় লুকোচুরি খেলি।

আমরা সবাই মিলে?

হ্যাঁ মা, তার ভেতরে নীলুও এসে যাবে।

কে নীলু? লক্ষ্মীরানি জিজ্ঞেস করেছেন, নীলু বলে তো কেউ নেই।

কেন অবিনের ছেলে।

অবিন, তার তো বারো বছর সবে। লক্ষ্মীরানি বললেন।

গুরুদাস বললেন, জোছনায় নেমে পড়ো, শালকেতে এমন চাঁদের আলো ছিল না।

সেই রাত্রি ফিরে এসেছে আবার। সকলে যেন ঘুম ভেঙে উঠে চন্দ্রালোকিত প্রাঙ্গণের দিকে তাকায়। আম, শিউলি আর নিমের ছায়াটুকুতে অন্ধকার। তা বাদে আলোয় সব ঝিলমিল করছে। সূর্য বলল, মা এসো, এমন জোছনা শালকেতে ছিল না।

চন্দনা ডাকল বিলুর বউকে। সে ডাকল মনীশের বউ সুমনাকে। মনীশের বউ সুমনা ডাকল মলিস্নকাকে। মলিস্নকা ডাকল মৃণালের বউ চম্পাকে। সূর্য ডাকল অভিষেককে। আর অবিনাশ ডাকলেন নীলুকে। আয়, এমন চাঁদের আলো বৃথা কেন নষ্ট হবে।

গুরুদাস বললেন, আমি বুড়ি হই, আমাকে ছুঁতে হবে।

নীলু। নীলুর মুখ দেখা গেল যেন। সূর্য জোছনার ভেতরে হেঁটে যেতে যেতে বলল, আমি ফুলবনি যাত্রা করেছি বাবা, দ্যাখো পারব ঠিক, ঠিক পৌঁছে যাব, ভেবো না, পাহাড়, অরণ্য, গনগনির ডাঙা…।r

শেয়ার করুন

Leave a Reply