বব ডিলানের নোবেল প্রাইজ

লেখক:

আন্দালিব রাশদী

রিপ ভ্যান উইঙ্কলের ঘুম ভেঙেছে

প্রায় দুশো বছর আগে, ১৮১৯ সালে প্রকাশিত ওয়াশিংটন আরভিংয়ের গল্পের রিপ ভ্যান উইঙ্কলের কথা মনে পড়তেই পারে।

নোবেল লরিয়েট বব ভিলান বেশ তো ঘুমোচ্ছিলেন। ফোনের রিংটোন, দরজার কড়া নাড়ার শব্দ তাঁর ঘুম ভাঙাতে পারেনি।

ষোলো দিন পর ঘুম থেকে জেগে উঠে বললেন, পুরস্কার পেয়ে তিনি এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে, ‘স্পিচলেস’ – নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন।

২০১৬ সালের সাহিত্যের নোবেল প্রাইজ বব ডিলানকে দেওয়া ঠিক হয়েছে কিনা, তিনি আদৌ সাহিত্যিক কিনা – এ নিয়ে ঢের বিতর্ক হয়েছে।

বব ডিলান যখন পুরস্কার নিয়ে নিশ্চুপ, বিতর্ক আরেক দফা বাড়ল। তিনিও নিশ্চয় ১৯৬৪-এর নোবেল লরিয়েট জ্যঁ পল সার্ত্রের মতো পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করতে যাচ্ছেন। তাতে বেশ শিক্ষা হবে সুইডিশ অ্যাকাডেমির। মার্কিন লেখক সংঘের কেউ-কেউ সুর তুলেছেন, সংগীতশিল্পী বব ডিলান আপনি নোবেল পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করুন, এটি হবে সাহিত্যের জন্য আপনার সবচেয়ে বড় অবদান।

নোবেল পার্টির চেয়ে অনেক বেশি জৌলুসপূর্ণ পার্টি তিনি এড়াতে পেরেছেন। এটাও পারবেন।

কিন্তু নোবেল কমিটির সদস্য পার ওয়েস্টবার্গের মুখের গাল ‘দুর্বিনীত’ এবং ‘উদ্ধত’ শোনার পর সম্ভবত তাঁকে নতুন করে ভাবতে হয়েছে।

নোবেল কমিটির নতুন পার্মানেন্ট সেক্রেটারি সারা মারিয়া দ্যানিউস অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে নোবেল বিজয়ী বব ডিলানের নাম ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর তারুণ্যের নায়ক যে বব ডিলান তাও শুনিয়েছেন। তাঁর হাতে আমেরিকান সংগীতের ধারা বদলে গেছে – তাঁর গীতিকবিতা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

১৯৬০-উত্তর তরুণ প্রজন্মের প্রিয় ঈশ্বর বব ডিলান। তাঁর নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির যথার্থতার বিতর্কের বাইরে গিয়ে জাতিগতভাবে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা তাঁর কাছে ঋণগ্রস্ত, তিনি আমাদের যুদ্ধদিনের বন্ধু। ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশে’ বব ডিলানও গান গেয়েছেন। ফোক, বস্নুজ, রক, কান্ট্রি মিউজিক, গসপেল সং – এতকিছুর বিশাল ভা-ার বব ডিলান ছাড়া আর কারো নেই।

এই নিবন্ধটি মূলত বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তির বিতর্ক নিয়ে, পাশাপাশি তার কিছু স্মরণীয় কীর্তিও এখানে অনূদিত।

 

দুর্বিনীত ও উদ্ধত

ঈষৎ অপরিশীলিত ভাষায় বেশ স্পষ্টভাবেই বলে দেওয়া যায়, বব ডিলান সুইডিশ অ্যাকাডেমি কিংবা নোবেল কমিটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছেড়েছেন।

নোবেল প্রাইজ নিয়ে তিনি ভালো-মন্দ কোনো কথাই বলেননি। এমন নয় যে, বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। এ নিয়ে কথা না বলার সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বারবার টোকা দিয়েও সাড়া না পাওয়ায় নোবেল কর্তৃপক্ষ টোকা দেওয়া স্থগিত করেছে। কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য পার ওয়েস্টবার্গ (জন্ম ১৯৩৩, ১৯৯৭ থেকে নোবেল কমিটির সদস্য, আটটি কাব্যগ্রন্থ, ১১টি উপন্যাস, ১৯টি জীবনী ও আরো কিছু ননফিকশন গ্রন্থের লেখক) বব ডিলানের এই ইচ্ছাকৃত নীরবতাকে বলেছেন ‘ইমপোলাইট’ ও ‘অ্যারোগ্যান্ট’ – ‘দুর্বিনীত’ ও ‘উদ্ধত’। পার ওয়েস্টবার্গ সুইডেনের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক দগেন নিহিয়েতার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন রোডেশিয়া থেকে ন্যাদাইন গর্দিমারের সঙ্গে বহিষ্কৃত হন। তিনি যে ক্ষুব্ধ এ তো স্পষ্ট। জ্যঁ পল সার্ত্রে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন; কিন্তু নোবেল কমিটিকে এরকম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেননি।

 

বব ডিলান কেন নোবেল পাবেন, কিংবা পাবেন না?

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার ১৬ দিন আগে জিওফ্রে হাইমসের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নোবেল পুরস্কার কি বব ডিলানের প্রাপ্য?’

তখন পর্যন্ত লন্ডনের বেটিং এজেন্সি ল্যাডব্রোকের তালিকার শীর্ষে হারুকি মুরাকামি, তারপর গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, ফিলিপ রথ প্রমুখ। তালিকায় বব ডিলানও আছেন। তবে তাঁর নাম জয়েস ক্যারোল ওটস, অ্যামোস ওজের পেছনে; সমপঙ্ক্তিতে তাঁর সঙ্গে অবস্থান করছেন টমাস পিনশন এবং মিলান কুন্ডেরা। তবে বব ডিলান টম স্টপার্ড, করম্যাক ম্যাক্কার্থি এবং সালমান রুশদির ওপরে। আগের বছরগুলো বাজির তালিকায় তিনি আরো ওপরে থাকতেন – এবার পিছিয়ে পড়েছেন। ভক্তদের প্রশ্নটি হচ্ছে – ‘ডিলান নোবেল প্রাইজ পাবেন তো?’ কিন্তু জিওফ্রে হাইমস প্রশ্ন রেখেছেন – ‘নোবেল প্রাইজ কি বব ডিলানের প্রাপ্য?’

প্রশ্নটিকে আরো সুনির্দিষ্ট করে তিনি জিজ্ঞেস করেছেন : ‘কবি হিসেবে বব ডিলানের কি নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত?’

উত্তরও তিনি দিয়েছেন : অবশ্যই নয়।

বব ডিলানের লেখা গান পড়তে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু তা কি প্রতিযোগিতামূলক কবিতার অঙ্গনে কবিতা হিসেবে ঠাঁই পাওয়ার মতো?

হালে কবিতার জন্য যাঁরা নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন সিমাস হিনি, ডেরেক ওয়ালকট, টমাস ট্রান্সট্রোমার, বিসস্নাভা সিমবোরস্কা – বব ডিলান কি তাঁদের কাতারের কবি? তিনি আরো লিখেছেন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গদ্যকে ইতিহাস মনে করা যেমন অবিচার, বব ডিলানের পদ্যকে তেমনি কবিতা বিবেচনা করা অবিচার।

বব ডিলানের অধিকাংশ রচনা পাঠ করার জন্য লিখিত হয়নি। হয়েছে সুরসহযোগে বাদ্যযন্ত্রের সমর্থনে গেয়ে শোনানোর জন্য। তাহলে প্রশ্নটিকে নতুন করে সাজানো যায় : গানের গীতিকার হিসেবে বব ডিলানের কি নোবেল প্রাইজ প্রাপ্য?

ভিন্ন শিল্পপ্রকরণের সমর্থন ছাড়া লিরিকস যেমন গান হয়ে ওঠে না, ক্যামেরার কাজ ছাড়া টিভি নাটকের স্ক্রিপ্ট যেমন নাটক হয়ে ওঠে না – গীতিকার ও টিভি-নাট্যকারকে কবি ও  ঔপন্যাসিকের সঙ্গে বিবেচনা করা কতটা সমীচীন?

জিওফ্রে হাইমসের লেখা থেকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে : সুইডিশ অ্যাকাডেমি আগেই নজির স্থাপন করেছে, যা গীতিকার ও স্ক্রিপ্ট রাইটারের জন্য একটি দরজা খুলে দিয়েছে। হ্যারল্ড পিন্টার, ওলে সোয়েঙ্গা, স্যামুয়েল বেনেট, ইউজিন ও’নিল, জর্জ বার্নার্ড শ’সহ এগারোজন নাট্যকারকে নোবেল প্রাইজে সম্মানিত করা হয়েছে। নাটক যদিও পড়তে ভালো লাগে, এর সম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে তা অভিনীত হতে হয় দর্শক কিংবা ক্যামেরার সামনে।

পিন্টার যদি কথোপকথন রচনার জন্য সম্মানিত হতে পারেন – যা জীবন্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয় তাহলে গায়ক ও মিউজিশিয়ানদের মাধ্যমে গীত লিরিকসের জন্য বব ডিলান কেন সম্মানিত হবেন না? তাহলে উডি অ্যালেন বা চার্লি কাউফম্যান কেন প্রাইজ পাবেন না?

 

বব ডিলানকে নিয়ে স্কট কানিংহাম

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় স্কট কানিংহাম লিখছেন, বব ডিলানকে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়াটা মূর্খতা। কিন্তু তিনি তো বব ডিলানের ভক্ত। যখন মিডল স্কুলের ছাত্র (বয়স নয় থেকে ১৩-এর মধ্যে) ‘রেইনি ডে ওমেন’ গানটি দিয়ে বব ডিলানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁর বয়োসন্ধি দখল করে নিল শিল্পীর ‘ট্যাঙ্গলড আপ ইন বস্নু’। যখন তিনি যৌবরাজ্যে, ‘গার্ল ফ্রম দ্য নর্থ কান্ট্রি’ হয়ে উঠল তাঁর প্রিয় গান। তাহলে তিনি বব ডিলানের পুরস্কারপ্রাপ্তিতে অসন্তুষ্ট হবেন কেন?

তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সাহিত্য ও গান দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারা। বব ডিলান যদি বিংশ শতকের শিল্পীও হয়ে থাকেন তাতে কি গান সাহিত্য হয়ে যাবে? স্থাপত্যকর্মে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যে প্রিৎজসার পুরস্কার তাও কি বব ডিলানকে দেওয়া যাবে? নোবেলের দরজা তাহলে যাঁদের জন্য খুলে গেল তাঁদের মধ্যে থাকছেন ব্রম্নস স্পিঙ্গস্টিন, এডি ভেডার, কেইন ওয়েস্ট, টেলর সুইফট প্রমুখ।

বব ডিলানকে নয় কেন? তিনি তো সাহিত্যের পর্যাপ্ত উপাদান ব্যবহার ও কৌশল অবলম্বন করেন। গ্রিক ও রোমান সাহিত্য এবং ইংরেজি ব্যালাড থেকে মুঠো ভরে নিয়ে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করেছেন। তাঁর গানের পঙ্ক্তি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়েছে। কবিতাকে যদি গানে রূপান্তর করা যায় তাহলে গান সাহিত্য নয় কেন?

লেখকদের মধ্যে যাঁরা বব ডিলানের নোবেল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নোবেলটা তাঁদের কাছে আঙুর ফল টক।

নোবেল পুরস্কার হচ্ছে সাহিত্যের একটি ‘এলিটিস্ট রিকগনিশন’। বব ডিলানকে পুরস্কৃত করে এলিটকে উপেক্ষা করা হলো। কিন্তু পুরস্কারটি যদি হ্যারি পটারের জে.কে রাউলিংসকে দেওয়া হতো তাহলে তো একই অভিযোগ উঠত। জেমস প্যাটারসন, স্টিফেন কিং, স্টেফানি মেয়ার, ড্যানিয়েল স্টিল – পাঠকের ভোটের যদি শক্তি থাকে পুরস্কার তাঁদেরই পাওয়ার কথা।

সুইডিশ অ্যাকাডেমি গত বছর একজন সাংবাদিককে এবং এ-বছর একজন গায়ককে পুরস্কার দিয়ে কী সাহিত্যের ‘এলিটিসিজম’ গুঁড়িয়ে দিলো?

১৯৬০-এর দশকে তিনি ‘কাউন্টার-কালচারে’র প্রবক্তা হলেও ২০১৬-তে এসে তিনি সাদা কার্ডিগান পরা পুরুষ শিল্পীদের প্যাট্রন সেইন্ট – পৃষ্ঠপোষক সন্ত। অর্থাৎ বব ডিলান ক্রমেই চার্চের কয়ার এবং ধর্মসংগীতের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ষাটের দশকে যে প্রগতিশীল তারুণ্যের তিনি ছিলেন মুখপাত্র, ২০১০-এর দশকে তিনি পালটে গেছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন খ্রিষ্টীয় হুজুরদের মুখপাত্র। কাজেই সুইডিশ অ্যাকাডেমির জন্য বব ডিলানই ছিলেন সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ।

 

বব ডিলান কি শ্রেষ্ঠ গীতিকার?

কোনো সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর কালের শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও সুরকার। তাঁর নোবেল প্রাইজপ্রাপ্তির শতবর্ষ পরও রবীন্দ্রনাথের গানের আবেদনে তেমন ভাটা পড়েনি।

বব ডিলানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারা থাকতে পারেন? চাক বেরি, র‌্যান্ডি নিউম্যান, স্টেফেন সন্ডহেইম, কেতানো ভেলোমো, জনি মিশেল, জন প্রাইন, ব্রম্নস স্পিঙ্গস্টিন, পেট টাউনসেন্ড, ক্রিস ক্রিসেটাফার্সন – জিওফ্রে হাইম বলেছেন, নিঃসন্দেহে বব ডিলান তাঁদের সকলকে ছাড়িয়ে। তবে এটাও সত্য, তিনি লিরিকসের নামে প্রচুর বাজে লেখাও লিখেছেন।

লেখক আরভিন ওয়েলশ বলেছেন, তিনি বব ডিলানের ভক্ত; কিন্তু তাঁর নোবেল প্রাইজপ্রাপ্তি তিনি অনুমোদন করেন না।

 

‘জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কবি’

বব ডিলানের জনপ্রিয়তা, তরুণদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং পৃথিবীজোড়া ভক্তের সংখ্যা মাথায় রেখে তাঁর কাব্যবিচার করার অনেক ঝুঁকি। যেহেতু পুরস্কারটি সালমান রুশদির গোত্রীয় কোনো সাহিত্যিক পাননি, তিনি নিজের বব ডিলান শোনার স্মৃতি হাতড়ে বলে দিলেন, তাঁর মাথা সবার ওপরে। নোবেল কমিটি ঠিক কাজটিই করেছে।

১৯৯১ সালে কেভিন সিমনসনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সস্নটারহাউস ফাইভ উপন্যাসখ্যাত মার্কিন লেখক কুর্ট ভনেগাট বব ডিলান সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ‘জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কবি’। তিনি আরো বলেন, তাঁর গানে একটি করে ভালো পঙ্ক্তি পাওয়া যেতে পারে, বাকি সব অর্থহীন বকবকানি।

 

বব ডিলানের নোবেল প্রাইজ : ভালো দিক, মন্দ দিক

বব ডিলানকে দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙিক্ষত এ-সম্মানের ভালো দিক মন্দ দিকের একটি কৌতুককর তালিকা করেছেন অ্যাডাম ল্যাঙ্গার।

ভালো দিক –

১. বব ডিলানকে নোবেল পুরস্কার প্রদান মহান সাহিত্যের সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করেছে।

২. এটা ফিলিপ রথের নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনার বারোটা বাজিয়েছে।

৩. অন্তত একদিনের জন্য হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে হটিয়ে দিয়েছে।

৪. ‘হাভা নাগিলাহ’ গেয়েছেন এবং একই সঙ্গে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছেন – এমন একজন এই প্রথম নোবেল প্রাইজ পেলেন।

৫. তার মানে স্টিভেন সন্ডহেইম কিংবা প্যাট্টি স্মিথও নোবেল প্রাইজ পেতে পারেন।

৬. আমরা তারস্বরে ‘ইডিয়ট উইন্ড’, ‘সাবটেরেনিয়ান হোমসিক বস্নুজ’ কিংবা ‘পে ইন বস্নাড’ গাইতে পারব। যদি কেউ আপত্তি করেন, বলব আমরা মহান সাহিত্য গাইছি।

৭. নোবেল পুরস্কার কে পেয়েছেন? কেউ জিজ্ঞেস করবে না, কোন বব ডিলান?

 

মন্দ দিক –

১. এখনই নামকরা অধ্যাপকরা বব ডিলানের গ্রন্থ তারান্তুলা অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেবেন।

২. বব ডিলানকে দিয়ে যেহেতু ফ্লাডগেট খুলে গেল, প্রস্ত্ততি নেবেন ২০১৭ সালের জন্য লিওনার্দ কোহেন।

৩. ফেসবুকে বব ডিলানের বহু নিন্দামন্দ করা হবে, কেমন করে তিনি ফিলিপ রথ, জয়েস ক্যারোল ওটস বা হারুকি মুরাকামির কাছ থেকে প্রাইজটা ছিনিয়ে নিলেন।

৪. অন্য বছরগুলোতে যেমন প্যাট্রিক মোদিয়ানো কিংবা অ্যালিস মুনরোর বই কেনার জন্য সবাই বইয়ের দোকানে ছুটত – এবারের নোবেল বইয়ের বাজারের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।

৫. বব ডিলানের পরবর্তী ‘ডেজার্ড ট্রিপ’ শোগুলোতে টিকিটের দাম বেড়ে যাবে।

৬. ‘দ্য টাইমস দ্য আর অ্যা চেঞ্জিন’ কথা শুরুতে বা শেষে – এরকম হাজারো পা–ত্যপূর্ণ বচন সহ্য করতে হবে।

৭. নোবেল প্রাইজের মন্দ সংবাদটি তো পেয়েই গেলেন, কবিতা ও উপন্যাসের ব্যাপারে সুইডিশ অ্যাকাডেমি আগ্রহ হারিয়েছে (ভাগ্যিস নিজেদের কবি টমাস ট্রান্সট্রোমারকে পুরস্কারটি আগেই দিয়েছে)।

 

নয় লাখ ডলার প্রাইজমানি!

পুরস্কারকে যাঁরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকেন, তাঁরাও টাকাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

নোবেল কমিটির ওপর ভয়ানক ক্ষক্ষপ্ত বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইনও মূলত টাকার জন্য পুরস্কারটি নিয়েছেন। সে-সময়ে টাকাটার খুবই দরকার ছিল তাঁর। স্ত্রী তালাক দিচ্ছেন – স্ত্রীর খোরপোশ মিলিয়ে মোট সেটলমেন্ট মানি পরিশোধ করতে নোবেলের প্রায় পুরো টাকাটাই লেগে যায়।

পুরস্কারের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে। পুরস্কার বিজয়ীকে একটি ভাষণ দিতে হবে।

এ-পর্যন্ত যে-আলামত নির্বাক থেকে বব ডিলান দেখিয়েছেন, তাতে ১০ ডিসেম্বরের নোবেল পার্টিতে (১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের জন্মদিন) থাকবেন না বলেই মনে হচ্ছে। নোবেল কমিটির সদস্য বব ডিলানকে দুর্বিনীত ও উদ্ধত বলে গাল দেওয়ার পর বব ডিলানের সঙ্গে পুরস্কারদাতাদের সম্পর্ক আরো তিতকুটেই হওয়ার কথা।

অনিবার্য কারণ দেখিয়ে পুরস্কারের সঙ্গে লেজুড়ে শর্তযুক্ত ভাষণটি লিখে পাঠিয়ে দিলেও চলত। নতুন সহস্রাব্দে বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক ডোরিস লেসিং সুইডেনে হাজিরা দেননি।

বব ডিলান যদি ভাষণ না দেন – এর বদলে একটা কনসার্ট করে আসেন, তা হলেও কি চলে? নোবেল ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র জোনা পেটারসন বলেছেন : নোবেল বিজয়ী শিল্পী যেটা সুবিধাজনক মনে করেন আমরা সেরকম ব্যবস্থা করার কথাই ভাবব।

কিন্তু তিনি যদি সাড়া না-ই দেন, ২০১৬-এর পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার নামই উৎকীর্ণ থাকবে, কিন্তু টাকা মিলবে না।

নোবেল কমিটির একজন সদস্য ও স্থায়ী সচিব লার্স গাইলেনস্টেন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আর্থিক প্রয়োজনে জ্যঁ পল সার্ত্রের আইনজীবী সার্ত্রের জন্য নোবেল পুরস্কারের অর্থ চেয়ে ১৯৭৫ সালে কমিটিকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কমিটি তা প্রত্যাখ্যান করে। বক্তব্যটি বিতর্কিত এবং তা সার্ত্রের অবস্থানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জীবনের শেষ ষোলো বছর বইয়ের রয়্যালটির টাকায় প্যারিসের হোটেলে জীবন কাটিয়েছেন। আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্যে তিনি ছিলেন না। কেউ-কেউ মনে করেন, বিষয়টি বানোয়াট। জ্যঁ পল সার্ত্র যে-পত্রে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছেন, প্রাইজমানির বিষয়টিও শেষ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলেছেন : ‘সবশেষে আমি (পুরস্কারের) টাকার প্রশ্নে আসছি : নোবেল লরিয়েটের ওপর প্রশংসাবাক্যের সঙ্গে বিপুল অঙ্কের টাকা-পয়সার একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। এই সমস্যাটি আমাকে পীড়িত করেছে। টাকাসহ কেউ পুরস্কার কবুল করবেন, বিজয়ী যে ধরনের সংস্থা কিংবা আন্দোলনকে উপযুক্ত মনে করবেন, টাকা তাদের জন্য ব্যয় করবেন। আমার নিজের বেলায় লন্ডন অ্যাপার্টাইড কমিটি বর্ণবাদবিরোধী কমিটির কথা মনে হয়েছে। অথবা পুরস্কার মহত্তর নীতিগত কারণে প্রত্যাখ্যান করে যাদের অর্থের খুব প্রয়োজন, সে-ধরনের আন্দোলনকে বঞ্চিত করতে পারেন। তবে আমি বিশ্বাস করি, সমস্যাটি ভুয়া। স্পষ্টতই আমি আড়াই লাখ ক্রাউনের এই পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করছি কারণ পূর্বে কিংবা পশ্চিমে আমি প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত হতে চাই না। আড়াই লাখ ক্রাউনের জন্য কাউকে নীতি বিসর্জনের কথা বলা যায় না, যে-নীতি কেবল তারই অনুসৃত নয়, তার সহযোদ্ধারাও এ নীতির ভাগীদার।’

সার্ত্র যথার্থই বলেছেন, এ-পুরস্কার পাওয়া এবং প্রত্যাখ্যান করা দুটোই তাঁর জন্য মনোবেদনার কারণ হয়েছে।

নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় ১০ ডিসেম্বর রাজকীয় অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন কারণে নোবেল লরিয়েটদের কারো কারো এ-অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তারা ভাষণটি ডাকযোগে (এখন ই-মেইল) পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমরা কি বব ডিলানের চিঠির প্রতীক্ষায় আছি? আমরা চিঠির অপেক্ষাতেই থাকতাম, কিন্তু দেরিতে হলেও তাঁর ঘোর কেটেছে, তিনি সাড়া দিয়েছেন।

 

বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের বন্ধু বব ডিলান

১৯৬৬ সালেই বব ডিলানের রেকর্ড বিক্রির সংখ্যা দশ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। বব ডিলানের নাম ষাটের দশকেই এদেশের মানুষ শোনে। পরিচিতি আরো নিবিড় হয় ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনগুলোতে। ১ আগস্ট ১৯৭১ যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশে জর্জ হ্যারিসনের ডাক পেয়ে চলে এলেন বব ডিলান। প্রথমেই গাইলেন তাঁর ব্যান্ড প্রতিবাদের অ্যানথেম : বেস্নাইন ইন দ্য উইন্ড। তাঁর নিজের লেখা, নিজের সুরে স্বকণ্ঠে গাওয়া গানটি সাত বছর ধরে অবিরাম গীত হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার তরুণ কণ্ঠে। গানটি যখন লিখেন, বব ডিলানের বয়স একুশ। গানের একটি অনুচ্ছেদ :

কতগুলো রাসত্মা অবশ্যই পেরিয়ে এলে একজন মানুষ

তুমি তাকে মানুষ বলবে?

কতগুলো সমুদ্র অবশ্যই একটি সাদা ঘুঘুকে পাড়ি দিতে হয়

সৈকতে ঘুমে ঢলে পড়ার আগে

কামানের গোলা কতবার অবশ্যই ছুড়তে হয়

চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ হবার আগে?

বন্ধু আমার জবাব তোমার বাতাসে ভাসছে

বাতাসে ভাসছে জবাব।

সে-সময় কিছুকাল বব ডিলান লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন, জর্জ হ্যারিসন খানিকটা সন্দিহান ছিলেন তাঁকে নিয়ে।

তিনি আরো কয়েকটি গান করেছেন সেই ঐতিহাসিক কনসার্টে : জাস্ট লাইক অ্যা ওমেন, ইট টেইকস অ্যা লট টু লাফ, এ হার্ড রেইনস গননা ফল, মিস্টার টাম্বুরিনম্যান এবং লাভ মাইনাস জিরো।

 

বব ডিলানের হাতে যখন পেইন্টব্রাশ

বব ডিলানের গান গাওয়ার যে-দৃশ্যটি সবার স্মৃতিতে গাঁথা, তাতে মাথায় হ্যাট, পরনে স্মার্ট পোশাক, হাতে গিটার, মুখের ঠিক সামনে হার্মোনিকা, কণ্ঠে অননুকরণীয় সুর। বব ডিলানের হাতে আবার পেইন্টব্রাশ। উত্তাল ষাটের দশকেই তিনি ক্যানভাস খুঁজে নেন। ছবিকে নিয়ে আসেন গানে। এমনই একটি গান ‘যখন আমি আমার মাস্টারপিস আঁকি’ :

হায় রোমের রাসত্মা ভরে আছে ধ্বংসসত্মূপে

প্রাচীন পদচিহ্ন চারদিকে

মত্ততায় মনে হবে সবকিছু দুটো করে দেখছো

স্প্যানিশ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শীতল আঁধার রাতে

আমাকে দ্রম্নত হোটেল কক্ষক্ষ ফিরে যেতে হবে

বতিচেলিস্নর ভাগ্নির সাথে আমার ডেটিং

ঠিক করা আছে

ওখানে সে থাকবেই, আমার কাছে শপথ করেছে

যখন আমি মাস্টারপিস আঁকি।

বব ডিলান নিজের আঁকাআঁকি নিয়ে বলেছেন :

আমার অধিকাংশ ছবিই বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া। সত্যিকারের মানুষ, সত্যিকারের রাসত্মাঘাট, পর্দার অন্তরালের ছবি, জীবন্ত মডেল, পেইন্টিং, ফটোগ্রাফ স্থাপত্য থেকে আমার বিষয় তুলে নিই। আমি জটিল দৃশ্য, ল্যান্ডস্কেপ, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব ছবিতে তুলে আনতে চাই – বিভিন্ন মাধ্যমে আমি কাজগুলো করি। তাঁর আঁকা সেলফ পোর্ট্রেট একই নামের গানের অ্যালবামের প্রচ্ছদ হয়েছে। ‘সেস্না ট্রেন কামিং’ গানে যেমন এসেছে, এসেছে ছবিতে।

বব ডিলানের উলেস্নখযোগ্য পেইন্টিংয়ের মধ্যে রয়েছে : সাইডট্র্যাক, ম্যান অন দ্য ব্রিজ, টু সিস্টার্স, গ্রিনট্রেন ট্র্যাক, ওয়াগান মাস্টার, ওমেন ইন পিঙ্ক, বারবার শপ, ব্রাজিল সিরিজ, এশিয়া আফ্রিকা সিরিজ। জলরং, তেলরং, অ্যাক্রিলিক সব মাধ্যমেই বব ডিলান সিদ্ধহস্ত।

গান ও চিত্রশিল্পের একটি ঐক্য থাকতেই পারে। রবীন্দ্রনাথও সেই প্রমাণ দেন।

 

গান নিয়ে বব ডিলানের সাক্ষাৎকার

গান নিয়ে বব ডিলান খোলাখুলি কথা কমই বলেছেন। ১৬ মে ২০০৯ হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত বিল ফ্লানাগানের নেওয়া বব ডিলানের ব্যতিক্রমধর্মী সাক্ষাৎকারটি অনূদিত হচ্ছে। এটি বব ডিলানের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের পঞ্চম পর্ব। এই পর্বটি গান নিয়ে।

প্রশ্ন : সিনেমার জন্য আপনার লেখা ‘লাইফ ইজ হার্ড’ গানটির কথা বলেছেন, তা রুডি ভ্যালি (১৯০১-৮৬) কিংবা নেলসন এডির (১৯০১-৬৭) ব্যালাডের ধরনে রচিত। আপনি একটি গান যে শৈলী অনুসরণ করে শুরু করেন, গানের শেষ পর্যন্ত কি তা আঁকড়ে থাকেন?

বব ডিলান : অবশ্যই। আমি বিধান মেনে চলতে চেষ্টা করি। কখনো-কখনো আমি একই গানের ভেতর ধারা বদলাতে চেষ্টা করি। তারপরও কাঠামোর একটি বিধান তো আছে। আমি দুভাবেই চেষ্টা করি, দেখি কোনটা আমার গানের জন্য জুতসই হয়। আমার পরিধি তো সীমিত। কোনো-কোনো ফরমুলা খুব জটিল। আমি সেগুলোকে ঘাঁটাই না।

প্রশ্ন : রবার্ট হান্টারের সঙ্গে আপনি অনেক গান লিখেছেন।
এ- প্রক্রিয়া কেমন করে কাজ করে?

বব ডিলান : এর জন্য নির্ধারিত কোনো প্রক্রিয়া নেই। কাজটা করে ফেললেই হলো। আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, কখনো আপনি স্টিয়ারিং হুইলের পেছন থেকে সরে যাচ্ছেন, অন্য একজন এসে তা চালাচ্ছে।

প্রশ্ন : হান্টারকে আপনি নিশ্চয়ই অনেকদিন ধরে চেনেন। মনে পড়ে, কখন আপনাদের প্রথম দেখা?

বব ডিলান : ১৯৬২ কিংবা ১৯৬৩ সাল হবে। আমি তখন বে এরিয়ায় গাইতাম। তাঁর সঙ্গে আমার প্যালো অ্যালটো কিংবা বার্কলে কিংবা ওকল্যান্ডে দেখা হয়ে থাকতে পারে। আমি তখন ওসব জায়গায় গান গেয়ে বেড়াতাম। হান্টারও ওদিকেই ছিল।

প্রশ্ন : হান্টার কি জেরি গার্সিয়ার বস্নু গ্রাস ব্যান্ডে বাজাতেন না?

বব ডিলান : হ্যাঁ, বস্নু গ্রাস কিং ব্যান্ডে।

প্রশ্ন : ন্যাশভিলের গীতিকারদের সঙ্গে নিয়ে লেখার কথা কি কখনো ভেবেছেন?

বব ডিলান : না, কখনো ভাবিনি।

প্রশ্ন : নেইল ডায়মন্ড ন্যাশভিলের গীতিকারদের সঙ্গে গান লিখে অ্যালবাম বের করেছেন।

বব ডিলান : এটা তার জন্য জুতসই হয়েছে; কিন্তু আমার বেলায় এটা কাজ করবে বলে মনে করি না।

প্রশ্ন : আপনি মনে করছেন আপনার বেলায় কাজ করবে না?

বব ডিলান : ওসব বাদেই আমার বেশ হচ্ছে। গান লেখা নিয়ে আমার কোনো বাতিক নেই। হান্টারকে সঙ্গে নিয়েও লিখেছি। আমরা একই স্কুল থেকে উঠে এসেছি। কাজেই এর একটা নিজস্ব যুক্তি আছে।

প্রশ্ন : আপনি কি অনেক গান শোনেন?

বব ডিলান : হ্যাঁ, কখনো-কখনো।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় গীতিকার কারা?

বব ডিলান : আমি মনে করি (জিমি) বাফেট; আরো আছে (গর্ডন) লাইটফুট, র‌্যান্ডি (নিউম্যান), জন প্রিন, গাই ক্লার্ক –
এ-ধরনের গীতিকার।

প্রশ্ন : বাফেটের কোন গান আপনার পছন্দ?

বব ডিলান : ‘ডেথ অব অ্যান আনপপুলার পোয়েট’, আরো একটি আছে – ‘হি ওয়েন্ট টু প্যারিস’।

প্রশ্ন : আপনি আর লাইটফুট তো অনেকদিনের সঙ্গী?

বব ডিলান : আমি যতদিন ধরে আছি, গর্ডোও আছেন।

প্রশ্ন : তাঁর কোন গানগুলো আপনার প্রিয়?

বব ডিলান : ‘শ্যাডোজ’, ‘সান ডাউন’, ‘ইফ ইউ কুড রিড মাই মাইন্ড’। আমি পছন্দ করিনি তাঁর এমন কোনো গানের কথা মনে করতে পারছি না।

প্রশ্ন : জেভনকে চিনতেন?

বব ডিলান : তেমন ভালো করে নয়।

প্রশ্ন : তাঁর কী আপনার পছন্দ?

বব ডিলান : ‘লইয়ার্স, গানস অ্যান্ড মানি’, ‘বুম বুম মাঞ্চিনি’, ‘ডাউন হার্ড স্টাফ’, ‘জয়েন মি ইন এলএ’ ধরনের গান হৃদয়ছোঁয়া এবং সনাতন। সম্ভবত ক্ল্যাসিক্যাল প্রশিক্ষণ থাকার কারণে তাঁর গানের ধারা সর্বগামী। জেভনের একটা গানের ভেতর তিনটা গান থাকতে পারে – প্রতিটি অনায়াসে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। জেভন আসলে শিল্পীদের শিল্পী – নিবেদিত নির্যাতিত একজন। ‘ডেসপারেডো আন্ডার দ্য ইভস’ এরকম একটি গান, – সবকিছুই এতে আছে।

(ডেসপারেডোর একটি অনুচ্ছেদ :

আমি হলিউডে হাওয়াইয়ান হোটেলে বসেছিলাম

আমি আমার শূন্য কফি কাপের দিকে তাকিয়েছিলাম

আমি ভাবছিলাম, জিপসি তো আর মিথ্যে বলেনি

লস অ্যাঞ্জেলেসে সব নোনা মার্গারিতা

আমি সবই পান করতে যাচ্ছি।

 

মার্গারিতা : টেকিলা ও টক ফলের জুসের সমন্বয়ে প্রস্ত্তত পানীয়)

প্রশ্ন : র‌্যান্ডি নিউম্যান?

বব ডিলান : হ্যাঁ র‌্যান্ডি। তার ব্যাপারে কী বলতে পারেন? তাঁর প্রথম দিকের গান ‘সেইল অ্যাওয়ে’, ‘বার্ন ডাউন দ্য কর্নফিল্ড’, ‘লুইজিয়ানা’ আমার পছন্দের; তখন গানগুলোকে সহজ রাখতেন। বরদেনো সঙ্গস। আমি তাকে ক্রাউন প্রিন্স ভাবতাম, জেলি রোল মর্টনের উত্তরাধিকারী। তাঁর শৈলী প্রতারণামূলক। তিনি এমনভাবে বলেন, তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলেছেন তা মনে থাকে না। র‌্যান্ডিও আমার মতো ভিন্ন এক যুগের সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছেন।

প্রশ্ন : জন প্রিন?

বব ডিলান : প্রিন যা লেখেন সব বিশুদ্ধ প্রম্নসত্মীয় (Proustian) অসিত্মত্ববাদ। একেবারে অসীম পর্যন্ত মিডওয়েস্টার্ন মনঃসফর। তিনি চমৎকার গান লিখেন। যখন ক্রিস ক্রিস্টোফারসন প্রথম তাঁকে মঞ্চে নিয়ে আসেন আমার মনে আছে, ‘স্যাম স্টোন’, ‘ডোনান্ড অ্যান্ড লিডিয়া’ দশ মাইল দূরের মানুষকেও মুগ্ধ করে। প্রিন ছাড়া আর কেউ এরকম গান লিখতে পারেন না। আমাকে যদি একটি গান বেছে নিতে বলা হয় আমি নেব ‘লেইক মারি’, গানটা কোন অ্যালবামের আমার মনে নেই।

প্রশ্ন : আপনার প্রজন্মের অনেকেই স্মৃতিকাতরতা নিয়ে ব্যস্ত। তারা একই গান একইভাবে ৩০ বছর ধরে গাইছেন। কিন্তু আপনি কখনো তা করছেন না কেন?

বব ডিলান : আমি যদি চেষ্টা করতাম তবু পারতাম না। আপনি যাদের কথা বলছেন তাদের সবারই দেখাবার মতো হিট করা গান আছে। তাদের শুরুটা ছিল প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা দিয়ে আর এখন তারাই পৃথিবীর অধিকর্তা হয়ে গেছেন। উদ্যাপনের গান, উদ্যাপিত হওয়ার মতো গান, গ্র্যান্ড ডিনার পার্টির গান – সবই তাদের। মূলধারার গান সংস্কৃতিতে সর্বব্যাপী প্রভাব বিসত্মার করে। আমার গান তাদের গানের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। আমারগুলো আরো মরিয়া হয়ে ওঠা গান। (রোজার) ড্যালট্রে, (পেট) টাউনশেন্ড, (পল) ম্যাককার্টনি, দ্য বিচ বয়েজ, এলটন (জন), বিলি জোয়েল – তাঁরা বিশুদ্ধভাবে গেয়ে নিখুঁত রেকর্ড করিয়েছেন। তাঁদের তাই নিখুঁতভাবেই গাইতে হয়, যেভাবে মানুষ তাঁদের গান মনে রেখেছে সেভাবেই। আমার গানের রেকর্ড কখনো নিখুঁত হয়নি। কাজেই এর ডুপিস্নকেট করে লাভ নেই। সে যাই হোক, আমি মূলধারার শিল্পী নই।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কোন ধারার শিল্পী?

বব ডিলান : আমি নিশ্চিত নই। হতে পারে আমি বায়রনীয় ধারার একজন (বায়রনেস্ক)। দেখুন, আমি যখন গান গাইতে শুরু করি তখন মূলধারার সংস্কৃতি মানে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পেরি কোমো, অ্যান্ডি উইলিয়ামস, সাউন্ড অব মিউজিক। সেখানে আমার গান খাপ খায়নি, এখনো আমার গান জুতসই হয় না। আমার কিছু গান
এ-বাধা ডিঙিয়ে গেছে; কিন্তু অন্য শিল্পীরা সে-গানগুলো গেয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে মূলধারায় ফেলতে চেষ্টা করেছেন?

বব ডিলান : সত্যি বলতে কী, তা করিনি। আমি উঠে এসেছি সংগীতের লোকধারা থেকে। এটা স্থানীয় – এর নান্দনিক সৌন্দর্য ও দেশীয় রূপ উপভোগের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। লোকগানের চলৎশক্তি ও গতিময়তা এখানেই। আমি চেষ্টা করলেও ব্রিল বিল্ডিংয়ের (রক এন রোলের হল অব ফেম এখানে) জন্য গান লিখতে পারব না। পপ গানের নামে যা চলে এসেছে তা আমি তখনো করতে পারিনি, এখনো পারি না।

প্রশ্ন : তার মানে কি এই যে, আপনি ‘আউটসাইড আর্ট’ সৃষ্টি করে চলেছেন? আপনি কি নিজেকে ‘কাল্ট ফিগার’ মনে করেন?

বব ডিলান : কাল্ট ফিগার বললে এর একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে যায়। কাল্ট শুনলে এটাকে মনে হয় গোত্রীয় ধরনের এবং তা দলাদলির ক্ষক্ষত্র। মানুষের আবেগের বিভিন্ন ধরনের স্তর রয়েছে, বিশেষ করে মানুষ যখন তরুণ। পেছন ফিরে মনে হয় আমার অধিকাংশ প্রভাব ক্ষ্যাপাটে ধরনের। গণমাধ্যম আমার কাছে তেমন পৌঁছাতে পারেনি। আমি পাশ কাটিয়ে যাওয়া ট্র্যাভেলিং পারফরমারদের দিকে আকৃষ্ট হই। সাইড শো পারফরমার – যেমন বস্নু গ্রাস সিঙ্গার, বস্ন্যাক কাউবয় হাতে ফাঁসের দড়ি এবং দড়ির জাদু। মিস ইউরোপ, কোয়াসিমোদো, দ্য বিয়ার্ডেড লেডি, অর্ধেক নারী অর্ধেক নর। এটলাস দ্য ডোয়ার্ফ, দ্য ফায়ার ইটার্স, টিচার্স অ্যান্ড প্রিচার্স, বস্নু সিঙ্গারস, ডিফর্মড অ্যান্ড বেন্ট – কত কিছু। আমার মনে হয়, এ যেন গতকালের ঘটনা। আমি তাঁদের অনেকের সঙ্গে মিশেছি, তাঁদের কাছে আত্মমর্যাদার বিষয়টি শিখেছি। এবং স্বাধীন হওয়াও। মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার – এসব বিষয়ও। শিখেছি কেমন করে নিজেকে নিজের মধ্যে আবদ্ধ রাখা যায়। প্রায় সবাই চড়ে বসেছে। ঘূর্ণিপাকের দিকে ঝুঁকেছে, রোলার কোস্টারে আসন নিয়েছে। আমার কাছে এসব দুঃস্বপ্নের মতো। এসব মাথা ঘুরিয়ে দেয়। এসব কৃত্রিম জীবনের ওপর বড় হাতলওয়ালা ভারী হাতুড়ি। আমার কাছে এসবের কোনো মানে নেই। এগুলো সত্যি মনে হয়নি। বড় রাসত্মায় নেমে যা কিছু পেয়েছি তাতেই বাস্তবতার শক্তি – তা আমাকে অন্তত এভাবেই স্পর্শ করেছে। আমি যখন বাড়ি ফিরে আসি সেই অনুভূতিগুলো অপরিবর্তিত থেকে যায়।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনার তো দশ কোটির বেশি রেকর্ড বিক্রি হয়েছে।

বব ডিলান : হ্যাঁ, আমি জানি। এটা আমার কাছেও রহস্যজনক মনে হয়।

 

পাদটীকা : ১১ মার্চ, ১৯৬২ সিনথিয়া গুডিংকে দেওয়া একটি বেতার সাক্ষাৎকারে বব ডিলান বলেছিলেন – ‘আমি কখনো বিখ্যাত হবো না’। সে-সময় বব ডিলানকে নিয়ে ‘আমি কখনো বিখ্যাত হবো না’ ক্যাপশনে নিচের কার্টুনটি প্রকাশিত হয়েছিল।

 

ম্যাগির খামার

ম্যাগিস ফার্ম – ম্যাগির ফার্ম বব ডিলানের লেখা জনপ্রিয় একটি গান। ১৫ জানুয়ারি ১৯৬৫ গানটি রেকর্ড করা হয়। তারপর অনেক খ্যাতিমান শিল্পী গানটি গেয়েছেন। একটি প্রতিবাদের গান। এটি শ্রমিকজীবনের একটি চরম তিক্ততার গল্প। বব ডিলানের ‘ব্রিংগিং ইট অল ব্যাক হোম’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত। এ-অ্যালবাম অবমুক্ত হয় ২২ মার্চ ১৯৬৫-তে। গানটি সিঙ্গল হিসেবে ব্রিটেনের বাজারে আসে ৪ জুন ১৯৬৫-তে। সে-বছরের নিউপোর্ট লোকসংগীত উৎসবে ইলেকট্রিক গিটারে গানটি গাইছিলেন। পিউরিট্যান
শ্রোতৃম-লীর কেউ-কেউ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন – বব ডিলানের হাতে লোকগানের চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সেই সুরই তরুণরা লুফে নিল। গানটি অনূদিত হলো :

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না

না, আর কখনো ম্যাগির খামারে কাজ করতে যাবো না

আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি

আমার হাত ভাঁজ করে বৃষ্টির প্রার্থনা করি

আমার মাথাভর্তি কত পরিকল্পনা

সব আমাকে পাগল করে তুলছে

কী লজ্জার, ম্যাগি আমাকে দিয়ে যেভাবে মেঝে ঘষায়

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না।

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না

ম্যাগির ভাইয়ের জন্য আমি আর কাজ করতে যাবো না

সে তোমাকে একটা কানাকড়ি দেয়

সে তোমাকে দেয় একটি দশ সেন্টের মুদ্রা

তারপর দেঁতো হেসে জিজ্ঞেস করে,

তোমার সময়টা ভালো কাটছে তো?

তারপর যতবার তুমি দরজা বন্ধ কর ততবার বেতন কাটে

ম্যাগির ভাইয়ের জন্য আমি আর কাজ করতে যাবো না।

 

ম্যাগির বাবার জন্য আমি আর কাজ করতে যাবো না

না, ম্যাগির বাবার জন্য আর কাজ করতে যাবো না

অকারণে সে তোমার মুখের উপর

সিগার ছুড়ে মারে

তার বেডরুমের জানালা

ইটের তৈরি

তার দরজায় প্রহরা দেয় ন্যাশনাল গার্ড

ম্যাগির বাবার জন্য আমি আর কাজ করতে যাব না।

 

ম্যাগির মায়ের জন্য আমি আর কাজ করতে যাবো না

না, ম্যাগির মায়ের জন্য আর কাজ করতে যাবো না

সে সব চাকরবাকরের সঙ্গে

মানুষ, ঈশ্বর ও আইন নিয়ে কথা বলে

সবাই জানে

ম্যাগির বাবার কুবুদ্ধিদাতা সে।

তার বয়স আটষট্টি, কিন্তু সে বলে চুয়ান্ন

ম্যাগির মায়ের জন্য আমি আর কাজ করতে যাবো না।

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না

আমি যেমন আছি তেমন থাকতে

আপ্রাণ চেষ্টা করি

কিন্তু সবাই চায় তুমি

তুমি তাদের মতো হয়ে যাও

তারা বলে যখন ক্রীতদাসের কাজ করো তখন গান গাও

আমি বিরক্ত হই

ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাবো না।

বব ডিলানের লেখা এই গানটিতে ম্যাগির ‘খামার’, ম্যাগির মায়ের কণ্ঠে ‘মানুষ, ঈশ্বর ও আইনের কথা’ এবং ম্যাগির বাবার দরজায় ‘ন্যাশনাল গার্ড’কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যথাক্রমে ধনবাদী শোষণ, বর্ণবাদ এবং রাষ্ট্রীয় অত্যাচার হিসেবে। কেউ-কেউ ম্যাগির খামারকে সামরিক শিল্প-কারখানা হিসেবে দেখেছেন আর তারুণ্যের জন্য ডিলানের গানে রয়েছে এ-সমাজকে প্রত্যাখ্যানের আহবান – ‘ম্যাগির খামারে আমি আর কাজ করতে যাব না’।

১৯৬৫ সালে নিউপোর্ট লোকসংগীত উৎসবে এ-গানটি দিয়েই ‘বব ডিলান কন্ট্রোভার্সি’র সূচনা। কণ্ঠশিল্পী পিট সিগারকে মনে করা হয় অ্যাকাউস্টিক গিটারের বদলে ইলেকট্রিক গিটার ব্যবহারের প্রধান প্রতিবাদকারী। অনেক বছর পর পিট সিগার বলেন, তিনি বব ডিলানের ইলেকট্রিক গিটার ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন না। কিন্তু নিউপোর্ট উৎসবের তিনিই ছিলেন ‘মাস্টার অব সিরিমনি’, মাইক্রোফোন ঠিকভাবে কাজ না করায় বব ডিলানের কণ্ঠ বিকৃত শোনাচ্ছিল, তিনি তখন চেঁচিয়ে বললেন, সাউন্ড ঠিক করো, বাজে শোনাচ্ছে, কিন্তু শিল্পী তাঁর কথা আমলে নিতে চাননি। বরং বলেছেন, তরুণরা এরকম কণ্ঠই পছন্দ করে।

এভাবেই একসময় ‘বব ডিলান কন্ট্রোভার্সি’ তাঁর গানের সঙ্গে মিশে যায়।

তুমি এখন বড় মেয়ে হয়ে গেছ

আমাদের কথোপকথন সংক্ষক্ষপ্ত ও মধুর

এতে আমার পা আর মাটিতে পড়েনি

আমি বৃষ্টিতে ফিরে এসেছি ও? ও?

তুমি আছো শুকনো মাটিতে

তুমি কোনোভাবে সেখানে পৌঁছে গেছো

তুমি এখন বড় মেয়ে হয়ে গেছো।

 

দিগমেত্মর পাখি সীমানা-বেড়ায় বসে

নিজে যেচে আমার জন্য গান গায়

আর আমি সেই পাখিটার মতো ও? ও?

শুধু তোমার জন্য তার গান গেয়ে যাই

আমি আশা করি তুমি শুনতে পাচ্ছো

এইসব অশ্রম্নর ভেতর দিয়ে আমার গান।

 

সময় জেট পেস্নন বড্ড দ্রম্নত চলে

আমরা যা ভাগাভাগি করে নিয়েছি যদি না টেকে

কী দুঃখের ব্যাপার

আমি বদলে যেতে পারি, কসম, ওহ্ ওহ্

দেখো তুমি কি করতে পারো

আমি যদি পারি

তুমিও তা পারবে।

প্রেম এত সহজ একটি কথায় প্রকাশ

তুমি সব সময়ই তা জানতে, আমি শিখছি এখন

আমি জানি এখন তোমায় কোথায় পাবো হো হো

অন্য কারো রুমে

এই মূল্যটা আমাকে দিতে হয়েছে

এতদিনে তুমি অনেক বড় মেয়ে হয়ে গেছো।

 

আবহাওয়ায় পরিবর্তন চরম হয়ে থাকে

কিন্তু মধ্যস্রোতে ঘোড়া বদলের কী মানে

আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি হো হো

আমার হৃৎপি– কর্কস্ক্রুর মতো সে-যন্ত্রণা

থামছে আবার শুরু হচ্ছে

যখন আমাদের বিচ্ছেদ হয় তখন থেকেই।

 

 

মৃত্যুই শেষ নয়

যখন তুমি দুঃখী আর যখন তুমি নিঃসঙ্গ

এবং তোমার কোনো বন্ধু নেই

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

পবিত্র বলে যা কিছু তুমি আঁকড়ে রেখেছিলে

নিচে পড়ে যায়, মেরামতের যোগ্য থাকে না

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

শেষ নয়, শেষ নয়…

 

যখন তুমি দুই রাসত্মার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে

যা তোমার বোধগম্য নয়

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

তোমার সব স্বপ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে

বাঁকের ওপাশে কী তোমার জানা নেই

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়…

 

যখন ঘূর্ণিমেঘ তোমাকে ঘিরে ধরে

নেমে আসে ভারী বৃষ্টি

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

তোমাকে সান্তবনা দিতে এখানে কেউ নেই

নেই কোনো সাহায্যের বাড়ানো হাত

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়…

 

জীবনের বৃক্ষ বেড়ে ওঠে

যেখানে আত্মার মৃত্যু নেই

আর মুক্তির উজ্জ্বল আলো ঝলকায়

অন্ধকারে এবং শূন্য আকাশে

শহরগুলোতে যখন আগুন জ্বলছে

মানুষের পোড়া মাংসের সাথে

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

আইন মানা একজন নাগরিক খুঁজে পেতে

বৃথাই তোমার অনুসন্ধান

শুধু মনে রেখো মৃত্যুই শেষ নয়

শেষ নয়, শেষ নয়…

 

 

নিয়তির সরল একটি বাঁক

তারা একসাথে পার্কে বসেছিল

সন্ধ্যার আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে

মেয়েটি ছেলেটির দিকে তাকায়, তার হাড়ে উত্তেজনার

ঝিলিক লাগে

তখন সে নিঃসঙ্গ বোধ করে, সরাসরি চলে যাবার কথা ভাবে

এবং দেখে নিয়তির সরল একটি বাঁক

 

তারা পুরনো খালের পাড় দিয়ে হেঁটে যায়

আমার বেশ মনে আছে একটু হতভম্ব দুজন

উজ্জ্বল নিয়ন বাতিওয়ালা একটি অদ্ভুত হোটেলে এসে থামে

ছেলেটির মনে হয় রাতের উত্তাপ মালগাড়ির মতো তাকে

আঘাত করে

নিয়তির সরল একটি বাঁকের মতো চলে যায়।

 

দূরে কোথাও একটি স্যাক্সোফোন বাজে

যখন মেয়েটি আর্কেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়

ছেলেটি যেদিকে হাঁটছিল আলো তছনছ করে দেয় ছায়া

দরোজায় অন্ধ ভিক্ষুকের থালায় মেয়েটি রেখে যায় একটি মুদ্রা

এবং ভুলে যায় নিয়তির সরল একটি বাঁকের কথা।

 

সে যখন জেগে ওঠে রুমটি শূন্য

মেয়েটিকে সে কোথাও দেখেনি

নিজেকে বলে, কিচ্ছু এসে যায় না, তবু ঠেলে জানালার সবটা

খুলে দেয়

ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করে যার সাথে মেলাতে পারে

না নিজেকে

যা এনেছে নিয়তির সরল একটি বাঁক।

সে ঘড়ির টিকটিক শুনতে পায়

কথা বলা এক তোতাপাখির সাথে হেঁটে যায়

ডকের পাশে জলধরায় তাকে খুঁজে বেড়ায়, যেখানে এসেছে

সব নাবিক

হতে পারে মেয়েটি আবার তাকে তুলে নেবে, কতক্ষণ থাকবে

প্রতীক্ষায়

আরো একবার নিয়তির সরল একটি বাঁকের জন্য

 

মানুষ আমাকে বলে এটা অপরাধ

নিজের ভেতর জানা আর বেশি-বেশি অনুভব

আমি এখনো বিশ্বাস করি সে আমার যমজই ছিল

আমি সূত্র হারিয়েছি

তার জন্ম বসমেত্ম আর আমার বড্ড দেরিতে

দোষ হোক নিয়তির সরল একটি বাঁকের।

 

নর্থ কান্ট্রির মেয়ে

তুমি যদি নর্থ কান্ট্রির মেলায় যাও

যেখানে সীমান্তরেখায় বাতাস বড় ভারি

সেখানে বাস করে একজন, তার কাছে আমার কথা

স্মরণ করো, একদিন সে-ই ছিল আমার সত্যিকারের প্রেম।

 

যখন তুষারঝড় বয় তখন যদি যাও

যখন নদী জমে যায়, আর গ্রীষ্ম ফুরায়

দেখো তার গরম কোট আছে কিনা

শনশনে বাতাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে।

 

দয়া করে দেখো তার লম্বা চুল ঝুলছে কিনা

তার বুকের ওপর দিয়ে গড়িয়ে ঝুলছে কিনা

আমার জন্য দেখ তার লম্বা চুল ঝুলছে কিনা

সেভাবেই তো আমি তাকে সবচেয়ে ভালো মনে রেখেছি।

 

কী জানি আমার কথা তার আদৌ মনে আছে কিনা

বহুবার আমি প্রার্থনা করেছি

আমার রাতের আঁধারে

আমার দিনের উজ্জ্বলতায়

 

তুমি যদি নর্থ কান্ট্রি মেলায় যাও

যেখানে সীমান্তরেখায় বাতাস বড় ভারি

সেখানে বাস করে একজন, তার কাছে আমার কথা

স্মরণ করো, একদিন সেই ছিল আমার সত্যিকারের প্রেম।

 

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

তোমার সাথে যেন চলতে পারি

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

তুমি যা বলো সব যেন করতে পারি

বেশ, আমি রাসত্মা ধরে হাঁটছি

আমার মাথা আমার হাতে

আমি একজন নারীর খোঁজ করছি

যার চাই একজন উদ্বিগ্ন পুরুষ

 

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

তোমার উড়োজাহাজে যেন চড়তে পারি

তোমার প্যাসেঞ্জার ট্রেনে যেন উঠতে পারি

বেশ, আমি তো চারদিক খুঁজেছি

তোমার মতো একটি মেয়ের জন্য

আমি কাউকে পাইনি

কাজেই তোমাকে যা করতে হবে

তোমার কাছে কেবল একটি অনুগ্রহ চাই

আমাকে আর একটি সুযোগ দাও।

 

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

তোমার সাথে যেন চলতে পারি

প্রিয়তমা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও

তুমি যা বলো সব যেন করতে পারি

আমি একজন নারীর খোঁজ করছি

যার কোনো পুরুষ নেই

এমন যে একটি সুচ খুঁজছি

যা হারিয়ে গেছে বালিতে

তোমার কাছে কেবল একটি অনুগ্রহ চাই

আমাকে আর একটি সুযোগ দাও।

 

বব ডিলান বচন

* মানুষ যা বিশ্বাস করে, কদাচিৎ তা করে থাকে। যেটা সুবিধাজনক তা-ই করে থাকে। তারপর অনুতাপ করে।

* স্বাধীনতার সঙ্গে যে দায়িত্ব আসে, এটা যিনি বুঝতে পারেন তিনিই হিরো।

* কেউই স্বাধীন নয়। এমনকি পাখিদেরও আকাশ আটকে রেখেছে।

* টাকায় কী এসে-যায়? একজন মানুষ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমোতে যায় – আর এই সময়ের মধ্যে তার যা ইচ্ছে তা যদি করতে পারে তাহলেই সে সফল।

* আমি সবার আগে নিজেকে একজন কবি মনে করি, তারপর সংগীতশিল্পী। আমি কবির মতো জীবনযাপন করি। কবির মতোই মৃত্যুবরণ করবো।

* সমতা নিয়ে এসব কথার কথা। মানুষের মধ্যে একটি বিষয়ই কমন – সবারই মৃত্যু হবে।

* আপনি আমার গান পছন্দ করেন কেবল এজন্যই এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমি আপনার কাছে ঋণী।

* পৃথিবীর সমস্ত সত্য একত্র করলে একটি বৃহৎ মিথ্যাকে পাওয়া যায়।

* কলেজ বৃদ্ধনিবাসের মতো, তফাৎ এটুকুই, কলেজে বেশি মানুষ মারা যায়।

* গতকাল কেবল স্মৃতি, যেমন হওয়ার কথা আগামীকাল কখনো সেরকম হবে না।

* গণতন্ত্র পৃথিবীকে শাসন করে না। এটাই বরং মাথায় রাখুন। সহিংসতা পৃথিবীকে শাসন করে। এটা বরং না বলাই ভালো।

* আমি আমাদের সবার পক্ষে কথা বলছি। আমি একটি প্রজন্মের মুখপাত্র।

* আমি দিনের কাজের মধ্যে বদলে যাই। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠি আমি এক মানুষ, যখন আমি ঘুমোতে যাই, আমি নিশ্চিত, আমি অন্য আরেকজন।

* আপনার কত টাকা আছে তাতে কিছু এসে-যায় না; দুধরনের মানুষ আছে : সঞ্চিত মানুষ ও বিস্মৃত মানুষ।

* দেখুন, আমি যখন শুরু করি তখন মূলধারার সংস্কৃতি মানে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পেরি কোমো, অ্যান্ডি উইলিয়ামস, সাউন্ড অব মিউজিক। আমি তখনো তাতে লাগসই হইনি, এখনো না।

* অনুপ্রেরণা পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। কাজেই যেখান-সেখান থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে নিন।

* নিজের সব স্মৃতির যত্ন নিন। এগুলোর অভিজ্ঞতা আপনার আর হবে না।

* আমি যদি বব ডিলান না হতাম, তাহলে ভাবতাম বব ডিলানের অনেক জবাব আমার কাছে আছে।

* দৃশ্যমান হওয়া বোঝায় পরিণত হয়। দৃশ্যমান হয়েছিলেন বলেই যিশুখ্রিষ্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। সেজন্যে আমি প্রায়ই নিরুদ্দিষ্ট হই।

* আগামীকাল কী নিয়ে আসবে তা অনুমান করাও কঠিন। কবিতা হচ্ছে একটি নগ্ন মানুষ… কেউ কেউ বলে, আমি একজন কবি।

* গানই আমার অভিধান। আমি গানকে বিশ্বাস করি।

* টাকা কথা বলে না, গাল দেয়।

* আমি কখনো রাজনৈতিক গান লিখিনি। গান পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে না – আমি সব ঘেঁটে দেখেছি।

* আমি যদি দ্রম্নত মরতে পারি, তাহলে মৃত্যু আমার কাছে কিছুই নয়।

* এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকেও কখনো-কখনো নগ্ন দাঁড়াতে হয়।

* আমার গানের সবগুলো মানুষই আমি।

* ভক্তেরা কি কাজে লাগে? হাততালি দিয়ে তো আর নাসত্মা করা যায় না। হাততালি নিয়ে ঘুমোনোও যায় না।

* এ-জমিন আপনার জমিন। এ-জমিন আমার জমিন। কিন্তু যারা পৃথিবী চালান, তারা কখনো গান শোনেন না।

* আমি অসংলগ্ন, এমনকি আমার নিজের কাছেও।

* আমি নৈরাজ্য কবুল করি, কিন্তু নৈরাজ্য আমাকে কবুল করে কিনা জানি না।

* যখন আপনি অসিত্মত্বহীন হয়ে পড়বেন, তখন কে আর আপনাকে দোষ দেবে?

* আমি সুখী না অসুখী তা কখনো বিবেচনা করিনি।

* যিনি নিজেকে কবি দাবি করেন না, আমি মনে করি তিনিই কবি।

* আমার কণ্ঠস্বর এতই বাজে যে, কোনো কিছুই একে প্রভাবিত করতে পারে না। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার