বাঘের দেশে বাঘের বেশে

লেখক:

bagher-deshe

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

বাঘ আমাদের অতিচেনা প্রাণী। ডোরাকাটা এই মায়াবী প্রাণীকে আমরা কখনো বেশ ভয় পাই আবার কখনো মায়ায় জড়িয়ে রাখি। সারা পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। যেটি এক লাখ থেকে নেমে এসে*ছে তিন হাজার দুশোতে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা এখন মাত্র একশ ত্রিশ। বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি মানুষকে। মানুষই এই মায়াবী প্রাণী বাঘের হন্তা। পরিবেশ বিপর্যয় এই রাজসিক প্রাণীকে বিপন্ন করে তুলেছে। সুন্দরবনে বাঘের অবাধ বিচরণ ক্রমে কমে এসেছে। ইউএস এইড সারা পৃথিবীর বাঘ রক্ষার আবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশেও ২০১৪ সাল থেকে বাঘ রক্ষার জন্যে জনসচেতনতামূলক কাজ শুরু করে।

‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ নামে যে দিবসের সূচনা হয়, সেটি প্রতিবছর ২৯ জুলাই নির্ধারণ করা হয়। বাঘপটুয়া শিল্পী নাজির হোসেনের আরেক নাম বাঘ-নাজির। নিজেকে বাঘ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

কেন নাজির নিজেকে বাঘের গোত্রভুক্ত মনে করেন তার নির্দিষ্ট কিছু কারণও আছে।

আবহমান বাংলায় যে লোককাহিনির সঙ্গে পটচিত্র রচনা হতো সেগুলোতে বাঘের চরিত্র দেখা যেত। যেমন – ‘গাজী-কালু-চম্পাবতী’র পালায় গাজীর সঙ্গী বাঘ। বাঘের সঙ্গেই গাজীর কথোপকথন হয়। ময়মনসিংহ গীতিকার নায়িকার সঙ্গে বাঘের সংলাপ বিনিময় হয়। মোগল মিনিয়েচারে বাঘের চরিত্রকে মূল হিসেবে ধরে নিয়ে চিত্ররচনার প্রবণতা দেখা যায়। শিল্পী নাজির হোসেন ঐতিহ্য ও লোককলার এ-প্রবণতা নিজে ধারণ করেন। বাংলার গণমানুষের মুখে-মুখে চলতে থাকা লোকগান, লোককাহিনি থেকে দৃশ্যকল্প নির্মাণের এ-পথে নাজির হেঁটেছেন বেশ সময় নিয়ে।

শিল্পীর কাজের ধরন ও বিষয় নির্মাণের কথা আমরা খানিক পরে আলোচনা করছি। তার আগে নাজিরের কাজের কল্পলোক সম্পর্কে আমরা বলতে পারি এভাবে –

নাজির এ-বাংলাকে শস্য-শ্যামলা বাঘের মতো উজ্জ্বল মায়াবী রঙে দেখতে চান। তাই তাঁর ছবি হয়ে ওঠে একেকটি গল্প। গল্পের ঢঙে ছবি তৈরি হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগের চিত্র নির্মাণে দেখা যায়, পশু শিকারের এক অনবদ্য গল্প। গল্পের সঙ্গে নিজেকে কোনো-কোনো ছবিতে জড়িয়ে নেন। কোনো-কোনো কাজে দেখা যায় নাজির নিজে বাঁশি বাজিয়ে বাঘের সঙ্গে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন। ক্যানভাসের চার কোণে চারটি বাঘের অবস্থান পুরো গল্পকে একপ্রকার বাঘবন্দি করে রেখেছে। ছবির চরিত্র হিসেবে তিনি সাপ, ময়ূর, মাছ এগুলোকেও তুলে এনেছেন।

পটচিত্র বা জড়ানো চিত্রকলার ধরন নাজিরের কাজে উঁকি দেয় ঠিকই কিন্তু তা খানিকটা মৌলিক পটচিত্রের কাছে পৌঁছায় না। নাজিরের কাজ বিমূর্ত এক গল্পের আভাস দেয়। ছবির বর্ণনায় একরকম স্পষ্ট ভাষা তৈরি না হয়ে রূপক বা ফ্যান্টাসি তৈরি করে। ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ঠিক বলা যায় না, চিত্র নির্মাণের ভাষায় রূপকল্প তৈরি করেন। এটি নাজিরের বৈশিষ্ট্য। নাজির হোসেন নিজেকে পটচিত্রী হিসেবে দাবি করলেও আমরা তা প্রত্যাখ্যান করে বলতে পারি – নাজিরের শিল্পকর্ম কল্পলোকের প্রকাশ। ক্যানভাসে বিষয়ের অতিবর্ণন দর্শকের মধ্যে মোহ তৈরি করে। এ-ভঙ্গি তাঁর নিজস্ব। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সূত্রানুসন্ধান করে।

মানুষ ও প্রাণিকুলের এ-মেলবন্ধনের সূত্র ধরে নাজিরের ক্যানভাসগুলোর জমিন তৈরি হয় নির্দিষ্ট কিছু রঙে। কোনো-কোনো ক্যানভাসের তল একেবারে গাঢ় কালো রঙে ঢাকা। কালো রঙের সঙ্গে গল্পের চরিত্রগুলো বর্ণনা করেছেন উজ্জ্বল বিপরীত রঙে। আবার তার পাশের ক্যানভাসটি দেখা যায় আলট্রামেরিন বস্নু রঙের জমিন। এমনিভাবে গাঢ় লাল, বেগুনি, নীল, ধবধবে সাদা জমিনেও নাজির তাঁর গল্প রচনা করেছেন। রঙের উজ্জ্বল দ্যুতি বেছে নেওয়ার অভ্যাস নাজির খুঁজে পেয়েছেন পটচিত্রীদের কাছ থেকে। পটচিত্রীরা মৌলিক রঙের ব্যবহার করেন বেশি। পটচিত্রীরা খুব সচেতনভাবে উজ্জ্বল ও বিপরীতমুখী রঙের ক্ষেত্রে চিন্তা করে থাকেন। নাজির হোসেন তাঁর ক্যানভাসে পটচিত্রকলার রঙের ধরন অনুসরণ করেন।

বলছিলাম বাঘের প্রসঙ্গ নিয়ে। বাঘ নাজিরের ছবির প্রধান চরিত্র কেন? এ-প্রশ্নের জবাবে নাজির বলেন, ‘বাঘ আমাদের উজ্জ্বলতা দেয়; সেইসঙ্গে শক্তি ও সাহস জোগায়। বাঘের শক্তি প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে সেরা শক্তি। তাই আমি বাঘকে আমার ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে রেখেছি।’

নাজির হোসেন নিজেকেও বাঘের সঙ্গী হিসেবে দেখান। বাঘ মাছ শিকার করছে, সঙ্গে লাল-সবুজ পট্টি বাঁধা ছেলেটি মাছ পলো দিয়ে ধরছে। ফ্যান্টাসির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে গল্প বলতে শুরু করেন শিল্পী।

নিজের ছবির সঙ্গে নিজেই সুর করে শেস্নাক বলতে থাকেন। ছবির ঘটনাকে বর্ণনা করে গীত গেয়ে শোনান। এ-গীত প্রাচীন বাংলার উৎসব-পার্বণের ধ্বনি। গীত শুনে-শুনে মানুষের মুখে-মুখে এক স্থায়ী রূপ তৈরি হয়ে আছে। নাজির গীতের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকেন। সঙ্গে থাকে বাংলার ‘রাজসিক বাঘ’। দর্শককে মাঝেমধ্যে নাড়া দেয় রাজসিক বাঘের কর্মকা-। বাঘের দেশের নাজির হোসেনের অন্তর্গত শক্তি আসে বাঘ থেকে। বাঘের আনন্দরূপ দেখা যায় এমন একটি ক্যানভাস হলো – বাঘ একতারা বাজাচ্ছে, একজন লাল-সবুজ পট্টিবাঁধা ছেলে ও মেয়ে বজরায় চড়ে যাচ্ছে। এরা সবাই বৃত্তে অবস্থান করছে। এর বাইরে চারপাশ ঘিরে আছে চারটি উড়ন্ত সাপ।

উড়তে থাকা সাপের মধ্যেও দেখা যায় আনন্দের ভঙ্গি। রঙের উদ্ভাসন। নাজিরের বিষয়ে ঘটতে থাকে এমনই ফ্যান্টাসি। নাজির একটি ফর্ম লোককলার ধারা থেকে নিয়েছেন। তা হলো –  নকশিকাঁথার গায়ে সুই-সুতার ফোঁড়। নাজিরের ছবির পুরো জমিনে আড়াআড়ি অথবা উলম্ব কোনো না কোনোভাবে নকশিকাঁথা সেলাইয়ের ফোঁড় উপস্থিত করেন। ছবির জমিনে নকশিকাঁথার ফোঁড় দেখে নকশি বুননের কথা দর্শকদের মনে পড়বে। ক্যানভাসের পুরো জায়গায় দৃষ্টিকে ছড়িয়ে দিতে এরকম স্বল্পদৈর্ঘ্যের রেখা ব্যবহার করেছেন তিনি।

নাজিরের লোককলার প্রতি মায়া অনুভব করার প্রবণতা বোঝা যায় লোকশিল্পীদের সৃষ্ট আকৃতি বা ফর্ম ব্যবহারের অভ্যাস দেখে। বিন্দু, ফোঁড়ন, ছোট-ছোট রেখার ঘূর্ণনগতি একরকম লোককলার আবহ সৃষ্টি করে।

লাল নকশিকাঁথার ডিজাইনের চিত্রতলে একটি কাজের গল্প হলো কুমারের চাকায় হাঁড়ি বানাচ্ছে কুমার। পাশে বসা মেয়েটি সাহায্য করছে। মাথার ওপরে দুপাশে শিকায় ঝোলানো শখের হাঁড়ি, কুমারের দুপাশে মাটির ঘোড়া, হাঁড়িপাতিলের গায়ে নকশা, সবার সামনে বসে আছে বাঘ, ডোরাকাটা বাঘের দৃষ্টি রাগান্বিত। এ-ছবিতে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য কুমারের চাকা ঘুরিয়ে মাটির পাত্র তৈরি, সঙ্গে বাঘের সম্পর্ক উপস্থাপন এক অনাকাঙিক্ষত ঘটনা। এভাবে নাজিরের বাঘ এখানে চমক তৈরি করে।

কোনো-কোনো ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে বাঘ নেই। নাজির নিজেই লাল-সবুজ পট্টি বেঁধে নায়ক হয়ে যান। বাঘ, কচ্ছপ, পাখি, মাছ, ময়ূর এসব নাজিরের ছবিতে প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে। বাঘের দেশে নাজির নিজেই বেশ ধরেন বাঘের। ছবির বাঘ চরিত্রগুলোকে শিল্পী মনে করেন তিনি নিজেই। তাই তাঁর ভেতরে বাঘের মায়া, স্বদেশপ্রেম, লোককলার প্রতি আগ্রহ জেগে আছে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নাজির হোসেনের এ-প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ২০১৬ সালের ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’কে উপলক্ষ করে। সংগত কারণে নয়, নাজিরের ছবির মূল চরিত্র ‘বাঘ’ এটি হয়তো একটি কারণ হতে পারে। বাঘের উপস্থাপনাকে নন্দন যুক্ত করে আমাদের জাতীয় ও লোকজ ধারার প্রকাশ দেখিয়েছেন নাজির তাঁর কাজে। তাই তাঁর কাজ আয়োজকদের কাছে গ্রহণীয়।

শিল্পীর কোনো দেশ নেই, সারা পৃথিবীতে শিল্পীর সৃষ্টির বিষয় ছড়িয়ে আছে। সারা পৃথিবী শিল্পীর দেশ। নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে শিল্পকর্ম যখন পৃথিবীর একটি প্রাণীকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়, সেটি গুরুত্ব পায়। নাজিরের বাঘের গুরুত্বও তেমনি। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের সকল বাঘের প্রতি নাজিরের ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায় এ-প্রদর্শনীর কাজে।

গত ২৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রদর্শিত এ-প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল – ‘বাংলার বাঘ’।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার