বাংলাদেশি কবিতার পালাবদল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

লেখক:

আহমদ রফিক

‘মানববিশ্বে কবিতার মৃত্যু নেই’ – ইংরেজ কবির এ মরমি উক্তিতে কবিতার চিরন্তন চরিত্রই শুধু ধরা পড়ে না, ব্যক্তিচৈতন্যের সঙ্গে (কবি ও পাঠকের মিলে) কবিতার যে নান্দনিক সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে তাও কালবিচারে সীমানার ঊর্ধ্বে। কবিতার সঙ্গে মানব হৃদয়গহনের সম্পর্ক নানামাত্রিক বিচারে ভাষা-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ এক বিশ্বমাত্রিক সূত্রে বাঁধা। সংকীর্ণতার সীমাবদ্ধ চরিত্র সেখানে অনুপস্থিত। কবিতার চরিত্র তাই যেমন বিশ্বজনীন, তেমনি সর্বজনীন হয়ে শ্রেণিনির্বিশেষও বটে।
বাংলা কবিতা ও বাংলাদেশি কবিতা দুই-ই বিশ্বসূত্রে বাঁধা মূলত আধুনিকতার টানে, সময় ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সেখানে যেমন জৈবনিক উপলব্ধির প্রকাশ, তেমনি আত্মোপলব্ধির গভীর ভাষ্যেরও প্রকাশ। তা যেমন বিনোদনে, তেমনি সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদ মিটিয়েও নান্দনিকতার মুক্তি ঘটায়। কবিতা এভাবে নানামাত্রিকতায় বৈচিত্র্যের অভিসারী। কবিতার পালাবদলও একইভাবে দেশ-কাল-ভিন্নতায় চিরন্তন সত্য হয়ে ওঠে।
বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে চল্লিশের দশকে পৌঁছে বাংলা কবিতা বিশ্বচরিত্রের সঙ্গে যোগসূত্রে তার নান্দনিক ও সামাজিক চরিত্রের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন শিল্পসর্বস্বতার নান্দীপাঠে, তেমনি সমাজচেতনার মুক্তভাষ্যে যথাক্রমে তিরিশে ও চল্লিশের অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের ভুবনে। শেষোক্ত ক্ষেত্রে প্রগতিচেতনার প্রকাশ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।

দুই
বাংলাদেশের কবিতা পাকিস্তানি চেতনার ধর্মীয় সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত হয়েছে মূলত বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের চরিত্রপ্রভাবে। আধুনিকতা, সমাজচেতনা এবং মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে পঞ্চাশের দশকের এ-পর্যায়ে ভাষিক স্বাদেশিকতার যে-প্রকাশ ঘটায় তাতে প্রাকৃত সৌন্দর্যের প্রতীকী প্রকাশ ছিল এক ধরনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সেখানে বিশেষভাবে দেখা গেছে শিমুল, পলাশ ও কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ছায়াপাত।
পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলাদেশি কবিতার পূর্বকথিত পালাবদলে তাই নান্দনিকতাকে অগ্রাহ্য না করেই সমাজবাস্তবতা ও জীবনবাস্তবতার প্রকাশ ঘটেছে। আগেই বলেছি, পঞ্চাশের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ভাষিক চেতনার প্রাকৃত প্রকাশে। তবে তিরিশের নন্দনতাত্ত্বিক চেতনারও ক্বচিৎ প্রকাশ ঘটেছে দু-একজন কবির রচনায়। যেমন শামসুর রাহমানের প্রাথমিক পর্বের কবিতায়। সেখানে প্রধানত জীবনানন্দ দাশ, কখনো বুদ্ধদেব বসুর কাব্যিক নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটেছে।
বিরল প্রকাশ হলেও ‘কবিতার জন্য কবিতা’ আপন চারিত্র্যধর্মে কাব্যভুবনে কিছুটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল। তবে পঞ্চাশের দশকে কাব্যরচনার মূল প্রবণতা দেখা গেছে সমাজচেতনার ভাষ্যে এবং তা ছিল ভাষা ও ভূখ-ের স্বাধিকারের ভিত্তিতে। পঞ্চাশের দশক তৎকালীন কবিদের জন্য হয়ে উঠেছিল মাতৃভাষার রাজনৈতিক অধিকারের মুক্তির দশক। কবিতা রচনার প্রধান সৃষ্টিধারা তেমন এক পথেই সার্থকতা খুঁজে পেতে চেয়েছে।
তবে এদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পরিস্ফুট স্বদেশভিত্তিক সমাজচেতনা ও শ্রেণিচেতনার সঙ্গে রোমান্টিকতারও প্রকাশ ঘটেছে। যদিও সে-রোমান্টিকতার সঙ্গে মাটি, মানুষ ও জীবনবাস্তবতার দ্বান্দ্বিক মিশ্র রূপও এক ধরনের সত্য। রোমান্টিকতা ও সমাজসচেতনতা বা আরো স্পষ্ট ভাষায় সমাজবাস্তবতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে অনেকের লেখায় সামাজিক দায়বদ্ধতার নান্দনিক প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কোনো কোনো সমালোচকের মতে, পূর্ববঙ্গে পঞ্চাশের কবিদের কাব্যাদর্শে একদিকে মানবতাবাদ, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রভাব প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অনেকের মধ্যে ভূখ-প্রভাবে স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার উপস্থিতিও ছিল লক্ষ করার মতো। এর পেছনে সামন্তবাদী চেতনার চেয়েও ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব সম্ভবত বেশি। তাই দু-একজনের পক্ষে সমাজবাদী হয়েও স্বাতন্ত্র্যবাদী হতে বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কারো কারো বিচারে, বিশেষ করে মার্কসবাদী শিল্পবোদ্ধাদের বিচারে তা ছিল অবাঞ্ছিত।
তবে সাধারণ বিবেচনায় বলা চলে, পঞ্চাশের কবিদের কাব্যচর্চার পেছনে প্রেরণা হিসেবে মাতৃভূমি-মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সামাজিক প্রত্যয় যেমন ছিল, তেমনি নান্দনিক বিচারে আধুনিকতার অন্বেষা, অভিনবত্ব তথা নতুনত্বের আকাক্সক্ষাও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি শৈল্পিক দায়বদ্ধতারও প্রকাশ ঘটেছে তাঁদের সৃষ্টিকর্মে।

তিন
পঞ্চাশের দশকের কবিতা প্রধানত সমকালীন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতার ফসল। মানবিকতা ও সমাজচেতনার রোমান্টিক প্রকাশের পালাবদল ঘটে ষাটের দশকে। তবে তা জাতীয়তাবোধকে বাদ দিয়ে নয়। সেক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেম-মানবীপ্রেম এলাকার হয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে প্রকাশ পেয়েছে। মাটির সোঁদা গন্ধ আর মায়ের দেহের ঘ্রাণ মিলেমিশে কবিতার নান্দনিক প্রকাশ ঘটিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে কবিতার আবেগধর্মী কিছুসংখ্যক জাদুকরী পঙ্ক্তি।
কিন্তু রাজনৈতিক কিছু অবাঞ্ছিত ঘটনা এবং টানাপড়েন সমাজ-সংস্কৃতি অঙ্গনে যে বিপরীত প্রভাব সৃষ্টি করে তার ফল কবিতাকে অংশত ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। এ-প্রভাব নেতিবাচক চরিত্রের। তাই আত্মরতি ও আপসটান কারো কারো ক্ষেত্রে শক্তিমান হয়ে ওঠে। ফলে ব্যক্তিচেতনার সীমাবদ্ধবৃত্তে কাব্যচর্চার এক ভিন্ন ধারা তৈরি হতে থাকে। নান্দনিকতার অজুহাতে কবিতায় প্রসাধনচর্চার দিকে অনাবশ্যক নজর দেওয়া কবিতার রীতিধর্মে পরিণত হয়।
এ-প্রসঙ্গে কবিতার ভুবনে স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তা নতুন করে মাথা তোলে, সঙ্গে থাকে সুবিধাবাদ, সুখবাদের ধারণা। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সামরিক বিরোধ বিপরীতচেতনায় শক্তি জোগায়। দেশাত্মবোধ হয়ে ওঠে সংকীর্ণতার শিকার। রাজকবিসুলভ চেতনা এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে দাঁড়ায়। স্মর্তব্য ১৯৬৫-র যুদ্ধ। রণাঙ্গন ও সীমান্ত সফর তাদের চেতনা ভিন্ন যাত্রায় প্রভাবিত করে। সংখ্যায় গুটিকয় হলেও কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীর ছোট একটি অংশ সত্যি বলতে কি বিকিকিনির শিকার হয়ে গিয়েছিলেন।
তবে স্বস্তির বিষয়, এ অবস্থা যেমন ব্যাপক নয়, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক-আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বাস্তবতা তা হতে দেয়নি। শাসকশ্রেণির স্বৈরাচারী মানসিকতা, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত নৈরাজ্য এবং তমোগুণের প্রতিক্রিয়ার প্রভাব কবিদের সুস্থ জীবনযাত্রায় উদ্বুদ্ধ করে। রাজনীতি ও
সংস্কৃতিচর্চার সমীকরণে গরমিল দেখা দেয়। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক যুগচেতনা এতটা প্রাধান্য পায় যে, কবি-সাহিত্যিককে প্রগতিচেতনার দ্বারস্থ হতে হয়। ঊনসত্তরের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক গণজাগরণ তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যেমন কবিতায় তেমনি গণসংগীত রচনায়।
কবিতা অনেকাংশে সরে আসে অর্থহীন শব্দচয়নের চৌখুপি থেকে, বলিষ্ঠ জীবনচর্চা তাদের ডাক পাঠায় জীবনের ধন রক্তের মূল্যে অর্জন করার জন্য। ফিরে আসে পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার
চেতনা-উদ্দীপক বাহার কাব্যভুবনে। পাকিস্তানি সহমর্মিতার প্রলেপ ঝরে পড়তে থাকে। কবিদের সংখ্যাগুরু অংশের শ্রুতিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ঘরে ফেরার ডাক। নব্য ভূখ-ভিত্তিক কথিত জাতীয়তার টান তাদের ধরে রাখতে পারে না। রাজপথ-মেঠোপথ একই চেতনার রঙে রঞ্জিত হতে থাকে।
এ-সময় কবিতা নতুন চেতনায় ভর করে বলিষ্ঠ উচ্চারণে পথ চলতে থাকে। কানে বাজে এমন চেতনার উচ্চারণ : ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’ যদিও তা ছিল ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী ঘরানার সেøাগান থেকে ভিন্ন। এখানে জাতীয়তাবাদী চেতনার রঙের বাহার। মার্কসবাদী কবি-শিল্পীরা এ-পর্যায়ে বিভাজিত। তাঁরা জাতীয়তাবাদের গৈরিকচেতনার পাশাপাশি রক্তিম পতাকার নিচে অবস্থান নিয়েছিলেন।
এছাড়া ব্যক্তিক অনুভূতির হার্দ্য প্রকাশে কবিতার জন্য একটি ছোট জমিও তৈরি হয়েছিল। অনুভূতির তীব্রতা স্বেদরক্তে মাখা বলে তা সমাজচেতনার বিপরীত ধারার ছিল না। এ-সময়ের দু-একজন কবির ভাবনা এমন, যেখানে ‘মানবিক অহঙ্কার ও অলঙ্কার মানুষের সৃষ্টিশীলতার দুই সম্পূরক তল।’ কথাটা কি মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ববিদ মেনে নেবেন?
মানুন বা না মানুন, অভাবিত হলেও সত্তরের দামামা বাজার পূর্বাহ্নে এদেশের কবিতায় এমন ঘণ্টাধ্বনিও শোনা গেছে আবার ‘সমাজমানসের মৃদুতম পরিবর্তন কবিতার শরীরে অনুভূত হয়ে’ প্রকাশ পেয়েছে। এভাবে ষাটের দশকের কবিতা বিচিত্র-ভাব প্রকাশের পথ ধরে চলেছে। তবে একথাও ঠিক যে, এই বিচিত্র-ভাবনা ও অবস্থান থেকেও ষাটের দশকের একেবারে শেষদিকে বাংলাদেশের কবিতার অংশবিশেষ রক্তচিহ্নিত পাথরটাকে ছুঁয়ে গেছে, জাতিসত্তার সম্মানে একমুঠো ঘাসফুল নিয়ে। সেখানে মানবিক চেতনার প্রকাশই বড় হয়ে থেকেছে। এজন্যই এ-সময়কার বিভিন্ন চরিত্রের কবিতা নিয়ে পর্যবেক্ষণে নানাজনের নানা মত প্রকাশ পেয়েছে।

চার
তবে ষটের দশকের শেষ প্রান্তে পৌঁছে কবিতার যে-অংশ জাগরণের রক্তছাপে চিহ্নিত তারই ধারাবাহিকতায় সত্তরের দশকে বিশেষ করে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ-উত্তর কবিতা পুরো বছরটা জুড়েই গুলি-বারুদ আর রক্তের অনুষঙ্গে চিহ্নিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। রাইফেল, রোটি-আওরতও তীব্র মর্মবেদনায় কবিতার সঙ্গী হয়েছে। বাঙালি কবি লেখক তাঁদের কলম কৃষ্ণচূড়ারঙে ভিজিয়ে সাংস্কৃতিক পরিচর্যার দায় পালন করেছেন। ষাটের দশকের নানামুখী ভাবধারা এই একটি বছরে এবং পরবর্তী কিছু সময় একটি বিন্দুতে মিলেছে। নিস্পৃহ, নির্মোহ বুদ্ধিদীপ্তিও অন্যদিকে ফিরে তাকায়নি। আসলে তাকানোর সুযোগ বা অবকাশ ছিল না।
সময়টা ছিল সব পথের যাত্রীদেরই জাতীয়তাবোধের কাছে আত্মসমর্পণের। নানা আদর্শের নান্দনিক অনুসারীদের জন্য এ-কাজ খুব একটা সহজ ছিল না। শুধু কবিই নন, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী – সবাই এই এক যাত্রার অংশীদার। পরিস্থিতি এ-যাত্রার লক্ষ্যই নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ভিন্নপথের দিশারি হওয়া সম্ভব ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনসদস্যের জন্য এটাই যেন এক পূর্বনির্ধারিত নিয়তি।
বাংলাদেশের কবিতা এই সময়পর্বে একাধিক প্রকরণগত ভিন্নতা সত্ত্বেও লক্ষ্য অর্জনের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেছে কাব্যশৈলীর নিজস্বতা নিয়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধ জীবনযুদ্ধের প্রতিরূপ হয়ে ধরা দিয়েছে। কবিতা কিছুটা হলেও তার অঙ্গসজ্জার কথা ভুলে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে অথবা অনুভূতি প্রকাশের তীব্রতায় অগ্নিক্ষরা হয়েছে। ক্বচিৎ প্রতীকে ও চিত্ররূপেও লক্ষ্যের আদর্শকে প্রতিফলিত করেছে।
এ-সময়ের কবিতায় জীবন ও মৃত্যু হাত-ধরাধরি করে চলেছে। বাতাসে মুক্তির ডাক; সে-ডাক কবিকে নানাভাষ্যে তাৎপর্যময় করে তুলতে হয়েছে যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতায়, তেমনি যোদ্ধাদের আবেগ ও শক্তি অগ্রযাত্রায় নিশ্চিত করতে। তাই কবিতার সামূহিক ক্যানভাসটি সাজানো হয় হাজার রক্তবিন্দু বা অগ্নিকণার সাহায্যে। রাজনৈতিক মতভেদ চেতনায় ছাপ ফেলে না, চেতনাকে ভিন্নমুখী হতে দেয় না।
সত্যি বলতে কি জাতীয় দুর্যোগ কবি-শিল্পী ও লেখক-বুদ্ধিজীবীদের এভাবে প্রাণিত করে, যাত্রার পথ নির্দিষ্ট করে দেয়। বিশ্বের নানা দেশের ঘটনাও লেখক-শিল্পীদের চেতনায় এভাবেই চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ বা আঞ্চলিক যুদ্ধ, তিরিশের দশকে সংঘটিত গণতন্ত্রী স্পেনের গৃহযুদ্ধ এভাবেই প্রতিটি দেশের
কবি-লেখক-শিল্পীদের তাড়িত করেছে তাঁদের নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্মে। একাত্তরে বাঙালি কবি-লেখক এদিক থেকে ভিন্ন ছিলেন না।
এভাবেই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রত্যয়-চিহ্নিত কবিতা, যা পরে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে একটি কাব্যধারা সৃষ্টি করে। যেমনটি দেখা যায় ভাষা-আন্দোলনের নানা মাত্রায় চিহ্নিত কবিতার পরিচিতি ‘একুশের কবিতা’ নামে। এ-আলোচনায় কবিতার পর্বান্তর যাত্রায় পালাবদলের চরিত্রই সূত্রাকারে তুলে ধরা হয়েছে কবি ও কবিতার নাম ও উদ্ধৃতি পরিহার করে। তবু যুদ্ধের ভয়াবহতা-শেষের গভীর বেদনার সাদামাটা অসাধারণ পঙ্ক্তিতে প্রকাশ না তুলে পারা গেল না।
অনেক যুদ্ধ গেলো
অনেক রক্ত গেলো
শিমুলের তুলোর মতো সোনা-রুপা ছড়ানো বাতাস।
ছোটো ভাইটিকে আমি কোথাও দেখি না,
নরোম নোলক-পরা বোনটিকে আজ আর কোথাও দেখি না
কেবল পতাকা দেখি,
স্বাধীনতা দেখি।
স্বাধীনতাযুদ্ধ ও তার হৃদয়-নিংড়ানো পরিণাম, তার সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে গোটা সময়পর্বটি উঠে এসেছে মাত্র কয়েকটি পঙ্ক্তিতে।
আনন্দ-বেদনার গভীর অনুভূতির জের টেনে স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ভুবনে পটপরিবর্তন। সেখানে শ্রেণিবিশেষের আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি রাজনৈতিক হতাশারও প্রকাশ। বিরাজমান রাজনৈতিক নৈরাজ্যে, দলীয় ক্ষমতার দাপটে মানুষ দিশাহারা। রাজনীতিমনস্ক বুদ্ধিজীবীর একাংশের স্বপ্নভঙ্গ। এর প্রভাব দেখা যায় কবিতায় তীক্ষè-তির্যক প্রতিবাদে। এমনকি জাতীয়তাবাদের সমর্থক কোনো কোনো কবির লেখাতেও।

পাঁচ
কবিতার এই যে আদর্শিক চেতনার পালাবদল এর প্রতিক্রিয়ায় এবং সত্তরের সঙ্গে চল্লিশের দশকের মিল-অমিলের পরিণামে কবিতা আবারো সংগ্রামীচেতনার পথ থেকে সরে আসে নান্দনিক-প্রাকরণিক প্রাধান্যের অন্তর্গত হয়ে। কবিতা ক্রমশ ব্যক্তিচেতনার বৃত্তে আশ্রয় নিতে থাকে। তার সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। জীবনকে নতুনভাবে দেখা শুরু হয় কিছুটা জোরালোভাবে।
পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন রক্ষণশীলতার দরজা খুলে দেয়। প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশি কবিদের অধিকাংশই ব্যক্তিবাদী বৃত্তে ফিরে যেতে শুরু করেন, নিজ নিজ ভাবনার ধারায় কবিতার রোদ পোহাতে থাকে। ব্যক্তিক চেতনায় নিষিক্ত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কবিতার ফুল ফুটতে থাকে। সেগুলো কাব্যাদর্শের কোনো মূল স্রোতের ধারাবাহিকতার বদলে শৈল্পিক আদর্শ বিচারে বিচ্ছিন্ন কাব্যভাবনার প্রতিফলন হয়েই প্রকাশ পায়।
এবার গোটা কাব্য-প্রচেষ্টার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নে সূত্র ও প্রবণতার সাধারণ বিচারে এমন কথা বলা চলে যে, আশির দশকের কবিতা মূলত স্বপ্নভঙ্গ ও প্রতিক্রিয়াধর্মী রচনার সময়পর্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। রাজনৈতিক বাম মতাদর্শে বিশ্বাসীরা কবিতার ভিন্ন একটি ঝাঁজাল বৃত্ত তৈরি করে। উচ্চকণ্ঠ ও তিক্তকণ্ঠের প্রকাশ বিশেষ ঘরানায় চিহ্নিত হয়। একলব্য কবিকুল শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়ায়।
এর কারণ গোটা দশক জুড়ে ক্ষমতার দাপটে স্বৈরাচারী শাসন সমাজকে বিভ্রান্ত করেছে, আদর্শচ্যুত করতে চেয়েছে, সমাজ-ভাবনাকে বিভাজিত করেছে। এ-পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কবিদের উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে চলেছে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতাও। কবিতা হয়ে ওঠে প্রধানত তাৎক্ষণিক রাজনীতিঋদ্ধ চরিত্রের। স্বপ্নভঙ্গের সুবাদে সমাজে যে-নেতিবাদী প্রভাব প্রধান হয়ে ওঠে তা অবশ্য পরবর্তী পর্যায়ে কবিদের স্পর্শ করে।

ছয়
আশির দশকে কবিদের স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিবাদী তৎপরতা সত্ত্বেও নব্বইয়ে কথিত গণতন্ত্রী শাসন যেমন সমাজব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন ঘটায় না, তেমনি কবিদের সৃষ্টিকর্মেও তেমন প্রভাব পড়ে না। সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত ও অপ্রত্যাশিত চরিত্র প্রকৃতপক্ষে কবিদের আগের মতো প্রতিবাদী না হয়ে কেন নন্দনতাত্ত্বিকতার বিচ্ছিন্ন বৃত্তে বিচরণে উৎসাহিত করল তা বহু বিশ্লেষণেও কিছুটা দুর্বোধ্য থেকে যায়।
তবে বারবার স্বপ্নভঙ্গের গভীর বেদনাজাত হতাশা যে অবসাদ ও বিষণœতার জন্ম দেয় তেমন পরিণামই হয়তো কবিদের রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে যেতে প্রলুব্ধ করেছে, সংগ্রামী কাব্যের ধারায় উজ্জীবিত হতে বাধা সৃষ্টি করেছে। শব্দ নিয়ে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিক নান্দনিকতার বৃত্তে ভিন্নধারায় কবিতা রচনায় কবিদের উদ্বুদ্ধ করেছে।
তাঁদের মনে হয়েছে, এবার বাংলাদেশে কবিতার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নয়া ভুবন তৈরি করা দরকার। সেখানে কোনো সমষ্টিগত সামাজিক আদর্শের প্রয়োজন নেই। দরকার নিজ নিজ চেতনার নিরিখে কাব্যভুবন নির্মাণ। আসলে বলিষ্ঠ, শুদ্ধ, প্রেরণাদায়ী নির্দিষ্ট মতাদর্শের অভাব, এর জাদুকরী আকর্ষণের অনুপস্থিতিও কবিতার ভুবনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বলে আমার বিশ্বাস।
সামাজিক নৈরাজ্য, রাজনৈতিক নৈরাজ্যের বর্ধমান প্রভাব কবিদের চেতনালোক ঐতিহ্যিক ধারার বাইরে কবিদের অনিশ্চয়তার ভুবনে ঠেলে দিয়েছে বলেই বোধহয় সাম্প্রতিককালে পৌঁছেও বাংলাদেশে কবিলড়াইয়ের ময়দানের পরিবর্তে ব্যক্তিবৃত্তে স্বচ্ছন্দ ছায়ায় অবস্থান করাই শ্রেয় বিবেচনা করছেন।
তাঁরা তাই শব্দ নিয়ে ভাবিত, শব্দের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহারে আগ্রহী, তেমনি ব্যক্তিকবৃত্তে ছোট ছোট ভাবের সংহত, শৈল্পিক প্রকাশে তৎপর। নান্দনিক-চেতনার প্রকাশে খ-কাব্যচিত্র সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ অধিক। ভাবনা, হয়তো এ-পথেই কবিতার নতুন, অভিনব ভুবন তৈরি করা যাবে, যা পূর্বসূরিদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের একাংশ চেতন-অবচেতনের মিথস্ক্রিয়ার জটিলতায় কবিতাকে আবদ্ধ রাখতে আগ্রহী, অনেকটা অভিনবত্বের টানে। তবে পূর্বধারার কবিতাও সৃষ্টি হচ্ছে।
কবিতা এভাবে কখনো একাধিক তত্ত্বেরও প্রভাবাধীন হয়েছে। চেষ্টা করছে চমক-লাগানো কিছু সৃষ্টির। অন্যদিকে আদর্শবাদী পূর্বসৃষ্টির ধারাও কবিদের কাউকে কাউকে সৃষ্টিকর্মে অনুপ্রাণিত করছে। কবিতার ভুবন এখন তার সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় বহুধাবিভক্ত। এর মধ্যেই কিছু কিছু উৎকৃষ্ট কবিতা জন্ম নিচ্ছে। তবে একেবারেই বিচ্ছিন্ন ভাবের প্রভাবাধীন হয়ে।
এদেশের কবিতা ভবিষ্যতে কোন পথ ধরবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর। সেখানে যদি আকর্ষণীয় কিছু সম্ভাবনার প্রকাশ ঘটে তাহলে হয়তো কবিতারও বাঁকফেরা নতুনত্বে নিজেকে খুঁজে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এ-মুহূর্তে সে-সম্পর্কে শেষ-কথা বলা অসম্ভব।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার