বরিষ ধরা মাঝে

লেখক:

 

Borish Dhana

পূরবী বসু

মানিকের আকাশের সবকটি তারা একসঙ্গে দপ করে নিভে গেল।

দুহাত দিয়ে ঘোর আঁধার হাতড়িয়েও মানিক দিশা পায় না। ঠাহর করতে পারে না সামনের দরজাটা ঠিক কোন দিকে। খুঁজে না পেয়ে একরকম ব্যর্থ হয়েই যেন বাইরে বেরোবার বদলে আবার ঘরের ভেতরেই ফিরে আসে মানিক।

মাঘ মাসের বিকেল চারটা। ঝকঝকে রোদ্দুরে চোখে কিছুটা ধান্ধা লাগে বুঝি তার। চেনাজানা পৃথিবীটা হঠাৎ কেমন অপরিচিত ঠেকে। সবকিছুই  নতুন মনে হয়। কিঞ্চিৎ ধোঁয়াশেও বটে। তবে এইসব কোনো কিছুর ভেতরেই আজ, অন্যদিনের মতো, আনন্দের কিছু কণা চিকমিক করে জ্বলে ওঠে না।

ঝিলপাড়ার এই অতিচেনা ঘরখানা মুহূর্তের জন্যে একবার দুলে উঠেছিল মানিকের চোখের সামনে। কিন্তু ভালো করে চারদিকে লক্ষ করার পর সে নিশ্চিত হয়, সবকিছুই স্বস্থানে রয়েছে। ঘরের প্রতিটি জিনিসের অনড় অবস্থান আর সেইসঙ্গে সম্পূর্ণ প্রশান্ত মুখাবয়ব নিয়ে সালমা বানুর ঘরের মাঝখানটাতে

ওভাবে সটান দাঁড়িয়ে থাকা মানিককে আশ্বস্ত করে, এটা ভূমিকম্প ছিল না। তবু কেন জানি নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

তুমি ঠিক আছো তো মানিক?

সামনে সামান্য ঝুঁকে পড়ে মানিকের মুখের দিকে ভালো করে নজর দেন সালমা বানু। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান সবকিছু ঠিক আছে কিনা।

হ্যাঁ, আমি ভালো আছি। একদিকে ঘাড় কাত করে নিজেকেই যেন নিজে  বোঝাতে চেষ্টা করে মানিক যে, সে ভালো আছে।

মানিক সোজা হয়ে বসে চেয়ারটিতে। পিঠটা হেলান দিয়ে। হাসার চেষ্টা করে একটু; কিন্তু তার মুখভঙ্গি ঠিক হাসির রূপ নেয় না। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঠোঁটদুটো কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক নড়াচড়া, কাঁপাকাঁপি করে আবার যথাস্থানে ফিরে এসে স্থির হয়ে বসে থাকে।

টিভির ঠিক সামনে রাখা চেয়ারটিতেই বসেছে মানিক। এ-বাসায় এলে  কেন জানি এখানেই বসে সে, সর্বদা। বিনা নির্দেশে, বিশেষ কোনো আকর্ষণ বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া। অকারণে। এর শুরু আর পরম্পরা আজ আর মনে নেই। তবে এভাবেই চলে আসছে বরাবর। কেমন অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে।

সামনে খোলা টিভির সম্পূর্ণ পর্দা জুড়ে এখন ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালের কুটিল দুই নারীচরিত্রের রূপদানকারী অভিনেত্রীর মুখম-ল। চোখমুখের অতি অভিনয় আর নাচানাচি দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোনো এক বিশেষ কুকর্মে ভীষণভাবে ব্যস্ত তারা।

নির্ঘাত তাদেরই কোনো নিকট আত্মীয়ার বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত দুজনই। এগুলো দিনের পর দিন বসে বসে দেখে  লোকে। দেখে মানে প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে গেলে। আর আশ্চর্য, হজমও করে ফেলে ঠিকঠাকমতোই। এগুলো এতটাই জনপ্রিয় যে, এদের কাহিনি বা চরিত্রের কোনো বিচ্যুতি বা অসঙ্গতি, কিংবা কোনোরকম অসামঞ্জস্য-ই কারো চোখে পড়ে না।

এই একটু আগেই সালমা বানু ওই বিস্ফোরক কথাটা উচ্চারণ করলেন।

অতি সহজে দৈনন্দিন সাধারণ কথাবার্তার মতোই ভূমিকাহীন কথাটা বলে ফেলেন। শান্ত, অনুত্তেজিত কণ্ঠস্বর সালমার, যা সবসময়ে প্রায় একই লয়ে থাকে। সালমা বানুর গলার আওয়াজে কোনো ওঠানামা নেই, আবেগে মথিত হয়ে ওঠে না তা কোনো কালেই।

মানিক এলে প্রতিদিনই তার সঙ্গে টুকটাক এটা-ওটা কথা হয় সালমা বানুর। সংসারের কতরকম খুঁটিনাটি কথা, দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো জটিলতার কথা। আশা ও আশাভঙ্গের কথা। মানিকের কাছে বলার জন্যই বুঝি সারাদিন ধরে কথাগুলো জমতে থাকে সালমার কণ্ঠের কোনো অদৃশ্য ভাঁজে, জিবের তলানিতে, কিংবা ঠোঁটের ভেতরটায় চিবুতে থাকা দুই পাটি দাঁতের মাঝখানে, পানের রসে কিংবা ছ্যাবড়ায় সিক্ত হয়ে। আসলে তো ওসব কিছুই নয়। গোটা দিন ধরেই কথাগুলোর অনুরণন চলে সালমার মসিত্মষ্কে। একবার সে-কথা মানিককে বলে ফেললেই তিনি মুক্ত। এক ধরনের শামিত্ম ও স্বসিত্ম বোধ করেন। মানিক এত ঠান্ডাপ্রকৃতির মানুষ, এত কম কথা বলে সে যে, তাকে কিছু বলতে এখন আর দ্বিধা বা সংকোচ হয় না সালমা বানুর। অনেক সহজ হয়ে এসেছে তার কথা বলা। এর কারণ বোধহয় কোনো সমস্যা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই একটা সমাধান বাতলে দিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে না মানিক। সহজে উত্তেজিতও  হয় না। তার পরিণত মানসিকতা দেখে মাঝে মাঝে বিস্মিতই হন সালমা বানু। সারাজীবন সংসার না করেও গৃহস্থালির খুঁটিনাটি এত ভালো বোঝে, জানে মানিক! সেসব সত্ত্বেও সংসারের কোনো মালিন্য, ক্ষুদ্রতাই যেন তাকে স্পর্শ করে না। অতি সহজে মানুষকে ক্ষমা করতে পারে মানিক। এছাড়া কারো জন্যে কিছু করতে পারলে বড় খুশি হয়। অথচ বয়সে সে সালমা বানুর চেয়ে অন্তত দশ বছরের ছোটই হবে।

 

মানিক ভাবে, ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারিত সালমা বানুর আজকের কথাগুলোর দ্যোতনা কি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি? বা এখনো পারছেন? মনে হয় না। তাহলে এত সহজে কথাটা তাকে বলতে পারতেন না। আর বলার পরেও এত স্বাভাবিক আচরণ করতে পারতেন না।

তোমাকে আর কষ্ট করে আমার জন্যে এতটা দূর থেকে রোজ  রোজ পানি নিয়ে আসতে হবে না মানিক! এই যে দেখছ জিনিসটা! এটা জবা, মানে চারতলার হানিফের বড় মেয়ে, যে ব্র্যাকে কাজ করে, তুমি তাকে চেন, ও এনে দিলো। বলে…

বাকি কথা আর কানে ঢোকে না মানিকের। সালমা বানু তবু বলে চলেছেন, এই বিশেষ ধরনের ফিল্টার করা পানির অন্যরকম এক স্বাদের কথা, যা টিউবওয়েলের পানির মতো না হলেও যথেষ্ট সুস্বাদু। এনজিওগুলোর এই নতুন ফিল্টার বিতরণের ইতিহাস শোনার ধৈর্য বা আগ্রহ ছিল না মানিকের তখন। মানিক ভালো করে তাই বস্ত্তটার দিকে তাকিয়েও দেখেনি একবার। শোনেও নি তাই এ-ব্যাপারে ঠিক কী বলছিলেন সালমা।

কিন্তু এখন টিভির কাছ থেকে চোখ ফিরিয়ে সে তাকায় ঘরের উল্টোদিকে। দেখে, একটা ছোট্ট কাঠের টুলের ওপরে সযত্নে রক্ষেত স্তরে স্তরে সাজানো কাচের পাত্রসমেত ওই বিশেষ বস্ত্তটা। মানিকের ঘাড়ে এখনো ঝুলছে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী নীল রঙের কাপড়ের  ব্যাগটা। মেঝেতে চোখ পড়লে দেখে, পায়ের কাছে পড়ে আছে শূন্য ছোট পিতলের কলসিখানা আর মাঝারি সাইজের তামার একটা জগ। দুটোতেই ভরে নিয়ে এসেছিল, আর কিছু নয়, টলটলে জল, রোজকার মতোই।

সালমা বানু অতি আগ্রহের সঙ্গে সেই পরম আরাধ্য ডিপ টিউবওয়েলের সুস্বাদু পানি নিজের হাতে তার মাটির কলসিতে ঢেলে রাখেন। তারপর খালি কলসি ও কাঁসার ঘটি কিংবা পিতলের জগটি,  যেদিন যেটা আসে, যথারীতি ফেরত দেন মানিককে। প্রতিদিন। আজো তাই দিয়েছিলেন।

দুই পাত্র ভরা পানি নিয়ে মানিককে ঘরে ঢুকতে দেখলেই সালমা বানু এমন একখানা পরিতৃপ্তির হাসি হেসে মানিকের ডান হাত থেকে ঘটি বা জগখানা তুলে নেন যে, মনে হয় কী যেন কোনো‌ অমৃতের অপেক্ষায় এতক্ষণ ধরে বসে ছিলেন তিনি। মানিকের এই দুই কিলোমিটার হেঁটে ডিপ টিউবওয়েলের কাছে আসা, আবার সেখান  থেকে জল সংগ্রহ করে আরো প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে এ-বাড়িতে তা পৌঁছে দেবার সমস্ত ক্লামিত্ম মুহূর্তে দূর হয়ে যেত সালমা বানুর এই নিঃশব্দ, সহাস্য সম্ভাষণে।

 

মানিক কক্ষনো সালমা বানুকে জানতে দেয়নি, এখান থেকে আসলেই ঠিক কতটা দূরে তার বাসস্থান। ধারণা দিয়েছিল, যা মোটেও সত্য নয়, সে যেখানে থাকে সে-বাসাটা ওই সবুজ ডিপ টিউবওয়েলটার ঠিক পাশেই। আরো বলেছিল, রোজ দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার শেষে তাকে একবার করে ব্যাংকে যেতে হয় বাড়ির মালিকের দোকানের টাকা জমা দিতে। আর সেই ব্যাংকটা সালমা বানুর বাসা থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই! প্রকৃত ঘটনা হলো, দুপুরের খাবারের পর ঘণ্টা তিনেক বিশ্রামের জন্যে ছুটি পায় মানিক। তবে এটুকু মিথ্যা সালমা বানুকে না বললে, মানিক বুঝতে পেরেছিল‌ তিনি তার বাড়িতে এসে মানিকের এই জল দিয়ে যাবার প্রস্তাব কখনো গ্রহণ করতেন না।

এতকিছু বলার পরেও কি সহজে রাজি হয়েছিলেন তিনি?  অনেক সাধ্য-সাধনার পর একটা শর্তে অবশেষে তিনি রাজি হন। সপ্তাহে অন্তত একদিন, তা বেলা করে হলেও, মানিক সালমা বানুর সঙ্গে তাঁর নিজের হাতে রান্না করা দুপুরের খাবার খাবে।

রাজি হয়েছিল মানিক। সে জানে, তা না হলে সালমা বানুকে তার ঈপ্সিত জল দিয়ে যাবার সুযোগ কোনোমতেই সে পাবে না। মানিক কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে বলেছিল, ভালোই হবে সেটা।  সপ্তাহে একদিন অন্তত রাহেলার মায়ের একঘেয়ে রান্নার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। ওই বাড়িতে মানিকের মতো ঘরনিবিহীন গৃহী যে-কয়জন রয়েছে তাদের জন্যে প্রতিদিন একত্রে রান্না করে দিয়ে যায় রাহেলার মা।

সালমা বানুর সঙ্গে মানিকের অলিখিত এব্যবস্থাটা প্রথমে  কেবল সাময়িক, মানে মাস কয়েকের জন্যে, একটা ব্যাপার ভাবা গিয়েছিল। কিন্তু সেই কয়েক মাস এখন আড়াই বছর গড়িয়ে তিন বছরে পড়তে শুরু করেছে। আর আশ্চর্য, এই তিন বছরের মধ্যে খোলা সদর রাস্তায় দাঁড়ানো এই জলের কল, যাকে সারাদিন রাতে কত মানুষ কতরকমভাবে ব্যবহার করে, একদিনের জন্যেও বিকল হয়নি।

এই সবুজ রঙের (সবুজ রং মানে আর্সেনিকমুক্ত) টিউবওয়েলকে কেন্দ্র করে সালমা বানুর সঙ্গে মানিকের পরিচয়ের ঘটনাটা ভাবতে গেলে মনে হয় সেদিনের কথা। বাড়িওয়ালার হয়ে মিউনিসিপালটির ট্যাক্সটা দিতে মানিককেই যেতে হয়। প্রতিবছরই। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। ট্যাক্স দিয়ে ঘরে ফিরছিল মানিক। হেঁটেই। এই পথ ধরে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে চার রাস্তার সংযোগস্থলে যেখানে সে দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক উল্টোদিকের সবুজ রং-মাখানো ডিপ টিউবওয়েলের হাতলটি ধরে দুহাত দিয়ে পাম্প করে সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজেই ডান হাতখানা হাতল থেকে সরিয়ে নৌকোর আদলে বাঁকা করে সেই নিষ্কাশিত জলটি ধরার দুরূহ চেষ্টা করে যাচ্ছেন মধ্যবয়সী এক নারী। তাঁর হাত ছাপিয়েও আঙুলের ফোকরফাকর দিয়ে পড়েটড়ে গিয়ে যে সামান্য একটু জল থাকছে হাতে, সেটুকুই যেন অমৃতের মতো চেটেপুটে পান করছেন তিনি। সামনেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৈশোর ছাড়িছাড়ি বয়সের অল্পঅল্প নরম দাড়িভর্তি ফর্সামতন একটি ছেলে। ছিপছিপে লম্বা, প্যান্টশার্ট পরা ছেলেটি ঘটনার আকস্মিকতায় কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না যেন। এমন সদর রাস্তার ওপরে খোলা জায়গায় নিজ হাতে কল পাম্প করে  কোনো ভদ্রঘরের ষাটোর্ধ্ব নারীর খালি হাতে করে জল পান করার ঘটনা রোজ তো ঘটে না। সে যেন তখন কী বলছিল প্রৌঢ়াকে – হয়তো নিজে পাম্প করে দেবার অনুমতি চাইছিল, অথবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পানি পান

করার ব্যাপারে তার মধ্যবিত্ত মানসিকতায় যে ঘা খাচ্ছে সেটাই সরাসরি অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করছিল। তবে কথাবার্তা যা-ই বলুক তারা, রাস্তার এপার থেকে কিছুই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল না মানিক। তবে ছেলেটির বিব্রতকর মুখম-ল দেখে এক ধরনের মায়াই হয়েছিল তার।

আশেপাশের দু-তিনটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে, যারা কল থেকে খাবার জল নিতে এসেছিল, এমন মজার ঘটনায় তাদের করণীয় ভুলে গিয়ে খালি পাত্র মাটিতে রেখে হাঁ করে এই ঘটনা উপভোগ করছিল।

হালকা নীল রঙের ওপর কালো পাড়ের ইস্ত্রি করা তাঁতের শাড়ি ও লম্বা হাতার কালো বস্নাউজের সঙ্গে সোনালি ফ্রেমের চশমা-পরিহিত, পায়ে স্যান্ডেল, কাঁচাপাকা ঘন চুল সুচারুভাবে পেছনের দিকে আঁচড়ে হাত খোঁপা করা স্নিগ্ধ চেহারার এক ভদ্রমহিলা কল থেকে উপচেপড়া জলটা কোনোমতেই হাতে ধরে রেখে পান করতে পারছেন না। সঙ্গের ছেলেটির হাতে মাঝারি আয়তনের একখানা কালো ব্যাগ, যার ভেতর তেমন কিছু নেই নিশ্চয়ই যা দিয়ে খানিকটা জল ধরে রেখে পান করতে পারতেন এই পিপাসার্ত নারী।

মানিক তার ঘাড়ের ঝুলি ঘেঁটে একটা ঝকঝকে পিতলের গস্নাস বের করে আনে। তার এই ঝুলি হলো ছোটখাটো একটা আস্ত পৃথিবী। বাবা বেঁচে থাকতে বলত, তোর ব্যাগে বাঘের চোখ খুঁজলেও পাওয়া যাবে। প্রাত্যহিক জীবনে হঠাৎ করে কাজে লাগতে পারে, বা প্রয়োজন হতে পারে তার কিংবা অন্যদের, তেমন অনেক জিনিসই বা সেসব জিনিসের বিকল্প কিছু রয়েছে এই ব্যাগে। ধাতব গস্নøvসটি বের করে নেবার পরেও যা পড়ে রইল ব্যাগে, তার ভেতর, – একটা হাফপ্যান্ট ও গেঞ্জি, ভাঁজ করা কালো ছাতা একখানা, সুই-সুতো, আঠা, কলম, পেনসিল, রাবার, কাঁচি, চাকু, চামচ, কাগজ, সেফটিপিন, কাগজের ক্লিপ, রাবার ব্যান্ড, স্কচটেপ, একখানা মাঝারি আকারের ফিনফিনে হালকা চিনেমাটির খাবারের পেস্নট, একটি কাপ, একটা ছোট বাটি, পান-সুপুরি, চুন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, ওরস্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক মলম, গোটা কয়েক ব্যান্ড-এইড, কিছু চিনাবাদাম, দু-তিনটা শক্ত লজেন্স, ইংরেজি থেকে বাংলার একটা  ছোট্ট পকেট অভিধান… আরো ছোটখাটো কত কী! রাস্তায়, বাসে কখন কীসের দরকার হবে আগে থেকে জানা অতি কষ্টকর। কিন্তু মানিক যে এ নিয়ে ভাবে এবং তার এই খুতির ভেতরের জিনিসের তালিকার যে অনবরত পরিবর্তন ঘটে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মানিক রাস্তা পার হয়ে উলটোদিকে দ্রুত চলে আসে। তারপর  কোনো কিছু না বলে অপরিচিত ভদ্রমহিলার সামনে তার গস্নাসটি এগিয়ে দিয়ে তা ব্যবহার করার জন্যে তাকে অনুরোধ জানায়। তার মনে হয়েছিল ভদ্রমহিলা খুব পিপাসার্ত ও ক্লান্ত। হয়তো দূরে কোথাও থেকে আসছেন। গলা ভিজিয়ে জলপান করা দরকার তার।

মানিক জানত না, আসলে, দূর সম্পর্কের এক বোনের বাড়িতে ট্রেনে করে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। ঘণ্টা পাঁচেকের পথ। গিয়েছিলেন মাত্র দুদিনের জন্যে। গাঁ ছেড়ে প্রবাসী পুত্রের পীড়াপীড়িতে সেই যে শহরে এসেছিলেন তিন বছর আগে, আত্মীয়-পরিবৃত ছয়তলা দালানের দোতলার একটা ঘরে, তারপর এই বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও যাননি বা থাকেননি কখনো। কখনো মানে এই দুদিন আগে পর্যন্ত। এই প্রথম বেরিয়েছিলেন।

সালমা বানুর সঙ্গে তারই কালো ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা  তরুণ ছেলেটি সম্পর্কে তার ভাগ্নে। সে-ই এসে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল সালমাকে দুদিন আগে। আজ আবার তাকে ঘরে পৌঁছে দিতে সঙ্গে এসেছে।

 

বছর দশেক আগে সালমা বানুর ভাশুর ও দেওরের ছেলেমেয়েরা  মিলে শহরে যখন ছয়তলা এই বাড়ি তৈরি করে, সালমা বানুর একমাত্র সন্তান প্রবাসী রাসেলও একখানা ফ্ল্যাট কিনে রাখে তাদের সঙ্গে। যদিও প্রথম থেকেই তার ফ্ল্যাটটা ভাড়াতেই রয়ে যায়। ছেলে-ছেলের বউ, নাতনি – ওরা কখনো দেশে আসবে মনে করেন না সালমা বানু। বাড়ির দোতলায় যে-ঘরটাতে এখন থাকেন তিনি, সেটা কোনো ফ্ল্যাটের অংশ নয়। করা হয়েছিল বাড়ির দেখাশোনা করবে যে-ম্যানেজার তার থাকার জন্যে। কিন্তু একজন ম্যানেজার নিয়োগ করার সামর্থ্য হয়নি এই ছোট্ট ভবনের ছয় পরিবারের, যারা এখানে বর্তমানে বসবাস করছে। দারোয়ান ছেলেটি নিচতলায় গ্যারাজের পেছনের দিকের একটা ঘরে থাকে। পাশেই থাকে বাড়ির ড্রাইভার। ফলে সালমা বানুর জন্যে দোতলার ওই ম্যানেজারের ঘরটি বরাদ্দ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তিন তলায় থাকে সালমার ভাশুরের ছোট ছেলে পিয়াল। সে-ই প্রতি শুক্রবার সালমার কাঁচা বাজার করে দেয়। মাসে মাসে চিকিৎসা, খাবার, ইলেকট্রিসিটি, টেলিফোন ও হাতখরচের সব টাকা-ই পাঠায় ছেলে। এভাবেই চলে যায়। মাঝে মাঝে ছেলে উঠেপড়ে লাগে মাকে বিদেশে তার কাছে নিয়ে যাবে বলে। এই বৃদ্ধ বয়সে তার মায়ের পক্ষে এভাবে একা থাকা সম্ভব নয়। শোভনও নয়। সালমা বানুও কৃত্রিম উৎসাহ দেন, আগ্রহ দেখান ছেলেকে। বলেন, নিশ্চয় যাবো। কিন্তু তারপর আর যাওয়া হয় না। পুত্রের উৎসাহে ভাটা পড়ার জন্যেই কেবল নয়, সালমা বানুর নিজেরও শখ বা উৎসাহ হয় না বিদেশবিভুঁইয়ে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে এ-বয়সে নতুন করে বসবাস শুরু করতে। তবে একমাত্র পুত্র খুব জোরাজুরি করলে কী হতো বলা শক্ত। ফলে যে যেখানে আছে, সে সেখানে সেভাবেই থেকে যায়। দিন কেটে যায় যথারীতি।

ভাগ্নের সঙ্গে রেলস্টেশন থেকে রিকশা করে বাড়ি যাবার পথে হঠাৎ সেদিন এই সবুজ রঙের ডিপ টিউবওয়েলটি চোখে পড়েছিল সালমা বানুর। ভাগ্নেকে বলে রিকশা থামিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি টিউবওয়েলটির দিকে। টিউবওয়েলের পানি খেয়েই বড় হয়েছেন সালমা বানু। সালমার ছোটবেলায় সরকারি চাকুরে পিতার কর্মোপলক্ষে তাঁরা যখন মেহেরপুর ছিলেন, তখন থেকেই এই পরিচিত ও প্রিয় পানি খেতে অভ্যস্ত তিনি। এরপর সারাজীবনই আস্বাদন করে এসেছেন এই পানি। কিন্তু এখানে আসার পর আর তা পাননি। বোতলের পানি, সেদ্ধ করা ট্যাঙ্কের পানি, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পাইপে আসা মিউনিসিপালটির পানি, – কোনোটির-ই স্বাদ সেই টিউবওয়েলের পরিচিত পানির মতো নয়। এইসব শহুরে পানি খেয়ে তাই তাঁর আত্মা মেটে না – পিপাসা দূর হয় না। অতৃপ্তি বাড়তেই থাকে।

মানিক তার গস্নøvসখানি টিউবওয়েলের পানিতে খলখল করে প্রথমে ভালো করে ধুয়ে নেয় একবার। তারপর গস্নাস ভরে সদ্য উত্তোলিত টাটকা টিউবওয়েলের জল ভরে সালমা বানুর দিকে গস্নাসখানা এগিয়ে দেয়। হাসিমুখে বলে, মাজা গস্নাস। একেবারে পরিষ্কার। নিশ্চিমেত্ম  খেতে পারেন।

কোনো আপত্তি বা দ্বিধা না করে স্মিতমুখে একবার মানিকের মুখের দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি জলভর্তি গস্নাসখানা প্রায় ছিনিয়ে  নেন মানিকের হাত থেকে। তারপর দুই হাত দিয়ে দুদিক থেকে   গস্নাসখানা ভালো করে ধরে মুখের কাছে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে একটানে সবটা পানি খেয়ে ফেলেন। ভরদুপুরে উজ্জ্বল সূর্যের ঠিক নিচে খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পিতলের প্রশস্ত গস্নøvস-পূর্ণ একরাশ পানি ঢগঢগ করে পান করার এই দৃশ্য শুধু মানিক আর সেই লম্বা ছেলেটিই নয়, আশপাশের আরো কিছু পথচারীও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। জল নিতে আসা ফুটপাথে বসে থাকা ছোট ছেলেমেয়েগুলোও দাঁত  বের করে হাসতে হাসতে হাততালি দেয়। এই অনানুষ্ঠানিক অথচ অসাধারণ পানি পানে কে বেশি পরিতৃপ্ত হয়েছিল বলা মুশকিল। পরম আগ্রহে যিনি সেটা পান করলেন তিনি, নাকি যার সাহায্যে যার ধাতব পাত্রে করে তা পান করা সম্ভব হলো, সে।

 

সেই থেকে প্রতিদিন সালমা বানুর ঘরে এক কলসি ও এক জগ বা এক ঘটিভর্তি জগতের সেরা পানীয় – পানি অর্থাৎ ডিপ টিউবওয়েলের পানি আসা শুরু হয়।

তবে ব্যাপারটা অত সহজে সঙ্গে সঙ্গেই ঘটেনি। পানি পান করে মানিককে ধন্যবাদ জানিয়ে, অনেক দোয়া করেও নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ যেন যথেষ্ট হয় না সালমার। সম্ভব হলে তাদের বাসায় মানিককে একবার পারলে যাবার আমন্ত্রণও জানান তিনি।

সালমা বানুকে নিয়ে এসেছে যে-রিকশাওয়ালা, এতক্ষণ রিকশা

থামিয়ে পানির উৎসবের মজা দেখছিল সে নিজেও। পানি পানশেষে সালমা বানু ও ভাগ্নে এসে আবার রিকশায় ওঠেন। এতক্ষণে অবশেষে ভাগ্নেটি কথা বলার সুযোগ পায় যেন। রিকশাওয়ালাকে নির্দেশ দেয় কোথায় যেতে হবে। এখান দিয়ে সোজা গিয়ে সামনের মোড়ে ডাইনে যেতে হবে। সেটাই শহিদ তিতুমীর লেইন। ডাইনে মোড় নিলে পাঁচ-ছয়টা বাড়ি পরে বাঁদিকে ৩১-এর/এ শহিদ তিতুমীর লেইনের হলুদ ছয়তলা বাড়িটি চোখে পড়বে, যার নাম ‘ভ্রমর’।  ওটাই সালমা বানুর বাসস্থান।

রিকশাটা চলে যাবার পরেও শূন্য পিতলের গস্নøvসখানা হাতে নিয়ে  বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মানিক। বেলা পড়তে এখনো ঢের  দেরি। ট্যাক্সের কাজে দেরি হতে পারে এই আশঙ্কায় তার কাজটি মানে বিল্ডিংয়ের দারোয়ান কাম লিফটম্যানের দায়িত্বটা যথারীতি বাড়ির মালিকের ড্রাইভারকে দিয়ে এসেছিল মানিক। এটাই নিয়ম। চাকরির শুরু থেকেই এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। তখন অবশ্য মানিক এখানে একা ছিল না। এই বাড়িরই তিনতলায় ভাড়া থাকত মানিকের জীবনের একমাত্র বন্ধন, – ছোট ভ্রাতুষ্পুত্র কাজল ও তার পরিবার। কাজলের সঙ্গে অনেক বছর একত্রে বসবাস করেছে মানিক।

জলের দরে গ্রামের জায়গাজমিন সব বেচে দিয়ে কন্যা কানন ও পুত্র বাগানসহ স্ত্রী ছায়া আর কাকা মানিককে নিয়ে যখন কাজল শহরে তার এক পরিচিত পরিবারের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত  নেয়, তখন থেকেই মানিকের জীবন থেকে আনন্দ একরকম বিদায় নিতে শুরু করে। সে বোঝে, গ্রামে জায়গাজমিন রক্ষা করা, বিশেষ করে সবাই মিলে সেখানে বসবাস না করলে তা ধরে রাখা খুবই সমস্যার ব্যাপার। এছাড়াও গ্রামে পরিবার রেখে বছরের পর বছর শহরে মেসে থেকে নটা-পাঁচটা কাজ করার কঠিন জীবনযাপন করতে করতে কাজলও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই সব বুঝে বাধা না দিয়ে নিশ্চুপে কাজলের এই বাড়ি বদল তথা জায়গা বদলকে সমর্থনই জানিয়েছিল মানিক।

কিন্তু অনেক স্বপ্ন আর সেইসঙ্গে ব্যাংকের চাকরিতে দু-দুটো প্রমোশন নিয়ে পরিবারসহ শহরে এসে উঠলেও এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি কাজলের। বিরানববইতে আবার ঘর ছাড়ার সময় যখন এলো, মানিককাকাও তাদের সঙ্গে যাবে এটাই আশা করেছিল কাজল। তারা ছাড়া এই অকৃতদার কাকার আর কেই-বা আছে পৃথিবীতে? কিন্তু মানিক যায়নি। এভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা জীবনভর ছুটে ছুটে, ঘুরে ঘুরে আর ভালো লাগছিল না তার। সবচেয়ে বড় কথা, আবার নতুন অচেনা এক স্থানে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিপার্শ্ব, নতুন মানুষ, তাদের নতুন নতুন ভালো লাগা, মন্দলাগার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সঙ্গে নতুন করে তাল মিলিয়ে চলা, কথা বলা, চিন্তা ভাগাভাগি করা আর পোষাবে না তার, মনে হয়েছিল মানিকের। তাছাড়া কোলেপিঠে করে মানুষ করা কাজলের ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু এখন এই বয়সে কাজলের পুত্র, কন্যা, স্ত্রীর ফরমাস-খাটা, আবদার মেটানো, সর্বদা তাদের মন জুগিয়ে চলা বড় কঠিন মনে হতো মানিকের। ঝিমধরা অবসন্ন জীবন নিয়ে বিব্রত মানিক বুঝি বা একরকম পরিত্রাণই চেয়েছিল। ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। তাই মাটি কামড়ে এখানেই পড়ে থাকা সাব্যস্ত করেছিল মানিক। থেকে গিয়েছিল সে ওই বাসাতেই।  একা। তখন থেকেই দারোয়ান/ লিফটম্যান/ ম্যানেজার, একাই সব দেখাশোনা করে মানিক এই বাড়ির। আর নিজের জন্যে জুটিয়ে নেওয়া এই ছোট কাজখানি তার থাকা-খাওয়ার জন্যে যথেষ্ট।

 

মানিক এবার উঠে পড়ে। আজ ঘরে ঢোকার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘাড় থেকে তার ব্যাগটা একবারও নামায়নি। যথেষ্ট ভারী এ-ব্যাগ। তবু যতক্ষণ ঘরের বাইরে থাকে, সবটা সময় ওটা ঘাড়েই ঝোলে তার। আজ সালমা বানুর কথা শোনার পর ঘরের ভেতরেও ব্যাগটা মানিকের দেহলগ্ন থেকেছে। বরাবর।

খালি কলসিটা এক হাতে, আর জগটা অন্য হাতে তুলে নিয়ে বেরোতে প্রস্ত্তত হয় মানিক। সালমা বানু সামনে এসে দাঁড়ান।

তুমি কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হলে মানিক?

কী যে বলেন!

সঙ্গে আর কী বলবে ভেবে পায় না মানিক।

খাবার পানির জন্যে না হোক, আমাকে দেখতে মাঝে মাঝে আসবে তো?

নিশ্চয় আসব।

মানিক ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে।

এ-ধরনের কথা বলে, প্রশ্ন করে আজকেই কি মানিককে পরিপূর্ণ বিদায় দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন সালমা বানু?

তারপরেও তার দুশ্চিন্তা হয়। মানিক জানতে চায়,

ফিল্টার ব্যবহারের পদ্ধতি সব ঠিকমতো জেনে নিয়েছেন তো?

তা নিয়েছি। তাছাড়া জবা বলেছে, প্রথম প্রথম প্রত্যেকদিন আসবে সে। এসে বুঝিয়ে দেবে সব। তুমি নিজেও একটা ফিল্টার কিনে নাও না মানিক! পানি বয়ে নিয়ে যেতে হবে না। স্বাদটাও খারাপ লাগবে না এই ফিল্টারের পানির।

মানিক হাসে।

ওটা কোনো ব্যাপারই না। টিউবওয়েলের এত কাছে বাসা!

নির্দোষ মিথ্যেগুলো জিবের ডগাতেই যেন বসে থাকে আজকাল।

 

মানিক উঠে পড়ে।

ফেরার পথে আজ রাস্তার দূরত্বটা বড্ড লম্বা মনে হয় তার কাছে। মানিকের হঠাৎ সবকিছু কেমন শূন্য লাগে। নিজেকে হঠাৎ অতি অকর্মণ্য, অপ্রয়োজনীয় এক বৃদ্ধ ছাড়া কিছু মনে হয় না তার।

মনে পড়ে কাজলরা এখান থেকে চলে যাবার পরে এক মধ্যরাতের কথা। সেটা কাজলদের চলে যাবার দিন নয়, তার পরের দিন নয়। তার পরের পরের দিনও নয়। ওরা এখান থেকে চলে যাবার বেশ কয়েকদিন পরে হঠাৎ এক রাতে ঘুম ভেঙে যায় মানিকের। চারদিকে নিঃশব্দ অন্ধকার। একা একা বিছানার ওপর উঠে বসে মানিক। খোলা জানালা দিয়ে চতুর্দশীর চাঁদ দেখতে পাচ্ছে সে। মানিকের মনে হয়েছিল, আকাশের এই যে চাঁদটা সে দেখছে, তা কাজলের ওখানেও একই রকম দেখাচ্ছে এখন, – আজ – এই রাতে এই মুহূর্তে। তার মানে কাজল এতটাই কাছে থাকে। অথচ কাজল তো আসলেই এত কাছে নেই! কত দূরে চলে গেছে। এতটা দূরে যে, হয়তো এই জীবনে আর কখনো দেখাই হবে না তার সঙ্গে। বেশি দূরে না গিয়েও অনেক দূরে চলে যাওয়া ভাইপো কাজলের জন্যে সেই গভীর রাতে একা একা বুকের ভেতরটা কীরকম হু-হু করছিল, খালি খালি লাগছিল সব। আজ এই মুহূর্তে ফুটপাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘরে ফেরা শত শত পথচারী-পরিবৃত মানিকের সেরকম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে সবকিছু।

মানিকের মনে হয়, বাকি জীবনে কিছুই যেন আর করার নেই তার। সব কাজ শেষ হয়ে গেছে। তার সাধ্যের আওতায় যা ছিল, সবই করে ফেলেছে সে। এখন কেবল রয়েছে অনন্ত অপেক্ষার কাল। অপেক্ষা, – অমিত্মম দিনগুলোর জন্যে। সেই দিনগুলো কবে আসবে, কীভাবে আসবে, আর কতদিন পরে আসবে কিছুই জানে না সে। তবু বেঁচে আছে। হয়তো থাকবে আরো কিছুদিন।

দুই হাতে দুটো শূন্য পাত্র নিয়ে সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজের ভঙ্গিতে তালে তালে পা ফেলে যেমন ছোটে প্রতিদিন, তেমন করে নয়, আজ কোনোদিকে না তাকিয়ে হাতদুটোকে বুকের কাছে বাঁকা করে গুঁজে নিয়ে খুব দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করে মানিক।

মানিক হাঁটছে। হেঁটে-হেঁটে ঘরে ফিরছে। তার বুকের কাছে তখনো চেপে ধরা ভারী, অপ্রয়োজনীয় দুটি ধাতব সামগ্রী সম্পূর্ণ মূল্যহীন, বাহুল্য ছাড়া আর কিছু নয় – একখানা খালি পিতলের কলসি আর একটা শূন্য তামার জগ। কাঁধে ঝুলছে সেই পরিচিত গাঢ় নীল কাপড়ের ব্যাগ যার ভেতর, বাবা বলত, ভালো করে খুঁজে দেখলে বাঘের চোখও নাকি মিলবে।

মানিকের মনে হয় জন্মের পর থেকে এভাবেই গন্তব্যহীন অবিরাম হেঁটে চলেছে সে। মানিক যেন নিরবধি হাঁটছে। আর হাঁটছে। একা একা।  ক্রমাগত। সোজা। একটানা। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply