বাংলাদেশের উপন্যাস : একটি সরল পাঠ

লেখক:

মোস্তফা তারিকুল আহসান

উপন্যাস প্রত্যয়টির সঙ্গে পরিচিত সবাই জানেন, ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের পর, ব্যক্তি মানুষ যখন জেগে ওঠে অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্মের পর উপন্যাসের আবির্ভাব হয়।  সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মহাকাব্যের বিশাল পটভূমিতে ব্যক্তিজীবনের অনুভূতি-ক্লেদ পাঠক ঠিকমতো খুঁজে পেত না। মহাকাব্যের যুগ শেষ হওয়ার পরই সে-কারণে উপন্যাসের যুগ বোধহয় শুরু হয়। অসম্ভব এক সম্ভাবনাকে মানুষের সামনে প্রতিভাত করার প্রত্যয় থেকে উপন্যাস লেখার প্রচলন হয়। সাহিত্যের এ-ফর্মকে সহজে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। কারণটা ব্যাখ্যা করার দরকার পড়ে না। জীবন যেমন জটিল, বহুমাত্রিক, তেমনি তার প্রকাশও জটিল দ্ব্যর্থবোধক হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই নির্দিষ্ট ছাঁদে একে আটকে রাখা সম্ভব নয়। ফলে  ঔপন্যাসিক জীবনের নানা পর্যায়কে আলোকিত করতে শুধু শুকনো বা পেলব গদ্যের আশ্রয়ে থাকতে পারেন না। তাঁকে কবিতার আনুভূতিক সৌন্দর্য, নাটকের সংলাপ, পরিবেশ-পটভূমির নানাভঙ্গিম আবহ, সাংগীতিক পেলবতাকে অঙ্গীভূত করতে হলো। তার সঙ্গে যুক্ত হলো জীবন সম্পর্কে নিজস্ব দার্শনিক বোধ, প্রগলভ বাচনিক শক্তি, জীবন-সমাজ-প্রকৃতি সম্পর্কে অপার বিস্ময়। সর্বোপরি, জীবনকে ব্যাখ্যা করার কিংবা সমাজের সঙ্গে নিবিড়তার সম্পর্কসূত্রও তিনি আবিষ্কার করতে চাইলেন। ধরে নেওয়া চলে, ঔপন্যাসিকের মানস খানিকটা পাঠকের থাকা জরুরি, শুধু পাঠের বিহবলতা দিয়ে উপন্যাসকে বিবেচনা করা নিছক বোকামি কিংবা অজ্ঞতা। অর্থাৎ আমি বলতে চাই, উপন্যাসের পাঠকের একটি গড় বুদ্ধি-বিবেচনা শক্তি থাকা প্রয়োজন।

ইউরোপীয় উপন্যাসের অনুকরণে বাংলা উপন্যাস যাত্রা শুরু করেছিল মনে করা হয়। কথাটি আংশিক সত্য। হ্যানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স ফুলমণি ও করুণার বিবরণ লিখেছিলেন এদেশীয় পটভূমি নিয়ে; লেখাটি কাঁচা, ঠিক উপন্যাস হয়ে ওঠেনি। টেকচাঁদ ঠাকুর আলালের ঘরের দুলাল লিখেছিলেন, সেটাও এদেশীয় সমাজ-পটভূমি নিয়ে। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু হয় আধুনিক  তথা ইউরোপীয় উপন্যাসের প্রচলন। বঙ্কিম অসাধারণ লেখক, তবে বঙ্কিমকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, টেকচাঁদকে সেভাবে দেওয়া হয় না। বঙ্কিমের রোমান্টিক, রসময়, ঘটনাবহুল কাহিনি ও অপূর্ব গদ্য বাঙালিকে মাত করে রেখেছিল। এতে কোনো অসুবিধা ছিল না, অসুবিধা হলো আমরা বাংলা উপন্যাসের গতিপথকে পালটে দিলাম। বঙ্কিম দৃশ্যত দেশীয় সমাজ-সংস্কৃতি জীবনকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন। প্যারীচাঁদ মিত্র পাঠককে মুগ্ধ করতে না পারলেও বাংলা উপন্যাসের  প্রকৃত উঠোনটি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। সে-পথে বাঙালি ঔপন্যাসিকরা গিয়েছিলেন তবে আরো কয়েক যুগ পরে। বুদ্ধদেব বসু একবার খেদ করে বলেছিলেন, আমরা বাংলা ভাষায় ইউরোপীয় উপন্যাস লিখছি। কথাটি ঠিক তবে নকলপনা অচিরেই ঘুচে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ অনেকটা করেছিলেন, আরো করেছিলেন তিন বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বদেশি চেতনা ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সফল উপন্যাস লিখেছেন। অন্তত ঘরে বাইরে, চোখের বালি ও গোরা লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে বাংলা উপন্যাসে স্থায়ী আসন দেওয়া চলে। গোরার স্বদেশ ভাবনা, জীবনকে মহাকাব্যিক ভঙ্গিমায় দেখার শক্তির জন্য গোরা উপন্যাস স্বতন্ত্র।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়  ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনজনের জগৎ আলাদা, তবে শক্তিতে তাঁরা স্বগোত্রীয়। উপন্যাসের বিশ্বপটভূমির কথা মনে রেখেই বলা যায়, তাঁরা অসাধারণ ঔপন্যাসিক। মানিকের পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা; তারাশঙ্করের হাসুলিবাঁকের উপকথা, গণদেবতা; বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী, আরণ্যক অর্পূব রচনা। মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের যোগ, তারাশঙ্করের আঞ্চলিক জীবনবোধ-সামন্তচেতনা, বিভূতিভূষণের জীবন-প্রকৃতি-দর্শন বাংলা উপন্যাসকে ধনী করে তুলেছে। শরৎচন্দ্রের জগৎও নিজ আলোয় উদ্ভাসিত; নারীজীবন-সামন্ত চরিত্র নিয়ে তাঁর আবেগতপ্ত ভাষা আমাদের এক মদির রণজগতে নিয়ে যায়। তবে উপন্যাসের শক্তির বিবেচনায় তাঁকে ন্যূন করে দেখতেই হয়।

প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন, মুসলমানদের রচিত উপন্যাস বা বাংলাদেশের উপন্যাসকে একটু আলাদা করে দেখার রীতি চালু আছে। ’৪৭-এ দেশবিভাগের পর থেকে বাংলা ভাষার উপন্যাস তথা সাহিত্যকে দুটো শিরোনাম দেওয়া হলো। মীর মশাররফ হোসেন বিষাদ সিন্ধু লিখে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। বিষাদ সিন্ধু কী ধরনের রচনা সেটা বড় ব্যাপার নয়, ব্যাপার হলো এর অপূর্ব ভাষাদক্ষতা ও রচনাকৌশল। দুঃখের বিষয়, ’৪৭-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুসলিম ঔপন্যাসিকরা প্রচলিত উপন্যাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারলেন না। তিন বন্দ্যোপাধ্যায় অসাধারণ উপন্যাস লিখে যে স্রোতধারা নির্মাণ করেছিলেন সে-ধারায় তাঁরা অবগাহন করতে পারলেন না; তাঁরা শুরু করেছিলেন গোড়া থেকে, কাঁচা হাতে। কারণটা গুছিয়ে বলা মুশকিল। নতুন ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির উন্মাদনা, জাতীয়তাবাদী চেতনা ইত্যাদি বিষয় নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছিল বলে অনুমান করা চলে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় সবাই সহজ আলগা পথে চললেন। তাঁরা প্যারীচাঁদ মিত্রের মতো বা তাঁর চেয়ে নিম্নমানের উপন্যাসও লিখে ফেললেন। আবুল ফজল, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, সরদার জয়েনউদ্দীন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এ-পর্বের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক। এ-পর্বের লেখকদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বলেছিলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছাড়া আর কারো নাম উল্লেখ করতে পারি না। শওকত ওসমানের জননীকে তবু উপন্যাসের মর্যাদা দেওয়া চলে। তবে তাঁর বাকি উপন্যাস সম্পর্কে সদর্থক মন্তব্য করা যাবে না। আবুল ফজল, কাজী আব্দুল ওদুদ প্রমুখ ব্যক্তির বুদ্ধি-প্রজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধাবান হলেও তাঁদের উপন্যাসের প্রতি শ্রদ্ধা করা কঠিন।

চল্লিশের এই দুর্বল উত্তরাধিকার অবশ্য আত্মস্থ করেননি পরবর্তী পর্যায়ের ঔপন্যাসিকরা। তবে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের পরে নতুন একটি ধারার জন্ম হয়। এঁরা উপন্যাসকে ঠিক শিল্প হিসেবে না দেখে ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অবশ্য এর পাশাপাশি সিরিয়াস ধারা সচল রয়েছে আজ অবধি।

বাংলাদেশের উপন্যাস বলতে আমরা পঞ্চাশের দশক থেকে রচিত হওয়া শক্তিমান ধারাকে বলতে আগ্রহী। এর নেপথ্যের কারণসমূহের কয়েকটি পূর্বের আলোচনায় আংশিক আলোচিত হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে মূলত পাকিস্তানবিরোধী প্রগতিশীল ধারার লেখকগণই বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকেন। পাকিস্তানপন্থিরা রাষ্ট্রীয় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ দাপটের সঙ্গে ইসলামি তমদ্দুন নিয়ে সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেন। এর পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী সরকারের ইচ্ছা অনুসারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চিরকালীন ধারাকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করতে সচেষ্ট হন। তাদের আন্দোলনের শক্তি যত প্রবল ছিল লেখার শক্তি ছিল তত দুর্বল। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দেওয়া যাবে। ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান বা গোলাম                 মোস্তফার প্রতিভা সম্পর্কে সমীহ করতে দ্বিধা থাকার কথা নয়।

যা হোক বাংলা উপন্যাস পঞ্চাশ ও ষাটের প্রতিভাধর লেখকদের সৌজন্যে প্রকৃত গতিপথ খুঁজে পায়। রচনারীতি ও বিষয়বস্ত্তর নবারোপ, শব্দ-ভাষার শক্তিশালী প্রয়োগ, নবচেতনার সংযোগে নতুন ধারার উপন্যাস রচিত হতে থাকে। সবাই নতুন বিষয় ও নব-আঙ্গিকে লিখেছেন তা নয়, পুরনো বিষয় ও রীতি কারো কারো লেখায় বজায় ছিল। তবু সামগ্রিকভাবে দীপ্র এক চেতনা ও লৈখিক-রীতি লক্ষ করা গিয়েছিল। নতুন রাষ্ট্র, উদ্বাস্ত্ত, গ্রামীণ অবকাঠামো, দারিদ্র্য, পারিবারিক জীবন, টানাপড়েন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাষা-আন্দোলন এবং জনজীবনের বিভিন্ন স্তরের সার্বিক চালচিত্র ব্যাপক ও নিপুণভাবে উঠে আসে উপন্যাসের বর্ণনায়। আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, হুমায়ুন কাদির, দিলারা হাশেম, শওকত আলী, রিজিয়া রহমান, আবুবকর সিদ্দিক, সেলিনা হোসেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, মাহমুদুল হক প্রমুখ ঔপন্যাসিকের নাম এ-ধারায় উল্লেখ করা চলে। এর বাইরে আরো অনেকেই রয়েছেন যাঁরা সক্রিয় আছেন উপন্যাস রচনায়।  

পঞ্চাশের দশকে আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং অন্যরা নবধারা শুরু করেন। আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র, কর্ণফুলী বাংলাদেশের উপন্যাসের শক্তি ও সম্ভাবনার অন্যতম উদাহরণ। ব্যক্তিজীবনের বহুভঙ্গিম  জটিলতা, নির্বেদ লক্ষ করা যায় তাঁর উপন্যাসে। কবি ও গল্পকার হিসেবে খ্যাতি ছিল শীর্ষ পর্যায়ে। এ-সময়ে সৈয়দ শামসুল হকের আবির্ভাব। গল্প দিয়েই (‘তাস’) তাঁর যাত্রা শুরু হলেও সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি সমান দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। তিনি পূর্বসূরি হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে প্রশংসা করেছেন উদারভাবে। পাশাপাশি বলেছেন, তাঁদের সামনে গল্প বা উপন্যাসের কোনো মডেল ছিল না। তিনি বলেছিলেন, ‘বন কেটে চলেছি।’ পঞ্চাশের লেখকই বায়ান্নের সন্তান। কাজেই সেই অসাধারণ মৌল চেতনা থেকে তাঁরা বেড়ে উঠেছেন চিন্তা-চেতনা ও মননে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সম্পর্কে সৈয়দ হকের উচ্ছ্বাসকে সংগত কারণেই গুরুত্ব দিতে হয়। চল্লিশটির মতো গল্প, তিনটি উপন্যাস, কয়েকটি নাটক রচনা করে ওয়ালীউল্লাহ্ যে-ফসল বাংলা ভাষায় রেখে গেছেন তা বাঙালি পাঠক কখনো বিস্মৃত হবে না। চল্লিশের দশকেই রচিত তাঁর অসাধারণ রচনা লালসালু বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের  অপূর্ব এবং নিবিড় চিত্র। উপন্যাসের ভাষা যে লেখককে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে পারে লালসালু তার অনন্য উদাহরণ। মনে হবে, একজন কারিগর নিপুণ ছেনি দিয়ে শব্দ কেটে কেটে বসিয়ে দিচ্ছেন আর পাঠকের চোখ খুলে যাচ্ছে বিস্ময়ে, দীপ্তিতে। চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে ইউরোপীয় রচনাভঙ্গির প্রভাব পড়লেও সেখানে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র মহিমা পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। মূলত সামাজিক জীবনের অনাচার ব্যক্তিচেতনার ব্যক্তিচেতনায় কীরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে তারই তীক্ষ্ণ শব্দশিল্প হলো তাঁর শেষ দুটি উপন্যাস। উপন্যাসের সৌন্দর্য, রচনারীতি, বুনন – এসব বিবেচনায় তাঁর সমকক্ষ লেখক কমই আছে এদেশে।

সৈয়দ হক শুরু করেছিলেন অচেনা নামক উপন্যাস দিয়ে। তারপর আজো তিনি সমানভাবে সক্রিয়। সর্বশেষ উপন্যাস গল্প কোলকাতার। সেখানে তাঁর শক্তি, সামর্থ্য, পরীক্ষাপ্রিয়তা একবিন্দু কমেনি। এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ, স্তব্ধতার অনুবাদ, মৃগয়ায় কালক্ষেপণ, এক যুবকের ছায়াপথ, মহাশূন্যে পরাণমাষ্টার, অন্তর্গত, দ্বিতীয়দিনের কাহিনী, স্মৃতিমেধ, টানটান, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। মূলত জীবনের গভীর আকাঙ্ক্ষা, নির্বেদ, সম্ভাবনা, বৈচিত্র্য ও প্রজ্ঞাদীপ্ত এষণা থেকেই তাঁর চরিত্র দাঁড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের সামূহিক বাস্তবতাকে সমূলে গভীর ব্যঞ্জনায় শব্দচিত্রে এঁকেছেন তিনি। মনস্তত্ত্ব তাঁর প্রধান বিষয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর উপন্যাসগুলো অসম্ভব সফল। বাংলাভাষাকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর অবিরাম পরিক্রমা ও নিরীক্ষা তাঁকে সতত সচল রেখেছে। গদ্য ও পদ্যের শক্তিকে তিনি অসামান্য বৈচিত্র্য নিয়ে ব্যবহার করেছেন উপন্যাসে।

দিলারা হাশিম, রাবেয়া খাতুন এ-পর্বের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক। দিলারা হাশেম লিখেছেন বেশকিছু সফল উপন্যাস। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এ-লেখক লেখালেখিতে এখনো সক্রিয়। স্তব্ধতার কানে কানে, মন এক শ্বেত কপোতী, আমলকি মৌ তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। নারীকেন্দ্রিক কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লিখলেও তাঁর লেখা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। রিজিয়া রহমানের বটতলার উপন্যাস, বং থেকে বাংলা প্রতিশ্রুতিবান লেখা।

ষাটের দশকে অনেকেই সফল। শওকত আলী মূলত উদ্বাস্ত্ত, দেশান্তর, উত্তরবঙ্গের জীবনযাত্রা নিয়ে তাঁর লেখার জগৎ নির্মাণ করেছেন। তবে বাঙালির জাতিতাত্ত্বিক ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর শক্তিমান কাজ প্রদোষে প্রাকৃতজন বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা ফসল। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে একটি অনুমাননির্ভর পটভূমি নির্মাণ করে এ-উপন্যাসের শরীর নির্মিত হয়েছে। ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব ও সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বোধ মিলে তাঁর উপন্যাস বাঙালির অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আবুবকর সিদ্দিক অন্যতম কবি, গীতিকার ও কথাসাহিত্যিক। কবি হিসেবে তিনি সফল ও খ্যাতিমান। তাঁর অসাধারণ বললে দৃশ্যত সে-সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না। সাতদিনের সুলতান কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর শক্তিমান গদ্য পড়লে পাঠক বুঝতে পারেন বাংলা গদ্য কত শক্তিশালী, সাবলীল, ব্যঞ্জনাদীপ্ত ও বহুমাত্রিক হতে পারে। উপন্যাসে তিনি বর্ণনাধর্মিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। খরদাহ, জলরাক্ষস, একাত্তরের হৃদয়ভস্ম তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস বহুমাত্রিক বিষয় নিয়ে গঠিত হয়েছে। দেশবিভাগ তাঁর উপন্যাসে বড় একটি অংশ জুড়ে আছে। যাপিত জীবন, গায়ত্রী সন্ধ্যা – এ জাতীয় উপন্যাস। প্রাচীন বাংলা সাহিত্য বা পুরাণ প্রসঙ্গের পুনর্নির্মাণ করে তিনি কিছু উপন্যাস লিখেছেন। চর্যাপদ নিয়ে রচিত উপন্যাসটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। চাঁদবেনে, হাঙ্গর নদী গ্রেনেড, কাঁটাতারে প্রজাপতি তাঁর কয়েকটি বিশেষ উপন্যাস। তবে সিরিয়াস পাঠকের মনে হবে, তিনি এমন অনেক বিষয় উপন্যাসের জন্য বিবেচনা করেছেন যেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতা কম। ফলে উপন্যাস নির্মাণে দৈন্য সহজে চোখে পড়ে; আয়োজন বিশাল হয়েও তা প্রয়োজনমতো সিদ্ধিলাভ করে না।

এ-পর্বের শক্তিশালী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। স্বগত মৃত্যুর পটভূমি নামক ছোটগল্প দিয়ে তাঁর লেখক-জীবন শুরু হয়েছিল। চল্লিশটির মতো গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন মাত্র দুটি। পরিশ্রমী লেখক। তিনি বলতেন, আমি ফুলটাইম পাঠক  আর পার্টটাইম লেখক। লেখার জন্য, লেখার মালমশলা সংগ্রহের জন্য, পরিবেশ ও ভাষা নির্বাচন-গ্রহণ করতে ইলিয়াস রীতিমতো রক্তপাত ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে এরকম সিরিয়াস লেখক আর নেই। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান   বা অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে যুগপৎ গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক জীবনের যে-চিত্র তিনি অাঁকেন এককথায় তা বাস্তবতাকে হার মানায়। তিনি আণুবীক্ষণিকভাবে দেখেন আর বিষয়ের খোলনলচেসহ বর্ণনা করেন শ্লীল-অশ্লীল-গ্রাম্য ভাষায়। detailsness বলে যে কথাটি উপন্যাসের বেলায় সবচেয়ে জরুরি অর্থাৎ প্লটকে নির্মাণের জন্য লেখক যে-অলিগলি-সন্ধিতে ঢুকে পড়েন তার বর্ণনায় ইলিয়াসের পাশে কেউ নেই। হিউমার, বাস্তবতা, অবাস্তবতা, ভাষা, বর্ণনা, দর্শন, আর এক প্রচন্ড ক্ষোভসূলভ আচরণ নিয়ে ইলিয়াস যুদ্ধে নেমে পড়েন। কেউ কেউ একে বিকার বলতে পারেন। তবে বাংলাদেশের  অসহ্য সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক জীবনের ভেতরের ক্লেদাক্ত জীবন পাঠকের সামনে উদ্ভাসিত করতে একজন কথাসাহিত্যিকের যা করা সম্ভব ইলিয়াস সবই করেছেন। খোয়াবনামা উপন্যাসে তাঁর শক্তি-সমর্থ বহুগুণে বিবর্ধিত। ইতিহাসের পুরনো পাঠ থেকে  পাকিস্তান আন্দোলন অর্থাৎ ফকির বা সন্ন্যাস বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসম কার্যকলাপের মর্মন্তুদ চিত্র তুলে এনেছেন বিশাল পটভূমিতে।

কাৎলাহার বিলে মজনু শাহের কাল্পনিক শাসন, পুঁথিপাঠে সারাক্ষণ মগ্ন তমিজের বাপ, চেরাগ আলি, রাজনৈতিক নেতা, সামন্ত চরিত্র এবং এর বাইরে ব্যক্তি মানুষের ক্রোধ, ক্ষোভ, রিরংসাকে তিনি বর্ণনা করেন অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে। ল্যাটিন আমেরিকার উপন্যাসের বর্ণনাকৌশল বা জাদুবাস্তবতার প্রভাব তাঁর রচনায় আছে বলে কেউ কেউ মনে করলেও আমাদের ধারণা চিলেকোঠার সেপাইয়ের হাড্ডি খিজির, কিংবা খোয়াবনামার ধ্যানগ্রস্ত তমিজের  বাপ এদেশীয় পটভূমিতে তৈরি এবং এদের নির্মাণে যে-ভাষা ইলিয়াস ব্যবহার করেন তা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ থাকে না। বরং ইলিয়াসের রচনাভঙ্গি, ভাষার জাদুময় গতি ও পটভূমি নির্মাণ দেখে বিস্মিত হতে হয়। কাঁচা পাঠক তাঁর উপন্যাস পড়ে হোঁচট খাবেন, ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রকৃত পাঠক উপন্যাসের শক্তি, সুষমা, রসবোধ, কারুকার্য উপভোগ করবেন। ইলিয়াসের পাশাপাশি কায়েস আহমেদের নাম পাঠকের স্মরণ হবে। অকালপ্রয়াত এই কথাসাহিত্যিক মাত্র দুটি উপন্যাস ও বেশকিছু ছোটগল্প (ত্রিশের মতো) লিখেছেন দক্ষতার সঙ্গে। তাঁর দিনযাপন উপন্যাসে তরুণ মধ্যবিত্ত চরিত্রের যে-ছবি দেখা গেছে লেখকের শক্তি ও সমর্থকে শনাক্ত করে।

ষাটের দশকের বিখ্যাত গল্পকার হাসান আজিজুল হক। তাঁর নিজস্ব স্টাইল ও অপূর্ব শৈল্পিক কুশলতা বাংলা গল্পকে ভিন্ন স্তরে নিয়ে গেছে। অসম্ভব শক্তিমান এই লেখক বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। বেশিরভাগই সম্পূর্ণভাবে লিখিত নয়। তবে সম্প্রতি পূর্ণাবয়বে তাঁর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে আগুনপাখি নামে। বৃত্তায়ন, শিউলি, তরলাবালা নামে তাঁর ক্ষুদ্রাকায় তিনটি উপন্যাস রয়েছে। ’৪৭-এর দেশবিভাগের মর্মবেদনা ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে রচিত তাঁর আগুনপাখি উপন্যাসটি। একজন নারীকে কেন্দ্র করে তারই জীবনবেদে উপন্যাসের পরিসর বেড়ে উঠেছে। রাঢ়বঙ্গের একজন সামান্য শিক্ষিত গৃহিণীর চোখ দিয়ে ঔপন্যাসিক বাংলা বিভাগ তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের অমানবিক ও পাশবিক সিদ্ধান্তকে অমূলক বলে উপস্থাপন করেছেন। একে একে সবাই মেথর-বউকে ছেড়ে পূর্ববঙ্গে চলে এলেও সে যায়নি। সে বলেছে, ‘আমি কেন যাবো আমাকে বুঝিয়ে দিক, তারপর যাবো।’ সে যাইনি। এবং একাই তার যুক্তি-বুদ্ধির পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেছে। রাঢ়বঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত একটি সম্পন্ন কৃষক পরিবারের কাহিনির মধ্যে লেখক এই উপমহাদেশের মর্মান্তিক একটি ঘটনাপ্রবাহকে সমূলে তুলে এনেছেন। লক্ষণীয় যে, তিনি রাজনৈতিক উপন্যাস লেখার লোভ সংবরণ করেছেন।

পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় উপন্যাসের ধারা নামে একটা বিষয় লক্ষ করা যায়। প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদ একে অপন্যাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। সব দেশেই ক্লাসিক ধারার বাইরে এরকম সস্তা চটুল বা পর্নোটাইপ উপন্যাস থাকে। সেখানের পাঠক জানেন কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ রচনা। আমাদের সমস্যা ভিন্নতর ও ভয়ংকর। আমাদের দেশের অর্ধশিক্ষিত বা কোমল পাঠকরা ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছেন এগুলোই প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস। একটি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, ভাষা-আন্দোলনকারী জাতির জীবনে এর চেয়ে পরিতাপের, দুঃখজনক আর কী হতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, প্রণব ভট্ট, আনিসুল হক বা আরো অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা অনেকে প্রতিভাবান, সে-নমুনাও তাঁদের অনেক রচনায় লক্ষ করা যাবে। তবে তাঁরা ব্যবসায়িক কারণে এমনসব বস্ত্তকে উপন্যাস বলে আমদানি করেছেন আমাদের জন্য যা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে বাধ্য। হুমায়ূন আহমেদ প্রতিভাবান লেখক। তাঁর প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। কথাসাহিত্য ছাড়া অন্যান্য মাধ্যমেও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমণি নিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাঁর হাতে আরো ভালো কিছু হবে – এমন আশা আমাদের ছিল। সহজ-সরল ভাষা দিয়ে চরিত্রের ভেতরের গূঢ় রহস্য প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। মানুষের মনস্ততত্ত্বকে হিউমারবেষ্টিত করে উপস্থাপন করার তাঁর নৈপুণ্য আমাদের মোহিত করে। ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর ব্যবসায়িক মোহ সংবরণ করা সহজ নয়, তিনিও তা পারেননি। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পৌনঃপুনিক তরল অহেতুক হাস্যকর কাহিনি আমরা পেয়েছি তাঁর কাছে। সায়েন্স ফিকশন, শিশুতোষ ও গুটিকয় সিরিয়াস উপন্যাস দিয়ে তাঁর ক্লাস চিনে নিতে পারবে পাঠক। জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন ইত্যাদি উপন্যাস, তিতলি বেগম, বিড়াল ইত্যাদি শিশুতোষ কাহিনি এবং আরো কিছু পারিবারিক কাহিনি তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে। হুমায়ূন অ্যাবনরমাল সাইকোলোজি ব্যবহার করে হিউমার সৃষ্টি করেছেন, যৌনতা তাঁর উপাদান নয়। মধ্যবিত্তের জীবনের নানা ক্লেদাক্ত দিককে নিপুণ দক্ষতায় তিনি ব্যবহার করেছেন। হিমুবিষয়ক কাহিনি প্রথমত উপভোগ্য হলেও পরবর্তীকালে একই বিষয়ের বারংবার ব্যবহারে তা বিরক্তির উপাদানে পরিণত হয়েছে। ইমদাদুল হক মিলন শক্তিমত্তাসহ আবির্ভূত হলেও পরে তিনি সস্তা রোমান্টিকতা ও যৌনতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে সিরিয়াস কোনো পাঠক তাঁর উপন্যাসের দিকে চোখ ফেরাতে পারেন না। অথচ ভূমিপুত্র, নূরজাহান তাঁর লেখা, ভাবতে অবাক লাগে। সাহিত্য বিনোদন নয়, এই কথা বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। আমাদের এ-পর্বের লেখকরা সাহিত্যের এই মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন থেকে সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। আশি-নববইয়ের দশকের অনেক গল্পকার উপন্যাস লিখে সিদ্ধিলাভ করেছেন। ওয়াসি আহমেদ, নাসরিন জাহান, মঞ্জু সরকার, মইনুল আহসান সাবের প্রমুখ লেখকের নাম গর্বভরে উচ্চারণ করা চলে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খুব ভালো উপন্যাস লেখা হয়নি এরকম মন্তব্য করা হয় প্রায়ই। আমরা এই মন্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নই। প্রথমত, অনেক সিরিয়াস উপন্যাস এ-বিষয়ে লেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস লেখার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং এ-ঘটনার তাৎপর্যগত অধ্যাস নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আরো ভালো লেখা হতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে মহৎ যুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস লেখা হয়েছে ঘটনার অনেক পরে। লিও টলস্টয়ের যুদ্ধ ও শান্তি লেখা হয়েছে বিপ্লবের অনেক পরে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের (অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস), মারিয়া রিলকের (অল কোয়ায়েট ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট) বেলায়ও এ-কথা প্রযোজ্য। আমাদের দেশে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো স্রেফ যুদ্ধদৃশ্যের বর্ণনার সমাহার। শওকত ওসমানের দুই সৈনিক, নেকড়ে অরণ্য এ-পর্যায়ের সবচেয়ে দুর্বল রচনা। সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, সেলিনা হোসেন, শওকত আলী   এ-বিষয়ে বেশ সফল উপন্যাস লিখেছেন। সৈয়দ হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, অন্তর্গত, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ সফল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস। বিরতিহীন টানা গদ্যে রচিত দ্বিতীয় দিনের কাহিনি মুক্তিযুদ্ধের মর্ম স্পর্শ করে যায়। অন্তর্গত উপন্যাস রচিত হয়েছে কবিতা আকারে, কবিতার আনুভূতিক তীক্ষ্ণ সৌন্দর্যময়তা, কোরাসের সম্মিলিত সাংগীতিক শক্তি মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্যকে নতুন মাত্রা দেয়। বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ উপন্যাস রচিত হয়েছে মহাকাব্যিক পটভূমিতে। আঞ্চলিক, ভৌগোলিক পটভূমি ও প্রকৃতিকে তিনি ব্যবহার করেছেন বিদ্রোহীদের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে। গায়ত্রী সন্ধ্যায় সেলিনা হোসেন মুক্তিযুদ্ধকে দেশবিভাগ থেকে ধারাবাহিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ-উপন্যাসের পটভূমি বেশ বড়। তবে আয়োজনটা আরো সংহত হলে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতো। আবুবকর সিদ্দিক, মাহমুদুল  হক ও শওকত আলীর উপন্যাসেও মুক্তিযুদ্ধ ব্যবহৃত হয়েছে বেশ সার্থকতার সঙ্গে।

বাংলাদেশের উপন্যাস সামগ্রিক তাৎপর্যে-প্রাখর্যে ও বিষয়-রচনারীতিতে এ-জনপদেও সামূহিক জীবনাচরণ, সংস্কৃতি ও বোধকে ধারণ করে চলেছে। এর পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব পড়েছে কখনো পরোক্ষভাবে, কখনো সরাসরি। অসম জীবনব্যবস্থা, গণতন্ত্রের লোভী-তেজি চরিত্র, সামন্ত-ব্যবসায়ী-বুর্জোয়া, এলিট শ্রেণি, হতভম্ব গণমানুষ, নিরন্ন কৃষক মজুর, ধর্মীয় গোড়া চরিত্র, রাষ্ট্রীয় জুলুম প্রপাগান্ডা, রাজনৈতিক ও সামরিক অত্যাচারী, সুবিধাভোগী রাজনৈতিক শ্রেণি ইত্যাকার বিষয় ও চরিত্র বাংলাদেশের স্বাভাবিক জনজীবনে যে নানামুখী প্রভাব ফেলেছে তার দৃশ্যকল্প এদেশের উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। সবই খুব সচেতনভাবে শিল্পের নিরিখে হয়েছে, এমনটা বলা কঠিন। তবে যা হয়েছে তা কম গৌরবের নয়। বাংলা ঔপন্যাসিকরা আমাদের উপন্যাসের যে-আসন তৈরি করেছেন তা বিশ্বমানের। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, জীবনবোধ, বিশ্বাস, আচরণ, জীবনজিজ্ঞাসা এবং এ-জনপদের সামগ্রিক পরিবেশ-পটভূমি নিয়ে ক্লাসিক পর্যায়ের অনেক রচনা আমাদের সঞ্চয়ে আছে। সেরকম গভীর দ্যোতনাসমৃদ্ধ ভাষা ও জীবনবৈচিত্র্য আমাদের আছে। যাঁরা নতুন উপন্যাস লিখবেন বা পাঠ করবেন তাঁদের এ গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার মনে রেখেই মাঠে নামা প্রয়োজন।

শেয়ার করুন

১ thought on “বাংলাদেশের উপন্যাস : একটি সরল পাঠ

Leave a Reply