বইপত্র

লেখক:

স্মৃতিসম্পদের পথরেখায়

আবুল হাসনাত

আকাশভরা সূর্যতারা : কবিতা-গান-শিল্পের ঝরনাধারায়

মতিউর রহমান

প্রথমা প্রকাশন

ঢাকা, ২০১৪

৮০০ টাকা

 

 

সুখদ, প্রাণদ, আনন্দদায়ক স্মৃতিগুলো যখন অস্তিত্বে আলোড়ন তোলে, তখন কত কথাই না মনে পড়ে। কৈশোরের উদ্দাম-দুর্দান্ত দিনগুলো পাড়ি দিয়ে যখন পৌঁছে যাই অঙ্গীকারের পথরেখায়, মনে পড়ে সঙ্গী হয়ে উঠছে বামপন্থী সাহিত্য। দীপিত হয়ে থাকছে ধমনীতে তখন কবিতা, গল্প আর উপন্যাস। একটি উপন্যাস শেষ না হতেই আরেকটির পাঠ চলছে। হাঁটছি ফুটপাত ধরে দিনের পর দিন। কথা বলছি অনর্গল দুই বন্ধু। স্বল্পভাষী আমাকে দিয়ে কখনো কথা বলিয়ে নিচ্ছেন মতিউর রহমান। কথার শেষ নেই। কথার পিঠে কথা বলে চলেছি। শিল্প কী, প্রেম কী, কবিতার প্রকরণ কী – কত রকমের যে প্রশ্ন। এই চেনা শহরের ফুটপাত, দীপদন্ড, অলিগলি এবং রাস্তাঘাট কত চেনাই না ছিল সে-দিনগুলোতে। কত যে জিজ্ঞাসা মনের ভেতর উথাল-পাতাল করছে। কথা বলেই চলেছি।

নিউমার্কেটের বইয়ের দোকান মহিউদ্দিন অ্যান্ড সন্স, স্টেডিয়ামের ম্যারিয়েটা এবং বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনে তখন তাঁর নিত্য যাতায়াত। ফলে ভুবনখ্যাত মার্কসবাদী সাহিত্যের গ্রন্থ সংগ্রহ করা মতিউরের পক্ষে তখন কোনো দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল না। এমনকি পূর্ব ইউরোপের মননজীবী সম্প্রদায় মার্কসীয় দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি চর্চায় যে খোলা হাওয়ার অবতারণা করেছিলেন এবং সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার বিপরীতে বুদ্ধিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নবীন স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিলেন, মতিউর পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে ষাটের দশকের মধ্যপাদেই তা পরিগ্রহণ করেন। ফলে তাঁর চেতনা ও রুচি এক সমগ্রতার বোধে দীপ্ত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

মতিউর রহমান-লিখিত আকাশভরা সূর্যতারা : কবিতা-গান-শিল্পের ঝরনাধারায় হাতে নিয়ে সেই উজ্জ্বল দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। স্মৃতির তাড়না থেকে উঠে এলো সেই দিনগুলোর কিছু কথা। কেননা, ব্যতিক্রমী এ-গ্রন্থটিতে কিছু ব্যক্তিমানুষ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও ষাটের দশকের আবহ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনই মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এই সময়ের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবেই তাঁর এই মানুষজনের সান্নিধ্যে আসা এবং নিকটজন হয়ে ওঠা। এখানে বলে রাখা ভালো, এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে মতিউর যে-কোনো বিষয়ে গভীর আলোচনায় ব্যাপৃত হতে পারেন। রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ বা সাহিত্য – কোনো এক গন্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না বলেই          যে-কোনো জনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন ও সংযোগ নিবিড় হয়ে ওঠে। এই বিরল গুণের অধিকারী বলেই তিনি হয়ে ওঠেন অনেকেরই প্রাণসখা এবং আত্মজন।

পরবর্তীকালে সত্তর, আশি ও নববইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গ আর দিল্লিতে নানা মানুষের সঙ্গে তাঁর আড্ডা আর আলাপচারিতা বিস্তৃত ও আরো প্রসারিত হয়েছিল। শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সংগীতসাধক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে এই দুটি শহরে কখনো পেশার সূত্রে, কখনো ভিন্ন এক আগ্রহে তিনি পরিচিত হন। এই পরিচয় থেকেই তিনি আপন হয়ে যান সকলের। পরে এই চেনাজানা গভীর সখ্যের বন্ধনে তাঁকে আবদ্ধ করেছে।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বরূপচেতনার এক আন্দোলন হয়েছিল। এই আন্দোলনে সংস্কৃতিবোধ ও বাঙালিত্বের সাধনা এক নবচেতনা নিয়ে বিকশিত হয়। এর ফলে আত্মপরিচয়ের স্বরূপ নিয়ে যে দ্বিধা ও সংশয় দেখা দিয়েছিল, তা কিছুটা হলেও সংকটমুক্ত হয়। সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে যেসব ব্যক্তির উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে পড়েছিল এবং যাঁদের কর্মে এ-আন্দোলন প্রভাময় হয়ে উঠেছিল এ-গ্রন্থে তাঁদের নিয়ে মতিউর রহমান সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।

গ্রন্থটিতে বেশ কয়েকজন মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে জানার বোধ ও অনুভব বিস্তৃত এক পরিসর নিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। ষাটের দশকে ছাত্র ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ব্যাপৃত থেকে মতিউর রহমান দেশের জন্য দায়বদ্ধ যেসব সৃজনশীল মানুষের সঙ্গে কর্মসূত্রে সখ্যের বৃত্ত তৈরি করেছিলেন, তাঁদের কথাই লিখেছেন এ-গ্রন্থে। আন্দোলনে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার কথা যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁদের মনন, মনীষা, সৃজন-উদ্যম ও সৃজন-উৎকর্ষের কথাও। ব্যক্তিত্ব ও মনীষার সঙ্গে এ হয়ে উঠল এক সমৃদ্ধময় সাংস্কৃতিক ভুবন। শুধু ব্যক্তিমানুষের স্বরূপই নয়, তাঁদের দেশ ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকার, তাঁদের সুষমামন্ডিত সৃজন-জীবনের সারাৎসার উঠে এলো তাঁর কলমে।

মতিউর রহমানের পঠন-পাঠন লুই আরাগঁ, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, ফ্রেদরিকো গার্সিয়া লোরকা, মায়াকভস্কি, ভজনেসেস্কি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়,  সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, সমরেশ বসু, দেবেশ রায়ের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। ষাটের দশকে পিকাসো, ব্রাক, মাতিস ও শাগালের শিল্পবোধ ও রুচি তাঁকে আন্দোলিত করেছিল। শিল্পের বিস্তৃত এক ভুবনে প্রবেশ যে-কোনো মানুষকে উন্নত জীবন ও শিল্পিত বোধে উজ্জীবিত করে। তা তিনি এখনো লালন করেন এবং এই শিল্পীদের সম্পর্কে সর্বশেষ গ্রন্থও তিনি পাঠ করেন। এখনো হৃদয়ে অম্লান ও অমোচনীয় হয়ে থাকে তাঁদের সৃজনকুশলতা এবং পর্ব থেকে পর্বান্তরে যাত্রার নানা প্রসঙ্গ। তাঁদের নিয়ে এক অধ্যবসায়ে অব্যাহত ধারায় তারই পরিচর্যা করে চলেছেন তিনি। সেজন্যেই তাঁর সংস্কৃতিবোধ ও রুচি তাঁর লেখনীতে এক বিস্তৃত ভুবন ও পটভূমি নিয়ে উন্মোচিত হবে, এ তো খুবই স্বাভাবিক।

বামপন্থী রাজনীতির নেতৃপদে আসীন হওয়ায় দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ একঝাঁক মানুষের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। রাজনীতি, সমাজ-পরিবর্তনের স্বপ্ন, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত একাকার হয়ে ছিল হৃদয়ে। যে-মানুষগুলোর কথা আছে বইটিতে, তাঁরা ছিলেন তাঁদের জগতে এক-একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিল্পিত স্বভাবে, সৃজনশীলতায় ও সাধনায় ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। কিংবদন্তিতুল্য এই মানুষজনের    অন্তর্জগতে ছিল কত-না স্বভাববৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যই তো তাঁদের সৃজনধারায় ছাপ ফেলেছে ও কল্পনাশক্তিকে করে তুলেছে বলীয়ান। অতি কাছ থেকে নিকটজনের মতো করে তাঁদের কথা লিখেছেন মতিউর রহমান। দেশাত্মার মর্মবেদনা এবং পরিবর্তমান সমাজনির্মাণের সাধনায় একাগ্র এতগুলো উজ্জ্বল মানুষের ব্যক্তিতব, সৃজনধারা এবং দেশ ও সমাজের জন্য তাঁদের বুকের ভেতরকার আকুতি বর্ণময় ও বিভাময় হয়ে উঠেছে তাঁর বর্ণনায়।

মতিউর রহমান যাঁদের নিয়ে লিখেছেন তাঁদের মধ্যে ভারতবর্ষের খ্যাতনামা চিত্রকর যোগেন চৌধুরী এবং বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীর ছাড়া সকলেই প্রয়াত। তিনি রণেশ দাশগুপ্তের খুবই নিকটজন ছিলেন। তাঁকে দেখেছেন খুব কাছে থেকে। রণেশ যখন ঢাকা ছেড়ে একবুক অভিমান নিয়ে কলকাতায় বাস করছেন সিআইটি রোডের লেনিন ইশ্কুলে কিংবা পার্কসার্কাস-সংলগ্ন মূল্যায়ন আপিসে, তখনো মতিউরের সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কথা হয়েছে দেশের পরিবর্তমান পরিস্থিতি, কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও রাজনৈতিক সংকট নিয়ে। এই সাহিত্যব্রতী মানুষটি কতজনকে যে মার্কসবাদে দীক্ষিত এবং দেশপ্রেমে প্রাণিত করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। এমনকি বহু তরুণ ও কমিউনিস্টকর্মী যখন অনিশ্চয়তা ও বিপন্নতায় অনিকেত বোধ করেছেন রণেশ দাশগুপ্ত তাঁদের উজ্জীবিত করেছেন দেশের কাজে। রুচি, শিল্পের ও সাহিত্যের প্রতি রণেশ দাশগুপ্তের দায়বদ্ধতা এবং অঙ্গীকার ছিল শানিত। শিল্প ও সাহিত্যের এমন কোনো শাখা ছিল না যেখানে রণেশ দাশগুপ্ত বিচরণ করেননি। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও চলচ্চিত্রে তাঁর ছিল সমান আগ্রহ। ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে যখন এদেশে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তখন তিনি সেমিনারে একটি অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন ও অন্য একটি অধিবেশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা তাঁর মনোগ্রাহী ও বিশ্লেষণাত্মক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি ও প্রবণতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন বলে তাঁর লেখনীতেও তা বিচ্ছুরিত হতো। তাঁর একটি ক্ষীণকায় গ্রন্থ উপন্যাসের শিল্পরূপ ষাটের দশকে সাহিত্যের অগ্রসর পাঠকদের জন্য হয়ে উঠেছিল অত্যাবশ্যকীয় এক বই। মুনীর চৌধুরী এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এ-গ্রন্থটিকে বাংলাভাষায় উপন্যাসের প্রকরণ নিয়ে লিখিত একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলে অভিহিত করেছিলেন।           এ-গ্রন্থটিতে ছড়িয়ে আছে তাঁর দেশ ও বিদেশের বহু উপন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতা। সে-কথা আজ মনে পড়ে। প্রবন্ধে মতিউর এই মার্কসবাদী পন্ডিতের সঙ্গে পাঠকের সম্যক পরিচয় করিয়ে দেন। রণেশ দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখিত প্রবন্ধে তাঁর পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি ও অঙ্গীকারের কথাও আছে। গ্রন্থটিতে বাংলাদেশের দুজন খ্যাতিমান সাংবাদিক আহমদুল কবির এবং বজলুর রহমানকে নিয়েও দুটি প্রবন্ধ আছে। দুই মেরুর এই দুই ব্যক্তিত্ব এদেশের সংবাদপত্র-জগৎকে তাঁদের মেধা ও মনন দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। সংবাদপত্র পরিচালনায় এবং দেশের রাজনৈতিক সংকটকালে – বিশেষত আশি ও নববইয়ের দশকে – তাঁরা কীভাবে সংবাদ পত্রিকাটিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন মুখপাত্র করে তুলেছিলেন, তাঁদের প্রসঙ্গ আলোচনাকালে মতিউর সে-কথা লিখেছেন। মতিউর একতা সাপ্তাহিকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বজলুর রহমানকে তিনি পেয়েছিলেন একতার সম্পাদক হিসেবে। খুব কাছে থেকে দেখেছেন এ-মানুষটির সাংবাদিকতার স্বরূপ ও গুণাবলি।

বইটিতে শিল্পী কামরুল হাসান, পরিতোষ সেন, সোমনাথ হোর, মোহাম্মদ কিবরিয়া, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য, পুর্ণেন্দু পত্রী, নিতুন কুন্ডু, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী – এই চিত্রকরদের সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা আছে। কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক-বর্ণনায়, কখনো তাঁদের সৃজন-বিশ্লেষণে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন এই স্বনামধন্য ব্যক্তিরা। তাঁদের নিয়ে প্রবন্ধগুলোতে বিশেষ গুরুগম্ভীর কোনো ভঙ্গিমা অবলম্বন করেননি লেখক। তাঁদের ব্যক্তিত্ব, বিশেষত সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁদের অবদান, বিশেষ মর্যাদা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। সেজন্য প্রতিটি প্রবন্ধই স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। ব্যক্তিগত সখ্য পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিসরে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টির বিভাময় জগৎ তাৎপর্যে ও উৎকর্ষে উজ্জ্বল।

গণেশ পাইন, সোমনাথ হোর আর যোগেন চৌধুরী ভারতবর্ষের খ্যাতনামা চিত্রকর। ব্যক্তিত্বে ও সৃজনধারায় তাঁদের সৃষ্টিময়তা ভিন্নমাত্রা সঞ্চার করেছে, এ-ব্যাপারে সন্দেহ নেই। বৈশিষ্ট্যে, সৃজনশীলতায় উদ্ভাবনী কৌশলে ও শিল্পকুশলতায় তাঁরা স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল ছিলেন। প্রত্যেকেরই পথপরিক্রমা কষ্টসাধ্য ছিল তো বটেই, তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রামও কোনোভাবেই মসৃণ ও সহজ ছিল না। অস্তিত্বের সেই সংগ্রাম তাঁদের সৃজন ও জীবনকে কতভাবেই না বিপর্যস্ত করেছিল। কলকাতার প্রায়ান্ধকার কবিরাজ-গলিতে ছিল গণেশ পাইনের বসবাস। পরিণত বয়সেও সরকারি বা বেসরকারি চাকরি পাননি। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। ছিল ধৈর্যময় দৃঢ়তা আর ঠাকুরমার কথকতার স্মৃতি, যা মধ্যরাতে তাঁকে ছবি অাঁকতে উদ্বুদ্ধ করত। শুধু ছিল কলেজ স্কোয়ারে এক চায়ের দোকানে আড্ডার যৎসামান্য বিলাসিতা। আর যোগেন চৌধুরীর বাস্ত্তহারা জীবনেই শুরু হয়েছিল ছবি অাঁকা। শিক্ষকতা, তারপর প্যারিস, রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ও শান্তিনিকেতন কলাভবনের শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণের এই যে পরিক্রমা এবং খ্যাতিমান হয়ে ওঠা, তা তো কোনোভাবে সহজ ছিল না। উদ্যম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামই যোগেনকে করে তুলেছিল অদম্য। গণেশ আর যোগেন দুজনেই নিজের নিজের সৃজন-উৎকর্ষ দিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন। সেজন্যে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁদের। বৃহৎ ভারতবর্ষের শিল্প-পরিমন্ডলে মর্যাদার আসন অর্জন করতে হয়েছে সৃজনের শক্তিময়তা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বলতা নিয়ে। মতিউর এ-প্রবন্ধদুটিতে তাঁদের এই পরিক্রমা, বিবর্তন, সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। সেইসঙ্গে উঠে এসেছে কেমন করে তিনি তাঁদের সান্নিধ্যে এসেছেন ও বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সে-কথা। পাঠক লাভবান হবেন এই বহুধাবিস্তৃত সৃজন-উদ্যানে প্রতিষ্ঠার নানামুখীন সংগ্রাম দেখে।

সোমনাথ হোর তাঁর ’৪৩-এর রেখালেখ্য ও কৃষক-আন্দোলনভিত্তিক ড্রইং দিয়ে মানবিক বোধের উজ্জ্বল চিত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষত তেভাগা আন্দোলনের সময়ে তিনি যেসব স্কেচ করেন তা স্মরণীয়তার মূল্য পেয়েছে, হয়ে আছে রেখার সরলতায় এবং বিষয়ের আবেদনের গুণে অসামান্য। চল্লিশের দশকেই এই সৃজন-উৎকর্ষের জন্য ভারতবর্ষের কলারসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন তিনি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রযত্নে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন তিনি এবং পরবর্তীকালে সৃজনের বহু স্তরের মধ্য দিয়ে একজন খ্যাতনামা চিত্রকর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনাকালে বহু শিক্ষার্থীকে তিনি শিল্পের বৃহত্তর ভুবনের নানা জিজ্ঞাসা দ্বারা পরিপুষ্ট করেন ও তাঁদের সৃজনকে করে তোলেন মনোময়। ড্রইং, ছাপাই ছবি এবং ভাস্কর্যের সৃজনে হয়ে ওঠেন অগ্রণী এবং সমীহ-জাগানিয়া এক শিল্পী।

কবি অরুণ মিত্র চল্লিশের দশকের এক উজ্জ্বল কবি। কবিতায় স্বরনির্মাণ করেছিলেন গদ্য কবিতার আবহে যা তাঁকে স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত করেছিল। ফরাসি ভাষায় তাঁর জ্ঞান ছিল অগাধ। সেজন্যে আধুনিক ফরাসি কবিতার যেমন অনুবাদ করেছিলেন, তেমনি ফরাসি সাহিত্য থেকে নিজেও কিছু পরিগ্রহণ করেন। মার্জিত রুচির এই কবি এলাহাবাদ, প্যারিস হয়ে কলকাতায় যখন থিতু হওয়ার জন্য এলেন, তখন অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। তবু কবিতার বাস্তব কল্পময় ও স্বপ্নময় জগৎ থেকে সরে যাননি। মতিউর তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন। এই কবিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন গ্রন্থটিতে তাঁর ফরাসি পঠন-পাঠনসহ এক শক্তিমান বামপন্থী কবি হিসেবে।

শিল্পী কামরুল হাসানের সান্নিধ্যেও এসেছিলেন তিনি। ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে করোটিতে এবং সৃষ্টিতে ধারণ করে তিনি সৃজনের যে-ভুবন নির্মাণ করেছিলেন তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর সৃষ্টির অজস্রতা এবং বিপুল বৈচিত্র্য এদেশের চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন, আশা, হতাশা ও প্রতিবাদ তাঁর সৃষ্টিতে আশ্চর্য কুশলতায় প্রতিফলিত হয়েছে। সমাজের ও মানুষের প্রতি কামরুলের অঙ্গীকার ছিল। সেজন্যে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটেও বড় ভূমিকা রাখেন। কামরুলের রেখার দীপ্তি এদেশের চিত্রকলা-আন্দোলনকে কতভাবেই না সঞ্জীবিত করেছে! গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বাঙালিত্বের সাধনায় এই শিল্পীর সাহসী ভূমিকা নিয়ে মতিউর রহমান গ্রন্থের একটি প্রবন্ধে আলোকপাত করেছেন।

শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মুর্তজা বশীরকে লেখক স্কুলজীবন থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নানাভাবে তিনি তাঁদের দেখেছেন। এই প্রত্যক্ষণ এবং এই দুই আধুনিক শিল্পীর শিল্পকুশলতার কথা আছে দুটি প্রবন্ধে।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী ও নিতুন কুন্ডুর সঙ্গে লেখক ষাটের দশকে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রমত্ত দিনগুলোতে চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্টতার সূত্রে নৈকট্য অর্জন করেন। কালের প্রবাহে এই নৈকট্য গভীর হয়ে ওঠে; আত্মজন ও বন্ধুজনের মতো হয়ে ওঠেন তাঁরা পরস্পর। ব্যক্তিগত এ-সম্পর্ক হয়ে ওঠে তাৎপর্যময়। পৃথক তিনটি প্রবন্ধে তাঁদের কথা আছে। আর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে ঘুরেফিরে এসেছে কাইয়ুম চৌধুরীর কথা। কাইয়ুম দেশের চিত্রকলা-আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছেন লোক-ঐতিহ্যকে আধুনিক জ্ঞানে ও বোধে আত্তীকরণ করে। তাঁর চিত্রে প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের মানুষের মর্মযাতনা, নদী-নিসর্গের মনোজ সুষমা। এক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য চিত্রকর। এছাড়া দেশের গ্রাফিক শিল্পকে এবং গ্রন্থের প্রচ্ছদকে একক সাধনায় তিনি উন্নত স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। এই শিল্পী কতভাবে যে উপলব্ধি করেছেন জীবন ও শিল্পকে, চোখ মেলে দেখেছেন বাংলাদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য, রুচি নির্মাণের জন্য বহুমুখীন কর্মে সদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তাঁর সৃজন কেমন করে হয়ে উঠেছে বাংলা ও বাঙালির জন্য তাৎপর্যময়। সে-কথা মতিউর বলেছেন।

এ-গ্রন্থে খ্যাতনামা সেতারবাদক রবিশঙ্করকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ আছে। রবিশঙ্কর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে যে-কনসার্ট করেন, তা মুক্তিকামী বাঙালিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে একদিকে অনুপ্রাণিত করেছিল, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের পক্ষে জনমতগঠনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। দীর্ঘদিন ধরে মতিউরের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন ছিল রবিশঙ্করকে সংবর্ধিত করবেন। সেজন্যে তিনি তাঁর বন্ধুসহ দিল্লিতে রবিশঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা এবং রবিশঙ্করের শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। ‘রবিশঙ্কর : একটি স্বপ্নের মৃত্যু’ প্রবন্ধে এ নিয়ে মতিউর রহমান খেদ প্রকাশ করেছেন এবং দিল্লিতে সাক্ষাৎকালে তাঁর সঙ্গে রবিশঙ্করের                 যে-কথোপকথন হয়েছিল, তা এই প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেন।

শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন ষাটের দশকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক জগতে এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সদা প্রফুল্ল, প্রাণের স্ফূর্তিতে ভরপুর উদারচেতা বামপন্থী মানুষ। তাঁর পেশার ও একই রাজনৈতিক কমিউনিস্ট মতাদর্শের সহকর্মীদের তিনি খুব সহজেই আপনজন হয়ে উঠতেন। কারুর আর্থিক বা অন্যকোনো ব্যক্তিগত সংকটেও তাঁকে উদার সহযোগিতা করতেন। কীভাবে দেশে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় – এ নিয়ে সর্বদা ভাবিত ছিলেন। তিনি মূলত সংবাদের ব্যবস্থাপনা এবং সম্পাদকীয় দায়িত্বভার বহন করতেন। তাঁর রচিত সারেং বৌ, সংশপ্তক দুটি অসাধারণ উপন্যাস। সংবাদের উপসম্পাদকীয় রচনায়, সাহিত্যসৃজন ও সংবাদ-পরিচালনায় নিত্য তিনি ব্যস্ত থাকতেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর নিরলস প্রয়াস ছিল। সেজন্যে একদিকে লেখনীধারণ, অন্যদিকে দেশের গণতন্ত্রমনা অন্যান্য দল, বিশেষত আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে, বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয় নিয়ে সমঝোতার পথ সৃষ্টি করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ষাটের দশকের শেষদিকে দেশে গণতন্ত্র-প্রতিষ্ঠার জন্য আইয়ুববিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে এবং আইয়ুববিরোধী একটি বৃহৎ মঞ্চ তৈরি হয়। এই মঞ্চটি যাতে যথাযথ ভূমিকা পালন করে, তার জন্য উপরোল্লিখিত নানা মতাদর্শের রাজনীতিবিদের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার কাজ করেন। এই সময়ে তিনি নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে অন্য দলগুলোর সঙ্গেও সংযোগ রক্ষা করতেন। বামপন্থী হলেও তিনি ক্ষুদ্র গন্ডিতে আবদ্ধ ছিলেন না। আপসহীন এই সংগ্রামী এবং সৃজনশীল মানুষটিকে সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতিজগতের মানুষ সমীহ করতেন। চল্লিশের দশকে তিনি যখন ছাত্র, তখনই তিনি কলকাতায় মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। সে-সময়ে তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হন ও পরবর্তীকালে নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর তিনি জেলে যান এবং ষাটের প্রারম্ভে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সংবাদে যোগ দেন। ’৬৫ সাল থেকে সংবাদে কাজের সুবাদে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। ’৬৭ সালে সোভিয়েত বিপ্লবের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপনে তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমাকে তিনি সাংস্কৃতিক উপপরিষদের আহবায়ক করেছিলেন। আলতাফ মাহমুদ, নূরুল হক বাচ্চু ও জহির রায়হান এই উৎসবকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করেছেন। এই তিনজনের সক্রিয় সহযোগিতায় এ-উৎসবটি খুবই সফল হয়েছিল। অমন বৃহৎ একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে যুক্ত ছিলাম বলে আজো গর্ব হয়। শহীদুল্লা কায়সার মানবিকগুণসম্পন্ন কত হৃদয়বান মানুষ ছিলেন, এই সময়ে তাঁর সান্নিধ্যে এসে তা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলাম। তিনি তখন ছায়ানাট্যের জন্য একটি স্ক্রিপ্ট ও দুটি গানও লিখেছিলেন। প্রায় দুমাস বিজয়নগরের একটি বাড়িতে মহলা হয়েছিল। আলতাফ মাহমুদ এই দুটি গানে সুর করেছিলেন। গৃহকর্তা ছিলেন এক উর্দুভাষী প্রগতিশীল ভদ্রলোক। শহীদুল্লা কায়সারের উপরোধে তিনি তাঁর বাড়ির এই ড্রইংরুমটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। শহীদুল্লা কায়সারের মতো সজ্জন, উদারহৃদয় মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মুহূর্তে আলবদর ঘাতকেরা তাঁর কায়েৎটুলীর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করে। সেই সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল চুয়াল্লিশ বছর। সংবাদপত্র, রাজনীতি ও বিদ্বৎসমাজে এমন প্রাণভরপুর মানুষ আমি আর দেখিনি। শহীদুল্লা কায়সারবিষয়ক প্রবন্ধে সবিস্তারে তাঁর সাহিত্যিক অর্জন, সাংবাদিকতার স্বরূপ ও এই বামপন্থী মানুষটির বহুমুখীন অবদান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন মতিউর।

রবীন্দ্রসংগীতে সমর্পিত সৌম্য দর্শন জাহেদুর রহীম বিরল কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ভরাট ও দরাজ কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান হয়ে উঠত উদ্দীপক এবং অত্যাবশ্যকীয় গান। রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভাবাই যেত না। স্বরূপ-চেতনার আন্দোলনে ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে তাঁর গান ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশচেতনার আরেক মন্ত্র। ছাত্রাবাসে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেমমূলক গানগুলোকে তিনি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অকাল প্রয়াত এই মানুষটির অবদানও ছিল অসামান্য। মতিউর রহমান তাঁকে স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।

সংগীতসাধক ওয়াহিদুল হক ছিলেন এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এক বিরলগুণের মানুষ। বাঙালি সংস্কৃতির অকৃত্রিম যোদ্ধা, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক ও সংগীতশিক্ষক এই মানুষটির প্রযত্নে ও অভিভাবকত্বে রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা প্রসার লাভ করে। রবীন্দ্র শতবার্ষিক উদযাপন ও ছায়ানট প্রতিষ্ঠায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ওয়াহিদুল। মতিউর রহমান একটি প্রবন্ধে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান।

সংগীতশিল্পী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে কোনো কিছু গুছিয়ে লেখা, তাঁর সান্নিধ্যে আসা যে-কোনো অনুজের জন্য বেশ কষ্টকর। কতভাবে যে এই শিল্পী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে মেধা ও শ্রম দ্বারা আন্দোলিত ও সমৃদ্ধ করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা অনেকেই তাঁর উদার সহযোগিতায় এদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে যেমন সমৃদ্ধ করেছিলাম, তেমনি পেয়েছিলাম তাঁর অপার স্নেহ। তাঁর চরিত্রে একটি গম্ভীর আবরণ ছিল, সেজন্য অনেক সময়েই অনুজ কণ্ঠশিল্পী-শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভয় পেত। কিন্তু এ ছিল এক আবরণ। আসলে তিনি ভেতরে ভেতরে ছিলেন খুবই স্নেহশীল। মহলায় দুপুরবেলা যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসত, তিনি প্রায়ই খোঁজ নিতেন তাদের দ্বিপ্রাহরিক আহার হয়েছে কি-না। এখনো মনে পড়ে, তিনি যখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নতুন করে সুরারোপ করছিলেন, সে-সময়ে তিনি ধ্যানস্থ হয়ে পড়তেন। এই সুর নিয়ে তিনি কতভাবে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন! একক, দ্বৈত ও সমবেত কণ্ঠে বিদ্রোহী গানটির সুর রচনার জন্য তিনি প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছেন। কতভাবে গেয়ে তারপর অজিত রায়কে নিয়ে চূড়ান্ত সুরটি নির্বাচন করেছিলেন। খুঁতখুঁতে স্বভাবের এই সুরস্রষ্টাকে যারা খুব কাছে পেয়েছিলাম তাদের জীবনে তিনি অমূল্য সম্পদ হয়ে আছেন। সমবেত গানের অনুজ শিল্পীদের তিনি গান শিখিয়েছেন পরম মমতায়। এত মমতা দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, প্রেম দিয়ে কাউকে গান শেখাতে আমি দেখিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহযোগিতার অপরাধে ১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ ঢাকায় তাঁকে ও শিল্পী আবুল বারক আলভীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আলতাফ মাহমুদের বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যায়। দুজনের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। আবুল বারক আলভী ভাগ্যক্রম ছাড়া পেলেও আলতাফ মাহমুদকে     পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে। আলভীর কাছে এই নির্মম নির্যাতনের বিবরণ শুনে শিউরে উঠেছিলাম। শত নির্যাতন সত্ত্বে তিনি মুখ খোলেননি। মতিউর সকৃতজ্ঞচিত্তে এই মানুষটিকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়। পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক চেতনা এদেশের মধ্যবিত্তের জীবনাভিজ্ঞতায় যে-জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছিল তার তাৎপর্য ছিল গভীর। পাকিস্তানের ভাবাদর্শের বিপরীতে নবীন চেতনাসঞ্চারী বাঙালিত্বের সাধনায় একটি নবীন মাত্রা যুক্ত হওয়ায় সৃজন অভিমুখের সকল শাখায় এবং গদ্যে, পদ্যে, সংগীতে, চিত্রকলা-অভিব্যক্তি ও সৃজনশীলতায় নতুন ভাষা নির্মাণের প্রয়াসে দীপ্ত পদচারণা লক্ষ করা যায়। একঝাঁক নবীন কবি, সাহিত্যিক, চিত্রী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বুদ্ধির দীপ্তি ও প্রাগ্রসর চিন্তার এই নবীনরা সৃজনের উদ্যানে নির্মাণ করেছিলেন চল্লিশের ভাবাদর্শের বিপরীতে সম্পূর্ণ নতুন এক ভুবন; যা ছিল মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রাণময়, স্বাদেশিকতায় এক স্বপ্ন নির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপিত সম্পূর্ণ নতুন বোধ এবং বিন্যাসে আধুনিক। এই মানুষেরা হীরের দ্যুতির মতো ঝলমলে হয়ে আছেন আমাদের সাহিত্য ও শিল্পের চিদাকাশে। এঁরাই বীজ বপন করেছেন, ফুল ফুটিয়েছেন উদ্যানে উদ্যানে। ষাটের দশকে স্বরূপ-চেতনার আন্দোলন যখন এক রূপ নিল এঁরাই প্রাণিত করেছিলেন তরুণ ও নবীন যুব সম্প্রদায়কে। ষাটের দশকে স্বরূপ-চেতনার আন্দোলন এবং বাঙালিত্বের সাধনার দিনগুলোতে মতিউর রহমান এঁদের অনেককেই পেয়েছিলেন সহযোদ্ধা ও সহযাত্রী হিসেবে এবং সাহচার্য তো বটেই। মতিউর রহমান তাঁদের কথাই লিখেছেন।

মুদ্রণ পরিপাট্যে গ্রন্থটি খুবই মনোগ্রাহী। ঢাকা থেকে এমন সুমুদ্রিত গ্রন্থ বহুদিন প্রকাশিত হয়নি। অসংখ্য ছবি গ্রন্থটির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে সন্দেহ নেই। এছাড়া গ্রন্থ শেষে নামের যে-নির্ঘণ্ট মুদ্রিত হয়েছে, তা যে-কোনো গবেষক বা আগ্রহী পাঠকেরও কাজে লাগবে।

এই গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে এদেশের একটি কালপর্বের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আনেদালনের, একজন বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীর নিজস্ব প্রত্যক্ষণের এবং অন্যদিকে সাংস্কৃতিক রুচির সমগ্রতার বিশ্বস্ত দলিল। আমরা লাভবান হলাম স্মৃতিসম্পদের পথরেখায় হাঁটতে হাঁটতে পুরনো কিছু আত্মজনকে বিস্মৃতির মধ্যেও নতুন করে আবার পেলাম বলে। কত মানুষেরই সংশ্লিষ্টতা ছিল এই আন্দোলনে, কত মানুষ উদারভাবে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করেছিলেন বলেই তো এক স্বপ্ন বুক নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল। বিস্মৃতপ্রায় অনেক কীর্তিমান মানুষকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য মতিউর ধন্যবাদার্হই হলেন। r

 

জীবনের জোছনা –

ধবল অনুবাদ

পিয়াস মজিদ

তিন পয়সার জ্যোছনা

সৈয়দ শামসুল হক

 

প্রথমা প্রকাশন

ঢাকা, ২০১৪

 

৪০০ টাকা

 

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর তিন পয়সার জ্যোছনার যতি টেনেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এমত দার্শনিক অভিজ্ঞানে যে – জীবন শুরু আর শেষের সাদা পর্দাময় এক চলচ্চিত্র মাত্র। মধ্যিখানের ছবিটা থেকে যায়, বয়ে যায় স্মৃতিসমুদ্দুরে। জীবনের সাদা পর্দা তাঁর কাছে ঠেকে জোছনার ধবলসম, যা মানুষজীবনের ‘অবিরাম ঝরে পড়া ধবল দুধ আসলে।’

ঠিক এমন প্রেক্ষাপট থেকেই ফিরে তাকাতে চাই এই মহার্ঘ্যগ্রন্থের পানে, যেখানে ব্যক্তিলেখকের সূত্রসারে ধরা দেয় আমাদের সাহিত্যশিল্পের সমষ্টিসময়। না, সৈয়দ হকের সময় মানে সন-তথ্যের শুষ্ক সারণি তো নয়; বরং এক নিপুণ চলচ্ছবি যেন।    স্মৃতি-বয়ানের এক-একটি রেখায় কী নিরুপম অাঁকা হয়ে যায় এক সম্পন্ন ক্যানভাস। অতঃপর আমরা পাঠকসকল অক্ষরে বোনা এই চিত্রমঞ্জরির সমুখে অনুধাবন করি বিশ শতকের সেই পঞ্চাশের দশক। সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলা-রাজনীতি আর মূলাধারে ফেলে আসা সমগ্র স্বদেশেরই এক বিশ্বাস্য প্রতিমা যেন দর্শন করতে থাকি। না, ইতিহাস-লিপিকারের গতানুগামী দায়িত্বে নিতান্তই অনীহ সৈয়দ হক; আমরা বলি – ইতিহাস এসে বরং কাকলি শুরু করে এই স্মৃতিরেখমালার কলমনেপথ্যে।

তবে ইতিহাস আর স্মৃতিনিচয়ের বিপ্রতীপে এ তো পঁচিশ অধ্যায়ী এক উপন্যাসেরও নাম, কথক-চরিত্র সৈয়দ শামসুল হককে বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন যেখানে সতর্ক করেন এই বলে যে, ‘লেখক হলে তুমি না খেয়ে মরবে, তোমার পাজামা থাকবে ময়লা, তোমার যক্ষ্মা হবে, সুরায় মাতাল তুমি নর্দমায় গড়াবে।’ সেই পিতাই আবার পুত্রের লেখা-ছাপা পত্রিকা হারানোর শোকতীব্রে বলে ওঠেন – ‘আমার বাদশার নামটাই শুধু ছাপা দেখেছিলাম, পড়া আর হলো না!’ (পৃ ৬৪)

এই যেমন বইয়ের একটা দিক, আবার একজন একচ্ছত্র ফজলে লোহানীকে ফিল্মি চরিত্রের চেয়েও অধিক চাঞ্চল্যে সুভাস্বর দেখি সৈয়দ হকের কলমের ব্যঞ্জনায়। বিখ্যাত কথাকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর এক জীবনীকার যেমন ‘আওয়ারা মসিহ’ বলে অভিষিক্ত করেছেন, ঠিক তারই বাংলা অনুবাদে ‘ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’ অভিধায় যেন এই বই পাঠ-পাঠান্তে আমরা সম্বোধন করে উঠি ফজলে লোহানী নামের আমাদের বিস্মৃত এক পুরোধা-আধুনিককে।

সাহিত্যগৃহের কথা বলেছেন লেখক। এই ঘরের দিকে যাওয়ার পথে কত বিচিত্র বাহির যে মূর্ত এখানে! নেহায়েত কৌতূহলে হানা দিলেও কেউ দেখবে কাসবা-গুলসিতান-মিরান্ডা-মধুদার ক্যান্টিন-রেক্স-বিউটি-মেজদার বিশ্রামালয়-মতিভাই রেস্টুরেন্ট-শাহবাগ হোটেল-রিভারভিউ ক্যাফে-গ্রিন হোটেল-গোবিন্দধাম-খোশমহল-ক্যাপিটাল-ইসলামিয়া রেস্টুরেন্ট কিংবা চু চিন চাও  রেস্তোরাঁয় চা-কফির কাপে টুংটাং, বেশুমার আড্ডা, কবিতার নতুন কুঁড়ি কী গল্প-উপন্যাসের খসড়া থেকে শুরু করে প্রথম প্রেমের ফাল্গুনী উদ্গমে ভরা এক সুব্যাপ্ত সরাইখানার অংশ যেন এরা। আর ভিনদেশি পর্যটকের মতো বইয়ের পাতায় ভর দিয়ে লেখকের এই জীবন-সরাইখানায় কখনো হানা দেয় হেমিংওয়ে, সমারসেট মম, এরিখ মারিয়া রেমার্ক, আর্থার কোয়েসলার, আর্থার কনাল ডয়েল, মুলকরাজ আনন্দ, অল্ডাস হাক্সলি, ম্যাক্সিম গোর্কি কিংবা কার্ল মার্কস পর্যন্ত। আরেকটু ভিন্ন ধরনে সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ থেকে কামাল আমরোহীর মতো নামজাদা চলচ্চিত্রকারও এসে হাজির হন সৈয়দ হকের স্মৃতি-সরাইশালায়। কামাল আমরোহী যেন তাঁর মীনাকুমারী-মধুবালা আর অশোককুমার, আনারকলি, মহলসমেত গুঞ্জরণ করে ওঠেন ‘আয়েগা আয়েগা আনে ওয়ালা’ সুররণনে।

আবার ব্যক্তি ও বন্ধবৃত্ত ছাপিয়ে বৃহত্তর বোধেরও ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে সৈয়দ শামসুল হক-বিরচিত তিন পয়সার জ্যোছনা। এই যেমন হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী কিংবা দাঙ্গার পাঁচটি গল্প প্রকাশ-নেপথ্যের গল্পগাথাও শোনা যায় এখানে। শুধু ঘটনা নয়, ঘটনায় নিহিত নন্দনও সৈয়দ হক টুকে রাখেন তাঁর কলমে – ‘…দাঙ্গার পাঁচটি গল্প, এক রঙা কালো মলাটে সে বই – হাসানের এমনই ছিল নন্দনবোধ যে, বিষয় বুঝেই প্রচ্ছদের রঙ তাঁর ভাবনায় আসত – সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ঘটনার রঙ তিনি ঘোর কৃষ্ণই বেছে নেন’ (পৃ ১৩১)। একটি মন্তব্যলেখনে তারপর হাসান হাফিজুর রহমানই মূর্ততা পান না শুধু; সঙ্গে সাকার হয় মনুষ্যত্বের হতমান কৃষ্ণ-পরিস্থিতিতে বাংলার লেখকশিল্পীদের কৃষ্ণাতিক্রমী অঙ্গীকারের ছবিও।

তিন পয়সার জ্যোছনা প্রকৃতার্থে এক উন্মোচনরেখা। জোছনার বিদ্যুৎ যেমন দিগন্ত-বিশালকে জানান দেয় খন্ডে-বিখন্ডে; এ-বইও নানান হ্রস্বদীর্ঘে পূর্ণ করে লেখকের জীবন ও শিল্পাবয়ব। যেমন বন্ধু আবিদ হুসেন কর্তৃক ‘সৈয়দ হক’ নামকরণের ইতিবৃত্ত জানতে পারি, যা বন্ধুর ব্যক্তিক সম্বোধন ছাপিয়ে এখন লেখকের পারিবারিক-সাহিত্যিক জীবনে পর্যন্ত বহমান আবার বুনোবৃষ্টির গান নামে কখনো না বেরুনো কাব্যগ্রন্থের আদিঅন্তের পাশাপাশি বন্ধু-চিত্রকর মুর্তজা বশীরের তিনদিনে লেখা আলট্রামেরিন উপন্যাস রচনার কাহিনিও জাজ্বল্য হয় তাঁর স্মৃতি-অনুপমে। কিংবা ফজলে লোহানীর ডোর     অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো নামে অলেখা কিন্তু চিরস্বপ্নরচিত উপন্যাস-পরিকল্পনার বিন্দুতে কত সিন্ধুভ্রমণ হয় আমাদের –

…লোহানী হতাশ্বাস, বললেন, – না, সৈয়দ হক, বাংলায় আর আমার কিচ্ছু হবে না। ভাবছি, ইংরেজিতে সাহিত্য করার কথা। ইংরেজিতে একটা উপন্যাস লিখব বলে ভাবছি, নাম দেব ডোর অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো। এর জন্যে ঢাকায় আমি আর নেই, এদেশে আর কিচ্ছু হবে না, আমাকে বিলেতে যেতে হবে। শুনে আমি গুম হয়ে বসে থাকি।

ডোর অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো – সপ্তম হলুদের দরোজা! – রংটার কথা ভাবা বুঝি চিত্রকরদের নিবিড় সঙ্গের কারণেই, মনে হয় একজন চিত্রকরই হবে এ-উপন্যাসের নায়ক, বড় ভালো লাগে শিরোনামটি, যদিও অর্থটা ঠিক ঠাহর করতে পারি না, ইংরেজিতে লেখার ব্যাপারটাও খুব বড় করে আমাকে টলায় না, আমি জানি আমি বাংলার আর বাংলাই আমার ভাষা। (পৃ ৯৬)

স্বপ্ন আর বাস্তবের এমনামন বহুতর সংশ্লেষণের জলছাপ-তৈলছাপে মুহুর্মুহু চিত্রাভ এই বই। যেখানে বইয়ের প্রুফ কাটা থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে দু-টুকরো করে দেশ কাটা পর্যন্ত অতি স্বাভাবিকে প্রকাশমান।

তাঁর গল্পপাঠের পর যে-বন্ধু খালেদ চৌধুরীর রূঢ় মন্তব্যের অভিঘাতে এক সন্ধ্যায় নিজ কলমের ওপর ‘ঘেন্না’ চলে এসেছিল বলে জানান, সেই খালেদ চৌধুরীকে খন্ডিতভাবে নয় বরং তাঁর চরিত্রের পুরো দিকটি আকার দেন এমনতর মূল্যায়নে – ‘নিজে এক অক্ষর লেখেন না খালেদ, এর জন্যে আমরা তাঁকে সক্রেটিসের সঙ্গে তুলনা করতাম, যিনি নিজে কিছুই লেখেননি, কিন্তু সক্রেটিসের মতো ভাগ্যবান তিনি নন, পাননি প্লেটোর মতো শিষ্য যিনি, গুরুর কথাগুলো লিখে রাখবেন, অথচ তখনকার সব তরুণ লেখকই ছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু, শুধু তখনকার কেন – পরেরও তরুণেরা তাঁর সঙ্গে আড্ডায় হবে মিলিত, এরাই তাঁকে নামে আর নয়, ডাকবে প্রভু বলে।’ (পৃ ২১২)

বোঝা যায় মানুষকে তার রক্তমাংসের প্রকৃত সংবেদে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী তিনি। বাহুল্য মহিমার কীর্তন বা নেতিমূলকতার কোনো একদিকে টলে না গিয়ে বন্ধু-স্বজন-দূরবৃত্তের সকলকে নিরাসক্ত-নৈর্ব্যক্তিকে উপস্থাপন করেন পাঠকের পটে। প্রত্যক্ষকে প্রত্যক্ষাতীতে স্থাপনপূর্বক এমন বিচারবোধ বাংলা আত্মকথায় বিরলই বলতে হয়। নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান যখন হাসান হাফিজুর রহমানের অকুণ্ঠ ঋণ স্বীকার করেন, তখন বন্ধুর প্রীতির আসন থেকে সৈয়দ হক রাহমানকে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠান দেন – ‘শামসুর রাহমানের এমন ঋণস্বীকার বাংলাদেশের সাহিত্য-সংসারে এখন পর্যন্ত একমাত্র বলেই আমি জানি।’ (পৃ ১১১)

এই বাক্যের পর শামসুর রাহমান তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি বর্ণিলতাসহ যেন দেখা দেন আমাদের কাছে। ঠিক তেমনি ‘একজন সফল লেখকের পেছনে থাকে নিরানববইটি লাশ’  – অগ্রজ লেখক শওকত ওসমানের এমন দর্শনচিন্তার বিস্তার তিনি বয়ে নিয়ে চলেন বইয়ের শেষ অবধি, অজানিতে যেন সতর্ক করে চলেন তাঁর উত্তর প্রজন্মের লেখক সম্প্রদায়কে। শুধু কি তাই! বিস্মৃত বন্ধু সাইয়িদ আতীকুল্লাহর স্মৃতিতে ছায়া ফেলতে গিয়ে কবিতা থেকে দুঃসহ সমকাল পর্যন্ত উঠে আসে অভিন্ন আলকেমিতে। ‘…যখন জনককেই ভুলে যাবার কালো মুহূর্ত এদেশে রচিত হয়, মূল্যবোধ ধসে পড়তে থাকে, ইতিহাস আর্তনাদ করে ওঠে, বাংলাদেশের এমন একটা কালে আমাদের বন্ধু এই আতিকুল্লাহ্ই লিখবেন এমন পঙ্ক্তিমালা :  প্রতিদিন এখন আমরা খাটো থেকে আরো খাটো হচ্ছি। …/ পায়ের নখ এখন ক্রমেই নেকড়ের নখের মতো হয়ে উঠছে।’ (পৃ ২২)

কবিকে ভুলে যাওয়া, জনককে ভুলে যাওয়া মিলে যে সামগ্রিক করালকাল যাপন করছি আমরা, তাকে যেন নীরবে ধিক্কার দিয়ে ওঠে সৈয়দ হকের সত্যসন্ধ কলম।

কলমকে হাতের ‘ষষ্ঠ আঙুলে’র উপমাবদ্ধ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। হ্যাঁ, শরীরী আঙুলপঞ্চমী ভেদ করে ঐন্দ্রজালিক আঙুলষষ্ঠীর বলেই এমন জীবনবেদে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভবপর হয় যে ‘ব্যর্থ হবার সফলতম পথ হচ্ছে নিজেরই পূর্ব সাফল্যের অনুকরণ।’ এভাবে বিনা-আয়েশে ব্যক্তি-অভিজ্ঞানকে সবার মান্য করে তোলেন তিনি। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়াই যে লেখকশিল্পীর অগ্রসরমানতার অবিকল্প উপায় এই বোধ জেগে ওঠে তিন পয়সার জ্যোছনা পাঠে।

না, স্মৃতির উপর্যুপরি সম্পাতে কেবল ভারাতুর হয়ে যাওয়াই নয়। রসে সিক্তও হই আমরা যখন লেখক তরুণ বয়সে নারী-সন্দর্শনের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন ‘চোখের দেখাতেই আমাদের তখন নিবৃত্তি আর আনন্দ, কথা বলা কি হাত ধরাটা গল্পের জগতের, বাস্তবে ওই চোখ শুধু চোখ, চোখেরই দেখা। সবাই যে তখন আমরা স্বামী নয়নানন্দ!’ (পৃ ৭২)

না, কোনো খেদ নেই। প্রাপ্ত আর প্রাপ্যের মাঝে কোনো সমীকরণ টানা নয়, বেঁচে থাকার অপরূপতায় ফেলে আসা          রূপছবি-সমুচয় মিলিয়ে অনন্য এক ভাষ্য প্রণয়ন করে ওঠে এই বই। বিবরণমূলকতার পাহাড় নয়; এমন জীবনের অন্তর্ভাষ্য যে জীবনপাত্র ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা-রোমান্টিকতা-সৃজনপ্রবাহ-মৃত্যু-দুঃখ-দেশভাগ-দাঙ্গা-ভাষাযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধ-রক্ত-অশ্রু-স্বপ্ন-স্বপ্নচ্ছেদ-নৈঃসঙ্গ্য-লগ্নতা ইত্যাকার জীবনেরই নানা বিরোধী উপচারে প্রাণময়।

জীবনযাপন আর শিল্পযাপনকে সৈয়দ শামসুল হক আলাদা কোনো তারে বাঁধেননি – এ-সাক্ষ্য পাই যখন লেখক তাঁর  শিল্পী-অনুজ সৈয়দ রইসুল হকের দুর্বৃত্তের হাতে প্রাণ দিয়ে ক্যানভাসের কাছে ফিরে না আসার সঙ্গে বন্ধুপ্রিয় ফজলে লোহানীর ‘সাহিত্যে আর না-ফেরা’কে একই শোকতুল্য করেন।

শিল্পকে নীরক্ত-মূল্যহীন করে তো জীবনকেই রুঠা-ক্ষয়গ্রস্ত করে তুলছি আমরা। চরম শিল্পরিক্তকালে বসে লেখা তিন পয়সার জ্যোছনা তাই সৈয়দ শামসুল হকের আত্মকথা-সাহিত্যকথা ছাপিয়ে হয়ে ওঠে এক অভাবিত শিল্পসন্দর্ভ। এর আলো আর ছায়ায় শিল্পসম্ভোগের আধারেই যেন আবিষ্কার করি জীবনসবুজকে।

এই বই পড়তে পড়তে উপলব্ধি হবে জীবন তো আর কিছু নয়, তিন পয়সার মহার্ঘ্য জোছনামাত্র। কেন? উত্তর দিচ্ছেন লেখক নিজেই, ‘সৃজনের বড় একটা দিক হচ্ছে মাতৃগর্ভের অন্ধকারের মতো। জলমগ্ন পীত অন্ধকারে ভ্রূণের বেড়ে ওঠা, জননী ঠাহরে পান সবই, কিন্তু ব্যাখ্যা দিতে পারেন না।’ (পৃ ৯০)

জসীমউদ্দীন থেকে সিকদার আমিনুল হক, কামরুল হাসান থেকে কাইয়ুম চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন থেকে গাজী শাহাবুদ্দীন পর্যন্ত কবি-লেখক-শিল্পীর সুদীর্ঘ পরম্পরার পরমকথায় ভরা মর্মছবিময় আলোচ্য বই তিন পয়সার জ্যোছনা। এভাবে দুশো চল্লিশ পৃষ্ঠার গ্রন্থকাঠামোয় সৈয়দ শামসুল হক সাহিত্যের গল্প বলতে বলতে হৃদয় থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্মৃত পরিসরের রেখা রেখে গেলেন। মহাসময় এসে অতঃপর নিশ্চিতভাবে অনুবাদ করে নেবে এই বিরল গ্রন্থের ভাবসার; প্রজন্মান্তরের পাঠক উদ্ধার করবে এর অন্তর্গত জীবনশিল্প আর শিল্পজীবনের যুগলবন্দি-বোধ। এক জীবনের গল্পে বহু জীবনের গল্পময় এই বই পড়তে পড়তে সৈয়দ শামসুল হকেরই কবিতার ভাষায় ব্যক্তিপাঠক আমরা অতঃপর বলে উঠব – ‘আমাদের এক নয়, অনেক জীবন।’

 

সময়ের কণ্ঠস্বর

মৃধা আলাউদ্দিন

 

এ কি অশ্রু

এ কি রক্ত

আল মাহমুদ

 

শিকড় প্রকাশনী

ঢাকা, ২০১৪

১৭৫ টাকা

আল মাহমুদ বাংলা কবিতার অপরিহার্য ও কিংবদন্তির শুদ্ধ নাম হিসেবেই উচ্চারিত। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে এই দীর্ঘ পরিক্রমার পর তিনি বর্তমানে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে এখন প্রায়ই দেখা যায় কাদা ছোড়াছুড়ির অন্ধকার গোধূলিসন্ধির নৃত্য, কষ্টের ঘনায়মান নিদারুণ প্রতিচ্ছায়া। কিন্তু আল মাহমুদ বহু আগেই তাঁর সোনালি কাবিনে অকম্পিত, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেই অমোঘ সুন্দর বাণী – ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা।’ সেই সুর ধরেই বলা যায়, কবির কোনো পরাজয় নেই, পরাজিত হননি কবি। লিখেছেন অনবরত সর্বব্যাপ্ত হয়ে বাংলা কবিতায় এবং আজো প্রতিদ্বন্দ্বীহীনভাবে লিখে যাচ্ছেন।

আল মাহমুদের কবিতায় নগরের বিত্ত-বৈভব, কৃষাণের কর্মের আনন্দ ও রোদের ঐশ্বর্য আছে। আছে বৃষ্টি, ধান-কাউন আর পাট ক্ষেতের মৌ-মৌ গন্ধ। সমাজ পরিবর্তন ও যৌনতার অনুপাত যদি তাঁর কবিতায় যুক্ত না হতো, তবে অনেক কবিতাই অপাঠ্য হয়ে যেত বলেই বোদ্ধামহল মনে করে। জানত না যা বাৎসায়ন আর যত আর্যের যুবতী, তাও জানতেন আল মাহমুদ। তিনি শুনতেন মেঘনার জলের কামড়ে ফসলের আদিগন্ত সবুজ চিৎকার। ঢেউয়ের পাল রাতের নদীতে ভাসমান পানিউড়ী যেভাবে ভেঙে যায় মাঠ-ঘাট-পথ, সেভাবে তিনি তার বানুর গতরে ঢেলে দেন চুমুর পর্বত। আল মাহমুদ উভয় বাংলার শুধু একজন শক্তিমান কবি নন, তাঁর কাব্য-সাধনায় মানুষের বোধের জন্য রয়েছে তাৎপর্যময় একটি সবুজ উপত্যকা – নির্মাণাধীন আলোর টাওয়ার। আল মাহমুদকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গল্প-উপাখ্যান, কবিতা – সফেদ, সন্দর্ভ। তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শিবনারায়ণ রায় তাঁর ‘একজন খাঁটি কবি’ সন্দর্ভে লিখেছেন, ‘সমকালীন যে দুজন বাঙালি কবির দুর্দার মৌলিকতা এবং বহমানতা আমাকে বারবার আকৃষ্ট করেছে তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায়। জিজ্ঞাসার প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় আল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা আগ্রহী হয়ে প্রকাশ করি। আমার মনে হয়েছে যে, বাংলা কবিতায় তিনি নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছেন। পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন; আঞ্চলিক ভাষা, অভিজ্ঞতা, রূপাবলিকে, তিনি নাগরিক চেতনায় সন্নিবিষ্ট করে প্রাকৃত অথচ ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ এক কাব্যজগৎ গড়ে তুলেছেন। জসীমউদ্দীন এবং জীবনানন্দ উভয়ের থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির কবি। কারো প্রতিধ্বনি নয়, নির্মীয়মাণ স্বকীয়তাই তাঁকে আধুনিক জগতে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী করেছে।’ আল মাহমুদের পাঠকমাত্রই এ-ধারণা মনে পোষণ করেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা চলে কবির কাব্যজগৎ নিয়ে। নগর, প্রকৃতি আর মানবীয় সম্পর্কের যে চূড়ান্ত সুন্দরে উপনীত হয়েছেন কবি, তা অন্য অনেকের মধ্যেই নেই। প্রেমজ সম্পর্কের যে-রৌদ্রগাহন আমাদের এদেশীয় সংস্কৃতিতে বিরাজ করছে আল মাহমুদ তার চূড়ান্ত আলোকে সেটা অতিক্রম করতে পেরেছেন। তাঁর কবিতায় রয়েছে বাংলা কবিতার নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষার বুননশৈলী আর আধুনিকায়নের প্রতি তীব্র মনোযোগ।

২০১৪ সালে একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদের নতুন কাব্য এ কি অশ্রু এ কি রক্ত। চার ফর্মার কাব্যগ্রন্থটিতে কবিতার সংখ্যা ৩৭। সংখ্যায় কম হলেও মনের পিপাসা মেটানোর জন্য এ-ই যথেষ্ট। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘দাও পরিয়ে মাল্যখানি’তে কবি লিখেছেন –

বুকের মাঝে বুক মেলাতে বাড়াও চরণ

ভালোবেসেই যেন আমার জীবন-মরণ।

প্রেমজ-বাণীর এ-কবিতার আবেগ মানুষকে মোহমুগ্ধ না করে পারে না। মানুষ চরণ বাড়াবে তার প্রিয়তমার দিকে, ভালোবেসে বাকি জীবনটা কাটানোর জন্য তার আপনজনের দিকে। এ পরিণত বয়সেও জীবন-মরণ ভালোবাসা কবিকে আরো কটা বছর বাঁচিয়ে রাখবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কবি আরো বলেন, ‘- এই তো আমি ছায়ায় আছি মায়ায় আছি/ এই তো আমি/ যাই পেরিয়ে নিজের গন্ধে নিজেই বাঁচি।’

কবিরা বড় বেশি প্রকৃতিপ্রেমী। কেননা, প্রকৃতিই পাঠাগার তাঁদের কাছে। যদিও কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ঘাড় ব্যথা করা ছাড়া সেখানে আর কিছুই পাননি। সে ভিন্ন কথা। কবিরা আকাশ থেকে, নদী থেকে, পাহাড়-বন থেকে অজস্র পাঠ গ্রহণ করেন। আল মাহমুদ এক অর্থে প্রকৃতি-প্রেমের কবিও বটে। কবির এ কি অশ্রু এ কি রক্ত গ্রন্থেও পাতা ঝরার কথা এসেছে। এসেছে বসন্তবরণের কথা। আরো আছে ‘শিশির ঝরে দূর্বাঘাসে শীত এসেছে শীতের মাসে।’ ‘আজ বসন্ত’ কবিতায় কবি ঋতুর ঘূর্ণিপাককে এভাবে তুলে ধরেছেন –

তবুও আমরা আছি বেঁচে

যার যা করার করছি যেচে,

কারণ ঋতুর ঘূর্ণিপাকে

শীত দাঁড়ানো পথের বাঁকে।

প্রেম ও প্রকৃতির টানের পরেই কবি এ-কাব্যগ্রন্থে গ্রহণ করেছেন মৃত্যুর স্বাদ। জন্মিলে মৃত্যু অবধারিত। এই এ-নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই। ভুল নেই। অবধারিত এ-নিয়ম মেনেই মানুষ পৃথিবীতে আসে, একসময় চলেও যায়। কবিও এর ব্যতিক্রম নন; কবিকেও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কবি বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বসে আছেন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের অধীর আগ্রহে। তিনি শুধু চারদিক থেকে ‘যেতে হবে যেতে হবে’ এমনই কলরব শোনেন। দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে কবি গেয়ে ওঠেন মৃত্যুর গান –

 

আমরা পৃথিবীবাসী শুধু দেখি রক্ত আর ক্লেদ

বুঝি না মৃত্যুর ভাষা, সত্য আর মিথ্যার প্রভেদ।

অথবা,

পাই বা না পাই আমি চলে যাব দূর-দিগন্তে

খেলা শেষ হলো, বেলা শেষ হলো – নিজের অন্তে।

সমাজ সচেতন প্রতিটি মানুষই দেখেছি, ফেলানির কাঁটাতারে ঝুলে থাকা লাশ। কষ্টের করুণ চিৎকার। প্রচুর লেখা হয়েছে ফেলানিকে নিয়ে, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ফিচার, সম্পাদকীয়,  উপ-সম্পাদকীয়। সিনেমাও তৈরি হয়েছে ফেলানির কাঁটাতারে ঝুলে থাকার করুণকাহিনিকাব্য নিয়ে। বিচারও হয়েছে এ নৃশংস হত্যাকান্ডের – কিন্তু তার বাবা-মা ফিরে পায়নি আদরের সন্তানকে।

সময়কে ধারণ করা, সমাজ-সচেতন আমাদের আজকের কবিও ভুলতে পারেননি ফেলানির বাবা-মায়ের কান্নার কথা। আর্তচিৎকারের কথা। তিনিও তুলে ধরেছেন তাঁর কাব্যভূমিতে, ফেলানিকাব্য – ‘এ কি অশ্রু এ কি রক্ত’ :

 

১. আমরা চাই না অথচ আমাদের চোখ

বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে অশ্রুপাত করে।

এ কি অশ্রু

এ কি রক্ত

নাকি বিবেকের গলে যাওয়ার টসটসে রস।

২. আমরা কাঁদছি মানুষ আমাদের মানুষ বলে

অবহিত করে বলে।

৩. আমরা নিজেকে মূর্খ বলতে লজ্জাবোধ করি।

– এ কি অশ্রু এ কি রক্ত

 

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কাব্যগ্রন্থ এ কি অশ্রু এ কি রক্তের প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। অলঙ্করণ করেছেন মেহেদী হাসান। আগাগোড়া সমৃদ্ধ বইটির সম্পদনায় কিছু ত্রুটি লক্ষ করা যায়, তবে ভাবসম্পদের বিচারে পাঠক খুঁজে পাবেন শক্তিধর কবি আল মাহমুদকেই। r

 

বাঙালি-মনীষার অন্তরঙ্গ চালচিত্র
মুহিত হাসান

 

সাত সাগরের ফেনায়

ফেনায় মিশে

 

বেলাল চৌধুরী

 

শুদ্ধস্বর

ঢাকা, ২০১১

 

৪০০ টাকা

 

কবি ও গদ্যকার বেলাল চৌধুরীর সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে বইখানা প্রথাগত স্মৃতিকথার গড়ন-ধরনে নির্মিত, এমনটা বললে ভুল করা হবে। এই বই ধরাবাঁধা আত্মজীবনীর ছকবাঁধা পথে হাঁটেনি, বরং এক অন্যরকম বিন্যাসে সাজিয়ে দিয়েছে বেলাল চৌধুরী যেসব বহুমুখী কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করেছেন তাঁর বিচিত্র জীবনে – তাঁদের আন্তরিক মুখচ্ছবির রঙিন-মধুর ক্যানভাস। নিদেনপক্ষে চল্লিশজনকে নিয়ে এই বইতে তাঁর কথামালা সংকলিত করেছেন তিনি, কাউকে নিয়ে একটি, অথবা কাউকে নিয়ে একাধিক লেখা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বইয়ের প্রথমেই স্থান পাওয়া জীবনানন্দ দাশ-বিষয়ক রচনাটি, ঋতিক ঘটকের চলচ্চিত্র বা শচীন দেববর্মণের গান সংক্রান্ত প্রবন্ধদ্বয় এবং একদম শেষে কফি হাউস, দৈনিক সংবাদ ও জাতীয় প্রেসক্লাব – এই তিন প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত লেখাগুলো একটু ভিন্ন ধাঁচের বলতে হবে। এগুলো বাদে বাকি সব রচনাই অবশ্য ব্যক্তিবিশেষের স্মৃতিকেন্দ্রিক।

আগেই বলেছি, জীবনানন্দকে দিয়ে এ-বইয়ের শুরু। ব্যক্তিগত গদ্যের ভঙ্গিতে একের পর এক উঠে আসে বেলাল চৌধুরীর জীবনানন্দ-পাঠের মুগ্ধকর অভিজ্ঞতার প্রাঞ্জল বয়ান, জীবনানন্দের কাছের মানুষদের সান্নিধ্যের স্মৃতি ও জীবনানন্দ-চর্চা বিষয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু মন্তব্য। এরপরের লেখা ‘মানুষ বুদ্ধদেব বসু’তে পাই লেখকের দেখা পারিবারিক পরিমন্ডলের আড্ডাবাজ বুদ্ধদেব বসুর এক সহৃদয় পোর্ট্রেট। একইভাবে ‘প্রাসঙ্গিকী : আবু সয়ীদ আইয়ুবে’ রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আইয়ুবের সঙ্গে আলাপের বয়ান। আইয়ুবের মানবকল্যাণমুখী মনের পরিচয় এই লেখাতে সহজাতভাবেই ফুটে উঠেছে। আর কলকাতার সেই কাল্ট-পুরুষ কমলকুমার মজুমদার! – কমলকুমারের অদ্ভুত বৈচিত্র্যময় চরিত্রের যে বর্ণনা বেলাল চৌধুরী তুলে ধরেছেন প্রত্যক্ষদর্শীর আন্তরিক কলমে ‘লেখকদের লেখক কমলকুমার মজুমদার’ শীর্ষক নিবন্ধে, তা তুলনাহীন।

বাংলার উত্তাল সাম্যবাদী আন্দোলনের ভাষ্যকার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে পৃথক স্মৃতিচারণ যেমন আছে এই গ্রন্থে, তেমনি কৃত্তিবাস পত্রিকাকে ঘিরে ষাটের দশকে যে দুই কবি কলকাতায় ঝড় তুলেছেন সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়েও একাধিক রচনা রয়েছে। কথাশিল্পী শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে মোট চারটি লেখা এখানে পাঠক পাবেন। চারটি লেখায় যেন চারভাবে এই মহান কথাকারকে দেখতে পাবেন পাঠক । তাঁর সাংবাদিক-সত্তা থেকে আরম্ভ করে কথাসাহিত্যিক বা খাদ্যরসিক-মনটিরও পরিচয় পাওয়া যাবে বেলাল চৌধুরীর সুরসিক কলমে। সেই সময়ের আরেক মেধাবী কথাসাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ক্ষুদ্রকার একটি লেখাও লভ্য এখানে। কিন্তু ক্ষুদ্র হলেও তা সন্দীপনের মেজাজি অথচ সংবেদী চরিত্রটিকে চিনিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। আরেক তুখোড় কবি বিনয় মজুমদারকে নিয়ে রয়েছে স্মৃতি ও বিশ্লেষণের মেলবন্ধনে রচিত তিনটি আলাদা প্রবন্ধ। এছাড়াও সমরেশ বসু, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, তারাপদ রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, অরূপরতন বসুর মতো কবি বা কথাসাহিত্যিকদের নিয়ে দীর্ঘ বা হ্রস্ব স্মৃতিচারণাও বইটিতে সংকলিত হয়েছে।  জীবনানন্দপ্রেমী মার্কিন গবেষক ক্লিন্টন বুথ সিলিকে নিয়ে সাক্ষাৎকারধর্মী রচনাটিও পাঠকের নজর কাড়বে।

বাংলাদেশের কাব্যভুবনের কয়েকজন উজ্জ্বল নক্ষত্রকে নিয়ে বেলাল চৌধুরীর লেখাগুলো যেন হয়ে উঠেছে মননঋদ্ধ মূল্যায়ন ও সুসংবদ্ধ স্মৃতিচারণের চমৎকার যুগলবন্দি। কবি সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ নুরুদ্দিন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মাহবুব-উল আলম চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী এবং ত্রিদিব দস্তিদারের মতো বাংলা কবিতার কয়েকজন উল্লেখযোগ্য স্রষ্টার ব্যক্তিগত জীবন দেখার ও তাঁদের কবিতার স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ উক্ত রচনাসমূহ। অন্যদিকে শওকত ওসমান, রশীদ করীম ও মাহমুদুল হকের মতো কথাশিল্পীকে নিয়ে বা সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেমের মতো মননশীল প্রাবন্ধিককে নিয়ে লেখকের বিবেচনাও ভাবানোর মতো। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের কয়েকজন দিকপাল, যেমন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহুর হোসেন চৌধুরী, কে জি মোস্তফাকে ঘিরে বেলাল চৌধুরীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পাঠককে জানিয়ে দেবে সংবাদপত্রের জগতে তাঁর উজ্জ্বল পদাচারণার কথাও। মীজানুর রহমানকে নিয়ে স্মৃতিকথায় তেমনিভাবে পাওয়া যাবে লিটল ম্যাগাজিনের জগতের এক অসামান্য ও ব্যতিক্রমী সম্পাদকের কর্মযজ্ঞের নিপুণ বর্ণনা। চলচ্চিত্র জগতের দুই একনিষ্ঠ সাধক আলমগীর কবির ও ফজলুল হক সংক্রান্ত নিবন্ধ-দুটিতে বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসের এক অন্যরকম সময়ের চিত্র ধরা পড়ে। কলিম শরাফীকে নিয়ে দীর্ঘ লেখাটিতে উঠে এসেছে এক সংগীতসাধকের গণসংগীত থেকে রবীন্দ্রসংগীতে অবিরাম ক্লান্তিহীন শুদ্ধ যাত্রার কথা।

সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে বইটি যেন আমাদের ফেলে আসা সময় ও প্রয়াত-জীবিত কৃতিজনের স্মৃতি ও ব্যক্তিসত্তাকে এক অভিন্ন ধারায় মিলিয়ে দেখায়। সাত সাগরের ফেনার মতোই এই বইয়ে উঠে আসা ব্যক্তিদের চিত্রগুলো বহুবর্ণিল ও নানামুখী যেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পৃথিবীর পাঠশালার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করেছেন বেলাল চৌধুরী। হার্দ্য ও শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোকে স্মৃতিচারণের রসে জারিয়ে ও বিশ্লেষণের তাপে ভাপিয়ে নিয়ে এরকমভাবে উপস্থাপন করা শুধু এই বোহেমিয়ান ভবঘুরে কবির পক্ষেই সম্ভব, এমনটা বললে আশা করি অত্যুক্তি হবে না। এপার বাংলা ওপার বাংলার বাঙালি মনীষার (অবশ্য এই বইয়ে আলোচিত ক্লিন্টন বি সিলি জন্মসূত্রে মার্কিনি, তবু তাঁর নাড়ির যোগ যেন বাংলাদেশেই গ্রথিত) অন্তরঙ্গ চালচিত্রে সমৃদ্ধ এই বই তাই যেকোনো অতীত-পিয়াসী বাঙালি পাঠককে তৃপ্ত করতে সমর্থ হবে বলেই ধারণা করা যেতে পারে। r

 

শিল্পের কান্ডারি

ফয়েজুল আজিম

জয়নুল আবেদিন

আবুল মনসুর

বেঙ্গল পাবলিকেশন্স

ঢাকা, ২০১৩

২৭৫ টাকা

 

জন্মশতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন আবুল মনসুর। শিল্পী হিসেবে এবং শিল্পকলার সংগঠক হিসেবে এদেশে তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান ও ভূমিকাকে পুনরায় অবলোকন কিংবা মূল্যায়নের যথোপযুক্ত সময়ই বটে। আধুনিক শিল্পকলার নিত্যপরিবর্তনশীল জগতে প্রায় ত্রিকাল অতিক্রান্ত জয়নুল আবেদিনকে একালের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের কাছে উপস্থাপনের সুদৃশ্য মানসম্পন্ন প্রয়াস বলা যায় এ-গ্রন্থ। স্বনামখ্যাত ব্যক্তির আলোচনা, বিশেষ করে আলোচক যদি স্বগোত্রভুক্ত হন, তাহলে সম্ভ্রম ও আবেগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। তবে নির্মোহ আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই আবুল মনসুর একবিংশ শতকের নতুন বাস্তবতায় শতবর্ষের জয়নুলের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রাপ্য অবস্থানের ওপর আলোকপাত করেছেন। এই আলোচনার সূত্রে জয়নুল ও তাঁর সময়ের কিছু অনালোকিত প্রসঙ্গ উন্মোচন ও বিবেচনার অবকাশ তৈরি হয়েছে।

ছয় দশকের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পকলার চর্চা এখন এদেশের শহুরে মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, একটা সময়ে এই সমাজে শিল্পচর্চা ও শিল্পীকুল ব্রাত্য হিসেবেই বিবেচিত ছিল। প্রচলিত সামাজিক মর্যাদায় ললিতকলার মানুষের খ্যাপা, উচ্ছন্নে যাওয়া প্রায় সমাজ-বহির্ভূত চরিত্র হিসেবেই দেখা হতো। শিল্পীদের ছন্নছাড়া জীবনচর্যাই শুধু নয়, সামাজিক জীবনযাপনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পেশাও ছিল এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণ। তবে সমাজ যেহেতু ক্রিয়াশীল, সমাজের বৈষয়িক ও মানসিক অগ্রগতির সঙ্গে সামাজিক প্রয়োজনের সূত্রে শিল্পীদের সম্পর্কে মানুষের অস্বচ্ছ ধারণারও পরিবর্তন ঘটেছে। নিকট অতীতের শিল্পী নামের লক্ষ্মীছাড়ারা এখন অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর বরপুত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ফলে সামাজিক কৌলিন্যে কুলীনকুলের একাসনেও তাঁদের আসন নির্ধারিত থাকছে। শিল্পকলার এই প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মাঝে এ-উপলব্ধি প্রায় অনুপস্থিত যে, তাদেরই পূর্বসূরিদের অজানা দুর্গম পথে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। এদেশে চারুকলার পথিকৃৎদের সামনে বাঁধানো কোনো পথ ছিল না। পথ নির্মাণ করেই পথে নামতে হয়েছিল তাঁদের, প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে কখনোবা কূলের দেখা মিলেছে।

বাংলাদেশে চারুকলার পথ নির্মাণের অগ্রপথিক জয়নুল আবেদিন, এ-বক্তব্য প্রায় প্রশ্নাতীত। একটি অপ্রস্ত্তত সমাজে বিরুদ্ধ পরিবেশে শিল্পকলার বীজ বুনেছিলেন তিনি। জয়নুল একাধারে স্বনামখ্যাত চিত্রকর, সার্থক সংগঠক। সমাজ তাঁকে শিল্পাচার্য অভিধায় ভূষিত করেছে। নানা কারণে আমাদের সংস্কৃতি-জগতে তিনি এক স্মারকতুল্য চরিত্র। যে-যুগ যে-সমাজে তাঁর আবির্ভাব, যে-কোনো বিবেচনায় তাকে ব্যতিক্রম বলা চলে। শিল্পী হওয়ার চরম স্পর্ধাকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে প্রতিষ্ঠিত করাই শুধু নয়, একটি অনালোকিত জাতির শৈল্পিক স্বপ্নযাত্রার কান্ডারি হয়েছিলেন তিনি। অর্ধশতাব্দী ধরে নানা বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আমাদের দেশে প্রবহমান শিল্পকলায় সৃজনে ও খ্যাতিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। সেখানে এবং সম্ভবত অনাগত কালেও শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অবস্থান সন্দেহাতীতভাবে নির্ধারিত থাকবে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি শিক্ষিত মুসলমান সমাজ তার আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন থেকেও মূলধারায় নিজস্ব অবস্থান নির্ণয়ের সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এই সামগ্রিক অনিশ্চিত পরিবেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে দু-একজন ব্যতিক্রমী চরিত্রের আবির্ভাব দেখা যায়। যেমন, সাহিত্য-সংগীতে কাজী নজরুল ইসলামের আবেগ-তাড়িত সরব উপস্থিতি, জসিমউদ্দীনের কবিতা আর আববাসউদ্দীনের গানে বাংলার উপেক্ষিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হৃদয়স্পন্দন এবং বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যকলার সমকালীনতা বাংলার সংস্কৃতির পরিমন্ডলে মুসলিম প্রতিনিধিদের উপস্থিতির স্বাক্ষর বহন করে। সাংস্কৃতিক কালচক্রে চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের আবির্ভাব বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক চক্রাবর্তের যোগসূত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে সমকালে এসব অসময়োচিত চরিত্র বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিতে ভিন্নমাত্রা সংযুক্ত করেছিল। বাঙালির সম্প্রদায়গত স্বাতন্ত্র্যের মাঝে ক্রিয়াশীল থেকেও চেতনায় ও ভঙ্গিতে স্বযোগ্যতায় সংস্কৃতির কুলীনকুলে তাঁদের অবস্থান নির্ণীত হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতকে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার ঘেরাটোপে বাঙালির সুপ্ত জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয়েছিল বলে একটি খন্ডিত ধারণা প্রচলিত আছে। বাংলার রেনেসাঁস নামে কথিত এই জাগরণ ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে ও পরিমন্ডলে। পাশ্চাত্য প্রণোদনায় জাগরিত এ-চৈতন্য স্বাভাবিকভাবে নিজস্ব সম্প্রদায়গত ঐতিহ্য ও মন-মানসিকতাকে বহন করেই বিকশিত হয়েছিল। এদিকে পাশ্চাত্য জ্ঞানভান্ডার বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের স্ব-আরোপিত অংশগ্রহণ ছিল না বলে সেই কথিত জাগরণে তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল না। পরিণামে আর্থ-সামাজিক জীবনের সমান্তরাল মননে ও চেতনায় উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে স্বাভাবিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। অথচ ধর্মীয় বিশ্বাসে আলাদা হওয়া সত্ত্বেও উপনিবেশপূর্ব-যুগে শত শত বছর ধরে লোকায়ত পর্যায়ে সম্প্রদায়গত সহনশীল ও সাবলীল সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় ছিল। ইংরেজ উপনিবেশ-আরোপিত শাসনের পরিণামে পাশ্চাত্য আধুনিকতার অনুপ্রবেশের সূত্রে সম্প্রদায়গত বিভাজনের দেয়াল সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়েছিল। ফলে পরবর্তীকালে জাগতিক জীবনে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে পিছিয়ে পড়া মুসলমান বাঙালি ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের মাঝে নিজের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষায় সচেষ্ট হয়। ঊনবিংশ শতকে নবজাগ্রত সংস্কৃতিতে স্বাভাবিকভাবে হিন্দু মূল্যবোধের প্রাধান্য থাকায় বিংশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান ক্রমান্বয়ে সামগ্রিক জাতীয় জীবনের স্রোতধারায় সম্পৃক্ত হতে থাকলে সেখানে দ্বিমুখী প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে মুসলমান সমাজে যেখানে ধর্মীয় গুরুদের প্রভাব ছিল প্রবল, সেখানে ললিতকলা সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত ভ্রান্ত ধারণা সম্ভাব্য মুসলমান শিল্পীদের স্বপ্ন কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছিল। উপরন্তু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় সামগ্রিক বাঙালি সমাজেই পেশা হিসেবে শিল্পকলার চর্চাকে বিশেষ উৎসাহের দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সহজেই অনুমিত যে, পূর্ববঙ্গের প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা জয়নুল আবেদিনকে নানা প্রতিবন্ধকতার দেয়াল অতিক্রম করেই শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়েছিল। শুধু শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর সংগ্রামই নয়, একই সঙ্গে আগামীর শিল্পীদের জন্য পথ নির্মাণের প্রায় অসম্ভব কল্পনা ও দুঃসাহস তিনি ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে জয়নুলের সাফল্যে এখন এ-কথা আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে, তাঁর হাতেই বাঙালি মুসলমানের শিল্পকলা চর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল।

ঊনবিংশ শতকে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণে হিন্দু মধ্যবিত্তের সুকর্ষিত জীবনবোধের প্রতিতুলনায়, বিংশ শতাব্দীতে নবাগত বাঙালি মুসলমান সাংস্কৃতিক চেতনা ছিল বিশেষভাবে আবেগপ্রসূত, স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল বৈশিষ্ট্যের। কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তমসাচ্ছন্ন এ-সময়ে বাংলার রেনেসাঁসে মুসলমান প্রতিনিধি হিসেবে নজরুল, জসিমউদ্দীন, আববাসউদ্দীন ও বুলবুল চৌধুরীরা স্বতন্ত্র এবং স্বমহিমায় ভাস্কর হয়ে উঠেছিলেন। বাঙালি মুসলমানের এই সাংস্কৃতিক অগ্রদূতদের মাঝে চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন তাঁর নিজস্ব মাধ্যমে সৃজনশীলতার মানদন্ডে সুউচ্চ অবস্থানের দাবিদার হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, দৃশ্যকলার ক্ষেত্রে তখন একদিকে নব্যবঙ্গীয় ভাবাবেগের জোয়ারে ভাটার টান, অন্যদিকে তরুণ শিল্পীদের মাঝে পাশ্চাত্য আধুনিকতার মাতাল হাওয়ার আহবান। বাংলা চিত্রকলার এই সন্ধিক্ষণে জয়নুল তাঁর চিত্রাঙ্গিক নির্মাণে সতর্ক অবস্থানে থেকে মৌলিক সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি সমকালীন আধুনিক চেতনাকেই ধারণ করেছিলেন।

কিন্তু তাঁর আধুনিকতা বাংলার চিরায়ত লোক-ঐতিহ্যের নির্যাস অবলম্বন করেই বিকশিত হয়েছিল। জয়নুল আবেদিন তাঁর শিল্পের বিষয় নির্বাচনে সম্প্রদায়গত চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে অন্ত্যজ শ্রেণি তথা মানবতাবাদকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। চল্লিশের দশকের সামাজিক বাস্তবতায় একজন তরুণ মুসলমান শিল্পীর এ-অবস্থান সুদৃষ্টি এবং উল্লেখ করার মতো বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা চলে।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে স্মর্তব্য যে, বাংলার সাংস্কৃতিক নবজাগরণে নতুন যুগের শিল্পকলার আবির্ভাব কিছুটা বিলম্বে ঘটেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অবনীন্দ্রনাথের হাত ধরেই আধুনিক বাংলা চিত্রকলার অভিযাত্রা। অবনীন্দ্রনাথকে যদি বলা যায় অতীতচারী- রোমান্টিক, তাহলে তাঁরই ভাবশিষ্য নন্দলাল হবেন ভারতীয় ঐতিহ্য-সম্ভুত আধুনিক রোমান্টিক। এদিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পাঠ নিয়েও যামিনী রায় প্রকাশিত হলেন বাংলা লোকচিত্রের উত্তরসূরি রূপে। অবনীন্দ্রনাথ বিস্মৃতির আড়াল থেকে প্রাচ্যকে টেনে আনলেন আধুনিকতার প্রাঙ্গণে। নন্দলাল সে-আধুনিকতাকে ধারণ করে ভারতের হৃদয়ের সন্ধানে নেমেছিলেন। আর যামিনী লোকায়ত বাংলাকে হাতে করে নিয়ে এলেন নাগরিক আধুনিকতার ভিন্ন জগতে। এই তিন মহীরুহের ছত্রছায়ায় আধুনিক বাংলা চিত্রকলার ত্রিধারার ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন না হয়ে, প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা জয়নুল আবেদিন একটি স্বতন্ত্র কিন্তু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণে সমর্থ হয়েছিলেন।

নানা কারণে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, জয়নুলের চরিত্রজ্ঞাপক চিত্রাঙ্গিক যামিনী রায় কিংবা কালীঘাট পটচিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। সরল দৃষ্টিতে এ-ধারণার একটি সাধারণ চাক্ষুষ বাস্তবতা হয়তো খুঁজে নেওয়া যায়। এখানে এ-কথা স্মরণ করা যায় যে, কালীঘাট চিত্রাঙ্গিক সম্পর্কে সুখ্যাত পন্ডিত উইলিয়াম আর্চারও পাশ্চাত্য-প্রভাবিত বলে একটি বিভ্রান্ত সিদ্ধান্ত পোষণ করতেন। ঐতিহ্যবাহী বাংলা পটের অবিচ্ছেদ্য কালীঘাট চিত্রকলার প্রণিধানযোগ্য দুটি দিক দৃশ্যমান। প্রথমত, পেশাদার স্বাধীন শিল্পী  হিসেবে বিষয় নির্বাচনে নিম্নবর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সামাজিক চেতনার প্রতিফলন। দ্বিতীয়ত, রেখা ও রঙের ন্যূনতম ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়বস্ত্তর সহজ-সরল উপস্থাপন। আমরা জানি যে, ভারতবর্ষের সকল চিরায়ত ধ্রুপদী চিত্রকলায় রেখার প্রাধান্য থাকলেও সর্বভারতীয় চিত্রকেন্দ্রগুলোতে এর রূপায়ণ একরকম নয়। ভারতের পশ্চিমাংশের প্রধান শিল্পকেন্দ্রসমূহে চিত্রকলার ব্যবহৃত রেখা সুচিক্কন, সুললিত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। পক্ষান্তরে পূর্ব-ভারতে বিশেষ করে বাংলা-পর্বের রেখা মেদবহুল, সহজিয়া ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যামিনী রায় উপরোক্ত আঙ্গিককে প্রায় সরাসরি কিন্তু তাঁর পরিশীলিত নৈপুণ্য ব্যবহার করেছিলেন। জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলার মুখ্য চরিত্র কালীঘাট চিত্রীদের মতো নিম্নবর্গীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাঁর চিত্রের প্রাণ, এতে ব্যবহৃত সুদৃঢ় রেখার সুগঠিত শারীরিক সৌষ্ঠব এবং এর সচলমান জৈবিক চরিত্র। চিত্রকলায় রেখা যে আকার ও দৃশ্যকে নির্মাণ করে জয়নুলের চিত্রাবলি এরই সার্থক মেলবন্ধন। সাদা-কালো বা ন্যূনতম বর্ণের ব্যবহার তাঁর চিত্রকলার রেখাভিত্তিক গঠনধর্মী বৈশিষ্ট্যকে সর্বসাধারণের কাছেও প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপিত করেছিল। কলকাতা আর্ট স্কুলে পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জয়নুলের চিত্রকলা আধুনিকতার আবহে বাংলা জনজীবন ও শিল্পের ভাষাকে এক ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেছিল। মূলত গত শতকের চল্লিশের দশকে বাংলা আধুনিক চিত্রকলায় ক্ষয়িষ্ণু নব্যবঙ্গীয় চিত্রধারার বিপরীতে তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের পাশ্চাত্য আধুনিকতা চর্চার ঘূর্ণাবর্তে জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধের ভূমিকা পালন করেছিল। হৃদয়ে ও মননে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচারকে ধারণ করে তিনি বাংলার লোকায়ত চিত্রাঙ্গিকের মূল সূরকে বর্ণনা করলেন আধুনিকতার কাঠামোর মাঝে। সেদিক থেকে তাঁকে বলা যায় বাংলার চিরায়ত লোকশিল্পের আধুনিক রূপকার।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক কালান্তরের টালমাটাল সময়ে সমসাময়িক কলাবিশারদদের কাছে শিল্পী হিসেবে প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে জয়নুল আবেদিন বেশ কিছুটা বঞ্চিত হয়েছিলেন বলেই প্রতীয়মান। অথচ অগ্রজ সমসাময়িক বিনোদবিহারী বা রামকিংকরের কথা যদি বাদও দেওয়া যায়, তাঁরই সমসাময়িক পরিতোষ সেন, চিন্তামনি কররা শিল্প-সমালোকদের কাছে যে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন এর কানাকড়িও জয়নুলের ভাগ্যে জোটেনি। ১৯৪৬ সালে কলকাতা দাঙ্গার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এবং জয়নুল, সফিউদ্দীন, কামরুল, শফিকুল আমিন প্রমুখ শিল্পীর অংশগ্রহণে ‘মুসলিম শিল্পীদের শিল্পকলা প্রদর্শনী’ – সমসাময়িক সমালোচকদের কাছে এই শিল্পীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা যায়। জয়নুলের চিত্রকর জীবনের ক্রান্তিকালে অসময়োচিত ভারত বিভাজন আধুনিক বাংলা চিত্রকলায় তাঁর প্রাপ্য অবস্থানকে কক্ষচ্যুত করেছিল।

বাঙালির আধুনিক সংস্কৃতিতে জয়নুল আবেদিনের অবদান মানে ও মননে সুউচ্চ কৃতিত্বের দাবিদার। পরবর্তীকালে বিভক্ত বাংলায় সম্পূর্ণ অপ্রস্ত্তত একটি সমাজে শিল্প-আন্দোলন গড়তে গিয়ে শিল্পের কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। চারুকলার অনিশ্চিত অভিযাত্রায় শিল্পের পথে পথ ভেঙে এগিয়ে চলার নিরন্তর সাধনায় ব্যাপৃত থাকা তাঁর পক্ষে হয়তো সম্ভব হয়নি। কিন্তু এই অহল্যা ভূমিতে শিল্পকলার যে কর্ষিত ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করেছিলেন তিনি, ছয় দশকের পথচলায় তা আজ পত্রপল্লবে পুষ্পিত বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পকলার অবিসংবাদিত অগ্রদূত জয়নুল আবেদিন। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক জাগরণের রেনেসাঁস-মানব হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা চলে। জাগতিক জীবনের দুর্ভিক্ষ অাঁকতে গিয়ে জয়নুল শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। জীবন-সায়াহ্নে মানুষের রুচির দুর্ভিক্ষের কথা বলতে গিয়ে মূলত সামাজিক সংকট উত্তরণের পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। সৌন্দর্য একটি বিমূর্ত ধারণা হলেও মানুষের শুভাশুভ বিবেচনার নির্ণায়ক। ‘জয়নুল’ শব্দের অর্থের মাঝে সৌন্দর্যের মৌলিক চরিত্র বর্তমান। জন্মশতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে জয়নুল আবেদিন স্বনামেই দেশ-জাতি-শিল্পের কাছে সুন্দরের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

এই প্রজন্মের কাছে জয়নুল আবেদিনের পরিচয়, পাঠ্যপুস্তকে শিল্পাচার্য কে? কিংবা বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনের পথিকৃৎ কে? ইত্যাকার দু-একটি প্রশ্নের মাঝেই সীমাবদ্ধ। বেঙ্গল পাবলিকেশ্নস  প্রকাশিত সাশ্রয়ী মূল্যের সুদৃশ্য ও উন্নতমানের এ প্রকাশনা সেই অপূর্ণতা কিছুটা পূর্ণ করতে সমর্থ হবে বলে আশা করি। গ্রন্থের টেক্সটের রচনাশৈলী পাঠবিমুখ ডিজিটাল প্রজন্মের জন্য কিছুটা বাধার সৃষ্টি করলেও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে ছাপানো জয়নুলের চিত্রাবলি নিঃসন্দেহে সব শ্রেণির পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। r

 

মুক্তিযুদ্ধের দালিলিক উপন্যাস

গোলাম মুস্তাফা

একাত্তর

মোরশেদ শফিউল হাসান

মাওলা ব্রাদার্স

ঢাকা, ২০১৪

১৬০ টাকা

মোরশেদ শফিউল হাসান মূলত একজন গবেষক-প্রাবন্ধিক। একসময় কবিতাও লিখেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচনা করেছেন একটি উপন্যাস – একাত্তর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি মহাকাব্যিক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসের সংখ্যাও কম নয়, – কিন্তু এই ব্যাপ্ত ও বহুমাত্রিক জীবনাভিজ্ঞতা এখনো সর্বাংশে প্রতিফলিত হয়নি আমাদের কথাসাহিত্যে। এই কারণেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত যে-কোনো রচনাই আমরা আগ্রহের সঙ্গে পাঠ করি, অভিজ্ঞতার একটি নতুন দিকের সন্ধান পাওয়ার আশায়। মোরশেদ শফিউল হাসানের একাত্তরও সে-অভিজ্ঞতারই একটি দলিল। দলিল বলছি এই কারণে যে, মোরশেদ তাঁর উপন্যাসে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন চিন্তা ও মতাদর্শ উপস্থাপন করেছেন, নৈর্ব্যক্তিকভাবে।

একাত্তরের মার্চে হানাদার বাহিনীর কারাগারে বন্দি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের কর্মচারী হেলালউদ্দিন, তার প্রতিবেশী মুকতাদির, মুক্তিযোদ্ধাদের নদীপার করানোর অপরাধে ধৃত মাঝিসহ আরো কয়েকজনের ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসের সূচনা। হেলাল সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ছিল না, সাধারণ মানুষের মতোই মার্চের ঘটনাবলিতে সে উৎকণ্ঠিত হয়েছিল – পরিবারের, বিশেষত তার উঠতি বয়সের দুটি মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে। স্ত্রী নাসিমার পরামর্শে কন্যাদের নিরাপত্তার জন্য মামাশ্বশুরের শরণাপন্ন হয়েছিল। মামাশ্বশুর একসময়ের এমপিএ, এককালে মুসলিম লীগে ছিলেন, পরে যোগ দিয়েছেন পিডিপিতে। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তার দহরম। উৎকণ্ঠিত হেলাল-নাসিমার এই চিন্তা ও পরিকল্পনা অস্বাভাবিক ছিল না, সেই দুর্দিনে অনেকেই এরকম আত্মীয়ের আশ্রয়ে নিজের পরিবারকে নিরাপদ করতে চেয়েছে। না, মামাশ্বশুর তাদের নিরাশ করেননি। কিন্তু কথা প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেও ছাড়েননি। সংকটের জন্য দায়ী করেছেন শেখ মুজিবকে, তবে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধেই আক্রোশ ছিল বেশি : ‘মুজিবরে কি আজ থাইকা চিনি? একলগে মুসলিম লীগ করি নাই? চিরকালই হের মাথা গরম। তয় সে নাকি শেষমেশ একটা আপোষে আসতে চাইছিল। কিন্তু অর লগে তাজুদ্দিনও গায়রা ছিল, তারাই ইন্ডিয়ার পরামর্শমতো তা হইতে দেয় নাই। আল্লা মালুম! এখন তোগো জয় বাংলা কই গেল?’ মামাশ্বশুরের মতো অনেকেই ছিলেন এরকম মতাবলম্বী। ব্রিটিশ আমলে মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের অত্যাচারের কথা পুনরাবৃত্তি করাই তাদের রাজনৈতিক পুঁজি। ‘একদিকে বিরটিশ, অন্যদিকে গান্ধি-নেহরুর সঙ্গে টক্কর দিয়া পাকিস্তান আদায় করছেন’ বলে জিন্নাহ-লিয়াকতের প্রতি এদের মোহাচ্ছন্ন শ্রদ্ধা শেষ পর্যন্তও অটুট ছিল। বাংলা ভাষা এদের বিবেচনায় ‘হিন্দুগো ভাষা। সংস্কৃত থাইকা আইছে।’ তবে, পাকিস্তানিদের সব কাজেই এরকম নির্দ্বন্দ্ব সমর্থন ছিল না তাদের। দলের বিরুদ্ধাচরণের ভয়ে অ্যাসেম্বিলেতে বাংলার পক্ষে ভোট না দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলাকে অবহেলা করাকে মনঃপুত হয়নি তার, বায়ান্ন সালে ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাও মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে : ‘ভাবছি, মুসলমানের দেশ পাকিস্তান, সেখানে মুসলমান ছাত্ররা গুলি খাইল!’ তবে এসব দ্বিধা সত্ত্বেও মনেপ্রাণে তারা ছিলেন পাকিস্তানের অনুগত।

বন্দিশিবিরে পাকিস্তানি মেজর জাহাঙ্গীর ও ক্যাপ্টেন মহববত জানের বাঙালি বিদ্বেষের শিকার হয়েছে হেলালের মতো সকলেই। শুধু বাঙালি বলেই তারা অবিশ্বাসের পাত্র – বিশ্বাসঘাতক। জেরা করার সময় বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাদের ঘৃণা ও অবজ্ঞাও গোপন থাকেনি মেজর ও ক্যাপ্টেনের আচরণ এবং বক্তব্যে। দেশভাগের পর উত্তর ভারত থেকে আসা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোরেশি সাহেবও পাকিস্তানের অখন্ডতা চাইতেন, কিন্তু তার মনে সংশয় ছিল। তার স্থির ধারণা হয়েছিল, পাকিস্তান আর টিকবে না। এই কারণেই পঁচিশে মার্চের পর তাঁর পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। এর জন্য তিনি দায়ী করেছিলেন ভুট্টোকে। তাঁর বিবেচনায় ভুট্টো ‘সেল্ফ-সিকার, এমবিশাস, হারামকা পয়দা!’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য ভুট্টো পাকিস্তানের ক্ষতি করছে, এ-কথা তিনি বেশ জোরেশোরেই বলতেন প্রকাশ্যে, এপ্রিল মাসেও। অবাঙালি বলেই হয়তো এ-কথা বলার সাহস ছিল তাঁর। মুজিব ও বাঙালিদের সম্পর্কে কোরেশির বক্তব্য ছিল : ‘মুজিব হ্যাজ গট দ্য মেজরিটি, হোয়াই নট উই গেভ হিম দ্য পাওয়ার? হাউ লং হি কুড সাসটেইন ইট? বেঙ্গলিজ অলওয়েজ ফাইট এমঙ্গ দেমসেল্ভস। আলটিমেইটলি মার্শাল ল উড কাম। দে উড কল ইট।’ অবাঙালিদের মধ্যে জায়দির মতো সহানুভূতিশীল মানুষও ছিলেন। রাজনীতিসচেতন প্রবীণ আরেফিন সাহেবকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর পরিবারকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পারিবারিক বন্ধু অবাঙালি ব্যবসায়ী জায়দি। প্রথমদিকে বেশ খোঁজখবর নিতেন। আরেফিনকে সেনানিবাসে বন্দি করে রাখা হয়েছে, জেরা করা হচ্ছে, – এসব খবর পেয়েছিলেন। শেষে তিনিও আর আরেফিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না, এড়িয়েই চলতেন। একদিন কাতর কণ্ঠে আরেফিনের স্ত্রী আফরোজাকে বলেই ফেললেন, ‘বোঝেনই তো ওরা আর্মির লোক, ওরা যা বোঝে তাই সত্যি, ওদেরকে কিছু বোঝানো কঠিন।’ অনেকের মতোই আরেফিন সাহেবও আর ফিরে আসেননি।

এই আরেফিনের ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে পাকিস্তান পর্বের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ। এই উপন্যাসের এক উল্লেখযোগ্য অংশ আরেফিনের ডায়েরি। আরেফিন রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। রাজনৈতিক ঘটনাবলি তাঁর চিন্তানিরপেক্ষও নয়। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার উপস্থাপনায় তিনি বস্ত্তনিষ্ঠ। একসময় একটি ইংরেজি দৈনিকে চাকরি করতেন, কাজেই রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি তাঁর অভিনিবেশ ও উৎসাহ ছিল। তাঁর ডায়েরির পাতায় বাংলাদেশের ইতিহাস বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। মোরশেদও ইতিহাস-উদ্ঘাটনে আরেফিনের ডায়েরিকে অবলম্বন করেছেন। আরেফিন বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতায় বিস্মিত হয়েছেন। যুদ্ধের অনেক চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা তার ছিল। ব্যাটল অব স্ট্যালিনগ্রাদ, ক্রেনস আর ফ্লাইংয়ের মতো ছবিগুলো দেখে তার ধারণা হয়েছিল, যুদ্ধের কাহিনি মানেই বীরত্ব ও দেশপ্রেম। কিন্তু বর্বর ও পাকিস্তানিদের কাপুরুষোচিত বর্বরতায় যুদ্ধের উলটো পিঠ দেখা হয়েছে তার। মনে হয়েছে, ‘পাকিস্তানিরা কি এই যুদ্ধ দেশরক্ষার জন্য করিতেছে? এই দেশ কি আর তাহাদের আছে? তাহারা নিজেও কি তাহা মনে করে? কাহার বিরুদ্ধে তাহাদের যুদ্ধ? নিজ দেশবাসীর বিরুদ্ধে?’ এ-প্রসঙ্গে মোরশেদ, আরেফিনের জবানিতে, পাকিস্তানের বিচারপতি কায়েনির সেই বহুল প্রচারিত মন্তব্যটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘পাকিস্তানি আর্মিই একমাত্র যাহারা তাহাদের নিজ দেশ দখল করিয়াছে।’

আরেফিন বিস্মিত হয়েছেন মাহমুদ আলি কাসুরির ভূমিকায়। করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে কাসুরি বলেছিলেন, মুজিব  অনেকদিন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এর প্রমাণও আছে। মাহমুদ আলি কাসুরি তখন পিপলস পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান। একসময় ন্যাপ করতেন। কিছুদিন মিয়া ইফতেখার উদ্দিনের আজাদ পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বার্ট্রান্ড রাসেলের ভিয়েতনাম যুদ্ধ-ট্রাইব্যুনালের সদস্য ছিলেন। সবসময় গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল তাঁর। সেই কাসুরির এহেন ভূমিকায় বিস্মিত ও হতাশ আরেফিনের মন্তব্য : ‘তারিক আলীর কথা বাদ দিলে তিনিই ছিলেন ট্রাইব্যুনালে এশিয়া হইতে একমাত্র সদস্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন হইতে লেনিন নাকি স্ট্যালিন কি একটা শান্তি পুরস্কারও পাইয়াছেন। সেই তিনিই আজ কিনা পূর্ব পাকিস্তানে আর্মি অপারেশন, মাস কিলিংয়ের পক্ষে সাফাই গাহিতেছেন? তাহার মানে কি সবার উপরে পাঞ্জাবি ইন্টারেস্ট?’ আরেফিনের মনে পড়ে, ন্যাপ গঠনের সময় গাফফার খান পাঞ্জাবিদের সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু পাঞ্জাবি হয়েও মিয়া ইফতেখার উদ্দিন বাংলা ভাষার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, গণপরিষদে এই নিয়ে বাঙালি সদস্যদের মুখ খোলার আগেই। ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ভূমিকায়ও আরেফিন অবাক হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্বার্থচিন্তা কীভাবে মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে – এরকম আরো নজির আছে আরেফিনের জবানিতে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের অনেক দেশই জড়িয়ে পড়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে একজন মার্কিন সাংবাদিক সে-সময় প্রশ্ন করেছিলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত নাক গলাচ্ছে কেন? ইন্দিরা উত্তর দিয়েছিলেন, এটি এমন এক ‘অভ্যন্তরীণ সংকট’ যা বহু বিদেশি রাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর দিকে ইঙ্গিত করেই এই উত্তর দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো তৎকালীন পরাশক্তিদ্বয় ছাড়াও অনেক দেশই এই সংকটকালে উদ্বিগ্ন বা সক্রিয় না থেকে পারেনি। বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকার স্মৃতিও আবার আমাদের মনে করিয়ে দিলেন আরেফিন। এককালে মওলানা ভাসানীর অনুরাগী আরেফিন চীনের ভূমিকায় বিস্মিত হয়েছেন : ‘পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় চীন নাকি সর্ব উপায়ে পাকিস্তানকে সহায়তা করিবে। চীন সরকার নাকি ইয়াহিয়া খানকে এই মর্মে আশ্বাস দিয়াছে। পাকিস্তানের অখন্ডতা! কী হাস্যকর কথা! ইয়াহিয়া খানের মতো মাও, চৌ এন-লাইয়েরও কি বোধবুদ্ধি লোপ পাইয়াছে? পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটিতেছে তাহার কিছুই কি তাঁহারা অবগত নহেন?’ আরেফিনের মতো অনেকেই চীনের এ-ভূমিকায় বিস্মিত হয়েছিলেন তখন। বিশেষত চীনাধারার বামপন্থীদের জন্য সে ছিল এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন নিয়ে চীনাধারার রাজনীতিবিদগণ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন, পূর্ববাংলা তাঁদের বিবেচনায় ছিল উপনিবেশ। কেউ আবার একই সঙ্গে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পাশাপাশি জমিদার-জোতদার খতমের লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন। কারো মতে, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদই তখন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে উঠেছিল। অথচ চীনপন্থীদের কোনো কোনো দল সত্তর সালেই ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা’ প্রতিষ্ঠার ডাকও দিয়েছিলেন। চীনপন্থীদের মধ্যে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন, চীনের এই ভূমিকার কারণে তাঁরাও সন্দেহভাজনরূপে গণ্য হচ্ছিলেন। পরে অবশ্য অনেকেই ইয়াহিয়া খানকে লেখা পত্রটির একটি বাক্যের কথা উল্লেখ করে চীনের ভূমিকাকে কিছুটা সমর্থনও করার চেষ্টা করেছিলেন। চৌ এন-লাইয়ের চিঠিতে মুষ্টিমেয় দুষ্কৃতির কর্মকান্ডকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলার ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছিল। অবশ্য ‘মুষ্টিমেয় দুষ্কৃতি’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় দূর হয়নি। মোরশেদের একাত্তরে এসব প্রসঙ্গের কিছু কিছু উল্লেখ আছে। চীনের ভূমিকার কথা ভাবতে গিয়ে আরেফিন বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট নিয়েও ভেবেছেন। কম্বোডিয়ায় মার্কিনি সমর্থনে লনলন সিহানুক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নিন্দা করলেও লনলন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। আরেফিনের মনে এ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে : ‘সেদিন বলা হইয়াছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এ-ঘটনায় প্রমাণিত হইয়া গেল। এখন চীন সম্পর্কে কী বলা যাইবে?’ এই প্রসঙ্গে ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি এবং ট্রটস্কি-লেনিনের সংলাপের উল্লেখও আছে। হিটলারের আগ্রাসী ভূমিকা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েও জার্মানির সঙ্গে স্ট্যালিনের চুক্তি ও মলোটভ-রিবেন্ট্রপ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের ভাগাভাগি প্রসঙ্গও বাদ যায়নি। ইতিহাস কোথাও একক নজির সৃষ্টি করে না। ইতিহাসের পুনর্লিখন হয় বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশে – প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও। কিন্তু ইতিহাসের উদাহরণ আমরা সরাচর গ্রহণ করি না, কিংবা গ্রহণ করি নিজেদের স্বার্থ বিচার করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের সরণিতে আরেফিনের বিচরণ অসংগত মনে হয়নি।

হেলালের ভাই সোহেল রাজনীতি-সচেতন, ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। রাজনীতি নিয়ে সবদিকেই তখন উৎকণ্ঠা। ভবিষ্যতের গর্ভে কী আছে এ-ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নয়। নানা খবরে-গুজবে অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে। এরই মধ্যে চলছে প্রস্ত্ততি – উভয়পক্ষের। মার্চেই তার দল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে আসন্ন যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিয়েছিল। শোনা যাচ্ছিল, পাকিস্তানিরাও প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হলে বর্ষাকালে যাতে বিপন্ন হতে না হয় সেজন্য পাকিস্তানি সেনারা সাঁতার শিখছে – এমন কথাও বাতাসে ভাসছিল। ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যোগ দিয়ে গিয়েছিল তাঁর খালা আফরোজার বাসায়। আফরোজার স্বামী আরেফিন তাকে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের, রাজনীতির খবর জানতে চাইলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ডায়েরির প্রসঙ্গে রাজনীতিতে আরেফিনের উৎসাহের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সোহেলের সঙ্গেও কথা বললেন রাজনীতি নিয়েই। ভাসানীর অনুসারী হলেও ভাসানীর সহচরদের প্রতি তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা হয়ে ন্যাপ গঠন করাও তাঁর কাছে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের সুবিধাবাদিতায় অনেকটা সিনিকও হয়ে পড়েছেন। কমিউনিস্টদের ভূমিকা, বিশেষত তাদের মস্কো-পিকিংয়ের প্রতি আনুগত্য নিয়ে বিরক্তি প্রকাশও করলেন। এরকম সংকটের সময় ভাসানী-মুজিব এক থাকলে কত ভালো হতো সে-কথাও বোঝালেন সোহেলকে।

২৫ মার্চের রাত সোহেলকে আফরোজাদের বাড়িতেই কাটাতে হলো। পাকিস্তানিদের বর্বর অভিযান শুরু হয়ে গেছে সে-রাতেই। আতঙ্কে কেটেছে সারারাত, পরের দিনও কারফিউর কারণে বের হতে পারেনি। অবশ্য এই দুঃসময়ে আফরোজা-আরেফিনের কন্যা মিলি ছিল তার সঙ্গে। দুঃসময়েও পরস্পরের নৈকট্য হয়তো তাদের কাম্য ছিল। ২৭ তারিখে সোহেল বের হয়ে পাকিস্তানিদের ধ্বংসলীলা দেখল। রাস্তায়, জগন্নাথ হলে তখন হানাদারদের নৃশংসতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। সোহেলের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।

সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় গিয়েছিল সোহেল, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। আগরতলায় গিয়ে দেখল দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সমীকরণ সেখানেও আছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এবং অন্য দলের সাধারণ কর্মীরা যত সহজে এবং দ্রুত মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পেরেছে, সোহেলের মতো অন্য দলের চিহ্নিত নেতাকর্মীরা ততটা সহজে ঠাঁই পায়নি মুক্তিবাহিনীতে। সোহেল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিল। শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছিল তার রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রাখতে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব – কোনো দ্বন্দ্বই, সহজেই মীমাংসিত হয় না। পরিস্থিতি বদলায়, দ্বন্দ্বের চরিত্রও হয়তো সে-অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, কিন্তু দ্বন্দ্ব রয়েই যায়। মাও সে তুং যেমন বলেছিলেন : ‘কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা হলেও সমাজ নির্দ্বন্দ্ব হবে না। প্রমত্তা ইয়াংসির মতোই দ্বন্দ্বের প্রবাহ চলবে, ধরনটা হয়তো পালটাবে।’ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অনেক দ্বন্দ্বকে সাময়িকভাবে উহ্য রাখতে হয় – এই তত্ত্ব সবসময় কার্যকর হয় না।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়াও একরকম ছিল না। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মতে, যুদ্ধ হবে দীর্ঘস্থায়ী – ভিয়েতনামের মতো। সকলে এ-ব্যাপারে একমত ছিলেন না। অনেকেরই ধারণা ছিল, ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক মুনাফালাভের চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার অজুহাতে নকশাল-সিপিএমকে নির্মূল করার চেষ্টা করছেন। ভারতীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব ছায়া ফেলেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপরও। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল ভারতের জনগণ। কিন্তু সবাই সহানুভূতি জানানোর ব্যাপারে অতটা উদার ছিলেন না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তিক্ততা প্রকাশিত হয়েছে তাদের মনোভাবে, কথায়। বিধান চৌধুরী দেশ ছেড়েছিলেন অনেক আগেই। না, পাকিস্তানিদের অত্যাচারে নয়। তার গ্রামের রমজান শেখই তাকে, তার পরিবারকে, দেশত্যাগী করেছিল। তখন তাদের বলা হতো রিফিউজি – বাস্ত্তহারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন, তারা অভিহিত হলেন শরণার্থী নামে। নামকরণের এ-পার্থক্যের মধ্যে কি সহানুভূতি ও মর্যাদার তারতম্য ছিল? বিধান চৌধুরীর কাছে কোনো তফাৎ নেই এই দুইয়ের মধ্যে : ‘যার নাম লাউ তার নাম কদু।’ বিধান চৌধুরীরা যখন উদ্বাস্ত্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে, তখন তাদের ততটা সমাদরের সঙ্গে গ্রহণ করেনি কেউ। সে-কারণেই হয়তো বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয়দানের উৎসাহকে তার মনে হয়েছে ‘আদিখ্যেতা’। তাছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হলেই বা তার মতো দেশত্যাগীদের কোনো লাভ হবে কি? তার কথায় স্পষ্ট ক্ষোভ : ‘জয়বাংলা হইলে আমরার কী? ফেরত দিব নি আমরার জমি-ভিটা-পুকুর? তো হুদাই ফাল পারি ক্যান আমরা?’ বিধানের এই ক্ষোভ অকারণ বা অসমীচীন নয়। মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে এসব অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব ছিল। প্রতিটি মানুষই তার নিজের অবস্থান ও স্বার্থচিন্তা থেকেই যার যার ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে অনেকেই, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন। দেশের মুক্তিই ছিল তাদের স্বার্থ – এই স্বার্থের মধ্যে মহত্ত্ব ছিল। এমন মহৎ স্বার্থের যোদ্ধারা ছিলেন বলেই তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

অবরুদ্ধ দেশেও এই দ্বন্দ্ব চলেছে। কখনো রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে, কখনো নিজেকে নিরাপদ রাখার মানবিক দুর্বলতার জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও তখন মানুষের চিন্তা ও আচরণ ছিল নানা ধরনের। মার্চের শুরুতেই বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল দেশের প্রতিটি বাড়িতে, অফিসে-আদালতে। ২৬ মার্চেই সে-পতাকা নামানো শুরু হলো। অনেকে নামাতে চাননি, কিন্তু প্রতিবেশীদের চাপে নামাতে বাধ্য হয়েছেন। আরেফিনের পরিবারও পতাকা নামাতে চায়নি, কিন্তু তাদের ভাড়াটে আজমল সাহেবের পীড়াপীড়িতে শেষপর্যন্ত নামানো হলো পতাকা। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর জন্যও চাপ ছিল। অনেকে বাড়ির গেটে কলেমা লিখে রেখেছে; অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য লিখে রেখেছে ‘ইহা মুসলমানের বাড়ি’। এই কথা জেনে, সেই দুঃসময়েও আরেফিনের মনে কৌতুক উঁকি দিলো : ‘কী একটা কাজে একবার রথখোলার দিকে এক বাসায় যাইতে হইয়াছিল। বাসার গেটে টিনের প্লেটে লেখা ‘ইহা গৃহস্থ বাড়ি’ নাকি ‘ইহা ভদ্রলোকের বাড়ি’, এইরকম একটা কথা। বুঝিতে না পারিয়া সঙ্গীর দিকে তাকাইতেই সে বুঝাইয়া দিল, পাশেই নিষিদ্ধ পল্লী। কেহ ভুল করে, তাই এই ব্যবস্থা।’ এরকম কাজের ব্যাখ্যা একটাই – তখন অনেকেরই মনে হয়েছে, জান বাঁচানো ফরজ।

হেলাল বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়েছিল। বাসায় এসে দেখে কেউ নেই। বাড়িওয়ালা ততদিনে বাড়িটা অন্যজনকে ভাড়া দিয়ে ফেলেছে। পাকিস্তানিদের হাতে বন্দিজনের কাছে বাড়ি ভাড়া দিয়ে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। হেলাল স্ত্রী-পরিবারের সন্ধানে মামাশ্বশুরের কাছে গিয়েছিল। মামাশ্বশুর তখন উল্লসিত হয়ে শোনালেন : ‘এখন অবশ্য সিচুয়েশন নর্মাল, আর্মি সবকিছু কন্ট্রোলে আইনা ফেলছে। তারপরও মিস্ক্রিয়েন্টরা এখানে সেখানে দু-চারটা ফুটফাট করতাছে।’

হেলাল অবশ্য ‘মুক্তি’র স্বাদ বেশিদিন পায়নি। দেশের বাড়ি গিয়েছিল। ততদিনে শান্তি কমিটির প্রতিপত্তি শুরু হয়েছে। যুবক বয়সী অনেকেই রাজাকার হয়েছে। তারাই পাকিস্তানিদের হয়ে সন্দেহভাজনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানিরা এসে হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়েছে, স্কুলের শিক্ষক সুশীলবাবুকে হত্যা করেছে। স্ত্রী নাসিমাদের গ্রামে গিয়ে দেখল, সেখানকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকে ধরিয়ে দেননি। বরং পাকিস্তানিদের বুঝিয়েছেন, তাঁর গ্রামে কোনো মুক্তিবাহিনী নেই। এদিকটায় বরং মুক্তিবাহিনীরই প্রভাব ছিল বেশি। চেয়ারম্যান দূরদর্শী ছিলেন, নাকি ভেতরে ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি ছিল তাঁর? নাসিমাদের বাড়ি থেকে বাসে করে ফেরার পথেই      পাকিস্তানিদের তল্লাশির কবলে পড়ল হেলাল। আরো অনেকের সঙ্গে তাকেও ধরে প্রথমে মিলিটারি ক্যাম্পে, পরে নদীর ধারে নিয়ে গেল। সেই নদীর ধার থেকে ওর আর ফেরা হয়নি। গুলির শব্দ আর কুকুরের চিৎকারে সেই রাতের অন্ধকার ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল।

ভারতে সোহেলদের চলছিল গেরিলা প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শুরু করার আগেই ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ওরা যেন কোথাও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় না দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করছে –  পাকিস্তানিদের এ-প্রচারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতেই এ-সতর্কতা। নকশাল, নাগা ও মিজোদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকার পরামর্শ ছিল। প্রশিক্ষণ চলাকালে শিবিরের বাইরে গিয়ে স্থানীয়দের বিরূপতাও কিছুটা অনুভব করেছে সোহেল ও তার সহযোদ্ধারা। আসামে, মুর্শিদাবাদেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাবের কথা জেনেছে তারা। দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্নে সেই বিরূপতাও উপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল সোহেল ও তার সহযোদ্ধারা। শত্রু-অধিকৃত দেশে যোদ্ধার বেশে ঢুকতে কোনো দ্বিধা ছিল না তাদের। হোক শত্রু-অধিকৃত, তবু তো নিজেরই দেশ। দেশে ঢোকার সময় পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পুকুরের জলে লুকিয়ে থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করে। তারপর এগিয়ে যায় দেশকে মুক্ত করার সংকল্প নিয়ে। এগিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ে, চে গুয়েভারার সেই বিখ্যাত সিদ্ধান্ত : ‘আমার পায়ের কাছে ঔষধের ব্যাগ আর কার্তুজের একটা বাক্স। দুটো নেয়া আমার পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়, ভারী। আমি ঔষধের ব্যাগ ফেলে কার্তুজের বাক্স তুলে নিয়ে আখক্ষেতের দিকে হাঁটতে থাকি।’ সোহেলদের মনেও দ্বিধার জায়গা ছিল না। অবিচল সংকল্প ছিল তাদের, ব্যক্তিগত প্রয়োজন সেখানে তুচ্ছ হয়ে উঠেছিল, যুদ্ধের সরঞ্জামের চেয়ে আর কিছুই তাদের কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয়নি। স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো স্বপ্ন ছিল না তাদের।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, মোরশেদ উপন্যাসের কাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করেছেন। অনেকটা দালিলিক ইতিহাসের মতোই। উপন্যাস কতটা ইতিহাস হয়ে উঠবে এই নিয়ে বিতর্ক আছে। ইতিহাসের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ হয়তো উপন্যাসে প্রত্যাশিত নয়। ইতিহাসের পটভূমিতে মানবমনের চরিত্র উন্মোচনই হয়তো ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব। মোরশেদ এখানে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন বেশি। আরেফিন, হেলাল, মুক্তাদির, নাসিমা, মিলি, সোহেল যেন কাব্যের উপেক্ষিতার ঊর্মিলার মতোই কিছুটা অনাদৃত রয়ে গেছে। অথচ এই চরিত্রগুলো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। হেলালের মৃত্যুর পর নাসিমার কথা আমরা জানতে পারিনি, যেমন জানতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সীমান্ত পাড়ি দেওয়া সোহেলের জন্য মিলির উৎকণ্ঠার কথা। আফরোজার বেদনার গভীরতাও অজানা রয়ে গেল।

তবে এ-কথা মানতেই হবে, মোরশেদ শফিউল হাসান একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের ইতিহাস তুলে ধরেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, নিখুঁতভাবে। একাত্তরে প্রায় সকলেরই লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা; কিন্তু এক লক্ষ্যমুখী হয়েও             চিন্তা-মতাদর্শ ও কর্মপন্থার পার্থক্য ছিল। এটাই স্বাভাবিক। অযান্ত্রিক স্বভাবের জন্যই মানুষের চিন্তায় বিভিন্নতা দেখা দেয়। মোরশেদ রাজনৈতিক উপন্যাস রচনা করেছেন, কিন্তু মানব-স্বভাবের বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করেননি। রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিবরণেও তাঁর ব্যক্তিগত মতাদর্শ তাঁকে আচ্ছন্ন করেনি। মতাদর্শের যান্ত্রিকতা শিল্পকর্মের সাফল্যকে কীভাবে ক্ষুণ্ণ করে তার নজির বিরল নয়। মোরশেদ একটি বড় ক্যানভাস নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। কিন্তু ক্যানভাসের বিস্তারকে তিনি পুরোপুরি ব্যবহার করেননি। তাঁর উপন্যাসটি একটি মহাকাব্যিক ব্যাপ্তির ইঙ্গিতবহ। সেরকম ব্যাপ্ত পরিসরের উপন্যাস রচনার মতো পর্যবেক্ষণ ও ক্ষমতা তাঁর আছে, এ-উপন্যাসে তার প্রমাণ দুর্লক্ষ্য নয়। আমরা ধরে নিচ্ছি একটি মহাকাব্যিক পরিসরের উপন্যাস রচনার প্রস্ত্ততি পর্ব তাঁর একাত্তর, প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর মতো। একাত্তরের মধ্যে যে-সম্ভাবনা লক্ষিত হয়েছে, মোরশেদ তাকে পরিণতি দেবেন ভবিষ্যতে – এমন প্রত্যাশা করা খুব একটা অবিবেচনাপ্রসূত মনে হয় না। r

 

সাহিত্যের উপযুক্ত সংগত

 

হামিদুর রহমান

 

মৃত্যুর আগে জীবনের সংগীত

ফারুক মঈনউদ্দীন

 

অবসর

ঢাকা, ২০১৩

 

২২৫ টাকা

 

সাহিত্যবিষয়ক একটি প্রবন্ধের বইয়ের কাছে একজন পাঠকের প্রথম প্রত্যাশাটা কী থাকে? পাঠক চায় নতুন কোনো অবলোকন। প্রবন্ধকার হয় তাদের একজন নতুন কবি বা লেখককে উপস্থাপন করে দেখাক, যিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়েও রয়ে গেছেন অন্তরালে অথবা প্রবন্ধকার সাহিত্যচর্চার অনালোকিত কোনো দিগন্তের উন্মোচন করুন, যা আমাদের সাহিত্যের জগৎকে দেবে নতুন বৈশিষ্ট্য। এসব আলোকপাত না থাক একজন প্রবন্ধকার বহুলচর্চিত লেখককে নিয়েও যদি লেখেন, মূল্যায়নটা হতে হবে সুগভীর বিশ্লেষণে নতুন আলোক দিকসঞ্চারী। অর্থাৎ একটি প্রবন্ধগ্রন্থ সুস্পষ্টভাবে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেবে নতুন অভিজ্ঞতার সামনে, যাতে চিন্তার প্রবাহে তৈরি হয় নতুন তরঙ্গ। পাঠকের এসব প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকায় আমি মনে করি ফারুক মঈনউদ্দীনের প্রবন্ধের বই মৃত্যুর আগে জীবনের সংগীত অবশ্যই আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। এ-কারণে দাবি রাখে যে, ফারুক মঈনউদ্দীন অন্তত দুজন নতুন লেখককে এই বইয়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে তুলে ধরতে পেরেছেন। তাঁদের একজন মিসরীয় কথাসাহিত্যিক আলা আল আসওয়ানি, অন্যজন হাঙ্গেরির লোককবি সেন্দর পেতোফি।

নাগিব মাহফুজ ছাড়া সম্ভবত আমরা আর কোনো মিসরীয় কবি বা লেখকের নাম চট করে মনে করতে পারব না। নাগিব মাহফুজের নামও আমাদের কারো জানা থাকার কথা ছিল না, যদি তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ না করতেন। এটা বিশ্বসাহিত্যের জন্যই চরম ট্র্যাজেডির বিষয় যে, কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ লেখক তা নির্ধারিত হয় নোবেল পুরস্কার পাওয়া-না পাওয়ার ওপর। সুখের বিষয়, ফারুক মঈনউদ্দীন সে-পথে হাঁটেননি। তিনি কোনো নোবেল পাইয়ে লেখককে নিয়ে না লিখে লিখেছেন মিসরের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ লেখক আলা আল আসওয়ানি এবং তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ইমারাৎ ইয়াকুয়াবিন নিয়ে। এ-কথাটা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, মিসরের সঙ্গে কিছুটা হলেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক-সংস্কৃতির মিল রয়েছে। গণতন্ত্রের আড়ালে দুটি দেশেই সামরিকতন্ত্রের কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো আবার পরোক্ষ প্রভাব কাজ করে থাকে। সে-কারণেই দুটি দেশেই তৈরি হয়েছে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির। মিসরের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির কালোছায়া। লেখক আলা আল আসওয়ানির ভাষায় ‘কাপুরুষতা আর ভন্ডামি, প্রতারণা আর ধূর্ততা, শ্রমবিমুখতা আর বিদ্বেষ – এসবই আমাদের মিসরীয়দের বৈশিষ্ট্য।’

‘মিসরীয় সমাজবিকৃতির দলিল ইমারাৎ ইয়াকুবিয়ান’ শীর্ষক প্রবন্ধে আমরা ফারুক মঈনউদ্দীনের সুগভীর বিশ্লেষণ থেকে জেনে নিই তাঁর লেখক হয়ে-ওঠার প্রেক্ষাপট এবং প্রথম লেখা উপন্যাস ইসাম আবদ এল-আতির দলিলপত্রসহ বহুল আলোচিত উপন্যাস ইমারাৎ ইয়াকুবিয়ান বা ইয়াকুবিয়ান বিল্ডিং লেখার পটভূমি। আলা আল আসওয়ানি হলেন সে-জাতের লেখক, ফারুক মঈনউদ্দীন যাঁকে পরিচিত করে দিয়েছেন এভাবে – ‘১৯৮০ সালে আমেরিকা থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে আসার পর তিনি লেখালেখিতে পুরোপুরি নিয়োজিত হতে চেয়েছিলেন। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য তাঁকে ডাক্তারি পেশাটাও চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির অভিপ্রায়ে বাকি সময়টা তিনি সম্ভব-অসম্ভব সব ধরনের জায়গায়,  বিখ্যাত-কুখ্যাত বহু ঠেকে বিচরণ করতে থাকেন ব্যতিক্রমী কোনো চরিত্রের খোঁজে। যেসব চরিত্র তাঁকে আকর্ষণ করত, তাদের সঙ্গে বহু নিশীথ অভিযানে তিনি হয়তো সারারাত পার করে দিয়েছেন। তার পরদিন আবার চাকরিতে গেছেন। এভাবে তিনি ধনী-গরিব, অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ, দেউলিয়া রাজপুত্র, মদ্যপ, দাগি আসামি, স্খলিত মেয়েমানুষ, ধর্মান্ধ জঙ্গি, ঠগ, অপরাধী অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। এরকম একটি চরিত্র তাঁর মনে খুব দাগ কাটে, ত্রিগুণ মাহমুদ (ট্রিপল মাহমুদ)। তাঁর বাবা এবং দাদা উভয়েই মাহমুদ ছিলেন বলে তৃতীয় প্রজন্মের এই মাহমুদকে সবাই ‘ট্রিপল মাহমুদ’ নামেই ডাকত। এই চরিত্রটি দেখেই তিনি লেখেন ইসাম আবদ এল-আতির দলিলপত্র। মিসরীয় সমাজের দুর্নীতি, ভন্ডামি আর স্বেচ্ছাচারে হতাশ এক উচ্চশিক্ষিত যুবক ইসাম এটির মূল চরিত্র। একটা কাগজের রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট এক ব্যর্থ পেইন্টার ছিল তার বাবা। তাদের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর ব্যর্থতার দলিল এই ঔপন্যাসিকা।

রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রে অবস্থিত একটি দশতলা বিল্ডিং নিয়ে রচিত ইয়াকুবিয়ান বিল্ডিং উপন্যাসটির বহুমুখী চরিত্রবিন্যাসে যে ব্যতিক্রমী মানুষগুলোকে আমরা দেখতে পাই, তাদের তৎকালীন কায়রোর প্রকাশ্য ও গোপন জীবনযাত্রার প্রতিনিধি হিসেবে দক্ষভাবে উপস্থাপন করে আসওয়ানি তুলে ধরেছেন সেই সমাজের দুরাচার এবং অন্যায়ের নগ্নরূপ। আসওয়ানির এ-উপন্যাসে ধনী এবং নির্ধন বিভিন্ন চরিত্রের অদ্ভুত সংমিশ্রণে আধুনিক কায়রোর এক মর্মভেদী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।’

‘প্রেম, যুদ্ধ ও জীবন : কবি সেন্দর পেতোফি’ প্রবন্ধে তিনি হাঙ্গেরির স্বাধীনতার কবি সেন্দর পেতোফির জীবন এবং কর্মের সংক্ষিপ্ত চালচিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর কবিসত্তার অন্তর্মূলকে ছুঁয়ে দেখার প্রয়াস পেয়েছেন। পেতোফি একদিকে ছিলেন কবি, বিপ্লবী এবং প্রেমিক – যাঁকে বাদ দিয়ে হাঙ্গেরির সাহিত্য কিংবা ইতিহাস কোনোটাই সম্পূর্ণ হবে না। অতৃপ্ত ছিল তাঁর আত্মা। ছিলেন স্বল্পজীবী, প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রেই – সম্মুখ সমরে। ফারুক মঈনউদ্দীনের বর্ণনা থেকে সামান্য অংশ তুলে ধরা যাক, ‘কাব্যচর্চায় পারদর্শিতা দেখালেও পড়াশোনায় তাঁর আগ্রহ ছিল না মোটেও। একের পর এক খারাপ ফলাফলের কারণে ষোলো বছর বয়সে মোট আটটা স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছিল তাঁকে। তিনি যখন পড়শোনা ছেড়ে অভিনেতা হওয়ার বাসনা প্রকাশ করলেন, বাবা তাঁকে ত্যাজ্য করে দেন, ফলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় পেতোফির। তখন পথে পথে ঘুরে প্রায় অনাহারে-অর্ধাহারে তাঁর দিন কাটছিল।’ এই দুর্দিন কখনোই তাঁর পিছু ছাড়েনি। পার্কে শুয়ে শুয়ে তিনি রাত কাটাতেন। আর হ্যাঁ, প্রেমের প্রতি কবির দুর্বলতা ও পক্ষপাত ছিল দুর্দম। একজন সাচ্চা কবিকে একদম সঠিকভাবেই বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক।

আলা আল ইয়াকুবিয়ান, সেন্দর পেতোফি ছাড়াও এ-সংকলনে প্রবন্ধ রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ এবং হাসান আজিজুল হকের ওপর। এছাড়া রয়েছে মা-বিষয়ক তিনটি উপন্যাসের তুলনামূলক আলোচনা।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সম্ভবত বাংলা ভাষায় যারা লেখালেখির চর্চা করেন, কি কবিতায়, কি কথাসাহিত্যে, সমালোচনা সাহিত্য তো বটেই – মোটামুটি সবাই কিছু না কিছু হলেও লিখেছেন। ফারুক মঈনউদ্দীনও লিখেছেন। লেখারই কথা। কারণ, রবীন্দ্রসাহিত্যের এত গভীর ব্যাপ্তি যে, বিশাল এর পরিধি – কোনোদিনও তা নিঃশেষিত হওয়ার নয়। শতভাবে হাজারভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তাঁকে, তাঁর কর্মকে। ‘আফ্রিকা : সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে ফারুক মঈনউদ্দীনও রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনাকে নতুনভাবে বিশ্লেষায়িত করার চেষ্টা করেছেন। প্রবন্ধকার আমাদের অবহিত করেন, ‘১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রবীন্দ্রনাথ বিবেকের তাড়নায় লিখেছিলেন ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি। তখন তিনি জীবনসায়াহ্নে উপস্থিত। এটাই আফ্রিকা মহাদেশের ওপর তাঁর একমাত্র রচনা।’ ফারুক মঈনউদ্দীন কবিতাটিকে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের চেতনার স্বরূপ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আরো তথ্য যোগের মাধ্যমে তাঁর যুক্তি ও বক্তব্যকে সুদৃঢ় করতে পেরেছেন। সে-কারণেই পাশ্চাত্য বিশ্বের প্রতি রবীন্দ্রনাথের যে-পক্ষপাত ছিল, তার ভিত্তিমূলটি কোথায় সেটারও কারণ অনুসন্ধান ঘটেছে।

জীবনানন্দের প্রতি ফারুক মঈনউদ্দীনের যে বিশেষ অনুরাগ রয়েছে, সেটা আগেই প্রতিষ্ঠিত। তিনি ক্লিন্টন বি শেলির জীবনানন্দ দাশের জীবনী বাংলায় অনুবাদ করে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলের প্রশংসা কুড়াতে সমর্থ হয়েছেন। এ-প্রবন্ধের বইয়েও দেখিয়েছেন সেই রূপসী বাংলার কবির প্রতি ভালোবাসার গভীর পরাকাষ্ঠা। তিনি মোট পাঁচটি আলাদা লেখায় জীবনানন্দ দাশকে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে মূল্যায়ন করেছেন। ‘সেই আট বছর আগের একদিন’ শীর্ষক প্রবন্ধে কবিতার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুচিন্তার গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন, মৃত্যুর যে কত রূপ-প্রকৃতি, বিশেষ করে স্বেচ্ছামৃত্যুর স্বরূপ উন্মোচনে প্রবন্ধটি সমৃদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যোগ হওয়ায়। সেইসঙ্গে জীবনানন্দের মৃত্যুটিও কি স্বেচ্ছামৃত্যু? – তাঁর জীবন বিশ্লেষণ করে সে-মৃত্যুর প্রকৃতি খোঁজা হয়েছে। ‘মৃত্যুর আগে জীবনের সংগীত’ প্রবন্ধটিতেও জীবনানন্দ দাশের কবিতা এবং জীবন বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরেকটু ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে সেই মৃত্যুকেই খুঁড়ে খুঁড়ে দেখা হয়েছে। ‘আলোচিত ও বিতর্কিত ক্যাম্পে’ শীর্ষক প্রবন্ধে আছে কবিতা লিখতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশকে কতবার যে কত রকমভাবে বিড়ম্বিত হতে হয়েছে, তার আখ্যান। সন্দেহ নেই সে-কারণে প্রবন্ধটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া এ-প্রবন্ধে ক্যাম্পে কবিতার ভাব ও বিষয়বস্ত্তর বিশ্লেষণ কাব্যপ্রেমীদের দেবে বাড়তি খোরাক। ফারুক মঈনউদ্দীন কবি বলেই সম্ভব হয়েছে কবিতার ভাবের গভীরে ঢোকার এবং শব্দকে বাজিয়ে বাজিয়ে দেখার। যতদূর জানি, ফারুক মঈনউদ্দীন কবিতা দিয়েই শুরু করেছিলেন তাঁর লেখালেখি। পরে তাঁর অভিনিবেশ যুক্ত হয়েছে গল্প এবং প্রবন্ধে।

যাহোক, ‘প্রেম-অপ্রেম, দারিদ্রে্য ও দাম্পত্যে জীবনানন্দ’ এবং ‘মাল্যবান : আত্মজীবনের নৈকট্য বিচার’ এ দুটি প্রবন্ধ আমি মনে করি জীবনানন্দীয় পাঠকের অবশ্যপাঠ্য। প্রথম প্রবন্ধটিতে কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশ এবং জীবনানন্দ দাশের চরিত্র ও প্রকৃতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁদের চরিত্রের বৈপরীত্যের দিকটি যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশ যে কতটা নিঃসঙ্গ ছিলেন, সেটাও পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। এক বাসায় থেকেও প্রায় আলাদা জীবনযাপন করতেন দুজন। লাবণ্য দাশ বাস করতেন ওপরে, জীবনানন্দ নিচে – কোনোমতো একটা খুপরির মতো ঘরে। যে-কবির বেড়ে ওঠার কথা ভালোবাসার ছায়ায়, তাঁকে নিত্যরোজ শিকার হতে হয়েছে স্ত্রীর দ্বারা নানা রকমের মানসিক যন্ত্রণায়। শুধু যে অকথ্য-কুকথ্য ভাষার বকুনি শুনতেন, তাই নয়, সুন্দরী লাবণ্য দাশের কাছে আসতেন তার রূপের গুণগ্রাহীরাও। তাদের কেউ কেউ গভীর রাত পর্যন্ত কাটিয়ে যেতেন এ-বাড়িতে। কবির প্রতি লাবণ্য দাশের এই নির্মমতার দিকগুলিই আলোচিত হয়েছে ‘মাল্যবান : আত্মজীবনের নৈকট্য বিচার’ প্রবন্ধে। মাল্যবান জীবনানন্দ দাশের প্রথম উপন্যাস, যেটি প্রকাশিত হয়েছিল কবির মৃত্যুর সতেরো বছর পর। এর কারণ হলো, কবিপত্নী লাবণ্য দাশ কোনোভাবেই চাননি উপন্যাসটি প্রকাশিত হোক। কেন চাননি, তার কারণ জানা যায় কবির ভাই অশোকানন্দের ভাষ্য থেকে। তিনি সরাসরি জানিয়েছেন, মাল্যবান আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যেখানে জীবনানন্দ তাঁর অসুখী দাম্পত্যজীবনকেই তুলে ধরেছেন। এরকম নানা চমকপ্রদ তথ্য, মাল্যবান উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনার তুলনা আরোপ করে ফারুক মঈনউদ্দীন যে-সত্য উন্মোচন করেন, তাতে এটাই বেরিয়ে আসে, কবিদের পান করতে হয় কষ্টের তীব্র নীলদংশন।

সন্দেহ নেই যে, আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হলেন হাসান আজিজুল হক। তিনি এমন একজন গল্পকার যে, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কোনো গল্পকারই তাঁর প্রভাব এড়াতে পারেন না, অথবা পারলেও তাঁর ছায়া পরিবৃত থাকতে হয় অথবা নিতে হয় দূর থেকেই স্পন্দন। একজন গল্পকার হিসেবে ফারুক মঈনউদ্দীনও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তিনিও হাসান আজিজুল হকের গল্পের জগতে প্রবেশ করেছেন নিমগ্ন ধ্যানে। বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে তিনটি আলাদা প্রবন্ধে মূল্যায়ন করেছেন হাসান আজিজুল হকের গল্প।

‘হাসান আজিজুল হকের অদ্ভুত অাঁধার ভুবন’ প্রবন্ধের মূল্যায়নে সাধারণ এবং খেটে খাওয়া অথবা দুঃখের অগ্নিহোমে জারিত জীবনের প্রতি হাসানের শিল্পমানস অথবা শিল্পচৈতন্য যা-ই বলি, তা যে কতটা নিগূঢ়, সে-সত্যকে তুলে ধরতে পেরেছেন প্রবন্ধকার উদ্ধৃতি এবং যুক্তির সমাবেশে। তাঁর পর্যালোচনার সামান্য অংশ – ‘হাসান তাঁর গল্পের ভুবনে অন্ধকারকে সব সময় বিমূর্ত বর্ণনায় ভেসে যেতে দেন না, বরং অন্ধকারকে রূপকে বিশেষায়িত করে অাঁধারের ভিন্নতর দ্যোতনা নির্দিষ্ট করে দেন, যাতে পাঠক সহজেই সেই অন্ধকারের ভেতর প্রবেশ করে যেতে পারে। মধ্যবিত্ত জীবনের বিবর্ণ ও হতাশ প্রতিচ্ছবি, কদর্যতা ও নিরাভরণ নগ্নতা অন্ধকারের কালো গহবর আশ্রয় করে তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে এক বর্ণনাতীত সূক্ষ্মতায়।’

‘হাসান আজিজুল হকের অরমণীয় রমণীরা’ প্রবন্ধের শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় তাঁর গল্পের নারী-চরিত্রদের নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন প্রবন্ধকার। যে-গল্পকারের গল্পে জীবনের কঠিন সত্য এবং ক্ষতগুলো বেরিয়ে আসে, আক্ষরিক অর্থেই সে-পটভূমিকায় নারীর ভেতরের সেই নারী আর থাকে না, যা কোমলতায় মিহি, সেখানে নিত্যই ক্রন্দন।

‘হাসান আজিজুল হকের গল্পের ভূগোল’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে হাসানের গল্পের পটভূমি, স্থানকালপাত্রের ওপর বিশেষ স্পটলাইট ফেলা হয়েছে। সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, হাসান মূলত রাঢ়বঙ্গের গল্পকার, আসলে তিনি যে সমানভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভাষা ও জীবণাচরণ নিয়েও কাজ করেছেন, সেই সত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন। রাঢ়বঙ্গের গল্পকার হাসান আজিজুল হকের বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি তারাশংকর গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন, সে-পর্যবেক্ষণও মূল্যবান। তাঁর মূল্যায়নে হাসান কেবল রাঢ়বঙ্গের লেখক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেন না, ‘ঊষর রাঢ় বাংলার যে প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি হাসান দেখেছেন এবং যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গল্পে, সেখানকার দরিদ্র ও বঞ্চিত মানবগোষ্ঠীর নিরন্তর সংগ্রাম কেবল বাংলার এই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা পৃথিবীর সকল মানুষের জীবনগাথা হয়ে ওঠে।’

‘তিন জননীর উপাখ্যানে’ পার্ল এস বাকের মা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী এবং শওকত ওসমানের জননী – এই তিন উপন্যাসের মায়ের মধ্যে মিল-অমিল, কার কী বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির তুলনামূলক আলোচনা রয়েছে।

ফারুক মঈনউদ্দীন প্রথমত কবি, তারপর গল্পকার, অবশেষে প্রবন্ধকার। সে-কারণে তাঁর প্রবন্ধ পাঠে ক্লান্ত হতে হয় না। বরং, পাঠকের জন্য থাকে বেশ রসদ, যা পাঠে অভিজ্ঞতার ভান্ডার যেমন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, রসাস্বাদনও হয় সমানভাবে। তিনি প্রবন্ধক্ষেত্রে গুরুত্ব দিলে পাঠকেরই লাভ।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার